সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Fri Jun 04, 2021 1:44 am
১১.

বাতাসের শনশন শব্দ কেটে ছুটে চলেছে মোটরসাইকেল। পিচঢালা রাস্তার দু'পাশে ইয়া বড় বড় মোটা মোটা গাছ। দূর-দূরান্ত পথের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেই মনে হয়, এ যেনো এক শিল্প! কোনো শিল্পী খুব নিখুঁত ভাবে রং তুলি দিয়ে এই রাস্তার দৃশ্যপট এঁকে গেছেন একের পর এক। বৃষ্টির পানিগুলো ঝলমলে রোদ্দুরে ঝিলিক দিচ্ছিলো। পানিতে ভেসে উঠেছে খয়েরী দেহের সবুজ পাতার গাছগুলোর প্রতিচ্ছবি। নাম কি গাছগুলোর? কড়ই গাছ বুঝি? টিকলি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো সাথে দু চোখ ভর্তি কৌতুহল নিয়ে ভাবছিলো। হঠাৎ আদরের থমথমে মুখের দিকে চোখ যেতেই টিকলি আস্তে করে বলল,

'বাদর সাহেব, আপনি কি রেগে আছেন?'

তখনের করা টিকলির ওভার রিয়েক্ট এখনো আদরের মনে গেঁথে আছে। যদিও এরপরে তাদের অনেক স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়েছে তবুও ঘুরেফিরে আদরের মনে হচ্ছে, মেয়েটা ওমন করে রিয়েক্ট করলো কেনো? না জেনে বুঝে এতো তেজি গলায় কেনো কথা বলল? এক মুহুর্তের জন্য আদরকে সে খারাপ ভেবেছে বলেই না আদরের সাথে একা আসতে চায়নি। ওতো উঁচু গলায় কথা বলতে পেরেছে। ভেবেই আদরের খারাপ লাগলো। আগ বাড়িয়ে কারোর উপকার এর জন্যই সে করতে যায় না। অকারণে না জেনেবুঝে কারোর উপর উঁচু গলায় কথা বলা কিংবা তেজী স্বরে কথা বলা আদরের একদম পছন্দ না। আর তা যদি হয় নিজের সাথে তাহলে তো কথাই নেই। নাকের পাটাতন ফুলিয়ে আদর উত্তর দিলো,

'সবকিছু বাদ দিন। আগে বলুন আমাকে কি বলে ডাকলেন?'

টিকলি জিব কেটে অন্যদিকে ঘুরে খুব গোপনে হাসলো। কোনোরকম হাসি চেপে রেখে আবারো প্রশ্ন করলো, 'আমরা এখন মোক্তারিয়া ঘাটে যাচ্ছি তাই না বাদর থুরি আদর সাহেব?'

নাক ফুলিয়ে আদর এক বাক্যে বলে দিলো, 'না।'

আত্মা ধক করে উঠলো টিকলির। এখন তো তাদের মোক্তারিয়া ঘাটেই যাওয়ার কথা। সেই ঘাট থেকে স্পিডবোট কিংবা ট্রলারে করে বন্দরটিলা ঘাট। এছাড়া তো আর কোনো রুট নেই। সব তো টিকলি ঠিকঠাক জেনেই এসেছে। তবে? তবে কি টিকলি ভুল করলো এই মানুষটাকে বিশ্বাস করে?

দুরুদুরু বুকে টিকলি বলল, 'কি বলছেন আপনি?'

'সরি মিস. টিকটিকি আমরা মোক্তারিয়া ঘাটে যাচ্ছি না। তার আগে আমরা যাবো কমলার দিঘি। ড্রাইভারদের সাথে আগেই কথা বলে নিয়েছি। কমলা দিঘি দেখে তারপর আমরা যাবো মোক্তারিয়া ঘাট।'

টিকলি চোখ বুজে বুকে হাত দিয়ে প্রশান্তির শ্বাস ফেলল। আর একটু হলেই তার প্রাণ পাখি উড়ে চলে যেতো বন্ধ কোনো কুটিরে। টিকলি যখন বুকে ডান হাত রেখে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলো তখন মোটরসাইকেল একটা বিটের উপর দিয়ে গেলো। অসতর্কতাবশত টিকলি প্রায় ঝুঁকে পরেই যেতে নিয়েছিলো। আদর তাড়াতাড়ি এক হাত দিয়ে টিকলিকে আটকানোর চেষ্টা করলো। টিকলি কোনোরকম নিজেকে সামলে নিয়ে আদরের কাধে আবারো হাত রেখে বসলো। ঝাঁজালো গলায় উঁচুস্বরে আদর বলল,

'কাউকে অযথা সন্দেহ করলে এমনই হয়। মেয়ে মানুষের সন্দেহের বাতিক বেশি লোকে ঠিক বলে।'

টিকলি বড় বড় করে চেয়ে সূক্ষ্ম কন্ঠে বলল, 'অপমান করছেন?'

'না পূজা করবো আপনাকে।' ত্যাড়া উত্তর আদরের।

টিকলি নাক ফুলিয়ে বসে রইল এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, সে আর এই লোকটার সাথে কথাও বলবে না আর সন্দেহও করবে না। লোকটার কথা তো নয় যেনো তীরের ফলা।

,

সামনের ড্রাইভারদের অনুসরণ করতে করতে ওরা কমলার দিঘি এসে পরলো। পথের মাঝেই একটা জায়গায় দু' পাশে বিশাল বড় বড় ঝাউগাছ আর মাঝখানে মাটির সরু রাস্তা। রাস্তাটা এতো সরু যে ঝাউগাছের ডাল-পালা শরীরের সাথে বাড়ি খেয়ে যাচ্ছিলো।

দু'পাশের ঝাউবনের ভিড়ে ওরা যখন যাচ্ছিলো তখন প্রকৃতির আবেশে টিকলির মুগ্ধকরা নয়নে একটা ঝাউগাছের চিকন ডাল এসে বাড়ি খেলো। টিকলি কুকরিয়ে উঠলো। আদর প্রায় সাথে সাথে মোটরসাইকেল থামালো। ওদের সাথে থামলো পেছনের আর্দ্রর মোটরসাইকেল ও। সামনের যে ড্রাইভার ওদের দিকে নজর রাখছিলো সেই ড্রাইভার সামনের দুজনকে বলল মোটরসাইকেল থামাতে। সবাই এগিয়ে আসতেই ছোট-খাটো একটা ভিড় জমে গেলো। টায়রা দেখলো টিকলির বাম চোখের ভ্রুর উপর কেটে গেছে। অল্প থেকে চোখ টা বেঁচে গেলো।

আর্দ্র হন্য হয়ে নিজের ব্যাগ থেকে পানি নিয়ে এলো। টায়রা টিকলির মুখে পানি ছিটিয়ে দিয়ে বলল, 'কারোর কাছে কোনো মলম বা ওষুধ হবে?'

আদর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলো। এতোক্ষণে সে নিজের ব্যাগটা আর্দ্রর দিকে ছুড়ে মেরে বলল, 'ব্যথার মলম আর ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ আছে। '

টায়রা যখন টিকলির কাটা স্থানে মলম দিয়ে দিচ্ছিলো তখন টিকলি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছিলো আদরকে। একটা মানুষ এমন হতে পারে? এ কেমন মানুষ? টিকলিকে এতো হেল্প করলো। টিকলির জন্য মোটরসাইকেল ভাড়া করে নিজে চালিয়ে এলো। অথচ টিকলির ব্যাথার সময় সে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল?

টিকলি উঠে দাড়ালো। টায়রা বলল, 'পারবি তো যেতে? ব্যাথা করছে?'

'না। তোরা চল।'

যে যার মোটরসাইকেলে উঠে বসলো। টিকলি আদরের পেছনে উঠে বসতেই আদর বলল, 'মাথা নিচু করে রাখবেন। পারলে আমার পিঠের সাথে মাথা ঘেঁষে রাখবেন।'

টিকলির মনে আবারো হাওয়ায় দোলনা দুলল। ঠিক যখনি এই মানুষটাকে খারাপ ভাবে ঠিক তখনি এই মানুষটা আরো বেশি ভালোয় পরিণত হয়ে যায়। গাড়িগুলো সব আবার চলতে শুরু করলো টিকলি একটু মন খারাপ করে জিজ্ঞেস করলো,

'আপনি ওমন পাষাণ হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন কেনো?'

'কেউ যদি নিজ থেকে ইচ্ছে করে ব্যাথা পায় তাহলে তো এমনি করা উচিত। ডোন্ট কেয়ার ভাব তাইনা?'

'আমি ইচ্ছে করে ব্যথা পেয়েছি?' টায়রার অবাক কণ্ঠ।

'তা নয়তো কি? আপনি যদি ওতো হা করে এই ঝাউ গাছের দিকে না তাকিয়ে থেকে মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে রাখতেন তাহলেই তো আর এই দূর্ঘটনা ঘটতো না। এখানে কারোর কিছু হলোনা কিন্তু আপনি চোখ টোখ কানা করে বসে রইলেন।'

খাঁটি সোনার কথা। কিন্তু টিকলির পছন্দ হলো না। গোমড়া মুখে বসে থাকলো। সবসময় কি সব দোষ তার হয়?

দু মিনিটের মাথায় তারা কমলার দিঘির বীচের কাছে থামলো। দেখলো দু একজন পর্যটক এসেছে এই কমলার দিঘি ঘুরতে। কমলার দিঘি তেমন একটা পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র নয় তবে হাতিয়ার স্থানীয় জনগনের কাছে এটি বেশি জনপ্রিয়। কমলার দিঘি মূলত একটি চর। একে কমলার দ্বীপও বলা যায়। এর চারিপাশ হাজার হাজার কেওড়া গাছ দ্বারা ঘেরাও। বিস্তৃত জায়গা জুড়ে এই কেওড়া বন। বাংলাদেশের বনবিভাগ থেকে একসময় এই জায়গায় অসংখ্য কেওড়া গাছ লাগানো হয়েছিলো যাতে নতুন জেগে উঠা চরকে আকড়ে ধরে রাখতে পারে। এর পাশেই রয়েছে একটা দিঘি। মাটির রং এখন মেটে রঙের হলেও একসময় কিছুটা লাল-কমলা ছিলো বলে এর নাম কমলার দিঘি।

বঙ্গোপসাগরের অতি নিকটে মেঘনা নদীর পাড় ঘেঁষে জেগে উঠা এই চরের মাইলের পর মাইল সবুজ কেওড়া গাছের বেষ্টনীতে বেষ্টিত সবুজ ঘাসের চাদরে ঢাকা বিস্তৃত মাঠ, সুবিশাল আকাশ, চিকমিক সাদা বালুর বীচ। সাগরের তীরে চরের ধবধবে সাদা বালু রৌদ্রময় উষ্ণ। এছাড়াও, রয়েছে সারি সারি কেওড়া গাছ, যা দেখলে চোখের পাতা মুগ্ধতায় ডানা ঝাপটানো বন্ধ করে দেয়।

কেওড়া গাছের আশেপাশে রয়েছে অসংখ্য শ্বাসমূল। স্থানীয় মানুষজন সম্ভবত একে 'বুম/ভূম' বলে।

সামনেই দেখা যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। সাগরের পাড়ে সুমধুর ঠান্ডা বাতাস। গাছেরা দুলছে অবিরাম। অন্তহীন নৃত্যে মেতে উঠেছে তাদের ডাল-পাতা। চিকচিক ভেজা উষ্ণ বালুময় ভূমিতে পা দিতেই সুরসুরি লাগছে। টায়রা এক্সাইটমেন্টে কথা হারিয়ে ফেলেছে। প্রকৃতির আকর্ষনে আপ্লুত সে। আদর আর্দ্র দুজন চোখে সি ব্লু রঙের একই সানগ্লাস পরে দাঁড়িয়ে ছিলো। পেছন থেকে ড্রাইভাররা তাড়া দিলো। আর্দ্র আদর এগিয়ে গেলো মোটরসাইকেলের দিকে। ওরা যেতেই টায়রা টিকলিকে খোঁচা দিয়ে বলল,

'তুই ওই ভাদ্রর সাথে যা, আমি আদর ভাইয়ার সাথে যাবো।'

আর্দ্র তখন ডাকতে এসেছিলো ওদের। টায়রার কথা শুনে সে তেজীয়ান গলায় বলল, 'মিস. ফুটা টায়ার নিজেকে এতো প্রায়োরিটি দিবেন না বা ইম্পোর্টেন্ডও ভাববেন না। আপনাকে নিয়ে যেতে আমার বয়েই গেছে। '

আর্দ্র টিকলির হাত ধরে বলল, 'তুমি আসো তো আপু। আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। কোনো টায়ার ফায়ার বহন করার মতো ইচ্ছে আমার নেই।'

টায়রা নাক ফুলিয়ে ভেংচি কাটলো। বলল, 'ক্ষমতা থাকার লাগে এই টায়রাকে বহন করতে।'

'সেই ক্ষমতা আমি চাই না। কোনোভাবে পেলেও সেই ক্ষমতা আমি বিকিয়ে দিবো।' আর্দ্র বলল দূর থেকে গলা উচিঁয়ে। আর্দ্রর এমন ধারার কথা শুনে টায়রার মনে ক্ষিপ্ত বাতাস বইলো। এদিকে টিকলিকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই তাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে আর্দ্র।

আদর মোটরসাইকেলের সাথে হেলান দিয়ে বেঁকে দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে শিষ বাজাচ্ছিলো। হঠাৎ সে দেখলো আর্দ্র টিকলির হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তা দেখে আদর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সানগ্লাসটা খুলল চোখ থেকে। টিকলি অসহায় ভাবে এক ঝলক তাকালো আদরের দিকে। এই তাকানোর অর্থ কি আদর জানে না। তবে তার মনে বিষন্ন সুর বয়ে গেলো। শিষ বাজানোর তাল কেটে গেলো। কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা ছুয়ে গেলো। তারপর আবারো স্বাভাবিক ভাবে সানগ্লাস টা চোখে পরে সে মোটরসাইকেলে উঠে বসলো।

আর্দ্র তখন মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে। টিকলি আদরের দিকে একবার তাকিয়ে উঠে বসলো আর্দ্রর পিছনে। টায়রা এসে দাড়িয়েছে তখন আদরের পাশে। আদর টায়রার দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হাসি দিয়ে বলল, ' হঠাৎ বাইক চেঞ্জ?'

'কিছু না ভাইয়া। এমনি।'

টায়রা কিছুই বলল না আদরকে। আর এই না বলা 'এমনি' কথাটাই আদরের বুকে সুইয়ের মতো বিধে রইল। 'আপনি একবার আমাকে বলে গেলেন না?' এই প্রশ্নটা অজান্তেই আদরের মনে বারংবার ঘুরপাক খেলো। এমনি এমনি মোটরসাইকেল চেঞ্জ করার কি আদেও কোনো কারন ছিলো? এটা কি আমাকে অপমান করা নয়? আমাকে কিছু না বলে হুট করে অর্ধেক রাস্তায় এসে আমারই ছোট ভাইয়ের সাথে সে চলে গেলো। এটা কি কোনোভাবে আমাকে রিজেক্ট করা হলো না? আদরের মুখ ভারী হয়ে গেলো। গম্ভীর গলায় সে বলল,

'উঠে বসো টায়রা।'

চলবে

Sm samim, Alom khan, Salman reja, Foisal Hossain, Hossain molla, Tanvir rahman, Tanvir hrz and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Fri Jun 04, 2021 1:44 am
১২.

সবার পেছনে ছুটে চলেছে আদরের মোটরসাইকেল। আদরের কিছুটা আগে যাচ্ছে আর্দ্রর গাড়ি। টিকলি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো আদরের দিকে। টায়রা আদরের কাধে এক হাত রেখে আরেক হাত দিয়ে ব্যাগ ধরে আনমোনা হয়ে কোথাও তাকিয়ে ছিলো। দুটো গাড়ির মধ্যে যে খুব বেশি ফারাক তা নয়। কাছাকাছি চলছে। আর্দ্রর গাড়ি থেকে এক ফিট দূরে হবে আদরের গাড়ি। টিকলি বহুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো আদরের পানে। আদর একবাক্যে সামনের দিকে চেয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। তার চোখের মনি দুটি একবারো ঘুরলো না টিকলির দিকে। একবার চেয়ে দেখলো না এক অপরূপ রমনী তার পানে নিজের অগাধ গহন দুটি চোখ মেলে দিয়েছে। কেনো জানি না টিকলি অসহায় হয়ে পরলো। স্নিগ্ধ চোখ দুটো দিয়ে আদরের পানে তাকিয়েই ভাবলো, 'সে কি রাগ করলো?'

টিকলি চোখ ঘুরিয়ে বিষন্ন মনে সামনে তাকালো। মন খারাপের ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমে গেছে। এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টিগুলো জানতে পারলো না আদর ঠিক দেখেছে দুটি প্রগাঢ় অভিলাষী চোখ তার সাদৃশ্যে তাকিয়ে ছিলো। টিকলির দিকে সরাসরি না তাকালেও তার মনোযোগ আটকে ছিলো টিকলিতে। সে দেখেছে টিকলিকে তাকিয়ে থাকতে কিন্তু কোনো এক চাপা অভিমানে আদরের পুরোদস্তুর আর তাকানো হয়ে উঠলো না। টিকলি যখন সামনে ফিরে তাকালো আদর তখন এক নজর টিকলিকে পেছন থেকে ভালোভাবে দেখলো। তারপর আবারো মোটরসাইকেল চালানোতে মনোনিবেশ করলো।

,

কমলার দিঘি থেকে প্রায় এক ঘন্টার ব্যবধানে হাতিয়ার শেষ প্রান্ত অর্থাৎ মোক্তারিয়া ঘাটে পৌছে গেলো ওরা। সেখান গিয়ে ড্রাইভারদের ভাড়া ও মোটরসাইকেল বুঝিয়ে দিলো। মোক্তারিয়া ঘাট থেকে স্পিডবোট বা ট্রলারে করে যেতে হয় বন্দরটিলা ঘাট অর্থাৎ নিঝুম দ্বীপের এক প্রান্ত।

আদররা স্পিডবোট ভাড়া করলো। আদর ব্যাগ গুলো একে একে এনে স্পিডবোটে রাখলো। স্পিডবোট টা ঘাট থেকে অল্প একটু দূরে। লাফিয়ে উঠতে গেলে পরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। টিকলি হাত বাড়িয়ে দিলো আদরের দিকে। আদর সম্পূর্ণ তাকে উপেক্ষা করে ট্রলি ব্যাগগুলো টেনে স্পিডবোটে তুলতে ব্যাস্ত হয়ে পরলো। টায়রা পাশ থেকে তখন চেঁচিয়ে বলল, 'ভাইয়া হাতটা ধরুন না।'

আদর সৌজন্যে হেসে টায়রাকে হাত ধরে টেনে উঠালো। টায়রা স্পিডবোটে উঠে টিকলির দিকে তাকালো সাথে বলল, 'হাইরে! তুই এখনো গাধার মতোন তাকিয়ে আছিস? নে উঠ দেখি।' টায়রা হাত বাড়ালো টিকলি জোরপূর্বক হেসে হাত ধরে উঠে আসলো।

বন্দরটিলা ঘাটে পৌছাতে সময় লেগেছে মাত্র কয়েক মিনিট। স্পিডবোট চলতে শুরু করতেই দেখা গেলো পানির ঝলকানি। টিকলি টায়রা পানিতে হাত রাঙালো, ঝাপটালো, আবেশিত হলো।

টিকলি আর টায়রা বসেছে পাশাপাশি। ওদের সামনেই আদর আর আর্দ্র বসেছে পাশাপাশি। সামনের দিকে তাকালেই চারজনা চারজনের মুখচ্ছবি স্পষ্ট দেখতে পারছে। টিকলি বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো আদরের দিকে কিন্তু এই কয়েক মিনিটের মাঝে আদর একবারো মুখ তুলে চেয়ে দেখলো না টিকলির ওই গভীর কূপের দুটো অসহায় চোখ। যে চোখ বলছে, 'আমার অপরাধ কি?'

অন্যদিকে, তখনের পর টায়রার সাথে আর্দ্রর আর কথা হয়নি। সবার মাঝে এক গোপন অভিমানের পালা চলছে। কিন্তু কেনো? কি অর্থ এই অভিমানের? অচেনা অজানা মানুষের সাথে আড়ালে আবডালে অভিমান কি মানায়? অভিমান কি যার তার উপর আসে? এই আড়ালে অভিমানটার উপর থাকে না বলা এক অধিকার। ওদের চারজনের কি সেই অধিকার হয়েছে? নাহ..হয়নি তো! তবে কেনো এই অভিমান? অভিমান যে অনেক দামী। যার তার সাথে করতে নেই। তা কি এই চার যুবক-যুবতী বুঝে না?

,

স্পিডবোট থেকে নামার সময় যথারীতি আদর সবার আগে নেমে আবারো ব্যাগপত্র নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পরলো। টিকলি এবার আর হাত বাড়িয়ে দিলো না। কিন্তু সে নামতে হিমশিম খাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে। ভাবছে, যদি নামতে গিয়ে স্পিডবোট পিছিয়ে যায় তখন তো টিকলি পানিতে পরে যাবে। গুরুতর কিছু না হলেও মান সম্মানের ফালুদা হয়ে যাবে।
এইতো... কাছাকাছি দেখা গেলো আর্দ্রকে। টিকলি গলা ছেড়ে আর্দ্রকে ডাক দিলো। আর্দ্র এসে নামিয়ে নিয়ে গেলো টিকলিকে।

টিকলির ডাক ঠিক কর্ণপাত হয়েছে আদরের। তার মনের মোমবাতিটার আলো আরেকটু হালকা হয়ে এলো। এরপরের বার বুঝি নিভেই যাবে। মনের মোমবাতির নিভু নিভু আগুনের জ্বলন্ত শিখাগুলো একটাই প্রশ্ন করলো, 'আমাকে কেনো ডাকলেন না টিকলি?'

টায়রা দাঁড়িয়ে ছিলো টিকলির পেছনে। আর্দ্র এসে টিকলিকে নামিয়ে নিয়ে গেলো কিন্তু তার দিকে এক পলক অবহেলায় তাকিয়ে চলে গেলো। টায়রাও যে পানি ভয় পায়!

সবার ব্যাগ নামিয়ে আদর ভাবনায় বিভোর টায়রাকে বলল, 'দাড়িয়ে আছো কেনো টায়রা? এসো নেমে এসো।' আদর হাত বাড়িয়ে দিলো। টায়রা হালকা করে হেসে আদরের হাত ধরে নেমে এলো।

সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো! এই এলোমেলো ঘটনাগুলোর উৎপত্তি কোথা থেকে তার হদিস পেলো না টিকলির অজ্ঞাত অবুঝ মন। আচ্ছা, এই বিশৃঙ্খল অভিমান গুলোর কারন কি এবং সূচনা কোথায়?

রৌদ্রেরঝাঁজে পুরে যাচ্ছে শরীর। চোখ মুখ কুচকিয়ে তাকিয়ে দেখতে হচ্ছে চারিপাশ। রোদ থেকে বাঁচতে কপালের উপর এক হাত রেখে টিকলি প্রশ্ন ছুড়লো, 'এখন কোথায় যাবো?'

আদর কোনো উত্তর দিলো না। ভাইয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আর্দ্র ভাবুক গলায় বলল,

'এখন..? এখন.... হ্যাঁ, এখন আমরা নামা বাজার যাবো। এটা এই নিঝুম দ্বীপের মূল বাজার বা মেইন পয়েন্ট বলা যায়। সেখান থেকে আমরা একটা হোটেলে উঠবো থাকা-খাওয়ার জন্য।'

'আমরা নিঝুম দ্বীপ ঘুরবো না এখন?'

আর্দ্র হাতঘড়ি টা দেখে নিয়ে কপালের উপর আবার হাত রাখলো। কানের চিপ দিয়ে ঘাম বেয়ে বেয়ে পরলো। হলুদ ফর্সা মুখখানা রোদশ্রীতে হয়ে আছে লাল। আর্দ্র ক্লান্ত গলায় বলল,

'সেই কাল বিকাল সাড়ে তিনটা থেকে জার্নি করছি। এখন অলমোস্ট দুপুর হয়ে গেছে। এখন যদি এই ঠাডা পরা রোদে নিঝুম দ্বীপ ঘুরতে যাও তাহলে একটুও মজা পাবা না। তার চেয়ে চলো নামা বাজার গিয়ে একটা ভালো হোটেলে উঠে খাওয়া-দাওয়া করে রেস্ট টেস্ট নিয়ে তারপর বিকালে ঘুরবো।'

আদর ধমকে উঠলো এই মুহুর্তে, 'এই, তোর সমস্যা কি? এতো নাক গলাচ্ছিস কেনো? ওদের ঘুরতে ইচ্ছে করলে ওরা ঘুরবে। তারপর যখন ইচ্ছা হবে তখন হোটেল বা রিসোর্ট ভাড়া করে থাকবে। আমাদের এখন যাওয়ার দরকার আমরা চলে যাবো ওদের টানছিস কেনো? ওদেরটা ওরা বুঝে নিবে। তোর ওতো বক্তব্য দিতে হবে না আর নিজের মতামতও পেষন করতে হবে না। যার যার টা সে সে বুঝে নিবে।'

ভাইয়ের বকুনিতে আর্দ্র একদম শান্ত হয়ে গেলো। টায়রা সূক্ষ্ম চোখে কিছুক্ষণ আদরের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ক্ষনকাল উদ্ধার করার চেষ্টা করলো আদরের এই অসময়ের কারণহীন রাগের। কিন্তু কোনো রহস্যই উন্মোচন করা গেলো না। তার ভোঁতা মস্তিষ্ক কারণটা ধরতে পারলো না। টিকলি কণ্ঠে রাগ মিশিয়ে বলল,

'আপনি এভাবে কথা বলছেন কেনো? আপনারা যদি এখন হোটেলে বা রিসোর্টে উঠেন তাহলে আমরাও উঠবো। পরে একসাথে নিঝুম দ্বীপ ঘুরা যাবে।'

আদর কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, 'কেনো? একসাথে কেনো? আমরা এখন হোটেল বা রিসোর্টে উঠলে আপনারাই বা এখন কেনো উঠবেন? আপনারা কি এসেছেন আমাদের ভরসায়? আমাদের সাথে যদি দেখা না হতো তখন কি করতেন? নিশ্চয়ই একা একা নিজের মরজিমাফিক ঘুরাফেরা করতেন? এখনও তাই করুন।'

কি আশ্চর্য! এই লোকটা হঠাৎ এতো কাট কাট গলায় কথা বলছে কেনো? লোকটা নিজ ইচ্ছায় আমাদের কত সাহায্য করলো! নিজে মোটরসাইকেল ভাড়া করে আমাদের নিয়ে আসলো। স্পিডবোট ভাড়া করলো। একসাথে আসলাম সবাই। লঞ্চে কত মজা করলাম। আর এখন দেখো! লোকটার ব্যাবহার দেখো না! সমস্যা কি এই লোকের? কি নিয়ে এতো রেগে আছে?
টিকলির মনে অজস্র ভাবনা। যে ভাবনার কোনো মাথা মুন্ডু কিচ্ছু নেই।

টিকলি আঙ্গুল তুলে কয়েকটা কড়া কথা শুনিয়ে দিতে উদ্ধৃত হলো৷ তখনি টায়রা অতি ঠান্ডা নরম ভদ্র এবং বিজ্ঞ সুরে বলল,

'দেখুন ভাইয়া, আমরা এতোটা পথ একসাথে এসেছি। বলতে গেলে এখন আমরা বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছি। ভাই-বোন অথবা বন্ধুর মতো। আর আমরা দুজন মেয়ে। কোথাও কাউকে চিনি না। অপরিচিত জায়গায় যদি এই অল্প পরিচিত আপনারা থাকেন তাহলে একটু সেফ ফিল হবে।'

আর্দ্র ঘাড়ে হাত রেখে বিড়বিড় করলো, 'ওহ মাই গড! এই মেয়ে এতো সুন্দর করেও কথা বলতে পারে? ভাইয়া এতো কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দেবার পরও এই মেয়ে এতো মিস্টি সুরে কথা বলছে? ভাইয়ার জায়গায় আমি হলে নিশ্চিত এখনি আমার গলা চেপে ধরে জবান বন্ধ করে দিতো।'

'এটা কোনো যুক্তিযুক্ত কারন হলো না টায়রা। আমরাও তো খারাপ হতে পারি।' আদর জবাব দিলো।

'কি যে বলেন ভাইয়া! আপনারা যদি খারাপই হতেন... যদি আমাদের ক্ষতি করাই আপনাদের মূল উদ্দেশ্য থাকতো তাহলে এর আগে অনেকবার অনেক সুযোগ আপনারা হাতছাড়া করে ফেলেছেন।'

'যেমন?' আর্দ্র এবার মুখ ফুটে প্রশ্ন করলো। আদর কড়া চোখে আর্দ্রর দিকে তাকালো। আর্দ্র মাথা নিচু করে আবারো কিসব বিড়বিড় করলো, 'বড় ভাই থাকার এই এক জ্বালা। কথায় কথায় শুধু চোখ রাঙানি।'

টায়রার আগে টিকলি বলে উঠলো, 'যেমন, প্রথম সুযোগ হলো লঞ্চে। একদম সুবর্ণময় সুযোগ। দ্বিতীয় সুযোগ হলো মোটরসাইকেলে। আপনারা ইচ্ছে করলে মোটরসাইকেলে করে আমাদের অন্য জায়গায়ও নিয়ে চলে যেতে পারতেন। মোটরসাইকেল ওয়ালাদের কিছু টাকা ঘুষ দিলেই হতো। তৃতীয় সুযোগ কমলার দিঘি। আপনারা ইচ্ছে করলে ওই জায়গায় আমাদের ক্ষতি করে ব্যাগপত্র টাকা পয়সা চুরি করে নিয়ে আমাদের একা ফেলে চলেও আসতে পারতেন। বিচ কিন্তু একদম জনমানবহীন নিরব ছিল। আর চতুর্থ.... '

আদর টিকলিকে থামিয়ে দিয়ে বলল, 'ব্যস ব্যাস থামুন, তার আগে বলুন আপনি আমাদের চোর বললেন?'

টিকলি চোখ দুটো বিস্ফোরিত করে ক্ষণকাল তাকিয়ে থাকলো ড্যাবড্যাব করে। আদর একটু বিব্রত বোধ করলো। আচ্ছা, মেয়েটা এভাবে তাকিয়ে আছে কেনো? আদর কি খুব ন্যাকামো বা অপ্রাসঙ্গিক কিংবা আজাইরা কথা বলে ফেলেছে নাকি?

টায়রা এবার নিচু কন্ঠে জোরালোভাবে বলল, 'না না না ভাইয়া। ও তা বলে নি। আপনারা আমাদের কি কি ক্ষতি করতে পারেন সেটার লিস্ট দিচ্ছিলো।'

আর্দ্র চোখ বড় বড় করে বলল, 'ভাইয়া দেখো, তোমাকে ইনডিরেক্টলি নানা ডাকলো।'

সাথে সাথে টায়রা দাঁত কটমট করে তাকালো। আর্দ্র দ্বিগুন চোখ রাঙিয়ে তাকালো। আদর নিজের ব্যাগটা কাধে নিতে নিতে বলল, 'এসো তোমরা সবাই।'

এই মুহুর্তে আদরের হেল্প নিতে একটুও ইচ্ছে করছে না টিকলির। যারা অহংকার করে তাদের টিকলি একদমই সহ্য করতে পারে না। আর আদরের মধ্যে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও সেই অহংকারের ছাপ পাওয়া গেছে। কিছুক্ষণের জন্য টিকলি আদরের উপর সেই মাস্ক পরা অসভ্য ছেলেটার ছায়া দেখেছে। নেহাৎ কোনো চেনাজানা নেই তাই ঠেলায় পরে যাচ্ছে না হলে কক্ষনো এই দাম্ভিক লোকের সাথে আর এক পাও বাড়াতো না।
এদিকে টিকলির চোখ টাও ব্যাথায় টনটন করছে। ভ্রু উপরের কাটা জায়গাটা থেকে ব্যথা ছড়িয়ে পরেছে সারা চোখময়। চোখের সেই তীব্র ব্যথা আস্তে আস্তে ঘায়েল করছে মাথাও। মাথার সাথে চোখের এই এক অবাক করা গোপন বন্ডিং। বাম চোখ দিয়ে টিকলি সব ঘোলা দেখছিলো। এমতাবস্থায় এই ভারী ট্রলি ব্যাগটা টেনে নিয়ে যাওয়া ভিষণ মুসকিল হয়ে দাড়িয়েছে।

আদর খেয়াল করলো সবটা। আস্তে করে টিকলির হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে সে টিকলিকে এড়িয়ে যাওয়া গলায় বলল, 'কোথাও ট্রাভেল করতে গেলে যতোটা সম্ভব ছোট ব্যাগ নেওয়া উচিত। আর সেখানে এই ট্রলি ব্যাগ তো রীতিমতো বিলাসিতা। '

টিকলি নাক ফুলিয়ে তাকালো। লোকটা কথায় কথায় অপমান করে যার জন্য তার উপকার গুলো চোখের আড়ালে পরে যায়। কিন্তু কথাগুলোও সব সত্যি বলে। সত্যি তো এতো বড় বোঝা কেনো নিয়ে এসেছে টিকলি? ছোট একটা ব্যাগ আনলেই তো পারতো। টিকলি আরেকবার ভালোভাবে আদরের দিকে তাকালো।
আদর হেটে যাচ্ছে বড় বড় কদম ফেলে স্ট্রেট সামনের দিকে তাকিয়ে ব্যাগ টানতে টানতে। ট্রলি ব্যাগের চাকার সাথে মাটির ঘর্ষণে ভু ভু শব্দ হচ্ছে। লোকটার পা ফেলে হাটার ধরনটাও কি সুন্দর! বলতে নেই, এই লোকটার উপর টিকলি রাগ করে থাকতে পারে না। লোকটার উপর তার জেদ তেজ আসে না। লোকটার অশেষ পারসোনালিটির উপর টিকলি মুগ্ধমগ্ন হয়ে যায় বারংবার।

চলবে।

sandipchandradas, Sm samim, Alom khan, Salman reja, Foisal Hossain, Hossain molla, Tanvir rahman and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jun 09, 2021 3:28 pm
মুমুর্ষিরা শাহরীন

১৩.
রিমঝিম আবহাওয়া। নিঝুম দ্বীপের নামা বাজার এসে ওরা উঠলো নিঝুম রিসোর্টে। রিসোর্টের দেয়ালে পোস্টার টানিয়ে স্পষ্টঅক্ষরে লেখা,

নিঝুম রিসোর্ট
পরিচালনায়
অবকাশ পর্যটন লিঃ ও সাফারী প্লাস
নামা বাজার, নিঝুম দ্বীপ, হাতিয়া, নোয়াখালী
মোবাইলঃ ০১৮৬৬৯৮৯৮৫৮, ০১৮৬৬৯৮৯৮৫৫ ( নাম্বার দুটি কালেক্ট করা অনলাইনের নিঝুম দ্বীপ সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা থেকে)

অবকাশ পর্যটনের নিঝুম রিসোর্টের দুই বেডের রুম ভাড়া দুই হাজার টাকা। অফ সিজন অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল - ৩০ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে এলে ৫০% ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। আদর দুটো রুম ভাড়া করলো। ডিসকাউন্ট দিয়ে দুটো রুম ভাড়া একত্রে পরলো দুই হাজার টাকা। রুম ভাড়া করার সময় আদর টিকলিকে ইশারায় দেখিয়ে দিয়ে লোকটাকে বলল,

'ওই যে উনাকে দেখছেন, উনার কাছ থেকে এডভান্স টাকাটা নিয়ে রাখেন।'

রিসেপশনিস্ট টিকলির কাছে গেলো। টিকলি টাকা দিয়ে লোককে আলবিদা জানিয়ে আদরের দিকে তাকিয়ে কোমড়ে হাত রেখে বলল, 'এটা কি হলো?'

আদর চুলে হাত চালাতে চালাতে জবাব দেয়, 'কোনটা?'

'এই যে এটা। মানে টাকাটা তো আপনি দিতে পারতেন। পরে আমার কাছ থেকে নিয়ে নিতেন।'

টিকলিকে এড়িয়ে যেতে যেতে আদর বলল, 'পরে দিলেও দিতে হতো আর এখনো দিতেই হচ্ছে। বাকির নাম ফাঁকি কথাটা মনে রাখবেন। আর মোটরসাইকেল ভাড়া পুরোটা আমি বহন করেছি। সো থাকা-খাওয়ার ভাড়া আপনার। '

টিকলি আদরের পেছন পেছন যেতে যেতে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল, 'মোটরসাইকেল ভাড়া আপনার কত পরেছে শুনি? আমার তো রুম ভাড়া করতেই দু'হাজার চলে গেলো। খাওয়া দাওয়ার খরচ তো আছেই। বলতে গেলে মোট তিন-চার হাজার টাকা খরচ হবে আমার।'

আদর হাটা থামিয়ে পেছন ঘুরে ঠোঁট গোল করে বলল, 'তো? আমারো ভাড়া গিয়েছে অলমোস্ট তিন হাজার টাকার মতো। আমি কি এই ব্যাপারে একটা টু শব্দ করেছি? তবে আপনি ফকিন্নির মতো আচরণ করছেন কেনো?'

নিজের দিকে আঙ্গুল তুলে টিকলি মুখটাকে হা করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। এরপর বিস্ময়কর কণ্ঠে বলল, 'আ আ আমি ফকিন্নি? আর আপনার মোটরসাইকেল ভাড়া তিনহাজার টাকা গিয়েছে? ফাইজলামি? '

আদর আবারো হাটা শুরু করে তাচ্ছিল্য করে বলল,

'আমি আপনার মতোন অভাবগ্রস্থ নই যে মিথ্যা কথা বলবো। আর একটা মোটরসাইকেলে দুজনের ভাড়া হলো ৩০০-৩৫০ টাকা। তো আমরা দুটো মোটরসাইকেল নিয়েছিলাম। এবং নিজ দায়িত্বে চালিয়ে এসেছি। এর জন্য ড্রাইভাররা এক্সট্রা টাকা নিয়েছে। দুটো মোটরসাইকেল মিলিয়ে ওরা দুই হাজার টাকা নিয়েছে। আর কমলার দিঘি দেখতে গেলে ৩০০-৩৫০ টাকা এক্সট্রা গুনতে হয়। তো এখানেও এক্সট্রা ৭০০-৮০০ টাকা দিতে হয়েছে। তারপর আপনাকে আমি মিরিন্ডা কিনে দিয়েছিলাম। কমলার দিঘি গিয়ে বাদাম, ঝাল মুড়ি খেয়েছেন দুই বোন। সব মিলিয়ে তিন হাজার টাকা খরচ হলো না?'

টিকলি আদরের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আরে ভাই আপনি আমাকে মিসকিন বললেন এদিকে তো আপনি সবচেয়ে বড় মিসকিন, অভাবগ্রস্থ, ফকির, অতিদরিদ্র, হতদরিদ্র একজন মানুষ। যে কিনা সামান্য একটা ত্রিশ টাকার মিরিন্ডা, বিশ টাকার বাদাম আর চল্লিশ টাকার ঝালমুড়িও হিসাব করে। আপনি নাকি আবার ডাক্তার?'

টিকলি বলল হাতের দু আঙ্গুলে ছোট করে পরিমাপ দেখিয়ে। আদর বলল, 'যে যেমন তার সাথে তেমনই করা উচিত। '

,

এই রিসোর্টগুলো যে একদম আহামরি সুন্দর টাইপ তেমন না। একদম বিরাট জাকজমকপূর্ণ লাক্সারি রিসোর্ট তা না। রিসোর্ট মানেই বুঝা যায় অনেক এক্সপেন্সিভ, আড়ম্বরপূর্ণ কিন্তু এখানে তার বালাই নেই। নামেই রিসোর্ট। খুব স্বাভাবিক একটা আবাসিক হোটেলের মতো। দেয়ালে পেস্ট রং করা, স্টেনওয়ালা কমদামি খাট, ফুল তোলা লাল কমলা বিছানার চাদর, এটাচ বাথরুমের কালো রঙের দেয়াল। সমস্যা হলো, এখানে দিনে বিদ্যুৎ থাকে না। ১-২ ঘণ্টা পরপর ৩০ মিনিটের মতো বিদ্যুৎ আসে।

আর্দ্র টায়রা ঘরগুলো দেখতে চলে এসেছিলো আগেই। টায়রা পুরো ঘরটা দেখে নাক উঁচুতে তুলল। বিড়বিড় করে বলল, 'নামেই রিসোর্ট।'

,

ওদের রুম দুটো পাশাপাশি। আর্দ্র খানিক চিন্তা করলো কোন ঘরে ঢুকবে। এরপর সে এই সিদ্ধান্তে আসলো যে বাম পাশের রুমটায় যাবে। আর্দ্র যখন বাম পাশের রুমে ঢুকতে গেলো দূর্ভাগ্যবশত টায়রাও সেই রুমে ঢুকতে গেলো। দুজন দুজনের সাথে হালকা ধাক্কা খেয়ে থেমে গেলো। এরপর টায়রা গেলো ডান পাশের ঘরে আর্দ্রও যেতে নিলো। এরপর দুজনেই আবার বাম পাশের রুমে ঢুকতে গেলো। পরিশেষে আর্দ্র বিরক্ত হয়ে বলল,

'আরে দাড়ান তো। হয় নিজে যান নাহয় আমাকে যেতে দিন।'

টায়রা হাত ভাঁজ করে দাড়িয়ে বলল, 'আপনার যাওয়ার দরকার আপনি যান। আমি পরে যাবো।'

'সবসময় শুধু ঘাইড়ামি।' বলেই আর্দ্র ডান পাশের ঘরে ঢুকে পরলো। বাইরে থেকে টায়রা গলা উঁচিয়ে বলল,

'দোয়া করি, আপনার কপালে একটা মহা ঘাইড়া জুটুক। যাতে আপনার জীবনটা ত্যানা ত্যানা করে দেয়। আমিন।'

'দূর হন এক্ষুনি।' ভেতর থেকে চেঁচিয়ে জবাব দিলো আর্দ্র।

,

খাওয়ার পর্ব শেষ করে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিতেই ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো দুই বোন। যার কারণে তাদের আজ আর কোথাও ঘুরতে যাওয়া হলো না। প্রায় যখন সন্ধ্যা তখন অন্ধকার হয়ে আসা ঘরটাতে মশার কামড় খেয়ে জেগে উঠলো টিকলি। কারেন্ট নেই। বাইরের দিনের আলো হালকা হয়ে আসছে দেখেই টিকলি একটা হতাশ নিঃশ্বাস ফেলল। টায়রাকে দু-একবার ডাক দিলো। টায়রা বিরক্তির ঘুম ঘুম কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলো,

'কি হইছে বা*?'

টিকলি রাগীস্বরে বলল, 'এক চটকানা খাবি। এতো খারাপ হইতাছিস কেনো দিন দিন?'

মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে আধো আধো চোখ মেলে টায়রা বলল, 'এই কথা বলার জন্য আমার এতো সুন্দর ঘুমটা ভাঙাইলি? '

'নাহ, বাইরে দেখ। তোর ঘুমের জন্য বারোটা বেজে গেছে।'

টায়রা নিজের স্মার্টফোনটা হাতড়িয়ে বালিশের আশেপাশে খুঁজলো। ফোন খুলতেই দেখা গেলো সাড়ে ছয়টা বাজে আর কয়েক মিনিট পর মাগরিবের আজান দিবে। টায়রা লাফিয়ে বিছানায় উঠে বসলো। মুখে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, 'ও মাই গড। এতো ঘুমিয়েছি?' এরপর টিকলির দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

'আমার ঘুমের জন্য বারোটা বাজছে তাই না? আর তুই কি করতাছিলি?'

'আমি তো তোর দেখাদেখি ঘুমাচ্ছিলাম।'

'সর তো আবাল। চোখের সামনে থেকে সর। তোর জন্য আজকে ঘুরতে যাওয়া হলো না। আবার কাল সকাল অবধি ওয়েট করতে হবে।'

'যত দোষ নন্দ ঘোষ।'

টায়রা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে আস্তে আস্তে বলল, 'ওরা তো একবার ডাকতে পারতো। আর আদর ভাইয়ার কাছে তো তোর নাম্বারও আছে।'

টায়রার আস্তে বাচ্য গুলো কর্ণপাত হলো টিকলির। শুধু কর্ণধার ই হয়নি একদম বুকের গভীরে ঢুকে গিয়ে তারা বিক্ষুব্ধ যুদ্ধ ঘোষণা করছে। আর এই বিক্ষিপ্ত যুদ্ধের কারন হলো টিকলির অবচেতন মন। যেই মনকে টিকলি নিজে বুঝে উঠতে পারছে না। যেই মন অভিমান করে বলছে, 'সত্যি তো, আদর সাহেব কেনো একটা ফোন দিলেন না? তার কাছে তো আমার নাম্বার ছিলো।'

,

বিকেলবেলা আদর আর্দ্র ও রেস্ট নিতে নিতে ঘন্টাখানেকের জন্য ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। ঘুম থেকে উঠে দেখে বিকাল পাঁচটা বাজে। এই সময়ে ফ্রেস হয়ে রেডি হয়ে ঘুরতে যেতে যেতেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তাই আর যাওয়া হয়নি। আদরও টিকলি টায়রাকে ডাক দেয়নি। শুধু ওরা দুই ভাই মিলে বিকাল দিকে নামা বাজারটা ঘুরে ঘুরে দেখেছে।

রাত তখন বাজে আটটা। এখানে সন্ধ্যার পর থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এছাড়া সারারাত লাইট ইউজ করা যায় সোলার প্যানেল থেকে। আদর রিসোর্টের পেছনে অল্প খালি জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে ছিলো। মোবাইল হাতে নিয়ে গেলো কন্ট্রাক্টস লিস্টে। উদ্দেশ্যে ওর এসিস্ট্যান্ট তমালকে ফোন দেওয়া। 'T' দিয়ে সার্চ দিতেই সবার সামনে ভেসে উঠলো টিকটিকি নামে সেভ করা একটি নাম্বার। আদর কয়েক সেকেন্ড গভীর মনোযোগে নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থেকে পরমুহূর্তে কল লাগালো তমালকে। তমালের সাথে কিছু জরুরি কথাবার্তা শেষ করে ফোন রাখতেই আবারো চোখ গেলো টিকটিকি নামের সেই নাম্বারটিতে। আদর ডায়াল করলো পরমুহূর্তে আবার কেটেও দিলো। ফোনটা পকেটে রাখতে গিয়েও পকেট থেকে আবার বের করে টিকলির নাম্বারটা ফোন থেকে ডিলিট করে দিলো।

মিনিট পাঁচেক পূর্ণিমাচন্দ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে আদর চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। ঘুরতেই দেখা হলো টিকলির সাথে। অনাকাঙ্ক্ষিত বশত টিকলিও হকচকিয়ে গেলো। আদর প্রশ্ন করলো আগে, 'আপনি?'

'হুম। ভেতরে নেট পাচ্ছিলো না তাই আর কি..'

'কি সিম ইউজ করেন?'

'বাংলালিংক।'

'ওহ সম্ভবত এখানে শুধু গ্রামীণফোন আর রবির নেট পায়। নট সিউর। '

'ওহ আচ্ছা।' টিকলি মন খারাপ করে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো সাথে সাথে পেছন থেকে ডেকে উঠলো গম্ভীর ব্যক্তিটি। টিকলি হালকা ভ্রু কুচকে তাকিয়ে নরম সুরে বলল,

'জি বলুন।'

ব্যস, সেখানেই থমকে গেলো সে। টিকলি যখন এতো সুন্দর করে কথা বলে আদরের তখন সব অভিমান দুমড়ে মুচড়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ করেই আবার যখন আদরকে এভোয়েড বা রিজেক্ট করে তখন আবার মস্তিষ্কে রক্ত উঠে যায়। কেনো এমন হয়? যেমন, এখন আদরের মনে হচ্ছে একটু আগে সে একটা ভুল করে ফেলেছে। নাম্বারটা ডিলিট করে সে ঠিক করেনি। আবার হয়তো কিছুক্ষণ পর টিকলির কোনো ব্যবহার তার ভালো না লাগলে সে আবার ভাববে, ডিলিট করেছে বেশ করেছে।

আদর গলা খাকারি দিয়ে প্রশ্ন করে, ' চোখের ব্যাথা কমেছে?'

টিকলির কুঞ্চিত ভ্রুযুগল সোজা হয়ে তাকালো। নরম হয়ে গেলো চোখের চাহনি। শীতল বৃষ্টি বৃষ্টি গন্ধ বাতাসে শরীর তপ্ত হয়ে যায়। স্রোতস্বিনীতে ভেসে যায় মন। ভিজে যায় হৃদয়পাটাতন। কিন্তু এই স্রোতস্বিনীতে ভাসতে ভাসতেই হঠাৎ স্রোতশূন্য হয়ে পরে সে। তখন নিজেকে বড্ড নিষ্প্রয়োজন বলে মনে হয়। অভিমান জমে যায় বুকের গহীনে। হিম শীতল হাওয়া ক্রমেই উষ্ণ গরমে পরিণত হয়। ভালো লাগে না তখন টিকলির। আদরের তার প্রতি উদাসীনতা এবং ছন্নছাড়া ভাব তার একদম ভালো লাগেনা। এই যে এখন কি সুন্দর ভাবে খোঁজ নিচ্ছে কিন্তু একটুপর ঠিক আবার টিকলিকে ইগনোর করবে যেমনটা করে আসছে সেই কমলার দিঘি থেকে। টিকলি বুঝে পায়না একটা মানুষের দুটো রূপ কি করে থাকতে পারে? এই কেয়ারিং তো এই ইগনোরিং।

টিকলি কানের পাশে চুলগুলো গুঁজে দিয়ে হালকা গলায় বলল, 'জি কমেছে।'

আদর টিকলির থেকে চোখ সরিয়ে আবারো আকাশের পানে তাকালো। বলল, 'ওহ। মলমটা ঠিকমতো লাগালে আস্তে আস্তে দাগও মিশে যাবে।'

টিকলি মাথা নাড়িয়ে 'হুম' বলল। এরপর কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলো, 'আকাশে কি দেখেন?'

আদর টিকলির দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণঠাসায় হাসি টেনে বলল, 'তাঁরা দেখি।'

'তাঁরা? প্রতিদিন দেখেন?'

'হুম। জানেন, আমি না শুকতারা জমিয়েছি।'

'যাহ, শুকতারা আবার জমানো যায় নাকি?'

আদর হাসে। বলে, 'যায় তো। এই যে আমার এই বুকের ডানপাশে শুকতারা রেখেছি।'

'কেনো রেখেছেন?'

'যাতে অসময়ে হঠাৎ করে কাঙ্ক্ষিত মানুষটা এলে আর কিছু না দিতে পারলেও এই শুকতারা যেনো দিতে পারি।'

'কাঙ্ক্ষিত মানুষ?' টিকলি অবাক গলায় প্রশ্ন করে।

'হুম, কাঙ্ক্ষিত মানুষ। এমন মানুষ যে আমার শুকতারা কিনতে চাইবে।'

'কিনতে চাইবে? শুকতারা বেঁচা-কেনাও যায় বুঝি?'

'নাহ, শুধু জমানো যায় আর কেনা যায়। বেঁচা যায় না।'

'তাই? আচ্ছা, কেনো কিনতে চাইবে?'

টিকলির বাচ্চামো প্রশ্ন শুনে আদর মুচকি হেসে উত্তর দিলো, 'কারণ সে যে কাঙ্ক্ষিত মানুষ তাই।'

আদর আবার বলল আত্মমগ্ন গলায়, 'শুকতারা যত্ন করে নিজের বুকের ডানপাশ টায় রাখার জন্য আমার বুকের ডানপাশ থেকে কেড়ে নিবে। কারণ সে ভাববে শুকতারা আমার কাছে ভালো নেই। একাকিত্ব বোধ করছে। তার একটা সঙ্গী দরকার। আর সেই সঙ্গিনী হবে সে।'

'কেনো সঙ্গ দিবে?'

"কারন সে যে হবে এক বিরলতম রঙিন প্রজাপতি। যার পাখায় থাকবে শুকতারার রং। ভালোবাসার রংমহলের ওয়াচ টাওয়ার। যার কাছে গেলেই আমি দেখতে পারবো আমার পুরো ভালোবাসাময় শুকতারার বাগান। শুকতারা জ্বলজ্বল করতে করতে জানান দিবে সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটির নাম।"

চলবে

Sm samim, Alom khan, Salman reja, Foisal Hossain, Hossain molla, Tanvir rahman, Rafi ahmed and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jun 09, 2021 3:29 pm
মুমুর্ষিরা শাহরীন

১৪.
নিঝুম দ্বীপ, বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় অন্তর্গত বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে উঠা ছোট্ট একটি ভূ-খণ্ড। ২০০৯ সালের ৮ ই এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার পুরো দ্বীপটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। সৌন্দর্যের অপার শোভনীয় এই নিঝুম দ্বীপ একদম শান্ত-শিষ্ট নিরিবিলি প্রাকৃতিক লীলাময় ভূমি। প্রায় ১৪,০৫০ একর আয়তনের এই দ্বীপটির বিভিন্ন সময় হরেক রকমের নাম ছিলো। কখনো ইছামতীর দ্বীপ তো কখনো বাইল্যার ডেইল বা বালুয়ার চর অথবা চর ওসমান। সবশেষে দ্বীপটি একদম নিরব-নিস্তব্ধ হওয়ায় এর নাম হয় নিঝুম দ্বীপ।

নিঝুম দ্বীপের একটি খ্যাত স্থান হলো চোয়াখালী বন। এছাড়াও রয়েছে চোয়াখালী বীচ, নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান, কমলার চর, উপর বাজার সি বীচ, নামা বাজার সি বীচ, চৌধুরী খাল, কবিরাজের চর, কুমারী সি বীচ, চর কুকরি-মুকরি ইত্যাদি।
বেলা সাতটায় ওরা চারজন এসে পৌছালো চোয়াখালী বন। উদ্দেশ্য বনে হরিণ দেখা। সিএনজি এর পেছনে বসে ছিলো টিকলি এবং টায়রা। সামনে ড্রাইভারের সাথে বসে এসেছে আদর এবং আর্দ্র। বেলা সাতটায় রোদ উঠেছে চনমনা। সিএনজি থেকে নেমে কিছুটা পথ হাটতেই চোখে ধরা পরলো চোয়াখালী বন। চোয়াখালী বোনের সামনে এসে টায়রা ঠোঁট উল্টে আদরকে প্রশ্ন করলো,

'এতো সকালে এতো তোড়জোড় করে নিয়ে আসলেন ভাইয়া কিন্তু এখানে তো কোনো হরিণের চিহ্নও নেই।'

সিএনজি ড্রাইভার তখন বলে উঠলেন, 'হরিণ দেখতে বনের ভেতরে যাইতে হইবো আফা।'

টায়রা চোখ বড় বড় করে বলে, 'বনের ভেতরে?'

'জি।'

'ওহ আল্লাহ, যদি বাঘ বের হয়?'

আর্দ্র চোখ মুখ কুচকে বলল, 'বলদ নাকি? নিঝুম দ্বীপে হরিণ, মহিষ, গরু, শেয়াল, পোকামাকড় আর সাপ টাপ ছাড়া অন্য কোনো হিংস্র প্রাণী নেই। বলা যায়, সুন্দরবনের পরে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। সারা বন গাছ-গাছালিতে ভরপুর।'

আদর পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সবসময়ের মতো কুঞ্চিত ভ্রুতে তাকিয়ে বলল, 'হুম। এই সম্পূর্ণ বনটিতে একসময় বনবিভাগ বিশ বছর মেয়াদি দুই কোটি তেতাল্লিশ লাখ গাছ রোপণ করে। এখানে প্রায় তেতাল্লিশ প্রজাতির গাছ আছে। তবে কেওড়া গাছের সংখ্যাই বেশি।'

'সব বাদ, আগে আপনি বলুন। আপনি আমাকে বলদ ডাকলেন?' কোমড়ে হাত রেখে তীক্ষ্ণ চোখে টায়রা আর্দ্রর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো।

আর্দ্র বিরক্তি ভঙ্গিতে মুখ দিয়ে চু শব্দ করে বলল, 'ভাইয়া আজকে সারাদিন এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো?'

'না চল।'

এই পুরো সময়টাতে টিকলি ছিলো একদম নিঝুম দ্বীপের মতোই শান্ত। নিঝুম দ্বীপের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরার জন্য আলাদা গাইডের প্রয়োজন নেই। সিএনজি বা মোটরসাইকেল ড্রাইভার রাই সব দেখিয়ে আনবে। এতে তারা পাঁচ-ছয়শ এক্সট্রা টাকা নিবে।
সিএনজি ড্রাইভার গেলো সবার আগে তারপর গেলো আর্দ্র। বনের মাঝে চিকন রাস্তা হওয়ায় এবং অগণিত শ্বাস মূল থাকায় এখানে দলগত ভাবে হেটে যাওয়া সম্ভব নয়। আর্দ্রর পেছন পেছন টায়রা পা বাড়ালো। টিকলি যাওয়ার পর আদর গেলো সবার পেছনে।

দেখা গেলো, বনের শুরুতেই রয়েছে প্রচুর শ্বাসমূল। টিকলি কোনো কারণে একটু অন্যমনস্ক ছিলো যার কারনে একটা শ্বাসমূলের উপর পা মাড়িয়ে যেতেই সে উল্টে পরে যেতে নিলো। আদর তৎক্ষণাৎ টিকলিকে ধরে রাগী গলায় বলল,

'এই আপনি সবসময় এতো কি চিন্তা করেন হ্যাঁ? যেখানে সেখানে ধুপুসধাপুস করে পড়ে যাওয়া কি আপনার কোনো রোগ?'

টিকলির ভারি রাগ হলো আদরের এহেন আচরণে। একটা টু শব্দ না করে সে সাবধানে পা ফেলে বনের ভেতর চলে গেলো।

সকাল থেকেই টিকলির প্রতি প্রচন্ড রাগ হয়ে আছে আদরের। আদর বলেছিলো পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে থাকতে তারা সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই বেরোবে। কেনোনা যত ভোর বেলায় আসা যাবে এই বনে তত কাছ থেকে হরিণের দেখা পাওয়া যাবে। কিন্তু তারা ঘুম থেকেই উঠেছে ছয়টায়। এই বেলায় হরিণ দেখা যাবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি হরিণ দেখা না যায় তাহলে এই চোয়াখালী বনে আসাটাই বৃথা। তাই সিএনজি তে উঠার সময় আদর কিছু কটু কথা শুনিয়ে ফেলেছিলো টিকলিকে। টিকলির যাওয়ার পানে তাকিয়ে আদর এবার একটু জোরে জোরেই বলল,

'এতো রাগ কেনো? একে তো নিজে ভুল করেছে তারউপর আবার আমার সাথেই রাগ দেখানো হচ্ছে?'

,

এই বনে যেতে হবে একদম নিরবচ্ছিন্ন নিরবতা পালন করে। একটু কোলাহল করলেই এখানে হরিণের দেখা পাওয়া মুশকিল। আদররাও সবাই এগোচ্ছিলো পিনপিন নিরবতা বজায় রেখে। বনের যত গভীরে যাওয়া যাচ্ছে এর সৌন্দর্য তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বলতে গেলে নিঝুম দ্বীপের প্রকৃতি কোনো অংশে সুন্দরবনের চেয়ে আলাদা নয়। প্রায় সত্তর দশকের দিকে বনবিভাগ থেকে পরীক্ষা মূলক ভাবে এই বনে চার জোড়া হরিণ ছাড়া হয়েছিলো। ১৯৯৬ সালে হরিণশুমারী মতে এখন বনের হরিণ সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। কিন্তু বনের ভেতর প্রায় এক ঘন্টা ঘুরঘুর করেও কোনো হরিণের দেখা না পেয়ে ওরা সবাই হতাশ। সিএনজি ড্রাইভারটির কাছ থেকে জানা গেলো,

'ক্রমাগত বন উজাড়ের ফলে এবং গাছ কাটার ফলে এখানে হরিণের সংখ্যা কমে গেছে। এছাড়াও সরকারের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ সংস্কারের অভাবে এবং হরিণ শিকারের ফলে বনে হরিণের দেখা পাওয়া দুষ্কর। তবুও দেখা পাওয়া যেতো যদি আপনারা খুব ভোরে আসতেন। ভোরের আলো ফুটছে ফুটছে এমন সময় এলে বনের সামনের দিকটাতেই হরিণের দেখা পেতেন।'

আদর দাঁত কিড়িমিড়ি করে টিকলির দিকে তাকিয়ে বলল, 'শুনেছেন নাকি এখনো রাগ দেখাবেন? দেখান না দেখান এবার ড্রাইভারের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে হনহন করে চলে যান। পারেন তো এই একটা কাজ ই।'

টিকলি তবুও আদরের সাথে কথা বলল না। গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো এক কোণায়। ওর যখন কারো কথা ভালো লাগে না তখন ও খুব বেশি চুপচাপ থাকে। আর সেই থমথমে মুখটাই জানান দেয়, 'আমার মন খারাপ। আমার সাথে কথা বলতে এসো না।'

আদর কিছুক্ষণ ক্রোধ নিয়ে কিন্তু আচ্ছন্নতা ভরপুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো টিকলির দিকে। আস্তে আস্তে রাগ শীতল হয়ে এলো। গরম চাহনি নরম হয়ে প্রকাশ পেলো চোখের পাপড়িতে। শ্যামল মুখশ্রী এই রোদ্রের সকালে ভ্যাপসা গরমে হয়ে উঠেছে ক্লান্ত। আরো আধ ঘণ্টা বনের ভেতর ঘুরঘুর করার পর যখন শ্বাসমূল, অসংখ্য গাছ-গাছালি, মেঠোপথে ছিপছিপে কর্দমাক্ত ভূমি এবং পাতার ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে অনুমতি না নিয়ে ঠিকরে চলে আসা সূর্যের আলো ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেলো না তখন শরীর ছেড়ে দিয়ে একটা উপুর হয়ে হেলে পড়ে যাওয়া গাছের উপর বসে নিস্তেজ গলায় টায়রা বলল,

'আমি আর হাটতে পারবো না। আল্লাহ! কতটা পথ হেটে এসেছি। অলমোস্ট এক থেকে দেড় ঘন্টা। এই আবার এতোটা সময় হেটে যেতে আমি আর পারবো না।'

টায়রা হাপানো গলায় বলল। টিকলি ছিলো ভীষণ শান্ত। মন খারাপের কোনো প্রতিচ্ছবির রেশ তার মুখে নেই। তার মুখমন্ডল ভীষণ শক্ত এবং দৃঢ় অনুভূতিশূন্য শরীর নিয়ে সে পুতুলের মতো হেটে চলেছে অবিরাম, অন্তহীন। নেই কোনো ক্লান্তি, শ্লেষ এবং হয়রান। খুব ঠান্ডা মেজাজ। বলেছিলাম, টিকলি ঠান্ডা মেজাজের রাগী। এই যেমন সে একদম সাপের ন্যায় ঠান্ডা হয়ে আছে একদম চুপচাপ। তেমনি কারোর সাথে এখনো একটা কথা পর্যন্ত বলেনি।

টিকলি রোবটের মতো সাইড ব্যাগ থেকে একটা পানির বোতল বের করে টায়রার হাতে দিলো। টায়রা পানি নিয়ে ঢকঢক করে খেতে খেতে টিকলির দিকে আড়চোখে তাকালো। টায়রা ধরতে পেরেছে হয় টিকলির মন খারাপ নয়তো সে ভয়ানক ভাবে রেগে আছে। অন্যদের মতো রাগ হলে গিজগিজ করা তার স্বভাব নয় টায়রা খুব ভালো করে জানে সাথে এও জানে এখন টিকলিকে প্রশ্ন করলে কোনো উত্তর পাওয়া যাবে না। টায়রা আর কথা বাড়ালো না। কিছুক্ষণ বসে রইল গাছের উপর বনের ঠান্ডা বুনোফুলের গন্ধে মিশে থাকা বাতাসের পাতলা আবরণের সাথে।

,

আদর বার কয়েক গভীর চক্ষুদ্বয় মেলে দেখেছে শান্ত সেই রমণীকে। রমণীর হঠাৎ নিরব হয়ে যাওয়ার কারণ উদঘাটন করতে কিছুক্ষণ চিন্তিত ছিলো সে। কাল রাতেও এই শান্ত মেজাজের রমণীর সাথে তার খুব সুন্দর ভাবে কথা বলা হয়েছে৷ কিন্তু সকাল হতে না হতেই আদর কি একটা বলল না বললো এরপর থেকেই মহারানী মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছেন। কাহিনি কি?

রাতের কথা মনে করতেই মনে পরলো এক গুরুত্বপূর্ণ কথা। কাল রাতে, আদর চেতন থেকেও অবচেতন ভাবে মনের খুব গভীর কুঠিরে থাকা এক কুঠিয়ালের গোপন গল্প ফাঁস করে দিয়েছে। কুঠিয়ালের কিছু না থাকলেও তার কাছে ছিলো অধিক মূল্যবান কিছু। তার কাছে ছিলো, প্রতিদিনের সন্ধ্যায় জমিয়ে রাখা পশ্চিমাকাশের শুকতারা। যেই শুকতারার কথা সেই কুঠিয়ালের আপন মন ছাড়া আর কেউ জানতো না। সেই শুকতারা নিয়ে দেখা শত শত স্বপ্নের কথা বলে ফেলেছে এই মহারানীকে। মহারানীর রাজ্যে নিতান্তই কুঠিয়াল একজন সামান্য প্রজা। এই সামান্য প্রজাকে কি মহারানী পাত্তা দিয়েছে? নাকি প্রজার সকল দুঃখ-কষ্ট শুনে সে ব্যঙ্গাত্মক করছে? কিন্তু মহারানীর তো এমন আচরণ শোভা পায় না। সে তো আর রাক্ষসী মহারানী না। কুঠিয়াল জানে এই মহারানী কোমলপ্রাণ নীতিবাদী এক নারী। তবে কেনো প্রজার উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো? প্রজার সকল দুঃখ-কষ্ট শুনে কি মহারানীর তাকে পাগল মনে হয়েছে বা অহেতুক পাগলের প্রলাপ মনে হয়েছে? যার কারনে মহারানীর এই তুচ্ছ ব্যবহার।

ইশশ...কুঠিয়ালটা না বড্ড অবুঝ! তার সরল মনটা বুঝি একটু বেশি সরল। আর সেই সরল মনের সকল কাহিনি এবং দূর্বলতা ধরতে পেরে যদি মহারানীর এই তুচ্ছ ব্যবহার হয় তবে কুঠিয়াল কখনো মহারানীর সাথে আর বাক্য বিনিময় করবে না।

_________________________

বনের ঠিক মাঝখানে একটি পুকুর রয়েছে। যেই পুকুরে হরিণেরা জল খেতে আসে। সেইখানে গেলে হরিণের দেখা পাওয়া যেতে পারে। প্রায় আরো আধ ঘণ্টা হেটে পুকুরের কাছাকাছি আসার পর দেখা গেলো মেঠোপথে হরিণের পায়ের ছাপ। পুকুরের সামনা সামনি যাওয়ার পর দেখা গেলো চার-পাঁচটা হরিণ একসাথে জল খাচ্ছে। টায়রা তা দেখেই লাফিয়ে উঠলো। চিৎকার করে বলে উঠলো,

'ইয়েস, পেয়েছি। ফাইনালি। হাইরে হরিণ! এই তোকে দেখার জন্য পাক্কা দুই ঘন্টা হেটে এসেছি। কি খেলা দেখালি রে তুই!'

মানুষজনের আওয়াজ পেয়ে হরিণ গুলো পুকুরের পানি থেকে মুখ উঠিয়ে ওদের দিকে তাকিয়েছে। আদর আস্তে আস্তে বলল, 'এই মেয়ের জ্বালায় শেষ মুহুর্তে এসে বুঝি হরিণগুলোকে পেয়েও হারিয়ে ফেলবো।'

হরিণগুলো অবাক স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলো। পুকুরের পানি খাওয়া বন্ধ করে ওরা মুখ তুলে তাকিয়েছে ওদের পাঁচজনের দিকে। চারিপাশে সবুজ কেওড়া গাছের অরন্য মাঝখানে অথৈ জলের নির্জন নীলাদ্রি রূপময় পুকুর যার একপাশে পানি পান করছে চার-পাঁচ টা হরিণের দল উপরে বিশাল বিস্তৃত নীল সাদা আকাশ। হঠাৎ হঠাৎ নির্জন পরিবেশ কাঁপাচ্ছে পাখিদের আনাগোনা। হরিণগুলো এমন নিরব দর্শক হয়ে তাকিয়ে ছিলো যেনো ওরা স্টোক করেছে কিংবা তব্দা খেয়েছে। হরিণদের সাথে স্টেচু হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওরা সবাই। হাত-পা নড়াচড়া বন্ধ। মুখে টু শব্দটি পর্যন্ত নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর আদর খুব আস্তে গলায় বলল,

'আর্দ্র ছবি তোল। ছবি তোল। ক্যামেরা কি তোর গলায় ঝুলিয়ে রাখার জন্য?'

আর্দ্র ক্যামেরা বের করলো। টিকলি অল্প একটু এগিয়ে গিয়ে সেলফি তুলল। এমনভাবে তুলল যে পুরো পুকুর এবং সাথে পুকুরের ওই পাড়ে হরিণের পাল কে দেখা যাচ্ছে। ছবির এককোণায় টিকলির মুখচ্ছবি।
আদর নিজের ফোনে হরিণের ছবি তুলতে এগিয়ে গিয়েছিলো। টিকলির পেছনে দাঁড়িয়ে হরিণের ছবি তুলছে। টিকলি নিজের ফোন ক্যামেরায় ক্লিক করতেই অজানায় এক সুশোভন চমৎকার ছবি তুলে ফেলল। ছবিটার এক কোণায় দেখা যাচ্ছে আদরকে এবং আরেক কোণায় টিকলিকে মাঝখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে পুকুর গলিয়ে হরিণের পালকে। টিকলি অপ্রস্তুত হয়ে পরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অনাকাঙ্ক্ষিত ছবিটির দিকে।

কিন্তু এতো সুন্দর মনোরম সুদৃশ্য রংবাহারী নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে বেঘাত ঘটালো আর্দ্রর ফটফট ক্যামেরার শব্দ। টায়রা মুখ দিয়ে চু শব্দ করে বিরক্ত হয়ে লাল চোখে তাকিয়ে রইল আর্দ্রর মুখের দিকে। হরিণের পাল গুলো ছুটে চলে গেলো বনের ভেতর। আর্দ্র টায়রার দিকে তাকিয়ে ছন্নছাড়া গলায় বলল,

'হোয়াট? ক্যামেরার শব্দ হলেও কি আমার দোষ নাকি? কুটিল মহিলা।'

'আপনার জন্য আমি একটাও ছবি তুলতে পারিনি হরিণদের সাথে। মাত্রই ছবি তুলতে যাচ্ছিলাম ওমনি ওরা দৌড়ে পালালো। আর আপনি আমাকে কুটিল বলছেন? মন চায়ছে, আপনাকে এই পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে রাখি। তারপর আজীবন আপনি ওই হরিণের মতো ঘাট থেকে জিহবা দিয়ে লেলিয়ে পানি খাবেন। জটলা পাকানো লোক একটা।'

টায়রা এত জোরে জোরে চিতকার করে করে কথা বলল যে আশেপাশে তাও যে কয়টা হরিণ ছিলো সব পালিয়েছে।

'আর আমার ইচ্ছে করতাছে আপনাকে ওই হরিণ গুলোর গলার সাথে বেধে দিতে। এরপর আপনি সারাদিন ওদের সাথে মুখ ত্যাড়াব্যাকা করে সেলফি তুলবেন। কখনো হরিণ ছুট লাগাবো আর আপনি দোল দোল দুলানি খেতে খেতে পিঠের ছাল-বাকল তুলে ওদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবেন। একদম আই লাভ ইউ ছবির মধ্যে দেব যেমন লাঙ্গল দেওয়ার সময় গরুর সাথে প্রতিযোগিতা দিয়েছিলো তেমন। আহ! কি দারুণ সিনারি!'

চলবে

Sm samim, Alom khan, Salman reja, Foisal Hossain, Hossain molla, Tanvir rahman, Md sohidul islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jun 09, 2021 3:30 pm
মুমুর্ষিরা শাহরীন

১৫.
সুমধুর পরিবেশ পাড়ি দিয়ে, ইট-খোয়ার রাস্তা মাড়িয়ে, চারিপাশের সবুজবীথি মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ ফেলে শা শা বায়ু কেটে ওরা এসে পৌছেছে চোয়াখালী বীচে।

উষ্ণ বালিতটে চিকচিক করছে সোনালী রোদ্দুর। সাদা বালুময় ভূমিতে পা রাখতেই ডেবে যাচ্ছে পা। সাগরের পাড়ে এক পা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বকেরা। দলবেঁধে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে গাংচিল। নীল বারিধারার সমুদ্রের গা ঘেঁষে উড়ে চলে যাচ্ছে শঙ্খচিল সহ নাম না জানা সাদা পাখি। পুরো বীচ জুড়ে দূরত্ব বজায় রেখে গাছের সমাবেশ। সাদা বালুময় ভূমিতে সবুজ গাছের কি অপরুপ মিলন!

খানিকটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলো আর্দ্র ফোন হাতে। কিছুটা চিন্তিত সে। চোখে মুখে ফুটে উঠেছে বিরক্তি। সেই চোয়াখালী বন থেকে আসার সময় থেকে দেখে আসছে টায়রা। আর্দ্র কাউকে বারবার ফোন দিয়ে যাচ্ছে।

সমুদ্রের কিছুটা কাছাকাছি দাড়িয়ে নোনাজলে পা ভেজানোর উল্লাসে মত্ত টিকলি। দূর থেকে নিমিত্তে তাকে চোখ দিয়ে ঘেরাও করে চলেছে এক যুবক। উপযুক্ত বয়সটাতে যৌবন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পানির ঝাপটানিতে ভিজে গেছে শরীরের বেশ কিছু অংশ। আদরের চাহনি নিষিদ্ধ কোনো ভেজা স্থানে আটকাতেই সে তাড়াতাড়ি চোখ ঘুরিয়ে ফেলল। বেহায়া চোখটাকে বেশ কিছু গালাগাল দিয়ে সে হেটে চলল চারিপাশ।

আশেপাশের কিছু জায়গায় চলছে সল্ট হারভেস্টিং এর প্রস্তুতি। সমুদ্র উপকূলের লবণ চাষীরা বিভিন্ন আকৃতির বর্গাকার বা আয়তাকার জমির চারিপাশে বাধ নির্মাণ করে খানিকটা খুলে রাখে। জোয়ারের সময় পানি ওই জায়গায় প্রবেশ করার পর মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সূর্যের তাপে পানি শুকিয়ে সেখানে লবণ দেখতে পাওয়া যায়।

টায়রা আর্দ্রর চারিপাশে কিছুক্ষণ চর্কির মতো ঘুরপাক করলো। আর্দ্র ধমক দিয়ে বলল, 'এই? চুপচাপ দাড়ান বলছি।'

টায়রা দাঁড়িয়ে গিয়ে মুখ ভেঙিয়ে বলল, 'আপনার সমস্যা কি?'

'অনেক সমস্যা। আমি চোখে ধান্দা দেখছি।'

'দেখতে থাকেন।' বলেই টায়রা আবারো ঘুরপাক শুরু করলো। আর্দ্র চোখ মুখ কুচকে সে জায়গা থেকে সরে এলো। এরপর আবারো কাউকে ফোন লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। টায়রা এগিয়ে গিয়ে উঁকিঝুকি দিয়েও কিছু দেখতে না পেরে হতাশ হলো। অবহেলা গলায় আন্তাজে ঢিল মারার মতো করে বলল,

'ও..গার্লফ্রেন্ড ফোন ধরছে না? '

আর্দ্র ভ্রু কুচকে খানিক্ষণ তাকিয়ে থাকলো টায়রার দিকে। টায়রা তার দু'চোখ ভর্তি কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পর আর্দ্র থমথমে কণ্ঠে জবাব দিলো,

'ব্রেকাপ হয়েছে। চোয়াখালী বনে একদমই নেট পায়না। সেখানে সে কল দিয়েছিলো ভাগ্যবশত দুই দাগ নেট পাওয়াতে একবার কল ঢুকেছিলো। কিন্তু আমি ধরতে পারিনি। এরপর সে অনেকবার ফোন দিয়েছে কিন্তু নেট এর জন্য ফোন বন্ধ পেয়েছে।'

'তারপর ব্রেকাপ হয়ে গেলো?' টায়রার অবাক গলা।

'নাহ। কাল রাতে সে আমায় একটা মেসেজ পাঠিয়েছিলো, 'Amake ki tumi nijer theke beshi valobasho?' কিন্তু আমি মেসেজটা দেখেছি একটু আগে। উত্তরে পাঠিয়েছি, 'Na।' এটা সেন্ড হলেও এরপরের মেসেজ টা সেন্ড হচ্ছে না। পরের মেসেজ টা আমি লিখেছিলাম, 'Ami tumake tumar thekeu beshi valobashi.' এখন অবধি সেন্ড হয়নি। এদিকে ফোন দিচ্ছি ফোনও ঢুকছে না নেটওয়ার্ক এর জন্য। কি মুসিবত এ পরলাম! গার্লফ্রেন্ড আমার গেছে এইটা।'

আর্দ্রর বিরহিত মুখ করে বলল। টায়রা কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে দম ফাটা হাসিতে ফেটে পরলো। আর্দ্র আগুন চোখে তাকিয়ে রইল। টায়রা হাসতে হাসতেই বলল,

'ওহ মাই গড! সিরিয়াসলি? এই সামান্য সিলি একটা ম্যাটার নিয়ে ব্রেকাপ?'

আর্দ্র গমগমে মুখে দাড়িয়ে থাকলো। টায়রা কোনো রকম হাসি চেপে বলল, 'এটাই কি প্রথম রিলেশন ছিলো?'

আর্দ্র একটু বিব্রত হয়ে বলল, 'না। পনেরো নাম্বার রিলেশন ব্রেকাপ হলো।'

টায়রা আবারো অট্টহাসিতে মেতে উঠলো। আর্দ্র রাগী গলায় বলল, 'মিস. ফুটা টায়ার একদম হাসবেন না।'

টায়রা হাসি থামিয়ে বড় বড় চোখ মেলে বলল, 'আবার? আবার আমার এতো সুন্দর নামটাকে বিকৃতি করলেন?'

আর্দ্র তাচ্ছিল্য ভাবে হাত নাড়ালো। টায়রা চোখ মুখ কুচকে বলল, 'ভাদ্র আশ্বিন কার্তিক অগ্রহায়ণ।'

'বাংলা মাসের নাম শিখছেন? ভালো তো। শিখুন শিখুন। তবে মাঝখান থেকে বলেছেন। বাংলা মাস বৈশাখ থেকে শুরু হয়। ডোন্ট ওয়ারি আমি শিখিয়ে দিবো।'

টায়রা দাঁত কটমট করে বলল, 'এর জন্যই আপনার ব্রেকাপ হয়। যে ব্যবহারের নমুনা! আই উইশ আপনার আর কোনোদিন প্রেম বা বিয়ে হতো না।'

আর্দ্র আতংকিত গলায় বলল, 'আল্লাহ এত্তো বড় অভিশাপ! আমি বাঁচমু না।'

,

ভেজা বিস্তৃত শুভ্র নির্মল সাদা বালুময় ভূমিতে পা ডুবিয়ে সাগরের তীর ধরে হেটে যাচ্ছিলো টিকলি। আদর দূর থেকে দেখছিলো কমলা রঙের জামার পার উড়না উড়িয়ে, বাতাসে সমুদ্রের পানির গন্ধ টেনে নিয়ে এক রমণী হেটে যাচ্ছে অভিমানী হয়ে। মুখে মন খারাপের রেশ। চোখ মুখ বড্ড অসুখী। চশমার আড়ালে ঢেকে থাকা অসহায় চোখগুলো আদর দেখতে পেলো না। তার চোখের ভাষা আদর পড়তে পারলো না। মনের খবরটাও নিতে পারলো না। হাটতে হাটতে টিকলি যখন আদরের কিছুটা কাছাকাছি। আদর তখন এক মনোনিবেশকারী যাদুকর গলায় একা একা বলল,

'টিকলি? আপনার ওই অতলতল সমান্তরাল দু' পাশ থেকে দু'গাছি চুলের উদ্ভব ঘটানো কপালটাতে টিকলি পরলে খুব সুন্দর লাগবে। চুলের ভাঁজে ভাঁজে মিশে যাবে টিকলির গন্ধ।'

আদরের এতো আস্তে কথা কি এতোদূর থেকে শুনতে পেলো টিকলি? সে হঠাৎ চোখ মেলে এক ঝলক তাকালো আদরের দিকে। আদরও তাকিয়ে রইল চোখে চোখ রেখে। টিকলি খুব কৌশলে চোখজোড়া সরিয়ে নিলো ওই সর্বনাশা চোখের উপর থেকে। আদরের ঘোর ভাঙলো। সে গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো এবার সোজা হয়ে দাড়ালো। খানিকটা এলোমেলো চোখে এদিক সেদিক তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো এতোক্ষণের অজানা ঘটনা। কিছুক্ষণ ভাবাভাবির পর হঠাৎ আদরের অভীষ্ট মন অভিযোগ পেষণ করলো ঈর্ষা মনোভাব নিয়ে,

'ওভাবে সে চোখ সরিয়ে নিলো কেনো? আদরের চোখ কি এতোটাই অসুন্দর নাকি আদর নিজে অসুন্দর?'

মনের এহেন অযুক্তিযুক্ত নিচুস্তরের মনোভাব দেখে আদর নিজেই কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে থাকলো। ধমক দিয়ে মনকে বলল,

'সমস্যা কি তোর? মন-মাইন্ড এতো নিচু কেনো? সময় থাকতে মন মানসিকতা উঁচু কর।'

ভেতর থেকে যেনো উত্তর এলো, 'এ্যাহ... সত্যি কথা বললেই দোষ। '

'এক চাপড়ে ঠিক করে ফেলবো। ওতো সত্যি কথা তোর বলতে হবে কেনো শুনি?'

______________________________

চোয়াখালী বীচ ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে যাওয়ায় ওরা ফিরে এলো আবার নিঝুম দ্বীপ। উদ্দেশ্য দুপুরের খাওয়া দাওয়া। হোটেল দ্বীপ সম্পদ এ খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে আর্দ্র ক্লান্ত গলা ঠেলে বলল,

'ভাইয়া এখন একটু রিসোর্টে যাই চলো। খুব টায়ার্ড লাগছে। গোসলও করা হয়নি।'

আদর একটু ভেবে বলল, 'আচ্ছা চল। বিকাল দিকে আবার বের হবো।' আদর টিকলিদের দিকে ফিরে তাকিয়ে আবার বলল,

'আপনারা কি করবেন?'

টিকলি সারাদিনে এই প্রথম আদরের সাথে কথা বলল এবং খুব তেজি গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে,

'যেহেতু আপনাদের সাথেই ঘুরছি তাহলে আপনারা যা করবেন আমরাও তাই করবো।'

আদর মিনিট খানিক তাকিয়ে থাকলো। এরপর গলা খাকারি দিয়ে বলল, 'তবে রিসোর্টে চলুন।'

টায়রাই উঠে দাড়ালো সবার প্রথমে। ক্লান্ত শরীরটাকে ধাক্কা-ধাক্কি করে সামনের দিকে এলিয়ে দিয়ে এলোমেলো পা ফেলে চলে যেতে লাগলো।

,

বিকালের একটু আগে আগেই ওরা গেলো নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান অথবা ন্যাশনাল পার্ক। এখানে একটা ওয়াচ-টাওয়ার আছে। টায়রা খুব আগ্রহ নিয়ে দৌড়ে ওয়াচ-টাওয়ারে উঠলো। আর্দ্র পেছন থেকে ধমক দিয়ে বলল,

'বেধে রাখা বলদ ছেড়ে দিলে যেমন পাগলের মতো ছুটাছুটি করে আপনি ওরকম ছুটাছুটি করছেন কেনো?'

টায়রা পেছনে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল, 'আবারো আমাকে বলদ বললেন?'

পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দুষ্টু হাসি হেসে আর্দ্র বলে, 'বলেছি বুঝি?'

টায়রা কোমড়ে হাত রেখে ঝগড়ুটে গলায় বলে, 'আমি ছুটাছুটি করি লাফাই আর যাই করি না কেনো আপনার তাতে কি?'

'কিছুই না। করুন। যত ইচ্ছা ছোটাছুটি করুন। এবং এমনভাবে ছুটাছুটি করুন যাতে আপনি এই ওয়াচ-টাওয়ার থেকে ধুম করে নিচে পরে যান। ছোটাছুটি করে যদি নাই পরেন তবে তো ছুটাছুটির অসম্মান করা হলো।'

___________________________

উপরে পেজা তুলোর ন্যায় মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে ধবল সাদা আকাশটির বুকে। মেঘের ভেলায় ভাসমান সূর্যটি উঁকিঝুঁকি দিয়ে নিজের নরম তাপ বিকোচ্ছে। নিচে দেখা যাচ্ছে, বয়ে যাওয়া পানিতে কানায় কানায় ভরপুর নীল রঙের নদী। নদীতে ঝিকুচ্ছে বেধে রাখা চার-পাঁচটা নৌকা। সামনে তাকালেই দেখা যাচ্ছে পুরো নিঝুম দ্বীপ। সবুজ গাছ-গাছালিকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে উল্লাসে মেতে আছে প্রকৃতি। সেই উল্লাসের উপহার হিসেবে ছড়িয়ে দিচ্ছে জোরালো হাওয়া। হাওয়ার কোলে ভেসে বেড়াচ্ছে দু একটা সাদা শিমুল তুলোর গুচ্ছ।

টিকলি আঙ্গুলের ডগায় তুলো নিয়ে মিস্টি একটা হাসি দিলো। গলায় ক্যামেরা ঝুলানো টায়রা সাথে সাথে ফট করে টিকলির ছবি ক্লিক করে চলে গেলো অন্যপাশে।

এদিক ওদিক তাকাতেই আদরের চোখ মুগ্ধতার সাগরে আটকে গেলো মহারানীর উপর। যেই মহারানী তুচ্ছ ছোট ছোট জিনিস নিয়ে আনন্দে মাতোয়ারা হয়। সাদা তুলো হাতে মহারানীর শুভ্র নির্মল চেহারা যেনো মিশে গেলো উচ্ছ্বাসে। মহারানীর ঠোঁটের কোলে মিষ্টি হাসি। আদরের মনটাও যেনো উল্লাসে মত্ত হলো। ভারি অবাধ্য মনটা হঠাৎ একটা অপ্রাকৃত কথা বলে উঠলো,

"প্রেমে পড়ার প্রথম ধাপ মুগ্ধতা কিংবা ঝগড়া।"

নিজের মনের এহেন অপ্রাসঙ্গিক বাক্যে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো আদর। আশ্চর্য! আজ তার মন এমন এমন কথা বলছে যে আদর নিজেই তার মনের উপর বিরক্ত এবং দ্বিধাবদ্ধ। এ কথা কেনো ভাবলো আদরের বেপরোয়া মন? এ কথা যে বড্ড বেশি অপ্রতিভ এবং অপ্রত্যাশিত। নিরর্থক এ কথাটি ক্রমেই আদররের মনকে ভাবনার সমুদ্রে ডুবিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দম আটকে মারা যাচ্ছে আশেপাশের সব বিষয়-বস্তু। উড়ে চলে যাচ্ছে হাওয়ার টিকলির কোমড় অবধি অবাধ্য রেশমি কেশ। আদরের মনের মনপাখিরা সেই অবাধ্য চুলের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ই দিশেহারা হয়ে পরলো।

চলবে

sandipchandradas, Sm samim, Alom khan, Salman reja, Foisal Hossain, Hossain molla, Tanvir rahman and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jun 09, 2021 3:30 pm
মুমুর্ষিরা শাহরীন

১৬.
জাতীয় উদ্যানটি ছিলো নামা বাজারের একদম পাশে। আশেপাশের বন জঙ্গল ঘুরে ওরা ট্রলার দিয়ে এসে নেমেছে কমলার চর। অন্যান্য চরের মতোই এই চরটি। শুধু পেছনে রয়েছে এক গভীর বন। বনে অজস্র হরিণের দর্শন পাওয়া যাবে। বনের গভীরে যেতে ইচ্ছে হলোনা কারোরই। তখন ঘড়িতে বাজে সম্ভবত সাড়ে চারটা। এই চরটির আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই। কানায় কানায় ভরপুর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ পার করে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের সান্নিধ্যে ওরা এসে পৌছালো কমলার চর। কমলার চরে দশ-বিশ মিনিট ঘুরাঘুরি করে ওরা চৌধুরী খালের যাত্রাপথে নামলো ট্রলারে করে।

অসংখ্য আঁকা-বাঁকা পথ, উপড়ে পরে যাওয়া গাছগাছালির আড়ালে নদীর বাকল ধরে ছুটে গেলা ট্রলার। এটা অনেকটা সুন্দরবনের মতো আবার বলার যায় কিছুটা রাতারগুল এর ন্যায়। গাছের প্রতিচ্ছবিতে স্বচ্ছ পানি হয়ে উঠেছে সবুজ রঙের। খয়েরী দেহের সবুজ ডাল-পালার গাছ গুলো সুবিন্যস্ত ভাবে পরে আছে একের উপর আরেক। হাওয়ায় দুলছে টিকলির চুল। টিকলির ঠিক পেছনে কিছুটা দূরত্বে বসে ছিলো আদর। হাওয়ায় দুলানো অগোছালো চুলের ছড়ায় মুখরিত আদরের আত্মমগ্ন মন বলে উঠলো,

"ওই এলোমেলো চুলে
ব্যর্থতা বয়ে যায় নিঃস্ব এই ললাটে।
হঠাৎ সেই বিকেল থমকায়
তখনি সন্ধ্যায় রাতের আধার নেমে যায়।"

এই দফায় আদর নিজের অবাধ্য বেহায়া মনটাকে আর ধমক দিলো না। সেই এলোমেলো চুলের টিকলির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ আকাশের দিকে আনমনা চোখে তাকালো। কটু শব্দ করে উড়ে চলে গেলো ঈগল। দমবন্ধকর উচ্ছ্বাসে মনটাকে বলে উঠলো, 'তোর কি হয়েছে?'

আদরের মনের থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেলোনা। আদর ধমকালেই কেবল তার মন তর্কে মাতে। অন্যথায় সে কোনোরকম কথা বলেনা। আদর হতাশ হলো আরো একবার। কবিতা লিখা বা ছন্দ মেলানো ছেড়ে দিয়েছে সেই বহুকাল আগে। ছেড়ে দিয়েছে বললে ভুল হবে। বলা যায়, সময়ের অভাবে তারা একা একাই হারিয়ে গেছে। শেষ হয়তো কবিতা আবৃত্তি কিংবা ছন্দ লিখেছিলো ক্লাস টেনে থাকতে। পড়াশোনায় ব্যস্ত আদর আর সময় করে উঠতে পারেনি নিজের জন্য। তাই হয়তো ছন্দেরা অভিমান করে হারিয়ে গিয়েছিলো। অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, অনেক চেষ্টা করেও যাদের এতোদিন ধরে বেধে আনতে পারেনি তারা আচমকাই আজ নিজ থেকে ধরা দিলো। কেনো?
আদরের ভ্রু কুচকে উঠলো। বিকালের লাল রোদ্দুরে ডুবন্ত টিকলির দিকে এক ঝলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিলো আলগোছে।

,

চৌধুরী খাল ঘুরতে ঘুরতে দিনান্ত বেলায় এসে ডুবি ডুবি সূর্য দেখে আদর তাড়া দিলো মাঝিকে। নিঝুম দ্বীপের পাড়ে এসে ট্রলার থেকে নামতেই নিস্তব্ধ অসুখী টিকলিকে দেখে আচমকা আদর বলল,

'মন খারাপ?'

টিকলি চকিতেই তাকালো। আদর হাত বাড়িয়ে দিলো টিকলির দিকে। বলল, 'আসুন। নেমে আসুন।'

আদরের হাতের দিকে তাকিয়ে টিকলির মনে পড়লো নিঝুম দ্বীপ আসার সময় স্পিডবোটের কথা। যখন সে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো কিন্তু আদর উপেক্ষা করে গেছে। আদর আবার বলল, 'কি হলো আসুন।'

'দরকার নেই। আমি একা পারবো।' টিকলির অকপটে জবাব।

আদর জোরালো ভাবেই বলল, 'আরে আসুন না।'

আদর হাত ধরতে গেলো। টিকলি দূরে সরে দাঁড়িয়ে বলল, 'আমি পারবো।'

বলেই একা একা অনেক কষ্টে সে নেমে এলো। আদর পুরোটা দেখলো। তবুও কিছু বলল না। স্পিডবোটে আসার সময়গুলো মস্তিষ্কের আনাগোনায় স্মৃতিচারণ হ
ঘটলো তারও। টিকলি নামার পরেই আদর কিছু বলার জন্য মুখ খুলল। তখনি টিকলি আদরের দিকে তাকিয়ে বলল,

'আজ থেকে আপনাদের আর আমাদের দায়িত্ব বহন করতে হবে না।'

আদরের কথা আদরের মুখেই রয়ে গেলো। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো ক্ষণকাল। নিঝুম দ্বীপে পা রাখার সাথে সাথেই আদর বলেছিলো ওদের আলাদা ঘুরতে। নিজের রাস্তা নিজে দেখে নিতে। তাই কি আজ টিকলি এই কথা বলল? আদরের মনের গহীনে কথাগুলো আসতেই সে নিরর্থক গলায় প্রশ্ন করলো,

'মানে?'

টিকলি তার চশমার আড়ালে থাকা চোখ দুটোকে শক্ত করে স্থবির কন্ঠে বলল, 'মানে আমরা আর আপনাদের ঘাড়ে বসে থাকবো না। আজ থেকে আপনারা আপনাদের মতোন ঘুরবেন থাকবেন আর আমরা আমাদের মতো।'

কথাগুলো বলেই টিকলি চলে গেলো। আদর দাঁড়িয়ে রইল একইভাবে। চোখের মনিকোঠায় ফুটে উঠলো নিদারুণ এক অবাকতা। নিস্পৃহ মনটা ভেবে উঠলো কেনো এই অবহেলিত কথাবার্তা? কাল রাতেও তো সব কিছু কত ভালো ছিলো। আজ তবে এসব কথা কেন? হ্যাঁ, এই মুহুর্তে এসে আদরের মনে হচ্ছে সে ভুল করেছে ওভাবে টিকলিকে ইগনোর করে। ওতোটাও অপমান করে কথাবলাটা উচিত হয়নি। তাই বলে কি সেই ক্ষোভ মনের মধ্যে পুষে রাখবে টিকলি?

কাছাকাছি আসতেই টায়রা সব কথা শুনতে পেলো। আদর তখন উদাস চোখে তাকিয়ে ছিলো টিকলির হেটে যাওয়া পথের পদচিহ্ণের দিকে। টায়রা কাছে এসে ইতস্তত ভাবে বলল,

'ওর কথায় কিছু মনে করবেন না ভাইয়া। আসলে সকালে একটু বকা দিয়েছিলেন তো তাই রাগ করেছে। ও এমনি ওকে অযথা কেউ বকাবকি করলে ও খুব মন খারাপ করে।'

আদর বিস্ময়তা সাথে রাজ্যের করুন এক প্রজার মিনতি স্বরে বলল, 'আমি তো উনাকে অযথা বকাবকি করেনি টায়রা। কাল রাতেই বলেছিলাম তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে আর উনি....'

টায়রা বলে উঠলো তখনি,

'ভাইয়া কাল রাতে ও অসুস্থ হয়ে পরেছিলো। সারা রাস্তা জার্নি করে এসে ডাস্ট অ্যালার্জির কারণে অ্যালার্জির ওষুধ খেতে হয়েছে। আর অ্যালার্জির ওষুধ খেলে তো ঘুম হয় প্রচুর। তার উপর আমারো মাথা ব্যথা ছিলো। এতোটুকু জার্নি কখনো করিনি তো তাই আর কি সব মিলিয়ে আজকে ঘুম থেকে উঠতে দুই বোনের ই দেরি হয়ে গেছে।'

আদর কিছুক্ষণ পলকবিহীন তাকিয়ে রইল। বলেছিলাম, না জেনে-বুঝে কথা বলা আদর একদমি পছন্দ করে না। সেই আদর ই আজ না জেনে-বুঝে এতো কথা শুনিয়ে দিলো? খুব অন্যায় করে ফেলেছে আদর। খুব...। এই অন্যায়ের ফয়সালা করবে কীভাবে?

,

টিকলি একা একা মৃদু পায়ে হেটে যাচ্ছিলো। হঠাৎ চিলের বেগে আগমন ঘটলো আর্দ্রর। পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে আর্দ্রর দেখা পেয়ে টিকলি ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো, 'কি ব্যাপার ভাইয়া?'

আর্দ্র টিকলির সঙ্গবরণে হাটতে হাটতেই বলল, 'কোনো ব্যাপার স্যাপার নেই।'

'তাহলে খবর টবর কি?'

'উমমম...ভালো খারাপ দুটোই।'

'খারাপ কেনো?'

'তোমার বোনটা সবসময় শুধু ঝগড়া করে৷ তাই খারাপ। এমন দস্যি একটা মেয়ে তোমার মতো অতি সভ্য ভদ্র নিরীহ মানুষের বোন কি করে হলো কে জানে? আচ্ছা, তোমরা আসলে এক মায়ের পেটের বোন তো? কুড়িয়ে টুড়িয়ে আনোনি তো?'

টিকলি হেসে দিলো। ঠোঁটে হাসির রেশ টেনেই বলল,

'হয়তোবা। মাঝে মাঝে আমারও সেরকমই মনে হয়। এতো রাগচটা মেয়ে।'

'আচ্ছা তাই? তোমার রাগ নেই?'

আর্দ্রর প্রশ্নে সেকেন্ডের জন্য হয়তো থমকে গেলো টিকলি। মুহুর্তের মাঝে মনে পরলো সকালে আদর বলেছিলো, 'এতো রাগ কেনো? একে তো নিজে ভুল করেছে আবার আমার উপরই রাগ দেখানো হচ্ছে?'

টিকলির ভাবনার মুহুর্তে আর্দ্র হালকা গলায় টিকলিকে ডেকে উঠলে আনমনায় টিকলি জবাব দিয়ে উঠলো,

'আপনার ভাইকে জিজ্ঞাসা করবেন। আমি কি সত্যিই খুব বেশি রাগী?'

'কি বললে?' ছোট ছোট চোখ করে বলল আর্দ্র।

টিকলি চমকে তাকিয়ে ছাড়া ছাড়া গলায় বলে উঠলো,

'বললাম আপনার ভাইয়ের থেকে তো আর বেশি রাগী না?'

আর্দ্র মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে বলল, 'তা ঠিক। তবে আমার ভাইয়া প্রচুর ভালো। '

টিকলি আর্দ্রর দিকে তাকিয়ে স্ফীত হাসলো। যেই হাসি কিছুটা ব্যাঙ্গাত্মক।

'হয়তো ভালো। তবে কাঠিন্যতা মানুষের মন কিংবা ভালো মানুষীটা ঢেকে দেয়।'

______________________________

রাতের নিঝুম অন্ধকারে আর্দ্র রিসোর্টের ছাদে দাঁড়িয়ে গুনগুন করছিলো,

'চান্দের বাতির কসম দিয়া ভালোবাসিলি
সূর্যের আলোয় ঝলমলাইয়া আমায় পোড়াইলি
চান্দের বাতির কসম দিয়া ভালোবাসিলি
সূর্যের আলোয় ঝলমলাইয়া আমায় পোড়াইলি
এখন তো চান্দেও চিনে না
আমারে সূর্যেও চিনে না
চিনবো কেমনে যে চিনাইবো সেও তো চিনে না'

গলা ছেড়ে এইটুকু গাইতেই পেছনে কারোর রাক্ষসী হাসিতে এতো সুন্দর বিরহ গান গান পরিবেশে বিঘ্ন ঘটলো আর্দ্রর। কটমটিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই চোখ জোড়া শীতল হলো। আটকে গেলো। সেই অট্টহাসির দিকে ক্ষণিক নিরস্ত নিবৃত চাহনিতে তাকিয়ে থাকলো অবুঝ হৃদয়। খোলা মনটা বিশাল সত্যি আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,

'মেয়েটার হাসিটা ওতোটাও খারাপ নয়।'

মাথা চুলকে উল্টো ঘুরে আর্দ্র নিজেও হেসে দিলো। টায়রার দিকে আবারো তাকাতেই মনে পরলো প্রথম দিনের কথা। সেই মাস্ক পরিহিতা সম্মুখ ভাগের কালো চুলের উপর মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করা পানিগুলো যখন আর্দ্রর সাথে তর্কে মেতে উঠেছিলো। টায়রা তখন হুট করে মাস্ক খুলল। মিনিট খানিকের জন্য আর্দ্র থমকে গেলো। সাগরের গভীরে ডুবে গেলো। বিশাল জলরাশির তলদেশ থেকে উদ্ধার করতে পারলো না তার অনুভূতিগুলোকে। আবার ক্রমেই সেই অনুভূতি গুলো ঝগড়া রাগ অভিমানে রুপান্তরিত হলো। ঠিক এই মুহুর্তটার অনুভূতিগুলোকেও দমিয়ে রেখে আর্দ্র ধমকে উঠলো,

'হেহে করে হাসছেন কেনো? আপনি জানেন আপনাকে ঠিক রাক্ষসীদের মতো লাগছে। একদম হাসবেন না। আর যেনো হাসির শব্দ আমার কানে না আসে। আপনার হাসি শুনলে আমার গা রি রি করে।'

টায়রা কোমড়ে হাত রেখে বলল, 'হাজার বার হাসবো। আপনি কানে তুলো গুজেন। এসব ছ্যাকাভ্যাকা টাইপ গান শুনলে কার হাসি আসবে না? পনেরো বার ছ্যাকা খেয়েছে। বেচারা!'

বলেই টায়রা আবারো হাসিতে মত্ত হলো। সেই হাসির দিকে তাকিয়েই আর্দ্র মুগ্ধ কণ্ঠে বলল,

'হাসবেন না। একদম হাসবেন না। আর শুনুন, কেউ আমাকে ডাম্প করেনা। সবাইকে আমি ডাম্প করি।'

'আহারে...। মিথ্যা কথা বলতে বলতেই না আরেকটা ব্রেকাপ হয়ে যায়।' টায়রা আবারো হেসে কুটিকুটি।

আর্দ্র গাল ফুলিয়ে বলল, 'মিথ্যা কথা না সব সত্যি। আমি জানি কালকেই এই মেয়েটা ফোন দিবে। কিন্তু আমি আর ধরবো না। যেই মেয়ে অকারণে সন্দেহ করে সে প্রেমের মর্ম বুঝে না। আর আপাতত আমি সিঙ্গেল। ব্রেকাপ ট্রেকাপ হওয়ার আর কোনো চান্স নেই।'

'যারা সন্দেহ করে তারাই প্রেমের মর্ম বুঝে কারণ তারাই বেশি ভালোবাসে।'

'না। বুঝে না।'

'আচ্ছা, তাহলে তো আপনিও প্রেমের মর্ম জানেন না। কারণ আপনিও মিথ্যা কথা বলেছেন।'

'কি মিথ্যা?' আর্দ্র সিরিয়াস হয়ে প্রশ্ন করলো।

ঠিকঠাক ভাবে দাঁড়িয়ে টায়রা উত্তর দিলো, 'বলেছেন আপনি নাকি তাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসেন। আসলে কি বাসেন?'

'না। টু বি অনেস্ট আমি এই পর্যন্ত কাউকেই ভালোবাসেনি। আমি শুধু সবার মাঝে তাকে খুঁজেছি যাকে আমি চাই।'

'হয়তো সবাইও আপনার মতোই ভেবেছে।'

'না ভাবেনি তারা।'

'কে বলেছে? আপনি বেশি জানেন?'

'হয়তো না। তবে আমি যা জানি তা আপনি জানেন না।'

'তো আপনি কি কি জানেন?' টায়রা চোখ উল্টিয়ে প্রশ্ন করলো।

আর্দ্র হেসে টায়রার দিকে এগিয়ে এলো। ঝুঁকে দাঁড়িয়ে বলে, 'বলবো?'

দু কদম পিছিয়ে টায়রা বলল, ' দূরে দাঁড়িয়ে অবশ্যই বলুন।'

আর্দ্র তখন নিবিড় প্রগাঢ় কোনো এক অদৃশ্য অদৃষ্ট মায়াজালে আটকে গিয়ে আত্মমুগ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলো,

"প্রেম মানে প্রেমছন্দ, প্রেমমগ্ন, প্রেমগন্ধ, প্রেমমন্দ, প্রেমমত্ত। আর এতোসব প্রেমের মাঝে সন্দেহ করার অবকাশ কোথায়? প্রেমের মাঝে সে সন্দেহ করার ফুরসৎ টাই তো পাবে না। প্রেমের ছন্দে ছন্দে বয়ে যাবে তার হৃদয় গভীরের অচিন পাখির দেহ। অচিনঘরে অচিন পাখির কুহুতানে কেটে যাবে সারা বেলা। মন্দ হয়ে উঠবে প্রেম। কলরবে ছেয়ে যাবে হৃদয়পাটাতন। গন্ধে গন্ধে বয়ে যাবে প্রেমের ক্যানভাস। প্রেমমত্তে মজে গিয়ে জেগে উঠবে নীল আকাশে নতুন চাঁদের প্রতিবিম্ব। সূর্যনিবারণে তপ্ত হয়ে উঠবে প্রেমমগ্ন যুগলবন্দী। তবুও তারা প্রেমে মত্ত।"

চলবে

sandipchandradas, Sm samim, Alom khan, Salman reja, Foisal Hossain, Hossain molla, Tanvir rahman and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jun 09, 2021 3:31 pm
মুমুর্ষিরা_শাহরীন

১৭.
টায়রাকে খুঁজতে ঘর থেকে বের হতেই অনাকাঙ্ক্ষিত বশত টিকলির দেখা হয়ে গেলো আদরের সাথে। উল্টো পায়ে চলে যেতে নিলো। আদর পেছন থেকে ডেকে উঠলো। ঘাড় ঘুরিয়ে টিকলি বলল,

'বলেছি তো আপনাদের মতো আপনারা থাকবেন আর আমাদের মতো আমরা। আজ থেকে আমরা অপরিচিত। তবে এতো ডাকাডাকি কেনো?'

আদর চেয়েছিলো টিকলিকে সরি বলবে। অনেকবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে সরি প্র‍্যাকটিস করেছে। জীবনে হয়তো এই প্রথম মা ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে সে সরি বলার প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু টিকলির এতোসব আগুনের গোলার ন্যায় কথার ছটায় সেসব কোথায় যেনো হারিয়ে গেলো। সরি প্র‍্যাকটিস টা একদম বৃথা গেলো। আবার ভর করলো রাগ। তবুও রাগ গুলোকে ধামাচাপা দিয়ে আদর এগিয়ে এলো টিকলির দিকে। মুখে গাম্ভীর্য ভাব টেনে বলল,

'আপনার কি মনে হচ্ছে না আপনি স্বার্থপরের মতো কথা বলছেন?'

টিকলি বিস্মিত হয়েও প্রকাশ করলো না। ভ্রু কুচকে বলল, 'আমি? স্বার্থপরের মতো কথা বলছি?'

'অবশ্যই।'

'ঠিক কি কারণে আপনার এমনটা মনে হলো?'

'মনে হওয়াটাই কি স্বাভাবিক নয়?'

'কেনো? কি করেছি আমি?'

'কি করেন নি? প্রথমত আপনার দরকার ছিলো বলেই আপনি আমাদের সাথে এসেছেন। কারণ আমরা ভালো ভদ্র ছেলে তা তো এক দেখায় বুঝে ফেলেছিলেন। সেই ট্রিকস টাই কাজে লাগিয়েছেন। ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাদের সাথে সেইফ মতো এসেছেন। ঘুরেছেন। যখন দেখলেন আজ বিকালে ঘুরা শেষ। ঠিক তখনি আপনার মনে হলো আপনাদের রাস্তা এবং আমাদের রাস্তা আলাদা। আমরা পরিচিত থেকেও হুট করে অপরিচিত হয়ে উঠলাম!'

আদরের কথায় বিষের ব্যথার মতো যন্ত্রণায় কাতরালো টিকলির মনের মনপাখি। চোখ দুটো উপচে উঠলো নোনা জল দ্বারা।
টিকলির মোটা ফ্রেমের চশমার নিচের জলসিক্ত চোখদুটো কি আদর দেখতে পেলো? তার মুখ হঠাৎ পাষণ্ড থেকে নমনীয় হয়ে উঠলো। আদর বলতে শুনলো। টিকলি নাক টেনে বলছে,

'ঠিক। আমি খুব স্বার্থপর। আচ্ছা খুব বেশি কি স্বার্থপর? আমি তো আপনার কথাই রাখার চেষ্টা করেছিলাম। আপনার অবহেলা বিরক্তি ভাব তো আমি আগে বুঝতে পারিনি। বুঝতে পেরেছি কমলার দিঘি থেকে। তবুও তেমন কিছু মনে করিনি। কিন্তু আজ সকালেও যখন অযথা বকাবকি করলেন তখনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আচ্ছা? আপনি বলুন তো আপনার দোষ নেই? আমরা না হয় ঘুম থেকে উঠতে পারিনি। দেরি করেছি। কিন্তু আপনি তো একটাবার ফোন দিতে পারতেন। আপনার কাছে তো আমার নাম্বার ছিলো। বিরক্ত দেখেই তো ফোন দেননি তাইনা?'

টিকলির গলা ভেঙে এলো। হয়তো আর এক মিনিট এখানে দাড়ালে অবাধ্য জল গুলো গড়িয়ে পরবে নির্জীব কপোলের উপর। অভিমানী ঠোঁটের উপর। নিজের উপর নোনতা স্বাদ পেয়ে অভিমানী ঠোঁট দুটো তখন আরো বেশি অভিযোগ করে বলবে,

'তুই তো সচরাচর কাদিস না টিকলি। তবে এখন হঠাৎ কেদে আমাকে লবণযুক্ত পানি খাওয়াচ্ছিস কেনো রে?'

টিকলি উল্টো ঘুরলো। চশমার নিচ দিয়ে চোখ দুটো মুছে চলে যেতেই পেছন থেকে আদর বলে উঠলো,

'যাবেন না।'

কেনো কে জানে টিকলির পা দুটো ইট পাথর সিমেন্টের এই স্থাপনার সাথে আটকে গেলো। নিস্পৃহতায় ছেয়ে গেলো শরীর। ক্রমেই অসাড়, নিষ্প্রভ, নিষ্প্রাণ হয়ে উঠছে মন। আদর আবার বলল,

'আপনার নাম্বার ডিলিট হয়ে গেছে।'

নিদারুণ এক অবাকতা নিয়ে টিকলি প্রশ্ন করলো, 'হয়ে গেছে?'

কেনো জেনো টিকলিকে মিথ্যা কথা বলতে পারলো না আদর। একটু ইতস্তত অপরাধী কণ্ঠে বলল,

'না। ডিলিট করে দিয়েছিলাম।'

টিকলি অবাক হলো। নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠলো ঠোঁটের কোণায়। সে কিছু বলল না। পা বাড়ালো আবার চলে যাওয়ার জন্য। আদর তড়িঘড়ি করে বলল,

'কিন্তু সব দোষ আপনার। এসবের জন্য দায়ী আপনি।'

আবারো পেছন ঘুরে টিকলি বলল, 'আমি দায়ী?'

'হুম অবশ্যই।' পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আদর আবারো বলল,

'আপনি যদি কমলার দিঘিতে গিয়ে আমাকে রিজেক্ট না করে আর্দ্রর সাথে না আসতেন তাহলে এসব কিছুই হতো না। আপনি আমাকে অপমান করেছেন। সারা পথ আমার সাথে এসে মাঝপথে আমাকে কিছু না বলেই আমারি ছোট ভাইয়ের সাথে আপনি চলে এসেছেন। আপনি একবার বলতে পারতেন আমাকে, যে আমার সাথে আপনার যেতে ভালো লাগছে না। কিন্তু এভাবে আমাকে না বলে কয়ে রিজেক্ট করে আপনি কীভাবে যেতে পারলেন?'

বিস্ময়ের সাগরের হাবুডুবু খেতে খেতে টিকলি আর কোনো কথা খুঁজে পেলো না। বড় বড় পল্লব বিশিষ্ট চোখ জোড়া দিয়ে তাকিয়ে থাকলো শুধু। আদর বলল খুব ই করুণ গলায়,

'আমি কারো কাছ থেকে রিজেক্ট সহ্য করতে পারিনা টিকলি।'

টিকলি অবচেতনে স্বগতোক্তি করলো, 'ওহ মাই গড। আপনি একটু বেশি বেশি বুঝেন। মানে কেমনে? কীভাবে সম্ভব? একটা মানুষ এতোটা ভুল ধারণা নিয়ে ভুল বুঝে থাকতে পারে কীভাবে?'

আদর কপালে ভাঁজ ফেলে তাকালো। টিকলি বলল,

'আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন আর্দ্র ভাইয়া আমার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো। সেই মুহুর্তে আমি কীভাবে আর্দ্র ভাইয়ার হাত ছাড়িয়ে আপনার সাথে আসবো? আপনাকে বলার সুযোগ টাই তো পাইনি। কিন্তু আমি অনেকবার তাকিয়ে ছিলাম আপনার দিকে।'

আদরের মনে পরলো। হ্যাঁ, টিকলি তাকিয়ে ছিলো। অসহায় চোখে তাকিয়ে ছিলো। ও প্রশ্ন করলো,

'আর্দ্র কেনো আপনাকে ওভাবে নিয়ে যাচ্ছিলো?'

'টায়রা আর ভাইয়ার মধ্যে ঝগড়া বেধেছিল তাই তারা দুজন আর দুজনের সাথে যাবে না। তার জন্য বাধ্য হয়ে আমার আর্দ্র ভাইয়ার সাথে যেতে হয়েছে।'

আদর তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। নিজের এতো বোকামির জন্য নিজের গালেই চর লাগাতে ইচ্ছে করলো। আদর হতাশ কণ্ঠে বলল, 'আসলেই?'

টিকলি আদরের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বিরক্ত নিয়ে চলে যেতে ধরলো।
মনে পরলো, আদর সরি বলতে চেয়েছিলো কিন্তু বলা হয়ে উঠলো না। সে পেছন থেকে ডাক দিলো,

'টিকলি?'

ঘাড় ঘুরিয়ে টিকলি বিরক্ত নিয়ে বলল, 'বারবার পিছু ডাকছেন কেনো? যেতে দিবেন না আমাকে নাকি?'

'নাহ..মানে বলছিলাম যে আপনি আমার উপর রেগে নেই তো?'

ইশশ...সরি বলা হলো না! আদরের নিজের উপরেই রাগ হলো। টিকলি ভ্রু কুচকে বলল, 'আমার রাগ হলেই আপনার তাতে কি?'

আদর থতমত খেয়ে বলল, 'কিছুই না।'

টিকলি আবার চলে যেতে ধরলে আদর আবার পেছন ডাকলো। বিরক্তের উচ্চ সীমায় পৌঁছে দাঁত কটমটিয়ে টিকলি বলল, 'সমস্যা কি আপনার?'

'আমরা যেমন একসাথে এসেছি একসাথেই যাবো। কাল ই রৌনা হবো।'

টিকলি এক পলক তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো।
উফফ আপসোস... এই বেলায়ও আদরের সরি বলা হয়ে উঠলো না। আদেও বলা হবে কি না কে জানে?

________________________________

ঘরে ঢুকেই টিকলিকে থমথমে মুখে বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন ছুড়লো টায়রা,

'কি হয়েছে রে তোর?'

'কি হবে?'

ভ্রু কুচকে চিন্তিত কণ্ঠে টায়রা বলল, 'নাহ। আজকাল একটু বেশি মন খারাপ থাকছে তোর। তাই জিজ্ঞেস করলাম।'

দীর্ঘ শ্বাস ফেলে টিকলি বলল, 'হয়তো। যাই হোক, ব্যাগ গুছিয়ে রাখিস কাল চলে যাবো।'

টায়রা অবাক হয়ে টিকলির কাছে এসে বসে বলল, 'কাল ই?'

'হুম। কাল ই।'

'কেনো? কাল কেনো? দুটো দিন ও হয়নি এসেছি। মাত্র কাল দুপুরে আসলাম। মাত্র তিনদিন হলো বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাবো?'

হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে টিকলি বলল,

'আদর সাহেবের নাকি জরুরি কল আসছে বারবার। এদিকে নিঝুম দ্বীপও তো মোটামুটি সব ই দেখা হয়েছে। কাল সকালে মেবি উনারা নামা বাজার সি বীচ আর উপর বাজার সি বীচ দেখিয়ে আনবেন।'

টায়রা মন খারাপ করে কাপড় গুছাতে লাগলো।

'তুই চাইলে আমরা আরো কিছুদিন থেকে যেতে পারি। ওরা চলে যাক। আমরা না হয় পরে যাবো।' টিকলি অন্যমনস্ক গলায় বলল।

টায়রা একটু ছন্নছাড়া হয়ে বলে,

'কি দরকার? কোনো দরকার নেই। এখানে থেকে আর কি করবো? ভালো লাগছে না। একসাথে এসেছে একসাথেই চলে যাই। ঢাকার আশেপাশে বান্ধবীদের বাসায় ঘুরেফিরে আর দুটো দিন নাহয় কাটিয়ে পরে বাড়ি ফিরবো।'

কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ টিকলি খুব গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো,

'আচ্ছা, টায়রা? তোর কি মনে হয় না আমরা ওদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পরেছি?'

কাপড় ভাঁজ করা থামিয়ে ভ্রু কুটি করে টায়রা বলল,

'হঠাৎ এখন এই প্রশ্ন? আমি বিকালে শুনেছিলাম আদর ভাইয়াকেও এসব বলছিলি তুই। কি হয়েছে তোর?'

'কিছু হয়নি। তোকে যেটা জিজ্ঞেস করলাম সেটা বল না।'

হাতের কাপড় গুলো ভাঁজ করায় আবার ব্যস্ত হয়ে পরলো টায়রা। অমনোযোগী গলায় বলল,

'জানি না।'

টিকলি নিষ্প্রাণ শ্বাস ছেড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখের পাতা বন্ধ করলো। বন্ধ চোখের কোল ঘেঁষে জেগে উঠলো শত না বুঝা গল্পকথা।

_____________________________

ফোনে মগ্ন ভাইকে আদর প্রশ্ন করলো,

'আচ্ছা আর্দ্র? মানুষ অর্ধপরিচিত কাউকে সরি কীভাবে বলে?'

ফোন থেকে চট করে চোখ উঠালো আর্দ্র। বড় ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো পুরোদস্তুর চার মিনিট। আদরের কুচকানো কালো দুই ভ্রু। কপালে সুক্ষ্ম তিন-চারটি চিন্তার ভাঁজ। মুখে পরাজয়ের চিহ্ন। যেনো কোনো কিছু না পেরে সে বড্ড হতাশ। পরীক্ষার খাতায় দুটো রসগোল্লা পেয়ে সে ভবিষ্যতের চিন্তায় মশগুল।

ভাইকে পর্যবেক্ষণ শেষে আর্দ্র গলা খাকারি দিয়ে বলল,

'সরি? মানে তুমি কাউকে সরি বলবা?'

আদর চট করে তাকালো আর্দ্রর দিকে। ধাতস্থ হয়েও রাগী কণ্ঠে বলল,

'তোকে এতো প্রশ্ন করতে বলেছি?'

'আচ্ছা? অর্ধপরিচিত সেই ব্যক্তিটি কে?'

'আমি তোকে প্রশ্ন করতে মানা করেছি?' গরম চোখে তাকিয়ে আদর বলল।

মুখ গোল করে 'ওহ' বলে আর্দ্র নিজেও খানিকটা চিন্তিত হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ ভাবা-ভাবির পর বলল,

'একটা সরি নিয়ে এতো ভাবা-ভাবির কি আছে ভাইয়া? স্রেফ সামনে যাবা যাকে সরি বলার বলে দিয়ে চলে আসবা।'

কথাটা বলেই আর্দ্র আবারো ফোনে ধ্যানমগ্ন হলো। আদর এক ঝলক ভাইয়ের পানে তাকিয়ে ভাবলো, 'এতো সোজা বুঝি? যদি এতো সহজ ই হতো তবে টিকলি যখন সামনে ছিলো আদর কেনো সরি বলতে পারলো না। বারবার সরি বলতে গিয়েও কেনো অন্য কথা বলল। সরি কি এতো সস্তা? গিয়ে দাড়ালাম আর বলে চলে আসলাম?' আদর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো ভাবলো,

'হয়তো কারো কারো ক্ষেত্রে এতোটাই সোজা। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে এই সরি বলাটা ভীষণ কঠিন।'

ভাবতে ভাবতেই আদর এলোমেলো হয়ে পরলো। উদাস চোখে খুঁজে বেড়ালো আকাঁবাকাঁ নদীর পাড়। নদীর কিনারা খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে গন্তব্যবিহীন মাঝির ন্যায় ঘুরে বেড়ালো সারা তটিনী জুড়ে। তবুও প্রশ্ন থেকেই গেলো। উত্তর পাওয়া হলো না ওই নদীর বুক থেকে।

চলবে

sandipchandradas, Sm samim, Alom khan, Salman reja, Foisal Hossain, Hossain molla, Tanvir rahman and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Fri Jun 18, 2021 4:11 pm


১৮.
'সখী গো আমার মন ভালা না
কালার সাথে পিরিত কইরা সুখ পাইলাম না
সখী গো আমার মন ভালা না'

'ওই বেটা চুপ।' টায়রার কর্কশ ধমকে থেমে গেলো আর্দ্রর সুর বিহীন বিখ্যাত গানটি। ভ্রু কুচকে টায়রার দিকে তাকিয়ে আর্দ্র বলল, 'আমি বেটা?'

'কেনো বুইড়া নাকি?'

আর্দ্র অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, 'মহা চাপাবাজ মেয়ে তো। আপনার সাথে চাপা করা আমার মতো নাদান বাচ্চার কর্ম নয়।'

টায়রা তেড়ে এসে বলল, 'একে তো আমার এতো সুন্দর মুড টা এই ফালতু গানের কারণে নষ্ট করলেন। তারউপর আবার আমাকেই চাপাবাজ বলছেন?'

আর্দ্র বড় বড় চোখ করে আতংকিত গলায় বলল, 'এই মারবেন নাকি?'

'হুম। একদম মেরে দিবো।' টায়রা বলল ডাকাতিনীর গলায়।

'আচ্ছা চাপাবাজ বলবো না। ফুটা টায়ার বলেই ডাকবো।' দাঁত কেলিয়ে বলল আর্দ্র।

_____________________________

সকাল সাড়ে পাঁচটা বাজে। দুপুর একটায় ওদের লঞ্চ। নিঝুম দ্বীপ থেকে বের হতে হবে প্রায় দশটা নাগাদের দিকে। তাই ভোরেই চলে এসেছে সূর্যোদয় দেখতে। নামার বাজার সি বীচ আর উপর বাজার সি বীচ এ ঘণ্টা দুয়েক এর মতো থেকে সকালের নাস্তা করে ওরা রিসোর্টে ফিরবে। এরপর গোছগাছ করে নিয়ে নিয়েই বেরিয়ে পরবে হাতিয়ার উদ্দেশ্যে।

ডুবি ডুবি সূর্যটা তার লাল কিরণ মেলে দিয়ে যখন জাগ্রত হতে আরম্ভ করলো সেই রশ্মিতে আদর দেখতে পেলো টিকলি হাস্যোজ্জ্বল মুখ। টিকলির টিকলো নাকের ভাঁজে ঠেসে দেওয়া ছোট্ট একটা আকাশি রঙের নোস পিন। কানে দুটো মাঝারি আকারের সাদা পাথরের দুল। হাতে সাদা ফিতার ঘড়ি। মুখে লাবণ্যতা, শ্রীময়ী, কোমলতা ভাব।
টিকলিকে দেখতে দেখতেই হঠাৎ আদর আবিষ্কার করলো টিকলির ঠোঁট থেকে কিছুটা দূরে গালের একটু নিচে দুটো ছোট ছোট গর্ত। চুল গুলো টান টান করে বেধে ছেড়ে দিয়েছে বলে কপালের একদম কিনারায় আরেকটা গর্তও চোখে লাগলো। সাদা মুখটায় ক্ষুদ্র গর্তগুলোর জন্য টিকলির বদনখানা হয়ে উঠেছে বড্ড কমনীয় এবং আকর্ষণীয়। আদর কৌতুহল লুকাতে না পেরে প্রশ্ন করলো,

'আচ্ছা, এগুলো কীসের গর্ত? গালে, কপালে?'

টিকলি একটু চমকে উঠেছিলো। সূর্যের উদয় দেখতে দেখতে ধ্যানমগ্ন হয়ে গেছিলো। আদরের কথা সম্ভিত ফিরে সে বলল,

'এগুলো? পক্সের দাগ।'
'ওহ।'
ছোট করে উত্তর দিয়ে আদর পকেটে হাত গুজে দাড়ালো। টিকলি আদরের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে আবারো সামনে তাকালো। সমুদ্রের বুক থেকে ধীরে ধীরে জাগ্রত হলো সূর্য। চারিপাশে পানির মেলা। বাতাসে মাতাল হাওয়া। তার মাঝে অগ্নিরাজকুমারী টিকলিকে এই নিঝুম দ্বীপে সম্ভাষণ জানাতে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে উঠে আসছে সূর্যদেব। আদর হঠাৎ বলল,

'সুন্দর লাগে।'

টিকলি চকিতে তাকালো আদরের দিকে। অস্ফুটে কণ্ঠে বলল, 'কি বললেন?'

আদর বলল না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। টিকলি আবার জিজ্ঞেস করলো। আদর গম্ভীর গলায় বলল, 'ভদ্র লোকের এক কথা।'

কিছুক্ষণ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থেকে টিকলি তেজি গলায় বলল, 'মারাত্মক! মারাত্মক ফালতু লোক আপনি। আপনার সাথে কথা বলাই ভুল।'

টিকলি ফালতু বলতেই আদরের মনে পরলো, প্রথম দিনের কথা। যেদিন সেই পনেরো দিনের প্রেগন্যান্ট মেয়েটার সাথে তার প্রথম দেখা হয়েছিল রেস্টুরেন্টে। মেয়েটা যাওয়ার আগে আদরকে ফালতু বলে গিয়েছিলো। আদরের ভারি রাগ হলো সাথে প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা? মেয়েটাকে যে সদরঘাটে দেখেছিলাম। মেয়েটা কি কোথাও যাচ্ছিলো? গেলেও কোথায় গিয়েছিল?
মনের প্রশ্নে আদর আবারো মনকে ধমক দিয়ে বলল,

'ইশশ ওই মেয়ের কথা এতো মনে করতে হয় কেনো তোর?'

আদরের মন থেকে পাল্টা জবাব না এসে উল্টো জবাব আসলো,

'আচ্ছা? টিকলির এই কপালটা কি বেশি মিল না ওই মেয়েটার সাথে? মাস্ক পরিহিতা সেই মেয়েটা কেমন ছিলো বলতো? তোর দেখতে ইচ্ছে করে না রে আদর?'

আদর টিকলির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তার দৃষ্টি ছিলো টিকলির কপালের দিকে। আচ্ছন্ন এক ঘোরে থেকেই আদর মনকে জবাব দিলো,

'নাহ দেখতে ইচ্ছে করে না। এই মহারানীর কাছে বোধ হয় বাকিসব রমণী তুচ্ছ।'

আদরের কথায় বোধহয় তার মনটা বড় বড় বিস্ময়কর চোখ করে তাকালো। কণ্ঠে রাজ্যের অবাকতা ঢেলে বলল, 'এই আদর তুই কি প্রেমে পরলি?'

আদর গরম কণ্ঠে বলল, 'আর একটা কথা বললে তোর একদিন কি আমার একদিন।'

_____________________________

ঢাকার উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছেড়েছে। লঞ্চের এ মাথায় দাঁড়িয়ে ছিলো ওরা সবাই। এইতো আর কয়েক ঘন্টা এরপর যে যার মতো আলাদা। আর্দ্র একটু চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো। আদর প্রশ্ন করলো,

'কিরে? কি হয়েছে তোর?'

আর্দ্রকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টায়রা ফটাফট উত্তর দিলো, 'আরে ভাইয়া ব্রেকাপ হয়েছে তো। তাই গার্লফ্রেন্ডের দুঃখে কাদছে।'

'এ আর নতুন কি?' অবহেলার গলায় আদর বলল।টিকলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনে বলল,

'তা ভাইয়া? আপনার এতো ব্রেকাপ হয় কেনো বলুন তো? আপনি এতো সুন্দর, বুদ্ধিমান আর মেয়েদের হাতের মুঠোয় রাখতে পারেন না?'

টিকলির কথায় আদর এক পলক চোখ মেলে ওর দিকে তাকালো। টিকলি খেয়াল করলো না। আর্দ্র দুঃখে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলে উঠলো,

'কি করবো বলো আপু? সবাই শুধু আমাকে চায়। আমি বেশি হ্যান্ডসাম তো তাই ব্রেকাপ হয়।'

আর্দ্রর কথায় টায়রা পেট ধরে হেসে দিলো। খানিক জোরালো শব্দে হেসে উঠলো আদরও। টিকলি আদরের হাসির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো। এই কয়দিনের মধ্যে লোকটাকে এই প্রথম শব্দ করে হাসতে শুনলো টিকলি। আদর হাসি থামালো। মুগ্ধ টিকলির কানে তখনো মন্ত্রের মতো বাজছিলো সেই হাসির সুর। সারা শরীরে কাপন ধরলো। হাসির শব্দ মিশে গেলো লোমকূপের ভাঁজে ভাঁজে। শরীর আত্মায় অসহনীয় ভালো লাগা কাজ করা শুরু করলো। ইশ...ভালোই হলো। শেষ যাত্রায় একটা দূর্লভ বস্তু টিকলিকে দেখা দিলো। অন্যদিকে ঘুরে তৃপ্ততার হাসি হাসলো। সে বলতে শুনলো। টায়রা আর্দ্রকে বলছে,

'বেশি হ্যান্ডসাম তাই আপনাকে সবাই ডাম্প করে?' বলেই আবার হু হা হাসিতে মেতে উঠলো।

আর্দ্র থমথমে মুখ নিয়ে বলল,

'হ্যাঁ তাই তো। জানেন, আমার এক গার্লফ্রেন্ডকে আমার একটু একটু ভালো লাগতো। তো সে একদিন বিয়ের কথা তুলল। আমি বললাম আচ্ছা। তার দুইদিন পর এসে হঠাৎ মেয়েটা বলে কাবিননামায় দেনমোহর ধরবে এক কোটি টাকা। যাতে আমি কক্ষনো তাকে ছেড়ে যেতে না পারি। ব্যস, বিয়ে টিয়ে সব চুলোয় যাক; আগে ব্রেকাপের পায়তারা খোঁজা যাক।'

আদর স্বাভাবিক থাকলেও টিকলি আর টায়রা কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো। এরপর টায়রা আবারো উচ্চহাসিতে মেতে উঠলো। টিকলি শব্দবিহীন হাসলো। আর্দ্র গম্ভীর গলায় বলল, 'মেয়েদের এতো উচ্চস্বরে হাসতে নেই।'

,

চারিদিকে সন্ধ্যা নেমে আসছে। দিনের সুমিষ্টি আলো রাতের কালোগহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। একটু আগেই বৃষ্টি হয়েছে। ঝুম ঝুম করে নিঝুম বৃষ্টি। প্রকৃতি এখন শান্ত। আকাশ হলুদাভ রঙে সজ্জিত। সূর্যাস্তরের সেই হলুদ আলোয় টিকলির মুখখানা দেখতে লাগছে একদম সকালের সূর্যোদয়ের সাথে দেখার মতোই স্নিগ্ধ।
টিকলি তাকিয়ে ছিলো জলের গা ছিটিয়ে চলে আসা লঞ্চের উত্তাল ঢেউয়ের দিকে। হঠাৎ একটু আনমনা কিন্তু করুণ গলায় বলল,

'আমাদের আর দেখা হবে না তাইনা?'

আদর টিকলির দিকেই তাকিয়ে ছিলো। টিকলি আবার বলল একটু হেসে,

'আজ থেকে আবার আমরা আলাদা। তবুও এই কয়দিনে আপনাদের সাথে সময় কাটিয়ে বেশ ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে দীর্ঘ পরিচিত বন্ধুদের সাথে সময় কাটালাম।'

আদর স্মিত হাসলো। ঠোঁটের কোণায় থুতনিতে গর্ত পরলো। ভাঁজ পরলো। সুন্দর দেখালো তাকে। টিকলি মাত্রই খেয়াল করলো আদর হাসলে তার ঠোঁটের কোণায় টোল পরে। টিকলি হঠাৎ বলল,

'আর্দ্র ভাইয়া ঠিক বলেছিলো আপনি খুব ভালো।'

আদর খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মেয়েটার দিকে। এই মেয়েকে বুঝতে পারে না আদর। আচ্ছা, এই মেয়েটার সাথে তার পথ যখন আলাদা হয়ে যাবে তখনও কি তাকে মনে থাকবে আদরের? নাকি শুকতারার মতো মনের মাঝে মনতাঁরা হয়ে বাস করবে? নাহ...মনতাঁরা কেনো হবে? মনতাঁরা কি যে কেউ হতে পারে নাকি? কিন্তু আদর তো নিজের মনকেই বুঝতে পারছে না তবে সেখানে তাঁরা বাস করবে কীভাবে? ইশশ... কি করে গেলো এই মেয়েটা আদরকে? এই মেয়ে নামক মনতাঁরাটা কি আদরকে একটুও উলোটপালোট করে দিয়ে গেলো না? তার ডানার উজ্জ্বল আলো দ্বারা কি আদরকে রাঙিয়েও নিভিয়ে দিয়ে গেলো না?

,

বেশ রাতের দিকে লঞ্চ এসে থামলো সদরঘাটে। লঞ্চ থেকে নামতেই চোখে এসে পরলো হাজারো বাতি। ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে অনেক লঞ্চ। সেখান থেকে লাল নীল সবুজ বাতি প্রতিফলিত হচ্ছে নিঃসৃত চার যুবক-যুবতীর মুখমন্ডলের উপর। কতক্ষণ কেটে গেলো কে জানে। টিকলি বলল,

'আসি তবে?'

আদর কিছু বলল না। আর্দ্রর দিকে তাকিয়ে টিকলি আবার বলল, 'এই যে, ভালো থাকবেন ভাইয়া। ঠিক মতো পড়াশোনা করে তাড়াতাড়ি উকিল হয়ে যান তো। আমার বিয়ের রেজিষ্ট্রেশন পেপার সব আপনার হাতে তৈরি করাবো।'

টায়রার চোখ ছলছল করছিলো। এর মাঝেও সে বলল, 'হ্যাঁ আর আমার বিয়েতে উকিল বাপ বানাবো।'

আর্দ্র গরম চোখে তাকিয়ে দাঁত কটমট করে বলল, 'মাথামোটা। বলদ।'

'এই আপনি...আপনি আবার?'

'হাজারবার বলবো। বলদকে বলদ বলবো নাতো কি বলবো?'

ওদের ঝগড়া এড়িয়ে টিকলি এগিয়ে গেল আদরের দিকে। আদরের পাশাপাশি দাড়ালো। সাইড থেকে একটা আলো এসে ঝলকানি দিয়ে পরলো দুজনার উপর। আদর টিকলির দিকে তাকিয়ে স্ফীত হেসে বলল,

'সাবধানে যাবেন।'

টিকলি মাথা নাড়ালো। বলল, 'আপনিও।'

টায়রার হাত ধরে টিকলি বলল, 'চল টায়রা।'

'আসি ভাইয়া।' টায়রা হাত মেলালো আদরের সাথে।

টিকলি আর্দ্রকে বাই দিয়ে চলে যেতে লাগলো। আদর আর্দ্রও উল্টো পথ ধরলো। কিছুদূর যেতেই চারজনই ঘুরে দাড়ালো। তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ চারজনার দিকে। এরপর একসাথে বিদায় দিতে নাড়লো চারটি হাত। আবার চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কদম ফেলা হলো।

চারজনের মনেই বেজে উঠলো এক ভয়ংকর ডঙ্কার সুর। বুকে ধামাধাম তবলা বাজিয়ে চারটে মন জানান দিলো, 'হৃদয় ব্যথা করছে।'

চারটে মন একই সুরে ভেবে উঠলো, আচ্ছা? আর কোনোদিন কি ওদের দেখা হবে? দুটো কথা বলা হয়ে উঠবে কি? চোখাচোখি হবে? অভিমান করাও হবে? গাল ফুলিয়ে বসে থাকাও কি হবে? তাকিয়ে থাকা হবে? ঝগড়া করা হবে? একসাথে ঘুরা হবে? বাইক দিয়ে? কখনো কি... দেখা হয়ে উঠবে?
কে জানে আদেও হবে কিনা? তবে কিছু একটা না বলা থেকে গেলো। কিছু একটা হলো না। ফাঁকা রয়ে গেলো বুকের ভেতর। বুকের সেই ফাঁকফোঁকর দিয়েই না বেরিয়ে পরে মনপাখি।

পথ মাড়িয়ে যেতেই আদরের মনে পরলো, 'ইশশ...তার সরি বলা হয়নি।' তবে আদর পেছন ফিরে তাকালো না। দেখলো না আর টিকলিকে। ইচ্ছেগুলোকে খাঁচার ভেতর আটকিয়ে সে কদম ফেললো একের পর এক।
থাক না দু একটা না বলা কথা। বুকের গহীনেই দগ্ধ হোক না সেসব। সব কথাই কি বলে দিতে হয়? তবে যদি ভাগ্যের জোরে কখনো তাদের দেখা হয়ে যায় তখন কি বলবে? থাক নাহয় কথাগুলো, লুকিয়ে চুরিয়ে মনের আনাচে-কানাচে। আদরের ব্যস্তময় দিনগুলোতে যদি একটু ফুরসৎ পেলে এই না বলা কথাগুলো বারংবার উঁকি দেয় তবে ক্ষতি কি? অন্যায় হবে নাতো!

আদর আকাশে তাকালো। অনেক মেঘ সেখানে। মেঘের বুকে চাঁদ খুব যত্ন করে আড়াল হয়ে গেছে।ইশশ.. কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়েছে। কিছুক্ষণ আগেই তাদের পথ শেষ হয়েছে। কিছুক্ষণ আগেই বোধ হয় ছন্দ কেটেছে। আচ্ছা, প্রেম হয়েছে কি?

চলবে

Hossain molla, Tanvir rahman, Md sohidul islam, Emran sumon, Rafi ahmed, Shohagh Hossain, Golam kibreia and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Fri Jun 18, 2021 4:11 pm

১৯.
হাসপাতালের চারিদিকে মৃদু গুঞ্জন। কারো কান্নার আহাজারি, কারোর হতাশতা, তো কারোর নিস্তব্ধ কষ্ট, কেউ অসুখী, কারোর যাওয়ার পালা, কারোর আসার বার্তা। আদর অপারেশন থিয়েটার থেকে মাত্র বের হলো। নিজের চেম্বারে এসেই শরীরটাকে এলিয়ে দিলো কালো রঙের চেয়ারটাতে। টেবিলের উপর এক হাত রেখে পেপারওয়েট ঘুরাতে ঘুরাতে কিছুক্ষণ নানান চিন্তা করলো।
একটু আগে অপারেশন থিয়েটারে ব্রেন টিউমারের এক পেসেন্ট ছিলো। মহিলাটির ততটাও বয়স নয়৷ অপারেশন শুরু করতেই আদর খেয়াল করলো মহিলাটির কপাল থেকে শুরু হওয়া দু গাছি চুল গুলো হুবহু টিকলির মতোন। কপালের মাঝবরাবর ছোট্ট একটা গুরু। মিনিট খানিকের জন্য আদর নির্বাক হয়ে পরলো। নিঝুম দ্বীপ থেকে বাড়ি এসেছে আজ প্রায় এক সপ্তাহ। এ কয়দিন ব্যস্ততায় টিকলিকে তেমন মনে না পরলেও হুট করে আজ ভীষণ বাজেভাবে মনে পরলো। অন্যমনস্ক আদর খুব কষ্টে দীর্ঘ সময় নিয়ে অপারেশন শেষ করে বের হলো।

,

সারাদিনের ব্যাস্ততাময় প্রহর শেষ করে বাড়ি ফিরতেই বুক পিঠ ছেয়ে যায় এক অনাবিল সুখে। শান্তির ঢেউ বয়ে যায় অন্তরপথে। এই তো...এখন আমার বিশ্রাম। একটু নিজের জন্য সময় পাওয়া গেলো। এবার একটু ঘুমোবো। রাত এগারোটা বাজে তখন। আদর ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ বসতেই দেখলো সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে। প্লেট সোজা করতে করতে আদর বলল,

'এখনো খাওনি কেনো তোমরা? রাত জেগে আমার জন্য অপেক্ষা করতে নিষেধ করেছি।'

আজিম খান খাওয়া শুরু করলেন। শান্ত শিষ্ট বুদ্ধিমান স্নেহের এক মাত্র বড় ছেলের উপর তিনি ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত। ছোট ছেলেকে অতিরিক্ত মাত্রায় আদর দিয়েছিলেন বলেই সে আজ ঠোঁটকাটা এবং সাথে কেয়ারলেস। কিন্তু বড় পুত্রও যে এমন ধারার হয়ে যাবে তা ভাবতে পারেননি। থমথমে মুখে আজিম খান বলে উঠলেন,

'বেশি চাপ? প্রায় প্রতিদিন দেরি করে আসছো যে?'

ক্লান্ত গলায় আদর বলল, 'হুম বাবা। প্রচুর। তিন দিনের যে ছুটিতে ছিলাম। তার ধকল এই এক সপ্তাহ জোরালো ভাবে আমার উপর দিয়ে গেলো। ইনশাআল্লাহ কাল থেকে একটু ফ্রি হতে পারি।'

আজিম খান গুপ্তধন পেয়েছেন এমন খুশি খুশি গলায় বললেন, 'সত্যি কালকে ফ্রি আছো?'

আদর চোরাচোখে তাকিয়ে বলল, 'জি।'

আজিম খান গলা খাকারি দিয়ে বললেন, 'তবে, আমার এক বন্ধুর সাথে কাল দেখা করতে যেও।'

ভ্রু কুচকে আদর প্রশ্ন করলো, 'বন্ধু মানে? তোমার বন্ধুর সাথে আমি কেনো দেখা করতে যাবো?'

আর্দ্র ভদ্র বাচ্চার মতো খাচ্ছিলো। বাবার কথা শুনে সে শুধরে দিলো, 'বাবা বলো বন্ধুর মেয়ের সাথে।'

আজিম খান কড়া চোখে তাকালেন। মনোয়ারা বেগমও নিশ্চুপে ধমক দিলেন। ভাইয়ের কথা শুনে নিয়েই আদর বিরক্তি ভঙ্গিতে বলল,

'সিরিয়াসলি বাবা? আমি শুনেছি ছেলের বিয়ে দেওয়ার জন্য মায়েরা পাগল থাকে কিন্তু আমার বেলায় সব উল্টো।'

'বিয়ে করলে তোমার সমস্যা কি?'

'কোনো সমস্যা নেই। আই হেভ নো প্রবলেম। বাট দেয়ার ইজ আ বিগ প্রবলেম। আমি তাকে বউ হিসেবে দেখতেই পারবো না। বোন বোন ফিলিংস হবে আমার। কারণ আমি এমন কাউকে বিয়ে করবো যার উপর আগে আমার প্রেম প্রেম ভাব কাজ করবে।'

কথাগুলো বলতেই কেনো যেনো হুট করে টিকলির মুখখানা চোখে ধরা দিলো। আদর অপ্রস্তুত হলো বাবার সামনে এমন কথা বলায়। আজিম খান ভ্রু কুচকে খানিক চেয়ে থেকে বললেন,

'ওকে এই মেয়ের সাথে কথা বলো। ঘুরো। প্রেম প্রেম ফিলিংস এমনিতেই আসবে।'

খাওয়া ছেড়ে উঠে পরলো আদর। মনোয়ারা বেগম দৌড়ে এলেন। শান্ত কন্ঠে আদর জবাব দিলো,

'আমি আর খাবো না মা। আর বাবা, বিয়ের কথা আমি নিজেই তুলবো আমার মরজিমাফিক। সব বিষয় সবার উপর চাপিয়ে দিতে নেই। এইসব বিয়ে সম্পর্কিত বিষয় তো নয়ই। আমরা এডাল্ট। নিজের ইচ্ছের দাম তো আছে নাকি? আর একবার বিয়ের কথা তুললে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো আমি।'

আদরের কথা শেষ হতেই আদর নিজের ঘরে চলে গেলো। পুরো ডাইনিং টেবিল জুড়ে পিনপিন নিরবতা। যদিও আদর শান্ত শিষ্ট ভদ্র একটা ছেলে তবে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিংবা পছন্দের সই কিছু না হলে ওর ওই তীরের ফলার ন্যায় কথার আঘাতেই মানুষকে আধমরা করে দিবে। আর্দ্র বিরক্তিতে চু শব্দ করে বলল,

'কি দরকার ছিল বাবা? ভাইয়ার বিয়ে ভাইয়াকেই বলতে দেও না। বিয়ের সময় এলে সে নিজেই বলবে।'

_____________________________

মন খারাপের মুখে বসে ছিলো টিকলি। টায়রা বসেছিলো একটু দূরে। টিকলি বলল করুণ গলায়,

'আমার ভালো লাগছে না টায়রা।'

টিকলির দিকে তাকিয়ে টায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলো, 'কি করবো বল?'

টিকলি ঠোঁট কামড়ে তাকালো ঘরের দরজার দিকে। নিঝুম দ্বীপ থেকে আসার পর ওরা দুইদিন ওদের বান্ধবীদের বাসায় ছিলো। বাড়ি ফেরার আজ পাঁচদিন। এই পাঁচদিনে শায়লা আক্তার বকা-ঝকা করার পর দুই মেয়ের সাথে কথা বললেও কথা বলছেন না জামিলুর রেজা। টিকলির বড্ড অসহায় লাগে। দুনিয়াদারি অন্ধকার দিয়ে আসে। বাবা কথা না বললে পৃথিবীকে পানিশূন্য মনে হয়। চন্দ্র সূর্য বিহীন মনে হয়। বাবার সাথে কথা বলতে পারছে না এর চেয়ে জঘন্য সময় আর কি হতে পারে? ভেতরটা খচখচ করছে। চাপা শ্বাসে বুক উদ্বেল। টিকলি হঠাৎ উঠে দাড়ালো। বলল,

'চল টায়রা বাবার কাছে যাবো।'

টায়রার কাছে মার চেয়ে বাবা একটু বেশি আপন। বাবা তাদের ছায়া। মাথার উপর শক্ত আচ্ছাদন। তবে বাবার চেয়ে মা খুব বেশি প্রিয়। টায়রাও উঠে দাঁড়িয়ে ভীতু গলায় বলল,

'সত্যি যাবি?'

'হুম চল।'

টিকলি হেটে গেলো। টায়রা বোনের পেছন পেছন লুকিয়ে চুরিয়ে এলো কোনোমতে। বাবা-মায়ের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চির পরিচিত অভ্যাস, নখ কামড়াতে শুরু করলো টিকলি। ভয়ে বুকে ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে। মাথা ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মা ঘুমোচ্ছে। ইশশ...এই সময়েই ঘুমোতে হলো। কিছু হলে মা বাচিঁয়ে দিতো। বাবাকে গিয়ে বলবে কি? টায়রা প্রশ্ন করলো,

'কিরে আপু যাস না কেনো?'

টিকলি নখ কামড়াতেই চোখ পাকিয়ে তাকালো। দাঁত কিড়িমিড়ি করে বলল, 'বিপদের সময় আপু? কেনো তুই যা। কি সুন্দর এখন আপু ডাকা হচ্ছে! পল্টিবাজ মেয়ে একটা!'

টায়রার থেকে চোখ সরিয়ে ধুরুধুরু বুক নিয়ে টিকলি দরজায় নক করে বলল,

'বাবা আসবো?'

উপন্যাসের পাতা থেকে মুখ ঘুরিয়ে দৃষ্টি দরজায় স্থাপন করলো জামিলুর রেজা। টিকলি স্বভাবও পেয়েছে একদম বাবার মতো। বাবার মতোই বই পড়া স্বভাব তার। অন্যদিকে বই দেখলে টায়রার জবাব,

'নিজের একাডেমিক বই পড়ি না। আর তোমার এই বা* ছা* বই পড়তে যামু? খায়ে দায়ে কাম নাই আর আমার।'

জামিলুর রেজা গম্ভীর গলায় বললেন, 'এসো।'

কাঁপা কাঁপা পায়ে ভেতরে এলো দুই বোন। বোনের নীল উড়নার কোণা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো টায়রা। জামিলুর রেজা বললেন,

'বসো দুজন।'

টিকলি বসলো বাবার পাশে। টায়রা অন্যপাশে বসলো। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতার পর জামিলুর রেজা বললেন,

'কি বলতে চাও?'

টিকলি গলা পরিষ্কার করে মাথা নিচু করে বলল, 'বাবা আই এম সরি।'

টায়রাও মাথা নিচু করলো। বলল, 'আই এম অলসো সরি বাবা। আসলে হয়েছিল কি....'

জামিলুর রেজা হাত তুলে বললেন, 'কৈফিয়ত দিচ্ছো কেনো? আমি তোমাদের কৈফিয়ত দিতে বলিনি। যদি এতোই আমাদের কথা ভাবতে তবে এই কাজ করতে না।'

টিকলি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, 'কিছু করার ছিলো না বাবা। আমি তোমাকে বারন করেছিলাম। আমি বিয়ে করতে চাইনি। তুমি জোরাজোরি করলে। তাই বাধ্য হয়ে...'

জামিলুর রেজা সূক্ষ্ম কণ্ঠে বললেন, 'তোমার কি বিয়ে হবে না কখনো? বিয়ে করবে না? সেই বিয়েটা এখন করলে কি সমস্যা?'

'এখন না করলে কি সমস্যা?'

'তর্ক করো না টিকলি।'

নাথা নত করে টিকলির উত্তর, 'সরি বাবা। তর্ক করতে চাইনি।'

জামিলুর রেজা গম্ভীর সুরে বললেন, 'আমি দেখাতে চাই সেই লোককে যে, তাদের ছেলের চেয়েও ভালো ছেলের কাছে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দিতে পারি এবং খুব তাড়াতাড়ি।'

টায়রা ভাবুক গলায় প্রশ্ন করলো, 'কাকে দেখাতে চাও বাবা?'

'যে আমায় ফোন দিয়ে আমার মেয়ে সম্পর্কে বাজে কথা বলেছে। বলেছে আমার মেয়ে নাকি পনেরো দিনের...ছি ছি ছি! বলতেও আমার মুখে বাধে। অশিক্ষিত লোক একটা। '

টিকলি কথা ঘুরানোর চেষ্টা করলো, 'বাবা আমাদের মাফ করে দেও। আসলে এতোটাই টেনসড ছিলাম যে কি করবো ভেবে উঠতে পারিনি। তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম।'

জামিলুর রেজা মিনিট খানিক তাকিয়ে থেকে ভাবলেন। এরপর বললেন, 'বিয়ে করবে?'

টিকলি অসহায় চোখে তাকালো। টায়রা বলল, 'বাবা তুমি কি সামহাও ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছো? আর আমি বুঝতে পারছি না, বিয়ে বিয়ে করে এতো পাগল হচ্ছো কেনো তুমি?'

'কারণ টা একটু আগে বলেছি। এককথা বলতে বার বার ভালো লাগে না।'

টিকলি অসহায় অসহিষ্ণু গলায় বলল, 'বাবা, আমি এখন বিয়ে করতে চাইনা। আমি বিয়ে করবো আর আমার একটা মতামত আছে না বলো? আমি মন থেকে রাজি না বাবা। প্লিজ...'

জামিলুর রেজা হতাশ চোখে তাকালেন মেয়ের দিকে। টায়রা ছলছল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিলো। সে প্রচুর কাদতে পারে। কাদার এক্টিং এ সে এক্সপার্ট। এইদিক থেকে টিকলি খুব শক্ত। খুব কম কাদে সে। বুক পুড়ে খানাখানা হয়ে গেলেও চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পরবে না। চোখেই রয়ে যাবে।

টায়রা বলল ধরা গলায়, 'বাবা আপুকে মাফ করে দেও।'

মেয়ের কন্ঠে গলে গেলেন জামিলুর রেজা। দুই মেয়েকে দুই হাত দিয়ে বুকে টেনে নিলেন। মেয়েদের মাথায় চুমু খেয়ে বললেন, ' ব্ল্যাকমেইল!'

টায়রা হাসলো। শায়লা আক্তার ঘুম থেকে উঠে পরেছেন তখন। বাবা মেয়ের ভালোবাসা দেখছিলেন অন্যরকম মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপটে। জামিলুর রেজা বললেন, 'কাজ হাসিলের সময় কি ইমোশনাল তাই না? চোখে পানি আবার সাথে আপুও।'

টায়রা শব্দ করে হাসলো। টিকলি নিরবে হেসে বাবার দিকে তাকালো। তারপর মাকে কাছে টেনে বলল,

'বাবা-মা আমি না তোমাদের খুব ভালোবাসি। এতো তাড়াতাড়ি পর করে দিও না। আমি সারাজীবন তোমাদের সাথে থাকতে চাই।'

প্রিয় মায়ের চোখ জলে সিক্ত হলো। তিনি মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বললেন, 'আমার মেয়েকে বিয়ে দিবো না। এই টিকলির বাবা আর কোনো পাত্র দেখো না তো তুমি। আমার রাজ্যের রাজকন্যারা হারিয়ে গেলে আমি রাজ্য দিয়ে কি করবো?'

_______________________________

বারান্দার লতা পেচানো দোলনাটিতে বসে ছিলো টিকলি। এক কোণায় খাচায় বন্দি দুটি ময়না পাখি বুলি আওড়াচ্ছিলো,

'টিকলি... টিকলি....টায়রা...টায়রা।'

টিকলি স্মিত হাসলো। শেষ আকাশের মাথায় ফুটে উঠেছে লাল হলুদ বেগুনি রশ্মি। একটু আগেই থেমেছে ঝুম বৃষ্টি। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মন খারাপ হলো টিকলির। বুক ভার হলো। বিষন্নতার বাশির সুর বয়ে গেলো। সেই মন খারাপ ক্রমাগত রূপান্তরিত হলো হৃদয় ব্যথায়। কি অসহ্যকর ব্যথা! তবুও টিকলি কাদলো না। শুধু চোখের কোণায় জলেরা হানা দিয়ে আবার একা একাই মিশে গেলো স্বর্ণ খচিত ওই আকাশটাতে। ওই স্বর্ণালি আকাশটাতে যেনো ভেসে উঠলো মনচিঠির লেখাগুলো। যেগুলো একয়দিনে খুলে পড়বার সাহস হয়নি টিকলির। তবে এখন পড়বে। পড়তে ইচ্ছে করছে। চোখের কোণা অশ্রুসিক্ত করে পড়তেই থাকবে। টিকলি পড়লো। গভীর নিবিড় প্রগাঢ় অনুভবে মনকে রাঙিয়ে সে পড়লো বিরবির করে। ভারী গলায়। উত্তাল নিঃশ্বাসে,

"ভালোবাসা তটিনী। গাঙ ভাসা রঙিন। স্রোতস্বিনী বেয়ে চলা পাহাড়িময় ঢাল। প্রবাহিণী জলধি। আবার কখনো মরা শঙ্খচিল। বেদনার সুর। কান্নার ধ্বনি। আবার কখনো গোলাপের ন্যায় মসৃণ, ভেজা, স্নিগ্ধ, মোলায়েম। ভোমররা ঘুরে মদু আহরণ করতে চায়। কেড়ে নিতে চায় ফুটন্ত ভালোবাসা কে। আবার ঈগলের মতো কখনো নির্দয়। ছু মেরে নিয়ে চলে যায় ভালোবাসাকে। তার তীক্ষ্ণ চোখে রাগ ঝরে। ভালোবাসার মলিনতা উড়ে রোষাগ্নি হয়। রোষানলে পুড়ে তখন ছারখার হয়ে যায় এই বুক। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের গর্জনে কেঁপে উঠে হৃদয়কূল। কানে লাগে, সিংহের মতোন গর্জন। যে গর্জন টেনে হিচড়ে বুক থেকে নিয়ে যাচ্ছে ভালোবাসা নামক আদরকে। হ্যাঁ, ভালোবাসা নামক আদরকে!"

টিকলি চোখ বন্ধ করলো। এরপর অনেকদিন বাদে কিছু না পাওয়ার বেদনার দু'ফোটা পানি পরলো নয়ন বেয়ে ঠোঁটের উপর। ঠোঁট অভিযোগ করলো, 'কাদছিস কেনো? কাদিস না। তুই কাদলে আমার উপর নোনতা স্বাদ অনুভব হয় রে।'

চলবে

Hossain molla, Tanvir rahman, Tanvir hrz, Md sohidul islam, Rafi ahmed, Hamida akter, Ns sordar and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 2 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Fri Jun 18, 2021 4:12 pm

২০.
বিকেলের দিক দিয়ে আদর আজ বাড়িতে ছিলো। তিন তলার তাদের বাড়িটাতে দোতলা নিয়ে তারা থাকে। তিন তলায় ভাড়া দেওয়া চারটে ব্যাচেলরকে। এরমধ্যে দুজন বিবাহিত। চাকরির সূত্রে আজ ব্যাচেলর তারা। দোতলার এই ঘরটার বারান্দার সাথেই ঘেঁষে জেগে উঠেছে বাগানবিলাস। হাত বাড়ালেই ছিড়তে পারা যাচ্ছে পাতার ন্যায় বেগুনি রঙের ফুলগুলো। বাগানের একপাশে লাগানো হয়েছে সারি সারি শিমুল তুলোর গাছ। বাতাসে শিমুল তুলো উড়ে এসে আদরের ঘর যখন মাখামাখি আদর তখন দেখতে ব্যস্ত তাদের মারামারি। সারাঘর জুড়ে তারা ঘুরে বেড়ায়৷ দুষ্টুমি করে। এ জায়গা ও জায়গায় বসে। আবার হাওয়ায় উড়ে অন্যের জায়গা দখল করে। আদর মন ভরে সব দেখে।

আজও ঘর মাখমাখি। হাতে কফির মগ নিয়ে শেষ বিকালকে মোহিত চোখে দেখছিলো সে। ঢেলে দিয়েছিলো হৃদয়ের সকল না পাওয়া দুঃখ। হঠাৎ হাতের সেলফোনটা বেজে উঠলো। সামনে ধরতেই দেখলো, রেগুলার এক পেসেন্টের ফোন। লোকটার বয়স হবে পঞ্চাশের ঘরে। আদর পারসোনালি উনাকে বেশ পছন্দ করে। ভদ্র লোকটিও আদরকে নিজের ছেলের মতোন স্নেহ করেন। মাস দুয়েক হলো লোকটার সাথে আদরের পরিচয়। লোকটার ব্রেন স্ট্রোক করেছিলো। আদর ফোন ধরলো। বলল,

'কেমন আছে মি. রুহুল হক? শরীরের অবস্থা কেমন এখন?'

'আহ! শরীর জবরদস্ত চলছে। তোমার কি খবর ইয়াং ম্যান?'

'আমার তো খবর নেই।'

'তাহলে আমি খবর পাঠাই?'

আদর হেসে দিলো। কিছুক্ষণ হেসে খেলে কথা বলার পর ফোন রেখে দিলো। লোকটা ভীষণ ভালো সাথে ভীষণ মজার। ব্যবসায়ী লোকগুলো মিশুক হয় ভালো। মানুষকে টপাটপ পটিয়ে ফেলতে পারে।

ফোনটা পকেটে রাখতেই আদরের কিছু মনে পরলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে তন্ন তন্ন করে কিছু খুঁজেও পাওয়া গেলো না। তুলোময় বাতাসে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিলো আদর। কোথাও নেই সেই নাম্বার। কেনো যে আদর রাগের মাথায় ডিলিট করেছিল? ধ্যাত! আদর আনমনেই বলল,

'ইশশ...নাম্বারটা নেওয়া হলো না। উনার কাছ থেকে নাম্বারটা চেয়ে রেখে দেওয়ার দরকার ছিলো।'

তখনি ভেতরের মনটা মীর জাফরের ন্যায় বিশ্বাসঘাতকের মতো করে বলল, 'কেনো রে আদর? ওর নাম্বার দিয়ে কি করবি রে?'

'চুপ ফাজিল। তোর কথা শুনেই নাম্বার ডিলিট করেছিলাম।'

'ভালো করছস। ভালোবাসলে একটু করসৎ করতে হয় বুঝলি? এখন খুঁজ মেয়েটাকে।'

আদর কিছুক্ষণ থেমে স্বগোতক্তি করলো, 'ভালোবাসা? ভালোবাসা কি?'

"ওই যে তোর কাছে যেটা প্রেমের ছন্দ তোর এই মনের কাছে সেটা ভালোবাসার গন্ধ।"

_______________________________

ব্যস্তসময় গুলো পার হচ্ছে নাস্তানাবুদ হয়ে। আদরকে স্যান্ডউইচের মাঝের কিমার মতো চেপে ফেলে। পিষে দিয়ে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। কোথাও এতোটুকু ফুরসৎ নেই। হাসপাতালের চেম্বারে বসা, রাউন্ড দেওয়া, মেডিকেলে ক্লাস নেওয়া, অপারেশন করা। সব মিলিয়ে আদরের এখন বাড়ি ফিরতেও বেজে যায় প্রায় বারোটা। আবার মাঝে মাঝে রাত বিড়েতে কল এলে ছুট লাগাতে হয় একটা দুটোর দিকেই। এরমাঝে পরেরদিন কোন বিষয়ের উপর লেকচার দিবে সেটাও দেখে নিতে হয়। পড়াশোনা করতে হয় প্রচুর। ডাক্তার হওয়ার এই এক জ্বালা! ফাঁক পেলেই বই নিয়ে বসে ঘাটাঘাটি করতে হয়। ক্লান্ত দেহখানি আর মানতে চায় না। দাদার স্বপ্ন ছিলো নাতী ডাক্তার হবে। সেই স্বপ্ন পূরোন করতে গিয়ে জীবন আজ খানখান।

দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি আদরের। দুপুরের খাবার খেতে বাড়ি এসেছিলো বিকাল সাড়ে চারটায়। পাঁচটার দিকে বাড়ি থেকে বের হতেই সিড়ির মুখে দেখা হলো রাহুলের সাথে। রাহুলের সাথে আদরের সম্পর্ক বেশ ভালো। তিনতলার ব্যাচেলরদের মধ্যে অবিবাহিত রাহুল এবং নয়নের সাথে আদর আর্দ্রর ঘনিষ্ঠতা বেশি। রাহুল সালাম দিলো। ব্যস্ত আদর তড়িঘড়ি করে নামতে গিয়ে থেমে গিয়ে সালামের জবাব নিয়ে বলল,

'কি খবর রাহুল?'
রাহুল হাসিমুখে জবাব দিলো, 'এই তো ভাই যাচ্ছে কোনোরকম।'
'কি জব খোঁজা হচ্ছে? পড়াশোনা তো শেষ হলো।'
'হ্যাঁ ভাই চেষ্টায় আছি।'
'আমিতো শুনেছি তোমার বাবার ভালো ব্যবসা আছে। ব্যবসায় ঢুকে গেলেই তো পারো।'
'না ভাই নিজে কিছু করতে চাই।'
'তাহলে আমার এক বন্ধুর বাবার সাথে কথা বলি?'
'নাহ ভাই। নিজের যোগ্যতায় অর্জন করতে চাই।'

আদর খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। ছেলেটার পারসোনালিটি অনেকটা তার মতো স্ট্রং আবার পরিচিত কারোর মতো স্ট্রিক্ট। সেই পরিচিতকে আদর খুঁজে পায় না। বলতে গেলে প্রায় মাসেকের মতো এই ছেলের মাঝে পরিচিত কারোর ছায়া দেখতে পাচ্ছে কিন্তু বুঝতে পারছে না। রাহুল বলল,

'হসপিটালে যাচ্ছেন ভাইয়া?'
'হুম ভাই প্রচুর চাপ। দম ফেলানোর সময় নেই৷ দুপুরের খাবারটা মায়ের ঘ্যানঘ্যানানিতে এসে খেয়ে গেলাম।'
রাহুল হেসে বলল, 'ওহ। আন্টি তো আবার আপনি বলতে পাগল।'
আদর স্মিত হাসলো। বলল, 'কোথাও যাচ্ছো?'
কিছু মনে পরার মতো রাহুল বলল, 'ওহ হ্যাঁ ভাই। আমি কিছুদিনের জন্য ফুপির বাসায় যাচ্ছি।'
'আচ্ছা সাবধানে যেও। নয়নও যাচ্ছে?'
'না ভাই। বলেছিলাম কিন্তু ও যাবে না।'
'আচ্ছা রাহুল তুমি যাও। আমারও দেরি হয়ে যাচ্ছে। হেভ আ সেভ জার্নি।'

_____________________________

টায়রা গেছে শপিং করতে নিভার সাথে। টিকলিকে অনেক জোর করার পরও কেউ নিয়ে যেতে পারেনি।

টিকলি বসে ছিলো খাটের মাঝ বরাবর বারান্দার দিকে মুখ করে। হঠাৎ শায়লা বেগমের আগমন ঘটলো। মেয়ের পাশে গিয়ে আস্তে করে বসলেন। বারান্দা গলিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েই প্রশ্ন ছুড়লো টিকলি,

'আচ্ছা মা? ওই আকাশে কি আছে? মানুষ এতো আকাশ দেখে কেনো?'

শায়লা আক্তার একটু চমকে তাকালেন। ভেবেছিলেন, মেয়ে বোধ হয় তাকে খেয়াল করেনি। কিন্তু বিচক্ষণ এই মেয়ের চোখ ফাঁকি দেওয়া ভীষণ মুসকিল। তিনি ভ্রু কুচকে বললেন,

'কোন মানুষ দেখে?'
'একজন দেখে।'
'কে?'
'উফফ..সেটা শুনে কি হবে?'
'হুম। আচ্ছা টিকলি?'
'হুম মা বলো। আমি শুনছি।'

গলাটাকে যথাসম্ভব নরম করে শায়লা আক্তার বললেন, 'তোর কি হয়েছে রে মা?'

টিকলি ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। মাকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল,

'জানিনা মা। শুধু এটুকু জানি যখন বৃষ্টির ছন্দে মুখরিত হয় চারপাশ আমার বুক তখন উত্থাল ধারায় ঢেউ বইয়ে দেয়। হৃদয় ব্যথা করে।'

কথা বলতে বলতেই টিকলির গলা কেঁপে উঠলো। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে শায়লা আক্তার তৎক্ষণাৎ গলা ভিজিয়ে বললেন, 'তোর কি হয়েছে মা? এতো বেশি শান্ত হয়ে গেছিস কেনো? কোথায় কষ্ট তোর মাকে বল?'

মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে টিকলি জবাব দেয়, 'কোথাও না মা। চিন্তা করো না।'

'তুই কি কাউকে পছন্দ করিস টিকলি?'

মায়ের কথায় ভড়কে গেলো টিকলি। মায়ের বুক ছেড়ে উঠে বসলো। এদিক ওদিক তাকালো। শায়লা আক্তার ভ্রু কুচকে তাকিয়ে ছিলেন। টিকলি মিথ্যা বলতে পারেনা। কথা কাটিয়ে দিতে খুব পারে। কথা কাটিয়ে দেওয়ার দারুন একটা টেকনিক মনে পরলো। বাপের বাড়ির প্রতি দূর্বল মাকে টিকলি জিজ্ঞেস করলো,

'তোমার ভাতিজার না আজকে আসার কথা?'

সেই মুহুর্তেই শায়লা আক্তার যেনো সব ভুলে গেলেন। কপালে হাত রেখে উত্তেজিত গলায় বললেন,

'হায়হায়! আসলেই তো। ছেলেটা কোথায় গেলো? সেই কখন বলেছে বের হয়েছে। একটা ফোনও করেনি। রাস্তা ঘাটে কোনো বিপদ আপদ হলো নাকি?'

বলতে বলতেই শায়লা আক্তার দৌড়ে গেলেন ফোনের উদ্দেশ্যে। টিকলি হালকা হেসে বসে রইল আবারো আকাশটার দিকে তাকিয়ে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মনে পরলো শুকতারার কথা। সাথে মনে প্রশ্ন জাগলো, 'সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটি কি আগে থেকেই ঠিক করা আছে? নাকি কাঙ্ক্ষিত মানুষটির অপেক্ষায় আছেন উনি?'

প্রায় মিনিট পাঁচেক পরেই একগাদা শপিং শেষে বাড়ি ফিরলো টায়রা আর নিভা। ভাবনায় মশগুল টিকলির খেয়াল নেই সেদিকে। হাতের শপিং ব্যাগ গুলো রেখে টায়রা টিকলির কাছে এসে বসে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

'আমি এসেছি তুই খেয়াল করছস?'

টিকলি তাকালো টায়রার দিকে। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, 'না, কখন আসলি?'

বিরক্তিতে চু শব্দ করে টায়রা বলে, 'এই তোর হইছে কি বলতো? আসার সময় নিচ থেকে মাও বললো তোর কি হইছে না হইছে জিজ্ঞাসা করতে। এতো চুপচাপ থাকোস কেন তুই?'

'আমি তো আগে থেকেই চুপচাপ।'

'এখন একটু বেশি।'

'কি শপিং করলি?'

কথা কাটানোর গুণ টিকলির বেশ ভালোই রপ্ত করা আছে। টায়রা ব্যাঙ্গাত্মক হেসে বলল,

'এড়িয়ে গেলি কি? আমাদের মধ্যে তো লুকানো কিছু থাকে না টিকলি।'

টিকলি অসহায় চোখে তাকালো। নিভা তাকিয়ে দেখছিলো দুই বোনকে। সে খুব ভদ্র একটা মেয়ে। বিনয়ী স্বল্পভাষী হেল্পফুল। নিভা নরম কণ্ঠে বলল,

'সেই যে নিঝুম দ্বীপ থেকে এলি এরপর থেকেই তুই এমন।'

নিভার কথা শুনে ভ্রু কুচকে টায়রা বলল, 'কাউকে ভালোবাসিস?'

টায়রার কথায় হালকা হেসে উঠে পরলো টিকলি। বারান্দার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল, 'হয়তো।'

টায়রা গিটার বাজায় মাঝে মাঝেই। সে খুব ভালো গিটার বাজাতে পারে। আর টিকলি খুব ভালো গান গাইতে পারে। টায়রার গিটারটা আজ হাতে উঠিয়ে নিলো টিকলি। বারান্দার গ্রাস কার্পেটের উপরে রাখা বাদামি রঙের বেতের চেয়ারটাতে বসতেই একটা ময়না পাখি বলল, 'টিকলি টিকলি।' আরেকটা ময়না পাখি বলল, 'টায়রা টায়রা।'

টায়রা কোনোদিকে কর্ণপাত না করে টিকলির দিকে এগিয়ে গেলো। টিকলির পাশের চেয়ারটাতে বসে গোয়েন্দা গলায় এবং হালকা আওয়াজে বলল,

'আদর ভাইয়াকে ভালোবাসিস?'

টিকলি যেনো মুহুর্তের জন্য থেমে গেলো। হাতের গিটারের দিকে তাকিয়ে রইল। টায়রার দিকে ফিরেও তাকালো না। সেকেন্ড গড়ালো মিনিট গড়ালো। নিস্তব্ধতা ভেঙে টিকলি কথার উত্তর না দিয়ে টুং টাং শব্দ তুলল। টায়রা অবাক গলায় বলল,

'তুই তো গিটার বাজাতে পারিস না। দে আমি বাজাই। তুই গা।'

'দেখি পারি কিনা? চেষ্টা করতে দোষের কি?' মিষ্টি গলায় বলল টিকলি।

টায়রা কথা বাড়ালো না। টিকলি সুর তুলছিলো আস্তে আস্তে। হালকা আওয়াজে। ধীরে ধীরে শব্দ গাঢ় হলো। দরজার সামনে এসে দাড়ালো শায়লা আক্তার জামিলুর রেজা নিভাসহ কাজের লোক সবাই। টিকলির গান মানে দূর্লভ কোনো বস্তু। শেষবার মা-বাবাকে গান শুনিয়েছিলো প্রায় চার-পাঁচ মাস আগে। অথচ অপরিচিত আদর একবার বলাতেই গেয়ে ফেলেছিলো। কি আশ্চর্য!

জামিলুর রেজা ফিসফিস করে স্ত্রীকে বললেন, 'আমার মেয়ের কি হয়েছে?'
'জানি না সবসময় বিষন্ন মুখে বসে থাকে শুধু।'

নিঝুম দ্বীপ থেকে ফিরেছে আজ প্রায় আটাশদিন। গত আটাশদিন যাবৎ সে বিচ্ছিন্ন আদর থেকে। কি জানি এভাবে কত আটাশ দিন যাবে। কিন্তু টিকলি যে ব্যকুল। এক নজর দেখার জন্য ধৈর্য্যহারা সে।

আকাশে তখন অনেক মেঘ। সাদা মেঘকাটা আকাশের এক কোণায় জ্বলজ্বল করছিলো বিকালের সূর্য। মৃদু বাতাস টিকলির মেঘের মতো কোমল চুলগুলোকেও আলতো ভাবে নাড়িয়ে দিয়ে গেলো। সুর তুলতে তুলতেই মেঘের কাছে আকুল আবেদনের গলায় টিকলি গেয়ে উঠলো চোখ বন্ধ করে,

'ও মেঘ ও মেঘ রে তুই যা না উড়ে
আমার বন্ধু থাকে যে শহরে
ও মেঘ ও মেঘ রে তুই বলিস বন্ধুরে
আমি আজও ভালোবাসি যে তারে

মেঘের সাথে মেঘের খেলা বন্ধু করলো অবহেলা
মেঘের সাথে মেঘের খেলা বন্ধু করলো অবহেলা
বন্ধু আমার রইলো কোন দূরে
আমি আজও ভালোবাসি যে তারে
আমি আজও ভালোবাসি যে তারে

মেঘ শুধু দুঃখ পেলে কাদে
রংধনু হয়ে আবার হাসে
আমার দুঃখ গলুক আমায় নিয়ে
সেই মেঘের ভেলায় চড়ে ভাসে

বৃষ্টিঝড়ে অবেলা বন্ধু করলো অবহেলা
বন্ধু আমার রইলো কোন দূরে
আমি আজও ভালোবাসি যে তারে
আমি আজও ভালোবাসি যে তারে

ভাবনার আদরে তোকে খুঁজে ফিরে
বড্ড ভিষণ করে আমার এ মন
আকাশের নিলীমায় অনুভবে খুঁজে যাই
যখন খুঁজে না পাই হারিয়ে

বৃষ্টিশেষে রোদ এলো
আমি আজও এলোমেলো
তুমি আছো বলো কি করে
আমি আজও ভালোবাসি যে তারে
আমি আজও ভালোবাসি যে তারে.........'

দীর্ঘগানটির সমাপ্ত টেনেই চোখ খুলল টিকলি। সবার বুকে কেমন দুঃখ ভাব বয়ে গেলো। টায়রা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো। টিকলি যে মাত্রাতিরিক্ত ভালো গায় এটা সবাই জানে কিন্তু এতো ভালো গিটার বাজাতে পারে তা কারোর জানা ছিলো না। টিকলির চোখ জোড়া ছলছল করছিলো। বিরবির করে মন আবারো সুর টেনে বলল, "আমি আজও ভালোবাসি যে তারে।"

ছলচ্ছল সেই চোখ জোড়াকেই হঠাৎ আচমকা দৈবাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে দুই হাতের বন্ধনে আবদ্ধ করে নিলো কেউ। ঢেকে গেলো চোখ। বন্ধ হলো চোখের পাতা। এরপর সামনে শুধুই অন্ধকার। টিকলি আতংকিত গলায় বলে উঠলো ,

'কে?'

চলবে

sandipchandradas, Hossain molla, Tanvir rahman, Tanvir hrz, Md sohidul islam, Md masum, Emran sumon and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum