সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Tue Jul 13, 2021 11:25 pm

৪১.
'মনতাঁরা!'
টিকলির বুক কেঁপে উঠলো। নাম না জানা রোমাঞ্চিত শিহরণের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো শরীর বেয়ে। চোখদুটোর কপাট বন্ধ করতেই সুখস্পর্শ আবেগ মিশ্রিত হলো শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আদর টিকলির কপাল থেকে চুল সরিয়ে নিলো। ভিষণ ব্যকুলতার গলায় বলল,

'আপনার এই কপালটা না আমার ভীষণ প্রিয়!'

টিকলি বন্ধ চোখে বিমূঢ় গলায় বলল, 'তারপর?'

'আপনার গালের ওই পক্সের ছোট দুটো গর্ত আমার ভিষণ প্রিয়!'

'তারপর?'

'আপনার ওই কপালে দু'পাশ থেকে শুরু হওয়া কোমড় দোলানো দু'গাছি চুলগুলো আমার ভীষণ প্রিয়!'

'তারপর?'

'আপনার এই টিকলো নাক আমার ভীষণ প্রিয়। আপনার সবকিছুই আমার ভীষণ প্রিয়। আপনার ওই পিঠের তিল টাও ভিষন প্রিয়! নজরকাঁড়া!'

টিকলি টপাস করে চোখ খুলল। আদরের ঠোঁটের কোণে তখন দূরন্ত মৃদু হাসি। কিছুক্ষণ শূন্যে আহাম্মক এর মতো তাকিয়ে থেকে টিকলি তেজি গলায় বলল,

'এই আপনি আমার তিল দেখেছেন কখন?'

আদর পা বাড়ালো দরজার দিকে। চলে যেতে যেতে বলল,

'কালো শাড়ির কালো ব্লাউজের ফাঁকে কালো তিলটার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিলো আমার খুব গোপনে, নির্বিঘ্নে, আপনার অগোচরে।'

,

বাইরে তখনো বৃষ্টি থামেনি। সুইমিংপুল থেকে আর্দ্র আগে উঠলো। টায়রা উঠতে গেলেই পিছলা খেয়ে পরলো। আর্দ্র হাত বাড়িয়ে দিতেই হাত ধরে উঠে এসে হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিলো। আর্দ্র হাত ধরে চোখ মুখ কুচকে বলল,

'কাজের সময় কাজী, কাজ ফুরালে পাজি।'

টায়রা অগ্নিদৃষ্টি সহযোগে তাকিয়ে থাকলো কয়েক মিনিট। গটগট পায়ে হাটা ধরতেই দেখা গেলো খানিকটা দূরেই গেটের পাশে ছাউনির নিচে বৃষ্টিতে জুবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাওয়াই মিঠাইওয়ালা। টায়রার থমকে যাওয়া দৃষ্টি অনুসরণ করে আর্দ্রও সেদিকে চোখ রাখলো। খানিকটা অবাক ই হলো এখানে হাওয়াই মিঠাইওয়ালা দেখে। কিছু পুরনো স্মৃতি মনে করাতেই বোধহয় আজ অসময়ে এই হাওয়াই মিঠাইওয়ালার উদয়। আর্দ্র ফিচেল হেসে হালকা গলায় বলল,

'আপনার মনে আছে? আপনার আমার প্রথম দেখা হাওয়াই মিঠাই কিনতে গিয়ে।'

টায়রা মুখ বাঁকিয়ে বলল, 'ঝগড়া করে।'

আর্দ্র চোখ ঘুরিয়ে বলল, 'ওই একই কথা।'

টায়রা ঠোঁট বিকৃত করে বলল, 'ওই দিনটাই আমার জীবনের কাল। আপনার মতো বধো মার্কা মানুষের সাথে সাক্ষাৎ। আর এখন পর্যন্ত সেই সাক্ষাৎ ফেবিকলের মতো চিপকেই আছে।'

আর্দ্র চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বোকা বোকা গলায় বলল, 'বধো কি? কিসব আউল ফাউল নাম! আর আমি বধো হলে আপনি বধি।'

টায়রা চোখ পাকিয়ে বলল, 'আপনার চেহারায় যে একটা হনুমানের ছাপ আছে আপনি কি জানেন?'

আর্দ্র পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, 'আর আপনার চেহারায় যে একটা বলদ বলদ ব্যাপার আছে তা কি আপনি জানেন?'

'আর আপনার চেহারায় খাসির সাইনবোর্ড টানানো আছে।'

'আপনার চেহারায় গাধার পোস্টার লাগানো আছে।'

'আপনি...আপনি..একটা অসহ্য।'

'আর আপনি বোধহয় আমার জন্য খুব সহ্য?'

,

রাত তখন একটা। আকাশ পরিষ্কার। বাঁকা একটা চাঁদ তাতে বিদ্যমান। আদর তড়িঘড়ি করে টিকলির রুমে এলো। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,

'কি হয়েছে? এভাবে আর্জেন্ট ফোন করে ডেকে আনলেন?'

'আমার ভালো লাগছে না ডাক্তার। আমি বাড়ি ফিরতে চাই।'

আদর বিস্মিত হলো, 'আমাদের তো আরেকদিন থাকার কথা টিকলি।'

'আপনি বুঝতে পারছেন না। আমার মন টানছে না। প্লিজ কথা না বাড়িয়ে চলুন।'

'এখন?'

'হুম।'

,

টায়রাকে কোনোমতে টেনে হিচড়ে ঘুম থেকে তোলা হয়েছে। আদর গাড়ি নিয়ে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো। টিকলিকে দেখতেই ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো। টায়রা ঢুলু ঢুলু পায়ে পেছনের সিটে বসেই মাথা এলিয়ে দিলো। আর্দ্র আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে টিকলির উদ্দেশ্যে বলল,

'কি হলো? এভাবে চলে যাচ্ছি কেনো আমরা? কোনো সমস্যা হয়েছে টিকলি?'

টিকলি মাথা নাড়িয়ে না করলো। আদরের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

'মনটা কু ডাকছে ভাইয়া। মনে হচ্ছে কিছু একটা খারাপ হবে। আমার এ দিকটা প্রচন্ড খারাপ। মন যা বলে তাই হয়।'

গাড়িতে কেউ আর কোনো কথা বলল না। আদর ড্রাইভিং এ গভীর মনোনিবেশ করতেই টিকলি আস্তে করে বলল,

'রাগ করছেন?'

আদর তড়িৎ বেগে টিকলির দিকে তাকিয়ে ফিচেল গলায় বলে উঠল, 'রাগ করার মতো কিছু হয়েছে বলে কি আপনার মনে হয়? যদি মনে হয় তবে আমি রাগ করেছি।'

এর পরিপেক্ষিতে টিকলি আর কথা খুঁজে পেলো না। চুপ হয়ে খুব সন্তর্পণে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালায় মাথা রেখে কালো আবরণে ঢাকা সুপ্ত রাত জাগা পরিবেশ দেখে গেলো। টায়রা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এই মেয়ে প্রচুর ঘুমোতে পারে বলেই আর্দ্রর ধারণা। তা নাহলে এই অতর্কিত সিচুয়েশনে কেউ এভাবে নাক ডেকে ঘুমোয়? ভাবার কালেই ঝাঁকি খেয়ে টায়রার মাথাটা গড়িয়ে পড়লো আর্দ্রের কাধে। আর্দ্র নাক ছিটকিয়ে ঝটকানা দিয়ে উঠাতে গেলেই আদর খেকিয়ে উঠলো,

'ঘুমাচ্ছে দেখতে পারতাছস না? ঘুমন্ত মানুষের সাথেও এরম করতে হবো? কাধে মাথা রাখছে কি কাধে ফোসকা পইড়ে গেছে?'

আর্দ্র ভাইয়ের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে বিরবির করে বলল, 'একজনের রাগ আরেকজনের উপর ঢালতাছে।'

ঘড়ির কাটা ঘুরছে নিজ গতিতে। কেটে যাচ্ছে সময়।কেটে যাচ্ছে মিনিটের পর মিনিট। টায়রার মাথা ঝুঁকে ঝুঁকে নেমে এসেছে আর্দ্রের বুকের দিকটায়। আর্দ্র টায়রার মাথাটা বুক থেকে উঠিয়ে আবার কাধে রাখলো। অজান্তেই অজ্ঞাত চোখদুটো ঘিরে ধরলো টায়রার মুখোঞ্চল। স্থির দৃষ্টিতে দেখতে দেখতেই কম্পিত হয়ে উঠলো হৃদয়। রাস্তার দু'পাশের গজারি গাছগুলো ছাড়িতে যেতে যেতেই মন বলল,
"রেখে গেলাম কতক স্মৃতি,
আবার কবে ফিরে আসা হবে না জানি।"

টিকলি জানালায় মাথা ঠেস দিয়ে ছিলো। বাইরে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। আদর হাত বাড়িয়ে টিকলির মাথা জানালা থেকে উঠিয়ে জানালার কাচ লাগিয়ে দিলো। টিকলি অসহায় চোখে আদরের দিকে তাকাতেই আদর স্নেহভরা গলায় বলল,

'ঘুম পাচ্ছে?'

টিকলি উত্তর দিলোনা। কেমন করে যেনো মাথা ঝাঁকালো। যার অর্থ হ্যাঁও না নাও না। আদর টিকলির মাথাটা নিজের কাধে রাখলো সযত্নে। এইতো... দ্বিতীয়বার কাছে আসা। ভালোবাসার মানুষটার সংস্পর্শ পাওয়া। খুব কাছে থেকে গায়ের গন্ধ নেওয়া। নিঃশ্বাসের শব্দ গোনা। প্রথমবার কাছে আসাটাও ছিলো এই বদ্ধ গাড়িতে। অভিমানী টিকলির কান্নাময় পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে আদর তার মাথাটা আলগোছে রেখেছিলো বুকের কিনারায়। সুন্দর সুন্দর দিনগুলো কেনো সবসময় সুন্দর থাকে না? কেনো হারিয়ে যায় অতীতের পাতায়? বর্তমানের বেড়াজালে?ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায়? আদর খুব আড়ালে টিকলির চুলের ভাঁজে আলতো করে ঠোঁট ছুইয়ে দিলো। বুঝলো না কেউ। জানলো না টিকলি। শুধু জানলো আদরের দগ্ধ হৃদয়। টিকলির চোখের পাতা বন্ধ। আদর গাড়ি চালাতে চালাতেই গাইলো দু লাইন,

'তুমি আকাশের বুকে বিশালতার উপমা,
তুমি আমার চোখেতে সরলতার প্রতিমা।'

আর্দ্র তখন অবধি তাকিয়ে ছিলো শ্যামল মুখশ্রীর টায়রার দিকে। শ্যামলা মানুষগুলো একটু বেশি মনকাড়া হয়। এদের একবার নজরে বন্দী করলে বোধহয় সহজে মুক্ত করা যায় না। আদরের গান শুনে আর্দ্রের দৈবাৎ আবার মনে হলো লাইনটা, 'তুমি আমার চোখেতে সরলতার প্রতিমা।'

টিকলি ঘুমিয়ে পড়েছে। ইশশ...কি মোক্ষম সময় ছিলো আদরের কণ্ঠে গান শোনার। কিন্তু শুনতে পেলো না। ভাগ্যটাই বুঝি খারাপ! টিকলি ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চিত হয়ে আদর মুচকি হাসলো। গলা ছেড়ে ধরলো গানের পরের লাইনগুলো।

,

গাড়ি থেমেছে ঠিক সেই স্থানে যে স্থান থেকে শুরু হয়েছিলো যাত্রা। আর্দ্র ব্যাগ বের করছিলো গাড়ির ব্যাক সাইড থেকে। টায়রা পাশে দাঁড়িয়ে হাই তুলতেই ধমকে আর্দ্র বলল,

'আরে আর কত ঘুমাবেন? এই ঠেলাগাড়ি মার্কা শরীর নিয়ে একটু হলেও তো হেল্প করতে পারেন নাকি? মনে মায়া দয়া নাই?'

টায়রা আবার হাই তুললো। নিজের ব্যাগটা হাতে নিয়ে দু কদম এগিয়ে গিয়েও পেছন ফিরে আসলো। আস্তে করে বলল, 'শুনুন।'

টায়রার হঠাৎ এতো সুন্দর ডাকে আর্দ্র স্তব্ধ হয়ে গেলো।বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে থাকতেই টায়রা ঠোঁট টিপে হেসে বলল, 'বধো মানে বোকা এজ লাইক এজ রামছাগল।'

আর্দ্র চোখ গরম করে তেজিয়ান দৃষ্টিতে তাকালো৷ আঙ্গুল তুলে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল, 'এক মাঘে শীত যায় না ফুটা টায়ার।'

টায়রা বাতাসে চুল উড়ানোর ভঙ্গিতে পা বাড়ালো সামনের দিকে। টিকলি ব্যাগ হাতে এগিয়ে যাচ্ছিলো। আদর গাড়িতে ঠেস দিয়ে টিকলির যাওয়ার পানেই চোখ রেখেছিলো। একটু কি অশ্রুসিক্ত ছিলো চোখদুটো? জ্বলজ্বল করছিলো কি চোখের ভেতরের মধ্যিখানের মনিদুটো? কয়েক কদম যেতেই টিকলি পেছন ফিরে তাকালো। আলতো করে মাথা দুলাতেই আচম্বিতে চশমার আড়ালে পড়ে গেলো কয়েক ফোঁটা নীর। শীতল অম্বু। গালে ছেপে গেলো বারির দাগ। টিকলি ব্যাগ মাটিতে ফেলে এক দৌড়ে আদরের কাছে গেলো। আদরের গভীর সন্নিপাতিক হতেই আদর রুদ্ধ গলায় খুব আস্তে করে বলল,

'একবার জড়িয়ে ধরবেন?'

টিকল যেনো এই কথাটির ই অপেক্ষায় ছিলো। পা উঁচু করে জড়িয়ে ধরলো আদরের গলা। তৃতীয় বার এতোটা কাছে আসা কিন্তু প্রথমবার এতোটা নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করা। জড়িয়ে ধরা। নিজের করে রাখার আকুলতা।

'আমাদের কি আবার দেখা হবে ডাক্তার? এভাবে? কিছু সুন্দর মুহুর্ত একসাথে কাটানো হবে? ইশশ..ডাক্তার আপনি মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছেন। সময় গুলো মুঠোবন্দী করে রাখেন নি। রাখলে আমার আর যেতে হতো না।'

আদর হালকা গলায় হাসলো৷ গম্ভীর, কঠোর, স্বল্পভাষী ভারিক্কি মনের আদরেরও চোখের পাপড়ি ভিজে উঠলো। সত্যি কি দেখা হবে? নাকি সামনে ওত পেতে আছে অন্যরকম ভয়ানক কিছু? টিকলিকে আরেকটু শক্ত করে ধরে আদর কাঁপা কাঁপা গলায় বাচ্চামো করে বলল,

'আই এম সরি। আদর খুব খুব সরি। অতীতে যা খারাপ হয়েছে তার জন্য সরি। ভবিষ্যতে যা খারাপ হবে তার জন্যেও সরি।'

______________________________

দিনের অগ্রভাগের রূর্যকিরণে চারিপাশ পরিষ্কার। রাতে বৃষ্টি হয়েছে অথচ এখন ভ্যাপসা গরম। গরমে ভিজে উঠেছে ঘাড় গলার কিছু অংশ। খোলা চুল লেপ্টে আছে গলার সাথে৷ শায়লা আক্তার মেয়ে পালানোর শোকে চোখ মুছতে মুছতে কোনো কারণে মেয়েদের ঘরে আসছিলেন। ঘরে পা রাখতেই তিনি বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। মুখের বুলি হারিয়ে ফেললেন অজ্ঞাত ভাবে। তাকে যেনো বোবায় ধরলো। হাজার চেষ্টা করেও কথা ফোটাতে পারলেন না মুখে। তিনি খানিকটা অচেতন পায়ে হেটে মেয়েদের বিছানার সামনে গেলেন। নিজের গায়ে হালকা চিমটি কাটতেই দেখলেন বিছানায় সত্যি তার দুই মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। তিনি চমকে উঠলেন। রাতের আধারে পালিয়ে গেলো। আবার পরের রাতের আধারেই ফিরে এলো? শায়লা আক্তার সকল ভাবনার সুতো ছিড়ে টায়রার গায়ে ধাক্কা দিলেন। টায়রা চোখ মুখ কুচকে বিরক্তি নিয়ে উঠে বলল,

'কি হয়েছে মা?'

'তোরা কে?'

টায়রা চোখ খুলে মাকে দেখে আবার চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পরলো। ঘুমিয়ে যেতে যেতে বলল, 'তোমার মেয়ে।'

শায়লা আক্তার তৎক্ষনাৎ চিতকার দিলেন। গলা ফাটানো চিৎকারে বলে উঠলেন, 'তোরা কীভাবে এলি?'

শায়লা আক্তারের চিৎকারে টিকলি জেগে উঠলো। টায়রা যথাসম্ভব বিরক্তিকর মুখে উত্তর দিলো, 'আমরা আবার কখন কোথায় গিয়েছিলাম? আমরা তো এখানেই ছিলাম।'

শায়লা আক্তার অগ্নি সহযোগী চোখে তাকিয়ে টায়রার গায়ে থাপ্পড় মেরে বললেন, 'উঠ। উঠ বলছি। মজা হচ্ছে আমার সাথে?'

মায়ের অত্যাচারে টায়রা উঠে বসলো। ঠোঁট উলটে বলল,

'সত্যি বলছি মা। আমরা কোথাও যাইনি। আমরা তো কালকে বাথরুমে লুকিয়ে ছিলাম। তোমাদের সাথে চোর পুলিশ খেলছিলাম। দেখলাম তুমি আর বাবা ধরতে পারো কিনা। কিন্তু আপসোস তোমরা ধরতে পারলে না। তাই রাতের বেলা বাথরুম থেকে চুপিচুপি বেরিয়ে এলাম। তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম।'

শায়লা আক্তারের চিৎকারে দরজায় এসে দাড়িয়েছেন জামিলুর রেজা। মেয়েদের দেখে রীতিমতো তার চোখ কপালে। টায়রার মুখে আপসোসের দুঃখী ছায়া। শায়লা আক্তার টায়রার মাথায় থাপ্পড় মারলেন। রাগী গলায় বললেন,

'আরেকবার আমার সাথে ফাইযলামি করলে বাসা থেকে বের করে দিবো।'

'বিয়ে দিয়ে তারপর বের করো। এখন বের করলে আমি কোথায় যাবো বলো? আমি তো তোমার মেয়ে একটু তো মায়া দয়া করো।'

শায়লা আক্তার চেঁচিয়ে উঠলেন, 'টায়রা, তোর গালে আমি ঠাস করে চর মারবো। ধৈর্য্যের বাধ ভেঙে দিছস। বেয়াদব। ঠিকমতো বল কখন এলি তোরা? কীভাবে এলি?'

টায়রার দাঁত কেলিয়ে আবারো দায়সারা জবাব,

'যেভাবে গিয়েছিলাম সেভাবেই ফিরে এসেছি।'

চলবে

Disha moni, Zidan hamid, Sabbir hosen sumon, Sohag hasan abir, Anik hossain, Nishad jaman, Sk rahul ali and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Tue Jul 13, 2021 11:26 pm

৪২.
কড়কড়ে রোদের উষ্ণতা পিঠে মেখে আদর ঘুমাচ্ছিলো। প্রচন্ড গরমে গায়ের টি শার্ট খুলে ছুড়ে ফেলা হয়েছে বিছানার আরেক কোণায়। হঠাৎ উন্মুক্ত পিঠে কারোর ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে আদরের পাতলা ঘুম ছুটে পালালো। মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই বিছানার পাশে মাকে বসে থাকতে দেখা গেলো। তার চোখ অবাকের সাগরে নিমজ্জিত। হাবুডুবু খেতে খেতে ডুবে যাচ্ছে তার কিয়ং উপলব্ধি সম্পন্ন মস্তিষ্ক। মনোয়ারা খান বিস্ময়তার সাথেই প্রশ্ন করলেন,

'কখন এলি বাবা?'

আদর ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জবাব দিলো, 'রাতে।'

মনোয়ারা খান জোরপূর্বক হেসে বললেন, 'হসপিটালে যাবি না?'

'না। আজ ছুটি।'

মনোয়ারা খানের কপাল কুচকে গেলো। তিনি আর একটি প্রশ্নও করলেন না। চোখের সামনেই যেনো দেখতে পেলেন কিছু সময় পরের প্রলয়। নাম না জানা বিপদের গন্ধ পেলো মাতৃহৃদয়।

,

আজিম খান নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছেন। হাতে কড়া লিকারের এক কাপ চা। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সামনে তাকাতেই তিনি বড় পুত্রকে আবিষ্কার করলেন। বড় পুত্রের ঠিক পেছন পেছন ভেজা বেড়ালের ন্যায় গুটিগুটি পায়ে হেটে আসছে তার ছোট পুত্র। আদর টেবিলের দিকে পা বাড়ালেই আজিম খান গম্ভীর সুরে বললেন,

'দাড়াও।'

আদর দাঁড়িয়ে পরলো। আর্দ্র পা টিপে টিপে চলে যেতে নিলেই আজিম খান উচ্চকন্ঠে বললেন, 'আমি দাঁড়াতে বলেছি। কথা কানে যায়নি?'

আর্দ্র তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে পরলো। চায়ে আরেকবার চুমুক দিয়ে পত্রিকা ভাঁজ করলেন আজিম খান। ছেলেদের দিকে ভ্রু কুচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আদরের দিকে প্রশ্ন ছুড়লেন,

'কোথায় গিয়েছিলে? আজকাল কোথাও যাওয়ার আগে বলে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করো না নাকি?'

আদর উত্তর দেওয়ার আগেই আর্দ্র ফট করে বলে ফেলল, 'ভাইয়া তো হসপিটালে ছিলো। চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি।'

আজিম খান তেজস্বী দৃষ্টিতে আর্দ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, 'তুমিও গিয়েছিলে? হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় হিসেবে তোমারও বুঝি চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি ছিলো?'

আর্দ্র মাথা নিচু করে ফেলল। আদরের দিকে লুকিয়ে তাকাতেই আদর চোখ বন্ধ করে আশ্বস্ত করলো। বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

'একটু ঢাকা থেকে বাইরে গিয়েছিলাম।'

'সেটা নিশ্চয়ই বলে যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো?'

আদর নির্বিকার কন্ঠে বলল, 'আমি ওখানে পৌঁছে মাকে ফোন করে বলেছিলাম।'

আজিম খান আর্দ্রের দিকে তাকিয়ে প্রচন্ড রাগ দেখিয়ে বললেন, 'তুই কেনো গিয়েছিলি?'

আর্দ্র মিনমিন করে বলল, 'ভাইয়া গিয়েছিলো তাই।'

'ভাইয়া যা করবে তাই করতে হবে? বাবা-মা কে বলার প্রয়োজন নেই?'

আর্দ্র মনোয়ারা খানের দিকে অসহায় চোখে তাকালো। মনোয়ারা খান এসে ঝাড়ি দিয়ে বললেন, 'ওর সাথে এমন করছো কেনো? বেচারা বাচ্চাটা আমার! আয় বাবা খেতে বস। ইশশ..একদিনে আমার দুই ছেলের মুখ শুকিয়ে গেছে।'

আজিম খান চোখ পাঁকিয়ে দাঁত কিড়িমিড়ি করে বললেন, 'এই অসভ্য মহিলার জন্যই আজ আমার মান-সম্মান সব জলে যাচ্ছে। এতো আদিখ্যেতা কিসের হ্যা? ছেলে কি তোমার একারই আছে?'

মনোয়ারা খান কোনো উচ্চবাচ্য না করে আর্দ্রকে নিয়ে টেবিলে বসালেন। আদর ভ্রু কুচকে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, 'মান-সম্মান জলে যাচ্ছে?'

আজিম খান দাঁত কড়মড় করলেন। মনোয়ারা খান আদরকে জোর করে ধরে নিয়ে টেবিলে বসাতেই আদর আকস্মিক বলে বসলো, 'বাবা আমি বিয়ে করতে চাই।'

আজিম খান আশ্চর্য হয়ে পরলেন যে এমন না। তবে মনোয়ারা খান আশ্চর্যের থেকেও আশ্চর্য হয়ে গেলেন। জামিলুর রেজা কল দেওয়ার পরেও তার মনে কিঞ্চিৎ আশা ছিলো যে ছেলে তার এমন কাজ করতে পারেনা। কিন্তু ছেলের এহেন ধারার কথা তো সব ভাবনা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আজিম খান ঠোঁট বাকিয়ে স্মিত হাসলেন। উপহাসের সুরে বললেন,

'এতোদিন জোর করে বিয়ের পীড়িতে বসাতে পারলাম না আর আজ নিজে থেকে এসে নির্লজ্জের মতো বলছো, 'বাবা আমি বিয়ে করবো' ?'

আদর রুটির ছিড়ে মাংসের ঝোলে ভিজিয়ে খেতে খেতে উত্তর দিলো, 'আগে মনের মানুষ পাইনি। এখন পেয়েছি।'

আজিম খান ছেলের বেহায়াপনা দেখে অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছে গেলেন। বসার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে নিভা। মাত্রই ঘুম থেকে উঠে একদম তৈরি হয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছে। এতো চিৎকার চেচাঁমেচির আওয়াজ শুনে সাথে আদর আর্দ্রকে এই সময় দেখে রীতিমতো তার আত্মা লাফিয়ে উঠলো। মনে পরে গেলো ঘুমের ঘোরে মুখ ফসকে বলে দেওয়া কথাটা। 'ওদের তো দুইদিন থাকার কথা ছিলো' কথাটা বিরবির করতেই শোনা গেলো আজিম খানের ঘোমট কন্ঠস্বর। লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে তিনিও জানতে চাইলেন,

'কে সেই মনের মানুষ?'

আদর খানিক থামলো। কিছুক্ষণ পর আস্তে ধীরে রুটি ছিড়তে ছিড়তে জবাব দিলো,

'জামিলুর রেজার মেয়ে টিকলি রেজা।'

চোখের পলকে উল্টোপাল্টা হয়ে যাচ্ছে সাজানো সকল পরিকল্পনা। আদরের বলে দেওয়া কথাটা বসার ঘরে ব্লাস্ট হওয়ার মতো কানে লেগে গেলো সবার। আর্দ্র খাওয়া থামিয়ে ভাইয়ের দিকে চেয়ে শুকনো ঢোক গিললো। মনোয়ারা বেগমের অক্ষিকোটর থেকে বলের ন্যায় কালো মনিওয়ালা চোখ দুটো বেরিয়ে আসার উপক্রম। বসার ঘরের দরজার সামনে থাকা নিভা চোখ মুখ কুচকে আরেকটা ব্লাস্ট হওয়ার অপেক্ষা করছে। মিনিট দুয়েক থমথমে নিরব পরিবেশ অতিক্রম করার পরই দ্বিতীয় ব্লাস্ট ঘটে গেলো। আজিম খান সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভীষণ রকম রাগের শরনার্থী হয়ে কাপঁতে কাপঁতে বললেন,

'কক্ষনো না। ওই মেয়েকে আমি কক্ষনো এই বাড়ির বউ হিসেবে মানবো না।'

আদরও খাওয়া ছেড়ে উঠে পরলো। বাবার দিকে তাকিয়ে অকপটে বলল, 'কেনো মানবে না? দোষ কি? পনেরো দিনের প্রেগন্যান্ট এটাই দোষ? পনেরো দিন কেনো রেডিমেড বাচ্চাও যদি থাকে তবুও আমি টিকলিকেই বিয়ে করবো। নচেৎ আর কাউকেই নয়।'

আজিম খান তাজ্জব বনে গেলেন। চমকে যাওয়া চোখ দুটো নিয়ে ছেলের পানে তাকিয়ে থাকার কালেই ছেলে তার আরো একটি চমকপ্রদ কথা বলল,

'এই যুগে এসে এখনো কীভাবে অশিক্ষিতদের মতো আচরণ করতে পারো তোমরা? পনেরো দিনের কেউ প্রেগন্যান্ট হয়?'

নিদারুণ অবাকতায় ঘেরা চোখদুটো নিয়ে আজিম খান বলে উঠলেন,

'মেয়েটার যদি কোনো দোষ নাও থাকে তবুও মেয়েটাকে এই বাড়ির বউ করে আনবো না। ওরকম অভদ্র বাপের বেটিকে এই বাড়ির বউ করার চিন্তা আমি জীবনেও করি না। তাতে যদি তুমি সারাজীবন বিয়ে না করো তাতে আমার কোনো আপসোস নেই। আমার ছোট ছেলে আছে। এক ছেলেকে বিয়ে না করালে আমার দুঃখ হবে না।'

আদর কাধ ঝাঁকিয়ে বলল, 'আচ্ছা, তাহলে তোমার ছোট ছেলেকেই বিয়ে করাও। আমি করলাম না বিয়ে তো কি হবে? আমার দিন চলবে না নাকি?'

প্রচন্ড রাগ নিয়ে আদর চলে গেলো। বাপ-ভাইয়ের কথা শুনে গলায় খাবার আটকে গেলো আর্দ্রের। হেচকি তুলে সে আদরের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিরবির করে বলল,

'লে হালুয়া হয়ে যাচ্ছে আমার বাল্যবিয়া। আবার আমাকে নিয়ে কেনো টানাটানি? সবসময় মাঝখান থেকে আমি ফাসাদে পড়ি। ধুর ভাল্লাগে না!'

আর্দ্র কাদো কাদো মুখ করে খাবার ছেড়ে উঠে দাড়ালো। মনোয়ারা খান স্তব্ধ হয়ে রোবটের ন্যায় শুধু সবকিছু অবলোকন করে গেলেন। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলেন না।

_____________________________

খাওয়ার পাট চুকিয়েই নিভা ছাদে ছুটলো। বুকে হাজারো বাসনা। শেষবেলায় দেখে যাওয়ার অসীম প্রয়াস। ছাদে যাওয়ার আগেই পাড় করতে হয় ব্যাচেলর বাসার দরজা। নিভা সেখানেই থমকে দাড়ালো। একবার ভাবলো, ছাদে গিয়ে লাভ কি এসময় তো রাহুল ছাদে থাকে না। আরেকবার ভাবলো, দরজায় নক করি। পরক্ষণেই ভেতর থেকে মনটা ছি ছি করে বলল,

'ব্যাচেলর বাসায় নক করবি? ছি ছি! নিভা তোর এতো অধঃপতন?'

নিভার মন খারাপ হয়ে গেলো। ঘোমট মুখে চলে আসতে নিলেই একটা কাজ করে বসলো সে। দরজায় হালকা টোকা দিয়ে দৌড়ে উপরের সিড়িতে উঠে গেলো। খানিক বাদে দরজা খোলার শব্দ হলো। নিভা উঁকিঝুঁকি মেরে দেখলো, পেট অবধি গেঞ্জি উঠিয়ে পড়নের লুঙ্গি গিট্টু দিচ্ছে নয়ন। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিভা সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসলো। কাউকে না দেখে বিরক্ত হয়ে একটা গালি দিয়ে নয়ন বলল,

'কোন শালায় দরজায় এম্নে নক কইরে যায় গা?'

'আমি শালায়।'

নিভা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল। নয়নের চক্ষু চড়কগাছ। নিভা বলতে ধরলো 'ভাইয়া..' তার আগেই মুখের সামনে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে ভেতরে চলে গেলো সে। কিছুক্ষণ শূন্যে আহাম্মক এর মতো চেয়ে থাকলো নিভা। প্রচন্ড বিস্ময়ে বাকি দুটো সিড়ি পার করে দরজার সামনে গিয়ে আবারো আস্তে করে টোকা দিলো। খানিক বাদে নয়ন এসে দরজা খুলে হিহি করে একটা হাসি দিলো। পড়নে তার এখন লুঙ্গির বদলে প্যান্ট এসেছে। নিভা পিটপিট করে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে দিলো। নয়ন খুব ভাব মেরে ভ্রু নাচিঁয়ে বলল,

'কি ম্যাডাম? পিপড়ার বাড়িতে যে হাত্তির পারা।'

নিভা ছোট ছোট চোখ করে চেয়ে নিজের দিকে আঙ্গুল তুলে বলল, 'ইনডিরেক্টলি হাতি ডাকছেন আমায়?'

নয়ন কানের লতি ধরে তওবা পড়ে বলল,

'নাউজুবিল্লাহ! কিসব ছি মার্কা কথা বলেন? আরে হাত্তি তো আমি আপনি তো পিপড়া।'

'আপনি আমাকে পিপড়া বললেন নয়ন ভাই?' নিভা চোখ বড় বড় করে বলল।

নয়নের মুখভঙ্গি পাল্টে গেলো। প্রচন্ড রকম আহত দৃষ্টি নিয়ে বলল, 'আমি কোনদিকে যাই?'

'কোনোদিকে যেতে হবে না। একটু রাহুলকে ডেকে দেন তো নয়ন ভাই।'

নয়ন চোখ কপালে তুলে টেনে টেনে বলল, 'রাহুল...রাহুল আর আমি নয়ন ভাই.....।'

নিভা থতমত খেলো। তোতলানোর স্বরে বলল, 'ওই...ওই একই কথা। আরে ডেকে দেন না ভাই।'

'ভাই ডাকবেন না প্লিজ। কচি কচি মাইয়াগুলা ভাই ডাকলে কলিজায় লাগে।'

নিভা চোখ পাঁকিয়ে তাকিয়ে বলল, 'আপনি কি ডেকে দিবেন?'

নয়ন দরজা ধরে হেলে দাড়ালো, 'থাকলে তো ডেকে দিবো।'

'মানে? কোথায় গিয়েছে?'

'ছাদে।'

নিভা বোকা বনে গেলো। ভ্রু কুচকে মিনিট কয়েক তাকিয়েই দৌড় লাগালো ছাদের দিকে। ইশশ...এতো কথা না বাড়িয়ে আগে ছাদে দেখলেই হয়ে যেতো।

,

তখন সকাল দশটা। রৌদ্রময় দিনের সাথে সুমধুর ঠাণ্ডা বাতাস। ছাদের পাটাতন হয়ে আছে ভয়াবহ গরম। ছাদঘরের টিনে ঢাকা চালে ঝিলিক দিয়ে উঠছে তীব্র রোদ। এতো রোদের ঝলকানিতে তাকিয়ে থাকা দায়। আকাশ পরিষ্কার। নীল গা জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে টুকরো টুকরো সাদা মেঘনাদ। রাহুল পেছন থেকে গলা পরিষ্কারের শব্দ শুনতে পেলো। সাথে সাথে হাতের সিগারেট টা নিভিয়ে ফেলে দিলো দূরে কোথাও। পুরোটা দেখে নিভার বুক চিরে বেরিয়ে এলো তীব্র হতাশ নিঃশ্বাস সাথে বেরুলো তীব্র জ্বালা। অবাধ্য নির্লজ্জ মনটা বারংবার বলে উঠলো,

'এই অসহায় মানুষটা ভালোবাসে কাউকে। এই দুঃখী চোখগুলো কারোর জন্য বছরের পর বছর স্বপ্ন বুনেছে। এই নিঃসহায় মানুষটা অনেকগুলো বছর পার করে দিয়েছে কারোর পথ চেয়ে।'

নিভার চোখদুটো টলমল করে উঠলো। কেনো যে এই কথাগুলো ভাবলেই তার চোখ জ্বলে, প্রাণ পুড়ে, হৃদয় জ্বলসে বুঝতে পারে না! মানুষ যা চায় প্রকৃতি তা দেয় না বরং যেই জিনিসটার একজন দাবিদার থাকেই সেই জিনিসটার অন্য আরেকজনেরও দাবি থাকতে হবে। এক মানুষকে নিয়ে কেনো এতো কাড়াকাড়ি? ভাবতে ভাবতেই নিভার হঠাৎ মনে হলো,

'কেনো আমাকে নিয়ে কারোর দাবি নেই? অথচ টিকলিকে নিয়ে মরণজনিত অশৌচ দাবিদার দুজন ব্যক্তির।'

ভাবনার ভাটা পরলো তুড়ি বাজিয়ে রাহুলের কথায়, 'ও হ্যালো মিস? কোথায় হারিয়ে গেছেন?'

নিভা সম্ভিত ফিরে অস্বাভাবিক ভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, 'কোত্থাও না। আপনি এ সময় এখানে?'

রাহুল রেলিং এ ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, 'ভাবলাম আপনি চলে যাবেন তাই দেখা করে যাই।'

নিভা অদ্ভুত চোখে তাকালো। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, 'আমার জন্য ছাদে এসেছেন?'

'জি। আপনি কাল বললেন না? আপনি সকালে চলে যাবেন। তাই এসে দাঁড়িয়ে আছি।'

'কতক্ষণ থেকে?'

'সাড়ে আট টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি।'

নিভা অবাক হলো। হঠাৎই সমস্ত গ্লানি হিংসে কষ্ট দূর হয়ে গেলো। মূর্ছা গেলো এতোক্ষণের ভাবনীয় সমস্ত কষ্টকর বাণী। কেবল মনেতে বয়ে গেলো অপার্থিব মেঘের সুর। যেই সুর বাজে না কবু কোথাও। বাজে শুধু সেথা, যেথায় শুধু নিভার অন্তরের অন্তঃস্থল।

'কখন চলে যাবেন? একা যাবেন?'

'এইতো আর কিছুক্ষণ পরই। আর্দ্র ভাইয়া রেখে আসবে।'

এরপর চুপ থাকা হলো। কিছুক্ষণ মুহুর্ত পার হলো শীতল হাওয়ায় উত্তাপ রোদে। রাহুল আচম্বিতে বলল,

'আমার কথা বলার বন্ধু-সঙ্গীটা চলে যাচ্ছে। আমি আবার একা হয়ে যাবো। থেকে যান না? আমার সময় কাটবে না।'

এই মৃদু আর্তনাদ জনিত কথাগুলোয় নিভার গাল বেয়ে টুপ করে পানি পরে গেলো তপ্ত ছাদে। 'কেউ তাকে বন্ধু ভেবে হলেও কাছে চায়। কথা বলতে হলেও সারাক্ষণ চায়।' ভেবেই মন প্রমোদন হৃষ্টতায় তুষ্ট হলো। পুলকিত স্ফুর্তিতে চোখ দুটো তৃপ্ত হলো। সহসা মলিনরুপে পরম যত্নে হেসে উঠলো শুকনো ঠোঁটদুটো। ছাদের একপাশের রৌদ্রস্নাত হাসনাহেনা গাছটা তখনও ঝরাচ্ছিল ফুল। বাতাসে ছড়াচ্ছিলো মিষ্টি সুগন্ধ!

চলবে

Muna hasan, Md zeesahi, Disha moni, Priya halder, Sabbir hosen sumon, Nishad jaman, Sikdar rahat and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Tue Jul 13, 2021 11:26 pm

৪৩.
তখন সকাল এগারোটা। প্রায় হয়ে যাওয়া দুপুরের কড়া উত্তাপ। অবিনশ্বর গরমে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে না চাইতেও টিকলি নিচে নেমে এলো। উদ্দেশ্য এক বোতল ঠান্ডা পানি ঢকঢক করে গিলে কলিজা ঠান্ডা করা। খুব নিরবে লুকিয়ে চুরিয়ে পা পা টিপে টিপে সিড়ি পার করলো যাতে কারোর চোখে না পড়ে। এখন অবধি সে জামিলুর রেজার মুখোমুখি হয়নি। আল্লাহ আল্লাহ করছে যাতে আরো দুই তিনদিন মুখোমুখি হতে না হয়। কিন্তু আশ্চর্য ভাবে শায়লা আক্তারও কিছু বলেনি। ভিষণ অবাক কান্ড!

বসার ঘরে আসতেই দেখা গেলো সোফায় বসে আছে রুহুল হক আর আকিদা হক। টিকলির ভ্রু জোড়া নিজ দায়িত্বে কুচকে গেলো। গোয়েন্দা নজরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই জামিলুর রেজা মেয়েকে দেখে বলে উঠলেন,

'কিরে মা, দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? যা খেতে বস। এখনো তো সকালের খাবার মুখে তুলিস নি।'

এতো কান্ড কীর্তির পর জামিলুর রেজার মধুর ডাক শুনে টিকলির আত্মা রীতিমতো লাফিয়ে উঠলো। বুকের ভেতর থেকে প্রবল শব্দে একটা ঢিপঢিপ আওয়াজ শোনা গেলো। কিছু তো একটা জটলা পাকিয়েছে। আকিদা হক উঠে এসে টিকলিকে জোর করে মিষ্টি খাওয়ালো। কোনোমতে চিবিয়েই গলা দিয়ে মিষ্টি নামিয়ে ফেলল টিকলি। শুকনো ঢোক গিলতেই দেখলো টায়রা নেমে আসছে। টিকলি চোখের ইশারায় বুঝালো, 'কি হচ্ছে?'। টায়রা ঠোঁট উল্টে বুঝালো, 'জানি না।' আকিদা হকের সামনে এসে টায়রা দাঁত বের করে হাসি দিলো। অতি ভক্তির সুরে বলল,

'আরে মামী যে? আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন? কিসের মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন মামী?'

আকিদা হক টায়রার এহেন আচরণে ভীষণ মাত্রায় খুশি হলেন। রীতিমতো খুশিতে গদগদ করতে করতে বললেন, 'আরে টায়রা তুমিও খাও, নাও নাও। একটা দারুন সুখবর আছে।'

টায়রা পুরো মিষ্টি মুখে নিয়ে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকলো। এক পলকে মিষ্টি গলা দিয়ে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,

'বলেন কি মামী? এই বয়সে? শেষ পর্যন্ত এই বয়সে এসে লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে সুখবর নিয়ে আসলেন? এতো বড় ছেলে, ভাগ্নিদের সামনে এসব আস্তাগফিরুল্লাহ মার্কা কাজ করে বসলেন?'

পাশ থেকে টিকলি ফিক করে হেসে দিলো। আকিদা হক কটমট করে তাকিয়ে আরেকটা মিষ্টি পট করে ঢুকিয়ে দিলেন টায়রার মুখে। বড় বড় পা ফেলে আবার গিয়ে সোফায় বসলেন। রুহুল হকের মুখ কোনো কারণে থমথমে এবং চিন্তিত। আকিদা হক সেইরকম হাসি হাসি মুখে বললেন,

'তা দুলাভাই, বিয়ের ডেট টা এবার ফিক্সড করে ফেলা উচিত।'

রুহুল হক চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, 'আগে তো ছেলে মেয়ের অনুমতি নাও।'

আকিদা হক হাত নাড়িয়ে মাছি তাড়াবার ন্যায় বললেন,

'অনুমতি নেওয়ার কি আছে? দুলাভাই তো নিজেই প্রস্তাব দিলেন। তার মানে টিকলির মতামত নিয়েই দিয়েছেন। কি টিকলি তাই তো? আর বাকি রইল রাহুল। রাহুল না করবে না। ফুফি অন্তপ্রাণ বলে কথা!'

শায়লা আক্তার বুক ফুলিয়ে মাথা দুলিয়ে হাসলেন।এরপর আবারো চললো তাদের কথোপকথন। পুরোটা সময় টিকলি নিরব দর্শক হিসেবে সবকিছু শ্রবণ করে গেলো। তার মানে? এরজন্যই কি এতো আদর সোহাগ? এতো তাড়াতাড়ি কীভাবে কি? কি করে এসব হতে পারে? রাহুল ভাইয়া? রাহুল ভাইয়ার সাথে বিয়ে? কীভাবে সম্ভব?
টিকলি কথা বলতে পারছে না। গলা দিয়ে শব্দ বের করে বলতেও পারছে না, 'আমি এই বিয়ে কিছুতেই করবো না।' আকস্মিক ঘটনায় সে যেনো বাক প্রতিবন্ধীর ক্ষমতা লাভ করেছে। বোবা হয়ে গেছে।মুখের বুলি হারিয়ে গেছে প্রবাহমান নদীর কোনো এক তীরে। সাতরে, হাতরে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কানে লেগে যাচ্ছে তালা। লক হয়ে গেছে গলা। শুধু চারিপাশ ঘন কালো অন্ধকার। চারিপাশের নৈঋত আঁধার থেকেই আবছা আলোয় অনেকগুলো কণ্ঠস্বরে প্রতিধ্বনি হয়ে আসছে একটাই কথা, 'এবার তুই কি করবি টিকলি?'

শায়লা আক্তার অতি আদুরে কন্ঠে বললেন, 'এদিকে আয় তো মা।'

টিকলি মায়ের দিকে হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইল। নিষ্প্রাণ চোখ দুটোর কোল ঘেঁষে জল গড়বে গড়বে ভাব। টিকলি আর কারোর কথা শুনলো না। এক ছুটে চলে গেলো উপরের নিজের ঘরে। উপস্থিত সবাই অবাক হলে জামিলুর রেজা জোরপূর্বক হেসে বললেন,

'লজ্জা পেয়েছে।'

,

টিকলি উপরে যেতেই নিভার কল এলো। অবিরাম জলস্রোতের অধিকারী নিষ্প্রভ দু'চোখের চাহনিতে দেখতে লাগলো ফোনের আলো। অনুভূতিহীন কানে শুনতে লাগলো ফোন বাজার শব্দ। বার কয়েক ফোন বেজে কেটে যাওয়ার পর টেক্সট আসলো, 'প্লিজ টিকলি ফোন তোল। আর্জেন্ট দরকার।'

পরেরবার ফোন আসতেই টিকলি ফোন তুলল। স্তব্ধ শ্বাসে কিছু বলার জোগাড় হলো না। হ্যালো হ্যালো বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে নিভা আসল কথা শুরু করলো। নিভার একের পর এক কথা শুনে টিকলির হৃদপিণ্ড যেনো রক্ত সরবরাহ করা বন্ধ করে দিলো। চোখের সামনে দেখতে পেলো অন্ধকার আগামী ভবিষ্যতের কালো ধোঁয়া। একে একে বন্ধ হয়ে যেতে দেখলো সকল পথ। টিকলি কোন পথে এগোবে এবার? কোন রশি ধরে টানবে? কোন রাস্তা ধরে হাটলে সে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাবে?

মিনিট দশেক না গড়াতেই রুহুল হক এবং আকিদা হকদের বিদায় দিয়ে ঘরে হুড়মুড় করে ডুকলেন জামিলুর রেজা, শায়লা আক্তার এবং টায়রা। জামিলুর রেজা নিস্তব্ধ টিকলির পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,

'আর সাতদিন পর তোমার বিয়ে মা।'

তৎক্ষণাৎ টায়রা বিছানার উপর হাটু মেরে বসে আকুতি মিনতি করে বলল,

'বাবা তুমি বুঝতে পারছো না কেনো? রাহুল ভাইয়া...? রাহুল ভাইয়া কেনো? দেশে কি ছেলের অভাব পড়ছে? ওকে আমি সবসময় ভাই ভাই নজরে দেখেছি। হঠাৎ করেই দুলাভাই এ কনভার্ট হই কি করে বলো তো?'

টায়রা কাদো কাদো চোখে তাকিয়ে বলতেই শায়লা আক্তার টায়রার মাথায় গুতা দিয়ে বললেন,

'মনে হচ্ছে বিয়ে ওর না তোর হচ্ছে?'

'উফফ..মা তুমি কথা বলো না তো। তুমি হচ্ছো মেইন কালপ্রিট। তোমারই তো ভাতিজা। তোমার বাপের বাড়ি থেকে সম্বন্ধ এসেছে। মনে মনে নিশ্চয়ই তুমি লুঙ্গি ডান্স দিচ্ছো?'

জামিলুর রেজা গলা পরিষ্কার করে বললেন, 'সম্বন্ধ আমরা দিয়েছি। আর তুমি লাফালাফি কমিয়ে করো। বড় বোনের বিয়ে হবে নাচবে, গাইবে, খাবে, ঘুরবে, দুলাভাই দেখবে শেষ।'

টায়রা যেনো গুপ্তধন পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে আস্তে আস্তে বলল,

'আরে বাবা আমি তো সেটাই বলছি। দুলাভাই দেখবো কীভাবে? এই দুলাভাইকে তো জন্মের পর থেকে দেখছি। এর মধ্যে দিয়ে দুলাভাই দুলাভাই ফিল পাবো না। একটা ইনটেক দুলাভাই চাই।'

'ঠাস করে একটা চর মারবো ফাজিল মেয়ে চুপ থাক।'

মায়ের ধমকে টায়রা মুখ ফুলিয়ে বসলো।

জামিলুর রেজা গম্ভীর গলায় বললেন, 'সাতদিন পর তোমার বিয়ে টিকলি। তৈরি হতে থাকো।'

বাবার কথায় অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে টিকলি মৃদু হাসলো। জামিলুর রেজার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। টিকলি হঠাৎ বাবার কাধে মাথা রাখলো। কম্পমান কণ্ঠস্বরে বলল,

'আমার সাথে এটা তুমি করতে পারো না বাবা। সব জেনেশুনেও কেনো আমাকে আগুনে ফেলে দিচ্ছো?'

জামিলুর রেজা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

'বাবা-মা কখনো সন্তানদের খারাপ চায় না। তারা সবসময় সন্তানের জন্য ভালোটাই করে। আমি তোমাকে কক্ষনো ওই বাড়িতে বিয়ে দিবো না। ও বাড়িতে তুমি সুখী হতে পারবে না।'

চোখমুখ শক্ত করে পাষণ্ডের ন্যায় কথাগুলো বলে জামিলুর রেজা ঘরের বাইরে পা রাখলেন। টিকলি উন্মাদের ন্যায় কেদে উঠলো। শায়লা আক্তার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ভাঙা গলায় বললেন,

'কেনো এরকম করছিস মা? ভুলে যা না ওই ছেলেকে! কি আছে ওখানে?'

টিকলি জবাব দিতে পারলো না বিনিময়ে খামচে ধরলো মায়ের আঁচল। উন্মত্তার ন্যায় কাদতে কাদতে হেচকি উঠে গেলো। ক্ষিপ্ত পাগলামির সুরে বলল,

'আমি পারবো না মা। তাকে ভুলে যাওয়ার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়। বিয়েটা ভেঙে দাও মা। দয়া করো।'

_______________________________

স্বচ্ছ সাদা মেঘের মাঝখানে রাজকীয় ভাবে তাপ বিকিরণ করছে সূর্যিমামা। গরমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃতি শীতল বাতাস বিলাচ্ছে। হালকা বাতাসে সাদা পর্দাগুলোর মৃদু কাঁপাকাঁপি। জানালার পাশেই ক্লান্ত পিপাসায় বসেছিলো দাঁড় কাক। নিভাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ভাইয়ের ঘরে এসে আর্দ্র থমথমে মুখে সেখানেই তাকিয়েছিলো বিছানায় এক কোণায় বসে। পুরো বাড়ি নিরব-নিস্তব্ধ। আদর আধশোয়া হয়ে হাতে একটা পেপার ওয়েট ঘুরাতে ঘুরাতে চিন্তিত মুখে বলল,

'আচ্ছা আর্দ্র, বাবা-মা কি কোনোমতে জেনে গেছে আমরা টিকলি টায়রাকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম?'

আর্দ্র গোমড়া মুখেই জবাব দিলো, 'জানি না।'

কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে আদর আবার বলল,

'আমরা যখন নিঝুম দ্বীপ গেলাম। তখনও তো না বলেই গিয়েছিলাম। এমনকি চার-পাঁচদিন থেকেছিলাম। কই তখন তো এতো রিয়েক্ট করেনি। অথচ এবার একদিনও থাকলাম না তাতেই যেনো বাসায় অগ্নিকাণ্ড লেগে গেলো।'

আর্দ্র ঠোঁট উল্টে দিয়ে বলল, 'আসলেই তো চিন্তার বিষয়।'

তখনি আদরের ফোনটা বেজে উঠলো। ফোন সামনে এনে রাহুলের নাম্বারটা দেখে ভ্রু কুচকে শোয়া থেকে উঠে বসলো। ফোন রিসিভ করে বলল,

'হ্যালো।'

' আসসালামু আলাইকুম ভাই।'

' ওয়ালাইকুম আসসালাম। কি ব্যাপার রাহুল? কোনো সমস্যা?'

'না ভাই।'

'তাহলে হঠাৎ ফোন দিলে যে? বাসায় আসো। এই উপরতলা থেকে নিচ তলায় ফোন দিতে হয় আবার? যখন তখন এসে পড়বে।'

রাহুল মাথা দুলিয়ে হেসে হালকা আওয়াজে বলল,

'ভাই আমার বিয়ে। আপনি আমার খুব কাছের ভাই-ব্রাদার। তাই সবার প্রথম আপনাকে জানালাম।'

আদর হেসে বলল, 'বাহ! ভালো! পেছন থেকে ছক্কা মেরে দিচ্ছো। তা মেয়ে কে?'

'আমার কাজিন। ফুফাতো বোন।'

'ওহ, উইশ ইউ ভেরি গুড লাক। কবে বিয়ে?'

'এইতো ভাই সামনের পনেরো তারিখ। আর সাতদিন পর। আপনার কিন্তু ভাই আসা চাই ই চাই।'

রাহুলের বিয়ের ডেট শুনে আদর চমকালো। চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো। ইচ্ছে করলো দেয়ালে কপাল ঠুকে জিজ্ঞেস করতে, 'ভাই আর ডেট পাস নাই? পনেরো তারিখে কি বের হইছে? সব জায়গায় এতো পনেরো পনেরো কেনো? এই পনেরো আমার জীবনের কাল। মন চায় সবজায়গা থেকে পনেরো নাম্বারটাকে বয়কট করে দেই। শালা!' রাহুল হ্যালো বলতেই আদর সম্ভিত ফিরে হেসে বলল,

'অবশ্যই। কেনো আসবো না? কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ডেট ফাইনাল করে ফেললে। আমি সময় করে উঠতে পারি কিনা বুঝতে পারছি না। মাত্র দুদিন ছুটি নিলাম।'

'না ভাই আসতেই হবে। কোনো ভাবে ম্যানেজ করবেন।'

আরো কিছুক্ষণ কথা বলে আদর ফোন রেখে আর্দ্রের দিকে তাকিয়ে হতাশ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

'রাহুলের বিয়ে। সাতদিন পর। তোরা তো প্রায় সমবয়সী। কি করলি জীবনে? এখনো বিয়ে করতে পারলি না। দেখ তোর আগে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।'

আর্দ্র পিটপিট করে তাকিয়ে বলল, 'নিজেরটা আমার উপর গছিয়ে দিচ্ছো? আমি তো তাও সমবয়সী কিন্তু তুমি তো কম করে হলেও দু-তিন বছরের বড়। তবুও তো বিয়ের ফুল ফুটলো না।'

দ্বিতীয় বার হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে আদর বলল,

'বললাম তো আজ বাসায়। দেখি কি হয়? বিয়ের ফুল ফোটে কিনা? না ফুটলে একাই বিয়ে করে বউ নিয়ে একাই সেটেল হয়ে যাবো।'

বাইরে দাঁড়িয়ে দুই ছেলের সম্পূর্ণ কথোপকথন কানে লাগলো মনোয়ারা খানের। বুকটা তার ধক করে উঠলো। শীঘ্রই কিছু একটা করতে হবে। দুই ছেলেরই মতিগতি তিনি ধরতে পারছেন না। হাব-ভাব ভালো নয়। বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস!

_________________________________

টিকলির যেনো বাকশক্তি, বোধবুদ্ধি, শ্রবণশক্তি সব লোপ পেয়েছে। শূন্যে এক ধ্যানে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে আছে। ঘরের ফ্যান চলছে ফুল স্পিডে তবুও ঘেমে নেয়ে একাকার। টায়রা টিকলির কাধে হাত রেখে বলল,

'আমার মনে হয় তোর উচিত ভাইয়াকে সব বলা।'

টিকলি আহত দৃষ্টিতে টায়রার দিকে তাকিয়ে ভেজা গলায় বলল, 'একটু আগেই নিভা ফোন করেছিলো।'

টায়রা সচেতন দৃষ্টিতে তাকালো, 'কি বলল?'

হা করে মুখভর্তি শ্বাস নিয়ে টিকলি বলল, 'উনার বাড়িতে ঝামেলা হয়েছে। উনি নাকি বাড়িতে বলে দিয়েছেন আমাকে বিয়ে করতে চান। এরপর থেকেই অশান্তি। উনার বাবা মানবে না।'

টায়রা বিরক্তি ঠেলে কপাল চাপড়িয়ে বলল, 'বালের সব ভেজাল একসাথেই লাগে? ভাইয়ার বাসায়ও আজকেই ঝামেলা লাগলো আমাদের বাসায়ও আজকেই তোর বিয়ের কথা উঠল। কাহিনি কি?'

জানালার ফাঁক গলিয়ে আকাশের দিকে তাকালেই বুক চিরে বেরিয়ে এলো কষ্টে ভরা দীর্ঘশ্বাস। অস্ফুট কণ্ঠে টিকলি বলল,

'এমন অবস্থায় আমি কি করে আমার বিয়ের কথা উনাকে বলবো? তারউপর সাতদিন পর বিয়ের ডেট। এ খবর শুনলে উনি...'

টিকলি জোরালো শ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ পর শক্ত মনোবল নিয়ে বলে উঠলো, 'নাহ..আগে আমি চেষ্টা করি। দেখি বিয়েটা ভাঙতে পারি কিনা। বাবা-মার মন গলে কিনা? তারপর উনাকে বলবো। উনার একার দায় তো নয়। সম্পর্ক টাতে আমারও কিছু করণীয় আছে।'

'যা ভালো মনে হবে কর। তবে মনে রাখিস হাতে কিন্তু মাত্র সাতদিন সময়।'

টিকলি মুখে আর কথা বলল না। প্রচন্ড কাদার ফলে ভীষণ রকম মাথা ব্যাথা করছে। মাথা কাজ করার সিস্টেম টা বোধহয় বন্ধ হয়ে গেলো। টিকলি বোধহয় পাগল হয়ে যাবে। পাশ থেকে ফোনটা বেজে উঠলো। দূর্বল হাতে ফোনটা কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ক্লান্ত গলায় কেউ বলল,

'কি করছেন?'

টিকলি যেনো দেহে প্রাণ ফিরে পেলো। চোখ বন্ধ করে শুকনো ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে তৃপ্ততা নিয়ে বলল, 'কিছু না।'

'বাসায় কোনো সমস্যা হয়েছে?'

'না। আপনার বাসায়?'

আদর কিছুক্ষণ থেমে হালকা গলায় উত্তর দিলো, 'না।'

টিকলি নিরবে মৃদু হাসলো। বলল, 'কোনো সমস্যা হয়নি? কেউ কিছুই বলেনি?'

'না। আপনাদের কেউ কিছু বলেনি?'

'নাহ্। কে আর কি বলবে?'

টিকলি দীর্ঘশ্বাস নিলো। আদরের ভ্রু জোড়া কুচকে গেলো। কথায় বলে না চোরে চোরে মাসতুতো ভাই! চোরের মন নাকি চোর বুঝতে পারে কিন্তু ধরতে পারেনা। আদর সন্দেহ কন্ঠে বলল,

'আপনার কণ্ঠটা কেমন যেনো শুনাচ্ছে। এনিথিং রং টিকলি? আপনি কি কেদেছেন?'

টিকলি ঠোঁট চেপে ধরলো। চোখ দিয়ে গড়ালো পানি।শব্দহীন ভাবে কেদে উঠলো। কিছু সময় অতিবাহিত হলো নিরবে। চোখ মুছে নাক টেনে ভাঙা গলায় টিকলি বলল,

'এমনি। শুধু চারিপাশ খুব বিরক্ত লাগছে বুঝলেন ডাক্তার? মনে হচ্ছে আমি কোনো বিষাক্তময় পরিবেশে বাস করি।'

আদর স্মিত হাসলো। বলল,

'মন-মানসিকতা খারাপ থাকলে আশেপাশের সবকিছুই বিরক্তিকর ঘটনা ঘটছে বলে মনে হয় আর এই বিরক্তির তিক্ততা বিচ্ছিন্ন করে তুলে আমাদের আপন মানুষজনদের কাছ থেকে। বিরক্ত দূরে ঠেলে ফেলে দিন টিকলি। শক্ত হয়ে উঠে দাড়ান। কঠোর হন। মনোভাব এমনভাবে সৃষ্টি করুন, আপনার জন্য আপনি সব। আপনার জন্য আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে।'

টিকলি অস্ফুটস্বরে কেদে উঠলো আবারো। মাথা ঝাঁকালো কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলো না। আদর জর্জরিত কণ্ঠে বলল,

'আপনি ঘুমান টিকলি। একটু রেস্ট নিয়ে মাথা ফ্রেশ করুন। আমার কথাগুলো বারবার ভাবুন। ঘুম থেকে উঠার পর যা আপনি চাইছেন কিন্তু তা পাচ্ছেন না তা বারবার আয়নার সামনে গিয়ে বলুন। যেমন, 'আমি টিকলিকে চাই। পৃথিবী ভেঙেচুরে, চূর্ণবিচূর্ণ করে, ধূলিসাৎ করে হলেও আমার তাকেই চাই। একমাত্র তাকেই চাই।' দেখবেন হালকা লাগবে নিজেকে।'

আদরের কথায় যাদুমিশ্রিত কোনো মধু ছিলো। আদরের কথা শুনেই থেমে গেলো টিকলির অশ্রুধারা। বলের মতো মাথায় ঢপ খেতে লাগলো শুধু একটাই কথা, 'আমি টিকলিকে চাই।' বারবার মনেতে বেজে উঠলো সেই কম্পাংক উদ্বিয়মান কণ্ঠস্বর, 'পৃথিবী ভেঙেচুরে, চূর্ণবিচূর্ণ করে, ধূলিসাৎ করে হলেও আমার তাকেই চাই। একমাত্র তাকেই চাই।' যাদুর মতো চট করে টিকলির ভেতরে দৃঢ় এক অদৃশ্য বল চলে এলো। আদরের মতো করে সেও আয়নার সামনে গিয়ে বারবার বলল,

'আমি উনার আছি উনারই থাকবো। পৃথিবী উল্টে যাক, ধ্বংস হয়ে যাক, এফোড়-ওফোড় হয়ে যাক তবুও আমি উনার। উনি আমার। প্রথম জীবনেও উনি আমার শেষ জীবনেও আমি উনার।'

চলবে

Muna hasan, Md zeesahi, Disha moni, Priya halder, Zidan hamid, Afifa Mahmud, Arjju khan and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jul 28, 2021 5:50 pm
মুমুর্ষিরা শাহরীন

৪৪.
বর্ষার গগন শরতের ন্যায় স্বচ্ছ। পেজা তুলোর ন্যায় শুভ্র মেঘের উড়াউড়ি তাতে। প্রকৃতি বিলাচ্ছে ঠান্ডা বৃষ্টি হাওয়া। রাহুল আর নয়ন একসাথে যাচ্ছে গুলশানের বড় আভিজাত্যপূর্ণ রুহুল হকের বাড়িতে। রুহুল হকের করুণ আবদার বিয়েটা যেনো এই বাড়ি থেকেই করা হয়। কিন্তু রাহুল কোনোমতেই রাজি নয়। রুহুল হক তখন বললেন অন্তত আজকের জন্য এসো। দুপুরের খাবারটা খেয়ে চলে যেয়ো। রাহুল বিয়ের আগে আর কোনো ঝামেলা চাইছে না। তাই অগ্যতা তাকে যেতে হচ্ছে সাথে একাকীত্ব দূর করতে নয়নকেও বগলদাবায় করে নিয়ে ছুটে চলেছে। রিক্সা দিয়ে যেতে যেতেই রাহুল খুব প্রফুল্লতার স্বরে বলছিলো,

'জীবনে এই প্রথম বোধ হয় আমি যা চেয়েছি তা পাচ্ছি। বুঝলি নয়ন? আমার খুব খুশি লাগছে। এতোটা খুশি আমি এ জীবনে কক্ষনো হইনি।'

'তাই? তাহলে চল এই খুশিতে একটা দারুণ কাজ করে ফেলি। আমিও বিয়ে করে ফেলি।'

রাহুল মজার ছলে নয়নের পেটে গুতা দিয়ে বলল, 'পছন্দের কেউ আছে?'

'আছে তো। প্রথমদিনই দিল কাইরে নিছে তোর শালী। চল না বন্ধু, একসাথে শুভ কাজটা সেড়ে ফেলি।'

রাহুল চোখ গরম করে তাকালো। ব্যাপক মাত্রায় রাগ দেখিয়ে বলল, 'শালা! নজর ভালো কর। আমার কলিজার বোন লাগে।'

'কলিজার বোনরে তো বিয়ে করতাছো।'

'নাহ, কলিজাকে বিয়ে করছি আর টায়রা আমার কলিজার বোন।'

নয়ন গালে হাত দিয়ে বলল, 'আমি প্রথমে ভেবেছিলাম তোর আর নিভার মধ্যে গিট্টু আছে।'

রাহুল হাত নাড়িয়ে মাছি তাড়াবার ন্যায় বলল, 'নারে! তুই সবসময় বেশি ভাবিস। ওর আর আমার মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু আপসোস আমার সেই খুব ভালো বন্ধুটাকেই আমার এতো খুশির খবরটা দিতে পারছি না।'

'হুম' বলে নয়ন চুপ হয়ে গেলো। রাহুল আবার বলল,

'নাম্বারটা নিয়ে রাখার উচিত ছিলো বুঝলি? বড্ড বড় ভুল করে ফেলেছি।'

,

দুপুরের জবরদস্ত খাওয়া দাওয়ার পর রুহুল হক একা রাহুলকে নিজের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি রুমে ডাকলেন। রাহুল চোখ মুখ শক্ত করে গিয়ে দাড়ালো। রুহুল হক চেয়ারে বসতে বললেন। নির্বাকে রাহুল চেয়ারে বসলো। রুহুল হক কাশলেন, পানি খেলেন এরপর অনেক্ক্ষণ সময় নিয়ে বললেন,

'তো কি ভাবছো?'

রাহুল ভ্রু কুচকে জানতে চাইলো, 'কোন বিষয়ে?'

'বিয়ে করছো। কিন্তু বউকে খাওয়াবে কি? বউকে রাখবে কোথায়? ব্যাচেলর বাসায় তো আর রাখতে পারবে না।'

রাহুল বাকা হেসে বুকে হাত ভাঁজ করে কথা শুনতে লাগলো। রুহুল হক গলা ঝেড়ে বললেন,

'আমার ব্যবসায় বসো। আর কতদিন..'

রুহুল হককে থামিয়ে রাহুল বলল, 'আমার ব্যাপারে আপনার না ভাবলেও চলবে। আমার ব্যাংকে চাকরি হয়েছে। সামনের মাস থেকে জয়েনিং। আর কিছু বলবেন?'

রুহুল হক অবাক হয়ে বললেন, 'কবে হলো?'

'পরসু খবর পেয়েছি।'

'বাহ! একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না?'

'কতকিছুই তো জানেন না। সবাই কি আপনাকে সবকিছু জানিয়ে করছে? এ পৃথিবীর সবকিছু কি আপনার জানা?'

রুহুল হক থতমত খেয়ে স্থিত হলেন। ছেলেটা বড্ড বড় হয়ে গেছে। কি সুন্দর মারপ্যাঁচ দিয়ে কথা বলা শিখেছে! রুহুল হকের ভাবনার মাঝেই রাহুল উঠে চলে যেতে লাগলো। দরজার বাইরে পা রাখার আগেই রুহুল হক বলে উঠলেন,

'শোনো? আমি ইচ্ছে করে আকিদাকে বিয়ে করিনি।'

রাহুল পেছন ঘুরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, 'যেভাবেই হোক করেছেন তো? আমার মায়ের মৃত্যুর চল্লিশ দিন হওয়ার আগেই এই মহিলাকে বিয়ে করে এনেছেন। দিনটা আজও আমার চোখের সামনে ভাসে।'

রুহুল হক ভাবলেশহীন গলায় বললেন, 'তবুও তোমার জানা দরকার। বিয়ে করছো। এখন বড় হয়েছো। সবকিছু জানার দরকার আছে তোমার।'

রাহুল পকেটে হাত দিয়ে দাড়ালো, 'হঠাৎ আজই কেনো মনে হলো আমার সবকিছু জানার দরকার?'

'জানি না। তবে কতকাল আর মনে মিথ্যে গল্প পুষে রাখবে। সত্যিটা জানার দরকার না তোমার?'

রাহুল বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, 'বলুন।'

রুহুল হক হতাশ নিঃশ্বাস ফেললেন। শূন্যে তাকিয়ে করুন গলায় বললেন,

'তুমি তো জানো তোমার মায়ের দু'কূলের কেউ নেই। শুধু ছিলো এক হতদরিদ্র খালা। সেই খালাও আমাদের বিয়ের পর পরই ইন্তেকাল করেন। শুধু রইল খালু। তোমার মায়ের আপন জন বলতে ছিলো সেই খালুই। আকিদা ছিলো তোমার মায়ের সেই খালাতো বোন।'

রাহুলের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। এই কথা তার অজানা ছিলো। সে অবিশ্বাস্য গলায় বলল, 'তাই নাকি? সত্যি?'

'হুম। তোমার মায়ের মৃত্যুর পর তোমার মায়ের গ্রামে গিয়েছিলাম গরিব দুঃখীদের খাওয়াতে। মনে আছে তোমার? সেইখানেই ঘটলো বিপত্তি। সেইদিন রাতে ঝুম বৃষ্টি ছিলো। প্রবল বর্ষন মাথায় নিয়ে আমি রাতে পৌছুলাম তোমার মায়ের খালার বাড়ি। তোমার মায়ের খালার বিয়ে হয়েছিলো পাশাপাশি বাড়িতে। সেই সূত্রে একই গ্রামে থাকা। আমি যখন ওই বাড়িতে পৌছুলাম। দেখলাম চারিপাশে কান্নার রোল। বাড়ি হালকা পাতলা সাজানো। পাঁচ-ছয় জন মানুষ। সেইদিন নাকি আকিদার বিয়ে ছিলো। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। তোমার মা মারা গেছে কিছুদিন হয়েছে। এই অবস্থায় বিয়ে কীভাবে করতে পারে? পরে শুনলাম আকিদার বাবার টাকার অভাব। মেয়ের ভরণপোষণ চালানোর মতোও ক্ষমতা নেই তার। মেয়ে বিয়ে দিবে কিন্তু বরপক্ষের যৌতুক মেটাতে পারেনি বলে বর বিয়ের আসর ছেড়ে চলে গিয়েছে। আমাকে দেখেই আকিদা ঘরে দরজা বন্ধ করে ফাঁস দিতে গেলো। আমি তড়িঘড়ি করে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখি গলায় উড়না পেচিয়েছে। আমি আকিদাকে বাঁচালাম। হতভাগা আমি তখনও জানতাম না এসব ছিলো সাজানো নাটক। আকিদাকে বাঁচানোর পর আকিদার বাবা কান্নাকাটি শুরু করে দিলো তার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি কোনোমতেই বিয়ে করবো না। তখন পাশ থেকে সেই চার-পাঁচটা লোক বলে উঠল, বিয়ে করতে হবে। কুমারী মেয়ের গায়ে হাত দিছেন আবার বিয়ে করবেন না। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমি তো আকিদাকে বাঁচাতেই কোলে করে নামিয়েছি। ওরা কোনো কথাই শুনলো না। তিলকে তাল বানাতে উঠে পরে লাগলো। বলল, 'পাঁচগ্রাম এক করবে। আমাকে জেলে পাঠাবে।' আমার ভয় লাগলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো তোমার মুখটা। আমি জেলে গেলে তোমার কি হবে? তোমার ভবিষ্যতের কি হবে? তুমি তখনো তোমার মায়ের মৃত্যুর ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারো নি। এমন অবস্থায় আমার কিছু হয়ে গেলে তোমাকে কে দেখবে? ওদের চেচাঁমেচিতে আশেপাশে আরো কিছু লোক জড়ো হলো। ব্যাপারটা অনেক জটিল হয়ে গেলো। দুজন লোক আমাকে দুটো ঘুষি পর্যন্ত মেরে দিলো। আকিদা প্রথম থেকে খুব ভালো মেয়ে ছিলো। তোমাকেও খুব আদর করতো। আমি ভাবলাম আকিদাকে বিয়ে করলে তোমার খেদমত করারও মানুষ হবে। শেষে না পেরে আমাকে বাধ্য হয়ে বিয়ে করতে হলো। কিন্তু কে জানতো ভালো মানুষীর আড়ালে যে দুই বাপ বেটি এতো বড় ছক কষে রেখেছিলো। আমি পরে বুঝতে পেরেছিলাম ওরা কোনোদিন তোমার মায়ের ভালো চায়নি। তোমার মায়ের ভালো ওরা সহ্য করতে পারতো না। ওদের ইচ্ছা ছিলো প্রথমেই আকিদার সাথে আমার বিয়ে দেওয়ার। বিশ্বাস করো আমি ইচ্ছে করে বিয়েটা করিনি।'

পুরো কাহিনি শুনে রাহুল ব্যঙ্গাত্মক হেসে বলল, 'এই গল্পগুলো যে বানোয়াট নয় তার কি প্রমাণ?'

রুহুল হক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'বিশ্বাস করা না করা তোমার ব্যাপার। তবে আজ বলতে দ্বিধা নেই আমি তোমার মাকে এখন অবধি ভালোবাসি। প্রচন্ড ভালোবাসি।'

রাহুল অবাক হলো। ভিষণ মাত্রায় অবাকতার সাথে সহসা মনটা হালকা হলো। হঠাৎই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটাকে বাবা বলে সম্বোধন করতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু করা হয়ে উঠলো না। কিছু একটা চেপে ধরলো যার কারনে গলা দিয়ে শব্দ বেরুলো না। ও তাড়াতাড়ি নয়নকে নিয়ে চলে গেলো।

_______________________________

জামিলুর রেজাকে সারাদিন বুঝিয়েও লাভ হলো না। তারা বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসে পরলো টিকলি। তখন প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া অপরাহ্ন। আকাশের দূর সীমানায় ভেসে উঠেছে হলুদ দাগ। জোরালো বাতাস। টিকলি নিষ্ক্রিয় চোখে টায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,

'কি করবো? বাবা-মা তো কোনোমতেই মানতে চাইছে না।'

ভারী নিঃশ্বাস ফেলে টায়রা বলল, 'জানি না। সাতদিন থেকে আজ একদিন চলে গেলো। হাতে সময় আছে মাত্র আর ছয়দিন। কাল পরসু বোধ হয় বিয়ের কেনাকাটাও শুরু হয়ে যাবে।'

'আমি চোখের সামনে অন্ধকার দেখছি টায়রা। আমার বাইরে বের হওয়া একদম বন্ধ। আমি উনার সাথেও দেখা করতে পারছি না। এসব কথা ফোনে বলাও সম্ভব না।'

টায়রা চিন্তিত মুখে বলল, 'আরেকটু চেষ্টা কর। কালকে পর্যন্ত দেখ। যদি কোনো কাজই না হয় তবে ফোনেই ভাইয়াকে সব বলে দিতে হবে। এছাড়া তো আর কোনো উপায় দেখছি না। সব শুনে ভাইয়া কি রিয়েকশন দিবে তাও বুঝতে পারছি না।'

টিকলি হতাশ হয়ে নিরাশ মুখে বসে থাকলো। কিছুক্ষণ পর মাথা উঁচিয়ে বলল,

'নিভাকে একটা ফোন দিবো? ওকে তো কিছুই জানানো হয়নি। দেখি ও যদি কোনো সাজেশন দিতে পারে।'

টায়রা মাথা দুলালো। টিকলি কল লাগালো নিভার নাম্বারে। দু'বার রিং হতেই ওপাশ থেকে বলা হলো,

'কিরে কি খবর?'

'ভালো না।'

নিভা ভ্রু কুচকে বলল, 'ভালো না মানে? কি হয়েছে?'

টিকলির থেকে টায়রা খপ করে ফোনটা নিয়ে বলল, 'টিকলির বিয়ে ঠিক করেছে বাবা-মা। আর ছয়দিন পরেই বিয়ে।'

নিভা হতবাক হয়ে গেলো। বিবেক বুদ্ধি লোপ পেয়েছে এহেন ধারায় অসহযোগ গলায় বলল, 'কি? মজা করতাছস? হঠাৎ বিয়ে? বিয়ে কেনো? তাও এতো তাড়াতাড়ি? পাত্র কে?'

টায়রা চুপ থেকে সময় নিয়ে বলল, 'রাহুল ভাইয়া। এখন তাড়াতাড়ি বিয়ে ভাঙার প্ল্যান দে।'

বাইরে তখন ঝড়ো হাওয়া। বাতাসের উদ্বেগে হেলে পরছে গাছ। ঝড়ছে পাতা। উড়ছে ধূলিকণা। নিভার কানে বজ্রপাতের মতো ঠেকলো কথাটা। স্তব্ধ হাত ঢিল হয়ে কান থেকে ফোন পরে গেলো সাদা মেঝেতে। তড়িৎ অনুপ্রভায় জ্বলসে যাচ্ছে হৃদয়। দানবের ন্যায় ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে বুক। নিভা কথা হারিয়ে ফেলল। এহেন ঘটনার আচম্বিতে সে নির্বাক হয়ে শরীর ছেড়ে বিছানায় বসে পরলো। মনটা রক্তাক্ত হচ্ছে। উত্তাপ হচ্ছে। জ্বলন্ত বহ্নিশিখায় পুড়ছে। নিভার পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। উদ্যমী হয়ে এই কণ্টকিত পৃথিবীকে পুড়িয়ে ছাড় খার করে দেওয়ার অদম্য ইচ্ছে প্রকাশ করছে মস্তিষ্ক। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পরেছে সে। রাগে দুঃখে কষ্টে সে কাদতে পারছে না। ভেতর থেকে নিঃশ্বাসের একটা ফুসফুস শব্দ বেরিয়ে আসছে।
নিভার পেছনে এসে দাড়ালো নিভার মা আমিনা বেগম। নিভা তখনও উদভ্রান্তের মতো বিছানা খামচে ধরে ছিলো। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলো। আমিনা বেগম ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন,

'কি হয়েছে মা?'

নিভার থেকে উত্তর ভেসে এলোনা। তিনি আর ঘাটালেন না। বললেন, 'রেডি হ মা। তোর খালামনি ডেকে পাঠিয়েছে। কিসব জরুরি আলাপ আছে নাকি।'

নিভা চকিতেই মায়ের দিকে তাকালো। উন্মাদের মতো বলল, 'আদর ভাইয়াদের বাসায়?'

'হ্যাঁ।'

নিভা বিরবির করে বলল, 'খালামনির বাসায় যাবো। খালামনির বাসায় আমার যেতে হবে। টিকলির সাথে উনার বিয়ে হতে পারে না। উনার সাথে টিকলি কেনো? কীভাবে সম্ভব?'

_______________________________

দিনের আলো আধারের গহব্বরে হারিয়ে যাওয়ার আগামবার্তা। সন্ধ্যে নামার অপেক্ষা। শেষ আকাশে রক্তিম লাল আভা। আনন্দে ব্যাকুল নিঃশ্বাসের সাথে উত্তালতার ভারী হাওয়া। ওই তো...দূরে দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যাতাঁরা। রাহুল স্মিত হাসলো। ছাদের দরজায় শব্দ হলো। চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই নিভাকে দেখা গেলো। রাহুল অবাক হলো। অভিনবত্ব চোখে তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাস্য গলায় জিজ্ঞেস করলো,

'আপনি?'

রাহুল চোখ কচলালো। আবার তাকিয়ে নিভাকেই আবিষ্কার করে হেসে আশ্চর্য হয়ে বলল, 'হোয়াট আ প্রেজেন্ট সারপ্রাইজ! কালই তো গেলেন। কই বলে যাননি তো আজ আসবেন।'

নিভা কথা বলছে না। অনর্গল ঘেমে চলেছে। সে মুখ হাতরে ঘাম মুছলো। শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। কথা বলতে গিয়ে দেখা গেলো, তার কণ্ঠনালিও ব্যাপক মাত্রায় কাঁপছে। নিভা প্রচ্ছন্ন দৃষ্টিতে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে একটু হতাশা। কিছুটা দিশেহারা।সাথে অনেকটা অসহায়তা। নিভা এলোমেলো পায়ে রাহুলের দিকে এগিয়ে গেলো। সে টলছে যেনো এক্ষুণি পড়ে যাবে। রাহুলের কাছে গিয়ে নিভা টলমলে চোখে তাকালো। বলহীন শরীরে পড়ে যেতে নিলেই রাহুলের কলার খামচে ধরলো। রাহুল নিভাকে ধরে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,

'কি হয়েছে আপনার? নিভা? শরীর খারাপ? কথা বলুন।'

নব্য প্রস্ফুটিত ফুলের ন্যায় নিভা আরক্ত নয়নের সহযোগে তাকালো। রাহুল ভ্রু কুচকে চাইলো। নিভা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ভাঙা গলায় দৈবাৎ বলে উঠলো,

'আমি আপনাকে ভালোবাসি। বিয়ে করবেন না! দয়া করে বিয়েটা ভেঙে দিন।'

রাহুলের কানে বিণৎ অদ্ভুত লাগলো কথাটা। সে বজ্রাহত হলো। তাজ্জব বনে গেলো। বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তার মনে হলো সে ভুল শুনেছে কথাটা কিংবা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানবী তার খুব ভালো বন্ধু নিভা নয়। এ অন্য কোনো অসুস্থ মানবী বা অশরীরী আত্মা যা রাহুলকে ভয় পাওয়া এবং চমকে দেওয়ার মতো অপরিসীম ক্ষমতা রাখে। রাহুল নিভার গালে হালকা থাপড়ে বলল,

'গেট আপ। আপনি কি ঘুমিয়ে আছেন? কি বলছেন এসব নিভা?'

নিভা রাহুলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ভেঙে কেদে দিলো। প্রচন্ডভাবে কামোম্মত্ত হয়ে রাহুলের কলার আরো শক্ত করে চেপে ধরে উচ্চস্বরে বলল,

'কেনো বুঝতে পারছেন না? আমি আপনাকে ভালোবাসি। বুঝার চেষ্টা করুন। কেনো বুঝতে চাইছেন না?'

রাহুলের বুকে মাথা ঠেকালো নিভা। ছন্নছাড়া কান্নায় মজে উঠলো। রাহুলের চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো। কলার থেকে নিভার হাত ছাড়িয়ে নিলো আক্রোশে। রোষ-আগুন চোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

'আমি বিস্মিত! এটা আমি আপনার থেকে আশা করিনি। বন্ধু নামে এতো বড় সুযোগ নিলেন। সব জেনেশুনে আপনি....'

রাহুল আটকে গেলো। প্রচণ্ড রাগে কথা বলতে পারা যাচ্ছে না। চলে গেলো সে তীব্র উষ্মা রাগ দেখিয়ে। জোরে জোরে শব্দ তুলল তার পদধ্বনি। নিভা ভেজা নয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ছাদে বসে পরলো। এখন তাকে দেখাচ্ছে যন্ত্রমানবের মতো। ভঙ্গ হৃদয়ে যেই নারী বসে আছে নিথর দেহে। নিষ্প্রাণ চোখ দুটো দিয়ে গড়াচ্ছে না পানি। মুখে ফুটছে না কোনো বুলি। শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অজানা পথের বাঁকে। নৈরাশ্য তার দু'চোখ। স্ফূর্তি-শূন্য ভালোবাসার ঘড়া। হতোদ্যম এক বুক আশা। মর্মপীড়িত প্রেমিক মন।

চলবে

Rabbykhan, Md Al Jubaer Rabby, Hikmatullah khan, Akaram khan, Md salim bapari, Ahmed ridoy akon, Risbi mahin and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jul 28, 2021 5:50 pm
মুমুর্ষিরা শাহরীন

৪৫.
ছাদের পাটাতনে বসে থাকতে থাকতেই সন্ধ্যা পেরিয়ে রজনীর আগমন ঘটলো। নিস্যন্দ নিশি বেলার ঝিঁঝি পোকাদের কোলাহল। বাতাসের গুঞ্জন। বাদুর পেঁচাদের ডানা ঝাপটানো। নিভা আস্তে করে উঠে দাড়ালো। টলমলে পায়ে ঘরে যেতেই বসার ঘর থেকে ডাক পরলো। নিভা ভালো করে চোখ মুছলো। মুখটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে বসার ঘরে গেলো। নিভাকে দেখেই আর্দ্র চোখ মুখ শক্ত করে উপরে চলে গেলো। চোখে তার ভীষণ রাগ। নিভা প্রশ্নবোধক চোখে মায়ের দিকে তাকাতেই মায়ের থেকে শুনতে পেলো, 'তার এবং আর্দ্রের বিয়ে। ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হবে এবং আগামী শুক্রবার তাদের বিয়ে দিন ঠিক করা হয়েছে।'

নিভা স্তব্ধ হয়ে গেলো। পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো। গোটা আকাশটাএক নিমিষেই ভেঙে পড়লো মাথার উপর। অবিশ্বাস্য চোখে বলল,

'কিহ্?'

আমিনা বেগম এবং মনোয়ারা খান কে ভীষণ
খুশি দেখাচ্ছে। মনোয়ারা খান উঠে এসে নিভার থুতনি ধরে চুমু খেয়ে বললেন,

'আমার অনেক দিনের সাধ ছিলো তোকে এই বাড়ির বউ করবো।'

নিভা কোনো কথা খুঁজে পেলো না। ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে থাকলো প্রাণপ্রিয় খালার দিকে। এ সবকিছুই তার কাছে অপার্থিব ঠেকছে। যেনো এসব ঘটনা মিথ্যে, কাল্পনিক, স্বপ্ন বৈ আর কিছুই না। একটু পরই এই ভয়ংকর স্বপ্ন ভেঙে যাবে। সবকিছু আবার আগের মতোই নিজ গতিতে চলতে থাকবে। একটার পর একটা ভয়ংকর সারপ্রাইজ কি আজ শুধু নিভার জন্যই অপেক্ষা করছিল? নাহ...এসব হয়না। কোনোমতেই হয় না। এ অবাস্তব। অসম্ভব। আদর আর্দ্রকে নিজের ভাই ব্যতীত অন্য কোনো নজরে সে কোনোদিন তাকায় নি। কীভাবে সম্ভব? আর্দ্রর সাথে সে? ছি!

আজিম খান থমথমে গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন। বড় ছেলের আগে ছোট ছেলের বিয়ে ঠিক করা নিতান্তই সমাজ বিরোধী কাজ। কটুক্তিময় কথা শুনারও কাজ। তবুও তিনি নিজ সীদ্ধান্তে অটল। তিনি খবর লাগিয়ে খোঁজ পেয়েছেন জামিলুর রেজার মেয়ে টিকলির বিয়ে আগামী শুক্রবার। তাই আর্দ্রের বিয়েও ঠিক করেছেন বেছে বেছে শুক্রবারে।

আদর সিড়ি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নামছে। নিভার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ গলা চেপে ধরেছে৷ এইতো... এক্ষুণি এক্ষুনি নিভা মারা যাবে। এই ধরণী থেকে তার বিদায়বেলা এসে গেছে। এই বসুন্ধরায় ষাট বছর বাঁচার ইচ্ছেটা বোধহয় তার পূরণ হয়েও হলো না। নিভা রুদ্ধশ্বাসে জড়ানো কণ্ঠে বলল,

'বাসায়.. বাসায় যাবো।'

নিভা আর এক মুহুর্তও দাড়ালো না। কারোর কথা শুনার আগেই এক ছুটে এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।

________________________________

রাতের আকাশে গোল চাঁদ উঠেছে। অজস্র নক্ষত্র তাঁরার ভিড়ে চাঁদমামা বসে আছে রাজা রাজা ভাব নিয়ে। তাঁরাগুলো যেনো তার সৈন্যদল। তার পাহারাদার। সবথেকে বড় তাঁরাটা হলো তার সেনাপতি। তারা চাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে, কোনোভাবেই যেনো অমাবস্যা তাকে ছুতে না পারে। আর চাঁদ নিশ্চিন্তে চারিপাশে বিকোচ্ছে জ্যোৎস্নার আলো। জ্যোৎস্নার সেই কোমল আলোয় টিকলির দখিন মুখী ঘরটা তখন মাখামাখি। দাঁত দিয়ে নখ কামড়িয়ে টিকলি চপল পায়ে ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পায়চারি করছিলো। ভীষণ মাত্রায় অস্থিরতা থেকে বলল,

'আমি কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারছি না টায়রা। আমার মনে হয় উনাকে এখনি জানানো প্রয়োজন। বাবা-মা কোনোমতেই রাজি হচ্ছে না।'

টায়রা কপালে ভাঁজ ফেলে একদিকে তাকিয়ে থাকলো। টায়রার জবাবের অপেক্ষা না করেই টিকলি ফোন লাগালো আদরকে।
টিকলি যখন আদরকে ফোন করায় ব্যস্ত তখন টায়রার ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এলো। টায়রা বিরক্ত মুখে কেটে দিলো। কেটে দেওয়ার দু মিনিট না গড়াতেই আবার ফোন আসলো। টায়রা বারান্দায় চলে গেলো। ফোন রিসিভ করেই প্রথমে ঝাড়ি দিলো,

'এই কোন আবাল রে? ফোন কেটে দেই চোখে দেখোস না? আল্লাহ চোখ দেয় নাই?'

ওপাশ থেকে করুণ স্বরে প্রথম যেই কথাটা ভেসে এলো তাতে টায়রা থমকে গেলো৷ শরীরটা কেমন অসাড় হয়ে এলো। অনুভূতিশূন্য দেহে শুনতে লাগলো তার প্রতিটি কথা।

'টায়রা আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।'

টায়রা ভ্রু বাকালো। ফোন যে আর্দ্র করেছে তা বুঝতে আর বাকি নেই।

'তো? মেয়েদের মতো কথা বলছেন কেনো? বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে বিয়ে করে নিবেন।'

'কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাই না।'

'বিয়ে করতে চান না তো নিজের বাবা-মাকে বলুন। আপনার হয়ে কি এখন আমি বিয়ে ভাঙবো? আর কেনোই বা ভাঙবো?'

'এইসময় ঝগড়া না করলে চলবে না?'

'না চলবে না। কারন আমি তো ঝগড়ুটে চাপাবাজ ফুটা টায়ার ভুলে গেছেন? ভুলে গেলেও সমস্যা নেই মনে করিয়ে দিয়েছি।'

টায়রা আবার বলল, 'এখন আমাকে ফোন দিয়েছেন কেনো? আমি কি আপনাদের সবার হ্যাল্পিং হ্যান্ড? নাকি হ্যাল্পিং সার্ভেন্ট?'

'টায়রা বুঝার চেষ্টা করুন....'

আর্দ্রকে মাঝপথে থামিয়েই টায়রা বলল, 'সত্যি বুঝলাম না বড়টাকে রেখে ছোটটাকে নিয়ে টানাটানি কেনো?'

আর্দ্র এতোক্ষণে সুযোগ পেলো কথা বলার। কাদো কাদো গলায় বলল, 'কিছু করুন না! আমি বাবা মাকে বলেছি। তারা তো ভাইয়ার উপর ক্ষেপে আছে। আমি আরেকবার বললে হতে পারে ধুমধাম করে দু-চারটে লাগিয়ে দিলো।'

টায়রা ভীষণমাত্রায় বিরক্তি নিয়ে বলল, 'ভাই আপনি কি ছেড়া না ছেড়ি? ফ্যাচফ্যাচ করে কাইন্দে আমারে ফোন দিছেন। তারউপর আবার বাপ মায়ের হাতে মাইর খাওয়ার ভয়ও পান। রাখেন তো মিয়া। মেজাজ এমনিতেই হাই লেভেলের গরম আছে।'

আর্দ্র ভ্রু কুচকে বলল, 'ইনসাল্ট করছেন?'

'সন্দেহ আছে? যাক গে, পাত্রী কে? কবে বিয়ে?'

আর্দ্র সময় নিয়ে বলল, 'পাত্রী নিভা। বিয়ে আগামী শুক্রবার।'

টায়রা থমকালো কিছুক্ষণের জন্য। নিস্পন্দ হৃদয়ে শূন্যে তাকিয়ে রইল। খানিক বাদে মৃদুস্বরে হেসে বলল,

'ভালোই তো! বিয়ে করে ফেলুন। সমস্যা কি? অপরিচিত কারোর সাথে তো আর বিয়ে হচ্ছে না।'

আর্দ্র আর কিছু বলার আগেই টায়রা ফোন কাটলো। ফোন কেটেই ঠোঁট চেপে বাইরে তাকিয়ে থাকলো। চারিপাশে জ্যোৎস্নার আলো। রাস্তার ধারে ফ্লুরোসেন্ট এর আলো। আশেপাশের বড় বড় ফ্ল্যাটগুলো থেকে ভেসে আসছে আলো। এতোসব আলোর মাঝেও টায়রার মনে হলো প্রকৃতি আজ বড্ড কালো। চারিদিকে খুব করে আধার নেমেছে। নৈঋতের এই অন্ধকারেই হয়তো হারিয়ে যায় পৃথিবীর কেউ না কেউ। টায়রার মনে হলো হঠাৎ করেই তার বুকে নৃশংসু কষ্টরা দামাল তবলা বাজাচ্ছে। চাপা এক প্রকার কাদতেও ইচ্ছে করছে কিন্তু কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাই কান্না বেরুতে চেয়েও বেরুলো না।

,

আজিম খানের মুখোমুখি বসে প্রচণ্ড আক্রোশে আদর বলল, 'তুমি নাকি আর্দ্রের বিয়ে ঠিক করেছো বাবা? তাও নিভার সাথে?'

আজিম খান অবহেলার সুরে বললেন, 'হুম'

আদর টেবিলে থাবা বসিয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে প্রশ্ন করলো, 'কেনো? ওর বিয়ের বয়স হয়েছে?'

আজিম খান নির্বিকার কন্ঠে বললেন,

'হয়েছে। তোমার ওতো আমার ছেলেকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই।'

আদর তাক লাগা কণ্ঠে বলল, 'ও আমার ভাই!'

আজিম খান পায়ের উপর পা তুলে বসে বললেন,

'আনফরচুনেটলি।'

আদর বিস্ময়তা নিয়ে বলল, 'বাবা...?'

'তুমি বিয়ে করবে না তাহলে তো এবার ছোট ছেলের দিকেই এগোতে হবে তাই না? আর কতদিন তোমার পথ চেয়ে বসে থাকবো? বুড়ো হয়েছি নাতি-নাতনির মুখ দেখতে হবে না?'

আদর দাঁত চেপে রাগ নিয়ন্ত্রিত করে আজিম খানের দিকে তাকালো। বলল, 'এবার বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে বাবা। নিভাকে আমরা আপন বোনের চেয়ে কোনো অংশে কম দেখিনি। তাকে কীভাবে তুমি এ বাড়ির বউ করতে চাও?'

আজিম খান বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। উঁচু গলায় বললেন, 'তোমার কি? তোমার সাথে তো আর বিয়ে হচ্ছে না। নিজেও বিয়ে করবে না অন্যকারোর বিয়েও হতে দিবে না। সমস্যা কি তোমার?'

'আমার অনেক সমস্যা। আর্দ্রর বিয়ে হবে না।'

'দেখি কে আটকায়!'

'ও বিয়ে করবে না।'

'ও করবে না ওর দাদা করবে।'

'ঠিকাছে, তবে তোমার কথাই থাক। আমি দাদুকে ফোন করছি। দাদু এসে নিভাকে বিয়ে করবে।'

আজিম খান ছেলের দিকে কটমট করে তাকালেন। বাপ-ছেলের তর্ক গড়ালো বহুদূর পর্যন্ত। মনোয়ারা খান উপরে গেলেন আর্দ্রের উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখলেন আর্দ্র ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। তিনি আর ঘাটালেন না। চলে আসতে নিলেই শুনতে পেলেন আদরের ঘর থেকে ফোন বাজার শব্দ। মনোয়ারা খান কৌতুহল নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বিছানায় আদরের ফোন পড়ে আছে। তাতে ভেসে উঠছে 'শুকতাঁরার মনতাঁরা।' মনোয়ারা খান বেশ অনেক্ক্ষণ নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

,

টায়রা থমথমে মুখে ঘরে আসতেই টিকলি হতাশ কণ্ঠে বলল, 'উনি তো ফোন ধরলেন না।'

টায়রা গম্ভীর মুখে উত্তর দিলো, 'হয়তো বিজি। পরে ফোন করে নিবে দেখিস।'

'হুম' বলে টিকলি আবার ঘরময় পায়চারি শুরু করলো। খানিক পরে টায়রার দিকে ভ্রু কুচকে বলল,

'কি হইছে? মুখটা ওরম কেনো? মন খারাপ?'

টায়রা মাথা দুলিয়ে না করলো। টিকলি সচেতন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

'কেদেছিস?'

টায়রা চোখ পাকিয়ে বলল, 'কাদবো কেনো?'

'না মানে...' পুরো কথা সম্পন্ন করার আগেই টিকলির ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এলো। টিকলি ফোন কানে ধরে বলল,

'হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?'

'ওয়ালাইকুম আসসালাম। তুমি কি টিকলি রেজা?'

'জি। আপনি?'

'আমি আদরের মা। মনোয়ারা খান।'

টিকলি চোখ বড় বড় করে নাম্বার টায় আরেকবার চোখ বুলালো। কিছুক্ষণ থম মেরে ফোন হাতে দাড়িয়ে থাকলো। ওপাশ থেকে দুই তিনবার হ্যালো বলার পর ভয়ে তোতলানো স্বরে সে বলল,

'জি জি বলুন আন্টি।'

'তুমি আর তোমার বোন কি কাল আমার সাথে দেখা করতে পারবে?'

টিকলি অবাক হলো। তবুও বলল, 'জি চেষ্টা করবো। কোথায়?'

মনোয়ারা খানের থেকে এড্রেস নিয়ে টিকলি ফোন রেখে টায়রার দিকে তাকালো৷ টায়রা ভ্রু কুটি করে জিজ্ঞেস করলো,

'কে?'

'উনার মা।'

'এ্যা?'

'হুম।'

'তোকে ফোন দিছে? নাম্বার কই পাইলো? '

'জানি না।'

'কি বলল?'

'কাল তোকে আর আমাকে দেখা করতে বলল।'

টায়রা চোখ কুচকে বলল, 'তোকে দেখা করতে বলছে ঠিকাছে। কিন্তু আমি কেন? থিওরী টা কি? যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু ঝামেলা দেখতে পাই।'

টিকলি চিন্তিত মুখে বলল, 'সব বাদ দে। আগে এটা বল। আমরা বের হবো কি করে? আমাদের তো বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ। বিকাল চারটায় দেখা করতে বলছে।'

'আগে কাল আসুক। তারপর ভাবি।'

টিকলি টায়রা গভীর চিন্তায় মশগুল হলো। হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখলো অংকই মিলছে না। অগোছালো সবকিছু গোছানোর কোনো পথই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সব চিন্তা ছাপিয়ে একটা কথাই টায়রার মাথায় ঘুরঘুর করছে। অত্যন্ত ক্রোধানলে জ্বলে মন বলছে, 'নিভার বাচ্চা কেমনে ভাদ্র রে বিয়ে করতে রাজি হইলো? তার মানে কি ও আগে থেকে ভাদ্রকে পছন্দ করতো? এর জন্যই এতো ঘেষাঘেষি করতো!'

সমস্ত চিন্তাভাবনা গুলোকে লণ্ডভণ্ড করে দিলো টিকলির ফোন। বাজখাঁই গলায় বেজে উঠলো এই যন্ত্র। টায়রা চমকে উঠে টিকলির দিকে কুশন ছুড়ে বলল,

'বালের এতো ফোন দেয় কে তোরে?'

টিকলি ফিসফিস করে বলল, 'চুপ থাক। উনি ফোন দিয়েছে।'

টায়রা মুখটানা মেরে বলল, 'হুহ..আসছে উনি..। বিয়ে করা জামাইয়ের লগেও মানুষ এম্নে কথা কয় না। তুই যেমন সারাক্ষণ কানের কাছে উনি উনি করস।'

'কানের নিচে চটকানা খাবি।'

'হ। এখন তো আমারেই মারবা। আমি পড়ছি মাইনকা চিপায়।'

'চুপ থাক। উনাকে কি সবকিছু বলবো?'

টায়রা কিছু বলার আগেই টিকলি বলল, 'নাহ থাক। আগে উনার মা কি বলে শুনে আসি। তারপর ধীরে সুস্থে সব বলা যাবে।'

'হুম। বিয়ে করার পরে বইলো আমার কোনো সমস্যা নাই। নো চিন্তা ডো ফুর্তি। তোমার কপাল তুমি নিজে পুড়বা।'

'চুপ থাক তুই।'

'থাকলাম।'

টিকলি ফোন রিসিভ করে বলল, 'কতগুলা ফোন দিলাম কোথায় ছিলেন?'

আদর রাগে দাঁত কিড়িমিড়ি করে বলল, 'আর্দ্রের বিয়ে ঠিক হয়েছে। নিভার সাথে।'

টিকলি আশ্চর্য চোখে অবিশ্বাস্য গলায় বলল, 'হ্যাঁ?'

চলবে

Arbaj khan, Sahin kondokar, Md amanul, Jalsan khan, Faima islam, Rahan balich, Neet kundal and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jul 28, 2021 5:51 pm
মুমুর্ষিরা শাহরীন

৪৬.
ঘড়ির কাটা সাড়ে তিনটের ঘরে। টিকলি টায়রা আস্তে করে নিচে নেমে এলো। জামিলুর রেজা সোফায় বসে সকালের পত্রিকা এখন পড়ছিলেন। টিকলি টায়রাকে কনুই মেরে বলল,

'দুপুরে খাওয়ার পর না বাবা ঘুমায়? আজ এখানে কেনো?'

টায়রা ব্যথা পেয়ে চোখ মুখ কুচকিয়ে বলল, 'আমি জানি বাল। তোরে বাশঁ দেওয়ার জন্য মনে হয় বইসে আছে।'

টিকলি চোখ রাঙানি দিতেই টায়রা ঠেলা দিলো এগোনোর জন্য। পা টিপে টিপে ড্রইংরুম পার হতে না হতেই জামিলুর রেজার গমগমে আওয়াজ শোনা গেলো। টিকলি টায়রা তটস্থ হয়ে চোখ মুখ খিচে দাড়াঁলো। জামিলুর রেজা মেয়েদের সামনে দাঁড়িয়ে জহুরি নজরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো। টায়রা তুতলিয়ে বলল,

'কি কি হয়েছে বাবা?'

জামিলুর রেজা এক ভ্রু উঁচুতে তুলে বললেন, 'কোথায় যাচ্ছো?'

টায়রা উত্তর খুঁজে পেলো না। টিকলিকে চিমটি কাটতেই টিকলি কটমট করে তাকালো। টায়রা কাধ দিয়ে হালকা ধাক্কা দিলো কিছু বলার জন্য। টিকলি বাবার দিকে ঘুরে বলল,

'ওই তো...ওই তো..মানে...আর কি আমরা পার্লারে যাচ্ছিলাম বাবা। হ্যাঁ পার্লারেই তো যাচ্ছিলাম। সামনে আমার বিয়ে তো। একটু সাজুগুজু করতে হবে না? মুখটাকে ফ্রেশ না রাখলে তো সবাই বউ দেখে নাক ছিটকাবে।''

জামিলুর রেজা সোজা হয়ে দাড়ালেন। বিয়ে সম্পর্কে মেয়ের চিন্তা ভাবনার উন্নতি দেখে তার খুশি খুশি লাগলো। তবুও সচেতন দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এই দুপুরে পার্লার কে খোলা রাখে?'

টিকলি হাত মোচড়াতে মোচড়াতে টায়রার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো। টায়রা বলল,

'আরে বাবা, এই পার্লার অনেক নামী দামী তো তাই সবসময় খোলা থাকে। কাস্টমার ডিমান্ড বুঝো না? সারাক্ষণ ভিড় থাকে।'

জামিলুর রেজা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, 'ওহ ভিড় হয়। তাহলে এখন যেতে হবে না। বাইরে কাঠফাটা রোদ্দুর। ঘরে যাও। বিকালে যেও।'

এই বলে জামিলুর রেজা চলে যেতে নিলেই টিকলি টায়রা সমস্বরে চিল্লিয়ে বলল, 'না।'

জামিলুর রেজা থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়ালেন। বোকা বোকা গলায় বললেন, 'কি হলো?'

টিকলি থেমে থেমে বলল, 'আসলে বাবা..হয়েছে কি? আমাদের এ সময় এপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে তো তাই।'

জামিলুর রেজা অবাক গলায় বললেন, 'পার্লারে এপয়েন্টমেন্ট?'

টায়রা বিজ্ঞ সুরে আস্তে গলায় হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল, 'হ্যাঁ বাবা। সেটাই তো বলছি। এখন পার্লারের মালিকের সাথে একটা এপয়েন্টমেন্ট আছে। এপয়েন্টমেন্ট এরপর না পার্লারে ঢুকে ফেসিয়াল আই মিন সাজুগুজু হেন-তেন হাবিজাবি করতে পারবো!'

জামিলুর রেজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'আজকাল পার্লারেও এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে ঢুকতে হয়। দিনকাল কোথায় যাচ্ছে? দেশ আসলেই উন্নতির পথে এগিয়ে গেছে।'

জামিলুর রেজা নিজের ঘরে যেতে যেতে বললেন, 'গাড়ি নিয়ে যেও। আর এক ঘণ্টার ভেতর বাসায় আসা চাই।'

জামিলুর রেজা যেতেই টিকলি টায়রা চাপা সুরে হেসে উঠলো।

,

নামীদামী চাকচিক্যপূর্ণ আড়ম্বরি রেস্টুরেন্ট। মাঝখানে টেবিল। দু'পাশে সোফা। টায়রা মনোয়ারা খানের দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে ছিলো। তার চোখে মুখেই ফুটে উঠেছে এখানে আসার বিরক্তি। টিকলি এক ঝলক মনোয়ারা খানের দিকে তাকিয়ে আবার এদিক ওদিক তাকালো। ভেতরটা অস্বস্তিতে বুঁদ হয়ে রয়েছে। মনোয়ারা খান সৌজন্যে হেসে বললেন,

'কি খাবে বলো?'

টিকলি ভ্রু বাকিয়ে মনোয়ারা খানের দিকে তাকালো। এখানে নিশ্চয়ই আদর যত্ন করে খাওয়ানোর জন্য ডাকা হয়নি। এতো সময় না নিয়ে আসল কথায় আসলেই তো হয়। টিকলি মাথা দুলিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, 'নাহ কিছু খাবো না। আপনি এখানে কেনো ডেকেছেন তা যদি বলতেন-'

মনোয়ারা খান স্মিত হাসলেন। টিকলি চোখ ছোট করে তাকালো। মহিলাটি নিতান্তই সুন্দর এবং আধুনিকা। পড়নে তার ঘিয়া রঙের জামদানী শাড়ির বেগুনি পার। মাথায় বেগুনি হিজাব। তার উঁচু নাক, চড়া কপাল, ভ্রুর নিচে একজোড়া নিঃসহায় চোখ, শ্যামলা মুখশ্রীর নিখুঁত গড়ন। তাকিয়ে থাকতে থাকতে টিকলির মনে হলো, 'আদর ওর মায়ের মতোন দেখতে।'

টায়রা সোফায় হেলান দিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, 'আমাকে কেনো ডাকা হয়েছে আন্টি?'

মনোয়ারা খান একটু নিভলেন টায়রার সরাসরি প্রশ্নে। একটু থেমে অপ্রতিভ গলায় বললেন,

'তোমার সাথে কি আর্দ্রের কথা হয়?'

টিকল বিস্ফোরিত কন্ঠে বলল, 'না না। ওর সাথে আর্দ্র ভাইয়ার কেনো কথা হবে?'

মনোয়ারা খান খানিকটা বিরক্তিতে ভ্রু কুচকালেন,'তুমি অনেক কিছুই জানো না টিকলি। উত্তরটা তোমার বোনকে দিতে বললে ভালো হতো।'

টায়রা অকপটে বলল, 'নাহ কথা হয়না।'

মনোয়ারা খান ভ্রু কুটি করে তাকালেন। টায়রা একটু থেমে শুকনো ঠোঁট জোড়া জিহবা দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে বলল, 'কাল রাতে হয়েছিলো।'

টিকলি অবাক গলায় বলল, 'কাল রাতে হয়েছিলো মানে?'

টায়রার জবাব দেওয়ার আগেই মনোয়ারা খান বললেন, 'আর্দ্রের বিয়ে ঠিক হয়েছে নিভার সাথে। তা জানো?'

টায়রা উত্তর দিলো না। অন্যদিকে তাকালো। সে বুঝে গেছে তার এখানে আসার কারণ। সবার মাঝে টিকলি বলল,

'জি শুনেছি।'

মনোয়ারা খান মাথা দুলালেন। টিকলি আবার বলল, 'কিন্তু আর্দ্র ভাইয়া তো ছোট তার আগে তো।'

'আদর বিয়ে করবে না। এদিকে ওর বাবাও মেনে নিবে না।'

টিকলি থামলো। সহায়হীন চোখে তাকালো মনোয়ারা খানের দিকে। মনোয়ারা খান উঠে এসে দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে টায়রার উদ্দেশ্যে বললেন,

'আমি জানি না আর্দ্রের প্রতি আদেও তোমার কোনো অনুভূতি আছে কিনা। তবে আর্দ্র নিজের আত্মগোপনেই নিজের মনের অনেকটা অংশ জুড়ে তোমার প্রতি গাঢ় অনুভূতি তৈরি করে ফেলেছে।'

টিকলি হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। বিদীর্ণ চোখে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইলেই মনোয়ারা খান হাত জোর করে বললেন,

'আমি তোমার পায়ে পরে বলছি টিকলি, দয়া করে আমার ছেলের জীবন থেকে সরে যাও। আমার সংসার আগুনে জ্বলসে যাচ্ছে। বাবা-ছেলের মাঝে একমাত্র তোমার কারণেই বিবাদ ঘটছে। তোমার কারণে আদর বিয়ে করছে না। তোমার কারণে আদরের বাবা জেদ ধরে ছোট ছেলের আগে বিয়ে দিচ্ছেন। দয়া করো, আমি তো তোমার মায়ের মতোন। সরে যাও আমার ছেলের জীবন থেকে। পরিবারের দোয়া ছাড়া তোমরা কখনো সুখী হবে না। আর তোমাদের বাবারা মরে গেলেও কোনোদিন তোমাদের মানবে না। আমার সংসারটা চূর্ণবিচূর্ণ করো না।'

মনোয়ারা খানের শুষ্ক গাল বেয়ে পড়তে থাকলো নোনা জল। টিকলি স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে মনোয়ারা খানের দিকে তাকিয়ে থাকার কালেই চোখের কোণায় অশ্রুর কুণ্ডলী জমা হলো। আদরকে ভুলে যেতে হবে- এ কথা তো কল্পনাতেও আনা যায় না। আদরকে ভালোবাসার অধিকার তার থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। টিকলির এখন কি করা উচিত? এই জনবহুল রেস্টুরেন্টে প্রেমিকের মায়ের সামনেই হাউমাউ করে কাদা উচিত? তার পা ধরে বলা উচিত- 'আমি আপনাদের দাসী হয়ে থাকবো তবুও এমন করবেন না।' তাহলে কি বলা উচিত? কি বললে আদর-অধিকার শুধু তার হবে?

মনোয়ারা খানের মায়া হলো। তবে তার কিছু করার নেই। তিনি টায়রার দিকে তাকিয়ে কান্নারত অবস্থায় বললেন,

'আমার আর্দ্রটাও ভালো নেই, মা। সরে যাও ওর জীবন থেকে। আর কক্ষনো কথা বলো না ওর সাথে। ওদের নতুন জীবনগুলো নিয়ে ওদের মতো করে থাকতে দাও। আমার সংসারটাকে বাঁচাও তোমরা। আমার ছেলেদের বাঁচতে দেও। সরে যাও তোমরা দুই বোন। দয়া করো, এই অসহায় মা টাকে।'

জগতের কোনোকিছুই যেনো টিকলির কর্ণগোচর হলো না। কানে তালা লেগে গেছে। পু' করে বিকট ধ্বনির এক ধরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। টিকলির মনে হচ্ছে এ সবই অপার্থিব। এসব ঘটছে না। টিকলি কল্পনা করছে। শুধুই কল্পনা। এ সব তার হ্যালুসিনেশন। একটু পর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কয়েক মিনিট গড়িয়ে গেলো কিচ্ছু ঠিক হলো না। যেমন ছিলো তেমনি রইল সব। টিকলির কিছুই বলা হয়ে উঠলো না। হাউমাউ করে কাদা হলো না। পা ধরে অনুনয় সুরে অনুরোধ করা হলো না। স্থিত হয়ে সোফা থেকে উঠে দাড়ালো সে। বাইরে নিজের ঠাট বজায় রাখতে গিয়ে এক ফোটা অশ্রু বিসর্জনও দেওয়া হলো না। দূর্বলতা প্রকাশ করার ইচ্ছে জাগলো না। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো। নিরব গলায় বলল,

'টায়রা চল। বাসায় যেতে হবে তো! বাবা এক ঘন্টার মাঝে বাসায় যেতে বলেছে।'

টায়রা চমক দুটি চোখে টলটলে পায়ে টিকলির সাথে হেটে চলে গেলো। মনোয়ারা খান তখনও হাত জোর করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেয়েগুলো চলে যেতেই তিনি মুখে হাত দিয়ে কাদলেন। তিনি চাননি এই সুন্দর ফুটফুটে মেয়েগুলোর হৃদয়ের গভীরে আঘাত করতে৷ কিন্তু না চাওয়া জিনিস গুলোই চেয়েফেলা হয়। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে, ছেলেমেয়ের দিকে নজর দিয়ে, সুন্দর সংসারটা চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে সেই সংসারের হাল ধরতে নারীগণ অনেক সময় অলৌকিক শক্তি সঞ্চয় করে থাকেন। যেই হাতিয়ার শক্তিটির নাম ধৈর্য্য এবং চোখের অশ্রু।

আদর আর্দ্র যখন গাজীপুর থেকে বাড়ি ফিরে এলো। সকালে ছেলের ঘরে যেতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন ছেলে তার ফোনে টায়রার ছবি দেখছে। কালকে ছেলেকে ডাকার উদ্দেশ্যে ঘরে গিয়ে ফিরে আসার সময় কেদে কেদে ফোনে কথাও বলতে শুনেছেন। আদর বলেছিলো, বউ নিয়ে একাই সেটেল হবে। ঘরের বাইরে থেকে শুনেই মনোয়ারা খানের আত্মা ধক করে উঠেছে। এই এতো জুড় ঝামেলার মাঝে টিকলি টায়রাকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না তার। এখন অপেক্ষা এবং দীর্ঘশ্বাস ব্যতীত আর কিছু করার নেই। সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাক তবুও তার সংসার সুখের থাক। সংসারের জন্য তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বার্থপর হতেও রাজি আছেন। কিন্তু অবুঝ মহিলা এটা বুঝতে পারলেন না এতে তার সংসার আরো জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।

_________________________________

শেষ বিকালের আকাশে এক ঝাকঁ পাখি উড়ে গেলো উত্তর দিকে। উদাস চোখে সাথে বৈরাগী মনে জানালা গলিয়ে সবুজবীথি প্রকৃতি দেখছিলো টিকলি। পাশেই গভীর চিন্তায় টায়রা কপাল কুচকে বসেছিলো। খানিক বাদে এক পলক টিকলির দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরালো। অদ্ভুত! টিকলি কাদছে না। একটা কথাও বলছে না। আশ্চর্য বিষয়! টায়রা যতটা সম্ভব নিজের স্বভাব-সিদ্ধ গলায় বলল,

'হাতে আছে আর মাত্র পাঁচদিন। কি করবি কিছু ভেবেছিস? ভাইয়াকে বলবি না?'

টিকলি উত্তর দিলো না। বিষন্ন মুখটায় যাতনা। চাপা অন্তর্বেদনার ক্লেশ। টায়রা বুঝতে পারছে এই এতো সুন্দর অরঞ্জিত নির্মল মুখটার পেছনের মর্মযন্ত্রণার মনস্তাপ। টায়রা ক্ষোভ ভাব নিয়ে মজা করার চেষ্টা করে এবার বলল,

'সব দোষ ওই আকিদা ভাল্লুকিনীর। ঐ ব্যক্তি প্রথমে রাহুল ভাইয়াকে বিয়ে করার জন্য বাবা-মাকে উসকানি দিয়েছিলো। এই মহিলার মাথায় প্রচুর বুদ্ধি। কুটনি মহিলা। অসহ্য।'

টিকলি স্মিত হাসলো। কি আশ্চর্য ব্যপার! যে যত অন্যের ভুল ধরতে পারে, সমালোচনা করতে পারে, পট পট করে কথা বলতে পারে সমাজের ভাষায় সে তত বুদ্ধিমান। স্বল্পভাষী, অনধিকার চর্চা করে না, কারোর ব্যাপারে মাথা ঘামায় না এমন মানুষগুলোই সামাজিক ভাষায় বোকা। প্রকৃত অর্থে তাদের বুদ্ধি নেই। সহজ ভাষায় বুদ্ধিহীন জীব তারা!

শেষ বিকেল দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। পক্ষীদের নীড়ে ফেরার ব্যস্ততা দেখা গেলো। দূরের আকাশের ডুবন্ত সূর্যের লাল আভা ভেসে উঠলো। প্রকৃতি নীল হতে হতে কালো আধারে ডুব দিলো তবুও টিকলি সেই স্থান থেকে নড়লো না। ঝিম মেরে একই স্থানে বসে রইলো।

রাত তখন আটটা। ফোনটা অনবরত বেজে চলেছে। এক ঝলক ফোনের দিকে তাকাতেই দেখা গেলো 'বাদর ডাক্তার' নাম ভেসে উঠেছে। টিকলি তাকিয়েই থাকলো। সেকেন্ড গড়ালো। মিনিট গড়ালো। পাঁচবার ফোন দেওয়া হয়ে গেলো। এরপর আর ফোন এলো না। মোবাইলের স্কিন কালো হয়ে গেলো। নিস্তব্ধ টিকলি তখনও তাকিয়ে থাকলো বোধবুদ্ধি নেই এমন ধারায়।

,

টিকলিকে ফোনে না পেয়ে আদর ভ্রু কুচকালো। এরকম তো কখনো হয়না। কপালে সূক্ষ্ম কয়েকটা ভাঁজ ফেলে টায়রার নাম্বারে ফোন লাগালো।

টায়রা টিকলির পাশেই বসেছিলো। সবকিছু তার চক্ষুগোচর হয়েছে। আদর যে এবার তাকে ফোন করবে তাও ভেবে রেখেছিলো। মিনিট দুয়েক না গড়াতেই আদরের ফোন পেয়ে টায়রা বারান্দায় চলে গেলো।

'আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। কেমন আছেন?'

'ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি?'

'ভালো আছি।'

'টায়রা, টিকলি কোথায়? ফোন করলাম কিন্তু রিসিভ করলো না।'

'আসলে...'

টায়রার তোতলানো দেখে আদর ভ্রু কুচকে বলল, 'ইজ এভরিথিং অলরাইট?'

টায়রা ইতস্তত করে বলল, 'ভাইয়া, আপনি কি রিয়েক্ট করবেন বুঝতে পারছি না।'

আদরের কেমন যেনো লাগলো। ভীত গলায় বলল,

'টায়রা হেয়ালি করো না। কি হয়েছে বলো?'

টায়রা চোখ মুখ কুচকে বলল, 'টিকলির বিয়ে ঠিক হয়েছে ভাইয়া।'

আদর থমকে গেলো। থমকে দাড়ালো তার ঘোটা পৃথিবী। গোল গোল ঘুরতে লাগলো মাথা। মস্তিষ্কের নিউরন গুলোও অবাক হয়ে উঠে কাজ করা বন্ধ করে দিলো। কেবল বলের মতো ঢপ খেতে লাগলো এই একটি বাক্য, 'টিকলির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।'

আদর শূন্যে দৃষ্টি রেখে বিস্মিত গলায় বলল, 'কি বলছো! বিয়ে ঠিক হয়েছে মানে? কবে? কার সাথে? উনি তো আমাকে কিছু বললেন না। টায়রা তুমি কি আমার সাথে মজা করছো? প্লিজ লক্ষী বোন এরকম মজা করো না।'

টায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'উত্তেজিত হবেন না ভাইয়া। পরিস্থিতি এখন আপনাকেই সামাল দিতে হবে। হাতে আর মাত্র পাঁচদিন সময়।'

আদর রুদ্ধশ্বাসে বলল, 'পাঁচদিন মানে?'

'পাঁচদিন পর টিকলির বিয়ে।'

আদর ক্রুদ্ধ গলায় বলল, 'আর তুমি আমাকে এখন বলছো? উনি কোথায়? আই ওয়ান্ট টু টক টু টিকলি।'

'ভাইয়া আগে আমার পুরো কথাটা শুনুন। টিকলি আপনাকে বলতে চেয়েছিলো কিন্তু..'

আদর অধৈর্য্য গলায় বলল, 'কিন্তু? কিন্তু কি? পাত্র কে? ডিটেইলস দেও।'

টায়রা চোখ বন্ধ করে মিনমিনে গলায় এক নিঃশ্বাসে বলল, 'পাত্র আমাদের মামাতো ভাই। নাম, রাহুল হক।'

আদর ভ্রু বাকালো, 'রাহুল হক মানে? রাহুল হক মানে কি টায়রা?'

'রাহুল হক মানে আমার মামাতো ভাইয়ের নাম।'

'টায়রা আমার মেজাজ গরম। উল্টাপাল্টা কথা বলবা না। কোথায় থাকে এই ব্যক্তি?'

টায়রা কাদো কাদো গলায় বলল, 'আপনার বাসার উপরের তলার রাহুল ই আমাদের মামাতো ভাই। তার সাথেই বিয়ে।'

আদর স্থির কানে শুনলো। শুনা মাত্রই অচল হয়ে এলো হাত পা। যেনো অসাড় হতে লাগলো শরীর। প্রকৃতি হয়ে উঠলো শান্ত নিরব স্তব্ধ। স্থিতিশীল প্রকৃতিতে অদ্ভুত শব্দ করে উড়ে গেলো বাদুর। আকাশে জমাট বাধা কালো মেঘের দল আদরকে উপহাস করলো। কালো অশরীরীর ন্যায় গাছগুলো আদরকে ব্যঙ্গ করলো। ফাঁকা রাস্তাটা পর্যন্ত আদরের সাথে পরিহাস করলো। ঠাট্টা করলো। এ কোন রাহুল? এই রাহুলের বিয়েতেই কি আদর যেতে চেয়েছিলো? এটাই কি সেই রাহুল যাকে সে নিজের ভাইয়ের মতো স্নেহ করতো? এটা কি সেই রাহুল যে আদরকে বড় ভাইয়ের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা করতো! আদরের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো। বিরবির করে অনবরত বলতে থাকলো,

'এসব কি শোনাচ্ছো তুমি টায়রা? এটা কীভাবে হতে পারে? রাহুল তোমাদের মামাতো ভাই? কীভাবে? আমাকে আগে কেনো জানাও নি? বিয়ে ঠিক হয়েছে তবুও আমাকে কেনো জানানো হয়নি?'

টায়রা বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলা শুরু করলো বিকালের ঘটনা। মনোয়ারা খানের কাল কল করা। আজ দেখা করা। আদরের জীবন থেকে টিকলির সরে যেতে বলা সব বলল। সব শুনে আদর পাগলের ন্যায় ছুটে গেলো উপর তলায়। মায়ের সাথে বোঝাপড়াটা পরের জন্য তোলা রইল। এখন রাহুলের সাথে কথা বলা আবশ্যক। কিন্তু উপরে ব্যাচেলর বাসায় গিয়ে জানলো রাহুল বাসায় নেই। ফোন দিলে ফোন বন্ধ আসলো। একবার দুইবার দশবার তবুও একই কণ্ঠ একই কথা, 'আপনার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারটিতে এই মুহুর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন। ধন্যবাদ।'

,

কলিংবেলের শব্দে শায়লা আক্তার সদর দরজা খুললেন। খুলে রাহুলকে দেখে চমকে উঠলেন। পরম যত্নে জড়িয়ে ধরে বললেন,

'বাবা তুই?'

রাহুলের মুখটা থমথমে। কালকের নিভার ঘটানো ঘটনা নিয়ে সে যথেষ্ট গম্ভীর। কোনোমতেই মাথা থেকে নামছে না ব্যাপারগুলো। তাই সেই বাসা ছেড়েই চলে এসেছে। মৃদু হেসে বলল,

'ব্যাচেলর বাসা থেকে বিয়ে করবো নাকি? তাই এসে পড়লাম।'

'ভালো করেছিস বাবা। কি খাবি বল?'

'উমমম.... পোলাও, আলু ভাজি আর কালাভুনা খেতে ইচ্ছে করছে ফুপি।'

চলবে

Arbaj khan, Hikmatullah khan, Md amanul, Ruma islam, Md salim bapari, Ahmed ridoy akon, Feroz hassan and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jul 28, 2021 5:51 pm
মুমুর্ষিরা শাহরীন

৪৭.

পানি খাওয়ার জন্য নিচে নেমে এসে টায়রার চোখ চড়কগাছ। চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলো,

'তুমি?'

রাহুল হেসে বলল, 'হ্যাঁ আমি।'

টায়রা জোরপূর্বক হেসে বলল, 'বউ দেখতে এসেছো?'

'নাহ নিতে এসেছি।'

টায়রা আতংকিত গলায় বলল, 'নিতে এসেছো মানে বিয়ের তো দেরি আছে।'

রাহুল উপরে যেতে যেতে বলল, 'এখান থেকেই বউ নিয়ে যাবো।'

রাহুলের কথা শুনে টায়রা ছুটে গেলো টিকলির কাছে। নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে যেতে না যেতেই রুহুল হকের ফোন এলো। রাহুল বিরক্ত মুখে ফোন রিসিভ করে বলল, 'জি বলুন।'

রুহুল হক দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, 'তুমি ওখানে কি করো? বিয়ের আগে এসব কি রং তামাশা?'

রাহুল দায়সারা জবাব দিলো, 'তাহলে কোথায় থাকবো? ব্যাচেলর বাসা ছেড়ে দিয়েছি। বউ নিয়ে তো আর ব্যাচেলর বাসায় উঠবো না।'

'আমি কি মরে গেছি। কতবার বললাম এ বাড়ি থেকে বিয়ে করতে কথা কানে যায় না তোমার। বিদায়বেলায় বউ নিয়ে কোথায় যাবে?'

রাহুল ভ্রু কুচকে কিছুক্ষণ ভাবলো এরপর আর উত্তর দিলো না। রুহুল হক ক্ষেপা গলায় বললেন, 'এক্ষুনি ও বাড়ি থেকে এ বাড়ি আসো রাহুল।'

রাহুল এক বাক্যে না করলো, 'কক্ষনো না।'

রাহুল থেমে শ্বাস ফেলল বলল, 'আচ্ছা। বিয়ের আগেরদিন আপনার বাড়ি যাবো। এ কয়দিন এখানে থাকি। আপনার বাড়িতে আমার দমবন্ধ লাগে।'

,

সকালে মায়ের মুখোমুখি হয়ে আদর ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো, 'কাল কোথায় গিয়েছিলে মা?'

মনোয়ারা খান অপ্রস্তুত হলেন। অপ্রসন্ন গলায় বললেন, 'কাজে।'

'কি কাজ?'

'ছিলো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ।'

'বলো।'

মনোয়ারা খান আর উত্তর দিলেন না। কাজ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আদর রোষাগ্নি গলায় বলল, ' নিজের ছেলের জীবন নষ্ট করা কি তোমার গুরুত্বপূর্ণ কাজ মা?'

মনোয়ারা খান বিস্ময় দৃষ্টিতে চাইলেন, 'আমি তোমার মা আদর। আমি তোমার জীবন নষ্ট করবো?'

আদর টেবিলে শব্দ করে বলল, 'তাহলে কেনো কাল টিকলির সাথে দেখা করেছো? কেনো ওকে আমার থেকে দূরে যেতে বলেছো?'

মনোয়ারা খানের চোয়াল শক্ত হলো, 'বেশ করেছি। যা করেছি একদম ঠিক করেছি। তোমাদের এসব প্রেম প্রেম খেলার আগে আমার সংসার৷ আমার চোখের সামনে আমার স্বামী কষ্ট পাচ্ছে বড় ছেলের জন্য। কিন্তু ছেলের ধ্যান জ্ঞান ওই এক মেয়ে। কি আছে ওই মেয়ের মাঝে? যখন বিয়ে দিতে চেয়েছিলো তখন তো কত কথা বলেছো! এখন কোন সাহসে ওই মেয়ের হয়ে সাফাই গাইতে আসো?'

আদর চমকিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে উচ্চারণ করলো, 'মা!'

মনোয়ারা খান কঠোর গলায় বললেন, 'আদর এখান থেকে যাও। তুমি নিজে একবার ভেবে দেখো তুমি কেমন মেয়ের প্রেমে পড়েছো। মেয়েটাকে আমি ভেবেছিলাম অন্যরকম। আমি দেখা করেছি আর সে তোমাকে সাথে সাথে বলে দিলো। সে যদি ভালোই হতো, তোমার ভালো চাইতো, সবার কথা চিন্তা করতো, তাহলে নিরবে সরে যেতো। এভাবে তোমার কাছে আমার নামে নালিশ করতো না।'

আদর বিস্ময়কর দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল ক্ষণকাল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই কঠিন মনের মানুষটি যে তার মা তা মানতে আদরের খানিকটা বেগ পেতে হলো। কীভাবে এতোটা কঠোর হতে পারে মা?

'না জেনে কাউকে ব্লেম করা উচিত নয়। কেউ যদি অযথা তোমাকে ব্লেম করে তাহলে তোমার কেমন লাগবে? ভেবে দেখো।'

আদর শক্ত গলায় বলল। চোখের সাদা অংশের আশেপাশে লাল রেখার ছড়াছড়ি। শ্বাস-প্রশ্বাসের ফুসফুস শব্দ ভেসে আসছে। আদর রেগে চলে গেলো নিজের ঘরে।

_______________________________

চারিপাশে ভ্যাপসা গরমের তান্ডব। মাথার উপর তেজস্বী সূর্য। রোদের তাপে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পিচ ঢালা রাস্তা, ফুটপাত। টিকলির শুষ্ক চুলগুলো মৃদু উড়ছে। বড় শপিংমলের এসির নিচে বসে থেকেও গা থেকে অনবরত ঘাম ছুটছে। অপ্রসন্ন চোখে এদিক ওদিক তাকাতেই রাহুলের কথা শোনা গেলো। একটা নীল জামদানী শাড়ি নিয়ে রাহুল বলছে,

'দেখ তো এটা কেমন লাগে?'

টায়রা ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে পাশে বসে ফোন টিপছিলো। এক ঝলক শাড়িটার দিকে তাকিয়েই আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো। বাড়িতে রুহুল হক এসেছেন। এক প্রকার ধমকে জোর জবরদস্তি করে তিনজনকে পাঠানো হয়েছে শপিং এ। বিয়ের আর মাত্র চারদিন বাকি। রাগে টায়রার মাথা ফেটে পরলো। মনে হলো এক্ষুনি রাহুলের নাক বরাবর ঘুষি দিয়ে বিয়ের ভূত মাথা থেকে নামিয়ে দি। রাহুলের আচরণে টিকলি অবাক হলো। রাহুল কীভাবে এতোটা স্মুথলি বিয়ে ব্যাপারটা নিতে পারছে? টিকলি ভাষ্যমতে রাহুল নিজেও কখনো বোনের নজর ছাড়া অন্য নজরে ওর দিকে তাকায়নি। টিকলি চোখ মুখ কুচকে বিদ্বিষ্ট গলায় বলল, 'তোমার যা পছন্দ হয় নাও।'

রাহুল কেমন করে যেনো মাথা ঝাঁকালো। নীল জামদানী শাড়িটা প্যাকেট করতে বলল৷ টিকলির চোখ গেলো শাড়ির স্তূপের নিচে পরে থাকা জলপাই রঙের জামদানী শাড়িটার দিকে। জলপাই রং আদরের খুব পছন্দ। আদর বলেছিলো একদিন, টিকলিকে বিয়েতে জলপাই রঙের শাড়ি পড়িয়ে সাজাবে। শাড়িটা হাতে তুলে নিতেই টিকলির হাত থেকে ছু মেরে রাহুল নিয়ে নিলো। টিকলি হতভম্ব চোখে তাকাতেই রাহুল হেসে অত্যাধিক খুশি গলায় বলল,

'এই শাড়িটা পছন্দ? ভাই এই শাড়িটাও প্যাক করে দিন।'

টিকলির আশ্চর্য ভাব তখন অবধি কাটলো না। হতবুদ্ধির ন্যায় বসে রইল। অতি দুঃখী মানুষরা একটু খুশিতেই পাগল হয়ে যায়। রাহুলের অবস্থাও হয়েছে তেমন। টিকলি রাগে দুঃখে বাইরে চলে এলো। রাগে ফুসতে ফুসতে হাত মোচড়াতে লাগলো। ইচ্ছে করলো হাতের মুঠোয় রাহুলকে পিষে ফেলতে। ফোনে টুং করে শব্দ হলো। টিকলি ক্ষুব্ধ হাতে ফোন বের করতেই দেখলো আদর ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছে। কপালের পাতা কুচকিয়ে ভয়েস মেসেজ ওপেন করতেই শুনা গেলো আদরের কণ্ঠ,

'টিকলি, আমার না অসুখ করেছে! আপনাকে দেখার অসুখ।'

বাতাস থেমে গেলো। রোদের ঝলকানি নরম হলো। সব শূন্যে উঠে লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে লাগলো। মুহুর্তেই অদৃশ্য এক স্তব্ধতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো টিকলিকে। নিশ্চল চোখের কোণায় বিন্দু বিন্দু করে জমতে থাকলো পানি। বুকে জমলো পাহাড় সমান মেঘ। হঠাৎই খেয়াল করলো তার শ্বাস আটকে আসছে। শরীরের ভর ছেড়ে দিচ্ছে। এই কণ্ঠকে ভুলে যাবার মতো ক্ষমতা তার নেই। টিকলি তড়িঘড়ি করে আবার দোকানের ভেতরে পা রাখলো। এখানে আর এক সেকেন্ড থাকতে পারবে না সে৷ টায়রাকে চোখের ইশারায় কিছু বুঝিয়ে রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলল, 'ভাইয়া, আমি বাসায় গেলাম।'

রাহুল তাক লাগা চোখে বলল, 'বাসায় যাবি মানে? মাত্র তো শাড়ি কিনলাম।'

'আমার শরীর ভালো লাগছে না। অস্থির লাগছে এতো মানুষের ভীড়ে।'

রাহুল কথা বাড়ালো না। বলল, 'তাহলে চল আমরাও চলে যাই। পরে আসবোনি।'

টায়রা উচুঁ গলায় বলল, 'না।'

রাহুল টিকলি ভ্রু কুচকে তাকালো। চিৎকারে দোকানদার পর্যন্ত বিহ্বল হয়ে পরলো। আমতা আমতা করে টায়রা বলল,

'না মানে। টিকলি বাসায় গেলেই তো বাবা মা বকা দিবে তারউপর যদি দেখে আমরাও শপিং করা বাদ দিয়ে এসে পরেছি তাহলে তো..'

রাহুল ভাবলো কিছুক্ষণ। টিকলি মাথা নাড়িয়ে বলল, 'হ্যাঁ টায়রা তো ঠিকই বলেছে।'

'আচ্ছা সাবধানে যাস।'

,

একটু আগের প্রবল রোদখানি এখন নেই। তেজস্বী সূর্য ঢাকা পড়েছে মেঘের আড়ালে। চারিপাশে ঠান্ডা বাতাস। নৃত্য করতে করতে হেলে পরছে বৃক্ষসমাজ। টিকলি ফুটপাতের ব্যস্ত পায়ের সমাচারে পিষ্ট হয়ে ধীর পায়ে হেটে যাচ্ছে। গাল ভিজে উঠেছে তপ্ত নোনা জলে। ফুটপাত ছেড়ে নিচে নেমে এলো সে। হেটে হেটে অনেকখানি দূরে এসে পরেছে। জনসমাগমহীন রাস্তার বাকল ধরে যেতেই কেউ হেচকা টানে গাড়ির পেছনের সিটে তুলে নিলো। টিকলি চিৎকার দিয়ে উঠতে নিলেই আগুন্তকঃ টিকলির দু' হাত চেপে ধরলো। টিকলি বার কয়েক পলক ফেলে আদরকে দেখে রাগীস্বরে বলল,

'আপনি? এভাবে কেউ টেনে ধরে?'

আদর দ্বিগুন তেজ দেখিয়ে বলল, 'আমার ফোন কেনো তুলছেন না?'

টিকলি নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলো, 'ভালো লাগছিলো না তাই?'

আদর আরো জোরে চেপে ধরলো টিকলির হাত। ব্যথায় চোখ মুখ কুচকে ফেলল টিকলি। আদর টিকলির দিকে ঝুঁকে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'আপনার সাহস তো কম না৷ বিয়ের শপিং করতে এসেছেন।'

আদরের থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা চালানো হলো কয়েকবার। বার বার ব্যর্থ হয়ে ক্লান্ত মাথা সিটে হেলান দিলো টিকলি। তখন চারিপাশে ঝুমঝুম করে নেমেছে বৃষ্টির সৈন্যদল। তাদের প্রধান কাজ হলো ভিজিয়ে দেওয়া। কিন্তু আসল কাজ হলো কারোর মন ভালো করা, কারোর মন খারাপ করা কিংবা কারোর বিরক্তির কারণ হওয়া। আদর গাড়ির জানালা আটকে বলল,

'আপনার মনে আছে টিকলি, আমি প্রথম কি বলে আমার অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলাম?'

টিকলি হালকা করে মাথা দুলিয়ে বলল, 'In the end of rain, the love is beginning.'

আদর স্মিত হেসে বাইরের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো, 'দেখুন আজও বৃষ্টি পড়ছে। একটু পর থেমে যাবে। ভালোবাসার সূচনা ঘটবে।'

বন্ধ চোখের পাতা মৃদু কেপে উঠলো। আদর অসহায় কণ্ঠে বলল, 'আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন কোনো পরিস্থিতিতে আমার থেকে দূরে সরে যাবেন না।'

টিকলি আদরের বুকে হালকা করে মাথা রাখলো। অপ্রতুল গলায় বলল, 'সরি।'

আদর পরম যত্নে টিকলির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, 'আমি রাহুলের সাথে কথা বলতে চাই।'

টিকলি মাথা উঠালো। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলো। আদর টিকলির ফোনের দিকে ইশারা করে বলল, 'নাম্বার দিন। আমি সব জানি। টায়রা কাল সব বলেছে।'

টিকলি আদরকে নাম্বার দিলো। আদর ভ্রু কুচকে বলল, 'এই নাম্বার তো আমার কাছেও আছে। কিন্তু বন্ধ।'

টিকলি চিন্তিত মুখে বলল, 'বন্ধ? কই দেখি।'

টিকলি ফোন দিলো। যথারীতি ফোন বন্ধ এলো। টিকলি হতাশ নিঃশ্বাসে বলল, 'বন্ধ। নাম্বার বোধহয় চেঞ্জ করেছে। নাহলে রাহুল ভাইয়ার ফোন কখনো বন্ধ থাকেনা।'

আদর সিটে বাড়ি মেরে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বলল, 'এখনি সিম পাল্টাতে হলো।'

টিকলি অসংলগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদর টিকলির গালে হাত রেখে বলল, 'কান্নাকাটি করবেন না। আমি আছি তো!'

টিকলি আদরের হাতের উপর হাত রেখে ভরসায় সুরে বলল, 'হুম।'

আদর টিকলির দিকে গভীর প্রেম নয়নে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। হঠাৎ টিকলির কপালে চুমু দিয়ে বলল, 'আজও একটা টিকলির অভাবে চুমু সম্পূর্ণ হলো না।'

টিকলি তৃপ্তি নিয়ে হাসলো। ফিসফিস করে বলল, 'আপনার স্পর্শ এমন কেনো বাদঁর সাহেব? বিষের চেয়েও জ্বালাধরণকারী!'

আদর টিকলির কপালের সাথে কপাল ঠেকালো। ভারী নিঃশ্বাসে বলল, 'আমি আপনাকে সবরকম আদর দিতে চাই টিকলি। যেনো আদরের আদরে বিষের ব্যথায় চেয়েও ভয়ংকর জ্বালায় আপনি লাল নীল বর্ণ ধারণ করেন।'

'এতো প্রেম সইবে আমার কপালে?'

আদর ঠোঁটের কোণায় মুচকি হাসি একেঁ বলল, 'মুন্সিগঞ্জের একটা দারুন সুন্দর জায়গা আছে। জায়গাটির নাম মোল্লারচর।'

টিকলি দুষ্টুমি করে বলল, 'এই ব্যাদনার সময়ে তবে আনন্দদায়ক ভাবে একটু ঘুরাঘুরি নামক নীল ব্যথা তৈরি করা যাক!'

আদর ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বলল, 'যাক। আমার কোনো সমস্যা নেই।'

,

টায়রা রাহুল ফিরলো দুপুরের দিকে। ভিজে জুবুথুবু হয়ে। শপিং ব্যাগ গুলোও অর্ধেক ভিজে গেছে। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকেই সোফায় আকিদা বেগমকে বসে থাকতে দেখা গেলো। রাহুল মাথার চুল ঝেড়ে ভ্রু কুচকে তাকালো। আকিদা হক উঠে এসে পেছনে উকিঁঝুঁকি দিয়ে একবার শপিং ব্যাগগুলোর দিকে তাকালেন। সন্দেহান গলায় বললেন,

'টিকলি কোথায়?'

পেছনেই শায়লা আক্তার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার পেছনের সোফায় জামিলুর রেজা বসে কিছু একটা আন্দাজ করে টায়রার দিকে আগুন গরম চোখে তাকালেন। টায়রা একটু মিইয়ে গেলো। তার এই ধুরন্ধর বাপের চোখে ফাঁকি দেওয়া বহুত কঠিন। রাহুল অবাক হয়ে বলল, 'টিকলি বাড়ি ফিরে নাই?

আকিদা হক ভ্রু জোড়া উঁচু করে তাকিয়ে বললেন, 'বাড়ি ফিরে নাই মানে? তোমাদের সাথে গেলো, তোমাদের সাথেই তো বাড়ি ফেরার কথা।'

রাহুল অপ্রস্তুত চোখে টায়রার দিকে তাকালো। টায়রা কি বলবে মুহুর্তের মাঝে বুঝে উঠতে পারলো না। মেয়েকে চুপ থাকতে দেখে জামিলুর রেজা আরো নিশ্চিত হলেন যে টিকলি আদরের সাথে গেছে। টায়রা মিনমিন করে বলতে ধরলেই চট করে মাথায় বানোয়াট কথারা ধরা দিলো। ও হেসে দাঁত বের করে বলল,

'ও তো একটা বান্ধবীকে ইনভাইট করতে গিয়েছে। আমাদের খুব কাছের বান্ধবী তো বাসায় গিয়ে ইনভাইট না করলে বেচারা দুঃখ পাবে।'

জামিলুর রেজা এতোক্ষণে মুখ খুললেন। গমগমে আওয়াজে বললেন, 'বান্ধবীর নাম্বার দেও। আমি তার সাথে কথা বলবো।'

টায়রা মিনমিন করে বলল, 'বাবা টিকলিকে ফোন করলেই তো হয়।'

জামিলুর রেজা ধমকে বললেন, 'দাড়িঁয়ে আছো কেনো? নাম্বার দিয়ে যেতে বলেছি।'

টায়রা নাম্বার দিলো। জামিলুর রেজা লাউডস্পিকার অন করে ফোন কানে ধরলেন। দু'বার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ফ্যাসফ্যাসে গলায় কেউ বলে উঠলো,

'বল। কি অবস্থা?'

রাহুলের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। চমকে জামিলুর রেজার কানে ধরা ফোনের দিকে তাকালো। জামিলুর রেজা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

'আমি টায়রার বাবা।'

নিভা দাঁত দিয়ে জিহবা কাটলো। ব্যাস্ত কণ্ঠে বলল, 'আসসালামু আলাইকুম আংকেল।'

'ওয়ালাইকুম আসসালাম।'

জামিলুর রেজা বাড়তি কথায় গেলেন না। সরাসরি প্রশ্ন করলেন, 'টিকলি কি তোমার ওখানে?'

নিভা বুঝতে পারলো কোনো কিছু ঘাপলা আছে। তা নাহলে টিকলিকে ফোন না দিয়ে নিভাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করা হতো না টিকলি কোথায় এবং টায়রার ফোন দিয়েও জামিলুর রেজা ফোন করতেন না। নিভা খানিকক্ষণ ভেবে ধীরে ধীরে উত্তর দিলো,

'জি আংকেল। আমাদের বাসায় এসেছে।'

'ঠিকাছে, ওকে একটু দেও।'

এ কথা শুনে নিভা কি বলবে ভেবে পেলো না। নখ কামড়াতে কামড়াতে হঠাৎ অভিনয় শুরু করলো,

'হ্যালো হ্যালো। হ্যালো আংকেল শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো৷ মরার ফোন খালি ডিস্টার্ব দেয়। নেট পাচ্ছে না আংকেল। আরেকবার বলুন। হ্যালো। আংকেল টিকলি ওয়াশরুমে গিয়েছে। আমাদের বাসায় এসেই পেট ভরে খেয়েছে তো। তাই প্রাকৃতিক কাজ সাড়তে গেছে। ও এলে আমি আপনাকে ফোন করতে বলবো। হ্যালো আংকেল শুনতে পাচ্ছেন। শালার ফোন!'

জামিলুর রেজা অপ্রস্তুত হয়ে ফোন কেটে দিলেন। টায়রার দিকে ফোন এগিয়ে দিলেন। তার মনে খটকা টা রয়েই গেলো। সচেতন দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ টায়রার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেলেন তিনি। রাহুলও তড়িঘড়ি করে উপরে চলে গেলো। সবাই যেতেই আকিদা হক ভ্রু নাচিয়ে বলল,

'ঘটনা কি খুলে বলো তো টায়রা!'

টায়রা কিছু বলতে চেয়েও বলল না। শয়তানি হাসি দিয়ে ক্রমাগত ভ্রু নাচিয়ে আকিদা হকের দিকে তাকিয়ে বলল,

'ঘটনা হলো আমি আপনাকে নিয়ে দারুন একটা ছন্দ বানিয়ে ফেলেছি। হাউ টেলেন্টেড আই এম!'

আকিদা হক খুশিতে গদগদ করে বললেন, 'তাই? আমাকে নিয়ে ছন্দ? শুনাও। শুনাও।'

টায়রা বলতে গিয়ে আবার চুপ হয়ে গেলো। বিষন্ন ভাব ধরে বলল, 'না থাক বলবো না। কারণ ছন্দতে আপনার নাম মুখে আনতে হবে। তুই করেও ডাকতে হতে পারে। আপনি আমার এতো প্রিয় একজন ভাল্লু...না মানে এতো প্রিয় একজন পছন্দের মামী। আপনার সাথে আমি বেয়াদবি করতে পারিনা। ছি ছি ছি! তওবা! তওবা!'

আকিদা হক টায়রার এমন ব্যবহারে ভাব নিয়ে দাঁড়ালেন। খুশিতে আকাশে উড়তে উড়তে বললেন, 'আরে বলো আমি কিছু মনে করবো না। এই প্রথম আমাকে নিয়ে কেউ ছন্দ লিখেছে। এ তো আমার জন্য বিরাট খুশির সংবাদ।'

টায়রা মাথা দুলিয়ে বলল, 'তাহলে বলি। আপনি আবার রাগ করবেন না।'

গলা উঁচিয়ে ধমকে টায়রা বলা শুরু করলো,

"এই আকিদা, ওইদিকে তাকা।
দা দিয়ে কেটে দিবো তোর পা আর কাল্লা।
তাড়াতাড়ি তোর এই নাম পাল্টা।
এই আকিদা, গরু কেটে করে ফেল তোর আকিকা।"

আকিদা হক চোখ বন্ধ করে খুব উৎসাহ নিয়ে ছন্দ শুনছিলেন। টায়রা এই সুযোগে পা টিপে টিপে স্থান থেকে সরে এক দৌড়ে ঘরে চলে গেলো। ছন্দ শেষ হতেই তিনি টপাস করে চোখ খুলে আহাম্মক এর মতো সামনে তাকিয়ে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর গগনবিদারী চিৎকার দিলেন, 'টায়...রা........।'

চলবে

Sahin kondokar, Akaram khan, Jalsan khan, Risbi mahin, Afrin kalam, Hafeez khan, Neet kundal and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Wed Jul 28, 2021 5:52 pm
মুমুর্ষিরা শাহরীন

৪৮.
রাহুল ইটের রাস্তা দিয়ে নির্বিকারভাবে হেঁটে আসছিলো। দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো রাস্তায় ছায়ার যোগানদাতা। বাহারি পাতাগুলো সকালের নরম রোদ আর নির্মল হাওয়ার সাথে দুলতে দুলতে রাস্তায় নানান ধরের নকশা আঁকছে। আকাশ ফেটে আসা তপ্ত রোদের ভ্যাপসা গরম। আচমকা রাহুল সামনে আর্দ্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। খানিকটা চমকে মুখটাকে নিচে নামিয়ে এগিয়ে যেতেই আর্দ্র রাহুলের কাধ চাপড়ে বলল,

'কি ভাই? কি খবর? বিয়ে করে নিচ্ছো? সাথে আবার হুটহাট বাসাটাও ছেড়ে দিলে। যাওয়ার আগে দেখাটা পর্যন্ত করে গেলে না।'

রাহুল শুকনো ঠোঁট দুটো ভিজালো। নিভার জন্যই তো এতোসব কাণ্ড। রাহুল উল্টে প্রশ্ন করলো, 'তুমি এখানে যে?'

আর্দ্র খুব জোরে শ্বাস ফেলল। বলল, 'সামনে আমার বিয়ে। মা-বাবা এসেছে শপিং করতে। সাথে বগলদাবা করে আমাকেও নিয়ে এলো। বুঝলে আজকালকার দিনে ছেলেমেয়ের ইচ্ছের কোনো মূল্যই নেই।'

রাহুলের চোখ ফেটে বেরুতে চাইলো। অবাক গলায় বলল, 'তোমার বিয়ে? আদর ভাইকে ছেড়ে তোমার বিয়ে?'

আর্দ্র দ্বিতীয় বার জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আকাশের দিকে মুখ করে তাকালো। খানিক বাদে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। থুতনি'টা কেঁপে কেঁপে উঠলো। রাহুল আর্দ্রর কাধে হাত রেখে বলল, 'কার সাথে বিয়ে হচ্ছে তোমার? আর কবে বিয়ে?'

আর্দ্র হাত চোখের উপর রাখলো। কিছুক্ষণ পর সরিয়ে বলল, 'তিনদিন পর৷ সামনের শুক্রবার। তোমাকে দাওয়াত দেইনি কারণ সেদিন তোমারও বিয়ে। তুমি নিজেই উল্টে দাওয়াত দিয়ে রেখেছো। আর দাওয়াত দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে আমি নেই। তবুও পারলে এসো।'

শেষের কথাগুলোর মুচকি হাসিতে আর্দ্রর ভেতরের কষ্ট গুলো দৃশ্যমান হলো। রাহুল মাথা দুলিয়ে বলল, 'পাত্রীর নাম কি ভাই?'

আর্দ্র উদাস কণ্ঠে বলল, 'নিভা ইয়াসমিন। আমার খালাতো বোন। চেনো নিশ্চয়ই? চেনার কথা তো!'

রাহুল চমকে উঠলো। বুকের ভেতর কি যেনো ধক করে উঠলো। আত্মা কাঁপলো। এরপর অবাক গলায় বলল, 'নিভার বিয়ে? তোমারও বিয়ে? তোমাদের দুজনের একসাথে বিয়ে?'

,

টিকলি হাত মোচড়াতে মোচড়াতে টায়রার পাশে বসে বলল, 'যাহ তো টায়রা। খবর লাগা তো। রাহুল ভাইয়া কি নাম্বার চেঞ্জ করেছে নাকি?'

দুপুরের খাওয়া শেষে অলস শরীরে শুয়েছিলো টায়রা। টিকলির কথায় যারপরনাই বিরক্ত হলো। টিকলি অস্থির হয়ে উঠলো, 'যা না! আর তিনদিন পর বিয়ে। কি করবো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।'

টায়রা ঘুমের ভান ধরে বলল, 'পরে যাবো।'

'এক থাপ্পড়ে সব দাঁত ফেলে দিবো। আমার এদিকে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আর তুই পরে আছোস তোর ঘুম নিয়ে?'

টায়রা বড় একটা হাই তুলে মুখ হামলাতে হামলাতে বলল, 'আমার বদলে তুই গেলে বেশি ভালো হবে। রাহুল ভাইয়া বোধ হয় ছাদে। এই ছেলে বেশিরভাগ সময় ছাদে থাকে। নিভাও বলেছিলো একদিন।'

টিকলি ভ্রু কুচকে তাকালো। নিভা আজ সকালে একবার এসেছিলো। রাহুল এ বাড়িতে থাকে শুনেই চমকে উঠলো। চোখ জোড়া টলমল করে উঠলো তার। আধ ঘন্টাও বসে থাকলো না। চলে গেলো। টায়রা তখন বাড়িতে ছিলো না। রাহুলও বাড়িতে ছিলো না। শুধু ছিলো একা টিকলি।

টিকলি সব ভাবনা একদিকে ফেলে ছাদের দিকে ছুটলো। রাহুল ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকঁছিলো। টিকলিকে দেখে সে হাসলো কিন্তু হাত থেকে সিগারেট ফেলল না। কি আশ্চর্য! অথচ নিভাকে দেখলে সে তড়িঘড়ি করে ফেলে দিতো। অবশ্য টিকলি আগে থেকে জানে রাহুল সিগারেট খায়। কিন্তু তবুও যাকে দেখে তার ভয় পেয়ে সিগারেট ফেলে দেওয়ার কথা তাকে দেখেই ফেলল না। যাক গে, এসব এতো ভেবে কাজ নেই। এক একজনের প্রতি এক একরকমের সম্মান। নিভার সাথে রাহুলের টিকলির মতো ঘনিষ্ঠতা ছিলো না বলেই হয়তো সামনে সিগারেট খেতে জড়তা কাজ করতো। টিকলি ইতস্তত করে বলল,

'ভাইয়া?'

রাহুল হেসে বলল, 'হুম বল।'

টিকলি তৎক্ষণাৎ কথা খুঁজে পেলো না। কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে শুকনো ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে বলল, 'বলছিলাম...বলছিলাম যে তুমি আজ সকালে কোথায় গিয়েছিলে? ফোন দিয়েছিলাম। কিন্তু ফোন বন্ধ এলো।'

দু'আঙ্গুলের ফাঁকে পোড়া ঠোঁটে সিগারেট ফুকতে ফুকতে রাহুল আস্তেধীরে জবাব দিলো, 'সকালে একটা কাজে গিয়েছিলাম। ছাত্রদের আর পড়াবো না বলে না করে দিয়ে আসলাম। সাথে আবার রাস্তায় আর্দ্রর সাথেও দেখা হলো। আর ফোনের সিম চেঞ্জ করেছি। পুরোনো সব জিনিস বাতিলের খাতায় নাম লেখাচ্ছি।'

টিকলি চমকে বলল, 'কি বলো! আর্দ্র ভাইয়ার সাথে দেখা হয়েছিল? কি বলল?'

'তেমন কিছুই না। শুনলাম ওর নাকি বিয়ে তাও আদর ভাইয়ার আগে। আমাদের যেদিন বিয়ে সেই একই দিনে বিয়ে।'

টিকলি এই সম্পর্কে আর কিছু বলল না। জড়তা নিয়ে চাইলো, 'তোমার নাম্বারটা দেও ভাইয়া।'

রাহুল নাম্বার দিলো। টিকলি নাম্বার নিয়ে নিশ্চুপে চলে যেতে গেলেই আবার ঘুরে দাঁড়ালো। ভাবলো, ও নিজে কি রাহুলকে সবটা বলে দিবে? পরক্ষণেই চিন্তা করলো থাক আগে আদর কথা বলুক। ভ্রু কুচকে টিকলি প্রশ্ন করলো,

'তুমি এতো ইজি কীভাবে? আমাকে বিয়ে করায় তোমার মত আছে?'

রাহুল টিকলির চোখের দিকে তাকালো। চোখের তাঁরায় তার জন্য কিছু খুঁজে না পেয়ে আবারো চোখ সরিয়ে নিলো। টিকলি অনেক্ক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো৷ রাহুলের থেকে উত্তর না পেয়ে চলে যেতে নিলো। রাহুল চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস আটকে তৃপ্তি নিয়ে বলল,

'আজ পর্যন্ত বলা হয়নি। আমি এই তুই নামের ভেবলি টাকে খুব ভালোবাসি। অনেক ছোটবেলায় থেকে তুই যখন আমার কাছে এসে আধো আধো গলায় বিচার দিতি , টায়রা তোর চকলেট খেয়ে ফেলেছে। সেই আধো আধো গলায় কথা বলা থেকে ভালোবাসি। কক্ষনো না কাঁদা তুই হঠাৎ বিশাল আকারে আয়োজন করে ঠোঁট চোখ ফুলিয়ে কেঁদে বন্যা বইয়ে দেওয়ার পানি গুলোকে ভালোবাসি। তোর শব্দবিহীন জটিল হাসিগুলোর ডঙ্কার কে আমি অনেক ছোটোবেলা থেকেই ভালোবাসি...!

টিকলি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো। চোখে বিস্ময়তার মেলা। চোখের ভাঁজে ভাঁজে অনুতাপ, অসহায়ত্ব। থুতনিতে কাঁপন৷ সে অবাক, হতবাক, নির্বাক। চোখের দৃষ্টি শুন্য। টিকলির মাথাটা দপদপ করছে। কানের ভেতর শাঁ শাঁ থেকে পু পু একধরনের শব্দ হচ্ছে। টিকলির পা স্থির থাকলো না। শূন্য চোখের দৃষ্টি পানি ফেলতে ফেলতে এক দৌড়ে নিচে চলে গেলো। এতোসব গোলমেলে জটিল সমস্যার বেড়াজালে টিকলির জীবন ছিন্ন করে দিতে ইচ্ছে হলো। মাথার চুল টেনে ধরলো। কোন দিকে যাবে? কোনপথটা খোলা? একদিকে রাহুলের এতো বছরের ভালোবাসার উপর মায়া অন্যদিকে নিজের ভালোবাসার উপর ভালোবাসা। কাকে রেখে কাকে কষ্ট দিবে টিকলি? কারোর কষ্টই তো কারোর থেকে কম নয়।

টিকলিকে কথাগুলো বলতে পেরে রাহুলের মনে অন্যরকম প্রশান্তি জাগলো। টিকলি যেভাবে দৌড়ে চলে গেলো রাহুল ধরে নিলো টিকলি লজ্জা পেয়েছে।একবারো ভাবতে পারলো না আবারো কষ্টের পঁচা সমুদ্রে সে গা ভাসাতে চলেছে।

রাহুল আকাশের দিক তাক করে সিগারেট ফুকতে ফুকতে স্মিত হেসে উঠলো। মনে মনে ভাবলো, ভালোবাসার চাইতে বড় অভিনয় এ পৃথিবীতে আর দুটি নেই। মানুষের চাইতে বড় বেঈমান এবং নিমকহারামও বোধহয় আর কেউ হয়না। যেই মেয়েটা দুদিন আগেও ভালোবাসি ভালোবাসি করে কেদে বুক ভাসালো। সেই মেয়েটা দুদিন না যেতেই তার ই খালাতো ভাইকে বিয়ে করতে বসে গেছে। তাও আবার তারিখ ফেলেছে একই দিনে। রাহুলের আরো মনে হলো তার জীবনের প্রথম মেয়ে বান্ধবী'টির নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে তার অভিনন্দন জানানো উচিত। কিন্তু দুভার্গ্যবশত জানানো যাচ্ছে না। কারণ সেইদিন তারও বিয়ে। তার অনেকদিনের জমানো ভালোবাসার সাথে তার বিয়ে। রাহুল ভেবে রেখেছে বাসর রাতে তার ভালোবাসার ভাণ্ডার এবং সিন্দুক উভয়ই টিকলির জন্য উন্মুক্ত করে দিবে। সাথে ঝার বোতল গুলোতে অনেকগুলো প্রজাপতি আর জোনাকি ধরে টিকলিকে উপহার দিবে। টিকলি নিশ্চয়ই খুশিতে রাহুলকে জড়িয়ে ধরবে? ইশশ কত্ত স্বপ্ন পূরণ হওয়া বাকি রাহুলের!

,

টিকলি কাঁপা কাঁপা হাতে আদরকে ফোন করলো। মুখে হাত রেখে কান্না চেপে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। সে ভেবেছে একজনের ছোটবেলার ভালোবাসার জন্য তিনটে জীবন নষ্ট হতে পারে না, কিছুতেই না। রাহুলকে বিয়ে না করলে রাহুল সাময়িক কষ্ট পাবে। হয়তো সারাজীবন কষ্ট পাবে। কিন্তু রাহুলকে বিয়ে করলে টিকলি আদর এমনকি রাহুল সারাজীবন আরো বেশি কষ্ট পাবে৷ টিকলি কখনো রাহুলকে মানতে পারবে না। আর সব শুনে রাহুলও নিশ্চয়ই এই বিয়ে করতে চাইবে না। যে স্বপ্ন রাহুল দেখছে তা বাস্তবায়ন করার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা টুকু টিকলির নেই, একদম নেই।

টিকলি আদরকে রাহুলের নাম্বারটা দিয়ে সতর্ক করে দিলো, 'আর মাত্র তিনদিন। তারপর কিন্তু আমার বিয়ে, ডাক্তার।'

টিকলির কণ্ঠটা কেমন যেনো ভেজা ভেজা শোনা গেলো। আদরের নিজেকে অসহায় লাগলো। সে গেছে এক গ্রামে গরিব অসহায় লোকজনদের মেডিকেল ট্রিটমেন্ট করতে। জরুরি ভিত্তিতে আজ ভোরেই যেতে হয়েছে। আবার রাতের গাড়িতে ফিরে আসবে। সব মিলিয়ে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত নিজেকে খুব বেশি নিঃসহায় লাগলো তার। মাথা কাজ করছে না। এই প্রায় দুপুর শেষ হয়ে যাওয়া সময়টাতেও তার সকালের খাবার খাওয়া হয়নি। এতোদিকের চাপ আদরের আর সহ্য হচ্ছে না। আল্লাহ মুখ তুলে তাকালে হয় এবার!

,

'হ্যালো? রাহুল?'

রাহুল নাম্বারটা আরেকবার দেখে নিলো। এরপর কানে ধরে বলল, 'জি ভাই। আসসালামু আলাইকুম। নতুন সিম তো চিনতে পারিনি।'

আদর টিকলির কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে শত ব্যস্ততার আড়ালেও সাথে সাথে রাহুলকে ফোন করেছে। সে যদিও ঢাকায় এই মুহুর্তে উপস্থিত নেই তবুও বলল, 'তুমি কি এক্ষুণি আমার সাথে দেখা করতে পারবে রাহুল?'

রাহুলের এখন কোথাও বের হতে ইচ্ছে করলো না। একটার পর একটা সিগারেট মনের সুখে খেতেই বেশি ভালো লাগছে। টিকলি তো সিগারেট সহ্য করতে পারে না। বিয়ের পর তো টিকলির কারণে রাহুলের সিগারেট খাওয়া বাদও দিতে হতে পারে। তাই বিয়ের আগ পর্যন্ত মনের সুখে সিগারেট খাবে বলেই প্রতিজ্ঞা করেছে সে। তাই রাহুল একটা মিথ্যে কথা বলল, 'না আদর ভাই। এখন তো দেখা করতে পারছি না। সামনে বিয়ে ভাই বুঝেন ই তো। ব্যস্ততা!'

আশেপাশের গ্রামের মানুষের নানান শব্দে চিৎকারে আদর আবছা শুনতে পেলো রাহুলের কথা। সেই আবছা কথা শুনেই দাঁতে দাঁত পিষে বলল, 'তাহলে ফোনেই বলছি শোনো...'

ওপাশ থেকে অনেক শব্দ ভেসে এলো। এক তো গ্রামে নেটওয়ার্কের সমস্যা। দুই. মানুষের কোলাহলে ঠিক মতো আদর কথা বলতে পারছে না। চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলছে। রাহুল ভ্রু কুটি করে হ্যালো হ্যালো করে বলল,

'হ্যালো আদর ভাই। কথা কেটে কেটে আসছে। একটু দূরে সরুন। অনেক মানুষের শব্দ। আমি ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছি না। হ্যাঁ? কি বললেন? ভাই একটু জোরে বলুন।'

আদরের সমানতালে রাহুলও চিতকার করে বলল। আদরের আশেপাশে মানুষজন গিজগিজ করছে। দূরে সরেও লাভ নেই। আদর হতাশ মনে জোরে চেঁচিয়ে বলল,

'যেভাবেই পারো প্লিজ রাহুল কাল সকালে আমার সাথে দেখা করো। এভাবে ফোনে বলা সম্ভব নয়।'

রাহুল আচ্ছা বলে ফোন রেখে দিলো। এরপর কিছুক্ষণ ফোন সামনে নিয়ে আদরের নাম্বারের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

_____________________________

বিকেল দিকে নিভা আবার এলো। টিকলি আধশোয়া হয়ে কিছু চিন্তা করছিল। নিভাকে দেখে ভ্রু নাচিয়ে তাকালো। সন্দিহান গলায় বলল,

'কিরে! সকালেই তো এলি। এখন আবার? কাহিনি কি? বিয়ের কনেদের ওতো বাইরে বের হতে হয়না জানিস না। তোর জন্য বাইরে বের হওয়া নিষেধ। বুঝলি?'

নিভা কাধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে জোরে শ্বাস ফেলে বলল, 'সকালে টায়রার সাথে দেখা হয়নি তাই এখন আবার আসলাম।'

টায়রা গিয়েছিলো ওয়াশরুমে। ভ্যাপসা গরমে ঘেমে নেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিল। তাই আবার গোসল করলো। ওয়াসরুম থেকে বেরিয়ে নিভাকে দেখতেই খানিক অবাক হলো। সাথে নিভাকে দেখে রাগে গা পিত্তি জ্বলেও উঠলো। মাথা থেকে সাদা তোয়ালে টা খুলে নিভার দিকে ছুড়ে মারলো। ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে নিজের বানানো উদ্ভট একটা গান গাইলো,

"ও আমার সতিন গো
চিরসাথী জামাইয়ের ঘরে
তোমারি জন্যে এনেছি আমি ঝাড়ুর বাড়ি যে..
ও...একই সাথে করবো মারামারি
যাবোনা কোনোদিন ছেড়ে
ও...থাকবে না কোনো বাধা
আমার আর জামাইয়ের মাঝে
তুই মরলে....জামাই আমার হবে
ও আমার সতিন গো
চিরসাথী জামাইয়ের ঘরে..."

টায়রা গানটা গাইলো 'ও আমার বন্ধু গো' গানের সুর নকল করে।

চলবে

Arbaj khan, Hikmatullah khan, Sahin kondokar, Md amanul, Akaram khan, Md salim bapari, Jalsan khan and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Tue Aug 31, 2021 1:19 am
বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ
মুমুর্ষিরা শাহরীন

৪৯.
টিকলি বিস্ফোরিত চোখে তাকালো৷ নিভা অবাক গলায় বলল, 'অ্যাই তুই কি গাইলি?'

টায়রা উত্তর দিলো না। মুখে ক্রিম লাগাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো। নিভা বড় বড় চোখ করে আবার বলল, 'তুই আমাকে দেখে গাইলি? আমি তোর সতিন?'

টায়রা মুখ টানা মেরে দিলো। টিকলি নিভাকে চেপে ধরে ভ্রু নাচিয়ে বলল, 'তুই আর্দ্র ভাইয়াকে বিয়ে করছিস? মত আছে তোর?'

নিভা চুপ হয়ে কুকরিয়ে গেলো। আড়চোখে টায়রার দিকে তাকিয়ে কথার উত্তর দিলো না। উল্টে তুতলিয়ে বলল, 'আমি একটু ছাদে যাই।'

টিকলি নিভাকে ছেড়ে দিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসলো। টায়রা ভ্রু কুচকে তাকালো। মুচকি হেসে টিকলি বলল, 'যা।'

নিভা চোখ মুখ কুচকে বলল, 'গেলাম।'

টিকলি ঠোঁট টিপে বলল, 'যাবি তো। তুই যে এতো ঘন ঘন বাসায় কেনো আসছিস সেটা কি আমি বুঝিনা?'

,

বাতাসের ছন্দে মিলেমিশে একাকার তখন বেলাশেষের পাখিদের কূঞ্জন। পরিষ্কার নীল আকাশ নরম রোদের সাথে ক্লান্ত। সূর্য ডোবার পরিকল্পনায় লাল হলুদ আলোয় নিজেদের রাঙাতে ব্যস্ত পশ্চিমা আসমান। ছাদে লাগানো ছোট ছোট সবজি গাছগুলো নরম রোদ আর হালকা বাতাসে দুলছে নিজ দায়িত্বে। নিভা ছাদে পা রাখতেই দেখলো রাহুল সিগারেট খাচ্ছে। দু' পা এগিয়েও আবার পিছিয়ে গেলো। নারীত্ব বোধটা মাথা চাড়া দিয়ে জেগে উঠলো। এই মুহুর্তে রাহুলের সাথে যেচে কথা বলাটা বিশাল বড় এক বেহায়াপনা সাথে অনেক বড় অন্যায়। তাছাড়া কিবা কথা বলার আছে নিভার? আর যাই হোক নিজের আত্মসম্মান ছিন্ন করতে পারবে না সে। ভালোবাসার জন্য কারণে অকারণে নির্লজ্জ হওয়া যায় কিন্তু নিজের আত্মসম্মান খোয়ানো যায় না কোনো অবস্থাতেই। ভালোবাসার জায়গায় এসেই নারীদের আত্মসম্মান প্রবল হয়ে উঠে।

নিভা ঘুরে দাড়াতে যাবে তখনই রাহুলের সাথে চোখাচোখি হলো। বিচলিত হয়ে রাহুলের হাত ফসকেই সিগারেট টা মাটিতে পড়ে গেলো। মিনিট খানিক আশ্চর্য দৃষ্টিতে সিগারেটের দিকে তাকিয়ে থেকে পা দিয়ে পিষে ফেলা হলো। নিভা ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই রাহুলের মনে পড়লো সে অভিনন্দন জানাতে চেয়েছিলো। রাহুল হালকা আওয়াজে বলল,

'অভিনন্দন।'

নিভা অবাক দৃষ্টিতে নির্বাক হয়ে ঘুরে দাড়ালো। রাহুল প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়ালো। নিভা ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো, 'কি কারণ?'

'আগামী নতুন দিনের জন্য অভিনন্দন।'

'আপনাকেও।' নিভা ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েও থেমে গেলো। পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলো, 'বিয়েটা আপনি করছেন ই তাহলে?'

রাহুল কাধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়, 'করবো না বলেছিলাম নাকি আপনাকে?'

নিভা তাক লাগা গলায় বলল, 'আপনি কি এখনো কিছু জানেন না।'

রাহুল বুঝলো না বরং আরো উল্টো বুঝে বলল, 'এ পৃথিবীর সবাই কি সব জানে? সব জানলেই কি বিয়ে করতে হবে না? আপনি তো কত কিছুই জানেন। তাই কি বিয়ে করছেন না?'

নিভা বিস্মিত হলো। বিরবির করে বলল, 'আনবিলিভেবল।'

রাহুল ভ্রু কুটি করে তাকালো। নিভা আচমকা বলল, 'দেখুন আপনি এই বিয়ে করবেন না প্লিজ। আপনি এই বিয়ে করতে পারেন না৷ এই বিয়েটা করলে তিন তিনটে জীবন নষ্ট হবে। আমি আপনাকে এক্সপ্লেইন করছি সব। আপনি একটু শুনুন।'

রাহুল ভাবলো তিনটে জীবন মানে ওর, টিকলির আর নিভার কথা বলছে। তাই রাহুল হাত সামনে এনে নিভাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

'কিচ্ছু এক্সপ্লেইন করতে হবে না নিভা। আমার জীবন নষ্ট হবে না। আমি টিকলিকে ভালোবাসি। আমার জীবন নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ ই নেই। আর টিকলি আমাকে ভালোবাসে কিনা জানিনা কিন্তু নিশ্চয়ই ওর বিয়েতে অমত নেই। আর বাকি রইল আপনার কথা। আপনি যেমন দু'দিনের মাঝেই বিয়ে করার জন্য রাজি হয়ে গেছেন ঠিক তেমনি দু'দিনের মাঝে এই পাগলামি গুলোও ভুলে যাবেন। এতোটা বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। সুখে থাকুন।'

নিভা বিস্ময়ে কথা বলতে পারলো না। স্তম্ভিত হয়ে গেলো। ও বলল কি আর রাহুল বুঝলো কি! তিনটে জীবন মানে তো রাহুল আদর আর টিকলির কথা বুঝিয়েছিলো। ওর নিজের কথা তো বাদ ই দিয়েছিলো। ব্যথিত নয়নে রাহুলের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো নিভা। এরপর কি আর কিছু বলার থাকতে পারে? এই ছেলেটা ঠিক কতটা গর্ব করে বলছে, ওর জীবন নষ্ট হবে না। অথচ দিন শেষে একমাত্র ওর জীবনটাই ভয়াবহ নষ্ট হয়ে যাবে। কালো দূর্যোগ নেমে আসবে ওর স্বপ্নভূবনে। নিভা স্থির পায়ে চলে যেতে গেলেই রাহুল হঠাৎ বলে উঠলো,

'আমি ভুল মানুষকে নিজের আপন বন্ধু ভেবেছিলাম। খুব ভালো বন্ধু ভেবে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত সব কথা শেয়ার করে জীবনের মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছিলাম। আর এই ভুল আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভুল।'

নিভার চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করে উঠলো। আহ কি কষ্ট! তীরের মতো ছুটে এসে বিধলো নিভার হৃদয়ের প্রগাঢ় গহনে। এতো কষ্ট! এতোটা কষ্ট! কেনো? নিভার চোখ ফেটে কান্না আসতে চাইলো। রাহুলের কলার চেপে চিৎকার করে কেঁদে জানতে ইচ্ছে করলো,

'ভালোবাসা এতোটা খারাপ? শুধুমাত্র ভালোবেসে ফেলেছিলাম বলেই আমি আজ আপনার কাছে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভুল? তবে কি আপনি ভুল নন? আপনিও তো ভালোবাসেন। আমার থেকেও পাগলের মতো টিকলিকে ভালোবাসেন। ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গেছেন। তবে আপনি কেমন ভুল? কেনো এতো স্বার্থপর আপনি? নিজেরটা ছাড়া কিছু বুঝেন না তাইনা? কথা বলার আগে ভাবেন না? একবার এই কথাগুলোর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখুন তো কেমন লাগে!'

,

নয়নকে রাহুল ডেকে পাঠিয়েছিলো আগেই। একা একা সিগারেট খেতে ভালো লাগে না। একটা সঙ্গী দরকার। সুখ দুঃখের আলাপ করতে করতে যার সাথে মজা করে সিগারেট খাওয়া যাবে। নয়ন জানে রাহুল ছাদে আছে। কিন্তু ছাদে গিয়ে দেখে নিভা আর রাহুল একসাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। নয়ন টাস্কি খেয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিরবির করলো,

'শালা! তোর চরিত্র এতো খারাপ হইছে কবে? একটারে বিয়ে করবি তার বান্ধবীর সাথে আবার লাইন মারবি? আমার যত শত পোড়া কপাল!'

টিকলি টায়রার ঘরের দরজায় গিয়ে নক করলো নয়ন। টিকলি শোয়া থেকে উঠে বসলো। হাসি হাসি মুখ করে বলল, 'নয়ন ভাই আপনি? আসুন না ভাইয়া আসুন।'

টায়রা ধমক দিয়ে বলল, 'স্টপ।' নয়ন সাথে সাথে থেমে দাঁড়ালো। টায়রা ভ্রু নাচিয়ে বলল, 'কি চাই? মেয়েদের ঘরে উঁকিঝুঁকি?'

নয়ন বোকা বোকা চেহারায় হেসে বলল, 'কোথায় উঁকি দিলাম? অনুমতি নিয়েই তো ডুকলাম।'

টিকলি বলল, 'ভাইয়া ওর কথা রাখেন। আপনি বসেন।'

নয়ন গিয়ে বিছানার কোণায় বসলো। টায়রা বিরবির করে পা গুটিয়ে বসলো। এরপর নয়নের দিকে গোয়েন্দা চোখে তাকিয়ে বলল,

'আচ্ছা কাহিনি কি বলেন তো! আপনারা সবাই আমাদের বাসায় এসে ভিড় জমিয়েছেন কেনো? বরপক্ষ কনেপক্ষের বাড়িতে! বিষয়টা ভিষণ উইয়ার্ড সাথে লজ্জাজনক।'

নয়ন কাশলো। সচেতন কণ্ঠে বলল, 'পরসু মানে হলুদের দিন সকালেই আমরা বরপক্ষ চলে যাবো।'

নয়ন টায়রার থেকে চোখ সরিয়ে টিকলির দিকে তাকালো। টিকলিকে বিষন্ন মনে চিন্তা করতে দেখে প্রশ্ন করলো, 'বিয়ের কনে এমন মনমরা কেনো?'

টিকলি দাঁত বের করে হেসে বলল, 'বিয়ের কনে যে তাই!'

নয়ন দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে বলল, 'কি আশ্চর্য! বিয়ে যারা করে তারাও মনমরা। বিয়ে যারা না করে তাদেরও মনমরা!'

টিকলি ভ্রু উপরে তুলে বলল, 'হঠাৎ এই কথা? বিয়ে করতে ইচ্ছে করে?'

'শুধু ইচ্ছে করে....'

'তবে? আর কি কি ইচ্ছে করে?'

'ওই বিয়ের পর যা যা ইচ্ছে করে আরকি!'

টিকলি গলা ঝেড়ে কাশলো। বিরবির করে বলল, 'কি নির্লজ্জ!'

নয়ন এবার টায়রার দিকে তাকিয়ে খুশি খুশি গলায় বলল, 'দেখুন, রাহুল আর টিকলি বিয়ে করে ফেলছে ওদিকে আর্দ্র ভাই আর নিভা বিয়ে করে ফেলছে। এ সুযোগে আমরা দুজনও বিয়ে করে ফেলি চলুন। আপনাকে আমার প্রথম দিন থেকেই ঝাক্কাস লাগে! দিল কাইরে নিছেন এক্কেরে!'

টিকলি টায়রা বিস্ফোরিত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। হাত মুঠো করে ঘুষি দেখিয়ে টায়রা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

'এটা কি?'

নয়ন ঢোক গিলে বলল, 'ঘুষি!'

টায়রা দরজা ইশারা করে বলল, 'আপনি এই মুহুর্তে আমার রুম থেকে বের হবেন নাকি এটা খেয়ে তক্তা হবেন?'

নয়ন না বুঝে বলল, 'হ্যাঁ?'

টায়রা উঠে বসে চুলকানির লাঠি হাতে নিয়ে বলল, 'তোর হ্যাঁ এর আমি গুষ্টি কিলাই। যাবি নাকি!'

নয়ন তাড়াতাড়ি নেমে দাঁড়ালো। দরজার কাছে গিয়ে বলল, 'সত্যি চলে যাবো? আর কিছুক্ষণ থাকি? আর একটু হলেই আমাদের বিয়ের পাকা কথা হয়ে যেতো। তাছাড়া আমি আপনাদের অতিথি...'

নয়নের কথা শেষ হওয়ার আগেই টায়রা বাড়ি ভাঙা চিৎকার দিলো, 'গেট লস্ট।'

___________________________

আর দুদিন পর রাহুল আর টিকলির বিয়ে। ওইদিকে আর্দ্র আর নিভার বিয়ে। এই মুহুর্তে আদর এবং রাহুল মুখোমুখি বসে আছে। রাহুলই প্রথম কথা বলল,

'ভালো আছেন ভাই?'

আদর জোরপূর্বক বলল, 'হুম।' পরিপেক্ষিতে জিজ্ঞেস করলো না তুমি কেমন আছো। রাহুল একটু অপ্রস্তুত হলো। বলল, 'কি খাবেন ভাই? বলেন অর্ডার দেই।'

'আমি দুজনের জন্য কফি অর্ডার দিয়েছি। আর কিছু খাবো না। তুমি যদি খাও তবে অর্ডার দেও।'

'বাড়ি থেকে খেয়ে বের হয়নি ভাই। খিদে লেগেছে। শুধু কফি খেয়ে পেট ভরবে না।'

রাহুল হেসে হেসে বলল। এদিকে আদর কাল দুপুরে খেয়েছিলো। এরপর থেকে না খাওয়া। আদর দাঁত কিড়িমিড়ি করলো। এই ছেলেটার সমস্যা কি? না জেনে শুনে কীভাবে একটা ছেলে ঢ্যাং ঢ্যাং করে বিয়ে করতে পারে?

'তুমি যে বিয়ে করছো মেয়ের মতামত নিয়েছো?'

রাহুল বিস্মিত ভঙ্গিতে বলল, 'আপনাকে তো বলেছিলাম ভাইয়া মেয়ে আমার কাজিন। মেয়ের পায়ের আঙ্গুল থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সবকিছুই আমি জানি। মতামত নেওয়ার প্রয়োজন নেই।'

আদর স্মিত হাসলো। কফি এসে গেছে। কফিতে চুমুক দিতেই রাহুল বলল,

'আর তাছাড়া মেয়ের পরিবার থেকে প্রস্তাব এসেছে। আর আমার ফুফা তার মেয়েদের বিষয়ে ভীষণ কন্সার্ন। মেয়ের মতামত না নিয়ে নিশ্চয়ই প্রস্তাব টি দেননি। তাই আলাদা ভাবে বিয়ের মতামত চেয়ে মেয়েকে লজ্জায় ফেলার কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছিনা। যতোই হোক আমরা কাজিন। এতোদিন ভাই বোন নজরেই দেখে এসেছি হুট করে জামাই বউ এ কনভার্ট হওয়া একটু কম্পলিকেট। মানিয়ে নেওয়ার জন্যও সময় প্রয়োজন।'

আদর কফির মগ টেবিলে শব্দ করে রাখলো। ধীরে সুস্থে বলল, 'তুমি খুব বুঝমান রাহুল। কিন্তু এতোটা বুঝমান হয়েও ভিষণ নির্বোধের মতো কাজ করে ফেলছো।'

রাহুল ভ্রু কুচকে তাকালো। একটু শক্ত কণ্ঠে বলল, 'ভাইয়া আপনি ঠিক কি বলতে চাইছেন?'

'আমি এটাই বলতে চাইছি যে, ভাই বোন থেকে জামাই বউ হওয়া একটু কম্পলিকেটেড। সময়ের প্রয়োজন। তুমি ই বললে। তাহলে এটা বুঝতে পারছো না? মেয়েটার অনেক কথা থাকতে পারে যা এই জড়তা গুলোর জন্য বলতে পারছে না।'

রাহুল সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালো, 'আপনি এসব কেনো বলছেন ভাই?'

আদর জোরে শ্বাস ফেলল। দু'আঙ্গুল দিয়ে কফির মগ ঘুরাতে ঘুরাতে বলল, 'আমি সবসময় সরাসরি কথা বলে এসেছি রাহুল। তুমি ঠিকমতো চেনো আমাকে। তোমার সাথে অনেক গুলো বছর কাটিয়েছি আমি। তুমি আমার খুব আদরের ছোট ভাই। তোমার সাথে এসব বলা লজ্জাজনক কিন্তু তবুও আমি নিরুপায়।'

রাহুলের নিঃশ্বাস আটকে এলো। রুদ্ধকণ্ঠে বলল, 'সরাসরি কথায় আসুন আদর ভাই। হেয়ালি করবেন না।'

আদর ভীষণ বড় আকারের দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আস্তেধীরে বলল, 'আমি টিকলিকে ভালোবাসি রাহুল।'

চলবে

Evan islam and Tonu islam লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 56
স্বর্ণমুদ্রা : 399
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-26
View user profile

বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ - Page 5 Empty Re: বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ

Tue Aug 31, 2021 1:19 am
বৃষ্টিশেষে প্রেমছন্দ
মুমুর্ষিরা শাহরীন

৫০.
টিকলি হাত মোচড়াতে মোচড়াতে টায়রার পাশে বসলো। চিন্তার গলায় বলল, 'উনি রাহুল ভাইয়ার সাথে দেখা করতে গেছেন।'

টায়রা কান থেকে ইয়ারফোন খুলে আমোদিত কণ্ঠে বলল, 'সত্যিই?'

টিকলি মাথা ঝাকাঁলো। ইতস্তত করে বলল, 'কিন্তু একটা ব্লান্ডার হয়ে গেছে সাথে একটা কান্ড ঘটেছে৷'

টায়রা পিটপিট করে তাকিয়ে বলল, 'কোন গাছের কাণ্ড, ফুল, পাতা ঘটেছে সেটাই আগে বল?'

টিকলি ত্যাড়াচোখে তাকিয়ে বলল, 'গাছের কাণ্ড, ফুল, পাতার কথা বলিনি। একটা ঘটনা ঘটেছে।'

টায়রা বিছানায় আগের মতো ঠেস দিয়ে বসে বলল, 'বল।'

টিকলি কালকের রাহুলের বলা কথাগুলো বলল, 'রাহুল ভাইয়া নাকি আমাকে ছোটথেকে ভালবাসে।'

টায়রা বিস্ফোরিত চোখে তাকালো। খানিক বাদে ওভার সিউর দিয়ে বলল, 'আমি জানতাম। জানতাম এরকম কিছুই একটা হবে। লজ্জাজনক হলেও বলি আমি প্রথমে ভেবেছিলাম রাহুল ভাইয়া আমাকে পছন্দ করে। কারণ সে সবসময় আমার সাথে ঝগড়া করতো। চাপাবাজী করতো।'

টিকলি চোখ ঘুরিয়ে বলল, 'ঝগড়া করলেই ভালোবাসা হয়?'

টায়রা ওভার সিউর দিয়ে আবার বলল, 'অবশ্যই। হয়না মানে? তোর আর আদর ভাইয়ার তো ঝগড়া দিয়েই সব শুরু হলো। আমার আর ওই ভাদ্ররও তো ঝগড়া দিয়েই শুরু হলো।'

টিকলি অবাক হতবাক কণ্ঠে বলল, 'কি বললি? কি বললি তুই? তুই আর আর্দ্র ভাইয়া মানে? তোরা দুজন প্রেম করিস?'

টায়রা হাত নাড়িয়ে বলল, 'ওই ডেমরার সাথে প্রেম করবো তাও আবার আমি? মাথা খারাপ নাকি?'

টিকলি ভ্রু নাচিয়ে বলল, 'তবে? ভালোবাসিস?'

টায়রা চুপ থাকলো। বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাড়ালো। দিন কালো হয়ে আসা মেঘলা আকাশ। চারিদিকে বৃষ্টি আমেজ। বৃষ্টির গন্ধ। প্রেমের ছন্দ। ভালোবাসার দ্বন্ধ। টায়রা মিস্টি হেসে স্মৃতিচারণ গলায় বলল,

'তোর মনে আছে টিকলি? আমি ছোটবেলা থেকে সবসময় বাবাকে গিয়ে বলতাম আমাকে আর আপুকে এক বাড়িতে বিয়ে দিবে। যদি বিয়ে না দাও তাহলে তোমার খবর আছে। আমি অনেক কাদবো। আপু ছাড়া আমার ভালো লাগবে না তো! আমি একা হয়ে যাবো যে! আমি ভয় পাবো। আমি কষ্ট পাবো। কিন্তু খুশি হবো না।'

টিকলি যেনো চোখের সামনে দেখতে পেলো সেই ছোট্ট মিস্টি শ্যামল পুতুল টায়রাকে। ভাবতে ভাবতে একরকম নস্টালজিক হয়ে গেলো। মৃদু হাসলো টিকলি। সব বুঝে উঠতে বেশি সময় লাগলো না তার। বলল,

'সময় চলে যাচ্ছে টায়রা। আর দুদিন পর বিয়ে। কাল গায়ে হলুদ। তুই আর্দ্র ভাইয়াকে বলে দে।'

টায়রা মাথা দুলিয়ে হেসে বলল, 'ভালোবাসলেই বলতে হবে নাকি? সব ভালোবাসায় মিলন হতে হবে এমন কথা কোথাও লেখা আছে? আমি তো ভেবেছি বিয়ের দিন উনার বিয়ে দেখতে চলে যাবো। তোর তো বিয়ে হবেনা আমি সিউর। তাই এখানে বসে সময় নষ্ট করে লাভ নেই।'

টায়রা একটু থেমে আস্তে গলায় বলল, 'আমি দেখতে চাই আমার সামনে উনি আমার বেস্টফ্রেন্ডকে কীভাবে বিয়ে করে। আমি উনাকে কংগ্রাচুলেশন করতে চাই।'

টিকলি জানালা গলিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, 'আল্লাহ! সব যেনো ভালো হয়৷ দুঃখের খরার পর সুখ যেনো বৃষ্টি হয়ে নামে।'

টায়রা ঘুরে দাড়ালো, 'কি ব্লান্ডার করেছিস বললি নাতো?'

টিকলি চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে কাচুমাচু হয়ে বলল, 'আমি উনাকে এই কথাটা বলতেই ভুলে গিয়েছি। তার উপর উনি কাল অনেক টায়ার্ড ছিলেন। দূরের একটা গ্রামে মেডিকেল ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে আমি এই কথাটা বলিনি।'

টায়রা মাথায় হাত দিয়ে বলল, 'আল্লাহ্! এই মেয়ে কি করে খাবে? এতো বড় একটা কথা আর তুই বললি না? তোর এই কথার জন্য যদি কোনো সমস্যা হয় তখন?'

টায়রার কথায় টিকলি ভয় পেলো। মাথায় হাত দিয়ে বসলো। এতো চিন্তা আর নেওয়া যাচ্ছে না। মাথা কেটে ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে।

__________________________

উত্তাল, অশান্ত নিঃশ্বাসের ধ্বনির সাথে মিশে একাকার তখন স্তব্ধ, ভারী বাতাস। রাহুলের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আদর বাতাসে অক্সিজেনের সংকট বোধ করছে৷ স্বপ্নরাজ্য তৈরি করার আগেই কাচের মতো চুরচুর করে ভেঙে পড়ছে রাহুলের উপর। রাহুলের চোখ লাল। অসম্ভব লাল। সে নিচু মাথায় উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বিরবির করে বলল, 'এসব কি? এসব হতে পারে না? টিকলি আর আদর ভাইয়া দুজনে কীভাবে সম্ভব? ওরা পরিচিত হলো কবে?'

রাহুলকে চুপ থাকতে দেখে আদর অস্থির হয়ে বলল, 'কথা বলছো না কেনো রাহুল?'

রাহুল মাথা উঁচিয়ে সামনে থাকা কফির মগ ঘুরালো। কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে। খাওয়া যাবে না। খুব শান্ত গলায় রাহুল বলল, 'কতদিনের সম্পর্ক আপনাদের?'

এতো কথার কি দরকার? আদর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে তিক্ততার সাথে বলল, 'পাঁচমাস।'

রাহুল বাঁকা হাসলো। আদর তা দেখে ভ্রু কুচকালো। এরপর ধীরেসুস্থে বলল, 'দেখো রাহুল, তুমি সরে যাও। বিয়েটা ভেঙে দেও কিংবা যা খুশি করো কিন্তু বিয়েটা যাতে না হয়।'

রাহুল ঠান্ডা স্বরে বলল, 'আপনি কেনো ভাঙছেন না? কেমন প্রেমিক আপনি?'

আদর রাহুলের ঠেস মেরে খোটা দেওয়াটা বুঝে দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলল, 'আমি নিশ্চয়ই চেষ্টা না করে এসে তোমাকে বলিনি। আমার আর টিকলির অনেক আগেই বিয়ে ঠিক হয়েছিলো। কিন্তু তখন আমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করতাম না বলে বিয়েটা ভেঙেছি। এরপর দুই পরিবারের মধ্যে কয়েক দফা দ্বন্ধ লেগে গেছে। এখন তারা মানছে না। তাই এসে তোমাকে বলা।'

রাহুল ভ্রু উচিঁয়ে বলল, 'আপনাদের প্রেমটা কীভাবে হলো ভাইয়া?'

আদর চোখ ছোট করে বলল, 'রাহুল, আমি এখানে তোমাকে কাসুন্দি মাখা গল্প শোনাতে ডাকিনি। সময় থাকলে এসব তুমি পরেও শুনে নিতে পারবে। মেইন পয়েন্টে আসো। এন্ড দ্যা মেইন পয়েন্ট ইজ আমি এই পৃথিবীর বিনিময়েও উনাকে ছাড়তে পারবো না।'

রাহুল চোখ তুলে বলল, 'আর টিকলি?' অস্থির কণ্ঠে রাহুল আবার বলল, 'আর টিকলি কি ভাইয়া? ও আপনাকে ছাড়তে পারবে না? পারবে হয়তো।'

রাহুলের চোখ মুখ জ্বলজ্বল করছিলো। কিছু পাওয়ার আশা। আদর হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। বলল, 'সেটা বাড়ি ফিরে টিকলিকে জিজ্ঞেস করো।'

রাহুল চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে দাড়ালো। আদর নির্বিঘ্নে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকলো। যাওয়ার আগে রাহুল বলল,

'আপনি মাত্র পাঁচমাসের ভালোবাসার জন্য বলছেন এই পৃথিবীর বিনিময়ে ছাড়তে পারবেন না। আর আমি তো পাঁচ বছর বয়স থেকেই ভালোবাসি। আর এখন আমি পঁচিশ পার করবো। আমি আমার বিশ বছরের ভালোবাসা কীভাবে ত্যাগ করবো বলতে পারবেন? আপনার মতো তবে আমারও বলা উচিত, এই মহাকাশের বিনিময়েও আমি টিকলিকে ছাড়তে পারবো না।'

রাহুল চলে গেলো। আদর হতভম্ব চোখে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল, 'রাহুল টিকলিকে ভালোবাসে? এতো ছোটোবেলা থেকে? আর উনি এ কথাটা আমাকে একবারো বললেন না? বললে আমি ব্যাপারটা রাহুলকে অন্যভাবে বুঝাতে পারতাম। বয়সে জুনিয়র একটা ছেলের কাছে এভাবে অপমানিত হতাম না। এতো বড় সত্যি কি করে চেপে গেলেন উনি?'

_____________________________

রাহুল এসেছে অনেকক্ষণ হলো। এসে সকালের নাস্তা করলো না। দুপুরে খেলো। এখন দুপুর গড়ালো। টিকলি সকাল থেকে কন্টিনিউয়াসলি আদরকে ফোন করছে। কিন্তু আদরের ফোন বন্ধ। টেনশনে টিকলির হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো। শরীর ঘেমে উঠছে বারংবার। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে টিকলি আবার আদরের ফোনে কল লাগালো। কিন্তু আবার সেই একই কথা। বিরক্তি রাগে ক্ষোভে টিকলি ফোন ঢেল দিলো। সাথে সাথে চুরচুর হয়ে গেলো ফোন।

টিকলি মাথার চুল টেনে ধরে ছাদে গেলো। টিকলিকে দেখে রাহুল হাসলো। সে জানতো টিকলি আসবে কিন্তু এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় আশা করেনি। এলোমেলো চুল, চোখে মুখে ঘাম, ছলছলে চোখ, কাঁপুনি থুতনি। দুপুরের খাবারটাও খায়নি। টলমল পায়ে টিকলি রাহুলের সামনে গেলো। অগোছালো টিকলিকে দেখে রাহুলের ভেতর টা মোচড় দিয়ে উঠলো। টিকলি কিছু বলতে যাবে তার আগেই রাহুল টিকলির মাথা হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

'আজ রাতে আমি চলে যাবো। কাল আবার আসবো তোকে হলুদ ছোয়াতে।'

টিকলির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। কয়েক মুহুর্ত কাটলো রাহুলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে। রাহুল এসব কি বলছে? তবে কি আদর ওকে কিছু বলেনি? ওর সাথে দেখা করেনি? সব জানলে রাহুল এতো সহজভাবে অবলীলায় এই কথাগুলো কেনো বলবে? এরজন্যই কি তবে আদর ফোন বন্ধ রেখেছে? টিকলির চোখ কুয়াশা-মাখানো ঝাপসা হয়ে এলো।

রাহুল কিছুক্ষণ টিকলির দিকে তাকিয়ে থাকলো। তাকিয়ে থাকলো টিকলির চোখের দিকে। বরাবরের মতোই তার জন্য কিচ্ছু খুঁজে পেলো না। কিন্তু আজ হঠাৎ রাহুলের মনে হলো টিকলির চোখগুলোতে আদরের জন্য সীমাহীন ভালোবাসা। আদরের থেকেও আদরের প্রতি বেশি ভালোবাসা। রাহুলের বুকটা চিনচিন করে উঠলো। আদর বলেছিলো বাড়ি ফিরে টিকলিকে জিজ্ঞেস করতে কিন্তু যেখানে টিকলির চোখ মুখ'ই সাক্ষ্যপ্রমাণ সেখানে জিজ্ঞেস করাটা বোকামি। নিজেকে কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। টিকলি কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই রাহুল আটকিয়ে দিলো,

'যা ঘরে যা। কাল থেকে অনেক ধকল যাবে। রেস্ট নে।'

রাহুল টিকলিকে ঠেলে পাঠিয়ে দিলো। টিকলি সিড়িতে পা রাখার আগে বলল, 'টিকলি শোন।'

টিকলি পেছন ঘুরে তাকালো। রাহুল আহত কণ্ঠে বলল, 'আমি তোকে খুব ভালোবাসি রে। আমার বুকটা পুড়ছে। গন্ধ পাস? পাস না তাই না?'

টিকলি চোখ ভেঙে কান্না আসলো৷ অজস্র চিন্তা ভাবনায় মাথা গোলগোল ঘুরতে লাগলো৷ ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দূর্বল গলায় বলল,

'আমার সাথেই কেনো এমন হচ্ছে বলতে পারো? আমার ভেতরে যে আগুন জ্বলছে। একটুপর সেই আগুনে আমিসহ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবো।'

টিকলি এলোমেলো পায়ে চলে গেলো। রাহুলের কষ্ট লাগলো। সিগারেট ধরালো সে।

,

আর্দ্রর বাড়ি থেকে হলুদ যাবে নিভার বাড়িতে। বেশ বড়সড় জাকজমকপূর্ণ ভাবে ছেলের বিয়ে দিচ্ছে আজিম খান। সকাল থেকে বড় ছেলেকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি খানিকটা চিন্তিত হলেও বিচলিত নন। আর্দ্রের হলুদ শেষে পোলাপান সবাই জোর করে আর্দ্রকেও নিভার বাসায় নিয়ে গেলো।

ফাঁক বুঝে আর্দ্র নিভার ঘরে ডুকলো। নিভা চমকে বলল, 'তুমি?'

আর্দ্র কয়েক পা এগিয়ে বলল, 'দেখ নিভা আমি তোকে বিয়ে করতে পারবো না। এটা সম্ভব না। ইম্পসিবল।'

নিভা অবাক হলো। এরপর বলল, 'আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাইনা আর্দ্র ভাইয়া। কিন্তু আমার হাতে কোনো উপায় নেই।'

আর্দ্র চাপা ক্রোধ নিয়ে বলল, 'উপায় খুঁজলেই উপায় বের হবে। আমি তোকে বোনের নজরে দেখেছি। এখন তোকে বউয়ের নজরে দেখা কোনোমতেই সম্ভব নয়। আর তাছাড়া...'

নিভা ভ্রু কুচকে বলল, 'তাছাড়া?'

আর্দ্র সময় নিয়ে বলল, 'আমার মনে হয় আই এম ফল ইন লাভ উইথ টায়রা।'

নিভা হেসে বলল, 'এই কথাটা বুঝতে এতোদিন লাগলো ভাইয়া? আজ গায়ে হলুদের দিন এসে বলছো! বড্ড দেরি করে ফেললে। আমার হাতে এখন কিচ্ছু নেই। আমি যদি বাবা মাকে গিয়ে বলি যে এই বিয়েটা আমি করবো না তবুও কোনো লাভ হবে না। এই মুহুর্তে আমার কথার কোনো মূল্য নেই। এক পার্সেন্ট মূল্যও নেই। উল্টো অকথ্য কথা শুনতে হবে। মারও খেতে হতে পারে। তবে তুমি নিশ্চিত থাকো এই বিয়েতে আমার 100% মত নেই।'

আর্দ্র ভ্রু কুচকে বলল, 'নেই তো? পরে কোনোদিন কোনোসময় কোনোকালে আমাকে ব্লেম করবি না তো?'

'কক্ষনো না।'

'আমি যা বলবো তাই শুনবি?'

নিভা মাথা ঝাকালো।

'আমি যদি বিয়ের আসরে বিষ খেতেও বলি, বিয়ে ভাঙতে বিষও খাবি বুঝলি?'

আর্দ্রের কথা শুনে নিভা চোখ বড় বড় করে তাকালো। আর্দ্র যেমনভাবে এসেছিলো তেমন ভাবে চলে গেলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো, 'কোনোমতেই শরীরে হলুদ লাগাবি না।'

,

টিকলি ঘরের দোর দিয়ে বসে আছে। জামিলুর রেজা, শায়লা আক্তার অনেক্ক্ষণ থেকে দরজা ধাক্কাচ্ছে। টায়রা রেডি হয়েছে কোথাও যাবে। টিকলির সেদিকে খেয়াল নেই। উল্টো হয়ে নিস্তব্ধ সে শুয়ে আছে। একটুপর টায়রা বিরক্ত মুখে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। জামিলুর রেজা এবং শায়লা আক্তার হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন৷ পেছনে তাকিয়ে শায়লা আক্তার বলল, 'কোথায় গেলো মেয়েটা?'

জামিলুর রেজা উনাকে কনুই দিয়ে হালকা গুতা মেরে সামনের দিকে ইশারা করলেন। শায়লা আক্তার সামনে তাকিয়ে দেখলেন টিকলি স্তব্ধ নিরব। পুরো বিছানা ফাঁকা রেখে একপাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। শায়লা আক্তার আস্তে করে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকলেন। টিকলি জেগেই ছিলো। এক দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে থাকলো। শায়লা আক্তার বললেন,

'উঠ মা। গায়ে হলুদের সময় হয়ে গেছে।'

জামিলুর রেজা টিকলির মাথায় হাত রাখতেই। টিকলি আকস্মিক এক কাজ করে বসলো। ঝটকানি দিয়ে জামিলুর রেজার হাত সরিয়ে দিলো। শায়লা আক্তার থেকে দূরে সরে বসলো। উন্মত্ত ক্ষিপ্ত গলায় বলল,

'দূরে থাকো। আমার থেকে দূরে থাকো। চলে যাও এক্ষুণি। আমি হলুদ লাগাবো না। যাও।'

শায়লা আক্তার বললেন, 'বেশি না মা। একটু লাগাবো আয়।'

টিকলি আগুন গরম চোখে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, 'তোমরা যাবে? নয়তো খারাপ হবে। খুব খারাপ।'

জামিলুর রেজা তড়িঘড়ি করে উঠে দাড়ালেন। পরে যদি আবার মেয়ে বিয়ে না করার জন্য চিল্লাচিল্লি করে। বাড়ি ভরতি লোকজন। মানসম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। এই চিন্তায় তাড়াতাড়ি স্ত্রীকে নিয়ে তিনি ঘর ছাড়লেন। গিয়ে রাহুলকে পাঠিয়ে দিলেন।

বাবা মা যেতেই টিকলি ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো। বিছানায় গিয়ে বসে ডুকরে কেদে উঠলো। একটু পর রাহুলের কণ্ঠ শোনা গেলো। দরজা ধাক্কাচ্ছে সে। টিকলি বিরক্তিতে কান চেপে ধরলো। অস্ফুট শব্দ করলো। বারান্দায় চলে গেলো এই বিকট শব্দ থেকে বাঁচতে৷ মিনিট দশেক অনবরত দরজা ধাক্কিয়ে টিকলিকে ডেকে রাহুল ক্লান্ত হয়ে উঠলো। দরজায় সামান্য হলুদ লাগিয়ে সে চলে গেলো। সাথে রেখে গেলো ভালোবাসা,

'নাই বা ছোঁয়ালাম তোর গায়ে। তাতে কি? শয়নে স্বপনে জাগরণে তুই আমার। আমি মন থেকে তোকে হলুদ ছুইয়ে দিয়েছি। তাতেই পর্যাপ্ত।'

,

আর্দ্র নিভার ঘর থেকে বের হতেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে টায়রার মুখোমুখি হলো। অপ্রস্তুত ভাবে ঘাবড়ে গেলো। টায়রা স্ফূর্তি কণ্ঠে বলল, 'আরে ভাদ্র সাহেব যে!'

আর্দ্র হাসলো। আশার মোমবাতি জ্বললো বাতাসে বাতাসে। আর্দ্র বলল, 'টায়রা শুনুন।'

'আরেব্বাস! টায়রা? এতো উন্নতি? ভালো ভালো। নতুন নতুন বিয়ে করছেন তো। বুদ্ধি খুলছে।'

আর্দ্র অস্থির হয়ে বলল, 'আচ্ছা ফুটা টায়ার শুনুন।'

'জি বলুন।'

আর্দ্র বলতে ধরলো, 'আমি..'

আর্দ্রকে টায়রা আটকিয়ে দিয়ে বলল, 'ওহ হো ভুলেই গিয়েছিলাম। কংগ্রাচুলেশন।'

আর্দ্র ভ্রু কুচকে বলল, 'কেনো?'

টায়রা প্রস্ফুটিত কণ্ঠে বলল, 'এই যে আগামী নতুন দিনগুলোর জন্য। ভাবছি এবার আমিও বিয়ে করে ফেলবো। আপনি বিয়ে করছেন। টিকলি বিয়ে করছে। নিভা বিয়ে করছে। রাহুল ভাইয়া বিয়ে করছে। শুধু আমি আর আদর ভাইয়া সিঙ্গেল।'

আর্দ্র অবাক হলো। টিকলি বিয়ে করছে? অথচ ও এসবের কিছু জানে না। আর্দ্র বিস্ময় নিয়ে বলল,

'টিকলি বিয়ে করছে মানে? কাকে? আর রাহুল ভাইয়া? কোন রাহুল?'

'আপনাদের বাসায় ব্যাচেলর ভাড়া থেকেছে সেই রাহুল। আমার মামাতো ভাই। টিকলিকে বিয়ে করছে৷ কাল ই বিয়ে।'

আর্দ্র রাগ নিয়ে বলল, 'আমার ভাইয়ের কি হবে তাহলে? আপনার বোন কীভাবে বিয়ে করতে পারে?'

টায়রা ঠোঁট উল্টে বলল, 'বিয়ে করবে না তো।'

আর্দ্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো, 'কি বলছেন? স্পষ্ট ভাবে বলুন। গোলমেলে লাগছে আপনার কথা।'

টায়রা হাত নাড়িয়ে বলল, 'আপনার ওতো কিছু জানতে হবে না। তাদেরটা তারা বুঝে নিবে। আপনি আমার কথা শুনুন, আমি ভেবেছি কাল টিকলির বিয়ে এটেন্ড করবো না। আমি আপনার বিয়েতে চলে যাবো। আপনি কীভাবে কবুল বলেন, কবুল বলার সময় লজ্জা পান কিনা কিংবা কেঁপে উঠেন কিনা তা দেখতে হবে না? ঝমকালো একটা গোলাপি শাড়ি পড়বো। আপনার তো নীল রং পছন্দ তাই না? ইশশ..আমার গোলাপি পছন্দ। এই জায়গায়ও আমাদের ম্যাচ করলো না। ঠিকাছে, আমার একটা নীল গোলাপি মিশ্রণের শাড়ি আছে। জমিন নীল, কুচি আর আচঁল গোলাপি। সেটা পরে যাবো।'

আর্দ্র হাত মুঠো করে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে টায়রার কথা শুনলো। টায়রা নিজের কথা শেষ করে বলল, 'আপনি কি যেনো বলতে চেয়েছিলেন?'

দাঁত কিড়িমিড়ি করে আর্দ্র বলল, 'কিচ্ছু বলতে চাইনি। আপনি আমার বিয়েতে আইসেন। আপনার জন্য আমি আলাদা একটা টেবিল বুক করে দিবো। পেট ভরে খেয়ে যাবেন। রাক্ষসী!'

টায়রা চোখ বড় বড় করে বলল, 'আপনি আমাকে রাক্ষসী বললেন? আপনি নিজে একটা... একটা বিটকেলের বংশধর। পিশাচের নাতিন।'

আর্দ্র বিরক্ত মুখে বলল, 'আচ্ছা এতো কথা যে বললেন! আমি কি একবারো আমার বিয়েতে আপনাকে ইনভাইট করেছি? ছ্যাচড়া চাপাবাজ মেয়ে কোথাকার!'

আর্দ্র রেগে গটগট করে হেটে চলে গেলো। অতি উৎসাহ নিয়ে যা বলতে চেয়েছিলো তা বলার আগেই এই মেয়েটা সব বিগড়ে দিলো। টায়রা মুখ হা করে নিজের দিকে আঙ্গুল তাক করে বড় বড় চোখে বলল,

'আমি ছ্যাচড়া? আমি? তুই ছ্যাচড়া! তোর ক্যারেক্টর লুজ। খচ্চরের উত্তরাধিকারী। খারাপ! দেখ শুধু তোর বিয়েতে গিয়ে আমি কি করি! প্লেট উপচিয়ে খাবার নিবো। নিতেই থাকবো। বাড়ি থেকে ইয়া বড় বড় টিফিন বক্স নিয়ে যাবো৷ খাবার টিফিন বক্সে শুধু ভরবো। আমি একাই ১০০ জনের খাবার খাবো। তোর বাপেরে কালকে ভালোমতোন টাইট দিবো। আমাদের এলাকার রাস্তার পিচ্চি পিচ্চি পোলাপান গুলোকে সহ নিয়ে যাবো। তোর বিয়েতে আমি একটা সুতাও গিফট দিবো না দেখিস। তোর মতো অভাবগ্রস্ত কেউ যদি আবার জিজ্ঞেস করে, এতো খেলেন অথচ গিফটের নামে ফকফকা। তখন আমি তার কানেকানে ফিসফিস করে তোর নামে কূটনামি করবো, 'শুনেন বর আমার এক্স ঝগড়ুটে পার্টনার বুঝলেন? সাথে বউ আমার বিরাট বড় বান্ধবী। আর বান্ধবীর বিয়েতে আবার গিফট কিসের!'

চলবে

Evan islam and Tonu islam লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum