সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান  - Page 3 Empty Re: মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান

Fri Jun 04, 2021 4:41 pm
২১|

দুমড়ানো মোচড়ানো ভেন্টিলেটরটির ভাঙ্গা অংশের একটি রডের সাথে দড়িটি একহাতে পেচিয়ে মুখে টেনে শক্ত একটা গিট আটে মোস্তফা। তারপর দড়িটি নিচে বেজমেন্টের মেঝের কাছাকাছি ছুঁড়ে দিয়ে অদূরে কয়েকটি টিমটিমে বাতির আলোয় ভেতরটা একবার দেখার চেষ্টা করে।

বেজমেন্টের সিঁড়ি ঘরের ওপাশটায় মেসকে একবারের জন্য দেখতে পায় সে। দ্রুত পায়ে উপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসেছে সে। হন্তদন্ত হয়ে চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে লেজওয়ালা দানবটি হাসপাতালের প্রধান ফটক ছেড়ে ঘুরে ঐ পাশ দিয়ে গাড়ি ওঠানামার প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি চলে গেছে।

সিঁড়িঘর জুড়ে প্রকান্ড গর্জনে গ্যারেজের ভেতরের খোলা জায়গাটি গমগম করে উঠছে।

মোস্তফা মেস এর দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে ইশারা করল কয়েকবার। ফিসফিসিয়ে হাক ছাড়লো। প্রথমে তাকে খেয়াল না করলেও একসময় মোস্তফার ইশারাটি দেখতে পায় সে।
দৌড়ে বক্সের স্তুপগুলির পাশ কাটিয়ে ভাঙাচোরা ভেন্টিলেটরটির দিকে এগিয়ে আসে।

তুমি? মোস্তফাকে দেখে যারপরনাই অবাক হয় মেস।
মোস্তফা তার হাতের তর্জনীটি বন্ধ করা দুই ঠোটের উপর বসিয়ে একদম চুপ থাকার নির্দেশ দেয় তাকে। তারপর দড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠে আসার জন্য ইঙ্গিত করে।

দড়িটি ধরে শক্ত করে ঝুলে পড়ে মেস। তারপর দেয়ালের উপর দুই পায়ে ভর করে নিজের ভারী দেহটি উপরে উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। ইতিমধ্যে পরজীবী আক্রান্ত সেই জন্তুটি তাকে অনুসরণ করে খোড়াতে খোড়াতে গ্যারেজের এই পাশটায় চলে এসেছে। নিচে সেটির অপার্থীব গর্জন শোনা যাচ্ছে। যেন তাকে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছে।

আরেকটু চেষ্টা করো! মটু! মোস্তফা তার দিকে তাকিয়ে তাকে কিছুটা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে।

মেস মাথা ঘুরিয়ে নিচে তাকাতে গেলে তাকে বাধা দেয়। চিৎকার করে বলে, নিচে তাকাতে যেওনা! তুমি প্রায় চলে এসেছো!
এর মধ্যে হঠাৎই জন্তুটি মাটি থেকে প্রায় লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। অন্ধকারে সেটির বিকৃত একটি হাত যেন মেসের একটি পা ছুঁয়ে যায়। কোনরকমে দুই পা ভাঁজ করে সেটির হাত থেকে এ যাত্রা নিজেকে রক্ষা করে মেস।

মধ্যরাত।
জ্যাকের ছাদখোলা ক্যাডিলাকটি মৃত্যুর মরুভূমির ধূসর পথ ধরে শা শা করে সামনে এগিয়ে চলছে। মরুভূমির ঠাণ্ডা রাতের বাতাস তার মুখে এসে বারি খাচ্ছে। চুলগুলি উড়িয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে। আকাশে এক টুকরো ভাঙা চাঁদ চারপাশ আলোকিত করে রেখেছে। অদূরেই পর্বতরাজির ছায়াগুলি ভেসে উঠেছ।
দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড়, কিছু মরুভূমির গাছ-গাছালি। সেগুলির পাশে একটি তিন শিংওয়ালা তৃণভোজী।

জ্যাকের ক্যাডিলাকটি তীব্র গতিতে সেটির পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। গাড়ির হেডলাইটে সামনের রাস্তায় হ্যানার জিপটির টায়ারের ছাপগুলি দেখা যাচ্ছিল। সেটি অনুসরণ করে আরও কিছুটা পথ এগিয়ে আসার পর, জ্যাক দেখতে পেল সামনে রাস্তাটি দুই ভাগ হয়ে দুই দিকে চলে গেছে।

একটা উচু টিলা পার হয়ে গাড়িটিকে রাস্তার এক পাশে থামাল জ্যাক। তারপর গাড়ি থেকে নেমে টর্চ জ্বালিয়ে রাস্তার দুই দিকে দেখার চেষ্টা করল। তার হাতের ডান পাশের রাস্তাটি চলে গেছে সমুদ্র বন্দরের দিকে। বাম পাশেরটি গেছে এই এলাকার গ্রামাঞ্চলে। হ্যানার গাড়িটির টায়ার হাতের বাম পাশের রাস্তায় ছাপ বসিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে।

এদিকে দখলদারদের ঘাঁটিতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় একটি তাঁবুর ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করল হ্যানা। সামনে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে সে। কতক্ষন এভাবে পড়েছিল জানা নেই।
হগের একজন গ্রাম্য ডাক্তার তার উপর এক ধরনের যন্ত্রণাদায়ক ওষুধ প্রয়োগ করেছে। যদিও মুখ থেকে একটি কথাও বের করেনি সে কিন্তু ওষুধের রেষে কখন যেন অবচেতন হয়ে পড়েছে জানা নেই।

হঠাৎ করেই পেছনে তাঁবুর প্রবেশপথে কেউ একটা নড়ে উঠল মনে হল। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকানোর চেষ্টা করতেই ওপাশের আলোতে কিছু একটার স্পষ্ট নড়াচড়া টের পেল হ্যানা।

 এখনো পুরোপুরি হিতাহিত জ্ঞান ফিরে ফিরে আসেনি তার। গ্রাম্য অত্যাচারী ডাক্তারের পুশ করা ইনজেকশনে শরীরের ভেতর অনবরত যন্ত্রণা হয়ে চলছে।

অবশেষে ভাঙাচোরা ভেন্টিলেটরটি থেকে বেরিয়ে আসা আংশিক রডগুলি হাতের নাগালে পায় মেস। তারপর সেগুলি ধরে গর্তের ফাঁক গলিয়ে কোন রকমে নিজেকে উপরে টেনে নিয়ে আসে।

তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে মোস্তফার ডানহাতটি কাঁধে তুলে কোন রকমে তাকে ধরে দাঁড় করায়। হুইল চেয়ারের উপর তাকে বসিয়ে দ্রুত হাসপাতালের পেছনের দিকটায় পা বাড়ায় মেস।

আমাদের আরো দ্রুত যেতে হবে! ফিসফিসে গলায় কথাটি বলল মোস্তফা। লেজওয়ালা দানবটিকে আমি বেজমেন্টের ভেতরে দেখিনি! সেটি সম্ভবত বাইরে বেরিয়ে এসেছে!

মোস্তফার কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে আরো দ্রুত পা চালাতে থাকে মেস। এই দিকটায় ঝোপঝাড় ইটপাথরের সুরকি দিয়ে ভর্তি।
 একটু দূরেই রয়েছে একটি আধা ভাঙ্গা দেয়াল। হুইলচেয়ার থেকে মোস্তফাকে কোলে করে তুলে ইট সুরকির উপর দিয়ে আধা ভাঙ্গা দেয়ালটির দিকে এগিয়ে যায় মেস।

তারপর সেটির উপর তাকে কোন রকমে বসিয়ে দেয়। পেছনে দৌড়ে তার হুইলচেয়ারটি আনতে যাবে, ঠিক সেই সময় কিছু একটার ভারি পায়ের পদক্ষেপের শব্দ কানে আসে তার। যেন দানবীয় কিছু একটা ধীর পায়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। মোস্তফার কথাই ঠিক, লেজওয়ালা দানবটি বাইরে বেরিয়ে এসেছে!

এক মুহূর্ত দেরি না করে সাথে সাথে ঘুরে বড় বড় পায়ে দেয়ালের কাছাকাছি চলে আসে সে। তারপর এক লাফে দেয়ালটি পার হয়ে দু হাতে মোস্তফাকে কোলে তুলে নেয়। দেয়ালের ওপাশে তাকে ধীরে ধীরে মাটিতে নামিয়ে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসায়। ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বলে। তারপর নিজে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে টু শব্দ না করে হাটু ভাজ করে বসে পড়ে।

   এদিকে ইট-সুরকির উপর দিয়ে কারো ভারি পায়ের পদক্ষেপ যেন আরো কাছাকাছি চলে এসেছে। কিছু একটা বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে দেয়ালের ওপাশে অস্থির পায়চারি করে বেড়াচ্ছে।

    হঠাৎই কেউ যেন মোস্তফার হুইলচেয়ারটি ধরে প্রচন্ড গতিতে শুন্যে ছুড়ে মারে। তাদের থেকে কিছুটা দুরে দেয়ালের এই পাশে এসে সেটি মাটিতে আছড়ে পড়ে। বিকট এই শব্দে দুজনেই যেন আতকে ওঠে।
তাদের কাছে মনে হয়, রাগে ক্ষোভে হতাশায় কেউ যেন ওপাশে উম্মাদ হয়ে পড়েছে।
পরমুহূর্তেই একটি বিকট গর্জন সেটির উন্মাদনা পৃথিবী কে জানিয়ে দেয়।

মোস্তফার হাতটি শক্ত করে ধরে ছোট বাচ্চাদের মতো চোখ দুটি কুঁচকে বন্ধ করে রেখেছে মেস। এই রাক্ষুসে কার্যকলাপ যে সে আর নিতে পারছে না!

অনেকটা পথ সামনে এগিয়ে হ্যানার গাড়িটিকে রাস্তার এক পাশে উল্টে থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করে জ্যাক।

এক মুহুর্ত দেরী না করে তার গাড়িটি রাস্তার পাশে থামিয়ে, হাতের টর্চটি নিয়ে হ্যানার জিপটির কাছে ছুটে যায়। মাটিতে নিচু হয়ে বসে পড়ে, সেটির ভেতরে আলো দিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করে।
গাড়ির ভেতরে কেউ নেই। ফাকা। সিটগুলি উল্টো হয়ে ঝুলছে।  

হঠাৎ কোন একটি সিটের এক কোনায় কয়েক ফোঁটা রক্তের ছাপ দেখে আঁতকে ওঠে জ্যাক। সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে আশেপাশে ঝোপঝাড়গুলি আলো দিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করে।
ঠিক এই জায়গা থেকে শুধু মাত্র বাইকের টায়ারের ছাপগুলি সামনে এগিয়ে গেছে।

হঠাৎই একটি বোটকা গন্ধ হ্যানার নাকে এসে ঠেকে। অন্ধকারে কেউ একজন হ্যানার তাঁবু গলে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ব্যাপারটি বুঝতে পেরে চুপচাপ অবচেতন হয়ে পড়ে থাকার ভান করে যায় হ্যানা।

কয়েক মুহুর্ত পর, এবার কারো একটি রুক্ষ হাতের স্পর্শ তার পায়ের উপর অনুভব করে। স্পর্শটি তার পায়ের গোড়ালি থেকে ধীরে ধীরে উরুর কাছাকাছি উঠে এসেছে।
হাতটি কয়েকবার তার উরুর মাংসে আলতো চাপ দেয়। তারপর ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, বাহ! কি সুঠাম পা! বলেই মুখ দিয়ে এক ধরনের বিকৃত শব্দ করে। লোকটির মুখের বোটকা গন্ধ তার নাকে এসে লাগে।
তবুও সে জায়গা থেকে এক চুলও নড়ে না।
হাতটি কোন একটি দখলদারের, লোকটি নিশ্চিতভাবেই একটি পারভার্ট।

হঠাৎ করেই বোটকা গন্ধ ওয়ালা লোকটি একটি ছোড়া বের করে তার পায়ের দড়িটি কাটতে শুরু করে।

দড়িটি কেটে যেতেই হ্যানার পা দুটির উপর দুই হাত রেখে সেগুলি দুই দিকে টেনে প্রসারিত করার চেষ্টা করে। লিকলকে জিভ বের করে মুখ থেকে এক ধরনের অশ্লীল শব্দ করে।

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে পেছনে ঘুরে লোকটির বুকের উপর সজোরে একটি লাথি বসিয়ে দেয় হ্যানা। বলে ওঠে, আমার পায়ের সৌন্দর্য দেখেছিস, এবার সেটার শক্তিটুকু পরখ করে দেখ!

লাথি খেয়ে টাল সামাল দিতে না পেরে দখলদারটি তাঁবুর একপাশে পুরো তাবুটি নিয়ে হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ে।

এই সুযোগে মাটি থেকে দ্রুত উঠে ঘুরে দাঁড়ায় হ্যানা। তাবুর খোলা একটি অংশ দিয়ে কোনরকমে নিজেকে গলিয়ে বের করে আনে।
যাওয়ার সময় তাবুতে পেঁচানো লোকটির দুই পায়ের মাঝখানটায় কিছু একটা নিরিখ করে। তারপর পা তুলে সজোরে আরেকটি আঘাত হানে।
লোকটি গোঙানির মতো এক ধরনের শব্দ করতে করতে এক পাশে কাত হয়ে পড়ে।

তারপর মাথা নিচু করে দ্রুত ছুটে গিয়ে সামনে রাখা কতগুলি তেলের ড্রামের পেছনে আশ্রয় নেয় হ্যানা। হাতদুটি তখনো বাধা তার! (চলবে)

RabbY khan, Debasis sorkar, Sikdar rahat, Sk rahul ali, Jannat islam, Akash islam, Parvez ali and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান  - Page 3 Empty Re: মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান

Fri Jun 04, 2021 4:41 pm
২২|

মোস্তফার একটি হাত কাঁধে নিয়ে তাকে ধরে দেয়াল ঘেঁষে ছোট ছোট পায়ে সামনে এগিয়ে চলছে মেস। পা-দুটি এখনো দুর্বল তার। নিজেকে একা সামাল দিতে পারছে না। মেসের সাহায্য নিতে হচ্ছে।

জন্তুটি এখনো দেয়ালের ওপাশে রয়ে গেছে। হন্যে হয়ে তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। এখানে বসে থাকাটা তাই আর নিরাপদ নয়।    

হাঁটতে হাঁটতে এক সময় দেয়ালের শেষ মাথায় চলে আসে তারা। ঘুরে দেয়ালের ওপাশে পা বাড়াতেই কিছু একটায় চোখ আটকে যায় তাদের।

সাদা এপ্রোন পরিহিত একটি মেয়ে দেয়ালের সাথে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। মেয়েটিকে দেখে প্রথমে থমকে যায় দুজনে। তারপর কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায় মেস।

ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকা মেয়েটি তাদের উপস্থিত টের পেয়ে ঝট করে মুখ তুলে তাকায়। সাথে সাথেই ভুত দেখার মতো চমকে ওঠে সে। ভয়ার্ত চোখ নিয়ে নড়েচড়ে কয়েক পা পিছিয়ে যায়।

সাদা এপ্রোন পড়া এই মেয়েটি আর কেউ নয়, সেই নার্সটি যে সর্বপ্রথম পরজীবী প্রাণীটিকে দেখে আইসিইউ কক্ষ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

মেয়েটি ভয়ে আতংকে এবার যেন দেয়ালের সাথে মিশে গেল প্রায়। নাকের জল চোখের জল মিলেমিশে একাকার তার। চোখের কাজলের কালি পুরো মুখ অবধি মাখামাখি।

এক মুহুর্ত পরে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল মেস। সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে বলল, আমরা তোমার কোন ক্ষতি করতে আসিনি। বাচতে হলে আমাদের সাথে আসো। আতংকিত মেয়েটি স্থির দৃষ্টি নিয়ে চোখ বড় করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে।

হঠাৎ করেই পেছন থেকে একটি শব্দ ভেসে এল তারপর। মনে হল পেছনে দেয়ালের উপর কেউ একজন লাফিয়ে উঠে পরেছে। দেয়ালটি এই মাত্রি যেন কেপে উঠেছে।

দেয়ালের ওপাশে অল্প মাথা বাড়িয়ে কিছু একটু দেখার চেষ্টা করল মেস। লাইটপোস্টের টিমটিমে আলোয় সেই লেজওয়ালা দানবটিকে এবার দেখতে পেল সে। এক লাফে দেয়ালের উপর উঠে বসে পড়েছে দানবটি। উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে চারপাশটায় এখনো কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। মুখ থেকে এক ধরনের গরগর শব্দ বের হচ্ছে।

তারপর হঠাৎ করেই মাটিতে লাফিয়ে পড়ল বিশালকায় জন্তুটি। মেস তড়িৎ গতিতে তার মাথাটি দেয়ালের ওপাশে সরিয়ে নিল। মোস্তফা বিস্ফোরিত চোখে তখনো তাকিয়ে ছিল সেদিকে।

অর্ধমানব সরীসৃপটি অনবরত পেছনের লেজটি নাড়াতে নাড়াতে সামনে একটি দালানের ধ্বংসস্তূপের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

মেয়েটিকে ইশারায় দ্রুত এদিকে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করলো মেস। প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও পরে ধীরে ধীরে সে উঠে দাড়ায়। সংকোচ ভেঙে মোস্তফার অন্যপাশে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায়।

কিছুটা পথ সামনে এগোতেই একটু দূরে একটি পুরোনো পরিত্যক্ত দালানের দেয়াল ঘেঁষে  একটি গাড়ি থামানো অবস্থায় দেখতে পেল তারা। কেউ যেন গাড়িটির সমস্ত বাতিগুলি বন্ধ করে দালানটির ছায়ার আড়ালে চুপচাপ অপেক্ষা করছে।

 মোস্তফা সেদিকে মাথা তুলে তাকিয়ে বলল, গাড়িটির দিকে চলো সবাই।
 
গাড়িটির কাছাকাছি যেতেই দরজা খুলে চালকের আসন থেকে দ্রুত পায়ে ছুটে বেরিয়ে আসলো মিকা। মোস্তফার দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই তার চেহারায় এক ধরনের মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। যেন ভারী কিছু একটা বুক থেকে নেমে গেল। পর মুহূর্তেই চোখদুটি মুছে এক দৌড়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। হয়তোবা তাকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছা হয়েছিল তার। যদিও পর মুহুর্তে নিজেকে সামলে নেয় সে।

আর কেউ কিছু খেয়াল না করলেও মোস্তফাকে দেখে তার চঞ্চলতা, মুখের সূক্ষ্ম হাসি মেসের মিনমিনে চোখদুটি ঠিকই লক্ষ্য করেছে।

এক এক করে সবাই যখন দ্রুত পায়ে গাড়িতে উঠে বসেছে। ঠিক তখনই গাড়ির পেছনের দরজাটি যখন খুলতে যাবে মেস, এমন সময় কিছু একটা শক্ত করে তার বাহুটি আঁকড়ে ধরল। ধাড়ালো নখরযুক্ত শক্তিশালী থাবাটি তার পেশির উপর বসিয়ে দিল। ব্যথায় কষ্টে মুখ দিয়ে এক ধরনের অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এলো তার। পরক্ষণেই ঘুরে গিয়ে যা দেখতে পেল তাতে রীতিমতো আঁতকে উঠল মটু। বিভীষিকাময় হিংস্র সেই পরজীবীটি তার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। সেটিকে দেখে গাড়ির ভেতর থেকে কেউ একজন আর্তচিৎকার করে উঠেছে।

পরজীবীটি তার বিকৃত এবড়োথেবড়ো হাতের থাবা বসিয়ে দিয়েছে মেসের বাহুতে। নিজেকে সে কোন ভাবেই ছাড়িয়ে নিতে পাড়ছে না এই রাক্ষসটির হাত থেকে। পর মুহুর্তেই তাকে ধরে এক রকম ছুরে ফেলল পাশের একটি ঝোপের উপর।

এদিকে গাড়িটি স্টার্ট দিয়ে খানিকটা সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে মিকা। সেটি দেখে পরজীবিটি খোঁড়াতে খোঁড়াতে গাড়িটির পিছু নিল।

যখন প্রায় গাড়িটি ছুইছুই করছে প্রানীটি, ঠিক তখনই হটাৎ করেই একটি হার্ড ব্রেক কষলো মিকা। পুরোপুরি অপ্রস্তুত প্রাণীটি সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির পেছনে ট্রাঙ্ক এর সাথে সজোরে একটি ধাক্কা খেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়লো। মুখ দিয়ে আর্তনাদের মতো শব্দ করে গর্জে উঠলো।

এবার গাড়িটি আরো কিছুটা সামনে এগিয়ে নিয়ে গেল মিকা। পর মুহুর্তেই ব্যাক গিয়ার ফেলে সজোরে চালিয়ে দিল পেছনে। জন্তুটি ততক্ষণে কোন রকমে উঠে দাড়িয়েছে। অতর্কিত এই দ্বিতীয় ধাক্কাটি সামলে উঠতে না পেরে ছিটকে গিয়ে একটি পিলারের উপর আছড়ে পরল সেটি। মাটিতে পড়ে কয়েকবার গুঙ্গিয়ে উঠল যেন। উপর্যুপরি পর পর দুটি হামলায় যেন কিছুটা আহত হয়ে পড়েছে।

এবার গাড়িটি আরো খানিকটা পিছিয়ে নিয়ে গলা হাকিয়ে মেসকে একবার ডাকল মিকা। ইতিমধ্যে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসেছে মেস। আহত বাহুটি থেকে তখনো ফোটায় ফোটায় রক্ত ঝরছে। একবার পেছনে তাকিয়ে বড় বড় পদক্ষেপে গাড়িটির দিকে ছুটে চলল সে।

এই হুলুস্থুল টের পেয়ে লেজওয়ালা দানবটি ইতিমধ্যে এদিকটায় চলে এসেছে। দরজাটি খুলে গাড়ির ভেতরে ঢুকতেই চিৎকার করে বলে উঠল মটু, পেছনে আরও একটি আছে! দ্রুত চালাও!

এবার গাড়ির প্যাডেলের উপর সজোরে পা বসিয়ে দিল মিকা। পেছনের চাকা দুটি মাটির সাথে এক ঘষায় ধুলো উড়িয়ে সামনের দিকে টেনে নিল গাড়িটি।

গাড়ির ভেতরে পেছনে মাথা ঘুরিয়ে একবার তাকাল মোস্তফা, চিৎকার করে বলে ওঠল, মিকা! গাড়ির গতি বাড়াও!

আমি চেষ্টা করছি! উত্তেজিত কণ্ঠে জবাব দেয় মিকা।

গাড়িটি আরো কিছুটা পথ সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে বাইরে দেখে মেস। পেছনে দালানের পর দালান লাফিয়ে তাদের গাড়িটির পিছু নিয়েছে লেজওয়ালা দানবটি। মোস্তফার পাশে বসে থাকা নার্সটি কাচুমাচু করে তার গলার ক্রুশটি ধরে রেখেছ।  বিরবির করে মনে মনে কিছু একটা পড়ছে।  

এক মুহুর্ত পরেই সমুদ্র শহরের রক্ষীবাহিনীদের একটি গাড়ি ঠিক তাদের পাশ কাটিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটে গেল। একটুর জন্য গাড়িটির সাথে তাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়নি।

ইজি, মিকা! ইজি! মিকার উদ্দেশ্যে ক্ষীণ গলায় কথাটি বলল মোস্তফা।

মিকা যেন নিজের সৎবিৎ হারিয়ে ফেলেছিল। সমুদ্র শহরে অবশিষ্ট মানুষের সংখ্যা খুবই কম। রাস্তাঘাটগুলি খালি। রাতের বেলায় সেগুলি আরো জনমানব শূন্য। গাড়ির টিমটিমে হেডলাইট আর মাঝে মাঝে দু একটি স্ট্রীট ল্যাম্পের আলোই তাদের সহায়। সামনে থেকে আসা গাড়িটি সে ভাল মতো দেখতে পায়নি। ঠিক যেভাবে মোস্তফা একসিডেন্ট করেছিল।  

দানবটি ইতিমধ্যে লাফিয়ে গাড়ির অন্যপাশটায় চলে এসেছে। গাড়িটির প্রায় সমান্তরালে ছুটে  চলছে। গাড়িটি এখন প্রায় ছুইছুই তার।

পরজীবি প্রানীটিকে আক্রমণ করার সময় গাড়িটির পেছনের অংশের খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি অংশ ভেঙে মাটির সাথে হেঁচড়ে এক ধরনের শব্দ করে চলছে। সেটি গাড়ির গতিও কমিয়ে দিয়েছে।

সামনে একটি বাক রয়েছে। মিকা গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে নিয়ে আসতেই হঠাৎ করে কিছু একটা তাদের ছাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। সেটির ভারে ছাদটি দেবে তাদের মাথায় এসে ঠেকেছে প্রায়।  

ধাড়ালো নখরযুক্ত হাতে গাড়ির ছাদটি আকড়ে ধরে আছে লেজওয়ালা দানবটি। বাক কাটিয়ে সামনে পথটা অনেকটাই ফাকা। গাড়িটিকে সাপের মতো করে এঁকেবেঁকে চালানোর চেষ্টা করছে মিকা। সেটির সাথে সাথে একবার ডানে তো একবার বামে হেলে পড়ছে জন্তুটি। কিন্তু লেজ নাড়িয়ে নিজের ভারসাম্য ঠিকই বজায় রাখছে সেটি।

এদিকে গাড়ির গতি আরো বাড়ানোর চেষ্টা করে চলছে মিকা। কিন্তু কোনভাবেই সেটিকে গাড়ি ছাড়া করতে পারছে না সে।

 অগত্যা একটা সময় জোরে আবার একটি হার্ড ব্রেক করে বসল সে। তাতে যেন কাজও হল। জন্তুটি গতির সাথে নিজেকে সামাল দিতে না পেরে ছিটকে গাড়ির সামনে গিয়ে আছড়ে পড়ল।
 
এবার সেটির উপর দিয়ে গাড়িটি চালিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য প্যাডেলে সজোরে চাপ দেয় মিকা।

 কিন্তু প্রচন্ড ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন এই জন্তুটি মুহূর্তেই উঠে দাঁড়ায়। তারপর নিজের দুই হাত দিয়ে গাড়িটির সামনের বাম্পারটি চেপে ধরে। প্রচন্ড পেশিশক্তি খাটিয়ে গাড়িটিকে এক রকম থামিয়ে দেয়।

 প্রাণপণে গাড়িটির গতি বাড়ানোর চেষ্টা করে যেতে থাকে মিকা। পেছনের চাকাগুলি ধূলো উড়িয়ে সজোরে ঘুরতে থাকে। কিন্তু কোনভাবেই সেটির শক্তির সাথে এই দুর্বল গাড়িটি পেরে উঠছে না।

অগত্যা এক সময় হার মেনে বসে গাড়িটি। হঠাৎ করেই স্টার্টটি বন্ধ হয়ে যায়। ভাঙ্গা চোরা দুমড়ানো মোচড়ানো জিপটি এবার দানবটির কাছে নতজানু হয়ে পড়ে।

গাড়িটি পুনরায় স্টার্ট দেয়ার জন্য অনবরত চাবিটি ঘুরিয়ে যেতে থাকে মিকা।

লেজওয়ালা দানবটি এবার বড় বড় পদক্ষেপে গাড়িটির চালকের আসনের দিকে এগিয়ে যায়। এক হাতে হ্যাচকা টান দিয়ে দরজাটি উপড়ে ফেলে। সেটি দেখে মিকার মুখ দিয়ে অস্ফুট একটি আর্তনাদ বেরিয়ে আসে।

দানবটি তাকে ধরতে যাবে, ঠিক সেই মুহুর্তে কেউ একজন পেছন থেকে সেটিকে আঘাত করে বসে।

জন্তুটি পেছনে ঘুরতেই দেখতে পায় মেস একটি স্টিলের পাইপ হাতে নিয়ে সেটির দিকে তেড়েফুড়ে আসছে।

পাইপটির উপর্যুপরি কয়েকটি আঘাতে জন্তুটি যেন একটু হকচকিয়ে যায়। দুই হাত সামনে বাড়িয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। মেসের পেশীবহুল শরীরের আঘাত যে একদম ফেলনা নয় সেটি কিছুটা বুঝতে পারে দানবটি।

পর মুহুর্তে কোন উপায় অন্তর না দেখে তার লেজটি সামনের দিকে চালিয়ে দেয়। লেজের আঘাতটি মেসের হাতে গিয়ে লাগে। মুহুর্তেই  স্টিলের পাইপটি হাত থেকে এক দিকে ছিটকে পড়ে।

পরমুহূর্তেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ষিপ্র গতিতে  হাত বাড়িয়ে মেসের গলা চেপে ধরে দানবটি। সেটির ক্ষিপ্রতার কাছে একরকম পরাস্ত হয় ধীর গতির মেস। মুহুর্তেই তাকে মাটি থেকে শুন্যে তুলে ফেলে জন্তুটি। সেটির মজবুত থাবায় দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয় তার। পা দুটি সজোরে ছুড়তে থাকে মেস। তার চোখের দৃষ্টি যেন এবার কমে আসছে। শরীরের সব বল হারিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু জন্তুটি তখনো তার ঘাড় মটকে দেয়নি বরং এক দৃষ্টি নিয়ে কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রথমবারের মতো সেটির চোখের চাহুনটি দেখতে পায় মেস। তার কাছে বড্ড চেনা চেনা লাগে সেই দৃষ্টি। মনে হয় বহু দিনের পরিচিত কেউ কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার পুরো অপরিচিত অচেনা সবকিছু।

ধীরে ধীরে হিংস্র কঠিন সেই চাহুনটিতে এক ধরনের অসহায়ত্ব, কোমলতা ফুটে ওঠে।

 তার পরপরই মেসকে ধরে রাখা হাতটির মুষ্টি খুলে যায়। মাটিতে পড়ে যায় সে।

 প্রাণীটি পেছনে ঘুরে লাফিয়ে একটি দালানের উপর উঠে পড়ে। তারপর আরেকটি দালানের উপর। এভাবে কয়েক মুহুর্তের মধ্যে সেটি অন্ধকারে কোথাও মিলিয়ে যায়।

  এদিকে দৌড়ে তার কাছে ছুটে আসে মিকা। তাকে ধরে দাড় করানোর চেষ্টা করে।
ক্লান্ত মেস গাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ক্ষীন গলায় জানতে চায় মোস্তফা, কি হয়েছিল?

  মেস কোন জবাব দিতে পারে না।

অস্ত্রের প্রয়োজন আমাদের। আমরা এভাবে খালি হাতে লড়াই করে বাচতে পারবো না। শক্ত গলায় কথাটি বলে ওঠে মিকা। তার চোখে মুখে কাঠিন্য।

মেস তবুও কোন জবাব দেয় না। একদৃষ্টিতে শুধু পেছনে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। (চলবে)

RabbY khan, Debasis sorkar, Nishad jaman, Apon arnob, Nishan ahmed, Akram ali, Said ahmed and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান  - Page 3 Empty Re: মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান

Fri Jun 04, 2021 4:42 pm
২৩|

জং ধরা এবড়ো থেবড়ো তেলের ড্রামগুলির পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিল হ্যানা। এখন সম্ভবত মধ্যরাত, বেশিরভাগ তাবুগুলিতে আলো নিভে গিয়েছে। আধা ভাঙ্গা চাঁদের আলোয় চারিদিকটা তাই অস্পষ্ট।

বেশ খানিকটা দূরে অল্প কিছু কাঠ খড় দিয়ে মৃদু আগুন জ্বলছে। সম্ভবত এখনো কয়েকটি দখলদার জেগে আছে। পান করছে।

এই মুহূর্তে তার প্রথম কাজটি হলো হাতের বন্ধনীটি খোলা। আশেপাশে কিছু একটা খুঁজতে শুরু করলো হ্যানা। ধারালো কিছু একটা, যেটি দিয়ে হাতের বন্ধনী কেটে ফেলতে পারবে।

ড্রামগুলির একটির তলে নাক লাগিয়ে একবার শুকে দেখার চেষ্টা করল সে। পুরনো পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ রয়েছে সেগুলি ভর্তি করে।

হঠাৎ করেই তার থেকে ১০-১২ ফুট দূরে একটি তাবু থেকে বাচ্চা মতো ছোট আকারের কেউ একজন যেন বেরিয়ে এলো। প্রথমে সেটিকে বাচ্চা মনে হলেও একটু পরে বুঝতে পারল ছোটখাটো বেটে মত হাফপ্যান্ট পরা টাকলা একটি লোক সেটি।

 মাথায় চুল কম ছোটখাটো গড়নের লোকটির হাফ প্যান্টটি ঝুলে অনেকটা ফুল প্যান্টের মত হয়ে গেছে। গায়ে ছোট আলখাল্লার মতো চাদর জরানো লোকটি প্রথমে আকাশের দিকে একবার তাকালো, তারপর গলা ছেড়ে কেশে একদলা থুতু ফেলল মাটিতে। তারপর হুইস্কির বোতলে এক চুমুক দিয়ে রাতের আড্ডায় যোগ দিতে ছোট ছোট পায়ে সামনে হেটে চলল।

এক মুহূর্ত দেরি না করে নিচু হয়ে দ্রুত পায়ে বেটে লোকটির তাবুর দিকে এগিয়ে গেল হ্যানা।

একটু মাথা বাড়িয়ে আশপাশটা একবার দেখে নিল সে। এই পাশটা শুনসান, নীরব।

ভয়ে ভয়ে তাবুর ভেতর মাথা বাড়িয়ে একবার উঁকি দিল। ভেতরটা খালি। একটা বিছানা পাতা রয়েছে সেখানে। তার ঠিক পাশেই কয়েকটি হকিস্টিক, লাঠিসোটা রাখা আছে। ধারালো কিছু একটা খুঁজে চলছে হ্যানা কিন্তু আশেপাশে সেরকম কিছু চোখে পড়ছে না।

পা দিয়ে লাঠিসোটাগুলি সামনে-পিছে সরিয়ে কিছু একটা খুঁজতেই হঠাৎ করে পেছনে কেউ একজন এসে দাঁড়ালো তার। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখতে পেল সেই টেকো মাথার বেটে দখলদারটি।

হ্যানাকে দেখে প্রথমে কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে পরল সে। হ্যানা মাথা নেড়ে এক ধরনের অসহায় ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

দখলদারটি এবার মাথা বের করে তাবুর বাইরে একবার তাকালো। তারপর হ্যানার দিকে ফিরে কোন রকম কথা না বলে তার পেছন থেকে একটি ছোট্ট ছোড়া বের করল। ইশারায় তাকে কাছে যেতে বলল।

ভয়ে ভয়ে তার কাছে এগিয়ে গেলে এক ঝটকায় তাকে পেছনে ঘুরিয়ে হাতের বন্ধন কেটে দিল বেটেটা। তারপর নিচু গলায় বলল, আমাকে অনুসরণ করো। বলেই হ্যানার হাতটি শক্ত করে ধরে তাকে তাবুর বাইরে বের করে আনলো।

মৃদু চাঁদের আলোয় দ্রুত পদক্ষেপে নিচু হয়ে কয়েকটি তাবু পার হলো তারা।

একটি তাঁবুর পেছনে আসতেই হঠাৎ ভেতর থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠল, বাইরে কে রে?

মরগান। বেটেটি উত্তর দিল। তাঁবুর ভেতর থেকে আর কোন সাড়া শব্দ এলো না।

বেশ কয়েকটি তাবু পেড়িয়ে অবশেষে রাস্তার পাশে চলে আসল তারা। দখলদারদের কেউ তখনো কিছু টের পায়নি।

হ্যানা এবার লোকটির হাত থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সেই যে হাতটি ধরেছে বেটেটা এখন পর্যন্ত সেটি ছাড়েনি। এবার এক অদ্ভুত  কান্ড করে বসলো সে। হ্যানার হাতটি তার বুকের উপর নিয়ে এমনভাবে তাকালো, যেন তাকে নিয়ে এখনই কোথাও ভেগে যেতে চাইছে বেটেটা। তারপর বাকি জীবন তাকে নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার পাতবে সে। আঁধো চাঁদের আলোয় লোকটির চোখের চাহনি দেখে যেন বিষয়টি আঁচ করতে পারল হ্যানা। বিষয়টি বুঝতে পেরে এক ধরনের অস্বস্তিতে পড়ে গেল সে। এবার বেটেটা ফিস ফিস করে তাকে এখানে অপেক্ষা করতে বলল। তারপর একটি গাড়ি বা বাইক কিছু একটা আনতে ওপাশে চলে গেল।

এরমধ্যে দূরে একটি গাড়ির হেডলাইটের অল্প আলো চোখে এসে পড়ল হ্যানার। গাড়িটি কিছুটা সামনে আসতেই বুঝতে পারল সেটি একটি ক্যাডিলাক। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়িটির হেডলাইটগুলি নিভে গেল। টিমটিমে আলোর পার্কিং লাইটগুলি জ্বলে উঠল। গাড়িতে আর কেউই নয়, জ্যাক।

হ্যানা দ্রুত পায়ে গাড়িটির দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎই এক পলক পেছনে তাকাতেই সেই বেটে লোকটিকে দেখতে পেল সে। একটি বাইক সাথে নিয়ে তাদের দেখে ভুত দেখার মতো করে অবাক হয়ে দাড়িয়ে আছে সে। হ্যানা তার দিকে একবার অসহায়ের দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর জ্যাকের গাড়ির দরজা খুলে তাতে চড়ে বসল।

পেছনে আর তাকানোর সাহস হল না তার। এক রকম মায়াই হল বেচারার জন্য।

বেঁটেখাটো টেকো মাথার দখলদারটি এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল তাদের দিকে, মুলত জ্যাকের দিকে।

রীতিমত হতভম্ব জ্যাক হ্যানার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কে এটা? তোমার বয়ফ্রেন্ড না তো?

হ্যানা কোন উত্তর দিল না। কথাটি পছন্দ হয়নি তার।

গাড়ি নিয়ে কিছুটা পথ এগিয়েছে তারা, এর মধ্যে হঠাৎ করেই পেছন বাইকের ঘরঘর শব্দ শুনতে পেল। তাদের থেকে খানিকটা দূরে অনেকগুলি হেডলাইটের আলো দেখা যাচ্ছে। কেউ বা কারা হকিস্টিক দিয়ে পিটাপিটি করতে করতে এই দিকে এগিয়ে আসছে।

পেছনে লাফিয়ে লাফিয়ে একে একে বাইকগুলি রাস্তার উপর উঠে চলছে। ধুলো উড়িয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে জ্যাকের গাড়ির পিছু নিয়েছে দখলদার বাহিনী। ইতিমধ্যে পুরো দখলদার শিবিরে খবর রটে গেছে সুন্দরী হ্যানা কোন এক সুদর্শনের হাত ধরে পলায়ন করেছে।

রেয়ার মিররে বাইকের হেডলাইটগুলি প্রতিফলিত হয়ে জ্যাকের চোখ মুখ ঝাঁঝিয়ে দিচ্ছে।

আমি ঠিক তোমাকে আশা করিনি। সামনের পথের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্কভাবে মাথার চুল বাঁধতে বাঁধতে কথাটি বলল হ্যানা।

জ্যাক কিছুক্ষণ কোন উত্তর দিল না। আসলে উত্তর দিতে পারল না। হ্যানার মুখ থেকে এরকম কিছু একটা শুনবে সেটা সেও আশা করেনি। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে।

প্রচন্ড গতিতে মরুভূমির মাঝখান দিয়ে এগিয়ে চলছে জাকের ক্যাডিলাক। পিছনে উদ্ভট চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যেও আড়চোখে জ্যাকের দিকে একবার তাকিয়ে নিল হ্যানা। জ্যাকের অপ্রস্তুত ইতস্তত ভাবখানা চোখ এড়িয়ে গেল না তার।

একটি ভাঙাচোরা বাইক খটমট শব্দ করতে করতে জ্যাকের ক্যাডিলাকের অনেকটা পাশে চলে এসেছে। জ্যাকের দিকে তাকিয়ে বাইকে বসা লোকটি তার হলদে দাঁত বের করে কিটমিট করতে যাবে, ঠিক এমন সময় দাঁতে দাঁত চেপে থাকা জ্যাক গাড়ির হুইলটি এক ঝটকায় একবার ডানে ঘুরিয়ে দিল। জ্যাকের অতর্কিত হামলায় গতি সামাল দিতে না পেরে বাইক নিয়ে সোজা একটি খাদে উল্টে পড়ল নোংরা হলদে দাঁতের দখলদারটি। কার রাগ কার উপর ঝাড়লো জ্যাক এই মুহূর্তে ঠিক সেটি বোঝা গেল না।

বাহিনীর একজনের উপর এরকম অতর্কিত হামলায় বাকি সবাই যেন এবার রেগে আগুন। পেছন থেকে হৈ হৈ শব্দ জুড়ে দিয়েছে সবাই। একবার নাগালে পেলে টুকরো টুকরো করে করে ছাড়বে।

ব্যস্ততার ভঙ্গি নিয়ে রেয়ার মিরর দিয়ে মাথা নিচু করে একবার পেছনে তাকাল জ্যাক। তারপর বলল, তুমি কি অন্য কাউকে আশা করেছিলে?

হ্যানা এবার একটু ভ্রু কুচকালো। এত লম্বা সময় পরে জ্যাকের কাছ থেকে উত্তর আশা করেনি সে, চোখ দুটি  ছোট করে একটু মজা করার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, কিছু বললে তুমি?

জ্যাক কোন উত্তর দিতে পারল না। এতক্ষণ পরে হেনার কথার জবাব দিয়ে নিজেই একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। একটু লজ্জা পেয়ে যেন চুপ হয়ে গেল সে।

এরপর কিছুক্ষণ তাদের মধ্যে কোনো কথা হল না। পেছনে কিন্তু বাদ্য-যন্ত্র বেজেই চলছে। সেদিকে ওদের দুজনের কারো খেয়াল আছে বলে এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে না। হ্যানাকে দেখে নির্ভার লাগছিল একটু। চুলগুলো খুলে সে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছে। এরকম নিশ্চিন্ত উদাসীন আচরণ যেন ঠিক পছন্দ হলো না জ্যাকের। ভেতরে ভেতরে কিছু একটা যেন পোড়াচ্ছিল তাকে।

আসলে তোমাকে আমাদের প্রয়োজন। তাই আমাকে আসতে হয়েছে। কোন কিছু না ভেবেই যেন মুখ ফসকে কথাটি বলে ফেলল জ্যাক। এর পরিনতি কি হবে সেটি বোধ হয় হ্যানার দিকে একবার তাকিয়ে কিছুটা আচ করতে পারল এবার। হঠাৎ করেই যেন তার পাশে বসে থাকা এই মানুষটি মূর্তি বনে গেছে।

আমি একটি সেরাম সংগ্রহ করেছি। জ্যাক তার কথার ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করল।

কিন্তু তাতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হলো বৈকি স্বাভাবিক হওয়ার কোন আভাস পাওয়া গেল না। এক মুহূর্তের জন্য তার কাছে মনে হল পেছনের চেয়ে তার পাশে একটি বড় ঝড় ফুলে-ফেঁপে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে।

গাড়ি থামাও! হঠাৎ করেই যেন একটু চিৎকারের স্বরে বলে উঠল হ্যানা।

কিহ! আকাশ থেকে যেন পড়ল জ্যাক। পেছনে মাথা ঘুরিয়ে আরেকবার তাকাল সে। হগ তাঁর বাহিনী নিয়ে অনেকটা জটলা করে ফেলেছে।

সামনে একটি তিন রাস্তার বাক। হাতের ডানে মোড় নিবে বলে ঠিক করেছে জ্যাক। বামের রাস্তায় একটু দূরে আরেকটি বাইকের দল দেখা গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে এক সাথে অনেকগুলি হেডলাইট জ্বলে উঠল।

অনেকগুলি থেমে থাকা বাইক রাস্তার ওপাশটা থেকে তাদের অ্যাক্সিলারেটর ঘোরাচ্ছিল। আর চারপাশটা ভমভম শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। হ্যানা দ্রুত সেইদিকে মাথা ঘুরে তাকালো। আরো একটি দল রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায়। দৃশ্যটি রীতিমত অবাক করলো তাকে।

মোড়ের কাছাকাছি ক্যাডিলাকটি নিয়ে আসতেই একটা তীক্ষ্ণ বাঁক নিলো জ্যাক। হ্যানা লক্ষ করল তার চেহারাতে কোন অভিব্যক্তি নেই। বরং এখন তাকে কিছুটা নির্ভার লাগছে।

কয়েক মুহুর্ত পর তার রেডিওতে অজ্ঞাত একটি কন্ঠ বেজে উঠলো, কন্ঠের মালিক বলল,
পেছনে না তাকিয়ে সোজা সামনে এগিয়ে যাও। আমার লোকেরা ওদের খাতির-যত্নে কোন রকম ছাড় দেবে না। কথাটি শেষ না হতেই রেডিওর যান্ত্রিক কণ্ঠটি কেটে গেল।

কে এটা? উৎসুক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল হ্যানা।

জ্যাক কোন উত্তর দিল না। কিন্তু মিটিমিটি হাসি থামিয়ে রাখতে পারল না।

ইতিমধ্যে হ্যানার মেজাজ তিরিক্ষে। তাকে আর টেস্ট করার সাহস পেল না জ্যাক, সরাসরি বলল, এটা মোস্তফার পুরনো বন্ধু, নাঈম হামজা!

কথাটি শুনে মুখ বাঁকা করে এক ঝটকায় মাথা ঘুরিয়ে নিল হ্যানা। কিছুক্ষন আর কোন কথা বলল না। গাড়িটি কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর বোঝা গেল তারা জঞ্জাল পেরিয়ে অনেক দূরে এগিয়ে এসেছে। হঠাৎ করেই পুরনো কিছু একটা মনে পরল হ্যানার, গলা বাজিয়ে বলে উঠল, গাড়ি থামাও!

আবার! নিচু গলায় বলল জ্যাক। সে রীতিমতো বিরক্ত এবার।

আমি গাড়ি থামাতে বলেছি! যেন দাত কটমট করছে সে।

মেয়েদের এই ধরনের অদ্ভুত আচরণ সত্যিই বুঝতে পারে না জ্যাক। আপন-মনে একবার মাথা নাড়ে সে। তারপর গাড়ির সাইড মিরর দিয়ে পেছনে তাকায়।

ভিড়ভাট্টা অনেক পেছনে ফেলে এসেছে তারা। আশপাশে কোনো রকমের কোলাহল নেই এই মুহূর্তে। ধুধু মরুভুমি মাঝখানের রাস্তা ধরে একটি ঝোপের পাশ ধরে গাড়িটির গতি কমিয়ে আনলো জ্যাক।

কিছু একটা ভেবে গাড়ির হেড লাইট দুটি বন্ধ করে দিল। উপরে চাঁদের নরম আলো, মরুভূমি জুড়ে বয়ে চলা মৃদু বাতাস চারদিকে একটা মনোরম পরিবেশ তৈরি করেছে। যদি তাতে মেয়েটার মন গলে কিছুটা!

গাড়িটি থামার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো হ্যানা। জ্যাক কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন ফিরে হাঁটা দিল সে।

হ্যানা! কি ব্যাপার! গাড়ি থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে হ্যানাকে ধরার চেষ্টা করল জ্যাক।

আমি সমুদ্র শহর আর যাচ্ছি না। মাথা নাড়তে নাড়তে উত্তর দিল হ্যানা।

কি বলছ?

সেখানে আমার আর কোন কাজ নেই।

কিন্তু তুমি একজন ডিপ্লোমেট!

হুম। আমি তা জানি। আর তাই কোন অ্যাডভেঞ্চার আমার কাজ নয়! দূত হিসেবে আমার যা কাজ ছিল আমি মনে করি যথেষ্ট করেছি। এবার আমার নিজের শহরে ফিরে যাওয়া উচিত।

কিন্তু এই রাতে? আমি তোমাকে কালকে সকালে বন্দরে পৌঁছে দেই!

সেটির কোন প্রয়োজন নেই। আমি এখান থেকে বন্দরে যাওয়ার কোন একটি যান খুঁজে নিতে পারব। আমার মনে হয় আমি নিজের যথেষ্ট দেখাশোনা করতে পারি। কাঁটা কাঁটা গলায় জবাব দিল হ্যানা।

জ্যাক কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছনে দূরে একটি বাইকের ঘর ঘর শব্দ শোনা গেল। আধো নিভু হেডলাইটটি জালিয়ে বাইকটি এদিকেই এগিয়ে আসছে।

কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে সেই দিকে তাকিয়ে থাকে জ্যাক। বোঝার চেষ্টা করে কার বাইক? কে সেটা?

একবার মনে হয় সেটি মোস্তফার বন্ধু হামজা কিন্তু পরক্ষণেই তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়, যখন কেউ একজন একটি হাতবোমা ঠিক তাদের দিকেই ছুঁড়ে মারে।

তৎক্ষণাৎ হ্যানার কাঁধে হাত রেখে তাকেসহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল জ্যাক। দুজনে কোন রকমে গড়িয়ে ক্যাডিলাকটির পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিল।

ইতিমধ্যে হাতবোমাটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণ করে ফেটে পড়েছে। ক্যাডিলাকটির গায়ে সেটির বিস্ফোরণের কণাগুলি শব্দ করে গিয়ে বিধেছে।
মনে হল যেন বোমার কণাগুলি জ্যাকের বুকের ভেতরে গিয়ে বাধল।
হ্যানার চেয়ে গাড়ির প্রতি জ্যাকের এই অতি সংবেদনশীল আচরণটি খেয়াল করতেই যেন পিত্তি জ্বলে উঠলো তার।

জ্যাক হ্যানার হাত ধরে তাকে কোন রকমে টেনেটুনে গাড়িতে তুলল। কয়েকবার চাবি ঘোরাতেই ঘরঘর শব্দ তুলে স্টার্ট নিল তার ক্যাডিলাকটি। এক্সিলারেটরে একটা চাপ দিতেই তীরের গতিতে সামনে এগিয়ে চলল জ্যাকের যান্ত্রিক পশুটি।

মুখ দিয়ে প্রায় এক রকম চিৎকার করে উঠল জ্যাক, এই হল আমার ক্যাডিলাক! বিপদের মুহূর্তে কখনো তার বন্ধুকে নিরাশ করে না।

গাড়িটি কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতেই হ্যানার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে জ্যাক, তুমি ঠিক আছো তো?

তার কটমটে চোখের চাহনিতে উত্তর পেয়ে যায় জ্যাক।

তারপর ফিসফিস করে আবার জিজ্ঞেস করল, কে ছিল ওটা?

ওটা হগ। ওদের দলনেতা। কাটা কাটা স্বরে জবাব দেয় হ্যানা।

আমাকে বন্দরে পৌঁছে দাও! হ্যানার কন্ঠে এখনো ধার।

আমি ভোরের আগেই তোমাকে পৌছে দিব।

কথাটি শুনে যেন ক্ষুরধার চেহারার এই মেয়েটি খুব একটা খুশি হয়নি। সে জ্যাকের মুখ থেকে আরো কিছু একটা শুনতে চেয়েছে। হয়তোবা কোন ধরনের অনুরোধ, দাবী।

হ্যানার নীরবতায় কিছু একটা যেন বুঝতে পারল জ্যাক। মেয়েরা সবসময় নিজে থেকে মুখ ফুটে সবকিছু বলে না। নিজেরা ছোট হতেও চায় না। তাই চালটি এখন জ্যাকের। এটা ছোট হওয়া নয় বরং পুরুষ হিসেবে তার উদারতা।

হ্যানার দিকে মাথা ঘুরিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে জ্যাক, হঠাৎই পেছন থেকে আরেকটি হাতবোমা।কোনরকমে গাড়িটি ঘুরিয়ে সেটি পাশ কাটিয়ে যেতে পারল সে এইবারটা।

কিন্তু মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই বুঝতে পারল এবার রক্ষা পেলেও বেশিক্ষণ এই লোকটার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। ওর থলিতে সম্ভবত আরো অনেকগুলি হাতবোমা রয়েছে। আর সে অনবরত তার থলে হাতড়ে বেড়াচ্ছে!

আমি বলতে চাচ্ছিলাম ...  হ্যানার দিকে আবার ফিরে তাকাল জ্যাক। হ্যানা কিছু একটা শোনার জন্য বেশ আগ্রহ নিয়ে তার দিকে ঘুরলো কিন্তু ততক্ষণে আরেকটি হাতবোমা গাড়ির অন্য এক পাশে গিয়ে পড়েছে। গাড়িটি এবার জোরে একটি ঝাকি দিয়ে উঠল। জ্যাক তার পুরো মনোযোগ গাড়ি চালানোর দিকে কেন্দ্রীভূত করল।

প্রেম চলছে! গাড়ির ভেতর! ঝোলা থেকে আরেকটি হাতবোমা বের করতে করতে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে কথাটি বলে উঠল হগ।

কথাটি শুনে যেন রাগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠল হ্যানা। একটা সুযোগ পেলে মনে হয় টুকরো টুকরো করে ছাড়বে এই হগকে।

হঠাৎ করেই একটি গ্রেনেড হ্যানার সিটের ঠিক পাশে এসে টুং শব্দ করে উল্টে পরল।

সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল জ্যাক।

কোন রকম পাত্তা না দিয়ে ঝট করে গ্রেনেডটি হাতে তুলে নিল হ্যানা। সেটি মুখে নিয়ে দাঁতে কামড়ে হগের আধখোলা পিনটির বাকিটা টেনে খুলে ফেলল। তারপর সঙ্গে সঙ্গে পেছনে ঘুরে হগের বাইক লক্ষ্য করে সেটি ছুঁড়ে মারলো। দাত কিরমির করে চেচিয়ে বলে উঠলো, কারো কথার মাঝে কথা বলতে নেই, হতচ্ছাড়া!

হ্যানার হাতে তারই ছুড়ে মারা গ্রেনেড দেখে হতবম্ভ হগের চোখদুটি এবার কোটোর ছাড়া হয়ে যাবার উপক্রম হল। প্রাণপণে বাইকের ব্রেক কষার চেষ্টা করল সে কিন্তু ততক্ষণে অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে। গ্রেনেডটি সরাসরি তার বাইকের চাকার নিচে আছড়ে পড়েছে।
পর মুহূর্তেই পেছনে একরাশ ধুলো উড়িয়ে বাইকসহ ধুলোর পেছনে হারিয়ে গেল হগ আর তার সাথে সাথে গেল তার আর্তচিৎকারও।

দৃশ্যটি দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় জ্যাকের মুখ থেকে কোন রা বেরোলো না। শুধু অস্ফুটস্বরে কিছু একটা বলল, আমার পাশেই তো একটা টাইম বোম!

তুমি কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলে? এবার জ্যাকের দিকে ফিরে নিজের চুলগুলো বাতাসে ছাড়তে ছাড়তে বলল হ্যানা।

ইয়ে মানে ... আমার কাছে একটা স্যাম্পল আছে। অনেকটা তোতলাতে তোতলাতে কথাটি বলল জ্যাক। আমার মনে হয়, সেটা একবার দেখে যাওয়া উচিত তোমার।

এবার মৃদু একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল হ্যানার মায়াবী চেহারায়। চুলগুলি ইতিমধ্যে বাতাসে ছেড়ে দিয়েছে সে। জ্যাক আড়চোখে সেই দৃশ্যটি একবার দেখার চেষ্টাও করে ফেলেছে।
(চলবে)

RabbY khan, Sikdar rahat, Sk rahul ali, Jannat islam, Apon arnob, Parvez ali, Akram ali and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান  - Page 3 Empty Re: মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান

Fri Jun 04, 2021 4:43 pm
২৪|

সমুদ্র শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত সুউচ্চ একটি ভবনের শীর্ষ তলায় জ্যাকের ডেরা। বিকেল গড়িয়ে এখন সন্ধ্যা। অন্ধকারের চাদর পুরো শহর ঢেকে দিয়েছে।

গতকালের ঘটনাদ্বয়ের পর আজ সারাদিনই সবার ভেতরে এক ধরনের থমথমে ভাব বিরাজ করেছে। মেস দিনভর ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। সন্ধ্যার দিকে ঘুম ভেঙে সবার সাথে একটু হাসি ঠাট্টা করার চেষ্টা করছে। বেশি সময় গুরু গম্ভীরভাবে বসে থাকার পাত্র সে নয়।

গতকাল কি ঘটেছে সবকিছু ভুলে গিয়ে কিচেন থেকে নিজ হাতে সবার জন্য নুডুলস বানিয়ে নিয়ে এসেছে। নিজেই সবাইকে সেটি সারভ করে করে দিচ্ছে। যদিও খাবারটি এক ধরনের অখাদ্য কিন্তু নিষ্পাপ মেসের চেহারাটির কথা ভেবে অল্প একটু ড্রিংকস এর সাথে খুব মজা হয়েছে এমন ভান করে সবাই সেটি খেয়ে নিচ্ছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পানীয় তার কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে। সবার ভেতরে এক ধরনের ফুর্তি ফুর্তি ভাব চলে এসেছে। কক্ষের ভেতরে হাসি ঠাট্টা শুরু হয়ে গেছে। মোস্তফা ও মিকা ক্ষণে ক্ষণেই একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। আর মেস তাদের মাঝে বাগড়া দিয়ে যাচ্ছে।

যদিও হ্যানা এই জম্পেশ আড্ডা মিস করছে। স্যাম্পলটি নিয়ে গবেষণায় সে সারাদিন পার করে দিয়েছে।

জ্যাক ভাবল হ্যানাকে একটু সময় দেওয়া উচিত। 'এক্সকিউজ মি' বলে আড্ডা থেকে নিজেকে একটু সরিয়ে নিয়ে হেনার কক্ষের দিকে পা বাড়ালো সে।

হ্যানা মাইক্রোস্কোপের উপর চোখ বসিয়ে কিছুটা সামনে নিচু হয়ে গভীর মনোযোগে স্যাম্পলটি পর্যবেক্ষণ করছিল। জ্যাক তার উচু হয়ে থাকা পশ্চাৎদেশ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে টেবিলের পাশে একটি টুলের উপর বসল। তাকে দেখেও না দেখার ভান করল হ্যানা।
পানিয়ের গ্লাসটি টেবিলের উপর রেখে এবার তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো জ্যাক। অনেকটা গা ঘেঁষে অণুবীক্ষণ যন্ত্রেটির দিকে মাথা বাড়াল সে।

হঠাৎই জ্যাকের কোমর হ্যানার সরু কোমরের সাথে মৃদু একটা ধাক্কা খেলো। পানীয় চড়ে গেছে তার মাথায়। তা না হলে এই টাইম-বোমার সাথে এরূপ আচরণ করার সাহস হতো না তার।

অণুবীক্ষণ যন্ত্র থেকে মাথা না তুলেই হ্যানা তার ডান হাত দিয়ে সজোরে এক ধাক্কা দিলো তাকে।
পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিয়ে পেছনে তাকাল জ্যাক। তাদের থেকে কিছুটা দূরে একটি থামের উপর পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেস। সামনে ঝুঁকে থাকা গভীর মনোযোগী হ্যানার নিতম্বের উপর চোখ তার। মিনমিনে চোখজোড়া যেন ইতিমধ্যে আরো ছোট হয়ে এসেছে। ঠিক যেন জুম করে কিছু একটা দেখছে।

ব্যাপারটি জ্যাকের একদমই সহ্য হল না। দ্রুতপায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল সে। মাথা বাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ভেতরে চলো! ওকে কাজ করতে দাও।

আজ তোমার স্থানে মেস অব্রাদোভিক থাকতে পারতো! বুকে এক হাত রেখে চোখ দুটি কুঁচকে বিষাদ ভরা মন নিয়ে বলল মেস।

ভালোই অভিনয় পারো তুমি! হাসল জ্যাক।

এক রকম টেনেটুনে ওকে নিয়ে বৈঠক ঘরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মুখ দিয়ে 'ওহ' করে একটি শব্দ বেরিয়েই গেল তার। শব্দটি শুনতে পেয়ে বিরক্তির দৃষ্টি নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল হ্যানা। এক রকম হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি করে টানতে টানতে কক্ষ থেকে মেসকে বের করে নিয়ে গেল জ্যাক।

তোমাকে আসলে এসব বলাই উচিৎ হয়নি। দাঁতে দাঁত চেপে বলল সে।

আমি তো আগেই জানতাম, সাহসী, এক মহীয়সী নারী সে! হ্যানার উপর বিস্ময়ে অভিভূত মেস। এখনো তার বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি। বলো না! ও কিভাবে ঘায়েল করল দস্যুটাকে?

অনেকবার বলেছি তোমাকে!

আরেকবার বলো! আধা খোলা পিনটি নিজে হাতে খুলে ফেলল! ওরকম একটা গ্রেনেড তো আমি হলেও হাতে নেয়ার সাহস পেতাম না! অসাধারণ! আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল সে। তুমি হলে হাতে নিতে, জ্যাক?

জ্যাক কোন উত্তর দিল না।

বৈঠক ঘরে একটি সোফার উপর গা হেলিয়ে আধা শোয়া অবস্থায় বসে আছে মোস্তফা। তার ঠিক পাশে তার হাতটি ধরে একটি টুলের উপর বসে একদৃষ্টিতে মোস্তফাকে দেখছে মিকা। জ্যাক ও মেসের অতর্কিতভাবে ঢুকে পড়ায় একটু নড়েচড়ে বসল সে।

ছোট্ট একটা কাশি দিল জ্যাক। তারপর মেসকে নিয়ে এক রকম টেনে একটি সোফার উপর বসে পড়ল দুজনে। মেসের দেহের ভারে সোফাটি এক দিকে হেলে পড়ল।

মেসের ভেতরের অস্থিরতা খেয়াল করেছে মিকা, একটা মুচকি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার? কিছু হয়েছে নাকি?

অন্যমনস্ক মেস আনমনে কয়েকবার মাথা নাড়লো। মনে হচ্ছিল কোন কিছু নিয়ে ভীষণ হতাশাগ্রস্ত সে।

জ্যাক! আমার বন্ধুটির খাতির-যত্নের কি কমতি হচ্ছে? এবার মোস্তফা মুখ খুলল। জ্যাকের দিকে চোখ তুলে তাকালো।

একটা মুচকি হাসি দিল জ্যাক। তারপর দুজনের মধ্যে ইশারায় ইশারায় কি যেন একটা কথা হল। মেস কিংবা মিকা তাদের কেউই সেটি ধরতে পারল না। পুরনো দুই বন্ধুর পুরনো কোন ভাষা।

কয়েক মুহূর্ত পর ঘরের প্রবেশদ্বারের সামনে এসে দাঁড়ালো হ্যানা। এক হাত দরজার পিলারের উপর অন্য হাত কোমরে রেখে তাদের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকালো সে। চেহারায় গাম্ভীর্য ভাব, গভীর চিন্তার রেখা।
পর মুহূর্তেই কক্ষের ভেতর হাসি-ঠাট্টা থেমে গেল। সবাই চুপচাপ হেনার দিকে মনোযোগ দিল।

সেরামটিতে আমি মানুষের ডিএনএ খুজে পেয়েছি। শান্ত গলায় কথাটি বলল হ্যানা।

নিমেষেই চেহারা থেকে আমুদে সব ভাব উবে গেল মেসের। সেখানে এক ধরনের চাপা অস্থিরতা এসে ভর করল। বিষয়টি কক্ষের কারো চোখ এড়িয়ে গেল না।

মেস? মোস্তফা তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো। কিছু হয়েছে?

না, কিছু না। নিচু স্বরে কথাটি বলে সোফা থেকে উঠে পড়ল মেস। নিজের কক্ষের দিকে পা বাড়াল। উত্তেজনায় রীতিমত কাঁপছিল সে। একটু পরই ধড়াম শব্দ করে তার ঘরের দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল।

সবাই একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো কয়েকবার।

কিছু একটা হয়েছে তার! সবার উদ্দেশ্যে কথাটি বলল মিকা। বিশেষ করে ওই জন্তুটিকে দেখার  পর থেকে!

জন্তুটি ওকে ছেড়ে দিল কেন? মোস্তফার কণ্ঠে বিস্ময়।

ভালো প্রশ্ন। উত্তর দিল জ্যাক।

বন্ধুরা আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। আবার সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল হ্যানা। সেরামটিতে আমি রেপটরের ডিএনএও খুজে পেয়েছি।

আমি আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। বলল মোস্তফা। সেজন্যই প্রাণীটি প্রচণ্ড ক্ষিপ্রগতির।

তারমানে সেটা এক ধরনের মিশ্রণ। মানুষ ও রেপটরের হাইব্রিড। বলল জ্যাক।

শুধুমাত্র মানুষ ও রেপটরই নয়, এক ধরনের গিরগিটির বৈশিষ্ট্যও রয়েছে প্রাণীটির মধ্যে। জানাল হ্যানা।

আচ্ছা ...। আপন মনে বিড়বিড় করলো মোস্তফা। কোন একটা বিষয় যেন পরিস্কার হলো তার কাছে। বলল, সেজন্যই জন্তুটি নিমেষে দেয়াল, গাছপালা বেয়ে উঠে যেতে পারে! এটি আসলে এই সবগুলি প্রাণীরই মিশ্রণ!

ইক্সাক্টলি তাই। উত্তর দিল হ্যানা।

মাই গড! অস্ফুট একটি শব্দটি বেরিয়ে এল জ্যাকের মুখ থেকে। ব্যাপারটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার। তার মানে শহর থেকে গোপনে কেউ এই অবৈধ গবেষণা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে!

এতো কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ! বিস্ময়ের সুরে বলল মিকা। সে নিজেও ব্যাপারটিতে যারপরনাই অবাক।

এটি একটি ল্যাব থেকে উদ্ধত প্রাণী। কেউ একজন মানুষ ও অন্যান্য সরীসৃপ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। তারপর মানুষের উপর সেটি প্রয়োগ করছে। শীতল গলায় বলল মোস্তফা।

ওহ! এটাতো ভয়ানক ক্রাইম! প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ। জ্যাকের কাছে এই ব্যাপারটি ক্ষমার অযোগ্য। সে দাঁত কটমট করে বলল, এই অপরাধীকে ছাড় দেয়া যাবে না!

ল্যাব! ল্যাবটি খুঁজে বের করতে হবে আমাদের! বলে চলল মোস্তফা। তাছাড়া এই ব্যাপারটি শহরের গভর্নরকে জানানো উচিত।

আমি স্বর্ণহোস্টকে ঠিক বিশ্বাস করি না। এবার মুখ খুলল হ্যানা।

আরো দুজন গভর্নর তো রয়েছে। আমরা তাদের কাছে যাবো। জ্যাক জানাল।

কিন্তু তাতে করে তুমি ব্যাপারটি গোপন রাখতে পারবে না, স্বর্ণহোস্ট নিজেও বিষয়টি জেনে যাবে। হ্যানা উত্তর দিল।

কিন্তু শহরের প্রশাসনকে এই ব্যাপারটি জানানো উচিৎ। চাক্ষুষ প্রমাণাদি থাকা সত্ত্বেও এরকম ভয়ঙ্কর একটি বিষয় নিয়ে আমরা চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। মোস্তফার কন্ঠে উৎকণ্ঠা। সে বলে চলল, পুরো শহরবাসী এই ভয়ঙ্কর বিপদের সম্মুখীন। রাতের আধারে এই প্রাণীগুলি শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে! শুধু আমরাই নয় শহরের মানুষও এখন নিরাপদ নয়!

মোস্তফা ঠিকই বলেছে। তাদেরকে বিষয়টি জানাতে হবে। এর বিরুদ্ধে তাদেরই প্রথমে ব্যবস্থা নিতে হবে। হ্যানার উদ্দেশ্যে বলল জ্যাক।

আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি কাল সকালেই কাউন্সিলরদের সাথে দেখা করতে যাবো। হ্যানা উত্তর দিল।

দরজা বন্ধ করে বিছানার উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে মেস। চোখ দুটি তার ভিজে একাকার।  তাহলে কসাইয়ের কথাই ঠিক। অসম্ভব পরিচিত সেই চাহনিটি আর কারোই নয়, তার ভাইয়ের! (চলবে)

RabbY khan, Nishad jaman, Akash islam, Nishan ahmed, Said ahmed, Biplob islam, Ashes ratul and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান  - Page 3 Empty Re: মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান

Fri Jun 04, 2021 4:43 pm
২৫|

তোমার ভাষ্যমতে তো হিংস্র, অতিপ্রাকৃতিক কিছু একটা রাতের আধারে এই শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে! সমুদ্র শহরের কৃষ্ণবর্ণের গভর্নর বললেন কথাটি। হ্যানার দিকে তাকিয়ে তার চোখদুটি ছোট হয়ে এসেছে।
তারপর এক ধরনের তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, হ্যানা, আমি তোমার কাছ থেকে আরও বেশি কিছু আশা করেছিলাম! তুমি একজন ডিপ্লোম্যাট! একজন বিজ্ঞানীও বটে!

সেজন্যই তো আমি বলছি। মুখের কথা কেড়ে নিল হ্যানা। এটি একটি ল্যাব থেকে তৈরি প্রাণী, যেটিকে কেউ একজন কোন জৈবিক অস্ত্র হিসেবে তৈরি করেছে। গভর্নরদের ব্যাপারটি বোঝাতে মরিয়া সে। সবচেয়ে বড় কথা আমরা জানি না, যে কাজটি করেছে, সে কে? কি উদ্দেশ্যে করেছে অথবা এরকম আরো কোন গবেষণা আছে কিনা!

পুরুষ গভর্নরের পাশে বসে থাকা অল্প বয়স্ক নারী গভর্নর হ্যানার কথাগুলি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।

প্রমাণ আমার হাতেই রয়েছে। কথাটি বলে হ্যানা তার ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট ট্যাব বের করল। তারপর সেটি অন করে গভর্নরদের সামনে নিয়ে গেল। কিছু তথ্য উপাত্ত ভেসে উঠতেই সেগুলি তাদের সামনে তুলে ধরল।

অল্প বয়স্ক নারী গভর্নরটি তার অনুমতি নিয়ে ট্যাবটি নিজের হাতে নিল। গভীর মনোযোগে স্লাইডগুলি পড়ে দেখতে শুরু করল। একে একে স্লাইডগুলি উল্টে যাওয়ার পর তার চেহারায় এক ধরনের চিন্তার ভাজ পড়তে শুরু করেছে তখন।

ট্যাবটি তারপর পাশে বসে থাকা পুরুষ গভর্নরের দিকে বাড়িয়ে দিল সে। কিছুটা অবহেলার ভঙ্গিতে ট্যাবটি হাতে নিল গভর্নর।

নারী গভর্নরটি অশুভ কিছু একটা আঁচ করতে পাড়ল যেন। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে হ্যানাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি বলছো এরকম আরো একটি প্রাণী রয়েছে?

ঠিক এরকম নয়। ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল হ্যানা, সেটি একটু অন্য ধরনের। সম্ভবত কোন এক ধরনের পরজীবী।

কোন এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল প্রাণী নয় তো?

দ্বিতীয়টির ব্যাপারে আমি ঠিক নিশ্চিত নই। কেননা আমরা শুধুমাত্র লেজওয়ালা দানবটির জৈবিক রস সংগ্রহ করতে পেরেছি।

হুম। গভীর মনোযোগে মাথা নাড়লো নারী গভর্নরটি। বলল, এবং সেটিতে মানুষের ডিএনএও রয়েছে!

আমি সেটাই বলছি। অন্তত এই প্রাণীটি কোন এলিয়েন নয়। কেউ একজন তৈরি করেছে!

এতক্ষণে পুরুষ গভর্নরটির চেহারায় অবিশ্বাসের ছাপ সরে যেতে শুরু করেছে। বরং সেখানে ধীরে ধীরে এক ধরনের অনিশ্চয়তার ছাপ ফুটে উঠছে।

আমার ধারণা আমরা খুব বেশি দেরি করে ফেলিনি। কথাটি বলে ইন্টারকমে রিসিভারটি তুলল গভর্নর মেয়েটি। ওপাশে কাউকে উদ্দেশ্য করে বলল, ক্যাপ্টেন নক, এখনই আমার সাথে দেখা করুন।

.

সেদিন সন্ধ্যায়। শরনহোস্টের অফিসে।

তোমার এত স্পর্ধা, ডক্টর! আমাকে না জানিয়ে অবৈধ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছ তুমি! মনিটরের পর্দায় তাকিয়ে কারো উদ্দেশ্যে কথাটি বলল শরনহোস্ট।

আই এম রিয়েলি সরি, গভর্নর। আমি তোমার সাথে বৈঠকে বসতে চেয়েছিলাম। মনিটর থেকে একটি কন্ঠ ভেসে এলো।

শাট আপ! আমি সবকিছু জানতে পেরেছি। বুচার কার হয়ে কাজ করতো সেটিও আমার কানে এসেছে। নিজের আত্মঅহমিকায় থর থর করে কেঁপে উঠল শরনহোস্ট। কাঁপতে কাঁপতে বলল, আমি এখনই তোমার গবেষণাকেন্দ্র সিজ করছি!

গভর্নর, আমার মনে হয় আমরা গঠনমূলকভাবে এর সমাধান করতে পারি।

সামনে থাকা একটি কিবোর্ডের বোতাম চেপে মনিটরটি বন্ধ করে দিল গভর্নর। কিছুক্ষণ রাগে ক্ষোভে ফুসতে থাকল। তারপর পকেট থেকে একটি ছোট্ট শিশি বের করে একটি ট্যাবলেট মুখে পুরে নিল।

তার কিছুক্ষণ পর কেউ একজন দরজায় কড়া নাড়লো।

কাম ইন।

ম্যাম আপনার জন্য একটি প্যাকেজ এসেছে। একজন গার্ড তাকে উদ্দেশ্য করে বলল। তার পাশে একটি লোক দাঁড়ানো, তার হাতে মাঝারি আকারের একটি কাটুন।

টেবিলে রেখে যাও! রাগে গজ গজ করতে থাকা শরনহোস্ট উত্তর দিল।

লোকটি দ্রুতই দরজার ফাক গলিয়ে একটি মাঝারি আকারের বাক্স নিয়ে গভর্নরের টেবিলের উপর রাখল। তারপর মাথা নিচু করে তাকে অভিবাদন জানিয়ে প্রস্থান করল।

শরনহোস্ট মনিটরের পর্দার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ভাবল। তারপর চেয়ার থেকে উঠে কাটুনটির সামনে এগিয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত সেটি পরীক্ষা নীরিক্ষা করে ড্রয়ার থেকে একটি কাটার বের করল সে। তারপর সেটির মুখের উপর বসানো কালো রঙের ট্যাপটি আড়াআড়িভাবে কেটে ফেললো।

উপরের ডালাটি খুলতেই সেটির ভেতর থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এল কিছু একটা। অনেকগুলি পা বিশিষ্ট মাকড়সার মতো প্রাণীটি শরনহোস্টের পুরো মাথার চারপাশ দিয়ে পেচিয়ে ধরল। অতর্কিত এই হামলায় ভারসাম্য হারানো শরনহোস্ট মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। মুখ থেকে তার এক ধরনের অস্ফূট গরগর শব্দ বেড়োতে লাগল।

.

কাউন্সিল অফিস থেকে ডেরায় ফিরছে হ্যানা। জ্যাকের কাছ থেকে ধার করে আনা ক্যাডিলাকটির গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা নেমে গেছে চারিদিকে। আবছা আলোয় সামনের রাস্তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।

গাড়ির হেডলাইটের বোতাম চাপতেই হঠাৎ রাস্তার মাঝে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে মনে হল হ্যানার। মুহুর্তেই তার পা সজোরে ব্রেকে চাপ দিতেই প্রচন্ড এক ঝাঁকি দিয়ে রাস্তার মাঝেই দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়িটি।

হেডলাইটের আলোয় একটি ছোটখাটো ছায়া স্থির দাড়িয়ে আছে দেখতে পেল সে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই তার মনে হলো লোকটা চেনা তার।

মর্গান! বিস্ফোরিত চোখে সামনে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই বলে উঠলো সে।

ওপাশ থেকে কোন উত্তর এলো না।

কয়েক মুহুর্ত পর ধীরে ধীরে হেডলাইটের আলো থেকে এক পাশে সরে এসে দাঁড়ালো লোকটি।

মর্গান, আই এম রিয়েলি সরি! গাড়ি থেকে গলা বাড়িয়ে অপরাধীর ভঙ্গিতে কথাটি বলল হ্যানা।

মর্গান একবার ডানে বামে মাথা নাড়লো। তারপর তর্জনি দুই ঠোটের উপর রেখে 'শশ' করে একটা শব্দ করলো।
তৎক্ষণাৎ চুপ হয়ে গেল হ্যানা।

আমি খাটো, বেটে, নগণ্য! তাই তুমি আমাকে পরিত্যাগ করেছ! দাঁতে দাঁত চেপে কথাটি বলল টেকো। কেউ কখনো আমাকে আমার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দেয়নি। একবার অদ্ভুতভাবে মাথা নাড়ালো মর্গান। যেন তার শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। তারপর আবার বলল, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছো, হ্যানা! আমি অবশেষে সেই জায়গা খুঁজে পেয়েছি, যেখানে আমার যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে!

হ্যানা অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি কিছু বুঝতে পারছি না, মর্গান!

এবার খল খল করে জোরে হেসে উঠল মর্গান। তার কয়েক মুহুর্ত পরেই তার পুরো শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। মনে হলো শরীরের এই কাপুনির উপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

তুমি ঠিক আছো?

মরগানের শরীর আরো জোরে জোরে কাপতে শুরু করল। এক রকম ঝাঁকি দিতে শুরু করল। সে নিজের মাথাটি দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে ছিল। চোয়ালটি তার আধ হাত নিচে পড়ে গেছে। দাঁতগুলি আরও প্রকটভাবে দৃশ্যায়িত হয়ে পরেছে। কেন যেন হ্যানার কাছে মনে হল সেগুলি আরও ধারালো তীক্ষ্ণ রুপ নিয়েছে। যেন তার শরীরের ভেতর কোন এক আমুল পরিবর্তন ঘটে চলছে।

এক মুহূর্ত দেরি না করে গাড়িটা স্টার্ট দেয়ার জন্য চাবিটি ঘোরাতে লাগল হ্যানা।

ইতিমধ্যে মরগানের মুখটি তীক্ষ্ন দাঁতগুলিসহ গিরগিটির মত সামনে বেরিয়ে এসেছে। শরীরটি একটি দানবীয় আকৃতি নিয়ে নিয়েছে। হাত পা-গুলি আরো লম্বা, পুরুষ্ট, শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মুখ দিয়ে অপার্থীব গরগর শব্দ বেরোচ্ছে।

.

মটু, দরজা খোলো। সারাদিন এভাবে পড়ে থাকলে তো অসুস্থ হয়ে পড়বে। দরজায় আঘাত করতে করতে গলা ছেড়ে বলল মোস্তফা।

ওপাশ থেকে কোন সাড়াশব্দ এলো না।

আমি সব বুঝতে পারছি, বাডি। কিন্তু আমাদের সামনে অনেক কাজ! তোমাকে ঘুরে দাড়াতে হবে।

ঠিক পরমুহূর্তেই ঘরের ভেতরে কিছু একটা সজোরে ভেঙে পড়ল।

মোস্তফা চিৎকার করে উঠলো, মটু! মটু! তুমি ঠিক আছো!

তারপরই কেউ যেনো ভেতরে কাচের জানালাটি ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলল। শব্দ শুনে জ্যাক ও মিকা বৈঠক ঘর থেকে তড়িঘড়ি করে ছুটে আসলো।
এরমধ্যে নিজের কাধ দিয়ে দরজায় সজোরে ধাক্কা দিতে শুরু করেছে মোস্তফা। ভেতর থেকে মেসের আর্তনাদের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করার পর জ্যাক মোস্তফাকে ইশারায় দরজার এক পাশে সরে যেতে বলল। তার হাতে একটি পিস্তল! দরজার দিকে তাক করে সেটির ট্রিগার চাপতেই সশব্দে কেঁপে উঠল যন্ত্রটি।

মুহুর্তেই দরজার নবটি উপড়ে গেল। এক লাথি দিতেই অর্ধ ভাঙ্গা দরজাটি ছিটকে ডানপাশের দেয়ালের সাথে সজোরে একটি ধাক্কা খেলো।

হুর মুর করে কক্ষের ভেতরে ঢুকতেই পাথরের মত জমে গেল জ্যাক। পুরো কক্ষটি ফাঁকা! কক্ষের ভেতরে কেউ নেই!

সামনে ঘরের একমাত্র জানালাটি ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ!  সেখানে একটি বড় গর্ত তৈরি হয়ে গেছে। দানবীয় কেউ বা কিছু একটা ঘরের ভেতর সেটি গলে ঢুকে পরেছে। তারপর সবকিছু লন্ডভন্ড করে মেসকে ধরে নিয়ে গেছে।

দৌড়ে ভাঙা জানালাটির দিকে এগিয়ে যায় মোস্তফা। আবছা অন্ধকারে কয়েকটা দালানের ওপারে কিছু একটা উড়ে গেল।

বন্দুকের বাইনোকুলারে চোখ দিতেই চিৎকার করে উঠল মিকা, উড়ুক্কু জন্তুটি নিচের পায়ে ধরে রেখেছে কাউকে!

ট্রিগারে চাপ দিতে যাবে এমন সময় বন্দুকের নলের উপর হাত রেখে সেটি নিচে নামিয়ে দিল মোস্তফা। মিকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকল।

ডোন্ট ফায়ার! জন্তুটি মাটি থেকে অনেক উচুতে রয়েছে। ওকে উড়ে যেতে দাও। ঠান্ডা কন্ঠে বলল মোস্তফা।

জন্তুটি সেটির বিশাল দুই ডানায় ভর করে কয়েক মুহুর্তেই অনেকটা দূরে উড়ে গেছে। সেটির নিচে কিছু একটা নড়াচড়া করতে করতে এক সময় হার মেনে নিয়েছে। নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। হয়তোবা জ্ঞান হারিয়েছে। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগ মূহূর্তে পর্যন্ত হয়তো তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল সেই মানুষটি। (চলবে)

RabbY khan, Sk rahul ali, Akram ali, Babul jalaluddin, Inamul haq, Biplob islam, Mim islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান  - Page 3 Empty Re: মোস্তফার অসমাপ্ত অভিযান

Fri Jun 04, 2021 4:44 pm
২৬|

গাড়িটি স্টার্ট নিতেই সেটির ব্যাক গিয়ার চাপল হ্যানা। পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে সজোরে প্যাডেলে চাপ দিতেই তীরের বেগে পেছনে ছুটে চলল গাড়ি। সামনে ইতিমধ্যে মর্গান এক ভয়ঙ্কর দানবীয় রুপ নিয়ে নিয়েছে। সেটির তীক্ষ্ণ হিংস্র চাহুনি একদৃষ্টিতে হ্যানার দিকে তাকিয়ে আছে।

পেছনে সরু লম্বা পথ। দু'পাশের দালানগুলি যেন রাস্তাটিকে আরো চেপে ধরেছে। দালানের গাঁয়ে ছোট ছোট টিমে টিমে বাতিগুলিতে রাস্তাটি অস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
গাড়িটিকে এই মুহূর্তে ঘুরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। তাকে আগে বের হতে হবে এই গলি থেকে। অগত্যা গাড়িটি পেছনের দিকেই চালিয়ে গেল হ্যানা। যদিও সে জানে এভাবে বেশিক্ষণ সে বিপদমুক্ত নয়।

মর্গান নামক হিংস্র পিশাচটি এবার দৌড় দিতে শুরু করেছে। সেটির তীক্ষ্ণ নখরযুক্ত আঙ্গুলগুলি মুষ্টিবদ্ধ। মুখ দিয়ে অনবরত আঠালো লালা জাতীয় পদার্থ গড়িয়ে পড়ছে। ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলি মুখগহ্বর থেকে প্রায় বেরিয়ে এসেছে। যেন সেগুলি হ্যানার নরম দেহ ছিন্নভিন্ন করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।

বড় বড় পদক্ষেপে এগিয়ে আসা জন্তুটির কাছে গাড়ির গতি প্রায় হার মেনে যাবার উপক্রম। এক রকম সময়ের ব্যাপার মাত্র। ব্যাক গিয়ারে সেটির গতি ৩০ থেকে ৪০ কিলোর বেশি উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এই হল জ্যাকের সখের ক্যাডিলাক। মনে মনে তাকে একবার গালাগাল দিল হ্যানা।

অসহায় মেয়েটি না পারে প্যাডেলের উপর নিজে থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে। দাত মুখ খিচে আসে তার। থর থর করে কাঁপতে থাকে শরীর। এরকম অতিপ্রাকৃত কোন কিছুর দেখা আগে মেলেনি। চোখ বড় বড় করে মেসের করা সেই বর্ণনা থেকেও বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়ংকর।

হঠাৎ সেটির জান্তব গর্জনে চারপাশের দালানগুলি যেন কেঁপে ওঠে। হ্যানার বুকটা এবার ধক করে ওঠে। মনে মনে নিজেকে গালাগাল করতে থাকে, এভাবে একা চলে আসার কারনে।
এবারো জ্যাকের কথার কোন পাত্তাই দেয়নি সে। এক রকম অবুঝের মতোই বেরিয়ে পড়েছে। ভুলে গিয়েছিল এটা কোন কিশোর কিশোরীর প্রেম কাহিনী নয় বরং পৃথিবীকে বাঁচানোর ভয়ঙ্কর অভিযান!

তার এই অনর্থক দেমাগের মাশুল দিতে হবে আজ। জ্যাককে 'ভালোবাসি' কথাটিও তার আর বলা হবে না। বাকি জীবন থাকতে হবে মর্গান নামের এই কুৎসিত দানবটির সাথে!

মর্গান প্রায় তার গাড়িটি ছুঁইছুঁই করছে! সামনে বনেটের উপরে একটি থাবা বসিয়ে ফেলল বলে! গাড়ির ব্যাকলাইটের অল্প আলোয় পেছনে একটি দালানের ভাঙা একটা অংশ দেখতে পায়নি হ্যানা।
একবার সামনে, একবার পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে বুঝতে আধা ভাঙ্গা একটা থামের সাথে গাড়ির পেছনের অংশ সজোরে এক ধাক্কা খেয়ে বসল। মুহূর্তেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। ঘরঘর শব্দ করে গাড়িটি এবার থেমে গেল।

হ্যানা গাড়ি স্টার্ট দেয়ার জন্য বারবার চাবি ঘোরাতে থাকে। কিন্তু গাড়ির ঘুম আর ভাঙ্গে না। জন্তুটি ইতিমধ্যে বনেটের উপর দুই হাতে সজোরে এক আঘাত করে বসেছে। তার সাথে গাড়িটিও যেন দম ছেড়ে দিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার উপর সজোরে আঘাত সেটিকে বিকল করে দিয়েছে। হাল ছেড়ে দিয়ে এবার চিরতরে ঘুমিয়ে পরে জ্যাকের ক্যাডিলাক।

বনেটের নিচ থেকে ইতিমধ্যে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। হ্যানা কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করে নিজেকে। মনে মনে বিড়বিড় করে। তারপর লাফিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে উঠে পড়ে। সেটি পেরিয়ে পেছনের ট্রাংকের উপর পা বাড়িয়ে দেয়। শরীরটাকে টেনেহেঁচড়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেয়। ছোট ছোট পদক্ষেপে সামনে অন্ধকারের দিকে ছুটে যেতে শুরু করে।

পেছনে পৈশাচিক আত্মচিৎকার তাকে তাড়া করছে!

.

নিজস্ব শিবিরে বিধ্বস্ত জ্যাক ও মোস্তফা তাদের অস্ত্রপাতি জোগাড়ে ব্যস্ত। হ্যান্ড গ্রেনেড, পিস্তল, শটগান অন্যান্য ছোট বড় অস্ত্রপাতি থলেতে ভর্তিতে ব্যতিব্যস্ত সবাই।

এর মধ্যে ঝিরঝির করতে থাকা পুরনো টিভি সেটের পর্দায় একজন গভর্নরের চেহারা ভেসে উঠেছে।

"স্বর্ণহোস্ট হ্যাজ বিন কম্প্রোমাইজড। উই আর ডিক্লেয়ারিং এ স্টেট অব ইমারজেন্সি।" পর্দায় গভর্নরটির কন্ঠে বেজে উঠলো কথাটা।

জানালার পর্দার ফাঁক গলিয়ে রাস্তায় লক্ষ করল মিকা। চারিদিকে সশস্ত্র সেনা সদস্য নেমে পরেছে।

হ্যানা এখনো ফিরল না। মোস্তফার চোখের দিকে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকাল জ্যাক। চোখে-মুখে তার চিন্তার রেখা।

তোমার ওকে একা ছেড়ে দেয়া উচিত হয়নি। জ্যাকের উদ্দেশ্যে বলল মোস্তফা।

কি-ই বা করতে পারতাম আমি? তুমি তো চেনো মেয়েটিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল জ্যাক। তারপর বলল, আমার সাথে ঠিক তার বনিবনা হচ্ছে না। আমাকে দেখলেই খিটমিট করে উঠছে।

তাই বলে তুমি তাকে একা ছেড়ে দেবে?

সে তো এমনটাই চেয়েছিল। নির্বিকার উত্তর জ্যাকের।

সে যদি এমনটা চেয়েও থাকে, তবু তোমার সেটা করা উচিৎ হয়নি। একটু ঝাঁজালো গলা মোস্তফার। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস। তাছাড়া আমার বিশ্বাস সে এমনটা চায়নি। বিড়বিড় করে বলা পরের এই কথাটি ঠিক খেয়াল করেনি জ্যাক। রেডিওর দিকে মনোযোগ ছিল তার।

কি বললে? উৎসুক ভঙ্গিতে তাকায় সে মোস্তফার দিকে।

তুমি বললে না, আমি মেয়েটিকে চিনি। মোস্তফা ব্যাখ্যা করে, কথাটি হয়তো সত্যি। হয়তো তুমিই ঠিক চেনো না তাকে।

রেডিওর উপর থেকে এবার চোখ সরিয়ে নেয় জ্যাক। হ্যানার কোনো খবর নেই।
হাত দিয়ে চোখ দুটি কচলে আফসোসের একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে সে। নিজের উপর খুব বিরক্ত।
এখন আমার কি করা উচিৎ? মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে সে।

ভুল শোধরানো উচিৎ। মোস্তফার সরাসরি জবাব।

কিছুক্ষন চুপ করে থাকে জ্যাক। তারপর বলে, তবে হ্যামারের সাথে দেখা করতে যাবে কে?

আমরা যাব। ওপাশ থেকে উত্তর দেয় মিকা। মোস্তফা যাবে। আমি তার ডান হাত হয়ে সাথে যাব।

তুমি ঠিক বুঝতে পারছো না, হ্যামার এই সুযোগের জন্যেই অপেক্ষা করছে। ও তোমাদের বন্দি করে ফেলবে।

জ্যাক, পরিস্থিতি এখন অনেকটাই ভিন্ন। মোস্তফা তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। জ্যাকের চোখে চোখ রেখে বলল, হ্যামার যা করে বেড়াতো সেগুলির কিছুই এখন আর ম্যাটার করে না। দস্যুতার চেয়ে অনেক বড় কিছু  ঘটে যাচ্ছে এখানে। মানুষের অস্তিত্বই এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। এটাকে থামাতে না পারলে, ভবিষ্যতে দখল করার মত কোন কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
.

ছুটে চলছে হ্যানা। একটা পরিত্যক্ত দালানের করিডর ধরে সামনে এগিয়ে চলছে। দুই পাশ ধরে সারি সারি কক্ষ। প্রতিটি কক্ষের দরজা পরীক্ষা করছে সে। কিন্তু দরজাগুলি বন্ধ! হয়তো অনেকদিন কেউ খোলেনি সেগুলি। জ্যাম হয়ে গেছে।

পেছনে দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে করিডোর দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে জন্তুটি। হ্যানাকে খুঁজতে খুঁজতে এদিকেই এগিয়ে আসছে। সেটির গরগর শব্দ করিডোরের দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ফিরে ফিরে আসছে।

অবশেষে একটি দরজার নব খট করে খুলে গেল। দরজাটি খুলে ভেতরে ঢুকেই আস্তে বন্ধ করে দিল সেটি। কক্ষটি ছোট। এক পাশে একটি স্টিলের খাট উল্টানো। উপরের সিলিং এর আস্তর ভেঙ্গে পড়েছে। দেয়ালে ইটগুলি খুবলে বের হয়ে আছে।
কক্ষের এক পাশে একটি পরিত্যক্ত বুকসেলফ কাত হয়ে পড়ে আছে। বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে ভাঙ্গা বুক সেলফটির পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিল হ্যানা। তার হৃদপিন্ডের গতি অনেক বেড়ে গেছে। বুকের খাঁচার সাথে ধক ধক করে বাড়ি খাচ্ছে। (চলবে)

RabbY khan, Debasis sorkar, Nishad jaman, Sikdar rahat, Sk rahul ali, Jannat islam, Akash islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum