সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty মাতৃত্বের স্বাদ

Fri Jun 04, 2021 5:04 pm
পর্ব-১

সুপ্তি পড়ার টেবিলে রসায়ন বই হাতে নিয়ে নড়াচড়া করছে। নিঃশব্দে রশিদ সাহেব রুমে আসলেন। তিনি কোনো কথা না বলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সুপ্তির সামনে ছোট্ট চিরকুট রেখে দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। কেউ দেখে ফেলার ভয়ে সুপ্তি ভাঁজ করা চিরকুট হাতে নিল। দরজা লক করে ঐখানেই চিরকুটটা পড়তে শুরু করলো,  

'প্লিজ,গতকালের ঘটনা কাউকে বলো না সুপ্তি! অনাকাঙিক্ষত ঘটনার জন্য আমাকে ক্ষমা করো। তুমি ক্ষমা না করলে আমি মরেও শান্তি পাবো না।'

পড়ার সাথে সাথে তিন বাক্যের চিরকুট ছিড়ে টুকরো টুকরো করে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল। ঐ ঘটনার পর একবারের জন্যও রশিদ সাহেবের মুখ দেখেনি সুপ্তি। প্রচন্ড ঘৃণা ধরে গেছে লোকটার প্রতি। ঐ ঘটনা মনে হলে তার গা ঘিনঘিন করে। প্রথমবার কোনো পুরুষ মানুষের স্পর্শ তার সবকিছু ঝড়ের মতো এলোমেলো করে দিয়েছে। ইচ্ছে করছে ডান গালটা কেটে ফেলে দিতে। যাকে সে এত সম্মান করে,বিশ্বাস করে তার এমন আচরণ কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না। কাউকে কিছু বলতেও পারছে না। স্বাভাবিক হতে পারছে না। খাটে শুয়ে চিরকুটের কথাগুলো আবার মনে করলো সুপ্তি। আমি ক্ষমা না করলে উনি মরেও শান্তি পাবেন না। চিরকুটে ক্ষমা চেয়েছেন। তাহলে কি ক্ষমা করে দিব? অনিচ্ছাকৃতভাবে যদি কেউ কোনো অন্যায় করে অথবা ভুল কাজ করে এবং তার ভুলের জন্য ক্ষমা চায় তাকে কি ক্ষমা করা যায়? সুপ্তি একা একাই নিজেকে প্রশ্ন করছে। কোনো উত্তর মেলাতে পারছে না।
বড় বোন মুক্তির কাছে পুরো ঘটনা বলে নিজেকে হালকা করবে? নাকি চেপে রেখে রশিদ সাহেবকে ক্ষমা করে আগের মতো স্বাভাবিক আচরণ করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। শুয়ে চোখ বন্ধ করে শুধু ভেবেই যাচ্ছে। দরজার কাছে মুক্তির ডাক শুনে তাড়াতাড়ি  দরজা খুলে দিল। কথা না বলে আবার পড়ার টেবিলে বইয়ের পাতায় চোখ বুলাতে শুরু করলো। মুক্তি সুপ্তির গা ঘেঁষে এলো চুল নেড়েচেড়ে বললো,

'কাল থেকে দেখছি একেবারে চুপচাপ আছিস। কি হয়েছে তোর?'

সুপ্তি বইয়ের পাতায় দৃষ্টি রেখেই উত্তর দিল,

'কিছু না'

'তোর শরীর ঠিক আছে?'

'হুমম'

'খেতে যা! মা বসে আছে। আমি বাবাকে ঔষধ খাইয়ে আসছি।'

কথা শেষ করে মুক্তি চলে গেল তার বাবার রুমে। সুপ্তি
বইয়ের উপর ডান কাতে মাথা রেখে খোলা জানালার
দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। বাইরে সূর্যের ঝলমলে আলোর বিচ্ছুরণ। আকাশে মেঘ নেই। নীল আকাশে সাদা সাদা ছেড়া মেঘেরা ভেসে বেড়ালেও সুপ্তির মনের আকাশে ধূসর মেঘের আনাগোনা। পলক পড়তেই নিঃশব্দে দু'ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। ডাইনিং টেবিল থেকে মায়ের হাঁক শুনে চোখ মুছে পা বাড়ালো ডাইনিং রুমের দিকে। সুপ্তির গুমরো মুখ দেখেই রেবেকা করিম রাগে বললেন,

'মুখের এই অবস্থা কেন? মুক্তির সাথে ঝগড়া হয়েছে?
কাল থেকে দেখছি ডেকে খাবার টেবিলে আনতে হচ্ছে।
শরীর খারাপ করেছে? সামনে ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষা। মাথায় রাখিস। খেয়ে এক দৌড়ে ফার্মেসি থেকে তোর বাবার ঔষধ নিয়ে আয়! এ বেলা ঔষধ  খেলেই শেষ।'

'টাকা টেবিলে রাখো। আমি খেয়েই বাবার ঔষধের জন্য যাচ্ছি।'

সুপ্তি তার মায়ের কোনো প্রশ্নের জবাব দিল না। কথা না বাড়িয়ে দ্রুত খেয়ে নিল। রেবেকা করিম টাকাটা টেবিলের কোণায় রেখে ভিতরে গেলেন। সুপ্তি ঔষধ কিনতে ফার্মেসিতে আসলো। ঔষধ কিনে ফিরতি টাকা নিয়ে যাওয়ার পথে রশিদ সাহেবের সাথে দেখা। সুপ্তি কথা না বলে এড়িয়ে যাচ্ছিলো। রশিদ সাহেব পথ আগলে সুপ্তির সামনে দাঁড়ালো। অপরাধীর মতো শান্ত গলায় বললেন,

'ক্ষমা করবে না আমায়?'

সুপ্তি অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো উত্তর দিচ্ছে না। রাস্তার মাঝখানে কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। বাসায়ও এই বিষয়ে কোনো কথা বলা যাবে না সবাই জেনে যাবে। সবাই জানলে ব্যাপারটা অন্যরকম দাঁড়াবে। রিয়ার আম্মু,আব্বুর সাথে ঝগড়া লাগবে। আমাকে নিয়ে রিয়ার আম্মুর ভিতরে সন্দেহের জাল সৃষ্টি হবে। রিয়ার আম্মু ভাববে,তার হাজব্যান্ডের সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক আছে। অকারণে ঘরে অশান্তি হবে। সুপ্তির নীরবতা দেখে রশিদ সাহেব আবার অনুনয় স্বরে বললেন,

'কি হলো? কিছু বলো? আমার যে অস্থির লাগছে। তুমি বুঝো না সুপ্তি? বিশ্বাস করো কিছুই ভালো লাগছে না।  খুব অপরাধবোধ হচ্ছে। এমনটা করতে চাই নি। রিয়াকে আদর করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে তোমার গালেও....। তুমি ক্ষমা করলে আমি শান্ত হবো। প্লিজ, চুপ থেকো না! খুব অন্যায় করেছি আমি। তুমি ক্ষমা করলে আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।'

সুপ্তি এবার রশিদ সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,

'রাস্তায় এইসব কি বলছেন? কেউ শুনলে তখন কি হবে জানেন?'

সুপ্তি দূর থেকে তার এক কাজিনকে দেখে কথা বাড়ালো না। প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্রুত বাসায় চলে আসলো। রশিদ সাহেব রিকশা নিয়ে তার কাজে চলে গেলেন।

এসআই রশিদ সাহেব চার মাস আগে বদলি হয়ে বেগমগঞ্জ থানায় জয়েন করেন। থানায় কোনো কোয়ার্টার খালি পান নি। তাই পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসা 'রেবেকা মঞ্জিলে' উঠেন। রেবেকা মঞ্জিলের মালিক আফসার করিম। তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া  উত্তরাধিকার সূত্রে জমিতে এক তলা বাড়ি করে স্ত্রীর নামে বাড়িটির নাম দেন 'রেবেকা মঞ্জিল'। বাড়িটির এক ইউনিটে আফসার করিম স্ত্রী,দুই মেয়ে নিয়ে থাকেন। অপর ইউনিটে সব সময় ভাড়াটিয়া থাকেন।
ব্যবসায়ী আফসার করিমের আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটাই খারাপ। বছর চারেক আগে স্ট্রোক করে বিছনায় পড়েন। উন্নত চিকিৎসা করালেও সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কোনো রকম অস্পষ্টভাবে কথা বলতে পারলেও ডান হাত,পা অবশ।
সংসার খরচের পুরো দায়িত্ব রেবেকা করিম আর বড় মেয়ে মুক্তির উপর। রেবেকা করিম প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বড় মেয়ে মুক্তি বিএসসি পাশ করে বাসার কাছেই একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি পেয়ে যায়। মাস্টার্সের পড়ার খরচ এবং মাকে হেল্প করার জন্য চাকরিটা শুরু করে। মুক্তির চেয়ে চার বছরের ছোট সুপ্তি খুব মেধাবী,শান্ত প্রকৃতির। কথা কম বলে। কলেজের ক্লাস,প্রাইভেট,লেখাপড়া আর গল্পের বই পড়েই তার সময় চলে যায়। শহরে সরকারি কলেজে পড়ার সুযোগ পেলেও বাবার অসুস্থতা,দেখভালের জন্যই বাড়ির কাছেই কলেজে ভর্তি হলো। বাবা হলো সুপ্তির খুব ভালো বন্ধু। সময় পেলেই বাবার সাথে গল্প করে। কলেজে কি ঘটলো,কোন ক্লাসটা ভালো করে বুঝতে পেরেছে নানা বিষয় নিয়ে বাবার সাথে সবকিছু শেয়ার করে। বাবার একাকিত্বের সময়টুকু কাটাতে পছন্দের লেখকের বই এনে গিফট করে। দুই মেয়ে সব সময় বাবার কাছাকাছি থাকে।

আগের ভাড়াটেদের সাথে সুপ্তিদের তেমন সুসম্পর্ক ছিল না। দেখা হলে প্রয়োজনীয় টুকটাক কথা বলা এই পর্যন্ত। রশিদ সাহেব,তার স্ত্রী খুব মিশুক এবং আন্তরিক। সুপ্তিদের বাসায় উঠার পর সবাইকে খুব আপন করে নিয়েছে। তাঁর এক বছরের ছোট্ট ফুটফুটে মেয়ে রিয়া সুপ্তি বলতে অজ্ঞান। সুপ্তিও রিয়াকে জীবনের চাইতে ভালোবাসে। প্রায় সময় ছোট্ট রিয়া সুপ্তিদের ঘরেই থাকে। রিয়া খাওয়া নিয়ে খুব বিরক্ত করে। কিছুই খেতে চায় না। সুপ্তি মাঝে মাঝেই গল্প বলে,গান গেয়ে ঘুরেঘুরে
অল্প সময়ে আনন্দ দিয়ে রিয়াকে খাইয়ে দেয়,ঘুম পাড়িয়ে দেয়। রিয়ার মা,বাবা খুব খুশি হন। তাঁরা  সুপ্তি,মুক্তিকে রিয়ার মতোই ভালোবাসে। ঘরে কোনো
ভালো খাবার রান্না হলে সুপ্তিদের ঘরে পাঠিয়ে তারপর তারা খাবেন। রেবেকা করিম এমন নিরিবিলি,ভদ্র ভাড়াটিয়া পেয়ে মনে মনে খুশি হন। রশিদ সাহেব,তার স্ত্রীর ব্যবহার,কথাবার্তা,সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দেখে
মুগ্ধ হন। মনে মনে ভাবেন, যাক এতদিন পর খুব ভালো একটা ভাড়াটিয়া পাওয়া গেল। অল্পদিনে আমাদের সবাইকে খুব আপন করে নিয়েছে।

সুপ্তি ইচ্ছে করেই সারাদিন ঘর থেকে বের হয়নি। বাবার সাথে টুকটাক কথা বলে লেখাপড়ায় মন দিল। রশিদ সাহেবও রিয়াকে কোলে নিয়ে সুপ্তিদের ঘরে আসেনি। হঠাৎ রাতে রিয়ার প্রচন্ড চিৎকার। সুপ্তি তখনও পড়ার টেবিলে। রিয়ার কান্না শুনে সুপ্তি নিজের ঘরে ছটফট করছে। সুপ্তির খুব কষ্ট হচ্ছে রিয়ার জন্য। মেয়েটাকে দেখেনি,কোলেও নেয়নি শুধুমাত্র রশিদ সাহেবকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। ঐ লোকটার কাছাকাছি আর পড়তে চায় না সুপ্তি। রিয়ার কান্না কিছুতেই থামছে না।
রিয়ার কান্না শুনে মুক্তি,তার মা দৌড়ে গেল। সুপ্তি পড়ার টেবিলে থাকলেও মন ছুটে গেছে রিয়ার কাছে।
তার রুমের দরজার কাছে পায়চারি করছে। বুঝার চেষ্টা করছে রিয়া কেন এত কান্না করছে? রিয়ার কি হয়েছে?
দুই মিনিট পর মুক্তি রিয়াকে কোলে নিয়ে সুপ্তির কাছে
আসলো। তখনও রিয়া শুধু  মনি মনি বলে কাঁদছে।
সুপ্তি এক টানে রিয়াকে কোলে নিল। ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে দু'গালে আদর দিয়ে কাঁধে মাথা
রেখে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে। রিয়া কান্না থামিয়ে চুপ করে আছে। মুক্তি দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু দেখলো। তার চোখের কোণায় জমে থাকা পানিটুকু মুছে সুপ্তিকে বলল,
'রিয়ার শরীর ভালো নেই। আন্টি বলল, জ্বর আসছে।
নাপা সিরাপ খাওয়ানোর পর জ্বর কিছুটা নেমেছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে তোর কাছে আসতে চাইছে। আন্টিকে বলে,'মনি যাবো।' তোর পড়া নষ্ট হবে তাছাড়া
অনেক রাত তাই আন্টি আসতে চাইছে না। আন্টি,
মামা কিছুতেই রিয়ার কান্না থামাতে পারছে না। দেখছিস সুপ্তি? তোর কোলে আসতেই মেয়েটার কান্না থেমে গেছে। মেয়েটা এত মায়াবী কেন? চলে গেলে কি করে থাকবি রে সুপ্তি?'

'জানি না' বলেই সুপ্তি রিয়ার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে  উঠোনজুড়ে হাঁটছে। চাঁদের ঝলমলে আলো পুরো উঠোনে উপচে পড়ছে। রিয়াকে কোলে নেওয়ার পর সুপ্তিরও দু'দিনের অস্বস্তি গুমোট ভাবটা নিমিষে উধাও
হয়ে যায়। এক অজানা ভালো লাগার আবেশে ঘিরে থাকে তার মন। পরম মমতায় রিয়াকে আগলে রেখে
ভালোবাসার গভীর বন্ধনে নিজেকে জড়িয়ে রাখে বেশ কিছু সময়। রিয়ার মুখে সব কথা না ফুটলেও আম্মু,আব্বু,মামা আর মনি স্পষ্ট করে বলতে পারে। সুপ্তি আদর করে রিয়াকে 'রিয়া মনি' কখনও 'জান মনি' বলে ডাকে। রিয়া সেই ডাক শিখে সুপ্তিকে শুধু 'মনি' বলে ডাকে।

মুক্তি অনেক আগেই ঘরে ফিরে গেছে। রিয়া সুপ্তির কোলে শান্তিতে ঘুমুচ্ছে। সুপ্তি তাকিয়ে আছে তার চোখ বরাবর চাঁদটার দিকে। কারো পায়ের আওয়াজ পেয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো রশিদ সাহেব দাঁড়ানো।

'রিয়া ঘুমিয়েছে?'

'হুমম'
'আমার কাছে দিবে নাকি ঘরে গিয়ে তুমি শুইয়ে দিবে?'

'আপনি যান। আমি রিয়াকে নিয়ে আসছি।'
'সুপ্তি'
'হুমম'
'এখনও কিছু বললে না!'
'ক্ষমা করে দিয়েছি।'

(চলবে)

মাকসুদা খাতুন দোলন

Abid faraje, Masum, Sk nadim, Tasmia haq, Sofikul alom, Nera akter, Za mahmud and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Fri Jun 04, 2021 5:04 pm
পর্ব-২

সুপ্তি রিয়াকে শুইয়ে দিয়ে চলে আসার সময় রিয়ার আম্মুকে বলল,
'কখন জ্বর আসছে?'
'আজ সন্ধ্যায়। দুপুরে কিচেনে আমি রান্না নিয়ে ব্যস্ত। বাথরুমের দরজা খোলা ছিল। এই ফাঁকে বালতি ভর্তি পানিতে ইচ্ছেমতো খেলেছে। পানি পেলে পাগল হয়ে যায় মেয়েটা! বিকেল থেকেই গা হালকা গরম। সন্ধ্যায় দেখি গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ঘরে নাপা সিরাপ ছিল। তাড়াতাড়ি খাইয়ে দেই। এর কিছু সময় পর ঘুমিয়ে পড়ে। উঠেই চিৎকার তোমার কাছে যাবে। ওর আবার ছোটবেলা থেকেই একটু ঠাণ্ডার সমস্যা।'

' সুস্থ হয়ে উঠবে। টেনশন কইরেন না! আমি এখন যাই আন্টি।'
রিয়ার আম্মু সুপ্তির কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায়
বললেন,
'সুপ্তি,কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। এতক্ষণ দু'জনে মিলে এত চেষ্টা করছিলাম মেয়েটাকে ঘুম আনানোর জন্য। কিছুতেই পারছিলাম না। তার এক বায়না মনির কাছে যাবে। এত রাতে কি করে যাই? তোমার বাবা অসুস্থ মানুষ। রিয়ার চিৎকারে ওনার ঘুম ভেঙে গেলে বাকি রাত হয়তো ঘুম আসবে না। তাছাড়া তোমার মা সারাদিন পরিশ্রম করে ঘুমিয়েছেন। তোমার সামনে পরীক্ষা। তুমি রাত জেগে পড়াশুনা করছো। রিয়াকে নিয়ে গেলে তোমার ডিস্টার্ব হবে। সব দিক চিন্তা করে তোমাদের ঘরে নক করিনি।'

'তাতে কি? আমাকে ডাকলেই হতো! আমি ঘুম পাড়িয়ে চলে আসতাম। কতটুকুই বা সময় নষ্ট হতো?'

রশিদ সাহেব কথা না বলে সুপ্তি এবং  তার স্ত্রীর কথাগুলো শুনে যাচ্ছেন। বারবার সুপ্তির মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। সুপ্তির মুখে ক্ষমা শব্দটি শোনার পর অনেকটা স্বস্তিতে ফিরেছেন। তাঁর চোখে,মুখে প্রশান্তির চিহ্ন। সুপ্তি একবারও তাকায়নি রশিদ সাহেবের দিকে। রিয়ার আম্মুর সাথে কথা শেষ করে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ে।

রিয়ার আম্মুর নাম সুহানা রশিদ। সুহানা মুক্তির সমবয়সী হলেও সুপ্তির সাথে বেশি বন্ধুত্ব। নিজের অনেক কথা শেয়ার করে। মুক্তি স্কুলে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি দুটো টিউশনি করে। এত সময় পায় না, তাই রিয়ার আম্মুর সাথে তার খুব বেশি সময় ধরে আড্ডা, গল্প করা হয়ে উঠে না। মুক্তি রিয়াকে আদর করলেও সুপ্তির খুব ভক্ত। ওর কাছেই বেশি সময় থাকে। ঐ ঘটনার পর থেকে সুপ্তি আগের চেয়ে অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে রিয়াদের ঘরে যাওয়া। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঐ ঘরে যায় না। সুপ্তি না গেলেও তার বাবার খোঁজ খবর নেওয়ার ছলে সুপ্তিকে দেখতে আসেন রশিদ সাহেব।
আফসার করিমের শরীরের খোঁজ খবর নেন,গল্প করেন। রাজনৈতিক দেশের পরিস্থিতি নানান বিষয়ে কথা বলেন। রশিদ সাহেবকে কাছে পেলে ওনি খুব খুশি হন। আফসার করিম কড়া লিকার চায়ের সাথে কড়কড়ে টোস্ট খেতে পছন্দ করেন। চায়ে টোস্ট ডুবিয়ে  
খেতে খেতে মনের আনন্দে গল্প করবেন। কথার ফাঁকে জোরে হাসবেন। তখন মনেই হবে না উনি দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় পড়ে আছেন। তিনি রশিদ সাহেবের প্রাণচঞ্চল আড্ডা বেশ উপভোগ করেন। সন্ধ্যায় রশিদ সাহেব রিয়াকে কোলে নিয়ে আফসার করিমের রুমে আসলেন। ওনাকে দেখেই আগে সুপ্তিকে ডাকলেন। সুপ্তি আসার আসার সাথে সাথে বললেন,

'যা মা, দু'জনের জন্য কড়া চা বানিয়ে নিয়ে আয়! আর হ্যাঁ বেশি করে টোস্ট বিস্কুট দিস! চা'টা বড় মগে দিস মা!

'বাবা, এতবার চা খেলে রাতে ঘুমুবে কি করে? বিকেল থেকে অলরেডি দুই কাপ গিলে ফেলেছো। ঘুম আসবে না পরে মা'কে শুধু ডাকবে। মা খুব ভোরে উঠেন। রাতের ঘুমটা মায়ের খুব দরকার। চায়ের বদলে ফল খাও। আমি ফল কেটে আনছি।'

'আর ক'দিন বাঁচবো রে মা? দিন তো ফুরিয়ে আসছে।
শুধু তো একটু চা-ই খাই। না করিস কেন?

বাবা,মেয়ের  কথা শুনে রশিদ সাহেব মুচকি হাসলেন। খাটের পাশে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন,

'মেয়ে হলো শান্তির ঘর। বাবাদের দিকে সব মেয়ের ভালোবাসা একটু বেশিই থাকে। আপনার সুপ্তি,মুক্তি হলো লক্ষী মেয়ে। সচরাচর এমন ভদ্র,সাংসারিক মেয়ে আমার চোখে পড়েনি। আমার রিয়াটা যেন বড় হয়ে সুপ্তির মতো হয়। এখনি আমাকে অনেক মায়া করে। বাসায় যতটুকু সময় থাকি আমার ঐটুকুনি মেয়ে সারাক্ষণ আঠার মতো লেগে থাকে।'

আফসার করিম রিয়ার বাবার কথা শুনে হাসলেন।

"জানেন,মেয়ে দুটোর জন্যেই আমি অনেক ভালো থাকি।"

রিয়া বাবার কোল থেকে নেমে সুপ্তির কাছে গেল। সুপ্তি রিয়াকে কোলে নিয়ে সোজা কিচেনে আসলো। দেখে রেবেকা করিম রাতের রুটির জন্য আটা গুলিয়ে ময়াম তৈরি করে হাত ধুয়ে মুছছেন।

'বাবা রিয়ার আব্বুকে নিয়ে চা খাবেন। বলল,কড়া চা বানাতে।'

'মুক্তি ঘুম থেকে উঠেছে?'

'জানি না। বুবুর ঘরে যাইনি।'
মুক্তির নাম মুখে নিতেই মুক্তি হাই তুলতে তুলতে সুপ্তির পাশে দাঁড়ালো। মুক্তি রিয়ার গাল ছুঁয়ে একটুখানি আদর করলো।

'আমাকে ডাকিস নি কেন সুপ্তি ?'

'ডাকলে তুই রেগে যাস। এই কারণে ডাকিনি।'

'ঘরে আলো নেই,জানালা খোলা। পুরো ঘর মশাদের দখলে। মশার গান শুনে ঘুম ভাঙলো।'

'মশাদের ধন্যবাদ। তোকে জাগিয়ে দেওয়ার জন্য।'
রেবেকা করিম চুলায় চায়ের পানি বসিয়ে মুক্তিকে বললেন,

'ঐ যে আটা গুলে রেখেছি। ঝটপট রুটি বেলে সেঁকে হটপটে রাখ। সকালের জন্য আলাদা করে রাখিস। ঐগুলো হালকা সেঁকতে হবে।'

'হাতে মুখে পানি দিয়ে আসছি।' এই কথা বলে মুক্তি ওয়াশরুমে চলে গেল।

সুপ্তি রিয়াকে খাটে বসিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দিল।
খাটের মাঝখানে কিছু খেলনা ছড়িয়ে রাখলো। রিয়া মনের  আনন্দে টেডি বিয়ার নিয়ে খেলছে। সুপ্তি তার কাছেই উপুর হয়ে শুয়ে ক্যালকুলেটর চেপে ম্যাথ করছে। ম্যাথ করার ফাঁকে ফাঁকে কান দিচ্ছে বাবার ঘরে কি কথা হচ্ছে সেইদিকে। আফসার করিম জোরে জোরে হাসছেন। সম্ভবত রশিদ সাহেবের কোনো মজার  কথা শুনে এমন শব্দ করে হাসছেন। হাসি থামিয়ে বললেন,

'বুঝলেন রশিদ সাব,স্টুডেন্ট লাইফে খুব স্মোকের নেশা ছিল। কোনোদিন মদ,গাঁজার আশেপাশে যাইনি। তবে প্রচুর সিগারেট ফুঁকতাম বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে। কলেজের পাশে যে নদীটা দেখছেন সেই নদীর নাম কংস নদী। বিকেল হলে চলে যেতাম নদীর পাড়ে। সাথে সাত আট জন বন্ধু। ফুরফুরে শীতল হাওয়ায় সবুজ ঘাসে বসে আড্ডা চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা। সিগারেট ধরিয়ে সুখটান দিতাম আর মনের সুখে গান গাইতাম।
আমাদের মাঝে সবচেয়ে ভালো মেধাবী ছিল জুয়েল।
সিগারেট ধরার কিছুদিন পর তার বড় ভাই একদিন
দেখলো টঙ ঘরের কাছে বসে সিগারেট টানছে। শার্টের কলার ধরে বাড়িতে নিয়ে গেল। তারপর সে কি মাইর দিল জুয়েলকে। এখনও মনে পড়ে। মাইর খেয়ে দু'দিন জ্বর ছিল জুয়েলের। তারপর থেকে জুয়েল আর আমাদের আড্ডায় আসতো না। এসএসসি,এইচএসসি ভালোভাবে পাশ করলো। চান্স পেলো বুয়েটে মেকানিক্যালে। এখন ঢাকায় গাড়ি,বাড়ি করে বিশাল বড়লোক। বাড়িতে আসে গাড়ি নিয়ে। আমার অসুস্থতার কথা শুনে হঠাৎ একদিন বাসায় হাজির। অনেক সময় গল্প করে খেয়ে-দেয়ে তারপর বউ বাচ্চা নিয়ে ঢাকায় ফিরে।

সুপ্তির মা চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। মুচকি হেসে বললেন,

'কি নিয়ে এত হাসাহাসি হচ্ছে? আমি কিচেন থেকে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। সিগারেট খাওয়া নিয়ে মনে হয়। তাই না?'

'হুমম,ঐ যে আমার বন্ধু জুয়েলের কথা বলছিলাম। বড় ভাইয়ের মাইর খাইয়া সিগারেট ছাড়লো। এরপর লেখাপড়ায় এমন মনোযোগ দিল। বুয়েটে চান্স পেয়ে বর্তমানে সে নামকরা ইঞ্জিনিয়ার।'

সুপ্তির মা দু'জনের হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে  নিজেও গরম চায়ে চুমুক দিলেন। সুপ্তির বাবার পাশে বসে গল্পে যোগ দিলেন।

'তোমারও তো সিগারেটের প্রচুর নেশা ছিল। আমি কত  নিষেধ করতাম। নেশা ছাড়াতে পারিনি। সুপ্তি ঐ কাহিনি না করলে এখনও সিগারেট ছাড়তে পারতে না।'

রশিদ সাহেব চায়ের কাপ রেখে কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলেন,

'সুপ্তি আবার কি কাহিনি করেছিল?'

সুপ্তির বাবা হেসে বললেন,

'সে অনেক আগের কথা। তখন সুপ্তির বয়স পাঁচ বছর।
একদিন আড়ত থেকে রিকশা করে বাসায় ফিরছিলাম।

রশিদ সাহেবের মোবাইল বেজে উঠলো। কল রিসিভ করে কথা বলছে। সুপ্তির বাবা কথা থামিয়ে চুপ করে আছেন। কথা শেষ করে মোবাইল রাখতে রাখতে রশিদ সাহেব বললেন,

'আজ না,অন্যদিন শুনবো সুপ্তির কাহিনি। থানা থেকে জরুরি ফোন আসছে এখনি যেতে হবে। তাহলে আজ উঠছি।'

রশিদ সাহেব রিয়াকে নিতে সুপ্তির রুমে আসলেন।
রিয়া মনোযোগ দিয়ে খেলছে। সুপ্তি ওড়না পাশে রেখে শুয়ে ম্যাথ করছিল। রশিদ সাহেবকে দেখেই ওড়না বুকে জড়িয়ে নিল।

'রিয়া আর তার মনি কি করছে? রিয়া আম্মুর কাছে যাবে না?'

'না,যাবো না। মনির কাছে থাববো। তুমি যাও।'

রশিদ সাহেব রিয়ার সাথে কথা বললেও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুপ্তির দিকে। পলক ফেলছে না। সুপ্তি তাঁর দিকে দৃষ্টি দিতেই মুচকি হাসলেন। খুব আস্তে করে
বললেন,

'পিংক কালার থ্রিপিসে তোমাকে খুব মানিয়েছে। দেখতে দারুণ লাগছে! লম্বা চুল ছেড়ে রাখলে তো কথাই নেই।
সৌন্দর্যের ষোল আনাই ফুটে উঠে। বারবার দেখতে ইচ্ছে করে।'

সুপ্তি লজ্জায় আর তাকাতে পারছে না। খাতার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ এমন প্রশংসা শুনে কি বলবে বুঝতে পারছে না। প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাবার জন্য বলল,

'রিয়া মনি থাকুক। আমি একটু পর আন্টির কাছে দিয়ে আসবো। আপনি যান।'

'সুপ্তি,তুমি খুব বুদ্ধিমতী এবং মেধাবী। আমার রিয়াটা যেন ঠিক তোমার মতো হয়।'

'আপনি ভাববেন না। আমার রিয়ামনি বড় হয়ে অনেক মেধাবী,ভদ্র এবং একজন সত্যিকারের মানুষ হবে।'

'তোমার পরীক্ষা কবে থেকে শুরু?'

'আগামী পরশুদিন থেকে।'

'ঠিক আছে পড়ো। রিয়া বিরক্ত করলে সাথে সাথে ওর মায়ের কাছে দিয়ে এসো।'

রশিদ সাহেব হাত বাড়িয়ে মেয়েকে আদর করে বাই দিয়ে চলে গেল। রিয়াও হাত নেড়ে বলল,

'তা তা বাবা!'

সুপ্তির ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষা শুরু হলো। একদিন পর পর পরীক্ষা হচ্ছে। শেষ পরীক্ষার দিন কলেজ থেকে ফেরার পথে মাঠে চাচাতো ভাই আশিকের সাথে দেখা। আশিক বলল,

'চল্ সুপ্তি একসাথে যাই! তোকে বাসার সামনে নামিয়ে আমি চলে যাবো।'
সুপ্তি দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল,

'তোর সাথে যেতে পারি এক শর্তে। যদি আমাকে আইসক্রিম খাওয়াস তাহলে যাবো।'

'ওকে আইসক্রিম খাওয়াবো। চল্। তুই রিকসা ভাড়াটা দিয়ে দিস্।'

'তাহলে যাচ্ছি না। তুই তোর পথে যা। আমি আমার পথে
যাচ্ছি।'

'আরে আমি এমনি বলেছি। তুই আমার বোন এবং বান্ধবী। ভাই হিসাবে আমার একটা দায়িত্ব আছে না?
তোকে রিকসা ভাড়া দিতে হবে না। এখন চল্ তাড়াতাড়ি! আকাশ কালো করেছে। বৃষ্টি নামবে মনে হয়।'

আশিক দুটো আইসক্রিম কিনে সুপ্তিকে নিয়ে রিকশায় বসলো। কথা বলতে বলতে বাসায় ফিরছে। মাঝপথে রশিদ সাহেবের সাথে দেখা। চোখে সানগ্লাস,বাইক চালাচ্ছে। সুপ্তিকে দেখে কথা না বলে চলে গেলো। বাসায় পৌঁছাতে অল্প একটু পথ বাকি। এর ভিতরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। আশিক রিকসার হুক উঠাবে সুপ্তি দিবে না। এই নিয়ে রিকসায় দু'জনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলো। সুপ্তি রাগে বলল,

'যদি হুক তুলিস। নেমে হাঁটা দিব কিন্তু!'

'তোর ঠাণ্ডা লেগে যাবে সুপ্তি! পরে চাচি আমাকে বকবে। বলবে আশিকের জন্য তার মেয়ের জ্বর আসছে।'

'লাগুক ঠাণ্ডা। আমি ভিজেই বাসায় যাবো।'

সুপ্তি হুক না উঠিয়ে নিজেও ভিজে চুপচুপে হয়েছে। আশিককেও ভিজিয়েছে। বাসার সামনে সুপ্তি নেমে গেল। আশিক রিকশা নিয়ে তার বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গেইট খোলা। ভেজা কাপড়ে সুপ্তি জড়োসড়ো হয়ে গেইটের ভিতরে প্রবেশ করতেই রশিদ সাহেবের মুখোমুখি। ভেজা ইউনিফর্ম শরীরে চেপে আছে। বাইক বারান্দায় রেখে ভিতরে যাবে দেখে সুপ্তি তার সামনে দাঁড়ানো। থেমে গেল দু'জনেই।
--------চলবে

Abid faraje, Masum, Sk nadim, Sofikul alom, Nera akter, Za mahmud, Soneya islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Fri Jun 04, 2021 5:05 pm
৩|

'অপূর্ব, খুব সুন্দর! একেবারে অন্যরকম লাগছে!'

ফিসফিসিয়ে বলে রশিদ সাহেব দ্রুত ভিতরে চলে গেলেন। সুপ্তি কথা না বলে হাঁটতে লাগলো। তার রুমের দিকে আসতেই দরজায় মায়ের মুখোমুখি,

'তোকে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে আশিকের সাথে এক রিকশায় আসতে বলেছে কে? এক জায়গায় দাঁড়াতে পারলি না? বৃষ্টি থামলে বাসায় আসলে কি হতো? এখনও ছোট আছিস?'

ভেজা শরীরের দিকে তাকিয়ে তার মা রাগে গড়গড় করে প্রশ্নগুলো করে যাচ্ছে। সুপ্তি কোনো উত্তর দিচ্ছে না। মাথা নীচু করে বাথরুমে চলে গেল। শাওয়ার ছেড়ে নীচে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার উপর কৃত্রিম ঝর্ণাধারা শরীর,মন শীতল করে নেমে যাচ্ছে। আহা! কি শান্তি। আজ পরীক্ষা শেষ হলো। পরীক্ষা নামক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম। কিছুদিন লেখাপড়া নিয়ে মায়ের বকবকানি থেকে ছুটি। কতদিন পর বৃষ্টিতে ভিজেছি মনে নেই। আজ অনেকক্ষণ গোসল করবো। বেসিনে মুখ ক্লিন করে আয়নায় মুখটা বারবার দেখলো সুপ্তি । রিয়ার বাবার কথাগুলো নিয়ে ভাবনার সাগরে ডুব দিয়েছে। এই মুহূর্তে সুপ্তির কল্পনায়  রঙিন স্বপ্নরা বারবার উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। নিজের রুপের প্রশংসা শুনে লজ্জা লাগলেও ভিতরে ভিতরে শিহরিত হচ্ছে। এর আগে তার কখনও এইরকম অনুভূতি হয়নি। এই প্রথম কোনো পুরুষ মানুষ তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছে।
আবার আয়নায় নিজের মুখখানা দেখে মুচকি হাসছে।   একজন বলেছে গোলাপি ড্রেসে তাকে খুব সুন্দর লাগে! ঐ কালারটাই এখন থেকে তার সবচেয়ে প্রিয় রঙ। বাথরুম থেকে বের হয়ে গোলাপি রঙের ড্রেস পরে নিল। ভেজা চুল টাওয়েলে প্যাঁচ দিয়ে ডাইনিং রুমে আসলো। তার মা টেবিলে খাবার দিচ্ছে।

' মা,তোমাকে কে বলল আশিকের সাথে এসেছি?'

'তোর বাবার রুমের জানালা আটকাতে গিয়ে দেখি তুই রিকশা থেকে নামছিস।'

' পরীক্ষা শেষ করে আশিকের সাথে কথা বলছিলাম।
ও বলল চল্ একসাথে যাই!  আইসক্রিম খেতে খেতে প্রায় চলে আসছি। হঠাৎ বৃষ্টি নামলো! আমিও মনে মনে চাইছিলাম জোরে বৃষ্টি নামুক। কতদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। আজ ভিজে বাসায় যাবো।'

'বড় হয়েছিস বুঝে শুনে চোখকান খোলা রেখে চলিস। শুধু এইটুকুই বলবো। বৃষ্টিতে ভিজে ইচ্ছে পূরণ করেছিস ভালো কথা! দেখিস,জ্বর আসলে আমারে ডাকিস না!
কয়জনকে আমি সামলাবো?

সুপ্তি হেসে মা'কে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি সুরে বলল,

' জ্বর আসলে তুমি শুধু একটুখানি আমার কপালটা ছুঁয়ে দিও মা। ব্যাস আর কোনো ঔষধ লাগবে না।'

'ছাড়! তোর বাবাকে খাবার দিয়ে আসি।'

ভাতের প্লেটে ভাজি,তরকারি তুলে স্বামীর রুমের দিকে যেতে যেতে বললেন,

'খেয়ে নে! মুক্তি ফিরলে ওকে নিয়ে খাবো। ভালো কথা, তোর আর মুক্তির বাসায় পরার ড্রেসগুলো কেটে রেখেছি কবে। এখন লেখাপড়ার চাপ একটু কম। কাল থেকে সেলাইয়ে বসে যাস।'

' কি বলো?ঐগুলো এখনও সেলাই হয়নি?

'বসার সময়টা কোথায় পেলাম?'

মাঝরাত থেকে সুপ্তির শরীর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে।
মা'কে না জানিয়ে প্যারাসিটামল খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। প্রতিদিন ফজরের আযানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙে রেবেকা করিমের। মেয়ে দুটোকে জাগিয়ে নিজে নামাজের ওযু করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে পড়েন। নামাজ,কোরআন তেলওয়াত শেষ করেন। উঠোন লাগোয়া বারান্দায় তসবিহ যপতে যপতে কিছু সময়   হাঁটেন। অসুস্থ স্বামীর অবশ হাত,পায়ে কবিরাজের তেল মালিশ করে ব্যায়াম করান। মুক্তি নামাজ শেষ করে মা,বাবার জন্য চা বানিয়ে রুমে দিয়ে যায়। নিজেও চা গিলতে গিলতে রাতে অর্ধেক গুছিয়ে রাখা নাস্তা বানানোর কাজ ঝটপট সেড়ে টেবিলে রেখে নিজের টিফিন বক্স নিয়ে বেরিয়ে পড়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে। রেবেকা করিম অসুস্থ স্বামীকে নাস্তা খাইয়ে,গা মুছে কিচেনের রান্নার কাজ শেষ করে একটু দেরিতে নিজের কর্মস্থলে বের হন। প্রতিদিনের মতো আজ ছোট মেয়েকে সকালে ঘুম থেকে সজাগ করেন নি। মেয়ের রুমেও আসেননি। স্কুলে যাওয়ার আগে ডেকে শুধু বললেন,

'অনেক বেলা হয়েছে। উঠে পড়। স্কুলে যাচ্ছি। তোর বাবার দিকে খেয়াল রাখিস।'

সুপ্তি চোখ খুললো না। এপাশ থেকে ওপাশে ফিরলো। মায়ের কথা শুনে ঘুম চোখে শুধু বলল,

'আচ্ছা যাও।'
আপাদমস্তক কাঁথা জড়িয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লো সুপ্তি।

চারিদিকে উঁচু দেয়াল ঘেরা সুন্দর ছিমছাম একটা দু'তলা বাড়ি। বাড়িটির সামনে বিশাল মাঠ। মাঠটিতে মোলায়েম সবুজ ঘাস গালিচার মতো বিছানো। দেয়াল ঘেঁষে শতবর্ষের পুরনো এক একটা বৃক্ষ ঠিক যেন অতন্দ্রপ্রহরী। নির্মল বাতাস দিয়ে পুরো বাড়িটিকে
শীতলতায় ভরিয়ে রাখে। লোকালয় থেকে দূরে বাড়িটিকে সারাক্ষণ প্রাণোচ্ছল রাখে রুম্পি,টুম্পি। বিকেল হলেই সারা মাঠজুড়ে ফুলের মতো ফুটফুটে টুইন মেয়ে দুটো দৌড়াদৌড়ি করে, ছোঁয়াছুঁয়ি খেলে। সুপ্তি দক্ষিণের বারান্দা থেকে মেয়েদের খেয়াল রাখে। কখনও কখনও মেয়েদের সাথে খেলায় যোগ দেয়। চোখ বেঁধে কানামাছি খেলে। মেয়ে দুটোকে নিয়ে গান গাইতে গাইতে দোলনায় দোল খায়।
গালে আদর দিয়ে দুলতে দুলতে গান ধরে,
'তোরা যে আমার চোখের মনি
তোরা আমার পৃথিবী
তোদের পেয়ে আমি খুব সুখী
ডাকিস যে আমায় মা-মনি'

দুপুর থেকে আকাশে মেঘ জমেছে। সাথে ফুরফুরে বাতাস। শান্ত,স্নিগ্ধ বিকেলে সুপ্তি মেয়েদের নিয়ে মাঠে এলো। মেয়েরা বল নিয়ে খেলা করছে ইচ্ছেমতো। সুপ্তি
দোলনায় আনমনে নানা ভাবনায় ডুব দিয়েছে। বাতাসের
গতিবেগ বেড়ে চলেছে। তার এলোমেলো চুল বাতাসের ছোঁয়ায় লুকোচুরি খেলছে। কি যে ভালো লাগছে সুপ্তির!ভালো লাগার রেশ নিয়ে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠে,

'আজি এই উদাস পবনে
বসে আছি নির্জনে
তোমার পথপানে চেয়ে
তুমি চলে এসো সঙ্গোপনে
দিও গো হাত দুটো বাড়িয়ে
চোখের ভাষা বুঝে নিও বুকে জড়ায়ে,,

বল গড়িয়ে চলে যায় বড় গাছটার নীচে। বলের পিছনে পিছনে দ্রুত গতিতে দৌড়াচ্ছে রুম্পি। রুম্পির পিছনে ধীরগতিতে টুম্পি যাচ্ছে। রুম্পি বল নিতে নীচু হতেই
গাছটার বড় শুকনো একটা ঢাল রুম্পির মাথায় পড়ে।
রুম্পি 'মা-মণি' শব্দে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। 'রুম্পি সোনা,রুম্পি সোনা চোখ খোল্!' বলে ঘুমের মধ্যে সুপ্তি গোঙাতে থাকে। মাথার কাছে আশিক
এসে হাজির। গোঙানি শুনে শরীর ঝাঁকি দিয়ে বলল,

' কি হয়েছে তোর? এত বেলা পর্যন্ত শুয়ে আছিস কেন?
চাচা তোকে ডাকছে কখন থেকে।'

সুপ্তি কাঁথা সরিয়ে উঠে বসে। শরীর কাঁপছে। ঠোঁট,জিভ শুকিয়ে কাঠ। প্রচুর পানি পিপাসা পেয়েছে। আশিককে
বলল,

'এক গ্লাস পানি এনে দে! খুব পানি খেতে ইচ্ছে করছে। কি সব আবোল তাবোল স্বপ্ন দেখছিলাম।

আশিক ডাইনিং রুম থেকে এক মগ পানি এনে সুপ্তির হাতে দিল। একটানে মগের পুরো পানি গিলে নিল সুপ্তি। ডানহাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখ মুছে জড়োসড়ো হয়ে  আবার শুয়ে পড়লো। চোখ বন্ধ করে আশিককে বলল,

'আমার শরীরটা ভালো নেই। তুই একটু বাবার কাছে যা!
দেখ তো বাবার কি লাগবে।'

আশিক সুপ্তির মাথার কাছে বসে কপালে হাত রেখে বলল,

' কপাল তো অনেক গরম। জ্বর কখন আসলো?'

'মাঝরাত থেকে।'

'কোনো ঔষধ খাস নি?'

'একটা প্যারাসিটামল ছিল। ওটাই খেয়েছি। খুব ক্ষুধা পেয়েছে। টেবিল থেকে কিছু এনে দে!'

'একটু অপেক্ষা কর। চাচাকে জানিয়ে আসি তোর খুব জ্বর।'

আশিক সুপ্তির বাবার ঘরে চলে আসলো। এসে দেখে ওনি চোখ বন্ধ করে ডানহাতটা কপালে উঠিয়ে কাতরাচ্ছেন। আশিক চেয়ার টেনে তার চাচার কাছে বসলো।

'চাচা,সুপ্তির জ্বর আসছে। আমি গিয়ে দেখি বিভোর ঘুম। এই জন্য আপনার ডাক শুনে নি। ডেকে তুললাম।'
চাচা আজ আপনার শরীরটাও কি ভালো নেই?

'আর বলিস না। তোর চাচি স্কুলে যাওয়ার পর এই যে পেটে ব্যথা শুরু হলো আর কমছে না। সুপ্তিকে ডাকি আসে না। তোর চাচিকে ফোন করি। ফোন বেজে যাচ্ছে। কেন রিসিভ করছে না বুঝতে পারলাম না।'

'এখনও ব্যথা আছে?'

'হুমম'

'গ্যাস্টিকের ব্যথা না তো?'

'আরে না। সব ঔষধ খাওয়ার আগে গ্যাসের ঔষধ খেয়ে নেই।'

'ডাক্তারকে কল করবো চাচা?'

'না। তোর চাচী স্কুল থেকে আসুক। ব্যথা একটু সহনীয় আছে।

'চাচা, আমি সুপ্তিকে কিছু খেতে দিয়ে আসি। ও ক্ষুধার কথা বলল।'

আফসার করিম একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
'দেখ আমি কেমন হতভাগা বাবা! মেয়েটার জ্বর। কাছে যেতে পারছি না। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে একটু ছুঁয়ে দিব সেই ক্ষমতাটুকু আমার নেই।'

আশিক চুপ থেকে খাবার টেবিল থেকে রুটি,সবজি নিয়ে সুপ্তির সামনে রাখলো। আস্তে করে সুপ্তিকে ডাকলো,

'উঠে বস। খাবার নিয়ে আসছি।'
সুপ্তি বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে রইলো। আশিক সুপ্তির মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। অল্প একটু খেয়ে হাত দিয়ে না সূচক ইশারা দিয়ে বলল,

'আর দিস না। খেতে পারবো না। বমির ভাব হচ্ছে।'

আশিক খাবার নিয়ে জোড়াজুড়ি না করে রেখে দিল। রুমাল ভিজিয়ে কপালে জলপট্টি দিয়ে মাথার কাছে মগে অল্প একটু পানি রাখলো।

'রুমালটা ভিজিয়ে একটু পর পর কপালে রাখিস সুপ্তি ।  তোর গায়ে অনেক জ্বর। জ্বর না নামলে সমস্যা হবে।
ফার্মেসি থেকে ঔষধ নিয়ে এখনি আসছি।'

আশিক চলে যাওয়ার পর পরই রশিদ সাহেব রিয়াকে কোলে নিয়ে সুপ্তির রুমে আসলেন। সুপ্তি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। মাথায় জলপট্টি দেখে গাল ছুঁয়ে আস্তে আস্তে  ডাকলো,

'সুপ্তি'

চোখ মেলে তাকালো সুপ্তি।তারপর ক্ষীণ গলায় বলল,

'মাঝরাত থেকে জ্বর আসছে।'
রশিদ সাহেব রিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে সুপ্তির পাশে বসিয়ে দিল। কপাল থেকে রুমালটা মগে চুবিয়ে হালকা চিপে সুপ্তির মুখটা ভালো করে মুছে দিয়ে আবার কপালে রাখলো। ডান হাতটা নিজের ডানহাতে চেপে রাখলো কিছুক্ষণ। সুপ্তি চুপ করে রশিদ সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। রিয়া সুপ্তির গালে ঠোঁট ছুঁয়ে আদর করে দিচ্ছে। সুপ্তির চোখ থেকে নিঃশব্দে নোনা অশ্রু গড়িয়ে দু'কানে নেমে আসে। রিয়া সুপ্তির কান্না দেখে তার ছোট্ট হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিল। রশিদ সাহেব মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সবার নীরবতায় কেটে যায় বেশ কিছু সময়। রশিদ সাহেব সুপ্তির দিকে তাকিয়ে মায়াজড়ানো গলায় বললেন,

' প্রথমে তোমার বাবার ঘরে যাই। দেখলাম উনি ঘুমুচ্ছেন। তারপর দেখি তোমার কোনো সাড়াশব্দ নেই।
ভাবলাম বাইরে গিয়েছো। রুমে এসি দেখি তুমি কপালে জলপট্টি নিয়ে শুয়ে আছো। জানো সুপ্তি, আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।'

'কেন?'

'জানি না। তবে তোমার জন্য খুব মায়া হয়। তোমাকে,,,'

তোমাকে বলে রশিদ সাহেব থেমে যান। সামনে তাকিয়ে দেখে আশিক ঔষধ নিয়ে রুমের ভিতরে ঢুকলো।

-----চলবে

Abid faraje, Sk nadim, Tasmia haq, Sofikul alom, Nera akter, Za mahmud, Soneya islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Fri Jun 04, 2021 5:08 pm
পর্ব-৪

এন্টিবায়োটিক খাওয়ার পর সুপ্তির জ্বর আস্তে আস্তে কমে। জ্বর না থাকলেও শরীর অনেকটা দুর্বল। মুখে রুচি নেই। জ্বরে আধা সিদ্ধ জিভে খাবারের কোনো স্বাদ নেই। যা মুখে তুলে সবই তিতা লাগে। এই মূহুর্তে নিজের জন্য বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই সুপ্তির। সব ভাবনা বাবাকে নিয়ে। হঠাৎ আফসার করিমের শরীর ক্রমশ খারাপ হয়ে যাওয়াতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। উনি শক্ত খাবার খেতে পারেন না। আগের মতো সবার সাথে তেমন কথাও বলেন না। মিসেস করিম স্কুল থেকে ছুটি নিয়েছেন। অসুস্থ স্বামীর পাশে থেকে নিজেও অনেকটা অসুস্থ। দেহটা আর একঘেয়ে পরিশ্রমের ঘানি টানতে চায় না। শরীর ক্লান্ত থাকলেও মনের দিক থেকে খুব শক্ত। দেহ এবং মন একে অন্যের পরিপূরক। দেহের কিছু হলে মন এমনিতেই দুর্বল থাকে। মিসেস করিম মনটাকে কখনও দুর্বল হতে দেন না। সময়,পরিবেশ বিবর্ণ হলেও মনে সাহস রেখে প্রিয় মানুষটিকে সুস্থ করে তুলতে রাতদিন পরিশ্রম করেন। ডাক্তার সবকিছু দেখে প্রাথমিকভাবে পাকস্থলীর সমস্যার কথা জানালেন। একই সাথে কিছু টেস্ট করতে দিলেন। তরল খাবার,স্যালাইন খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। টেস্টের রিপোর্টে কোলন ক্যান্সার ধরা পড়লো। অল্প দিনের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে অবস্থা আরও অবনতির দিকে যেতে থাকে। সেন্স থাকলেও কারো সাথে কোনো কথা বলেন না। কেউ কথা বললে কোনো সাড়াশব্দ করেন না।

খবর শুনে কাছের আত্মীয়-স্বজন আফসার করিমকে চোখের শেষ দেখা দেখতে ছুটে আসেন। মেয়ে দুটোকে সান্ত্বনা দেন। অসুস্থ মানুষটির মুখে ফলের জুস দিয়ে ইচ্ছে পূরণ করেন। কথা বলার চেষ্টা করেন। তিনি
কারো কথার জবাব না দিয়ে স্যাঁতেস্যাঁতে চোখে শুধু তাকিয়ে থাকেন। সবাই মিসেস করিমকে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ধৈর্য্য ধারণ করতে বলেন। মৃত্যুর উপর কারো হাত নেই। প্রকৃতির চিরাচরিত এই স্বাভাবিক নিয়মকে মেনে নেওয়া ছাড়া কিবা করার আছে? ভাগ্যে যার মৃত্যু যেভাবে লেখা সেভাবেই হবে। কোলন ক্যান্সার ধরা পড়ার ঠিক সতেরো দিনের দিন ফজরের নামাজ পড়ে মিসেস করিম স্বামীর কাছে যান। মাথা কাত করা দেখেই বুকটা ধড়ফড় করে উঠে। তাড়াতাড়ি মাথা সোজা করে গাল,মুখ ছুঁয়ে দেখেন। পুরো শরীর ঠাণ্ডা।
সাথে সাথে হাতের ভেইন চেপে পাল্স দেখলেন।
বুঝতে বাকি রইলো না তাঁর জীবনে কি ঘটেছে। সুপ্তির মায়ের গগনবিদারী চিৎকারে মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়ি নিরব,নিস্তব্ধ শোকে পাথর।

জীবন থেমে থাকে না। সময়ের স্রোতে জীবনকে টেনে নিতে হয়। সময়ই জীবনের ধারাকে পাল্টে দেয়। রেবেকা মঞ্জিলের সবকিছু আগের মতো থাকলেও বাড়িটি অনেকটা প্রাণহীন। সুপ্তি বাবার শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও বাবার সাথে কাটানো সুখের স্মৃতিগুলো মনে করে কাঁদে। পুরোনো ছবি দেখে নিজের মনকে শান্ত করে। মুক্তির মতো তাকেও সংসার খরচের দায়িত্ব নিতে হবে। বাবা বেঁচে নেই মা'কে সব সময় ভালো রাখতে হবে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সেই বোধশক্তি তার ভিতর সৃষ্টি হয়। লেখাপড়ায় মন দিল। নিয়মিত সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস করে। দুটো প্রাইভেট পড়া শুরু করলো। মুক্তি মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করে
আবার স্কুলে জয়েন করে। পাশাপাশি আরও ভালো চাকরির খোঁজে প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে। মিসেস করিম স্বামীকে হারিয়ে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরলেও ভিতরে পাহাড়সম কষ্টের বোঝা বহন করে চলছেন প্রতিনিয়ত। ভালোবেসে বিয়ে করে সুখের নীড় গড়েছিলেন যেই মানুষটিকে নিয়ে সে কাছে নেই। দিনের শুরুটা হতো যার মুখটিতে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে প্রিয় মানুষটির চলে যাওয়া তাঁর জীবনের গতিকে বারবার এলোমেলো করে দেয়। স্বামীর অকাল প্রস্থান জীবনের সুন্দর সময়গুলোকে অমানিশার চাদরে ঢেকে দিয়েছে। নীরবে কেঁদে অশান্ত মনকে শান্ত করেন। নিয়তিকে মেনে নিয়ে বহমান শান্ত নদীর মতো ছুটে চলেন সামনের দিকে। তাঁর নিজের জন্য কোনো ভাবনা নেই। সব ভাবনা মেয়ে দুটোর ভবিষ্যত নিয়ে। তিনি কি পারবেন একাকী সব সামলে নিতে? মেয়ে দুটোকে যোগ্য করে ভালো ঘরে বিয়ে দিতে? তাঁর একটাই চাওয়া সৎ,চরিত্রবান,যোগ্য ছেলের কাছে মেয়ে দুটোকে বিয়ে দিয়ে তারপর যেন মরেন। মুক্তির বিয়ে নিয়ে বেশ চিন্তিত থাকেন মিসেস করিম। মেয়েটার লেখাপড়া শেষ। বয়সও বেড়ে যাচ্ছে। এখনি বিয়ে দেওয়ার উপযুক্ত সময়। কিন্তু ভালো ছেলের খোঁজ কোথায় পাবেন?
সারাক্ষণ মাথায় একটা চিন্তাই ব্যস্ত করে তুলে মিসেস করিমকে।

চলতি মাসের পনেরো তারিখ রিয়ার জন্মদিন। সুহানা রশিদ মেয়ের জন্মদিনে বড় করে অনুষ্ঠান করবে। থানার স্টাফদের ইনভাইট করবে। সুপ্তিকে নিয়ে সব পরিকল্পনা করে। রশিদ সাহেব থানার কাজে দু'দিনের জন্য ঢাকা গেছেন। সুপ্তি দু'দিন ধরেই রিয়া,তার মায়ের সাথে থাকছে। চা খেতে খেতে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
গল্প করছে,রিয়াকে শাড়ি পরিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে ছবি তুলছে। মাঝেমাঝে মুক্তি এসে
আড্ডায় শরিক হচ্ছে। সুহানা রশিদ সুপ্তি,মুক্তিকে পেয়ে
গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে। হাসি,গল্পে ফিরে যায় তার অতীত জীবনের সুন্দর স্মৃতিগুলোতে। রশিদ সাহেবের সাথে প্রণয়,চিঠি আদান-প্রদান,মাঝেমাঝে দেখা করা তারপর প্রেমের সফল পরিণতি বিয়ে সবকিছু হাসিমুখে অকপটে বলে যাচ্ছে। কোনো জড়তা নেই। কথাগুলো শুনে সুপ্তির আগ্রহ বেড়েই যাচ্ছে। তার শিরা উপশিরায় লোহিত কণিকাগুলো দ্রুতগতিতে ছুটছে। সুপ্তির জানা ছিল না রিয়ার আব্বু ভালোবেসে প্রেম করে বিয়ে করেছে। সুপ্তি কৌতুহল নিয়ে রিয়ার আম্মুকে প্রশ্ন করে,

'প্রথমে কে পছন্দের কথা জানায়?'

স্মিত হেসে সুহানা রশিদ বলল,

'রিয়ার আব্বু আমার মামাতো ভাই এটা জানো তো?'

মুক্তি হাসতে হাসতে উত্তর দিল,

'হুম জানি। তবে এটা জানি না ভালোবেসে বিয়ে করেছেন।'

'এক মিনিট। এখনি আসছি।' বলেই সুহানা রশিদ তড়িৎ গতিতে খাট থেকে নেমে কিচেনে গেলেন। ছোট্ট ট্রেতে তিন কাপ ধূমায়িত চা নিয়ে আবার খাটের মাঝখানে বসলেন। নিজে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ট্রে এগিয়ে দিলেন ওদের সামনে।

'চায়ের কেটলি উনুনে ছিল। তাই ঝটপট নিয়ে আসলাম। চা ছাড়া গল্প করে মজা পাই না।'

তড় যেন সইছে না সুপ্তির। আগ্রহ নিয়ে আবার বলল,

তারপর কি হলো? বলেন তাড়াতাড়ি!

সুহানা রশিদ সুপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে দুষ্টুমি
করে বলল,

'কি ব্যাপার? কারো প্রেমে পড়েছো? তোমার চোখে,মুখে
বেশ কৌতুহল দেখছি।'

সুপ্তি খানিকটা হকচকিয়ে যায়। মুক্তির দিকে দৃষ্টি দিল।
তারপর শান্ত গলায় জবাব দিল,

'না ঐসব কিছু না। মনে হচ্ছে আপনাদের রিলেশনটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। তাই কৌতুহল হচ্ছে সবকিছু জানার।'

তাই বুঝি? তাহলে শোন! পছন্দের কথা প্রথমে কে জানিয়েছিল। আমি তখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। রিয়ার আব্বু অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। একদিন আম্মার অসুস্থতার খবর শুনে রিয়ার আব্বু মামিকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসলো। আম্মা অসুস্থ থাকায় জুলেখার মাকে নিয়ে রান্না আমিই করি। আম্মা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত মামি আমাদের বাসায় থেকে গেলেন। সাথে রশিদ ভাইও। রিয়ার আব্বুকে তখন রশিদ ভাই বলে সম্বোধন করতাম। বাসায় আসার পর খেয়াল করলাম যেকোনো ছুতোয় সে আমার সামনাসামনি থাকে। কথা বলার চেষ্টা করে। লেখাপড়া নিয়ে কথা বলে। আমারও
বেশ ভালো লাগে কথা বলতে। সেই ভালো লাগা যে ভালোবাসায় রুপ নিবে জানতাম না। মনের অজান্তেই রশিদ ভাইকে নিয়ে ভাবতে শুরু করি। সামনে আসলে লুকিয়ে বারবার দেখি। চোখে চোখ পড়লেই লজ্জায় চোখ সরিয়ে আনি। এইদিকে মামিকে কাছে পেয়ে আম্মা অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেন। মামি চলে যাবেন এই নিয়ে আম্মার সাথে কথা বলছিলেন। দুপুরে খাওয়ার পর রশিদ ভাই টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে। আমি কিছু সময় খাটে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করি। কিছুতেই ঘুম আসছে না। কি এক যন্ত্রণা! আগে এমন হয়নি। শুইলেই
ঘুমে চোখের পাতা দুটো আপনাআপনি বুঁজে আসতো।এখন কত পরিশ্রম করছি। কিন্তু চোখে ঘুম নেই! ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে আছি। ঘুম পালিয়ে এলোমেলো ভাবনা এসে জুড়ে বসলো। কিছু সময় ভাবনায় ডুবে থেকে বিছানা ছেড়ে রশিদ ভাইয়ের রুমে উঁকি দিলাম। দেখি ছোট ভাই তন্ময়ের পাশে কোল বালিশ জড়িয়ে ঘুমুচ্ছে। চলে আসলাম ছাদ বাগানে। সামনে প্রশস্ত মাঠের দিকে ফিরে আছি। নীল আকাশের দিকে
তাকিয়ে দেখি দুটো শালিক উড়ে যাচ্ছে। মনের আনন্দে গুনগুনিয়ে গান গাইতে শুরু করি,

'তোমায় রেখেছি যতন করে
মনের মন্দিরে
মনের বিনিময়ে মন দিয়ে
বেঁধে নিও প্রেমডোরে'

চার লাইন গাওয়ার পর হঠাৎ থেমে যাই। পিছন থেকে আওয়াজ আসলো,

'থামলি কেন?'

বুকটা কেঁপে উঠে। ফিরে দেখি রশিদ ভাই। কি যে ভালো লাগছিল ভাষা নেই! প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মিলন যে এত তাড়াতাড়ি হবে বুঝতে পারিনি। সম্ভবত তারও ঘুম আসছিল না। আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আমি তার দিকে তাকাতে পারছি না। খুব লজ্জা লাগছে! মাঠের দিকে তাকিয়ে আছি। অথচ তাকে মনে মনে খুব করে চাইছিলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,

'ঘুম আসছিল না। চলে আসছি। তুই আমার কাছে গিয়েছিলি। আমি টের পেয়েছি। জানি তুই ছাদে আছিস। কালকে চলে যাবো। কিছু ভালো লাগছে না আমার! সুহানা তোকে কিছু বলার ছিল।'

কথাটা শুনেই বুকটা ধুক করে উঠলো। এক মুহূর্ত দেরি না করে কাঁপা গলায় বললাম,

'কি বলার ছিল?'

'কাউকে ভালোবাসিস?'
'হুমম'
সাথে সাথে হৃদকম্পন দ্রুত বেড়ে চলেছে। আর কি বলবো বুঝতে পারছি না। আমি যে রশিদ ভাইকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। কি করে বুঝিয়ে বলি আমি তোমাকেই ভালোবাসি। কারো পায়ের ধপধপ আওয়াজে বলতে গিয়েও বলতে পারিনি। তন্ময় সামনে এসে হাফাচ্ছে।

'আপু, আম্মা তোমাদের এখনি যেতে বলছে। তাড়াতাড়ি চলো।'

তুই যা! এখনি আসছি!

তন্ময় ফের এক দৌড়ে নীচে চলে গেলো। পিছনে পিছনে
আমরাও যাচ্ছি। হঠাৎ যেন দু'জনের মুখ থেকে কথা উধাও হয়ে যায়। যেতে যেতে রশিদ ভাই শুধু বলল,

'ভার্সিটির হলের ঠিকানায় চিঠি লিখিস। তোর চিঠির অপেক্ষায় থাকবো।'

আমি বুকে সাহস নিয়ে বলেই ফেললাম,

'তুমি কাউকে ভালোবাসো?'

'হুমম,বাসি তো! আমার ডিপার্টমেন্টের এক বান্ধবীকে।'

কথাটা বলেই রশিদ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি
হাসছে। শোনা মাত্রই রাগে,কষ্টে অভিমানে দ্রুত নীচে চলে আসলাম। তার সামনেই আর গেলাম না। শরীর খারাপের কথা বলে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলাম।
পরদিন সকালে মামি চলে যাবেন। রাজশাহী ওনার বাসায় বেড়াতে যেতে বললেন। রশিদ ভাই আমার দিকে তাকিয়ে আবারও মিটমিট করে হাসছে। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে আছি। ইচ্ছে করছে না ঐ মুখের দিকে তাকাতে। মামি আম্মার ঘরে গেলে সে এক ফাঁকে কানে কানে ফিসফিসিয়ে
জানিয়ে দিল,

'পাগলি তোকেই আমি ভালোবাসি! প্রতিদিন একটা করে মাসে ত্রিশটা চিঠি লিখবি। মনে থাকে যেন!'

সাথে সাথে আমার চোখ থেকে অশ্রুকণা দু'গাল বেয়ে পড়লো।

এতক্ষণ সুহানা রশিদ কথাগুলো বলে হাঁফ ছাড়লেন।
হেসে হেসে আবার শুরু করলেন তখন মোবাইল ছিল না। দু'জনে কত কথা চিঠিতে লিখেছি। শত শত রোমান্টিক কথা,কত আদর,প্রতিশ্রুতির কথা,বিরহের কথা লিখেছি চিঠিতে। দেখা হতো খুব কম। বছরে দুই তিনবার। সবকিছু হতো চিঠিতে লিখে। এভাবেই দু'জনে প্রেম করেছি দীর্ঘ চার বছর। তারপর ওর চাকরি হলো পুলিশের এসআইয়ে। আমাকে মামা,মামিও পছন্দ করতেন। মামা তার ছেলের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিলেন আম্মা,আব্বা অমত করেন নি। হয়ে গেলো বিয়ে। তিন বছর যেতে না যেতেই ভালোবাসার ফসল রিয়া ঘর আলো করে আমার কোল জুড়ে এল। চলছে সুখের সংসার.....
--------'চলবে

মাকসুদা খাতুন দোলন

Abid faraje, Masum, Sk nadim, Tasmia haq, Nera akter, Za mahmud, Soneya islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Wed Jul 28, 2021 6:10 pm
(৫)

সুহানা রশিদের কথা শোনার পর সুপ্তি একেবারে চুপ হয়ে যায়। কথাগুলো কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। মনকে বুঝাতে পারছে না রশিদ সাহেব প্রেম করে বিয়ে করেছেন। কিন্তু যাকে পছন্দ করে ভালোবেসে দীর্ঘদিন প্রেম করে বিয়ে করেছেন। সুখে সংসার করছেন। সন্তানের বাবা হয়েছেন। সেই মানুষটি পাল্টে যাচ্ছে কেন? রিয়ার আম্মুর কি নেই? তাকে ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছেন। এখনও আগের মতোই ভালোবাসেন। তাহলে আমার সাথে এমন করেন কেন? বারবার সৌন্দর্যের প্রশংসা করে আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছেন কেন? তাঁকে নিয়ে আমার ভিতরে রঙিন ভাবনার জগত তৈরি হয়েছে। উনি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন? নাকি আমার দেহটাকে ভালোবাসেন? মিছে ভালোবাসার অভিনয় করে আমাকে ঠকিয়ে চলে যাবেন অনেক দূরে। সারাজীবন সেই ক্ষত আমাকে বহন করে চলতে হবে। সবকিছু জেনেশুনে আমি রিয়ার আম্মুর সাজানো সংসার কিছুতেই ভাঙতে পারবো না।
তার প্রিয় মানুষটিকে ভালোবেসে দীর্ঘশ্বাসের কারণ হবো না। আমার ভিতর যে মোহ, আবেগ,স্বপ্ন তৈরি হয়েছে সেখান থেকে সরে আসতে হবে। মা'কে বলবো রিয়ার আব্বুকে যেন জানিয়ে দেন বাসা ছেড়ে দিতে। দূরে সরে গেলে সবার জন্য ভালো হবে। কিন্তু রিয়ামনিকে ছাড়া আমি কি করে ভালো থাকবো? ওকে যে আমি জীবনের চাইতে ভালোবাসি। মেয়েটার মায়া কীভাবে ছাড়বো? রিয়াও তো আমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারবে না।
সুপ্তি কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে নানা ভাবনায়
নির্ঘুম অর্ধেক রাত কাটায়। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়ে।

রশিদ সাহেব ঢাকা থেকে ফেরার সময় মেয়ের জন্য বার্থডে ড্রেস নিয়ে আসেন। ড্রেসের সাথে ম্যাচিং করে
রিয়ার আম্মুর জন্য সুন্দর শাড়ি আনেন। রেড কালার
মসলিন শাড়িতে গোল্ডেন সূতার ভরাট কাজ। রিয়ার জন্মদিন কাছে চলে আসলো। ঠিক হলো জন্মদিনের অনুষ্ঠান বাসায় হবে। বাবুর্চি দিয়ে রান্না করে বাসায় লোকজন খাওয়াবে । উঠোনে বড় করে প্যান্ডেল সাজানো হলো। রিয়ার আম্মু সুপ্তিকে নিয়ে ঘর সাজাতে ব্যস্ত। কেক কাটার ঘরটি নানা রঙের বেলুন,ফুল দিয়ে
সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখলো।
রিয়ার আম্মু আলমারি থেকে বেশ কিছু শাড়ি বের করে খাটের উপর ছড়িয়ে রাখলো। সুপ্তিকে বলল,

'সুপ্তি, বার্থডে প্রোগ্রামে তুমিও শাড়ি পরো। দেখ তো কোন শাড়িটা তোমার পছন্দ হয়।'

সুপ্তি শাড়িগুলোতে চোখ বুলিয়ে এক নজর দেখে নিল।
তারপর বলল,

'মায়ের অনেক শাড়ি আছে। ইচ্ছে করলেই পরতে পারি।
শাড়ি পরতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া আমি গুছিয়ে শাড়ি পরতেও পারি না। রিয়ামনি আর আমি ম্যাচিং ড্রেস পরবো। বুবুকে বলি শাড়ি পরতে। আপনি আর বুবু
শাড়ি পরেন। আমি আর রিয়া ড্রেস পরি। এটাই বরং সবচেয়ে ভালো হয়।'

'চিন্তা করো না। আমি তোমাকে গুছিয়ে শাড়ি পরিয়ে দিব। তবুও বলছি শাড়িটা পরো। সবসময় তো এইসব প্রোগ্রাম হয় না। সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করবো। গ্রুপ ছবি তুলবো। মজা করবো। ভালো লাগবে।
সামনে বছর কোথায় থাকি না থাকি তা কি বলা যায়?
ছবিগুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে।'

কথাগুলো শুনে সুপ্তির মনটা খারাপ হয়ে যায়। চোখের কোণে খানিকটা অশ্রুকণা জমে। চুপ করে মাথা নুইয়ে
আবার শাড়ি দেখছে। রিয়ার আম্মু তার নতুন শাড়িটা বের করে সুপ্তির সামনে রাখলো। সুপ্তি কিছু বলছে না। নীরবতা দেখে উনি আবার বলল,

'কি হলো সুপ্তি? চুপ কেন?'

'কই না তো! শাড়ি দেখছি।'

রিয়ার আম্মু সুপ্তির খুব কাছে বসলো। নতুন শাড়িটা
খাটে মেলে বলল,

'শাড়িটা কেমন? আমার জনাব ঢাকা থেকে ফেরার পথে নিয়ে আসছে। আমার সব শাড়ি তার পছন্দের কেনা।'

'খুব সুন্দর শাড়ি! আপনাকে দারুণ মানাবে।'

সুহানা মুচকি হাসলো। শাড়ি ভাঁজ করতে করতে বলল,

'এই শাড়িটা পছন্দ হলে তুমি পরো। মন থেকে বলছি।
আমি অন্যটা পরি।'

'ছিঃ এটা কেমন কথা! আর একবার বলবেন না। আমার খুব লজ্জা লাগছে। আপনি যেহেতু এত করে বলছেন আমি শাড়ি পরবো। মায়ের লাল জামদানি,
কাতান,তসর আরও অনেক শাড়ি আছে। জামদানি শাড়ি আমার খুব পছন্দের। মায়ের লাল জামদানি পরবো।'

রশিদ সাহেব থানা থেকে বাসায় আসলেন। ঘরে ঢুকেই
দেখেন সুপ্তি খাটে বসা। সুপ্তি দেরি না করে রিয়ার আম্মুকে বলল,

'আন্টি আমি যাই! অনেক কাজ জমে আছে। মা স্কুল থেকে চলে আসবেন।'

'তাহলে ঐটাই ফাইনাল। সবাই শাড়ি পরছি।'

সুপ্তি হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে চলে আসলো।

সুপ্তি গোসল করে তার মায়ের কাপড়,নিজের ভেজা কাপড় রোদে মেলে দিতে ছাদে চলে আসলো। কাপড়
মেলে ভেজা চুল ছেড়ে বিলি কেটে দিচ্ছে তাড়াতাড়ি শুকানোর জন্য। ছাদের কোণায় কিছু ফুলের টব আছে। টবগুলোর কাছে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ পিছন থেকে মনি ডাক শুনে পিছনে ঘুরে দেখে রশিদ সাহেবের কোলে রিয়া। সুপ্তি রিয়ার গালে হাত ছুঁয়ে বলল,

'এই দুষ্টু মেয়ে! দেখে আসলাম ঘুমাচ্ছো। এখনি উঠতে বলছে কে?'
রিয়া ইশারায় তার বাবাকে দেখিয়ে ছোট্ট করে বলল,

'বাবা বলছে উততে!'

রশিদ সাহেব হেসে মেয়ের গালে আদর দিয়ে বললেন,

'বুঝলে সুপ্তি, বাপের গন্ধ পেলেই হলো। আর কিছু লাগে না তোমার রিয়ামনির। আমার আওয়াজ শোনা মাত্রই ঘুম থেকে উঠে বসে আছে।'

সুপ্তির চোখ দুটো ছলছল। বাবার সাথে কাটানো সুখের স্মৃতিগুলো সামনে আসে। বাবাকে কোনোদিন প্রাণভরে ডাকতে পারবে না। বাবার আদর খেতে পারবে না। বাবার সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে পারবে না। বাবার মুখটি মনে হলেই তার ভিতরে জমা কষ্টগুলো গলে দু'চোখে উপছে পড়ে। সুপ্তি অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
রশিদ সাহেবের বুঝতে বাকি রইলো না সুপ্তির চোখে পানি। তার বাবার কথা মনে পড়েছে।

'প্লিজ সুপ্তি,আমার সামনে তুমি কাঁদবে না! কেউ সারাজীবন বেঁচে থাকে না। তুমি কাঁদলে ভীষণ কষ্ট হয়। এই কথা মিছে নয়। মন থেকে বলছি। তোমার সবকিছুর প্রতি আমি খুব যত্নশীল। তোমার কোনো ক্ষতি আমি চাই না।'

রশিদ সাহেব সুপ্তির খুব কাছে আসলো। রিয়ার হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিল। সুপ্তির কান্নার বেগ আরও বেড়ে যায়। নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। রশিদ সাহেব সুপ্তির
ওড়নার কোণার অংশটুকু দিয়ে চোখ দুটো মুছে বললেন,

'প্লিজ! আর কেঁদো না। চোখের পানি কোনো কিছুর সুরাহা নয়।'

সুপ্তি চোখ,মুখ মুছে রশিদ সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। রশিদ সাহেবও তাকিয়ে আছে সুপ্তির দিকে। সুপ্তি কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বলল,

'আপনি আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছেন কেন? আমি যতই দূরে দূরে থাকতে চাই। আপনি যেকোনো উপায়ে কাছে এসে কথা বলেন। আপনার স্পর্শের অনুভূতি আমাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। যা আমার জন্য খুবই ক্ষতিকর সেটা আপনি বুঝেন? ঐদিন কি বলতে চেয়েছিলেন?
'তোমার জন্য মায়া হয়। তোমাকে আমি...'তারপর আশিক চলে আসলো। থেমে গেলেন। এখন শুনতে চাই।'

রশিদ সাহেব রিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে হাঁটতে বলল।
রিয়া হাঁটছে। টবগুলোর গাছের পাতা,ফুল ছুঁয়ে দিচ্ছে।
রশিদ সাহেব চুপ করে সুপ্তির মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সুপ্তি আবার বলল,

'কি হলো?'

'আমাকে বিলিভ করো না সুপ্তি?'

'কিসের বিলিভ? বিলিভ করলেই কি? বাস্তবতা কি করে ভুলে গেলেন?'

'চরম বাস্তব সত্যিটা আমার মাথায় আছে। আমি তোমাকে ভালোবাসি। সত্যিকারের ভালোবাসায় কোনো পাপ নেই। শুধু বলবো আমার প্রতি শতভাগ বিশ্বাস রাখতে পারো।'

'রিয়ামনির আম্মুকে তো পছন্দ করে দীর্ঘদিন প্রেম করে বিয়ে করেছেন। আপনার বিবাহিত স্ত্রী। আপনার প্রতি সে অন্ধ। আপনিও তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন। আপনাদের রিলেশনের বিয়ে। রিয়ার আম্মু সবকিছু আমার কাছে শেয়ার করেছে। তার বিশ্বাসটা ভেঙে দিবেন না। তাকে ঠকাবেন কেন? আমি জেনেশুনে কেন
অন্য একজনের সংসার ভাঙবো?'

'সে তার জায়গায় আছে,থাকবে। তুমি সংসার ভাঙতে যাবে কেন ? সবকিছু ঠিক থাকবে। আমার উপর ছেড়ে দাও। আমি সব সামলে নিতে পারবো।'

' আমি আর কিছু শুনতে চাই না। আপনি আর আমার সামনে আসবেন না। আমার কিছুই ভালো লাগে না।'

'ঠিক আছে, সামনে আসবো না। ছোট্ট একটা রিকোয়েস্ট ছিল। বলো রাখবে?'

কি?

'ঢাকা থেকে ফেরার পথে দুটো শাড়ি কিনেছি। একটা রিয়ার আম্মুর জন্য। আর একটা তোমার জন্য। তোমার শাড়িটা বাসায় আনিনি। পরিচিত শাড়ির দোকানে রেখে আসছি। দোকানটি তুমি চিনবে।'শাড়ি ঘর' নামে যে বড় দোকানটা সেখানে রাখা আছে। কলেজ থেকে ফেরার পথে নিয়ে আসবে। প্লিজ না করো না।'

'এটা কি ঠিক হলো? কেন কিনলেন? কেন নিব আপনার দেওয়া শাড়ি? বাসায় মা আর বুবুকে কি বলবো? কোথায় লুকিয়ে রাখবো?'

'বলবে কয়েকজন বান্ধবী মিলে তোমার জন্মদিনে এই শাড়ি গিফট করেছে।'

'বাহ্ ভালোই তো বুদ্ধি! আমার জীবনটাকে নষ্ট করার জন্য আপনি এমন করছেন। তাই না?'

রশিদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,

'তোমার যা খুশি বলতে পারো। শাড়িটা এনে ছিড়ে ফেলে দিও। তবুও শান্তি পাবো যে আমার দেওয়া শাড়িটা ছুঁয়েছো।'

রশিদ সাহেব রিয়াকে কোলে নিয়ে দ্রুত নীচে চলে গেলেন। সুপ্তি কিছু সময় ছাদে বসে রইলো। কিছুই ভালো লাগছে না। আনমনে ভেবে যাচ্ছে। আমার জীবনে এইসব কি শুরু হয়েছে? রিয়ার আব্বুর কাছ থেকে আমাকে সরে আসতেই হবে। নীচ থেকে মুক্তির
ডাক শুনে সুপ্তি চুল বেঁধে চলে আসলো ঘরে।
খাবার টেবিলে মিসেস করিম ভাত নিয়ে বসে আছেন।
মুক্তির হাতে ভাত। মিসেস করিম রাগে চোখ বাঁকা করে বললেন,

'এতক্ষণ লাগে কাপড় মেলে দিতে? ছাদে কি করছিলি?
রিয়ার আব্বুকে দেখলাম ছাদ থেকে নামতে। একটা কথা দুই বোনকে বলে রাখি। আগে তোর বাবা বেঁচে ছিল। রিয়ার আব্বু যখন তখন ঘরে এসে গল্প করতো।
তোর বাবার সময় কাটতো,কথা বলে ভালো লাগতো।
তখন ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল। এখন তোর বাবা নেই।
রশিদ সাহেবের হুটহাট ঘরে আসাটা মোটেও ভালো দেখায় না। আমার কাছে ভালো লাগছে না। সরাসরি বলতেও পারবো না। তাই আমাদেরকেই দূরত্ব রেখে চলতে হবে। সমাজে মেয়েদের চলার পথটা এখনও অনেক বন্ধুর। যে পরিবারে কর্তা ব্যক্তিটি থাকে না সেখানে মানুষ অনেকটা অসহায় ভাবে। দুর্বলতার সুযোগ নেয়। তাই বুঝেশুনে চলতে হবে। কেউ যেন কোনো ধরণের কটু কথা বলতে না পারে। কথাগুলো মনে রাখবি।'

সুপ্তি চুপ করে খেয়ে যাচ্ছে। মুক্তি বলল,

'তুমি অযথাই চিন্তা করছো মা! আমার বুঝার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। সুপ্তিও বড় হচ্ছে। আস্তে আস্তে সব বুঝবে।'

সুপ্তি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

'মা,রিয়ার আব্বুকে বলো আমাদের বাসাটা ছেড়ে দিতে।
সামনের মাস থেকে যেন অন্য বাসায় উঠে।'

মুক্তি তার মা থ হয়ে যায়। দু'জনে চোখাচোখি করে চুপ থাকে। কিছু সময় পর মিসেস করিম বললেন,

'কেন ছেড়ে দিতে বলবো? সমস্যা কোথায়? এমন নিরিবিলি ভাড়াটিয়া এর আগে পেয়েছি বল?'

'জানি না। তবে আমি যা বলছি তাই করো।'

মুক্তি সুপ্তির বাম হাতটা চেপে ধরে বলল,

'সত্যি করে বলতো তোর কি হয়েছে?'

সুপ্তি খাওয়া শেষ করে বেসিনে হাত ধুয়ে তার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,

'কিছুই হয় নি।'

--------চলবে

Umma Mejana khatun, Arbaj khan, Hikmatullah khan, Akaram khan, Naimul islam, Feroz hassan, Arfin rony and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Wed Jul 28, 2021 6:11 pm
৬|

সুপ্তি তার রুমে এসে বামদিক কাত হয়ে শুয়ে আছে। এখন আর পড়ায় মন বসবে না। মনে মনে ঠিক করে কিছুসময় ঘুমিয়ে তারপর পড়তে বসবে। পনেরো মিনিট পর নিঃশব্দে মুক্তি এসে সুপ্তির পাশে শুয়ে গায়ে হাত রাখলো। আস্তে করে ডাকলো,

'সুপ্তি জেগে আছিস?'

'হুমম,কিছু বলবি?'

'সত্যি করে বল্ তোর কি হয়েছে?'

'কি আবার হবে?'

'হঠাৎ মাকে ঐ কথা বললি কেন? রিয়ার আব্বুকে কেন
বাসা ছেড়ে দিতে বলবে?

'তেমন কিছু হয়নি। আসলে রিয়ার কারণে ওদের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। আস্তে আস্তে বেড়েই চলেছে। ওরা তো সারাজীবন এই বাসায় থাকবে না। অযথা মায়া বাড়িয়ে লাভ কি?'

' শুধু এই কারণে বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছিস? অন্য কোনো কারণ নেই তো? রিয়ার জন্য তোর কষ্ট হবে না?'

সুপ্তি চুপ করে আছে। ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট পাচ্ছে। অকারণে চোখের কোণে ধলা পাকিয়ে অশ্রুকণা জমে। গড়িয়ে পড়ার আগেই নিজেকে সামলে নিল। শুধু রিয়ার জন্য খারাপ লাগছে না। কি করে বুঝিয়ে বলি রিয়ার আব্বু যে আমার মনের ভিতর আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। আমি যে দিনে দিনে লোকটার মায়ায় পড়ে যাচ্ছি। মায়াজাল থেকে কি করে মুক্তি পাবো? আমি কি লোকটাকে ভালোবেসে ফেলেছি? আমার এত কষ্ট হচ্ছে কেন? আমি ওনাকে ভালোবাসতে চাই না তবে মায়া হচ্ছে কেন? সুপ্তির চুপ দেখে শরীর ঝাঁকিয়ে মুক্তি বলল,

'কি রে ঘুমিয়ে পড়লি? কিছু বলছিস না কেন?'

সুপ্তির কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। গলাটা ভারী হয়ে আসছে। সবকিছু চেপে গিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে ঘুমের ভান ধরে শুধু বলল,

'বুবু এখন ঘুম দেয়! স্কুল থেকে আসছিস তুই খুব ক্লান্ত। কালকে সন্ধ্যায় রিয়ার জন্মদিনের অনুষ্ঠান আছে। দু'জনেই শাড়ি পরবো। তুই বাসায় ফেরার পথে ফুলের দোকান হয়ে আসিস। বেলি ফুলের মালা নিয়ে আসবি খোঁপায় গুঁজবো। আর একটা কথা,বুবু তুই আমায় একটা মোবাইল কিনি দিবি? মায়ের কাছে চাইতে সাহস পাচ্ছি না। আমার কাছের বান্ধবীদের অনেকের মোবাইল আছে।'

'এখনি সময় হয় নি তোকে মোবাইল কিনে দেওয়ার। সুপ্তি, তুই আমার চেয়ে অনেক মেধাবী। আমাদের ইচ্ছে তুই ডাক্তারি পড়বি। বোন আমার একটু ভালো করে চেষ্টা কর। আমার বিশ্বাস তুই মেডিকেলে চান্স পাবি।
মায়ের কাছে মোবাইল চাইতে হবে না। আমি তোকে কিনে দিব। আগে এইচ এস সি পাশ কর। ভর্তি পরীক্ষা হয়ে যাক তারপর আমিই কিনে দিব। খেয়াল করছি, ইদানীং তুই খুব কম পড়ছিস। কোথাও সমস্যা হলে আমাকে বল্। ভিতরে চেপে রাখিস না।'

'বুবু,আমার কোনো সমস্যা হয়নি। তুই আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবি? খুব মাথা ধরেছে।'

'আচ্ছা,দিচ্ছি।'

মুক্তি সুপ্তির মাথায় পরম মমতায় হাত বুলাতে বুলাতে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ে।

রিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে রিয়ার নানু,নানা, তার মামা খুব ভোরে চলে আসে। রিয়া ওদের পেয়ে খুব খুশি। মিসেস করিম,মুক্তি স্কুলের যাওয়ার পর সুপ্তিও তৈরি হয়ে বাসায় তালা দিয়ে কলেজে চলে আসলো। ক্লাস শেষ করে বাসায় ফেরার পথে শাড়ির দোকানের কথা মনে হলো। শাড়িটা নিবে কিনা ডিসিশন নিতে পারছে না। নিয়ে কোথায় রাখবে? শাড়ি দেখে ফেললে অনেকগুলো মিছে কথা বলতে হবে। এমনিতেই মা দুই বোনকে নিয়ে খুব টেনশন করেন। হঠাৎ মা শাড়িটা দেখে ফেললে টেনশনের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যাবে। দরকার নেই শাড়ি নেওয়ার। নানা ভাবনায় হাঁটতে হাঁটতে সুপ্তি বাসায় চলে আসলো।
এসে দেখে মা নামাজে দাঁড়িয়েছেন। সুপ্তি গোসল করতে বাথরুমে চলে গেল। বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখে মা মুক্তিকে গোল্ডের আংটি দেখাচ্ছে। সুপ্তি কাছে এসে বলল,

'দেখি, কেমন আংটি কিনলে!'

মুক্তি রিয়ার জন্য কিনে আনা ছোট্ট আংটিটা সুপ্তির হাতে দিল।

'মা,খুব সুন্দর আংটি কিনেছো! কিন্তু রিয়ার আঙ্গুলে ছোট হবে মনে হয়।'

' সমস্যা নেই। চেঞ্জ করে আনা যাবে। মহাদেবের দোকান থেকে এনেছি। এখনও টাকা দেই নি।'

সন্ধ্যা হতেই সব গেস্টরা চলে আসলো। সুপ্তি মায়ের লাল জামদানি পরে সাথে ম্যাচিং কাঁচের চুড়ি,হালকা গয়না পরলো। খোঁপায় বেলি ফুল গুঁজে দিল। মুক্তি লাল রঙের জর্জেট শাড়ির সাথে ম্যাচিং অর্নামেন্টস পরে চোখে কাজলের রেখা টেনে দিল। ছাড়া চুলের একপাশে বেলি ফুল গুঁজে দিল। মুক্তি অনেকটা হালকা
সাজেই নিজেকে সাজিয়ে নিল। সুপ্তি,মুক্তিকে লাল শাড়িতে খুব সুন্দর লাগছে। মিসেস করিম নিজে গোছগাছ হচ্ছে। আড়চোখে মেয়ে দুটোকে বারবার দেখছে। একাই মনে মনে কথা বলছে। সেইদিনের আমার ছোট্ট মেয়ে দুটো এতবড় হয়ে গেছে চোখেই পড়েনি। মনে হচ্ছে এই তো সেইদিন সুপ্তি খালি গায়ে সারা উঠোনময় দৌড়ে বেড়াচ্ছে। মুক্তিকে তার বাবা উঠোনে হাতে ধরে সাইকেল চালানো শেখালো।
চোখের সামনে সব ভাসছে । চোখের পলকে সুন্দর সময়গুলো চলে গেলো। তাদের বাবাও আমাদের ফাঁকি দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলো। কখনও ভাবিনি মানুষটাকে ছাড়া আমাকে বেঁচে থাকতে হবে।

'কি হলো? মা তোমার হয়েছে? চলো যাই।' সুপ্তির কথায়
ভাবনার ঘোর কাটিয়ে তিনি বললেন,
হয়েছে, চল্।
সুপ্তি মায়ের দিকে তাকিয়ে হাতে লিপস্টিক নিল।

'কিছুই হয়নি! তুমি ঠোঁটে লিপস্টিক দাও নি। লিপস্টিক দিয়ে দিব। আজ এত এত সব লোকজন আসবে। সবাই সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে আসবে। আর তুমি হচ্ছো এই বাড়ির মালিক। এত সিম্পল ভাবে কেউ যায় নাকি?'

'সুপ্তি রাখ তো! ঐসব রঙ চঙ আমার ঠোঁটে দিস্ না।'

মুক্তি এসে মাকে জড়িয়ে ধরলো। সুপ্তির কথায় তাল মিলিয়ে হেসে বলল,
'মা,সুপ্তি ঠিকই বলেছে। তুমি এমনিতেই সব সময় সুন্দর। তবে আজকের দিনটা আলাদা। বুঝো না কেন? বাইরের লোকজন আসবে। প্রতিদিন তো এইসব প্রোগ্রাম হয় না।'
সুপ্তি জোর করেই তার মায়ের ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দিয়ে দিল।
মিসেস করিম মেয়ে দুটোকে নিয়ে ঘর থেকে বের হবে এমন সময় আশিক এসে দরজায় দাঁড়ালো।

'বাহ্!সবাইকে খুব সুন্দর লাগছে। মুক্তি 'বু' তোমাকে একদম পরীর মতো লাগছে। চাচি আপনাকেও হালকা পিংক কালারের তাঁতের শাড়িতে খুবই মার্জিত লাগছে।'

'আমাকে কেমন লাগছে বললি না তো!' সুপ্তি হেসে বলল।

'তোকে পেত্নির মতো লাগছে! হিহিহি'

'আচ্ছা,মনে রাখিস কথাটা! যদি আমার দিকে তাকাইছিস চোখে গুঁতো দিয়ে চোখ উপড়ে ফেলবো।'

মিসেস করিম মুক্তিকে নিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছে।
পিছনে পিছনে আশিক,সুপ্তি যাচ্ছে। আশিক আস্তে করে সুপ্তির হাত ধরে পিছনে টেনে আনে। কানের কাছে ছোট্ট করে বলল,

'একটু আস্তে হাঁট! কথা আছে।'

'পেত্নির সাথে কথা নেই।' বলেই সুপ্তি দ্রুত হেঁটে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।

রশিদ সাহেব সুপ্তিকে দেখামাত্রই মুচকি হেসে ইশারায় জানিয়ে দিল খুব সুন্দর লাগছে। সুপ্তিও মুচকি হাসলো।
রশিদ সাহেব সবার গ্রুপ ছবি উঠালেন। গেস্টদের আপ্যায়নের ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলেই সুপ্তির চোখে চোখ রাখছে। আজ সুপ্তি চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখছে না। অজানা এক ভালো লাগার আবেশ তাকে ঘিরে রেখেছে। আজ রশিদ সাহেবের মার্জিত ড্রেসআপও সুপ্তিকে মুগ্ধ করে। আশিক খেয়াল করলো
সুপ্তি একবারও তার দিকে তাকাচ্ছে না। লুকিয়ে অন্য একজনকে আপনমনে দেখে যাচ্ছে। অনুষ্ঠান শেষ করে
সুপ্তি ঘরে আসামাত্রই আশিক রাগে সুপ্তির সামনে দাঁড়ায়,

'রিয়ার আব্বু তোর দিকে বারবার তাকাচ্ছিল কেন?
ঐ বেটার চোখ ভালো না। দেখলাম তুইও বারবার তাকিয়েছিলি। ব্যাপারটা কি?'

সুপ্তি কিছু বলতে যাবে এমন সময় মুক্তি ঘরে ঢুকলো।
প্রসঙ্গ অন্যদিকে নিয়ে বলল,

'আশিক তুই আমাদের কিছু ছবি তুলে দে! বুবুর মোবাইল দিয়ে।'

'মুক্তি 'বু'র ছবি সুন্দর আসবে। কিন্তু তোরটা নিয়েই টেনশন হচ্ছে। তোকে খুব বিশ্রী দেখাচ্ছে।'

'যা ভাগ! ছবি তুলতে হবে না। তুই আর আসবি না আমাদের বাসায়। নিজের চেহারার দিকে তাকাইছোস? উল্লুক একটা।'

আশিক হাসতে হাসতে বলল,
'তোর বাসা নাকি? আমার চাচার বাসায় একশোবার
আসবো। এখানেই থাকবো। দেখি তুই কি করিস।'

'তোরা কি শুরু করলি? আশিক ছবি তুললে ঝটপট তুলে দে! আমি চেঞ্জ হবো।' মুক্তি নিজের মোবাইল আশিকের হাতে দিয়ে বলল।

সুপ্তি কথা না বলে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে খোঁপার ক্লিপ খুলতে শুরু করলো। আশিক ঐভাবে সুপ্তির বেশ কিছু ছবি উঠালো। সুপ্তির সামনে মোবাইলের ছবিগুলো ধরে আস্তে আস্তে বলল,

'দেখ,এই ছবির সামনে দীপিকা,প্রিয়াংকা, শ্রীদেবী কিছুই না। সত্যিই বলছি। ছবিগুলো খুবই ন্যাচারাল আসছে।'
বেশ কিছু ছবি তুলে দিয়ে আশিক তার বাসায় চলে গেলো।

সুপ্তি নিয়মিত কলেজের ক্লাসগুলো করছে। সামনে টেস্ট পরীক্ষা। একদিন কলেজে থেকে বের হয়ে দেখে রশিদ সাহেব বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্তি খানিকটা চমকে যায়। আজ এখানে কেন আসছে? আল্লাই জানে কি বলবে? সুপ্তিকে দেখে প্রশান্তির হাসি দিয়ে রশিদ সাহেব বললেন,

'বাইকে উঠো। এক জায়গায় যাবো।'

সুপ্তি অবাক চোখে কৌতুহল নিয়ে বলল,

'কোথায়?'

'বলছি উঠো।'

'আমি পারবো না আপনার সাথে যেতে।'

'ভয় পেয়ো না! প্লিজ, উঠো বলছি!'

সুপ্তি এদিক-ওদিক বারবার তাকাচ্ছে। কেউ দেখে ফেলে কিনা। তারপর বলল,

'কোথায় যাবেন আগে সেটা জানতে চাই। তাছাড়া বিকালে আমার ইংরেজি প্রাইভেট আছে। আমি কোথাও যেতে পারবো না।'

রশিদ সাহেব সানগ্লাস খুলে হাতে রাখলো।

'সুপ্তি, তুমি মিছে বলছো। আজ তোমার প্রাইভেট নেই। কি কি বারে তুমি প্রাইভেট পড়ো সেটা জানি। সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি চলো। সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে যাবো। তোমার খুব পছন্দ হবে।'

সুন্দর জায়গা শুনেই সুপ্তির ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠে।
ভিতরে ভয়,উত্তেজনা,আবেগ সব একসাথে জুড়ে বসলো। ভিতরে প্রচণ্ড ঘাম হচ্ছে। কি বলবে? মাথায় কিছু আসছে না। গুছিয়ে কিছু বলতে পারছে না। চুপ করে আছে। রশিদ সাহেব সুপ্তির হাতটা টেনে পিছনের সীটের সামনে এনে হাত ধরেই বলল,

'উঠো,বলছি। খারাপ কিছু হবে না। আমার উপর বিশ্বাস রাখো। একটা সারপ্রাইজ আছে।'

------চলবে

Md amanul, Ruma islam, Md salim bapari, Jalsan khan, Ahmed ridoy akon, Naimul islam, Arfin rony and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Wed Jul 28, 2021 6:11 pm
(৭)

সুপ্তি বাইকের মাঝখানে ব্যাগ রেখে রশিদ সাহেবের পিছনে চেপে বসলো। বাইক বাতাসের গতিবেগে ছুটে চলেছে। সুপ্তির সামনের ছোট চুলগুলো বাতাসের আলিঙ্গনে বারবার সারা মুখ,চোখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। মাথার উপর তীর্যক সূর্যের প্রখর তাপ। ঘামের নোনাজল গলা থেকে বক্ষ ভেদ করে নীচের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। শীতল হাওয়া সুপ্তির ঘর্মাক্ত দেহকে প্রশান্তি দিলেও টেনশনে
হার্টবিট বেড়েই চলেছে। তার নিজের উপর খুব রাগ ধরে যায়। কেন সে জোর খাটিয়ে বাইক থেকে নেমে গেল না।
কপালে আজ কি ঘটতে যাচ্ছে কে জানে? স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে পিচঢালা প্রশস্ত রাস্তার পাশে 'ঝিলমিল' রেস্টুরেন্টের সামনে রশিদ সাহেব বাইক থামান। বাইক
লক করে দ্রুত নেমে হাস্যউজ্জ্বল মুখে বললেন,

'চলো'

সুপ্তি স্থির হয়ে বসে রইলো বাইকে। শান্ত গলায় বলল,

'এখানে কেন?'

'গেলেই দেখতে পাবে।'

সুপ্তি 'ঝিলমিল'রেস্টুরেন্টের কর্ণার টেবিলে রশিদ সাহেবের মুখোমুখি বসে আছে। কোনো কথা বলছে না।
চুপচাপ সবকিছু দেখে যাচ্ছে। ওয়েটার এসে খাবার মেন্যু কার্ড দিয়ে গেল। রশিদ সাহেব খাবারের তালিকা সুপ্তির সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন,

'যা খেতে পছন্দ করো তাই অর্ডার দাও। ইচ্ছে হলো আজ দু'জনে একসাথে লাঞ্চ করবো। এইজন্য এখানে আসছি।'
সুপ্তি ডান গালে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
'আমার ক্ষুধা নেই। আমি কিছুই খাবো না! খেতে চাইলে আপনি খান। খাওয়া শেষ করে দ্রুত আমাকে কিছুটা পথে এগিয়ে দিন। তারপর ঐখান থেকে রিকশা নিয়ে আমি একাই চলে যেতে পারবো।'

সুপ্তির কথা শুনে রশিদ সাহেব শব্দ করে হাসছেন।
অনেকটা বাংলা সিনেমার ভিলেনদের মতো। তাঁর পুরো শরীর নড়ছে। সুপ্তি কিছুটা ভয়ার্ত চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে ওনার দিকে। এই মুহূর্তে লোকটাকে খুবই বিরক্ত লাগছে। হাসিমুখটা দেখে রাগে শরীর জ্বলছে। আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এখানে কেন নিয়ে আসছে? জায়গাটা ভালো লাগছে না। খুব শান্ত পরিবেশ। রেস্টুরেন্টে লোকজনের আনাগোনা হাতে গোনা। পরিচ্ছন্ন,
নিরিবিলি রেস্টুরেন্ট। মনে হচ্ছে নতুন চালু হয়েছে।

'তুমি ভিতরে প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছো, সুপ্তি। আমি ঠিক বুঝতে পারছি। ভয় পেয়ো না। আমার উপর বিশ্বাস রাখো।' রশিদ সাহেবের কথায় সুপ্তির ধ্যান ভাঙে। নড়েচড়ে শান্ত গলায় বলল,

'আপনি বুঝতে পারছেন না। আমার বাসায় যাওয়া খুব প্রয়োজন। দেরি করে বাসায় ফিরলে মা খুব টেনশন করবেন। মা দুই বোনকে নিয়ে সব সময় চিন্তা করেন।
বাবা বেঁচে নেই। জানেন তো মা'ই আমাদের সবকিছু।'

রশিদ সাহেব ওয়েটারকে ডেকে কাচ্চি বিরিয়ানি, ড্রিংকসের অর্ডার দিয়ে ওয়েটারকে বললেন,

' বেশি সময় নিবেন না। খুব দ্রুত খাবারটা দিবেন।'

'জ্বি, স্যার। মিনিট দশেকের মধ্যেই দিতে পারবো।'

ওয়েটার অর্ডার নিয়ে চলে গেলো। রশিদ সাহেব সুপ্তির চোখের দিকে তাকালেন। তারপর ধীর গলায় কথা শুরু
করলেন,

' দেখ,সুন্দর না রেস্টুরেন্টটা? এই রেস্টুরেন্ট চালু হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। এই থানায় বদলি হয়ে আসার কিছুদিন পর থেকে। রেস্টুরেন্টের মালিক আমার পরিচিত। দীর্ঘদিন দুবাই ছিলেন। তারপর দেশে নিজের জায়গায় রেস্টুরেন্ট দিল। ডেকোরেশন ভালোই করেছে। শৌখিন মানুষ। তবে জেলা শহরে হলে বেশ চলতো মনে হচ্ছে। এখনও ব্যবসায় লাভ হয় নি মনে হয়। যা টাকা ইনভেস্ট করেছে। সম্ভবত লোকসান হচ্ছে।
তেমন জমজমাট হয়ে উঠেনি।'
সুপ্তি বলল,
'আপনি আইনের লোক। চোর,ডাকাত,ছিনতাইকারী,
চিটার,বদমাশ,গাঁজাখোর,এমপি,ডাক্তার,শিক্ষক,ব্যবসায়ী ভালো,মন্দ সব শ্রেণির লোকদের সাথে সখ্যতা আছে। উঠাবসা আছে।'
রশিদ সাহেব আবারও শব্দ করে হাসলেন।

'ঠিক বলেছো! পেশাগত কারণে অনেক থানায় কাজ করেছি। অনেক লোকজনের সাথে পরিচয় হয়েছে। তবে
তোমাদের মতো এত সুন্দর মনের মানুষ পাইনি। তোমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তোমার কথা বলবো না।
সেটা গোপনই থাক।'

'কেন বলবেন না? আমি খুব খারাপ তাই না?'

'হুমম,শুধু খারাপ না। তুমি ভীষণ খারাপ।'

দশ মিনিটের মধ্যে ওয়েটার খাবার দিয়ে চলে গেল।
রশিদ সাহেব খাবারের প্লেট সুপ্তির সামনে এগিয়ে দিয়ে
বললেন,
'নাও এবার খেতে শুরু করো।'

সুপ্তি নিজের প্লেট থেকে অর্ধেক বিরিয়ানি রশিদ সাহেবের প্লেটে তুলে দিল।

'এ কি করছো ? খাবার রেখে দিচ্ছ কেন?'

'প্লেটের সবটুকু খেতে পারবো না। নষ্ট হবে। লাগলে আপনার প্লেট থেকে নিয়ে খেতে পারবো।

' চাটনির অর্ডার করবো? তাহলে অনেকটুকু খেতে পারবা।'
'দরকার নেই।'
'এত অল্প খাও বলেই স্বাস্থ্যের এই অবস্থা! পড়াশোনা করো, মাথা খাটাতে হয়। এখনি তো বেশি বেশি খেতে হবে।'

সুপ্তি চুপচাপ খাচ্ছে। একটু পর পর আড়চোখে তার চারপাশের সবকিছু দেখে নিচ্ছে। পরিচিত কেউ এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। কেউ দেখার আগেই খাওয়া শেষ করে নিরাপদে বাসায় যেতে পারলেই মাথা থেকে টেনশনের ভারি বোঝাটা নেমে যেতো।
রশিদ সাহেব খাওয়ার ফাঁকে খেয়াল করলেন। সুপ্তি
বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।

'ভয় কাটে নি তোমার? তাই না?'

সুপ্তি জবাব দিল না। মাথা নীচু করে খেয়ে যাচ্ছে।

'ঠিক আছে? খাওয়া শেষ করো এখনি ফিরে যাচ্ছি।'
বলেই রশিদ সাহেব খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে বেসিনে গেলেন।

মুহূর্তের মধ্যে সুপ্তির মলিন মুখের গুমোট ভাবটা উধাও হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে পারবে এটা ভেবেই সে ভিতরে খুব শান্তি পাচ্ছে। দ্রুত খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে চেয়ারে বসলো। রশিদ সাহেব প্যান্টের পকেট থেকে ছোট্ট কাগজের প্যাকেট বের করে ডান হাতের মুঠোয় রাখলেন। সুপ্তির মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,

'তোমাকে বলেছিলাম একটা সারপ্রাইজ দিব। সত্যিই
তোমাকে চমকে দিতেই এখানে নিয়ে আসছি। কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে নেই। তোমার বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই আমার ক্ষুদ্র আয়োজন। তোমাকে ভালো রাখতে চাই। তোমার মুখে সব সময় হাসি দেখতে চাই সুপ্তি। আজ তোমার জন্মদিন। তোমাকে জন্মদিনের
শুভেচ্ছা।'
তিনি কথাগুলো বলে হাতে রাখা ছোট্ট প্যাকেটটা সুপ্তির
হাতে দিলেন।

'এটা তোমার জন্য। জন্মদিনের ছোট্ট উপহার। গোল্ডের একটা ফিঙ্গার রিং আছে। পাথর বসানো। খুলে দেখো পছন্দ হয় কিনা! পছন্দ না হলে জানিও চেঞ্জ করে এনে দিব।'
সুপ্তির মনে হলো আকাশ থেকে সে পড়েছে। মানুষটা তাকে এতটাই অবাক করে দিয়েছে। এভাবে চমকে দিবে কল্পনাও করে নি। এতক্ষণ কুচিন্তা,নেগেটিভ ভাবনা ছাড়া কিছুই মাথায় আসে নি। কিছু সময়ের জন্য সে স্তব্ধ,ভাষাহীন হয়ে পড়ে। রশিদ সাহেবও নিশ্চুপ হয়ে বসে আছেন। দু'মিনিট পর সুপ্তি বলল,

'আমার নিজেরই মনে নেই আজ আমার জন্মদিন। আপনি কি করে জানলেন? আমি তো কখনও বলিনি।
আসলে জন্মদিনটা ভুলে গেছি বাবা প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ার পর থেকে। বাবা যখন সুস্থ ছিলেন তখন
প্রতি জন্মদিনে কিছু না কিছু গিফট দিতেন। মা'কে বলতেন ভালো রান্না করে মেয়ে দুটোকে খাওয়াও।
বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে এই বিশেষ দিনগুলোতে
মা তেমন কোনো আয়োজন করতেন না। কোনো রকম
খেয়েপড়ে সাদামাটা ভাবে দিনগুলো চলে যাচ্ছে। এতে বুবুর আর আমার কোনো রকম অভিমান,অভিযোগ নেই। সবকিছু মানিয়ে নিয়েছি। রিয়ামনির জন্মদিনের প্রোগ্রাম অনেক বছর বাদে 'রেবেকা মঞ্জিলে' ভিন্নমাত্রার
আনন্দ ছিল। অনেক বছর পর সেইদিন মায়ের মুখেও হাসি ছিল। খুবই ভালো লেগেছে।

রশিদ সাহেব প্রাণখোলা হাসি দিলেন। এরপর বললেন,

তোমার জন্মদিনের তারিখটা জেনেছি তোমার বাবার কাছ থেকে। একদিন তুমি বাসায় ছিলে না। সম্ভবত কলেজে গিয়েছিলে। রিয়াকে কোলে নিয়ে তোমার বাবার কাছে যাই। তোমার বাবা পুরনো দিনের কথা বলতে গিয়ে ওনার বিয়ের প্রসঙ্গ উঠালেন। ওনি তোমার মা'কে ভীষণ পছন্দ করতেন। সম্ভবত ওনারা ভালোবেসে বিয়ে করেছেন। মুক্তির জন্মের পর তুমি যখন পেটে আসলে তখন তোমার বাবা,দাদির আশা ছিল এবার ছেলে সন্তান হবে। বিশেষ করে তোমার দাদির প্রত্যাশা বেশি ছিল। অবশেষে সবার আশায় জল ঢেলে তুমি আগেভাগেই পৃথিবীতে চলে আসলে। গাইনি জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই সিজার করে তোমাকে বের করতে হয়। তোমার অবস্থা নাকি খুবই খারাপ ছিল। বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ ছিল। তিনমাস ইনকিউবেটরে রেখে চোখ ফুটানো হয়। সবার দোয়ায় সেই তুমি আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে বড় হতে শুরু করলে। তোমার দাদী প্রথমে রেগে থাকলেও পরে নাকি স্বাভাবিক হয়ে যান। ছোটবেলা তুমি খুব কিউট,চঞ্চল ছিলে। দুষ্টুর সেরা ছিলে। সকলের নয়নের মনি ছিলে তুমি। তোমার বাবা ঐদিন অনেক কথা শেয়ার করেছিলেন।

'বাবা আপনাকে এত কিছু বলেছেন? কিছুই বাদ রাখেন নি দেখছি।

'হুমম,আরও অনেক খবর আমার কাছে আছে। এখন
আপাতত এখানেই থাক। পরে একদিন শুনাবো আর কি কি খবর আমার কাছে আছে। এবার আংটিটা বের করে অনামিকায় পরো। দেখি কেমন দেখাচ্ছে।'

সুপ্তি আস্তে করে আংটি বের করে বা'হাতের অনামিকায় পরে আংটির দিকে তাকিয়ে আছে। দামী উপহার পেয়ে যতটা খুশি হয়েছে তার চেয়ে শতগুণ খুশি হয়েছে এতবছর পর হঠাৎ তার জন্মদিন সেলিব্রেট করে তাকে
চমকে দেওয়ার জন্য। দামী জিনিসের প্রতি তার বিন্দুমাত্র লোভ নেই,আগ্রহ নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম
নিয়ে মা,বাবা বড় বোনকে নিয়ে সুখেই ছিল। দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিল। দীর্ঘদিন বাবার অসুস্থতা, তারপর সবাইকে ছেড়ে চলে যাওয়া যেন কালবৈশাখী ঝড়ের মতো সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল।
রশিদ সাহেব সুপ্তির ভাবনা দেখে বললেন,

'কি হলো? এত কি ভাবছো? পছন্দ হয় নি? তোমার আঙুলে বেশ মানিয়েছে। মুগ্ধ হয়ে দেখছি!'

সুপ্তি আংটি খুলে বক্সে ঢুকিয়ে রাখলো। তারপর ছেড়া
কাগজের প্যাকেটে ঢুকিয়ে বলল,

'খুব সুন্দর আংটি। অনেক পছন্দ হয়েছে। তবে বলতে সাহস পাচ্ছি না উপহারটা আপনি ফেরত নিয়ে নিন। এই প্রথম আমাকে কেউ এত সুন্দর গিফট করে জন্মদিন উইশ করেছে। দিনটি আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।'

বিল নিয়ে ওয়েটার আসলো। বিল,বখশিস পরিশোধ করে তিনি বললেন,

'চলো,দেরি হয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে বাকি কথা বলি।'

দু'জনে হাঁটতে হাঁটতে রেস্টুরেন্টের বাইরের দিকে বাগানের কাছে আসলো। রশিদ সাহেব খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছেন। কথা বলছেন না। কিছু সময় সুনসান নীরবতা। বিষয়টি সুপ্তিকে ভাবিয়ে তুলছে। কি এমন বলেছি যার জন্য এত কষ্ট পেয়েছে। আংটি ফেরতের কথা বলে ভুল করেছি কি? ফেরত তো আমি দিতেই চাই। এত দামি জিনিস নিয়ে কি করবো? ইচ্ছে হলে বাসায় কারো সামনে পরতে পারবো না। লুকিয়ে চুকিয়ে একটু আধটু চোখের দেখা দেখতে পারবো। রশিদ সাহেব খোলা আকাশ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সুপ্তির চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন,

'জগতে কেউ প্রকৃত সুখি না। পুরুষ মানুষ কাঁদতে পারে না। তাই পুরুষের কষ্টের কারণ সবার চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো পুরুষ ভিতরে পাহাড়সম চাপাকষ্ট নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব,সংসার দায়িত্ব,বাচ্চার মুখের হাসি,সামাজিকতা সবকিছু ব্যালেন্স করে কাটিয়ে দিচ্ছে বছরের পর বছর। কেউ জানতে পারে না। শুধুমাত্র যার কষ্ট আছে সেই মানুষটি বুঝে কষ্টের তীব্র দহনে সে কতটা পুড়ে।'
কথাগুলো বলে রশিদ সাহেব থেমে যান।

সুপ্তির চোখ দুটো টলমল। মনে হচ্ছে অশ্রুকণা এখনি গাল বেয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়বে। কোনো রকম নিজেকে সামলে নিল। বিড়বিড় করে নিজেকে প্রশ্ন করছে, ওনি এসব কথা বলছেন কেন? আমি কিছু অন্যায় করেছি? কিছুই বুঝতে পারছি না। ভীষণ খারাপ লাগছে। ম্লান মুখে সুপ্তি জানতে চাইলো,

'হঠাৎ কি হলো?'

'কিছু না'

'কিছু না বললেই হলো। কিছু ঘটেছে।'

'তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাইকে উঠো।'

'না উঠবো না। আগে আপনি বলুন।'

'সুপ্তি,রাস্তায় পাগলামি করো না!দেরি হয়ে যাচ্ছে! তোমাকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।' হাঁটতে হাঁটতে রশিদ সাহেব কথাগুলো বলে যাচ্ছেন। সাথে সাথে সুপ্তি হাঁটছে।

'প্লিজ,দাঁড়ান! শুধু বলুন কার জীবনের কথা বলছেন?'

রশিদ সাহেব এবার থামলেন। সুপ্তি এক দৃষ্টিতে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

তুমি ঐদিন বললে না সুহানা তোমার সাথে সবকিছু শেয়ার করেছে। আমাদের দীর্ঘদিনের প্রেমের বিয়ে।
আমি সুহানাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি,সেও আমাকে জীবনের চাইতেও ভালোবাসে। আমার প্রতি তার অন্ধ বিশ্বাস ইত্যাদি ইত্যাদি। তুমি বললে আমি যেন সুহানার বিশ্বাসটা ভেঙে না দেই। তাকে না ঠকাই। কিন্তু সে তো অনেক বছর আগেই আমাকে ঠকিয়েছে। বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে। আমার সাথে চরম প্রতারণা করেছে। তার পুরো পরিবার আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
অন্য একদিন সময় করে সব তোমায় বলবো সুপ্তি। এখন চলো তাড়াতাড়ি। বলেই রশিদ সাহেব হনহন পায়ে দ্রুত বাইকের কাছে এসে বাইক স্টার্ট দিলেন।

সুপ্তির শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। তার নিজেকে অনুভূতিহীন মনে হচ্ছে। এইসব কি শুনছে সে?
কি ঘটতে যাচ্ছে? রিয়ার আম্মু কি করেছিল ওনার সাথে? হায় আল্লাহ্! মানুষের জীবন এমন কেন? মনে নানা প্রশ্ন রেখে ধীর পায়ে বাইকে এসে বসলো সুপ্তি।

বাসায় এসে সুপ্তি দেখে রিয়ার আম্মু জমিয়ে কথা বলছে
তার মায়ের সাথে। সুপ্তিকে দেখে মিসেস রেবেকা অগ্নিদৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। কোনো কথা বললেন না। সুপ্তি মাথা নীচু করে সোজা তার রুমের দিকে চলে গেল।

------চলবে

Arbaj khan, Hikmatullah khan, Sahin kondokar, Md amanul, Feroz hassan, Risbi mahin, Arfin rony and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Wed Jul 28, 2021 6:12 pm
(৮)

মায়ের লাল চোখ দেখে সুপ্তি বুঝে গেছে আজ মা তার উপর ভীষণ ক্ষেপে আছে। দেরি করে ফেরার কারণ জানতে চাইলে বানিয়ে কি বলবে মাথায় কিছুই আসছে না। টেবিলে ব্যাগটা রেখে ফ্যানের সুইচ অন করে ফ্লোরে
দু'পা মেলে খাটে হেলান দিয়ে বসেছে। কিছু সময় জিরিয়ে শরীর ঠাণ্ডা করে তারপর গোসলে যাবে। মাথার উপর ফুল স্পীডে ফ্যান ঘুরছে। সুপ্তি ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ভেবে যাচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য মিছে কথা কোনটি বলা যায়। কলেজ থেকে ফেরার পথে বান্ধবী লিপির বাসায় নোট আনতে গিয়ে দেরি হয়েছে।এটা বললে মা হয়তো বিশ্বাস করবেন। ভাবনার মাঝখানে রেবেকা করিম অগ্নিমূর্তির ন্যায় সুপ্তির সামনে এসে দাঁড়ালেন,

' এতক্ষণ কোথায় ছিলি?'

'কলেজে ছিলাম। তারপর বাসায় ফেরার পথে লিপির বাসায় যাই নোটের জন্য। ওর মা না খাইয়ে ছাড়লো না।
লিপিও হাতটা ধরে খাবার টেবিলে বসিয়ে দিল। গল্প করতে করতে কখন এত সময় চলে যায় বুঝতে পারিনি।'

রেবেকা করিম কথাটা শোনামাত্রই মেয়ের ডান গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিলেন।

'সত্যি করে বল কোথায় গিয়েছিলি? খুব বড় হয়ে গেছিস তাই না? মিথ্যা কথা বলা শিখে গেছিস? পাজি মেয়ে কোথাকার! তোর আর লেখাপড়া লাগবে না। এক মাসের মধ্যে তোর বিয়ে দিব। লিপি এসে তার খোঁজে বাসায় কত সময় বসে থেকে মেয়েটা একটু আগে বের হয়ে গেলো। তোর লেখাপড়া বন্ধ। আর কলেজে,
প্রাইভেটে যেতে হবে না।'

সুপ্তি ডান গালে হাত রেখে মাথা নিচু করে আছে। চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ সুহানা রিয়াকে নিয়ে সুপ্তির ঘরে ঢুকে। মূলত সুপ্তিকে দেখতেই
রুমে আসে। তখন সুপ্তি ঘরে ফিরে কোনো কথা না বলে সোজা তার রুমে চলে আসলো। তার মা রাগে মেয়ের দিকে তাকিয়েছিলেন। সেটা সুহানা বেশ ভালো করেই খেয়াল করে। সুহানাকে দেখামাত্রই রেবেকা করিম কথা থামিয়ে দেন। তড়িঘড়ি করে রুম থেকে বের হতে হতে বললেন,

'সুহানা আমার ঘরে চলেন।'

সুহানা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে রিয়াকে রেখে ওনার পিছনে পিছনে গেলেন।

সুপ্তি পা ভাঁজ করে মাথা নিচু করেই বসে আছে। রিয়া মায়ের কাছ থেকে দ্রুত সুপ্তির কাছে গিয়ে বসে। মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

'মনি তুমি কাঁদছো কেন?' বলে ছোট্ট হাতে চোখের পানি
মুছে দিল।

'আর কেঁদো না।'

সুপ্তি রিয়াকে কোলে বসালো। গালে গাল মিশিয়ে চোখ বন্ধ করে চুপ করে থাকে। রিয়া আবার বলল,

'তোমাকে কে মেরেছে? বলো না?'

'কেউ না? এমনি কাঁদছি।'

'তুমি একটা বোকা।'

'কেন?'

'এমনি কেউ কাঁদে?'

'আচ্ছা কাঁদবো না'
রিয়া সুপ্তির গালে ঠোঁট ছুঁয়ে হেসে বলল,

'পাপ্পা দিয়েছি। আর কাঁদবে না কিন্তু!'

'আচ্ছা,মনে থাকবে। এখন তুমি একটু মায়ের কাছে যাও।'

'তুমি কি করবে?'

'বাথরুমে যাবো।'

'এসে কিন্তু আমার সাথে খেলবে।'

সুপ্তি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। রিয়া দৌড়ে তার মায়ের কাছে চলে গেল। সুপ্তি বেশ সময় নিয়ে গোসল করে বাথরুম থেকে বের হলো। প্রায় মাগরিবের সময় হয়ে আসছে। রুমের জানালা আটকিয়ে ঘরে আলো জ্বেলে দিল। আযানের সুর কানে ভেসে আসতেই ওযু করে মাগরিবের নামাজ শেষে দু'হাত তুলে মোনাজাতে বসে।
তার দু'চোখের উপচে পড়া নোনা জল বৃষ্টির মতো ঝরছে। আল্লাহ তুমি আমাকে সঠিক বুঝ দান করো।
মায়ের সাথে কেন মিথ্যা কথা বললাম। মাকে কেন কষ্ট দিলাম? বাবার মতো তুমি মা'কে কখনও আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যেও না। মাকে সব সময় ভালো রাখতে চাই। আমার কোনো আচরণে মা কষ্ট পেয়ে যেন অসুস্থ হয়ে না যান। মায়ের মান-সম্মান, আমার সবকিছু রক্ষা করে চলতে পারি। মোনাজাত শেষ করে ভেজা চুল থেকে টাওয়েল চেয়ারে রাখলো। চোখ বুঁজে ডান হাতটা
কপালের উপর দিয়ে শুয়ে আছে। মুক্তি কাছে এসে ডাকলো,

'সুপ্তি,পড়তে বসবি না?'

মুক্তির ডাক শুনে উঠে বসে। মুক্তি কাছে এসে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,

'সত্যি করে বল আশিকের সাথে কোথায় গিয়েছিলি?'

'আশিকের সাথে? ওর সাথে যাবো কেন? ও আজ কলেজে আসেনি।'

'কার সাথে? কোথায় গিয়েছিলি?'

সুপ্তি চুপ করে আছে। কিছুই বলছে না। মুক্তি জোরে ধমক দিয়ে আবার বলল,

বলছিস না কেন? তোর মতিগতি আমার ভালো লাগছে না মোটেও। পড়ালেখায় তোর যে মন নেই সেটা কেউ বুঝতে না পারলেও আমি ঠিক বুঝেছি। এখন বল ছেলেটা কে? কার সাথে ঘুরতে গিয়েছিলি?

সুপ্তি খাট থেকে নেমে দরজা লক করে আবার খাটের
উপর বসে।
'বুবু সব বলছি তোকে। আগে আমাকে কথা দে! আমি যা বলবো সব মায়ের কাছে বলবি না। এমনিতে মা আমাদের নিয়ে অনেক টেনশন করেন।'

'ঠিক আছে,জানাবো না। সবকিছু খুলে বল।'

সুপ্তি এক এক করে রিয়ার আব্বু সম্পর্কে সবকিছু বলে।যা ঘটেছে, আজকে যা যা কথা হয়েছে সবকিছু শেয়ার করে। ব্যাগ থেকে আংটি বের করে মুক্তির হাতে দিয়ে
বলল,
'এই আংটিটা জন্মদিনে গিফট করেছেন। আমাকে সারপ্রাইজ দিতে এবং দিনটা স্মরণীয় করে রাখতে ওনি কলেজ থেকে এক রকম জোর করেই ঝিলমিল রেস্টুরেন্টে নিয়ে যান। ওনার ইচ্ছে একসাথে লাঞ্চ করে গিফট দিয়ে বার্থডে উইশ করবেন। তাই হাত ধরে টেনে
বাইকে উঠান। বিশ্বাস কর আমি যেতে চাই নি। কিন্তু নিজেকে জোর করে আটকাতেও পারিনি। রিয়ার আব্বুর প্রতি এক ধরণের ভালো লাগা কাজ করে। কেন জানি খুব মায়া হয়। ওনাকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে।
ওনার প্রতি ভীষণ দুর্বলতা কাজ করে। আমি সব বুঝি বুবু। তারপরও...

মুক্তি সব কথা শুনে চুপ হয়ে যায় । গম্ভীরভাবে সুপ্তির দিকে তাকিয়ে আছে। সুপ্তি মাথা নীচু করে আছে।

'আমার দিকে তাকা!' মুক্তির দিকে তাকালো সুপ্তি।

রিয়ার আব্বুকে ভালোবাসিস?

সুপ্তি কোনো উত্তর দিচ্ছে না। চুপ করেই আছে। সুপ্তির
ডান হাতটা নিজের হাতে নিয়ে শক্ত করে ধরে বলল,

মন দিয়ে শোন,কাউকে ভালো লাগা আর ভালোবাসা এক নয়। হুট করে কাউকে ভালোবাসা যায় না। তুই একটা ঘোরের মধ্যে আছিস সুপ্তি! তোর ভিতর প্রচণ্ড আবেগ কাজ করছে। একটা মোহের মধ্যে আছিস। তাই বাস্তবতা ভুলে গেছিস। তোর চোখে এখন সবই রঙিন মনে হবে। আমার মাথায় কিছুতেই আসছে না, তুই কি করে একটা বিবাহিত পুরুষকে ভালোবাসিস? তোর লজ্জা করছে না? তোর জ্ঞান,বুদ্ধি এতটাই লোপ পেয়েছে? সামনে তোর উজ্জ্বল ভবিষ্যত। বুঝতে পারছিস কি বলছি? জীবনটাকে নষ্ট করে দিস না। রিয়ার আব্বু তোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তোর ক্ষতি করতে চাইছে। ওনার ঘরে সুন্দরী বউ থাকতে তোকে কেন ভালোবাসতে যাবে? তাদের রিলেশনের বিয়ে এবং তারা খুব সুখে আছে। তুই তো ভালো করে জানিস! তাহলে তুই জেনেশুনে রিয়ার আম্মুর সংসারটা ভাঙবি কেন? আগে এটার জবাব দে!

'রিয়ার আব্বু সুখে নেই। সুখে থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে। রিয়ার আম্মু তাকে ঠকিয়েছে। আমাকে আজ অনেক কিছু জানালেন।'

ওও তাই নাকি? প্রেম করে বিয়ে করে এখন সে সুখে নেই? কি সুন্দর কথা! এখন নতুন করে তোকে নিয়ে সুখি হতে চায় তাই না? এই কথা শুনে তুই অমনি গলে গেলি? লোকটাকে বিশ্বাস করে ফেললি? পরিকল্পনা করে এগুচ্ছে। ভালোবাসার অভিনয় করে প্রেমের খেলা খেলে তোর জীবনটাকে নষ্ট করে হঠাৎ বদলি হয়ে অন্য জায়গায় চলে যাবে। পাত্তাও পাওয়া যাবে না। সারাজীবন পস্তাতে হবে। রিয়ার আব্বুকে নিয়ে তোর ভিতর যে রঙিন স্বপ্ন, আবেগ,মায়া,ভালোবাসা,দুর্বলতা তৈরি হয়েছে সেখান থেকে সরে আয়। জেনেশুনে ভুল
করে সারাজীবন কাঁদিস না।

সুপ্তি মনোযোগ দিয়ে মুক্তির সব কথা শুনে বললো,

বুবু তোর কথাগুলো মেনে চলবো। দেখিস এখন থেকে মন দিয়ে লেখাপড়া করবো। মন থেকে সব ঝেড়ে ছুড়ে ফেলে দিব। মা রাগে গালে চড় দিয়ে বলে গেছেন আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবেন। তুই মা'কে বুঝিয়ে বলিস
আমাকে নিয়ে আর টেনশন করতে হবে না। আমি জীবনে কোনো ভুল কাজ করবো না। মায়ের মান,সম্মান নষ্ট করবো না। লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবো,ইনশাআল্লাহ।

শুনে খুশি হলাম। কিচেনে যাচ্ছি। তুই আয়! আজ দুই বোন মিলে রান্না করে মা'কে নিজ হাতে খাইয়ে দিব।
মায়ের মন ভীষণ খারাপ। মা খুব কষ্ট পেয়েছেন।

বুবু, তুই যা। আমি আসছি।

মিসেস করিম নিজের ঘরের লাইট অফ করে শুয়ে আছেন। দুই বোন মিলে রাতের রান্না শেষ করে। মুক্তি এশার নামাজ পড়ে মায়ের ঘরে গেল। আস্তে আস্তে ডাকলো,

মা,উঠো। ভাত খাবে। এশার নামাজও তো পড়ো নি মনে হয়। খেয়ে এশার পড়ে ঘুম দাও।

'ঘুমাই নি। জেগে আছি। মাথাটা খুব ধরেছে!'

মিসেস করিম শোয়া থেকে উঠে বসলেন। ওযু করে এশার শেষ করে দুই মেয়েকে নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে
ঘুমের ঔষধ খেয়ে আবার শুয়ে পড়লেন। সুপ্তির সাথে একটি কথাও বললেন না। সুপ্তিও কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে তার ঘরে চলে আসলো। মুক্তি টেবিলের খাবার গুছিয়ে সুপ্তির পাশে বিছানায় কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়লো।

রশিদ সাহেব অনেক রাতে বাসায় ফিরলেন। কাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে বের হলে সুহানা খাবার টেবিলে ডাকে।
দু'জনে খেতে বসলেন। রিয়ার আব্বু কোনো কথা না বলে খেয়ে যাচ্ছে। সুহানা হঠাৎ বলল,

'সুপ্তি মনে হয় প্রেম টেম করে। আজ কলেজ থেকে কার
সাথে যেন কোথায় গিয়েছিল। আমার তো মনে হয় আশিকের সাথে প্রেম আছে মেয়েটার। বাসায় ফিরেছে দেরি করে। তার মা রাগে মাইর দিয়েছে। মাথা নীচু করে কাঁদতে দেখেছি।

কথাটা শোনামাত্রই রশিদ সাহেব খাওয়ার মাঝখানে বিষম খেলো। কাশি শুরু হলো। কাশতে কাশতে চোখে পানি চলে আসলো। সুহানা স্বামীর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে পানির গ্লাসটা এগিয়ে বলল,

'পানিটা গিলে নাও। কোথাও তো যাচ্ছো না! একটু আস্তে ধীরে খেলে কি হয়?'

--------চলবে

Sahin kondokar, Akaram khan, Md salim bapari, Faima islam, Afrin kalam, Rahan balich, Neet kundal and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Wed Jul 28, 2021 6:13 pm
(৯)

রশিদ সাহেব চুপচাপ গ্লাসের পানি গিলে নিলেন। কাশি কিছুটা কমলে আবার খাওয়া শুরু করেন। আজ আমার জন্য সুপ্তিকে মায়ের হাতে মাইর খেতে হয়েছে। মেয়েটার চোখের পানি দেখলে ভীষণ কষ্ট হয় আর আজ আমার কারণেই তাকে শাস্তি পেতে হয়েছে। খুব অন্যায় কাজ করেছি। সুহানা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। গম্ভীর হয়ে কিছু ভাবছে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
তোমার আবার কি হলো? কি ভাবছো? কিছুটা চমকে গিয়ে জবাব দিলেন,কি ভাববো? চুপ থাকলেই কিছু ভাবছি এমনটা ভাবা ঠিক না। টায়ার্ড লাগছে। সারাদিন পর বাসায় আসছি কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কথা শেষ করে বেসিনে গেলেন হাত ধুতে। সুহানা খাওয়া শেষ করে টেবিল থেকে এঁটো প্লেট সিংকে রেখে টেবিল গুছিয়ে রাখছে। আবার কি মনে করে কথা শুরু করলো,সুপ্তি মেয়েটাকে শান্ত ভাবতাম। শান্ত মেয়েগুলো
ডুবে ডুবে জল খায়। চোখ,মুখ দেখলে কে বলবে মেয়েটা কলেজ ফাঁকি দিয়ে প্রেম করে ঘুরে বেরাচ্ছে। রশিদ সাহেব বেড রুমের দিকে যেতে যেতে বললেন,
কারো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভাল।
প্রেম,ভালোবাসা,সুখ,হাসি,কান্না সব কিছু জীবনেরই অংশ। যে কারো জীবনে প্রেম আসতে পারে। ক্লাস নাইনের ঘটনা ভুলে যেও না। বলেই বেড রুমে ঢুকে টিভি
ছাড়েন। শুয়ে রিমোটের বাটন চেপে চ্যানেল ঘুরাতে থাকেন। সুহানা ঐ জায়গায় একেবারে পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এত বছর পর রিয়ার আব্বু এটা কি বলল? আজও মনে রেখেছে? ক্ষমা করে কথা দিয়েছিল কোনোদিন ঐ প্রসঙ্গ উঠিয়ে আমাকে কষ্ট দিবে না। আজ হঠাৎ কি মনে হলো তার? চুপচাপ বাকি কাজ দ্রুত শেষ করে। ভাবছে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে জানতে চাইবে অতীত নিয়ে কেন কথা উঠালো? গিয়ে দেখে টিভি চলছে। রশিদ সাহেব কোল বালিশ জড়িয়ে আরামে ঘুমুচ্ছে। কিছু সময় স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সারাদিন পরিশ্রম করে এসেছে। থাক এখন আর ডাকবো না।
সুহানার মনটা অকারণে খারাপ হয়ে যায়। ঐপাশ ফিরে নানা ভাবনার ভিতর চোখের পাতা এক করে ঘুমানোর চেষ্টা করে।

মুক্তি ভোরে ঘড়ির এলার্ম শুনে ঝটপট বিছানা ছাড়ে।
সুপ্তিকে ধাক্কা দিয়ে সজাগ করে মায়ের ঘরে গিয়ে দেখে
রেবেকা করিম নামাজ পড়ে কোরআন তেলওয়াত করছেন। মুক্তি ওযু করে নামাজের বিছানায় দাঁড়ানোর আগে আবার সুপ্তিকে ধাক্কা দিয়ে বলল,আমি নামাজে দাঁড়াচ্ছি। তাড়াতাড়ি ওযু করে আয়! ফজরের সময় পার হয়ে যাচ্ছে । সুপ্তি চোখ ডলতে ডলতে বাথরুমে যায়। ওযু করে মুক্তির পাশে এসে দাঁড়ায়। দু'বোন নামাজ শেষ করে মায়ের ঘরে আসে। দেখে মা জায়নামাজে উপুর হয়ে আছে। মুক্তি দ্রুত হাঁটু ঘেরে বসে মা'কে ডাকলো। রেবেকা করিম মাথা উঠালেন। তাঁর দু'চোখে পানি। সুপ্তি মায়ের পা দুটো ধরে কান্নাজড়িত গলায় বলল,মা,ক্ষমা করে দাও। আর কখনো তোমাকে কষ্ট দিব না। মন দিয়ে লেখাপড়া করবো। দেখে নিও তোমার মনের আশা পূরণ করবোই মা। আমার জন্য তোমাকে কষ্ট পেতে হবে না। তুমি কেঁদো না মা! তুমি কাঁদলে ভীষণ কষ্ট হয়। বাবা বেঁচে নেই। তুমিই বাবা,তুমিই মা। তুমি যেমনটি চাইবে আমি সেভাবেই চলবো। সুপ্তি কথাগুলো বলে ওড়না দিয়ে মায়ের চোখের পানি মুছে দিল। রেবেকা করিম সুপ্তিকে টেনে মাথা বুকের সাথে মিশিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। মেয়ে দুটোও নিঃশব্দে কাঁদছে।
তিনি কাঁপা গলায় আস্তে আস্তে বললেন, তুই আমার খুব কষ্টের সন্তান! তোকে পেটে নিয়ে খুব কষ্ট করেছি। প্লাসেন্টা নীচে ছিল। ব্লিডিং হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। ডাক্তার জানালেন,খুব রিস্কি পেশেন্ট। এক তো গন্ধে কিছু মুখে তুলতে পারতাম না। যদিও কষ্টে অল্প কিছু খাওয়া হতো। পরক্ষণেই বাথরুমে গিয়ে বমি করে পেট খালি করে আসতাম। খুব বমি হতো। শেষের দিকে শরীর এতটাই দুর্বল ছিল দু'বেলা স্যালাইন চলতো। শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায়। প্রেশার তো আগে থেকেই ছিল। তুই পেটে আসার আগে তিন মাসের একটা বাচ্চা এবর্শন হয়। বাচ্চাটা ছেলে বাবু ছিল। বেঁচে থাকলে কলেজ পাশ করে ভার্সিটিতে পড়তো। এখনও ভীষণ কষ্ট হয়। এখনও মনে হলে বুকটা কেঁপে উঠে। তারপর থেকে ভিতরে সব সময় ভয় কাজ করতো। নিজেদের ইচ্ছে,আল্লাহর অশেষ কৃপায় তুই পেটে আসলি। সবার প্রত্যাশা ছিল এবার ছেলে হবে। নানা জটিলতার কারণে পেটে তোর বয়স যখন সাত মাস ডাক্তার সিজার করলেন। আমি সুস্থ হয়ে বাসায় আসলাম। তোকে রেখে আসতে হলো হসপিটালে। শুরু হলো আরেক কষ্ট। কত নির্ঘুম রাত,দুশ্চিন্তা,পরিশ্রম তোকে নিয়ে করেছি সেটা বুঝাতে পারবো না। তোর বাবা সব সময় আমার পাশে ছিল তোর দাদিও ছিল। আস্তে আস্তে তুই সুস্থ হয়ে বেড়ে উঠলি।

মুক্তি মা'কে জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখলো। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল, তুমি আমার সংগ্রামী মা। তোমার তুলনা নেই। তোমার মতো ধৈর্যশীল আমরাও হতে পারবো না। বাবাকে নিয়ে কতটা বছর কষ্ট করেছো। অল্প খেয়েপড়ে শান্তি খুঁজেছো। ঠোঁটে হাসি রেখে নিজেকে সুখে রেখেছো। তোমাকে আর আর কষ্ট করতে হবে না। এই তো আর ক'টা বছর দু'বোন ভালো চাকরি করবো ইনশাআল্লাহ। রেবেকা করিম দুই মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। মুক্তি মায়ের হাত ধরে
বলল, মা,চলো বাইরে ফ্রেশ বাতাসে একটু ঘুরে আসি।
সকালের স্নিগ্ধ,মোলায়েম বাতাস গায়ে লাগলে শান্তি পাবে। তিনি বললেন, তোরা দুই বোন যা! আমি আর একটু দোয়া দুরুদ পড়ে উঠবো।

দুই বোন মিলে বাসার সামনে প্রশস্ত রাস্তায় চলে আসলো। তখনও প্রকৃতি জেগে উঠে নি। ফুরফুরে শীতল হাওয়া চোখে মুখে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। মুক্তি হাঁটছে রাস্তার মাঝ বরাবর। পিছন পিছন সুপ্তি হাঁটছে।
সুপ্তির অনেকটা হালকা লাগছে। আপনমনে ভেবে যাচ্ছে। মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে বুবুর কাছে সব কিছু শেয়ার করে নিজেকে অনেকটা ঝরঝরে লাগছে। আজ থেকেই লেখাপড়ায় লেগে যাবো। ভালো কিছু করতে হলে নিজের ইচ্ছে শক্তিটাই আসল। আমি সেটাই প্রমাণ করবো। মাথায় এতদিন রঙিন ভাবনার যে জটলা জ্যাম বেঁধে ছিল তা ছুড়ে ফেলে দিলাম আবর্জনার ঝাঁপিতে।

হাঁটা শেষ করে দুই বোন গেইটের কাছে আসলো। পুরো গেইটের উপরে বাগান বিলাসের আধিপত্য। পাতার ফাঁকে ফাঁকে থোকায় থোকায় ফুল ফুটেছে। সুপ্তি ফুল ছুঁয়ে বলল, বুবু দেখ ফুলের বাহার! দেখলেই মনটা জুড়িয়ে যায়।' মুক্তি হেসে মাথা উঁচিয়ে তাকালো। ডানপাশে লেখা 'রেবেকা মঞ্জিল'। নামটির উপর কালো আস্তরণ পড়ে নামের উজ্জ্বলতা অনেকটা ম্লাণ হয়ে গেছে। মুক্তি নেম প্লেটটির উপর হাত রেখে বলল, বাবার হাতে করা বাড়ি। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়িটি ঘিরে। রঙ করা হয়নি কত বছর ধরে। ভালো একটা চাকরি পেলে বাড়িটি রঙ করবো। ঘরে আরও নতুন ফার্নিচার কিনবো। কত কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছি।
চাকরিটাই হচ্ছে না। এখন গিয়ে তুই পড়তে বসবি। আমি কিচেনে যাবো। আজ বৌদ্ধ পূর্ণিমার জন্য স্কুল বন্ধ। তাই অনেক দিন পর আজ খোলা বাতাসে হাঁটলাম। সুপ্তি তাড়াতাড়ি বলে উঠলো,ওও তাইতো আজ বন্ধ। মনেই ছিল না। গতকাল কলেজ থেকে জেনে এসেছি।

মুক্তি কিচেনে এক উনুনে রুটি সেঁকে হটপটে ভরছে। অন্যটাতে সবজি নেড়েচেড়ে দিচ্ছে। মনে মনে ভাবছে স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দিব। সামনে সুপ্তির পরীক্ষা। মা স্কুলে চলে যান। আমিও সকালে বের হয়ে যাই। যেইদিন টিউশনি থাকে শেষ করে বিকালে আসি। সুপ্তি একা বাসায় থাকে। রিয়ার আব্বুর প্রতি তার যে দুর্বলতা কাজ করছে তার জন্য যে কোনো বিপদ হতে পারে। রিয়ার আব্বু সেই সুযোগের সঠিক ব্যবহার করতে পারে। এই সময়ে ওকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য ওর পাশে একজন থাকা দরকার। স্কুলের জব ছেড়ে বাসায় ভালো কিছুর জন্য স্টাডি করি। পাশাপাশি সুপ্তির লেখাপড়া,সব কিছুর দিকে ভালোভাবে নজর দিতে পারবো। নাস্তার কাজ শেষ করে টেবিলে দিয়ে ওদের খেতে ডাকলো।

পরদিন স্কুল থেকে ফিরে মুক্তি মা'কে বলল, মা আজ চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে আসছি। কবে থেকে ভাবছিলাম ছেড়ে দিব। দেই দেই করে দেওয়া হচ্ছে না। এইজন্য মনে হয় ভালো জব হচ্ছে না। সুপ্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিবে আর আমি ভালো একটা চাকরির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। বয়স তো চলে যাচ্ছে! দোয়া করো মা! তুমি পাশে থেকে দোয়া করলে সব কিছু সম্ভব। রেবেকা করিম সব কিছু শুনে চুপ থেকে কিছু সময় পর বললেন,
চাকরিটা ছেড়েই দিবি? ঠিক আছে তুই যা ভালো বুঝিস তাই কর। নতুন চাকরি হলে এটা ছাড়লে ভালো হতো না? মুক্তি মাকে আশ্বস্ত করে বলল, ভেবো না। এবার ভালো কিছু হবে। পড়ার সময়ই তো পাই না! চাকরি নিয়ে মাথা ব্যথা না থাকলেও মেয়ের বিয়ের চিন্তা আরামের ঘুমকে হারাম করে দিয়েছে। রেবেকা করিম ভেতরে ভেতরে অস্থির থাকেন মেয়ের বিয়ে নিয়ে। ভালো কোনো পাত্রের সন্ধান মিলছে না। মেয়ের বয়স বাড়ছে। ভালো বিয়ের প্রস্তাবও আসছে না। ছোট মেয়ের লেখাপড়ায় মন নেই। কলেজের ক্লাস ফাঁকি দিতে শিখে গেছে। টেনশনে রাতে ঘুমাতে পারেন না মিসেস করিম। প্রতি ওয়াক্ত নামাজ পড়ে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করেন।

রশিদ সাহেব সকালে নাস্তা খেয়ে কিছুক্ষণ খবরের কাগজে চোখ বুলালেন । ড্রেস পড়ে বের হবেন এমন সময় সুহানা গরম কফির মগ হাতে সামনে দাঁড়ালো।
কফির মগ এগিয়ে দিয়ে বলল,

'কি হয়েছে তোমার? গতরাত থেকে কিছু একটা ভেবে যাচ্ছো। রাতে হঠাৎ ঐ কথা বললে কেন?'

'কিছু হয়নি। থানার কাজে কত জায়গায় যেতে হয়। কত ঝামেলা থাকে। বাসায় এসে সব সময় কি কথা বলতে ইচ্ছে করে? রাতে যা বলেছি মিছে কিছু ছিল?'

'কথা দিয়েছিলে প্রসঙ্গ টেনে কখনো কষ্ট দিবে না।'

প্রসঙ্গ তুমিই টেনে বলতে বাধ্য করলে। অন্যকে নিয়ে ভেবে কথা বলার আগে প্রত্যেকের নিজের অতীত ঘেঁটে নেওয়া উচিত। নিজের সমালোচনা করা উচিত। আমরা তা করি না।

কফি শেষ করে রশিদ সাহেব তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেলেন। সুহানা সংসারের কাজ,রিয়ার দেখভাল নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করে। সময় পেলেও সুপ্তিদের ঘরে আসে না। হঠাৎ স্বামীর বদলে যাওয়া তাকে ভাবনায় ফেলে দেয়। বিকেল হলেই রিয়াই খেলনা নিয়ে সুপ্তির কাছে চলে আসে। অনেক সময় একাই খেলে। সুপ্তি পাশে বসে পড়ে। খেলতে ইচ্ছে না করলে ছবি আঁকা শিখে। সুপ্তি ঐদিনের পর থেকে রশিদ সাহেবের মুখোমুখি হয় নি ইচ্ছে করে। রশিদ সাহেব একটা বিষয়ে কথা বলার জন্য রেবেকা করিমের কাছে আসলেও সুপ্তি তার ঘরে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে থাকে। দেখা করেনি কথাও বলেনি। সুপ্তি
একদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ রশিদ সাহেব বাসার ভিতরে ঢোকার সময় গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সুপ্তির সামনে ভাঁজ করা কাগজ ছুঁড়ে দিয়ে ভিতরে চলে যান।
সুপ্তি কাগজটা উঠিয়ে দ্রুত বাথরুমে চলে যায়। ভাঁজ করা কাগজ মেলে ধরলো চোখের সামনে।

আমার জন্য মায়ের হাতে মাইর খেলে। ক্ষমা করো আমাকে। তোমাদের ঘরে আর যাবো না। যদি পারো বাইকের হর্ণের আওয়াজ শুনে সামনের বারান্দা অথবা ছাদের সামনের দেয়াল ঘেঁষে একটু দাঁড়িও। এক নজর না দেখলে ভালো লাগে না। এই রিকোয়েস্টটা রেখো।
কারো কাছে কিছু শেয়ার করো না। সবার জন্যই ভালো হবে।

সুপ্তি কাগজটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে কমোডে ফেলে দিল। মুক্তির কাছে চিঠির কথা শেয়ার করলো না। নিজের মনেই রেখে দিল। সুপ্তির পরীক্ষা সামনে।
মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করে,নামাজ পড়ে। মিসেস করিম মেয়ের পরিবর্তন দেখে মনে মনে খুশি হন। একদিনও বাইকের আওয়াজে ছাদে বা বারান্দায় যায়নি। রশিদ সাহেবের কথা রাখে নি। মুক্তি চাকরির পড়া নিয়ে ব্যস্ত। পাশাপাশি সুপ্তি,রিয়াকে মজার মজার গল্প বলে শোনায়। ভালো কোনো রেসিপি রান্না করে মাকে নিয়ে খাওয়া দাওয়া করে। একদিন মুক্তি পেপারে শহরে নামকরা বেসরকারী কলেজের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে এপ্লিকেশন করে।

----চলবে

Umma Mejana khatun, Arbaj khan, Hikmatullah khan, Ahmed ridoy akon, Naimul islam, Feroz hassan, Risbi mahin and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 171
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Wed Jul 28, 2021 6:13 pm
(১০)

মিসেস করিম আগের মতো সংসারের কাজকর্ম তেমন একটা করেন না। মেয়ে দুটো করতে দেয় না। সংসারের কাজ,বাজার সবকিছুই মুক্তি নিজে হাতে করে।
স্কুলের সময় টুকু বাদ দিয়ে মিসেস করিম বিশ্রাম,
নামাজ,কোরআন পড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। প্রতি সোমবার,বৃহস্পতিবার রোজা রাখেন। মুক্তি স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দেওয়াতে খুব হিসেব করে চলতে হয়। মাসে বাজারের তালিকা থেকে অনেক কিছু বাদ দিতে হয়। মুক্তি নিজেদের আর্থিক দুর্বলতা কাউকে বুঝতে দেয় না। সাধ আর সাধ্যের মাঝে কীভাবে ভালো থাকা যায়। সবাইকে ভালো রাখা যায় সেটা শিখে গেছে। কষ্ট চাপা দিয়ে হাসিমুখে সব সামলে নিচ্ছে। সংসারটা যেন তারই। মা,বোন তার শরীরের দুটো অংশ। তাদেরকে ভালো রাখার বাইরে নিজের জন্য কিছুই ভাবতে পারে না। গ্যাস বিল বিল,কারেন্ট বিল,এক মাসের বাজার খরচ,মায়ের ঔষধ সবকিছু নিজের দুটো টিউশনির টাকা,মায়ের বেতনের অর্ধেক টাকা দিয়ে গুছিয়ে চালিয়ে নেয়। স্কুলের চাকরিটা থাকলে খরচের পাশাপাশি কিছু টাকা সঞ্চয় করে রাখতো। এখন তা আর করতে পারে না। এইজন্য তার কোনো আক্ষেপ নেই। সুপ্তিকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে এনে লেখাপড়ায় মনোযোগী করতে হবে।
নিজের জন্য,স্বচ্ছলভাবে সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার জন্য,সুপ্তির লেখাপড়ার খরচের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য যে করে হোক ভাল চাকরি তাকে করতেই হবে।

দুপুরে খেতে বসে মিসেস করিম মুক্তিকে বললেন,

'এই ক'দিন তোকে রান্নাঘরে যেতে হবে না। মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া কর। ভালো করে চেষ্টা করে দেখ যদি কলেজের চাকরিটা হয়ে যায়। একটা চিন্তা মাথা থেকে নামবে। যেমনে পারি রান্নাটা আমিই করবো। সুপ্তি এসে
সবজি কেটে,ধুয়ে দিলে তোর আসতে হবে না রান্নাঘরে।'

'চাকরির পড়ার কোনো শেষ নেই মা। কোত্থেকে কি প্রশ্ন আসে আগে থেকে কিছুই বুঝা যায় না। এর আগে এক কলেজের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন আসলো বাংলা,ইংলিশ
সাধারণ জ্ঞান এবং বিষয়ভিত্তিক। প্রত্যেক বিষয়ে আলাদা আলাদা পাশ। কি কঠিন কঠিন সব গ্রামার আসছে। ভাইভা তো দূরের কথা! লিখিত পরীক্ষায় পাশ করিনি। এখন যে কলেজে এপ্লিকেশন করেছি শুনলাম বিরাট বানিজ্য হয়। জানি না চাকরি হবে কিনা!'

মিসেস করিম চুপ থেকে কিছুটা নিরাশ গলায় বললেন,

'কে বলল বিরাট বানিজ্য হয়? কার কাছে শুনলি?'

'আমার বান্ধবী মনিকে চিনতে না? ফোন দিয়েছিল তার একটা সুখবর দিতে । তখন কথা হলো। মনিও ঐ কলেজে আবেদন করেছে।'

সুপ্তি খাওয়ার মাঝখানে হঠাৎ কৌতুহল নিয়ে বলল,

বুবু,মনি আপুর বিয়ে হয়ে গেছে?

'হুমম,বিয়ের খবর জানাতে ফোন দিয়েছিল। বিয়ের প্রোগ্রাম হয় নি। ঘরোয়াভাবে বিয়েটা হয়েছে। অনুষ্ঠান হবে নাকি দুইমাস পরে।'

সুপ্তি আবার প্রশ্ন করলো,

মনি আপুর বর কি করে?

'বলল বায়িং হাউজের এজিএম।'

কথাগুলো শুনে মিসেস করিম দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ভিতরে ভিতরে মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তায় অস্থির থাকেন। চিন্তাভাবনায় ঠিক মতো ঘুমাতে পারেন না। এখন মনির বিয়ের খবরটি যেন তীরের মতো কানে এসে বিঁধে। আল্লাহর হুকুম ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না। জন্ম,মৃত্যু,বিয়ে সবই আল্লাহর হাতে। কার সাথে মেয়ের বিয়ে লেখা আছে একমাত্র উপরওয়ালা জানেন। মেয়ে দুটোকে সৎ,চরিত্রবান পাত্রের হাতে তুলে দিয়ে কবে যে চিন্তামুক্ত হবো জানি না।

মায়ের ভাবনা মুক্তির চোখ এড়াতে পারে নি। খেতে খেতে তার বিয়ে নিয়ে মা অনেক কিছু ভাবছে। সেটা ভালো করে উপলব্ধি করতে পারে। খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে গেল মুক্তি। ফিরে এসে মায়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,

মনির বিয়ের খবর শুনে হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে। আমি সব বুঝি মা। তুমি আমাদের লক্ষী মা। মা,বাবা হলো সন্তানের অমূল্য সম্পদ। বাবা আমাদের রেখে চলে গেলেন। জীবন দিয়ে চাইলেও আর ফিরে পাবো না। তুমিই আমাদের সবকিছু। তুমি ছায়া, তুমিই মায়া। তুমি বটবৃক্ষ,তুমিই শান্তি। আমরা না খেলে তোমারই কষ্ট লাগে। অসুখ হলে তোমার চোখেই জল আসে। বাইরে থাকলে ঘরে না ফেরা পর্যন্ত তোমারই দুশ্চিন্তার প্রহর কাটে। মনমরা হয়ে থাকলে তোমার মনেই হাজার প্রশ্ন জাগে আমার মেয়েটার কি হয়েছে? মুখটা শুকনো কেন? মা সন্তানের জন্য নিঃস্বার্থভাবে তার সবকিছু সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করেন। মায়ের বুক হচ্ছে পরম মমতার আশ্রয়স্থল। আজীবন সন্তানকে স্নেহ,মায়া, ভালোবাসা,নির্ভরতা,সাহস,অনুপ্রেরণা,ভরসা দিয়ে যান।
মা,তুমি শুধু দুই বোনের জন্য প্রাণখোলে দোয়া করো।
মায়ের দোয়া,আল্লাহর রহমত থাকলে সবকিছু হবে। তুমি যেমন চাইছো আল্লাহ্ যেন তোমার মনের আশা পূরণ করেন। আমার বিয়ে নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করো কেন ? আমি তো মোটেও ভাবি না। বিশ্বাস করো মা নিজেকে নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। তবে ভালো একটা জব আমাকে পেতেই হবে তোমাকে,সুপ্তিকে ভালো রাখার জন্য।

মিসেস করিমের চোখ দুটো ছলছল। উপচে গড়িয়ে পড়ার আগেই মুক্তি মুছে দিল। মুক্তি হেসে বলল,

আবার চোখে পানি আনলে কেন? কি যে কর না মা! খাওয়ার আগে গ্যাসের ঔষধ খেয়েছো? তোমার কিন্তু মনে থাকে না।

মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলেন মিসেস করিম। হাত ধুতে বেসিনে গেলেন।

সুপ্তি দুজনকে বলল,

বুবু মা'কে নিয়ে খাটে যা। আমি টেবিল গুছিয়ে আসছি।
একটা মজার ঘটনা শুনাবো। আজ হঠাৎ মনে হলো তাই
শেয়ার করবো।

মুক্তি মা'কে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। সুপ্তি কোনো রকম এঁটো প্লেট সিংকে রেখে টেবিল আধামোছা করে
দু'মিনিটে এসে হাজির। মুক্তি অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

কি গুছিয়ে আসলি শুনি? দেড় মিনিটেই সব কাজ শেষ?
হুমম,শেষ করে আসছি।
মা'কে মাঝখানে রেখে সুপ্তি বামপাশে শুয়ে কথা শুরু করলো,

আগে মাথায় যা আসছে তা বলে নেই। পরে ভুলে যাবো।
বেশ অনেকদিন আগে আমি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি। কাউকে বলি নি। অবশ্য তখন বাবার অসুস্থতা নিয়ে সবাই খুবই আপসেট ছিলাম। স্বপ্নের কথা আস্তে আস্তে ভুলে যাই। আজ হঠাৎ মনি আপুর বিয়ে প্রসঙ্গে মনে হলো। মা মন দিয়ে শুনে আমাকে বলবা এই স্বপ্নের মানে কি? ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষার শেষ দিন বৃষ্টিতে ভিজে রাতে জ্বর আসে। পরদিন তুমি,বুবু স্কুলে চলে গেলে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমে অচেতন। দেখি সুন্দর দো'তালা একটা বাড়ি। সামনে বিশাল মাঠ। মাঠজুড়ে সবুজ ঘাসের গালিচা। চারপাশে শত বছর পুরানো বিরাট বিরাট গাছ। দক্ষিণের বারান্দায় খোলা জানালা দিয়ে বাতাসের অবাধ বিচরণ। কি যে সুন্দর বাড়িটা। আশেপাশে বেশি বাড়িঘর নেই। বাড়িটিতে শুধু তিনজন
মানুষ। আমি আর দুটো জমজ বাচ্চা। বাচ্চা দুটো মেয়ে।
আমাকে মা বলে ডাকে। মা,মা ডাকে সারাবাড়ি মাতিয়ে রাখে। মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে,খেলা করে। দোলনায় চড়ে, খিলখিল করে হাসে। আমি মেয়ে দুটোকে নিয়ে খুব আনন্দ করি। একদিন বল খেলতে গিয়ে বল চলে যায় মাঠ পেরিয়ে বড় গাছটার নীচে। ঐদিন আকাশ মেঘলা ছিল। তবে বৃষ্টি ছিল না,বাতাসের বেগ ছিল বেশি। ও একটা কথা,বলতে ভুলে গেছি। মেয়ে দুটোর নাম ছিল রুম্পি,টুম্পি। বল আনতে রুম্পি দৌড়ে গেল গাছের নীচে তারপর বড় গাছটার একটা শুকনো মোটা ঢাল রুম্পির মাথায় পড়ে। রুম্পি মাটিতে লুটিয়ে অজ্ঞান
হয়ে পড়ে। আমি সে কি কান্না। কাঁদতে কাঁদতে গোঙাতে থাকি। আশিকের ডাকে সজাগ পেয়ে দেখি আমার পুরো শরীর ঘামে ভিজে একাকার। অনেকক্ষণ পর্যন্ত শরীর নাড়াতে পারছিলাম না। বুঝলাম না কেন এই স্বপ্ন দেখলাম।
মুক্তি বলল,
বুঝার কিছু নেই। স্বপ্নের কোনো অর্থ, মাথামুণ্ডু কিছুই খুঁজে পাবি না। সারাদিন রিয়াকে নিয়ে থাকিস।
এইজন্য ঘুমের মধ্যে মেয়ে বাচ্চা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিস। ঘুমিয়ে থাকা মানুষ মৃত মানুষের সমান। ঘুমন্ত ব্যক্তি নিজের কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যদি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো তবে এই আজগুবি স্বপ্নগুলো দেখতো না। শোন,আর একটা কথা বলি।

কি কথা। তাড়াতাড়ি বল্!

উঠোনের বারান্দার গেইটে আওয়াজ শুনে মুক্তি কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। সুপ্তিকে বলল,

কেউ আসছে মনে হয়। গিয়ে দেখে আয়!

সুপ্তি শোয়া থেকে উঠে এলো চুল খোঁপা করতে করতে
উঠোনের বারান্দায় আসে। রশিদ সাহেব,সুহানা রিয়াকে কোলে নিয়ে দাঁড়ানো। সুপ্তি রিয়াকে দেখে মুচকি হাসলো। কথা না বলে গেইট খুলে দাঁড়িয়ে রইলো।
ওনারা ভিতরে আসার পর গেইট আটকিয়ে ঘরে আসলো। মিসেস করিম খাটের মাঝখানে বসেছেন তাঁর পাশে মুক্তি। সুহানা মেয়েকে নিয়ে খাটেই পা উঠিয়ে বসলেন। রশিদ সাহেব চেয়ারে সবার মুখোমুখি বসেছেন। সুপ্তি না বসে খাট ঘেঁষে দাঁড়ালো। রশিদ সাহেব কথা শুরু করলেন,

অনেকদিন ধরে ভাবছি প্রস্তাবটা নিয়ে আসবো। রিয়ার আম্মুকে বললাম তুমি আপার সাথে কথা বলে আসো।
সে কিছুতেই আমাকে ছাড়া আসবে না। ক'দিন ধরে ভীষণ ব্যস্ত। এসে কথা বলবো সময় করে আসতে পারছি না। আজ আসছি মুক্তির বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। আমার এক কলিগের ভাইয়ের জন্য পাত্রী খোঁজ করছে। সে শুধু কলিগ না, আমার ভালো বন্ধুও বটে। সুপ্তি,মুক্তির অনেক গল্প আমার কাছ থেকে শুনেছে। কলিগ বন্ধু নিজ থেকেই মুক্তির প্রসঙ্গ এনে প্রস্তাব দিল। তারা মুক্তিকে দেখেছে রিয়ার জন্মদিনের প্রোগ্রামে। আপনাদের সর্ম্পকে তাদের কিছুই জানার নেই। আপনি যদি সম্মতি দেন এবং তাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে বলেন তাহলে আমি ওদেরকে কিছু বলতে পারি।

মুক্তি উঠে কিচেনে গেল। ইশারা দিয়ে সুপ্তিকে সাথে নিয়ে গেল। মিসেস করিম চুপ থেকে সব কথা শুনলেন।
শান্ত গলায় বললেন,

মেয়ে বড় হয়েছে। বিয়ে তো দিতেই হবে। মেয়ে দুটোকে
নিয়েই তো আমার সবকিছু। ওদের সুখ মানে আমার সুখ। যার সাথে মেয়ে বিয়ে দিব তার সম্পর্কে কিছুই এখনও জানলাম না।

রশিদ সাহেব হেসে বললেন,

একদম ঠিক কথা। সবকিছু দেখে,জেনেশুনে, ভেবেচিন্তে
তারপর ফাইনাল কথা। ছেলে প্রাইভেট ব্যাংকে জব করে, বাড়ি কুমিল্লা।

------চলবে

Umma Mejana khatun, Hikmatullah khan, Sahin kondokar, Md amanul, Ruma islam, Akaram khan, Md salim bapari and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum