সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 176
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ - Page 3 Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Wed Jul 28, 2021 6:23 pm
মাতৃত্বের-স্বাদ (২৩)

আশিক চলে যাওয়ার পর সুপ্তি নিজের রুমে এসে লাইট
অফ করে শুয়ে কাঁদে বেশ কিছু সময়। নিজের ছোট্ট
ভুলের কারণে আজ জীবনের সব সুন্দর স্বপ্নগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আমার প্রতি আশিকের দুর্বলতা আগে থেকেই জানতাম। তবে কেন জেনেবুঝে
আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলাম? কেন নিজেকে কনট্রোলে আনতে পারিনি? আশিককে কোন মুখে নিজের অভিশপ্ত জীবনের কথা জানাবো? নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে নীরবে চোখের পানি ফেলে সুপ্তি।

গ্রীষ্মের বন্ধের পর সুপ্তির অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা
শুরু হলো। সুকন্যাকে দেখতে ইচ্ছে হলেও পরীক্ষা শেষ করে মুক্তির বাসায় যায় না। মনে মনে ঠিক করে শেষ
পরীক্ষার দিন অনেক সময় সুকন্যার সাথে কাটিয়ে আসবে। মুক্তি ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে কলেজে জয়েন করে। মুক্তি,শিহাবের সুখের সংসারে সুকন্যা যেন একটা ঝলমলে চাঁদ। কলেজ সময় বাদে পুরো সময় মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে মুক্তি। শিহাব প্রায়ই বাসায় ফেরার পথে মেয়ের জন্য হরেক রকম খেলনা কিনে আনে। এসেই কাপড় না ছেড়ে মেয়ের সাথে খেলবে,হামাগুড়ি দিবে,ওকারে নিয়ে হাঁটা শিখাবে
আদর করে তারপর ফ্রেশ হতে যাবে। সুকন্যা জন্ম নেবার পর অনেকদিন মুক্তিকে নিয়ে বেড়াতে বের হয় না শিহাব। আজ ফোন করে মুক্তিকে বলল,

-বিকেলে মা,মেয়ে তৈরি থেকো। আজ ঘুরতে বের হবো। সুকন্যার মা যেন নীল রংয়ের শাড়ি পরে। মা,মেয়ে ম্যাচিং করে পরবে।
-জনাব আপনি জানেন না? বিকেলে সুকন্যা তার মায়ের
বুকের দুধ খেতে খেতে সুখনিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকে। তার আম্মিজানও পরম মমতায় মেয়েকে আগলে শান্তিতে গভীর ঘুমের দেশে থাকে। মেয়ের তখন ঘুমের টাইম তো!
-একদিন অনিয়ম হলে কিছু হবে না। খুব ইচ্ছে হচ্ছে তিনজনে রিকশায় চেপে একটুখানি ঘুরে সামনের পার্ক
হয়ে বাসায় ফিরে আসবো।
মুক্তি হেসে বলল,
- ইচ্ছে পূরণ হবে। চলে আসবা তাড়াতাড়ি। রাখছি।
মুক্তি নীল রঙের শাড়ি পরেছে। সুকন্যার গায়ে নীল জামা,ছোট্ট মাথায় নীল রঙের ব্যান্ড। মা,মেয়ে সেজেগুজে শিহাবের জন্য অপেক্ষা করছে। শিহাব বকুল ফুলের মালা হাতে এসে হাজির হলো। মুক্তির খোঁপায় বকুল ফুলের মালা গুঁজে বলল,
-ব্যস্ততা কখনোই সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব তৈরি করে না। দূরত্ব তৈরি হয় একে অপরকে বুঝতে না পারা,
সময় না দেওয়া এবং যত্নের অভাবে। তুমি মনে মনে চাইছিলে মা,মেয়েকে নিয়ে যেন একটু ঘুরতে বের হই তাই না? আমি ঠিক বুঝতে পেরেছি।'
শিহাবের কথা শুনে মুক্তি মুচকি হাসলো।
-হুমম, ঠিক তাই। চলো এবার হই। সন্ধ্যার আগে ফিরে আসতে হবে।

শিহাব সুকন্যাকে কোলে নিল। রিকশা নিয়ে চলে আসলো পার্কে। বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে হেঁটে যাচ্ছে
সামনের পথ ধরে। সুকন্যা এই প্রথম প্রকৃতির বাইরের রূপ দেখলো। বাবার কোল থেকে যা দেখছে সবই তার কাছে নতুন,রঙিন। শিহাব একটু পরপর মেয়ের গালে
পিতৃস্নেহের ঠোঁট ছুঁয়ে আদর করে দিচ্ছে। শিহাব হঠাৎ বলল,একটা কথা তোমায় জিজ্ঞেস করবো। মনে করেও ভুলে যাই। মুক্তি টিস্যু দিয়ে সুকন্যার নাক মুছে বলল,কি কথা? শিহাব বলল,সুকন্যার জন্মের সময় সকাল বেলায় যখন তোমাকে ক্লিনিকে নিয়ে আসবো। তখন হাত ধরে বললে,সুপ্তি কিছু চাইলে যেন ফিরিয়ে না দেই। ঐদিন এর মানে বুঝতে পারিনি। তারপর অনেক সময় চলে গেল। মনেও থাকে না। সুপ্তি কি চাইবে আমার কাছে? মুক্তি শান্তস্বরে বলল,এতদিন পর জানতে ইচ্ছে করলো? ঐ কথার মানে জটিল কিছুই না। আমি যদি বেঁচে না ফিরতাম। তবে সুপ্তি যদি সুকন্যাকে একবারে চাইতো তাহলে তুমি তাকে দিয়ে দিতে। সুপ্তি বাচ্চাদের খুব ভালোবাসে। সুকন্যাও তার খালার কাছে অনেক ভালো থাকতো। তুমি চাকরি,মেয়ে,সংসার কয়টা সামলাতে? আমার অবর্তমানে তুমি কতদিন একা থাকতে? আর একা থাকবেই বা কেন? তুমি বিয়ে করে আবার সংসার শুরু করবে এটাই তো স্বাভাবিক।
শিহাব হাঁটার গতি থামিয়ে মুক্তির মুখোমুখি দাঁড়ালো।
জন্ম,মৃত্যু,বিয়ে সৃষ্টিকর্তার হাতে। জন্ম নিলে মরতে হবে এটাই চিরন্তন সত্য। তবে কার মৃত্যু কখন,কীভাবে আসবে জানি না। এমনও হতে পারে তোমার আগে আমি মরে গেলাম। মুক্তি সাথে সাথে শিহাবের মুখে হাত
চেপে ধরে। হয়েছে! এখানেই থাক! মৃত্যু নিয়ে কথা বলে সুন্দর সময়টুকু নষ্ট করতে চাই না। আমরা আনন্দ করতে এসেছি। সুকন্যা একবার বাবার দিকে একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। দু'জনেই সুকন্যার গালে চুমু খেয়ে হেসে উঠল। সুকন্যাও বাবা মা'র স্পর্শ পেয়ে ছোট্ট একহালি দাঁত বের করে হাসছে। দু'জনে ধীর পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।

সুপ্তি শেষ পরীক্ষার দিন মুক্তির বাসায় গেল। যাওয়ার পথে গাড়ি ভাড়া রেখে বাকি টাকা দিয়ে সুকন্যার জন্য কিছু খেলনা কিনে নিল। দুপুরে খেতে বসে মুক্তি বলল,
দেখতে দেখতে সেকেন্ড ইয়ারে উঠে গেলি। অনার্স ফাইনাল দিয়েই বিসিএসে এপ্লাই করবি। এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাক। প্রতিযোগিতায় টিকতে গেলে নিজেকে আপডেট রাখতে হবে। চাকরির পরীক্ষার কোনো সিলেবাস নেই। সববিষয়ে নিজেকে দক্ষ,যোগ্য করে তৈরি করতে হবে। মেডিকেল,ভার্সিটিতে চান্স হয়নি তাতে কি হয়েছে? যার শেষ ভালো তার সবকিছুই
ভালো। ধৈর্য ধরে এখন থেকেই পরিশ্রম করে যা! দু'একটা টিউশনি করাতে পারলে খুব ভালো হতো। তোর স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য। ভালো কথা, আমাদের পাশের বাড়ির রিনা আন্টির দুই নাতনি ছিল।
ওদেরকে পড়াতে পারিস তো! সুপ্তি খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে আবার চেয়ারে বসলো। গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বলল,বুবু টিউশনির চিন্তাটা মাথায় আছে।
টিউশনি তো আমাকে করতেই হবে। মায়ের অবসরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। মুক্তি বামহাত দিয়ে সুপ্তির হাতটি ধরে বলল, তোর বুবু যতদিন বেঁচে আছে তোকে এতকিছু ভাবতে হবে না। টিউশনি করতে বলেছি শুধু তোর আগের পড়াগুলো চলমান রাখার জন্য।
অনেক কিছু তোর জন্য সহজ হবে।

সুপ্তি অনেক সময় সুকন্যার সাথে কাটিয়ে সন্ধ্যার ঠিক
আগ মুহূর্তে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিবে। বের হওয়ার আগে মুক্তি বারবার নিষেধ করে বলল, 'সন্ধ্যায় বের হওয়ার দরকার নেই। আজ এখানে থেকে যা! শিহাব তোকে স্টেশনে পৌঁছে দিবে। একটু অপেক্ষা কর। ও এখনি চলে আসবে। সুপ্তি বের হতে হতে বলল,তুমি এত চিন্তা করছো কেন? চলে যেতে পারবো। মা একা আছে। এমনিতেই তাঁর শরীর ভালো থাকে না। আমি আসছি বুবু।' বিদায় নিয়ে চলে আসলো রাস্তায়।

সুপ্তির কাছে তেমন টাকা নেই। ভেবেছিল মুক্তির কাছ থেকে কিছু টাকা চেয়ে নিবে। গল্প করতে করতে সেকথাও ভুলে গেছে। রিকশা না নিয়ে হেঁটেই ফুটপাথ ধরে যাচ্ছে। দুই পথ ধরেই স্টেশনে যাওয়া যায়।
লোকজনের ঝামেলা এড়াতে এবং তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর জন্য আজ পার্কের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে।
সন্ধ্যার অন্ধকারে নির্জন পথধরে যেতে সুপ্তির ভালোই লাগছে। মনে মনে কিছুটা ভয়ও পাচ্ছে। লোকজনের চলাচল হাতে গোনা। অনেকেই হাঁটা শেষ করে বের হচ্ছে। সুপ্তি পিছনে না তাকিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ পিছন থেকে আওয়াজ আসলো,'একা নাকি? লও যাইগা! রাতে আমাদের লগে থাইকা সকালে তোমারে বাড়িত পৌঁছাইয়া দিমু! তোমার বডি তো হেব্বি সুন্দর!' সুপ্তি ফিরে দেখে তার সাথে দুইজন মাঝবয়সী লোক হাঁটছে। পান খাওয়া মুখে লাল দাঁত কেলিয়ে হাসছে। সুপ্তি বুঝতে পেরে কথা না বলে দ্রুত হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। তার হার্টবিট কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ভিতরে ঘামতে থাকে।
বেশ দূরে দেখে দুইজন বয়স্ক মোটা মহিলা হেঁটে সামনের দিকে যাচ্ছে। সুপ্তি বাতাসের গতিবেগে হেঁটে মহিলার কাছে এসে হাফাচ্ছে।' আন্টি খুব বিপদে পড়েছি। পিছনে দুইজন লোক আসছে। আমাকে বাজে কথা বলেছে। আমার পিছু নিয়েছে।' কথা শেষ করতেই
লোক দুটো সুপ্তির দিকে বিকৃত হাসি দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। গায়ের রং কালো,মোটা বয়স্ক একজন মহিলা বললেন,এই দাঁড়া! ওরে তোরা কি বলছোস?
একা দেখে মাইয়া মানুষরে অবলা ভাবছোস? হারামজাদার দল। দুইজন কান ধইরা উঠবস করবি আর বলবি জীবনে আর কোনোদিন কোনো মেয়েকে
খারাপ কথা বলবো না। নারী হলো মায়ের জাত। সব নারীকে মায়ের সম্মান দিব। বোনের মর্যাদা দিব। পুরুষ লোক দুটো কাঁচুমাচু করে এখান থেকে সটকে পড়ার চেষ্টা করছে। দেরি দেখে অপর ভদ্রমহিলা জোরে ধমক দিয়ে বলল,'দেরি করছিস কেন? আপা যা বলছে কর!
আমাদের বাসা এই কালি মন্দিরের পিছনে। আমার ভাই একটা পুলিশে চাকরি করে। এখনি ফোন করে এনে বলবো,তোরা ছিনতাইকারী। পরে বুঝবি পুলিশের প্যাদানি কারে বলে। ধমক শুনে আরও কিছু লোকজন জড়ো হলো। লোকদুটো কান ধরে উঠবস করার পর মহিলা সুপ্তিকে বললেন, মা,এবার তুমি এদের পচা গালে দুইটা চড় মেরে দাও। সারাজীবন যেন এদের মনে থাকে। পথে কোনো মেয়েমানুষ দেখলে সালাম দিয়ে মাথা নীচু করে হাঁটে। কথাটা সুপ্তির খুব পছন্দ হয়। খুশিতে সাথে সাথে দুইজনের গালে দুটো চড় বসিয়ে দিল। ভদ্র মহিলা বললেন, এবার যা! সামনের দিকে না। পিছনের পথ দিয়ে যাবি। লোক দুটো পিছনের দিকে দ্রুত হেঁটে চলে গেলো।
ভদ্রমহিলার একজন সুপ্তিকে বললেন,মা মেয়েদের চলার পথটা খুবই বন্ধুর! উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে,বিচক্ষণতা দিয়ে অনেককিছু মোকাবিলা করতে হয়। তা তুমি একা পার্কের এই নির্জন পথ ধরে কোথায় যাচ্ছো?
সুপ্তি বলল,কলেজ রোড বোনের বাসা থেকে এই পথেই হেঁটে স্টেশনে যাচ্ছি বাস ধরবো। প্রতিদিন বাসেই আসা যাওয়া করি। আজ একটু দেরি হয়ে গেছে! আন্টি কিছু মনে না নিলে আপনি আমার সাথে একটু চলুন। খুব ভয় করছে! ভয় কিসের? যেখানে অন্যায় দেখবে প্রতিবাদ করবে। আমরা এই পথেই যাচ্ছি। তুমি বললে স্টেশন পর্যন্ত তোমাকে এগিয়ে দিব। সুপ্তি ওনাদের সাথে কথা বলতে বলতে স্টেশনে পৌঁছালো। বাসে উঠার পর ভদ্রমহিলা দু'জন নিজেদের গন্তব্যের দিকে যাত্রা করে।

সুপ্তি ঐদিনের ঘটনা কারো কাছে শেয়ার করেনি। মনে মনে ঠিক করে এখন থেকে সব সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। তার মনের সাহসও অনেক বেড়ে গেছে। সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হলো। সুপ্তি নিয়মিত ক্লাস করছে। সুকন্যাকে খুব বেশি দেখতে ইচ্ছে হলে মাঝে মধ্যে মুক্তির বাসায় যায়। এখন আর আগের মতো তেমন সময়ও পায় না। বাসার কাছেই দুটো টিউশনি শুরু করে। একদিন সুপ্তি ক্লাস শেষে ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হয়ে সামনের দিকে হাঁটছে। এমন সময় বন্ধু দীপ্ত জোরে ডাক দিল।' সুপ্তি দাঁড়াও। কথা আছে।' সুপ্তি থামলো।
প্রতিদিন ক্লাস শেষ করেই তাড়াহুড়ো করে চলে যাও।
কিসের এত তাড়া? তোমার বাসা কি শহরের বাইরে?
একদিনও ক্যান্টিনে কারো সাথে আড্ডা দিতে দেখি না
তোমাকে। কেন বলতো? দীপ্ত কথাগুলো বলে হাঁফাচ্ছে।
সুপ্তি মুচকি হেসে বলল,একসাথে এতগুলো প্রশ্ন করলে কয়টার জবাব দিব? দীপ্ত হেসে বলল,আমার এত তাড়াহুড়ো নেই। তুমি আস্তে ধীরে বলো। ক্যান্টিনে সবাই
বসেছে। চলো ঐখানে চা খেতে খেতে আসল কথাটা বলা যাবে। সুপ্তি হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,সরি দীপ্ত, আমার বাসা শহর থেকে দূরে। এখন তোমাদের আড্ডায় গেলে বাসায় ফিরতে দেরি হয়ে যাবে। মা টেনশন করবেন। তার চেয়ে কাজের কথাটা এখানেই বলো। দীপ্তর মনটা খারাপ হয়ে গেল। শান্ত গলায় বলল,
আমরা সব ফ্রেন্ডরা পিকনিকের আয়োজন করছি। তুমি থাকবে তো আমাদের সাথে? দূরে যাওয়া হবে না। এই ধরো শহরের আশেপাশেই। সুপ্তি বলল, কিছু মনে করো না দীপ্ত। যেতে পারবো না মনে হয়। আজ আমি যাই।
সুপ্তি বিদায় নিয়ে রাস্তায় এসে রিকশা নিল। এই দীপ্ত
ছেলেটাকে একদম ভালো লাগে না সুপ্তির। ডিপার্টমেন্টের সব মেয়েদের সাথে তার খুব খাদির।
হঠাৎ চিঠির কথা মনে পড়ে গেল। চিঠিটা কি দীপ্তই পাঠিয়েছিল কিনা কে জানে? চিঠিতে নাম,ঠিকানা কিছুই লেখা ছিল না। নানা ভাবনায় সুপ্তি সন্ধ্যার আগেই বাসায় আসে।

শিহাব সকালে নাস্তা শেষ করে চা না খেয়েই শোবার ঘরে আসলো। শার্ট গায়ে দিয়ে বোতাম লাগাচ্ছে। মুক্তি গরম চায়ের কাপ নিয়ে শিহাবের সামনে দাঁড়ালো।
মুক্তির মনটা ভালো নেই। শিহাব চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক
দিতে দিতে বলল, আজ সুকন্যা রাতে বেশি ঘুমায়নি।
তোমারও ঘুম হলো না। বেশি খারাপ লাগলে কলেজে যাওয়ার দরকার নেই। বাসায় বিশ্রাম নাও। মুক্তি শার্টের বাকি বোতাম লাগিয়ে আস্তে করে বলল,আবারও কিছু একটা হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। এখন কি করবো? শিহাব কৌতুহল নিয়ে বলল, মানে কি? কি হয়ে গেছে? মুক্তি ভার গলায় বলল,সকাল থেকে দুইবার বমি হয়েছে।
শিহাব চা শেষ করে কাপ পাশে রাখলো। মুক্তির গাল দুটো আলতো চেপে ধরে হেসে বলল,কিছুই করতে হবে না। যে আসার সে আসবেই। মা,বাবাকে হারিয়েছি কবেই। আল্লাহ সুকন্যাকে মায়ের প্রতিরূপ হিসাবে পাঠিয়েছেন। সুকন্যাকে যখন মা বলে ডাকি তখন আমার ভিতরটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আল্লাহ মা দিয়েছেন
এবার আশা করি বাবাকে দুনিয়ায় পাঠাবেন। আল্লাহ যদি সহায় থাকেন এবার দু'জনের আব্বাজান এসে ঘর আলোকিত করবে। শিহাব কথাগুলো বলে মুক্তিকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

মুক্তি রাতেই মাকে ফোন করে খবরটা দেওয়ার পর মিসেস করিম মেয়েকে অভয় দিয়ে সান্ত্বনার স্বরে বললেন,আলহামদুলিল্লাহ্, শুনে খুব খুশি হয়েছি। এটা কোনো সমস্যা না। সমস্যা যেমন আছে সমাধানও আছে। চিন্তা করিস না! আমি তো আছি। সুপ্তি শুনেই মায়ের মোবাইল দিয়ে ফোন দিল।
হ্যালো,বুবু অভিনন্দন তোকে! খবরটা শুনে খুউব খুউব
খুশি হয়েছি। নো চিন্তা ডু ফুর্তি। সুকন্যাকে কালকেই আমার কাছে নিয়ে আসবো। সুকন্যা আমার মেয়ে।
তুই বিশ্রামে থেকে কলেজ করবি। আর একটা কথা,
মন বলছে তোর এবার ছেলে হবে। ছেলে হলে আমি কিন্তু নাম রাখবো। মুক্তি হেসে বলল,তোর মন তো কত কিছুই বলে! পাগলি মেয়ে একটা। ঠিক আছে ছেলে হলে তোর ঠিক করা নামই রাখবো। দুজনে হাসতে হাসতে কথা শেষ করে।

সুকন্যার বয়স নয় মাস গিয়ে দশমাসে পড়লো। মুক্তির শরীর ভালো থাকে না। অনেক কষ্টে মেয়েকে ব্রেস্ট ফিডিং ছাড়িয়ে ফিডার ধরালো। রাতে মুক্তি যাতে ভালোভাবে ঘুমাতে পারে সেইজন্য শিহাব হাতের কাছে ফিডার নিয়ে মেয়েকে নিজের বুকে নিয়ে ঘুমায়। দুইমাস পর মিসেস করিম অবসরে যান। তিনি সুপ্তিকে পাঠিয়ে নাতনিকে নিজের কাছে আনেন। মুক্তির শরীর ভালো থাকে না। সুকন্যার ঠিকমতো যত্ন হয় না। খোলামেলা পরিবেশে নানির আদর পেয়ে সুকন্যা তরতর করে বেড়ে উঠতে থাকে। এখন সুপ্তির ব্যস্ততা বেড়েছে অনেকগুণ।
সময় কীভাবে চলে যায় টেরই পায় না। ক্লাস,লেখাপড়া, টিউশনি, সুকন্যাকে সময় দেওয়া সবকিছু নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকে। তার স্বপ্ন একটাই নিজের ক্যারিয়ার গড়া।
স্বাবলম্বী হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। নিজের মতো করে মাকে নিয়ে ভালোভাবে বাঁচবে। কারোর কোনো দয়া,করুণা,সাহায্য নিয়ে বাঁচতে চায় না।

সময় গড়িয়ে চলে আসলো সুকন্যার জন্মদিন। সুপ্তি টিউশনির টাকা দিয়ে সুকন্যার জন্য কানের ছোট্ট রিং বানিয়ে দিল। মিসেস করিম নিজেই সাধ্যমতো প্রথম নাতনির জন্মদিনের ছোট্ট করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। মুক্তি,শিহাব বড় একটা কেক নিয়ে বাইরের খাবার, মেয়ের জন্য ছোট্ট গলার চেইন নিয়ে সকালেই চলে আসে। অনুষ্ঠান শেষ করে শিহাব শাশুড়ির দেওয়া খাবারের বক্স নিয়ে রাতেই চলে যায়। মুক্তি সুকন্যার সাথে দু'দিন থেকে মা,বোনের সাথে গল্পটল্প করে বাসায় চলে আসে।
মুক্তির ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে আসছে।
ডাক্তার জানালেন একটা সিজার করার পর যেহেতু খুব কম সময়ের মধ্যে আবারও কনসিভ করেছে।
পেসেন্টের প্লাসেন্টা নীচে। তাই একমাস আগেই সিজার করতে হবে। শিহাব এবার মুক্তির ডেলিভারির ব্যাপারে
খুবই সচেতন। ডাক্তার যখন যা যেভাবে করতে বলছেন
সেভাবেই করে রাখছে। মুক্তির শরীরও বেশ ভারি হয়ে গেছে। হাত,পায়ে পানি এসে ফুলে গেছে। ডাক্তারের দেওয়া নির্ধারিত তারিখে হসপিটালে ভর্তি করা হলো মুক্তিকে। ভর্তি করার দুইঘন্টা পরেই সিজার করা হলো। মুক্তির ফুটফুটে জমজ পুত্র সন্তান চিৎকার দিয়ে পুরো
অপারেশন থিয়েটার কাঁপিয়ে তুলে। ডাক্তার,নার্স আয়া
সবাই খুবই খুশি। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ডাক্তার ওটি থেকে বের হয়ে হাসতে হাসতে শিহাবকে বললেন,
অভিনন্দন আপনাকে! জমজ ছেলেদের বাবা হয়েছেন।
ছেলেরা,তার মা খুব ভালো আছে। শিহাব সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়।

জমজ ছেলে পেয়ে শিহাব,মুক্তির সংসারে আনন্দের বন্যা। গরু জবাই করে আকিকা দিয়ে জমজ ছেলেদের নাম রাখলো। সুপ্তির ঠিক করা নামই রাখা হলো।
পাঁচ মিনিট সময়ের ব্যবধানে জন্ম নেওয়া জমজ ছেলে
দুটোর নাম রাখা হলো 'সূর্য' আর 'তুর্য'।
------চলবে

Arbaj khan, Hikmatullah khan, Sahin kondokar, Md amanul, Ruma islam, Akaram khan, Md salim bapari and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 176
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

মাতৃত্বের স্বাদ - Page 3 Empty Re: মাতৃত্বের স্বাদ

Wed Jul 28, 2021 6:23 pm
মাতৃত্বের-স্বাদ (২৪ সমাপ্ত পর্ব)

বাড়ির কাছেই এনজিও দ্বারা পরিচালিত একটা স্কুলে জয়েন করে সুপ্তি। সপ্তাহে চারদিন ক্লাস নেয়। ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াতে খুব ভালো লাগে। এদের অনেকেই গরিব ঘরের সন্তান। ঠিকমতো ভালো খাবার পায় না। সুপ্তি মাঝে মাঝে সাধ্যমতো নিজের টাকা খরচ করে বই,খাতা কলম কিনে দেয়। স্কুলটাইমটা তার খুব পছন্দের। দুপুর দুটো থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত।
যেইদিন কলেজে ক্লাস কম থাকে অথবা বন্ধের দিনগুলোতে নিয়মিত স্কুল করে। বাসায় নিজের অনেক কাজ গুছিয়ে সুকন্যার গোসল,খাওয়া শেষ করে বিকাল
সময়টা স্কুলে সময় দেয়। আজ ক্লাস শেষ করে স্কুল থেকে বের হয়ে দেখে গেইটের সামনে আশিক দাঁড়িয়ে
আছে। হাতে ঝালমুড়ির ঠোঙা একটা পানির বোতল।
সুপ্তি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,'কি রে কবে আসলি?
এই না সেইদিন বাড়ি থেকে গেলি। আবার এখন কেন?'
আশিক সুপ্তির হাতে ঝালমুড়ির ঠোঙা দিয়ে বলল, 'আজ ভোরে আইছি। এসে ঘুম দিলাম। কেন জানি হলে ভালো লাগছিল না। ভাবলাম বাড়িতে দুটো দিন থেকে যাই। চল্ সুপ্তি একটু নদীর ধারে যাই! শান্ত বিকেলের এই সময়টা হাঁটলে ভালো লাগবে।'
সুপ্তি যেতে অসম্মত জানালো না।
দু'জনে ঝালমুড়ি খেতে খেতে চলে আসলো নদীর তীরে।
অস্তগামী সূর্যের লাল আভায় নদীর শান্ত ঢেউগুলি চিকচিক করছে। সুপ্তি বলল,ছোটবেলায় দু'জন কতবার এসেছি। তুই পানিতে নেমে আমার জন্য কচুরিপানা ফুল তুলে আনতিস। মনে হচ্ছে সেই দিনের কথা! এখন দু'জন কত্তবড় হয়ে গেছি। আশিক বলল, আমার সব মনে আছে। তোরই মনে থাকে না। তুই অনেকটা বদলে গেছিস সুপ্তি। নৌকায় উঠবি? সুপ্তি বলল,সময় কতকিছু পাল্টে দেয়। কতকিছু পাইয়ে দেয় আবার সময়ই জীবন থেকে অনেককিছু কেড়ে নেয়। আশিক বলল,বুঝলাম তো! তোর গুরুগম্ভীর কথা। এখন বল্ নৌকায় উঠবি?
আজ না,অন্যদিন যখন আসবো তখন উঠবো। চল্
বাড়ি ফিরে যাই। কথা শেষ করেই সুপ্তি আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়।

সুকন্যা আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। অনেক কথাই বলতে পারে। রেবেকা মঞ্জিলের সারা উঠোনময় দৌড়াদৌড়ি করে বল খেলে। বারান্দায় তার নানু পাটি বিছিয়ে দিলে সেখানে সব খেলনা নিয়ে দোকান সাজিয়ে নানুকে ডেকে আনে। 'নানু চলো, আমার দোকান থেকে খেলনা কিনবে। রেবেকা করিমের কষ্ট হলেও নাতনির আবদার
মিটাতে যা করতে বলে তাই করে। সুপ্তি বাসায় ফেরার পথে সুন্দর ডল হাউজ কিনে আনে। সুকন্যা খুশিতে
সুপ্তির গালে চুমু দিয়ে বলল,'তুমি আমার খুব ভালো মামনি। সবচেয়ে সেরা মামনি।' সুপ্তি সাথে সাথে সুকন্যাকে বুকে জড়িয়ে শান্তিতে চোখ বন্ধ করে রাখে।
সুকন্যা মায়ের কাছে খুব বেশি থাকে না। মুক্তি নিয়ে গেলেও সুপ্তির কাছে চলে আসে।
সুকন্যা মুক্তিকে আম্মু বললেই সুপ্তিকে মামনি বলে ডাকে। সুপ্তিই ঐ ডাক শিখিয়েছে।। মুক্তি ফোন দিলে মিসেস করিম সুকন্যাকে নিয়ে বেড়াতে গেল। সুপ্তির স্কুল বন্ধ। বাসায় লেখাপড়া করছে। বই নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বারান্দায় আসলো। দেখে গেইটের কাছে পিয়ন দাঁড়িয়ে
আছে। সুপ্তিকে দেখে পিয়ন পান খাওয়া লাল ঠোঁটে একগাল হেসে চিঠিটা এগিয়ে বলল,'সুপ্তি মা তোমার চিঠি।'হলুদ খামে চিঠি দেখে সুপ্তির এবার কোনো আগ্রহ বা কৌতুহল কোনটাই হলো না। অনিচ্ছাকৃতভাবে চিঠি নিয়ে ঘরে এসে বইটা রাখলো। ফ্যান ছেড়ে শুয়ে চিঠিতে চোখ বুলালো।
প্রিয় সুপ্তি,
এই মুহূর্তে তোমার মায়াবী মুখটা দেখতে বড্ড ইচ্ছে করছে। অনেকদিন তোমাকে দেখি না। জানো তো, যাকে ভালো লাগে তার মুখটাই বারবার মনে পড়ে।
এ এক কঠিন যন্ত্রণা। সময় ফুরিয়ে আবার আমরা মুখোমুখি,চোখাচোখি হবো। তবে তুমি আমাকে দেখবে।
চিনবে কিন্তু কিছুই বুঝবে না। ভালোবাসা অফুরান।
ভালো থেকো নিরন্তর ......
সুপ্তি চিঠিটা পড়ে রাগে একটানে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে বাইরে ফেলে দিল। বলদ একটা! মজনু সাজছে।
ডিপার্টমেন্টের কোন ছাগলটা আমার জন্য দিওয়ানা হয়েছে এটাই ধরতে পারলাম না। সুপ্তি চিঠির কথাগুলো ভাবতে ভাবতে নিমিষেই ঘুমিয়ে পড়ে।

সময় যেতে থাকে স্রোতের মতো। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর পার হলো। সুপ্তি অনার্স,মাস্টার্সে সেকেণ্ড ক্লাস পেলো। স্কুলের চাকরি,টিউশনি আর বিসিএসের লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করে।
হন্যে হয়ে ভালো চাকরির খোঁজ করে। জেনারেল বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রিলিতে টিকলেও লিখিত পরীক্ষা দিয়ে ভাইভাতে আর যেতে পারেনি। চলতি বছরেই আশিকের মা স্ট্রোক করেন। কিছুটা ভালো হয়ে উঠলে সুপ্তির মা'কে খবর পাঠিয়ে কাছে এনে হাত ধরে বললো,

'রেবেকা,তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি।
আমার দিন শেষ হয়ে আইতেছে। যেকোনো দিন মরে যাবো। আমারে ক্ষমা করে দিও বইন! আশিক তোমারে চাচি না তার আর একটা মা বলেই জানে। আশিকের একটা ভালো চাকরি হলে সুপ্তিরে ঘরে তুলুম। আমি যদি নাও থাকি তুমি আমার এই ওয়াদাটা পূরণ করবা বইন।
আশিককে তুমি তোমার ছেলের জায়গা দিও। রেবেকা
করিম সুপ্তির জীবনের দুর্ঘটনা কীভাবে বলবে? সত্যিটা না বলে নিজের মেয়ের ভালোর জন্য বিয়ের কথা দিয়ে এতবড় প্রতারণা করা ঠিক হবে? বিবেক বলে একটা কিছু তো আছে। কিছু সময় ভেবে বললেন,ভাবী আপনি আশিকের জন্য চিন্তা করবেন না। আশিক আমার ছেলে। আল্লাহর হুকুম হলে আশিকের সাথে সুপ্তির বিয়ে হবে। সবকিছুই উপরওয়ালা নির্ধারণ করেন। আমি আগেই আপনাকে কথা দিতে পারবো না। তারা দু'জন
দু'জনের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলে ঠিক করে নিবে।
আপনি ভাববেন না। আগে আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেন। আল্লাহর কাছে এটাই একমাত্র চাওয়া।
আশিকের মা আর সুস্থ হয়ে উঠেননি। পনেরো দিন পর আবার স্ট্রোক করে না ফেরার দেশে চলে যান।

প্রকৃতির সব বিধিবিধানকে মেনে নিয়ে জীবনকে সামনের দিকে টেনে নিতে হয়। মায়ের মৃত্যুর শোকে
অনেককিছু এলোমেলো হয়ে গেলেও আশিক মনোবল হারায়নি। অসুস্থ বাবাকে যে তাকেই ভালো রাখতে হবে,
সুস্থ করে তুলতে হবে। আশিক লেখাপড়া শেষ করে বাড়ি থেকেই ভালো চাকরির খোঁজ করে। চাকরি পেলেই সুপ্তিকে বিয়ের কথা বলবে। দু'জনেই বিসিএসের জন্য রাতদিন লেখাপড়া করছে। এডুকেশনে স্পেশাল বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি দেখে সুপ্তি এপ্লাই করলো। তার প্রবল আত্মবিশ্বাস এবার হবেই। পরীক্ষার দিন আশিক সুপ্তির সাথে গেল। পরীক্ষা শেষ করে সুপ্তি ফুরফুরে মেজাজে কেন্দ্র থেকে বের হলো। গেইটের একটু দূরে দেখে আশিক তারজন্য আইসক্রিম কিনে দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্তি কাছে যেতেই মুচকি হেসে বলল,
'নে আগে গলাটা ভিজিয়ে নে! তোর পছন্দের জিনিস।'
সুপ্তি বলল,'তুই যে কি? এখনো আগের মতো আছি নাকি? বড় হয়েছি না? এখনও কাঠি ধরে চেটে চেটে
আইসক্রিম খাওয়ার বয়স আছে? ক'দিন পরে সরকারি কলেজের লেকচারার হতে যাচ্ছি। এখনও বাচ্চা বাচ্চা বিহেভিয়ার থাকলে হবে? আইসক্রিমের বক্স নিয়ে বাসায় গিয়ে খাওয়া যেতো না?'
আশিক আইসক্রিম কামড়ে খেতে খেতে বললো,
'না যেতো না। যা বলছি তাই কর! আমরা দু'জন কখনো বড় হবো না। খাওয়া শেষ কর তাড়াতাড়ি। একটু ঘুরেফিরে বাইরে লাঞ্চ করে তারপর বাড়ি ফিরবো।' আজ না বুবুর বাসায় খাওয়ার কথা! সুপ্তি বলল।
আশিক ফোন বের করে বলল,'বাইরে খেয়ে ঘুরেফিরে যাওয়ার সময় মুক্তি বু'র হাতে চা খেয়ে দু'জনে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিব। আমি এখনি মুক্তি বু'কে ফোন দিচ্ছি। সুপ্তি কিছু না বলে শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।

দু'জনে অনেক সময় রিকশা করে শহরে ঘুরে দুপুরে লাঞ্চ করে খেলনার দোকানে ঢুকলো। আশিক দুটো ছোট্ট গাড়ি খেলনা কিনে মুক্তির বাসায় গেল। সূর্য,তুর্য দুই ভাই খালামনিকে দেখেই ছুটে আসলো। সুপ্তি দুটোকেই কোলে নিয়ে আদর করলো। সূর্যটা একটু কথা কম বললেও তুর্য কথায় বেশ পটু। তুর্য সুপ্তির গালে আদর দিয়ে বলল, খালামনি তোমারটা কই?
সুপ্তি গাল দুটো আলতো করে টেনে বলল,কি আমারটা কই বাবা? আ রে বোকা! গাড়ি তো আশিক মামা এনেছে। তুমি ট্রেন আনলে না কেন? ট্রেন আনলে তো ঐটা দিয়ে নানু বাসায় চলে যেতাম। আপুনিকে দেখে আবার বাসায় চলে আসতাম। সুপ্তি এবার বুঝে জোরে হেসে উঠল সাথে আশিকও হাসছে। সুপ্তি তুর্যের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,আমার ভুল হয়ে গেছে বাবা! এরপর যখন আসবো তোমাদের জন্য ট্রেন নিয়ে আসবো।
ট্রেনের কথা শুনেই দু'ভাই সুপ্তির গালে চুমু দিয়ে হাত তালি দিল। চা খেয়ে সন্ধ্যার আগেই আশিক সুপ্তিকে নিয়ে বাড়ি চলে আসলো।

দুইমাস পর আশিক ঢাকায় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কনসালটেন্ট হিসাবে জয়েন করে।
দিন বিশেক পর স্পেশাল বিসিএসের ফলাফল বের হলো। সুপ্তির অক্লান্ত পরিশ্রমের কাঙ্ক্ষিত ফল হাতের মুঠোয় চলে আসে। সুপ্তি সরকারি কলেজে প্রভাষক পদে নিয়োগ পায়। নিজের জেলায় পোস্টিং পেলেও বাসা থেকে অনেকদূরে। রেবেকা করিম মেয়ের সরকারি চাকরিতে খুশিতে আত্মহারা। সুপ্তিকে নিয়ে গ্রামে শ্বশুর বাড়ির পুরানো বাড়িতে আসলেন। পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে সুপ্তির বাবার কবরের পাশে মেয়েকে নিয়ে মোনাজাত করে ঐদিনই ফিরে আসেন। রাতে ঘুমানোর আগে মেয়ের ঘরে এসে দেখেন সুপ্তি সুকন্যাকে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।
আস্তে করে ডাকলেন,ঘুমিয়েছিস? 'না বলো'
জীবনে কষ্ট পেয়েছিস। লেখাপড়া নিয়ে পরিশ্রম করেছিস। পরিশ্রমের ফলও পেয়েছিস। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। এখন তোকে আর একা দেখতে চাই না। আমি চাই সামনে ঈদের পর বন্ধের মধ্যে আশিক আর তোর বিয়েটা হয়ে যাক। তোর চাচি অসুস্থ থাকার সময় আমার হাত ধরে তার ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইলেন।
তোদের দু'জনের বিয়ের কথা বলে গেছেন।
মা,তুমি সবকিছু জানো। এরপরও বলছো?
হুমম,বলছি। আমার বিশ্বাস আশিক তোর সব মেনে নিবে। প্লিজ মা,আর একবারও বলো না। যেমন আছি
খুব ভালো আছি। এখন যাও। ঘুমাবো।

মিসেস করিম মুক্তির সাথে পরামর্শ করে বাড়ির দুটো ইউনিট ভাড়া দিয়ে সুপ্তির কর্মস্থলের কাছেই বাসা ভাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। কলেজে জয়েনিং এর দিন সুপ্তি আশিকের দেওয়া শাড়িটা পরে কলেজে যোগদান করে।
সবার সাথে পরিচয় পর্ব শেষ করে কলেজ থেকে বের হবে বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছে সুপ্তি। হঠাৎ বন্ধু রাজিবের মুখোমুখি। সুপ্তি অনেকটা অবাক হয়ে যায়।
সুপ্তি বলল,রাজিব তুমি এখানে? রাজিব বলল,
আমি জানি,তুমিও আজ এই কলেজে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছো। আমার খবর তুমি না জানলেও আমি ঠিকই রেখেছি। চিঠিতে এটাও লিখেছিলাম কোনো একদিন তোমার মুখোমুখি হবো কিছু চাইবার এবং দেবার। সেই সময়টা আজ এসেছে।
আমিই সেই চিঠির মানুষ। সুপ্তি আমি তোমাকে ভালোবাসি। বিয়ে করতে চাই। তখন স্টুডেন্ট ছিলাম
তাই কোনো যোগ্যতা ছিল না,টাকা ছিল না,সম্মান ছিল না তাই ভালোবাসার কথা জানাতে পারিনি। তোমাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানি। আমার বড় বোন মুক্তি আপার কলিগ। তারা একই কলেজে চাকরি করে। একদিন মুক্তি আপার বাসায় গিয়ে তোমাকে দেখে আমার বড় বোন। তখন আমার ভাইয়ের বিয়ের জন্য মেয়ে খোঁজ করছিল। তোমাকে আপার পছন্দ হয় কিন্তু মুক্তি আপা তখন সরাসরি না করে দেন। তোমার লেখাপড়া শেষ করার আগে বিয়ে দিবেন না। আমার বোন মায়ের কাছে যখন তোমার সম্পর্কে বলছিল তখন আমি পাশে ছিলাম। তোমার কথা শুনেই চিনে ফেলেছি। তুমি আমার ডিপার্টমেন্টে লেখাপড়া করো। তখন থেকেই আমি প্রতিদিন তোমাকে আড়াল থেকে দেখতাম। কিন্তু কখনো সাহসে কুলায় নাই তাই বলিনি। আমারও স্পেশাল বিসিএস দিয়ে এই কলেজে নিয়োগ হয়েছে। সুপ্তি এখন নিশ্চয়ই বড় আপাকে মুক্তি আপার বাসায় পাঠাতে পারি? আমার ভাইয়া তিন বছর হয় বিয়ে করেছে।

সুপ্তি হা হয়ে রাজিবের কথা শুনছিল। এও সম্ভব হয়?
রাজিবই চিঠি লিখতো? বিশ্বাস করতে পারছি না।
আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো ঠিক। কিন্তু ওর চোখে আমার জন্য এত ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল কখনো বুঝতেই পারিনি। সামনাসামনি কিছুই বলতো না।
এত ধৈর্য ছেলে মানুষের থাকে?রাজিব বলল,
সুপ্তি এত কি ভাবছো? এখনও কি অযোগ্যই রয়ে গেলাম? সুপ্তি ভাবনা থেকে ফিরে মোবাইল বের করে বলল, তোমার নাম্বারটা বলো। সেইভ করে তোমাকে মিসড কল দিচ্ছি। তুমিও সেইভ করে রেখো। এখানে দাঁড়িয়ে কি সিরিয়াস বিষয়ে কথা বলা যায়? আমি তোমাকে ফোনে সব জানাবো।
সুপ্তি কথা শেষ করে দ্রুত চলে এসে বাস ধরলো।

কিছুদিন ক্লাস করার পর সুপ্তি কলেজের কাছাকাছি
তিনরুমের বাসা ঠিক করলো। রেবেকা মঞ্জিলের দুই ইউনিট ভাড়া দিয়ে চলে আসলো শহরের ভাড়া বাসায়।
সুপ্তি দু'দিনের ছুটি নিয়ে ঘরের সব ফার্নিচার গুছিয়ে
সবকিছু ঠিকঠাক করে আবার কলেজে ক্লাস নেওয়া শুরু করে। নতুন চাকরি,নতুন স্টুডেন্ট,নতুন বাসা সবকিছু মিলিয়ে নতুন পরিবেশটা বেশ উপভোগ করছে সুপ্তি। সুকন্যাকে কাছেই ভালো দেখে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিল। রেবেকা করিম সুকন্যাকে স্কুল থেকে আনা নেওয়া করে। নতুন ভাড়া বাসা বেশ খোলামেলা। সামনে বিশাল মাঠ। মাঠভর্তি গালিচার মতো সবুজ ঘাস। বিকেল হলেই সুকন্যা মাঠে বাচ্চাদের
সাথে খেলে,দৌড়াদৌড়ি করে। রেবেকা করিম পাশের বাসার সমবয়সী মহিলাদের সাথে হাঁটে,গল্প করে।
সুপ্তি বারান্দায় বসে আপনমনে টুকটাক লেখালেখি করে। কবিতা লিখে,গান লিখে। কখনো জীবনের স্মৃতি কথা লিখে। কখনো বা সুকন্যার খেলা দেখে একা একাই
হাসে।
মুক্তি,শিহাব ছেলে দুটোকে নিয়ে বেড়াতে চলে আসলো
সুপ্তির ভাড়া বাসায়। শিহাব হাসতে হাসতে সুপ্তিকে বলল,বলেছিলাম না সামনে তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যত।
সব হয়েছে। অনেক কষ্ট করেছো। এখন আশিককে বিয়ে করে সুখে সংসার করো। সুপ্তির মনটা খারাপ হয়ে যায়। কোনো কথা না বলে চুপ থেকে টেবিলে খাবার দিয়ে শিহাবকে বলল,বিয়ের ভাবনা মাথা থেকে কবেই
বের করে দিয়েছি। চাকরি,মা,সুকন্যাকে নিয়ে অনেক ভালো আছি। শিহাব হেসে বলল,তুমি না ভাবলেও আমাদের ভাবতে হয়। খাওয়া শেষ করে মুক্তি, শিহাব বাসায় যাওয়ার আগে বলল,এবার ঈদের দু'দিন পর সবাই মিলে কক্সবাজার যাবো তিনদিনের সফরে।
সুকন্যা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। সুপ্তিকে জড়িয়ে ধরে বলল,খুব মজা হবে তাই না মা মনি! নানুকেও কিন্তু নিব। মুক্তি মেয়েকে আদর দিয়ে বলল,এই পাগলি মেয়ে, নানুকে খালি বাসায় রেখে যাবো নাকি? সবাই যাবো।
তোর বাবা গাড়ির টিকেট কেটে রাখবে।

ঈদের আগের দিন রাতে রাজিব ফোন দিলে সুপ্তি কুশল বিনিময় করে জানিয়ে দিল তার বিয়ে আগেই ঠিক হয়ে গেছে। কোনোভাবেই এটা চেঞ্জ করা যাবে না। রাজিব যেন অন্য কাউকে বিয়ে করে সংসারী হয়। ঈদের দু'দিন পর সবকিছু গুছিয়ে সবাইকে নিয়ে রাতে রওয়ানা দিল
কক্সবাজারের উদ্দেশে। সকাল আটটায় সী-বীচের কাছাকাছি হোটেল কল্লোলে উঠলো সবাই। সুপ্তি,সুকন্যা
রেবেকা করিম এক রুমে। পাশের রুমেই মুক্তি,শিহাব ছেলে দুটোকে নিয়ে উঠলো। সুপ্তি ফ্রেশ হয়ে আশিককে ফোন করলো। ফোন সুইচ অফ।হোটেল সী-বিচের কাছাকাছি হওয়ায় সমুদ্রের গর্জন
শোনা যাচ্ছে। সুপ্তি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সাগরের বিশাল
জলরাশির দিকে দৃষ্টি দিল। এত কাছ থেকে সমুদ্র দেখবে তার ভাবনায় আসে নি। শান্ত স্নিগ্ধ সকালের হিমশীতল বাতাস পুরো দেহমন জুড়ে প্রশান্তি এনে দিল।
সারারাতের বাস জার্নির ধকল এক নিমিষেই উধাও হয়ে যায়। সুপ্তি বেশ সতেজ অনুভব করছে। অপলক চোখে তাকিয়ে আছে সারি সারি উত্তাল ঢেউগুলির দিকে। কীভাবে সৈকতের চিকচিকে বালুর উপর আঁচড়ে পড়ছে। আকাশের দিকে তাকায়। দেখে নীলাভ আকাশে
কোনো মেঘের আনাগোনা নেই। রাস্তার দুইপাশে সবুজ
গাছগাছালি। কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশ পেয়ে সুপ্তি
ভাবনার আকাশে ডুবে যায়। আপনমনে শব্দের বুননে নিজের লেখা কবিতার চার লাইন বিড়বিড় করে আবৃত্তি করে,
তুমি দূর আকাশের অধরা চাঁদ,
কাছে পেতে প্রেয়সীর মনে জাগে সাধ।
উদাসমনে যায় বেলা, কাটে তার নির্ঘুম রাত;
দূর থেকে দেখতে পাও কি তার চোখের জলপ্রপাত?

মায়ের ডাক শুনে সুপ্তি রুমের ভিতরে গেল। সুপ্তিকে তার মা বললেন,জীবনে কোনোদিন এত লম্বা সময় বাসজার্নি করি নাই। মনে হচ্ছে এখনও বাসে আছি।
মাথাটা এখনও ঘুরছে। কানে বারবার গাড়ির হর্নের আওয়াজ আসছে। সুপ্তি বলল,নাস্তা করে গোসল দিয়ে একটা ঘুম দাও। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার সব ঔষধ নিয়ে আসছি। আল্লাহ্ রহমতে তোমার কিছু হবে না।
সাগরের পাড়ে গেলে দেখবা শরীর মন কেমন ভালো হয়ে যায়। সুপ্তি মায়ের সাথে কথা শেষ করে মোবাইল নিয়ে আবার আশিককে ফোনে ট্রাই করে। এবারও ফোন সুইচ অফ করে রেখেছে।

বিকালের দিকে সবাই সী-বিচে আসলো। সাগর দেখে সুকন্যা খুশি হলেও সূর্য,তুর্য ভয়ে কোল থেকেই নামছে না। শিহাব,মুক্তি দুই ছেলেকে কোলে নিয়ে হাঁটছে। সুপ্তি
এক হাতে মা'কে ধরে অন্য হাতে সুকন্যাকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সুপ্তি বলল, 'বুবু আমরা ঠিক সময়ে বের হয়েছি। সূর্যের ডুবে যাওয়ার দৃশ্য খুব কাছ থেকে দেখতে পাবো। আমরা কিন্তু তিন চার ঘন্টা বীচেই থাকবো।' তোর আদরের ভাইগ্নারা এত সময় এখানে থাকতে দিবে বলে মনে হচ্ছে না। এখনি ভয়ে দুই জনই কোলে উঠে গেছে। তুর্য মায়ের কানে কানে বলল,সাগরে তো তিমি মাছ থাকে। তিমি মাছ আস্তো মানুষকে গিলে খায়। আপুনি
সকালে বলেছে। মুক্তি ছেলের কথা শুনে হেসে বলল,
'মা,বাবা কাছে থাকলে বাচ্চাদের কেউ কিচ্ছুটি করতে পারে না। বোকা,ভীতু ছেলেরা ভয় পায়! তুর্য সোনা আর তার ভাইয়া কি ভীতু ছেলে? তুর্য এবার চোখ বড় করে
সাহস করে বলল, আমরা দুই ভাই মোটেও ভীতু না।
আমরা তো বিমানের পাইলট হবো। যুদ্ধ বিমান চালাবো। তুমি দেখে নিও মা! মুক্তি ছেলের গালে চুমু খেয়ে বলল,আমার লক্ষী বাবাটা! আগে সুস্থ থেকে বড় হও। শিহাব বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সৈকতের অস্থায়ী ছাতা ভাড়া নিল। ষাট টাকা করে চারঘন্টার জন্য।
তুর্যের ভয় অনেকটা কমে গেছে। বাবার সাথে বল খেলছে। মুক্তি বাদাম কিনে ছিলে মা'কে দিচ্ছে নিজেও খাচ্ছে। সৈকতে পর্যটকদের ভিড় আস্তে আস্তে বাড়ছে।

সুপ্তি হাতে কিছু বাদাম নিয়ে একাকী ধীর পায়ে সামনের
দিকে এগিয়ে যায়। এই সময়টায় সবাই খুব কাছ থেকে সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখতে আসে। বিদায়ী সিদুঁররাঙা সূর্যের এখন ভীষণ তাড়া। লাল আভায় পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। আকাশের পশ্চিমকোণটা সাগরের খুব কাছে মনে হচ্ছে। এক অপূর্ব দৃশ্য সুপ্তি পলকহীন চোখে দেখছে। ঠিক তখনি তার কাঁধে একজনের হাত রাখার স্পর্শ টের পেয়ে চমকে উঠে। দ্রুত গতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আশিক মুচকি হাসছে। গায়ে হালকা নীল রঙের টি-শার্ট,জিন্স প্যান্ট। চোখে স্কয়ার শেপের লেন্স। মনে মনে আশিককে চাইছিল। তবে এভাবে এত কাছাকাছি পাবে তার কল্পনার বাইরে ছিল। আশিকের হঠাৎ উপস্থিতি তাকে ভীষণভাবে মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে রাখে। মুখের দিকে তাকিয়ে প্রাণখোলা হাসি দিয়ে বলল, এতটা সারপ্রাইজড করে দিবি। ভাবনায় আসে নি। তুই জানতিস আমরা এখানে আসবো?
আমি তো জন্মের পর যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি তখন থেকেই তোকে চিনি,বুঝি। তোর কোনো কিছু আমার কাছে অজানা নয়। তুই যে আমার রক্তে মিশে আছিস। আমার কষ্ট একটাই তুই আমাকে বুঝলিই না। আমি তোর কাছাকাছি থেকেও অনেক দূরে। আশিক কথাগুলো বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সুপ্তি অন্যদিকে ফিরে আছে। কথা বলছে না। আশিক আবার বলল,
এই বন্ধে তোকে বিয়ে করে ঘরে তুলবো। বধূর সাজে তোর মুখটি মনভরে দেখবো। ছোটবেলা থেকে শুধু তোকে বউ কল্পনা করে আবেগে ভেসেছি। চাকরি নেই,
টাকা নেই, দু'জনের লেখাপড়ার ক্ষতি হবে তাই কল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস করিনি। এখন দু'জনেই
প্রতিষ্ঠিত। স্বপ্ন পূরণের কোনো পিছুটান নেই।
সুপ্তির চোখদুটো ছলছল। মাথা নীচু করে আশিকের কথাগুলো শুনে যাচ্ছে। নিজেকে সংযত করে শান্ত গলায় বলল,তোকে আমার অনেক কথা বলার আছে।
আশিক এক বাক্যের কথা শুনেই তাড়াতাড়ি বলল,
আমি তোর মুখ থেকে নতুন করে কিছুই শুনতে চাই না। আমি অনেক আগেই শুনেছি এবং তোর অনেক কিছু জেনেছি। মুক্তি বু' আমাকে ফোনে সব বলেছে।
সুপ্তি বলল,
-কি কি বলেছে?
-তোর শুনে কি হবে? পুরোনো কথাগুলো মনে করে কষ্টই বাড়বে। আজ এখন তোর ভিতরের সব কষ্ট সাগরে ছুঁড়ে ফেলে দে! আজকের পর থেকে পুরোনো কোনো কষ্টই তোকে ছুঁবে না। কোনো দুঃখ, কষ্টকে তোর ধারে কাছেও আসতে দিব না।
সুপ্তির চোখ থেকে দু'ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে। আবেগাপ্লুত হয়ে বলল,
-তুই জানিস? আমি আর কোনোদিন মা হতে পারবো না। তোকে বাচ্চা দিতে পারবো না। তুই বাবা ডাক শুনবি না। আমাকে বিয়ে করে জীবনে কষ্টই পাবি।
-হুমম,সব জানি। অ্যাবর্শন করার সময় টিউমারের সাথে
ইউট্রাস ফেলে দিতে হয়।
-তারপরও তুই বিয়ে করতে চাস?
-দুনিয়ার সব নারী কি মাতৃত্বের স্বাদ নিতে পারে? সবার গর্ভে কি সন্তান ধারণ ক্ষমতা থাকে? দুনিয়ায় নিঃসন্তান
দম্পতি নেই? খোঁজ নিয়ে দেখ ঘরে ঘরে এই সমস্যা।
শুধু যে মেয়েদের সমস্যার কারণে বাচ্চা হয় না তা কিন্তু না। অনেক পুরুষ সন্তান দিতে অক্ষম। যাদের সন্তান নেই তারা কি এই কষ্টে সংসার আলাদা করে ফেলছে? এই কষ্টে তুই কেন একাকী জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিবি। জীবনে কি সুখ পেয়েছিস? ঐটা একটা দুর্ঘটনা মাত্র। এতে তোর কোনো দোষ নেই। সব নিয়তির খেলা। সব ভুলে যা! আর একটা কথা,মুক্তি বু,শিহাব ভাই এখানে আসার সব পরিকল্পনা করে। ফোনে আমাকে জানায়। তোকে জানাতে নিষেধ করেছিল। তারা দু'জনের সিদ্ধান্ত আমাকে বলেছে সুকন্যা আমাদের মেয়ে হয়ে আমাদের কাছেই থাকবে। এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
সুপ্তি নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছে। আশিক সুপ্তির হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলল,এই যে হাত দুটো ধরলাম। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এমন করেই ধরে থাকবো। কখনোই আলাদা হবো না। যাকে জীবন দিয়ে ভালোবাসি তার সুখটা যেমন আমার। তার দুঃখটাও ঠিক আমারই। দেখে নিস
সবচেয়ে সুখী দম্পতি হবো আমরা। আশিক সুপ্তির চোখের পানি মুছে দিল। দু'জনে হাত ধরেই সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ততক্ষণে সূর্য ডুবে সন্ধ্যা হয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসে........
---------------------সমাপ্ত-----------

মাকসুদা খাতুন দোলন

Umma Mejana khatun, Arbaj khan, Hikmatullah khan, Sahin kondokar, Akaram khan, Jalsan khan, Ahmed ridoy akon and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum