সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

ভাইরাস  - Page 3 Empty Re: ভাইরাস

Fri Jun 04, 2021 5:48 pm
২১|

হঠাৎই পাশের ঘরে হুলস্থূল কান্ড শুরু হয়ে গেছে। ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র কেউ উল্টে ফেলছে। দরজা জানালায় কিছু দিয়ে সজোরে আঘাত করছে। তারপরই এক ধরনের আর্তনাদের মতো শব্দ করে ঘর ফাটাচ্ছে। এরপর কিছু সময় চুপচাপ থেকে আবার এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

এক হাতে ছোট্টু অন্য হাতে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে খাটের উপর বসে আছে শামসু। সামনে হারিকেনের বাতিটি নিভিয়ে রাখা হয়েছে। সবাই মনে মনে দোয়া দরুদ পড়ে চলছে। যেন অনস্তকাল ধরে কোন এক নরকের ভেতর বসে আছে তারা।

সামসুর স্ত্রীর চোখ গড়িয়ে অনবরত পানি ঝরে পড়ছে। একটু পর পর সে ফুপিয়ে উঠছে। এক হাতে তার মুখ চেপে ধরে রেখেছে সামসু।

হাসেম চাচা মরেনি অথবা মরে গেলেও পুনরায় কোন ভাবে জেগে উঠেছে। ঠিক কোন জিন্দা লাশের মতো! যেভাবে তার বাজান জিন্দা লাশে পরিণত হয়েছিল। আর কিছুই ভাবতে পারছে না ছোট্টু। তার চোখের জলও এখন যেন শুকিয়ে এসেছে। অনেকটা পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে চোখ দুটি।

সারাদিন মা ভাইদের কোন খোঁজখবর নেই। বেঁচে আছে কিনা তাও জানা নেই। মিলিটারি চাচাও আর ফিরে আসলো না। সবকিছুই যেন হঠাৎ করেই উলটপালট হয়ে গেছে। পুরো পৃথিবী ওলট-পালট হয়ে গেছে।
এত সুন্দর সাজানো গোছানো পৃথিবী, যেখানে তার বাবা প্রতিদিন তার জন্য গঞ্জ থেকে হাতে করে একটা খেলনা বা এক ঠোঙা মজা নিয়ে আসত। তারা সেগুলি নিয়ে কাড়াকাড়ি জুড়ে দিতো। কালু সবার ভাগেরটা খেয়ে ফেলতো।

কালুর কথাটি ভাবতেই বুকটা যেন আরো ভারী হয়ে আসলো ছট্টুর। তারা মাঠে ফুটবল খেলতে যেত। নারকেলের পাতা দিয়ে বানানো ফুটবল। কালু সেটা দিয়ে খেলতে চাইতো না। বাজানের কাছে কতবার তারা প্লাস্টিকের ফুটবলের জন্য আবদার করতে গেছে। পারেনি। সেই আবদার আর করা হয়ে ওঠেনি। আর কোনদিন সেটা হবেও না। যার কাছে করার কথা ছিল সেই মানুষটিই আর নেই। নেই তার সেই রগচটা ভাইটিও।

এ কেমন এক পৃথিবী! ছন্দছাড়া, স্বার্থপর, নিষ্ঠুর, বীভৎস। আলোহীন, অন্ধকারময় এক দুনিয়া। এখানে যেন সূর্য থেকেও নেই। অন্ধকার কাটাতে চাঁদের আলো যেন আরো ভয়াবহ এক বিভীষিকা। এই চাদের আলোয় সৌন্দর্য নেই। শুধু আছে ভয়, আতঙ্ক, দুঃস্বপ্ন। এই আলো কারো মনে প্রশান্তি এনে দেয় না, অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে। এই আলোয় স্নান করতে বেরিয়ে পড়ে পিশাচ নরখাদকেরা। এ যেন এক অভিশাপ্ত জগৎ।  

দৈত্যদানো ভূত-প্রেতের গল্প কাহিনি ছোটবেলা থেকেই অনেক শুনেছে ছট্টু, তার মায়ের কাছে এসব কাহিনির ভান্ডার ছিল। কিন্তু বাস্তব এই পৃথিবী যে কোন একদিন তার থেকেও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে নেবে সেটি বোধহয় তার মায়েরও জানা ছিল না। তার ঝুলিতে যে এরকম কোন গল্প ছিল না!

বিভীষিকাময় এই বাস্তবতা হার মানিয়ে গেছে সব কল্পনাকে। এখানে জ্বীন-ভূতের ভয় নেই, ভয় নিজের আপন মানুষগুলিকে। ভয় তাদের কখন জিন্দালাশ হিসেবে দেখতে হয় সেটি নিয়ে। ভয় তাদের সাথে প্রান বাচাতে কখন যুদ্ধ করতে হয়! তার চেয়েও ভয়ের বিষয়, নিজেকেও না কখন এই একই রকম কিছু একটায় রূপান্তরিত হতে হয়। এ যে কোন সাধারণ মৃত্যু নয়, মৃত্যুর চেয়েও হাজার গুণ ভয়ংকর একটা কিছু।

অনেক কিছু মনে মনে ভেবে চলছিল ছট্টু। হঠাৎ করেই হাসেমের ঘর থেকে দরজা ভাঙার বিকট শব্দ  তাদের কানে ভেসে এলো। ঘরের ভেতর থেকে কারো  অনবরত আঘাতে হুরমুর করে কাঠের দুর্বল দরজাটি ভেঙে পরেছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে উঠোনের আশেপাশে কেউ একজন পায়চারি করতে শুরু করেছে।

সামসু দ্রুত পায়ে বিছানা থেকে উঠে ঘরের জানালাগুলি আরো একবার পরীক্ষা করতে শুরু করল।

মা! ও মা! কই গো তুমি! বাইরে কেউ একজন বিকৃত কন্ঠে টেনে টেনে কথাগুলি পুনরাবৃত্তি করে চলছিল। যেন অনর্গল এক ধরনের প্রলাপ বকছে। তারপরই অস্থিরতা করতে করতে বাড়ীর এপাশটায় ওপাশটায় ছুটে বেড়াতে লাগলো সেই কন্ঠের মালিক। যেন কেউ একজনকে হন্যে হয়ে খুজে বেড়াচ্ছে।
চারিপাশের নীরবতা ছাপিয়ে উঠোনের উপর তার খালি পায়ের ধুপ ধাপ শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

এবার যেন জড়ানো ভারী কণ্ঠস্বরটি ধীরে ধীরে এক ধরনের গোঙ্গানিতে রূপান্তরিত হতে লাগলো।

ছোট্টু বিছানা থেকে উঠে গিয়ে শক্ত করে দরজার খিলটি আঁকড়ে ধরল। সামসুর ঘরের দরজার খিলটি একটু দুর্বল। দরজাটি আটকানোর মতো আর কোন ধরনের ব্যবস্থা সেটির উপরে নিচে নেই।

এবার সামসু তার ঘরের কাঠের আলমারিটি কাধ দিয়ে সজোরে ঠেলতে শুরু করলো। তাকে দেখে তার স্ত্রী সাহায্য করার জন্য উঠে গেল। ধীরে ধীরে দুজনে মিলে নিঃশব্দে আলমারিটি ঠেলে দরজার সামনে নিয়ে আসলো। দরজার উপর সেটি হেলান দিয়ে রাখার সময় খট করে একটি শব্দ হল।
 
হঠাৎ করেই যেন বাইরে ছোটাছুটি থেমে গেল। কেউ একজন ব্যাপারটি খেয়াল করেছে।
পরক্ষনেই সেটি দরজার উপর সজোরে একটি আঘাত করে বসল।
পর পর আরও কয়েকটি আঘাতে দরজাটি প্রায় কেঁপে কেঁপে উঠলো। ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। সামসু, ছোট্টু সবাই মিলে আলমারিটি ঠেলে ধরে রেখেছে। সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দরজাটি বাঁচানোর চেষ্টা করে চলছে।

উপর্যুপরি কয়েকটি আঘাতের পর হটাৎই যেন জিনিসটি একটু বিরাম দিল। উঠোনের এক কোনে গিয়ে আবার বোবাকান্না জুড়ে দিল।
 
ধীরে ধীরে কান্নার শব্দ মিলিয়ে সেখানে এক ধরনের গোঙ্গানির মত গরগর শব্দ তৈরি হতে শুরু করল।

.

রফিক চাচার উঠোনে ভুতুড়ে কিছু একটা চলাফেরা করে বেড়াচ্ছে। উপরে চাদের আধো আলোয় বেড়ার ফাঁক গলিয়ে সেটি সে দেখতে পাচ্ছে। একটি ছায়া তড়িৎ গতিতে উঠোনের এপাশে চলে যাচ্ছে, আবার দৌড়ে ওপাশটায় চলে যাচ্ছে।

রফিক চাচা মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়ছে। তার স্ত্রী খাটের এক পাশে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।

অনবরত অস্থিরভাবে পায়চারি করা ছায়াটি হঠাৎ করেই উঠোনের ঠিক মাঝখানটায় এসে দাড়িয়ে পড়ছে, মুখ দিয়ে এক ধরনের গরগর শব্দ করে চলছে। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ এক জায়গায় স্থির মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে তারপর আবার সেটি অস্থির পায়চারি করতে শুরু করেছে।

ভুতপ্রেত জীবনে দেখার অভিজ্ঞতা তার নেই তা নয় কিন্তু আজকে যা দেখতে পেল তা পেছনের সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। রাফিক চাচা টের পাচ্ছে তার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটি লাফাচ্ছে। তার শরীর কেপে কেপে উঠছে। দৃশ্যটি যেন আর সহ্য করতে পারছে না সে। এবার দ্রুত বিছানার উপর এসে বসে পড়ল সে। তার স্ত্রী ছুটে তার কাছে গিয়ে তাকে পাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগলো। তারপর কলসি থেকে তাকে এক গ্লাস পানি এনে দিল। রফিক চাচার কপাল থেকে দরদর করে ঘাম বেয়ে পরছিল।

খাটের উপর রাখা হারিকেনের ফিতাটি টিমটিমে এক ধরনের হলদে আলো তৈরি করেছে। রফিক চাচা আলোটি নিভাতে দেয়নি। তার বিশ্বাস আগুন আশেপাশে থাকলে ভুত-প্রেত জাতীয় কিছু সামনে আসতে পারে না।

কিছুক্ষণ পরে তার স্ত্রী ছোট ছোট পায়ে বেড়ার ফুটোটির দিকে এগিয়ে গেল। সাহস করে চোখ রাখতেই বেড়ার ফাঁক গলিয়ে যা দেখতে পেল তাতে যারপরনাই অবাক হল সে। অদ্ভুত একটি ছায়া মাটিতে বসে হামাগুড়ি দিচ্ছে। তারপর গড়িয়ে গড়িয়ে উঠোনের এক কোনায় চলে গেছে। এবার একনাগাড়ে হাত দুটি দিয়ে সামনের মাটি খুঁড়তে শুরু করেছে।

.

অনেকক্ষণ কোন সাড়াশব্দ ছিলনা উঠোনে। তারপর হঠাৎ করেই ঘরের পেছনটায় এক ধরনের শব্দ শুনে সেদিকে ছুটে গেল সামসু। তার পেছন পেছন গেল ছোট্টু ও তার স্ত্রী।
কেউ একজন বেড়ার ওপাশ থেকে মাটি খোঁড়ার চেষ্টা করে চলছে। সামসু দ্রুত মাটিতে বসে পড়ে বেড়ায় কান পেতে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করলো। কোন কুকুর বিড়াল নয় সেটি। মানুষ জাতীয় কিছু একটা বসে রয়েছে বাইরে। অনবরত মাটি খুঁড়ে চলছে। ইতিমধ্যেই ছোটখাটো একটা গর্ত তৈরি হয়ে গেছে সেখানে। আবছা চাদের আলোয় কাদামাখা দুটি হাত দেখা যাচ্ছে!

এভাবে খুড়তে থাকলে তো সেটি খুব শীঘ্রই এই গর্ত দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়বে! (চলবে)

RabbY khan, Debasis sorkar, Shamima zakia, Md sabbir, Md babul, Hasan molla, Taniya akter and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

ভাইরাস  - Page 3 Empty Re: ভাইরাস

Fri Jun 04, 2021 5:48 pm
২২|

হাশেমের বিকৃত মুখখানা গর্ত দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। রক্তমাখা, দাঁত কিড়মিড় করা সেই মুখটি দেখে সামসু যেন সাক্ষাৎ মূর্তি বনে গেছে। এতদিনের একসাথে ওঠাবসা করে আসা মানুষটিকে এইরূপে দেখতে হবে সেটা কোনদিন কল্পনাও করেনি সে। এইতো কয়েক সপ্তাহ আগেও তারা টং দোকানে বসে সন্ধার আলাপ জমিয়েছে। নতুন সিনেমা নতুন নায়িকা নিয়ে আড্ডা দিয়েছে। আর আজকে তার এই রূপ! সময় কত দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যায়, বিকৃত হয়ে যায়!

গর্ত দিয়ে হাসেমের শরীরের অর্ধেকটা প্রায় ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। হাত দুটি সামনে বাড়িয়ে সবকিছু ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে।

সামসু বুঝতে পারছে ধীরে ধীরে হাসেম ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। তাকে আটকাতে হলে যা কিছু করার খুব দ্রুতই করতে হবে। কিন্তু সামসুর হাত দুটি যেন বাধা! পা দুটি এক চুলও নড়ছে না। তার প্রিয় বন্ধুটিকে কিভাবে থামাবে সে?

হাসু! জোরে চিৎকার করে উঠল সামসু। যেন হাশেমের কাছ থেকে কোন উত্তর আশা করছে।

হাসেম কোন উত্তর দিল না। শুধু মুখ দিয়ে পশুর মত এক ধরনের ঘরঘর শব্দ করতে লাগল।

কিছুটা বিভ্রান্ত ছোট্টু নিজেও সামসু চাচার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কোনো পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করছে। নিজে থেকে কিছু করার সাহস পাচ্ছে না।
কিন্তু ঘরের সবাই জানে যা কিছুই করার খুব শীঘ্রই করতে হবে। হাশেম ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লে তাকে থামানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
কিন্তু শামসু যে মিলিটারি নয়!

হাশেমের কোমর বেড়ার নিচে আটকে গেছে। তাই সে কিছুটা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। তা না হলে এতক্ষণে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়তো সে।

হাসেম আবার খুড়তে শুরু করল। আরো জোরে খুড়তে শুরু করল। তার হাত দুটি যেন এক ধরনের যন্ত্রের মতো কাজ করছে এবার।

এই ভয়াবহতার মধ্যে সামসু ও ছোট্টুর অলক্ষ্যেই, হঠাৎ শামসুর স্ত্রী মোনা কোথা থেকে একটা মোটা লাঠি যোগাড় করে হাসেমের মুখের উপর সজোরে একটি আঘাত করে বসেছে। তার পরপরই উপুর্যপুরি আরো কয়েকটা আঘাতে হাসেমের নাকটি বসিয়ে দিয়েছে।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় সামসু শুধু ফ্যালফ্যাল করে দেখছে। তারই নাজুক, বোকাসোকা, স্বামীভক্ত বউটি আরেকটি আঘাত করে হাসেমের মুখের এক পাশের দাঁতগুলো ভেঙে দিয়েছে।

হাশেম নামক জন্তুটি এবার পাগল কুকুরের মত অস্থির হয়ে উঠেছে। কুমিরের মতো ডিগবাজি দিতে শুরু করেছে।
মোনা তখনো থামেনি, তার আরেকটি সজোরে আঘাতে এবার হাসেমের একটি চোখ দেবে গিয়েছে।

ছোট্টু ততক্ষনে নিজেকে সামলে নিয়েছে। পাকের ঘর থেকে একটি রুটি বেলার বেলুন, অন্য হাতে একটি খুন্তি নিয়ে এসেছে।

তবে শামসুর বউয়ের শেষ আঘাতটি যেন কাজে লেগেছে। নরপিশাচটি এবার পিছপা হতে শুরু করেছে।

সামসু এর মধ্যে ভকভক করে বমি করে মেঝে ভাসিয়ে দিয়েছে।
হাসেম ইতিমধ্যে সাপের মতো এঁকেবেঁকে নিজের শরীরটা বের করে নিয়ে গেছে। কিন্তু হাসেমের সেই কদর্য মুখখানা এখনো শামসুর চোখের সামনে ভাসছে।

ছোট্টু দৌড়ে গিয়ে ঘরের কোণ থেকে একটি স্টিলের ট্রাংক টেনে গর্তের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সামসুর স্ত্রী তাকে সাহায্য করার জন্য সেদিকে এগিয়ে গেছে।

বমি মুছতে মুছতে কোনরকমে সামসু নিজেকে সামাল দিয়ে তাদের সাহায্য করতে পা বাড়াল।  

ইতিমধ্যে তারা ট্রাংকটি গর্তের মুখে বসিয়ে দিয়েছে। বাইরে হাশেম উন্মাদের মত চিৎকার করে বেড়াচ্ছে। তার চিৎকারে এক ধরনের অশুভ, অপার্থীব সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। কোন নরপিশাচ রেগে গেলে যেমনটা হয়। সামনে তবে আরো ভয়ঙ্কর কিছু অপেক্ষা করছে!

এইটা হাসেম না! একটা রাক্ষস! পরনের কাপড় কোমরে গুজে, পেছনের লম্বা চুলগুলি খোপা করে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে কথাটি বলল শামসুর স্ত্রী।

সামনের এই মেয়েটিকে বড় অচেনা লাগছে আজ সামসুর কাছে। কিছুটা লজ্জিতও সে। মেয়েটির দিকে ঠিক চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। আসলে মানুষের চরিত্র বোঝা বড় দায়। যাকে আজীবন শান্তশিষ্ট, দুর্বল মনের মানুষ মনে হয়েছে, এ যাত্রা সবার জীবন সেই মেয়েটিই বাঁচিয়ে দিয়েছে।

.

রফিক চাচা হারিকেনের আলো আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এবার অনেকটা শব্দ করেই দোয়া দুরুদ পড়তে শুরু করেছে।

হঠাৎ করেই অবয়বটি মাটিতে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ড মূর্তির মত স্থির থেকে তড়িত্গতিতে এদিকেই মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়েছে। অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় সেটির ছোপ ছোপ রক্তমাখা কুঁচকানো চামড়ার চেহারাটি দেখে বুকটা যেন ধক করে উঠলো রফিক চাচার স্ত্রীর। তার মনে হলো এখনই বুঝি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। ঝট করে বেড়ার ফাঁক থেকে চোখ সরিয়ে নিল সে। এক পা দুপা করে কোন রকমে পাটি বিছানো বিছানার উপর এসে বসলো।

আলোটা নিভান! রফিক চাচার উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে বলল সে।
রফিক চাচা তার কথা শুনতে পেল বলে মনে হলো না। সে অনেকটা উচ্চস্বরে বিড়বিড় করে কিছু একটা পড়ে চলছিল।
তার স্ত্রীর চোখেমুখে আতঙ্ক। সে নিচু স্বরে আবারো বলে উঠল, আওয়াজ কইরেন না!

এবার হঠাৎ করেই তার মনে হলো ছায়াটি বোধ হয় আবার উঠোনে ছুটাছুটি শুরু করে দিয়েছে। সেটির পায়ের শব্দ আরো বেড়ে গেছে। কেন যেন মনে হচ্ছে সেটি ঘরটার কাছাকাছি এগিয়ে আসছে।

সামনের চুলগুলি সাদা হয়ে আসা পেটের পীড়ায় ভোগা বয়স্কা মানুষটির হৃদযন্ত্র যেন এবার বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। সে কোনরকমে রফিক চাচার দিকে এগিয়ে যায় তার কাধ ধরে একটা ঝাঁকি দেয়। কিন্তু রফিক চাচার কোন সৎবিৎ ফেরে না। যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে সে। তার গলার স্বর আরও বেড়ে গেছে।

ঠিক তার পরমুহূর্তেই পশ্চিমের বেড়ার উপর সজোরে কিছু একটা আছড়ে পরল। রফিক চাচার স্ত্রীর পুরো শরীর যেন এবার একটা ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। তার পরপরই শরীর এলিয়ে বিছানার উপর পড়ে গেল সে। সম্ভবত মূর্ছা গেল।

রফিক চাচা আরও উচ্চস্বরে দোয়া দুরুদ পড়তে শুরু করল। হারিকেনের আলো বাড়িয়ে দিল। নিজে নিজে বলল আগুনের সামনে ভুত-প্রেত আসতে পারবে না।

তারপর উঠে খাটের অপর পাশে তার স্ত্রীর কাছে এগিয়ে গেল। কয়েকবার তার নাম ধরে ডাকলো। কাধে ধরে নাড়া দিল কিন্তু কোন সারা শব্দ মিলল না। অজানা আশঙ্কায় তার বুকটা ভারী হয়ে আসলো।

এরপরই বেড়ার উপর আরেকটা আঘাত। অবয়বটি তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল এখন। সেটি জানে ঘরের ভিতরে কিছু রয়েছে। তাই ভেতরে ঢোকার জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছে। ঘরের এপাশের বেড়ায় কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করে, এবার সেটি দরজার কাছে চলে গেছে।

সজোরে দরজার উপর ধাক্কা দিতে শুরু করল। দরজার খিলটি নড়ে নড়ে উঠল। রফিক চাচা স্থির দাঁড়িয়ে একমনে দোয়া দুরুদ পড়েই চলছিল। হারিকেনটা তার এক হাতে বুকের কাছে ধরে রাখা। পাগুলি রীতিমত ঠকঠক করে কাঁপছে।

নাছোড়বান্দার মতো এলোপাতাড়িভাবে দরজার উপর আঘাতের এক পর্যায়ে দরজাসহ অবয়বটি ঘরের ভেতর আছড়ে পড়ে। রফিক চাচা পাটি বিছানো খাটের উপর উপুড় হয়ে পড়ে যায়। তার হাতে থাকা হারিকেনটি খাটের উপর পড়ে গেলে সেটির কাচ ভেঙে চুইয়ে চুইয়ে তেল পড়তে থাকে।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পাটির উপর আগুন ধরে যায়। রফিক চাচা সৎবিৎ ফিরে পেতেই কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে ঘরের এক কোণে বেড়ার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ে। জন্তুটি ইতিমধ্যে লাফিয়ে তার স্ত্রীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তার ছিন্নভিন্ন দেহটা গোগ্রাসে গিলে চলছে। খাট চুইয়ে চুইয়ে মেঝেতে রক্ত ছড়িয়ে পড়ছে। সেটি দেখে মুখ থেকে এক ধরনের বোবা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে তার। মুখে হাত দিয়ে চাপা কান্নায় কুঁকড়ে ওঠে সে।

এদিকে আগুন আরো ছড়িয়ে পড়েছে। খাটের পাশে থাকা আসবাবগুলির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রফিক চাচা ঘর থেকে বেরোনোর জন্য হামাগুড়ি দিতে শুরু করল। ধীরে ধীরে নিজেকে টেনে হিচড়ে দরজার দিকে নিয়ে যেতে থাকল। জন্তুটি একবার রফিক চাচাকে খেয়াল করল কিন্তু পরমুহুর্তে ঘাড় ঘুরিয়ে তার স্ত্রীকে খেতে ব্যাস্ত হয়ে পরলো।

কোনরকমে ঘর থেকে বেরিয়ে উঠে দাড়াল সে। ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে উঠোনের এক কোনে গিয়ে থামল। তারপর হাঁটুতে ভর করে কুঁজো হয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো। এরমধ্যে ঘরের চারপাশ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

হঠাৎ করেই তাল গাছের পাতায় তৈরি বিশাল ভারী চালাটি হুড়মুড় করে মেঝের উপর ভেঙে পড়ে। ব্যাপারটি এত দ্রুত ঘটে যায় যে রফিক চাচা নিজেও ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারে না।

পরমুহূর্তেই ঘরের ভেতর থেকে জন্তুটির এক ধরনের  আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসতে থাকে। আর এক মুহূর্ত দেরি করলে রফিক চাচা নিজেও সেটির নিচে চাপা পড়তো।

জন্তুটি বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেটির মুখ থেকে গরগর শব্দ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। রফিক চাচার কাছে মনে হল অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে। জন্তুটি ঘরের চালার নিচে আটকে পড়েছে। আগুন ইতিমধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেটির বাইরে বেরিয়ে আসার কোনো পথ সে দেখছে না।

স্ত্রীর জন্য আপন মনে তার চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। অপরাধীর মতো মাথা নাড়তে নাড়তে নিজেকে এক রকম টেনে রাস্তার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল সে।

.

সবুর দেওয়ানের বাড়িতে এই শেষ রাতেও বৈঠক চলছে।
শফিক লাঠিয়াল হঠাৎ করেই গলা হাঁকিয়ে বলে উঠলো, কাইল সক্কালে আমরা কালামের বাড়ি যামু। কালামের পরিবার এই সবকিছুর সাথে জড়িত থাকবার পারে। এইটা আমাদের খুঁইজে বার করতে হইবে।

সবুর দেওয়ান শফিকের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। বলল, শফিক ঠিকই বলছে। তোমরা যারা যারা এই পাগল লোকগুলোরে দেখছো, তারা সকলে দিনের বেলায় তাদের খুঁজে বার করার চেষ্টা করো। তাদের বাড়ি যাও, কেউ কাউরে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলে আমারে জানাও। দরকার হইলে আমরা আরো কঠোর হইব। সার্বিক স্বার্থে! গেরামের স্বার্থে!

হয়! হয়! বলে পেছন থেকে এক ধরনের রব উঠলো। সবাই সবুর দেওয়ানের নতুন সিদ্ধান্তে একাগ্রতা প্রকাশ করল।

(চলবে)

RabbY khan, Debasis sorkar, Taniya akter, Angel riya, Md ovi, Md najmul hosen, Aliya Chowdhury and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

ভাইরাস  - Page 3 Empty Re: ভাইরাস

Fri Jun 04, 2021 5:49 pm
২৩।

হাশেম আরো কয়েকবার বেড়ার উপর ধাক্কাধাক্কি করে একটা পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে। উঠোনের এক কোনে গিয়ে কুকুরের মতো কেউ কেউ শব্দ তুলে কাঁদতে শুরু করেছে। অশুভ সেই কান্নার শব্দ চারপাশ ভারী করে তুলেছে।

এ যেন হাসেম নয়, ভয়াবহ অসুস্থ এক পৃথিবীর মায়া কান্না। বিষাক্ত ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত সেই পৃথিবী।

একটা সময় ধীরে ধীরে কান্নার শব্দ উঠোন থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে। তারপর একসময় মিলিয়ে যায়।
ছোট্ট ভয়ে ভয়ে বেড়ার দিকে এগিয়ে যায়। চোখ বাড়িয়ে বেড়ার ফাঁকে একবার বাইরে তাকায়। তার শরীর তখনও সামান্য কাঁপছিল।

বাইরে অল্প অল্প সূর্যের আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে, যদিও বিভীষিকাময় ভয়াল রাতের আঁধার তখনও কাটেনি। অন্ধকারে চারপাশ ছেয়ে আছে।

সামসু ঘরের এক কোনে বসে বাশের সাথে একটি ধারালো দা বেধে চলছে। তার স্ত্রী খুন্তি বটি জোগাড় করে নিয়ে এসেছে।

.

ভোরের আলো ফুটে উঠতেই সবুর দেওয়ান শফিক বাহিনীকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। সর্বপ্রথম কালামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করেছে।

ঝলমলে সকালের আলোয় চারপাশটা দেখে মনে হয় না রাতে কি ভয়ঙ্কর বিভীষিকা চলে এই গ্রামটায়।
শরতের হালকা বাতাসে রাস্তার দু পাশের ধানিজমিগুলির উপর ঢেউ খেলে যাচ্ছে। দুই একটা বক পাখি মাছ শিকারে ক্ষেতের মধ্যে ঘোরাঘুরি করছে। এক মুহূর্তের জন্য সবুর দেওয়ানের কাছে মনে হয় পৃথিবীটা এখনও সুন্দরই আছে। ভেতর থেকে ধুঁকে চলা এই পৃথিবীকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

কালাম! বাড়ি আছোনি? শফিক তার বাজখাঁই গলায় হাক ছাড়ে। সবুর উঠানের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে শফিকের লাঠিয়াল বাহিনী।

ভেতর থেকে কোন রকম সাড়া শব্দ আসে না। শফিক হাতের লাঠিটি শক্ত করে ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ঘরের ভেতর থেকে খট করে খিল খোলার শব্দ ভেসে আসে। সবাই তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখ দরজার দিকে, হাতে শক্ত করে ধরা লাঠি।

ধীরে ধীরে ক্যাঁচক্যাচ শব্দ তুলে কাঠের দরজার কপাট দুটি খুলে যায়। ভেতর থেকে মাথায় গামছা মোড়ানো একটি অবয়ব ধীরে পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

সবুর মাথা নিচু করে দরজার দিকে তাকায়। ছায়ার আড়ালে চেহারাটি বুঝতে চেষ্টা করে।
লোকটি আর কেউ নয়, কালামের বড় ভাই মিলিটারি।

আমরা কালামরে খুঁজতে আসছি। কালাম কই? সবুর জিজ্ঞেস করে।

কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে অবয়বটি। কোন জবাব দেয় না। জবাব না পেয়ে শফিক তার লাঠিটি শক্ত করে ধরে সামনে কয়েক পা সামনে এগিয়ে যায়। পেছন ফিরে একবার সবুর দেওয়ানের দিকে তাকায়। সবুর দেওয়ান তখনও স্থির মিলিটারির দিকে তাকিয়ে আছে।
কোনরকম জবাব না পেয়ে মনে মনে কিছু একটার জন্য প্রস্তুতি নেয় শফিক।

.

সারা রাত হন্তদন্ত হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে রফিক চাচা। কোথাও আশ্রয় পায়নি। গ্রামের বেশিরভাগ ঘরগুলি বাইরে থেকে তালা দেওয়া। দু-একটা বাড়িতে মানুষ থাকলেও কেউ দরজা খোলেনি।

ক্লান্তি ভরা শরীর নিয়ে কখন যে একটি গাছের সাথে পিঠ এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই তার। চোখ মেলে দেখে ভোরের আলো ঝলমল করছে। গাছের উপর পাখপাখালি কিচিরমিচির করে চলছে।

সে ঝট করে মাটিতে বসে পড়ে। আশে পাশে, গাছের পেছনে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করে। চারপাশটা শুন্য, নিরব। আশে পাশে কেউ নেই।

কিছুটা দূরে তার বাড়িটা পুড়ে ছারখার। সে দিকে তাকাতেই মনে পড়ে তার স্ত্রী আর বেঁচে নেই। বুকের ভেতর থেকে চাপা কান্না বেরিয়ে আসে তার।

হাতে মুখ চেপে বৃদ্ধ শরীরটাকে নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। মনে মনে কিছু একটা ভাবে। তারপর আকবর মেম্বারের বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।

.

সকাল হয়ে পড়েছে। সামসু ভয়ে ভয়ে ঘরের দরজা সামান্য খুলে ফেলে। মাথা বাড়িয়ে সামনে বাড়ির উঠোনে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করে।
তারপর ছোট্টু ও তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ঠোটের উপর তর্জনী রেখে তাদের চুপ থাকার নির্দেশ দেয়।
দরজার ফাঁক গলিয়ে নিশব্দে শরীরটাকে বাইরে বের করে নেয়। তারপর ছোট ছোট পায়ে ঘরের পেছনের দিকে হাঁটা দেয়।

আশেপাশে কোন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাইরে মৃদু বাতাস বয়ে চলছে। গাছের উপর পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। পেছনের ধানী জমিগুলি দিয়ে দূর-দূরান্তে তাকালেও কোন কিছু চোখে পড়লো না তার।

উঠোনে আসতেই এক কোনায় একটি গর্ত দেখতে পায় সামসু। গর্তটা রাতে আঁধারে হাসেম খুড়েছে। অগভীর গর্তটির ভেতরে কিছু নেই। ফাঁকা!

.

চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে মিলিটারি। সবুর দেওয়ান আবার জিজ্ঞেস করে, কি হইছে তোমার, মিয়া?

কালাম তার বউরে নিয়া শশুর বাড়ি চইলা গেছে। এবার মুখ খোলে মিলিটারি।

কবে গেছে?

এই গতকাইল ... মিলিটারি কন্ঠে আরষ্টতা।

তুমি ঠিক আছো তো?

গামছা দিয়ে চেহারাটা একটু ঢাকার চেষ্টা করে জবাব দেয় মিলিটারি, হয়, ভাইজান।

শফিক লাঠিয়াল সবুরের দিকে একবার তাকায়। সবুরের চেহারায় এক ধরনের অবিশ্বাসের ছাপ।

ঐ কোনায় গিয়া খারাইছো কেন? বাইরে আইসা দাড়াও। ধমকের সুরে বলে শফিক।

মিলিটারি কোন জবাব দেয় না। দরজার সামনে থেকে একচুল নড়েও না। তাকে দেখে কিছুটা দুর্বল, ভারসাম্যহীন মনে হচ্ছিল।

সবুর আকাশের দিকে একবার তাকায়। সূর্য ঝলমল করছে চারপাশে। সূর্যের আলোয় গা পুড়ে যাচ্ছে।

কেন যেন সবুরের কাছে মনে হয়, মিলিটারি এই আলো থেকে বাঁচার জন্য মুখ ঢাকার চেষ্টা করছে।

কালাম কই? সত্যি কইরা বল? এবার শফিক হাক ছাড়ে। শফিকের বাজখাই গলার স্বরেও একচুল নড়ে না মিলিটারি।

কিছু একটা গন্ডগোল আছে। সবার তা বোঝা হয়ে গেছে।

এবার শফিক তাঁর হাতের মোটা বাশটি সামনে বাড়িয়ে মিলিটারির শরীরের উপর একরকম গুতো দেয়ার জন্য চালিয়ে দেয়। গুতো খেয়ে মিলিটারি কয়েক পা পেছনে সরে যায়। কিন্তু তার মুখ থেকে কোন ধরনের শব্দ বের হয় না। পেছন থেকে শফিকের কয়েকটি সাঙ্গোপাঙ্গ সামনে এগিয়ে আসে। একরকম আঘাত করার ভঙ্গি নিয়ে মিলিটারির দিকে তাদের হাতে ধরা বাশগুলি তাক করে। তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে।

একটা সাঙ্গ মিলিটারি উপর আঘাত করতে গেলে সবুর দেওয়ান চেঁচিয়ে ওঠে, বলে, থাম তোরা!

শফিক কিছুটা বিস্ময় নিয়ে সবুর দেওয়ানের দিকে তাকায়।

মানুষটা তো কথা কইল এইমাত্র। শফিকের উদ্দেশ্যে বলল সবুর। অন্য কিছুও তো হইবার পারে!

কিন্তু...

শফিক কিছু একটা বলতে গেলে সবুর তাকে আবার থামিয়ে দিল। বললো, আমরা দেশ, দশের উপকার করতে বাইর হইছি। মানুষ খুন করতে নয়! ওরে ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢোকা।

তারপর?

দরজার পেছন দিয়ে তালা দিয়ে দে!

কি কন মিয়া ভাই? শফিক ভীষণ অবাক। আপনে বুঝতাছেন না? এইটারে ছাইড়া দিলে তো আমরার রাইতের ঘুম তো হারাম হইয়ে যাইবে!

ছেড়ে দিলাম কে বলল? প্রত্যেক বেলায় তোরা আইসে দেখে যাবি। কোন সমস্যা মনে হইলে ব্যবস্থা নিবি। সবুর উত্তর দিল।

সাথে সাথে মাথা ঘুরিয়ে নিল শফিক। কিছু একটা মনে মনে ভাবল। তারপর ছোট্ট একটা মুচকি হাসির রেখা তার চেহারায় খেলে গেল। (চলবে)

RabbY khan, Debasis sorkar, Md sabbir, Imrose nabila, Hasan molla, Taniya akter, Tanjid khan and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

ভাইরাস  - Page 3 Empty Re: ভাইরাস

Wed Jun 09, 2021 8:54 pm
২৪|

কড়া দুপুর বাইরে। কটকটে রোদে দো-চালা ঘরের টিনের চাল ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। এদিকে বেলা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে মিলিটারির অস্থিরতাও ক্রমেই বেড়ে চলছে। মুখ দিয়ে হিংস্র গরগর শব্দ বের হচ্ছে। অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে তার কোটরাগত লাল হিংস্র চাহনি কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। মিলিটারির তামাটে চেহারাটা দাড়ি-গোঁফে ভরে গেছে। উস্কোখুস্কো চুলগুলি ঘাড় অবধি নেমে এসেছে।

শরীরে জড়ানো জরাজীর্ণ শার্টটি তার এক পাশ থেকে ছিঁড়ে ঝুলে পড়েছে। পেটা তামাটে শরীরে বুকের পেশী গুলি দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে। শিরাগুলো ফুলে ফুলে উঠছে।

চোখ দুটি বন্ধ করে অনবরত সামনে-পেছনে মাথা ঝাকাতে থাকে মিলিটারি। যেন তীব্র ব্যথায় তার মাথার ভেতরটা ছিড়ে ভুরে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই তার শরীর প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। যেন এক প্রকার খিঁচুনি হচ্ছে। একটা পর্যায়ে মিলিটারি খাটের একপাশে নিজের শরীর টেনে নিয়ে বাকানোর চেষ্টা করতে থাকে। ঠিক যেমন করে কুমিরের মতো পাক খেতে শুরু করেছিল রহিম বক্স এর শরীর। হাত পা ছুড়তে ছুড়তে এক সময় হাতের বাধন কিছুটা আগলা করে ফেলে সে। আরো কিছুক্ষন ধস্তা-ধস্তির পরে মুখ দিয়ে ধরি কামড়ানোর চেষ্টা শুরু করে মিলিটারি।

এদিকে কেউ বা কারা উঠনে এসে ভীড় করেছে। মাটিতে বাশের ঠুক ঠাক শব্দ উঠানে শোনা যাচ্ছে। নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার তোড়জোড় এবার যেন আরো বাড়িয়ে দিল মিলিটারি।
শিগগিরই দরজার ওপাশে মনুষ্য উপস্থিতি টের পাওয়া গেল। বিড়বিড় করে চলা কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ করেই বাইরে শফিকের বাজখাই গলা শোনা গেল, শালাকে এক বারিতে খতম করবি। খবরদার বারিটা যেন মাথার উপরই হয়। শফিক কারো উপর চিত্কার করে আদেশ করল। মিলিটারি ততক্ষনে তার এক হাত ছাড়িয়ে নিয়েছে। অন্য হাতটাও ছাড়িয়ে ফেলেছে প্রায়।


শফিকের সাথে থাকা লম্বা করে সাঙ্গটা দরজার তালা খুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তার সাথে বেঁটেখাটো স্বাস্থবান পাংগোটি বাশ নিয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুখে পান চিবোতে চিবোতে এক পর্যায়ে সাঙ্গকে এক দিকে ঠেলা দিয়ে চাবিটি হাতে নেয় সে। চাবিটা তালার ভেতরে ঢুকিয়ে ডানে আলতো করে চাপ দেয়। কট শব্দ করে তালাটা খুলে যায়।
লম্বু মানুষের বুদ্ধি থাকে হাঁটুতে। এখন খুলল কেমনে? সগর্বে কথাটি বলতে বলতে দরজার কপাট খুলল পাঙ্গ। ভেতরে ঢুকতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তেই, 'হই' শব্দ করে তার উপড় ঝাপিয়ে পড়ে মিলিটারি? হাতের বাশটি একপাশে ছিটকে পড়ে যায় লোকটির। মিলিটারির হাতে একটা শক্ত কাঠের পীড়ে ছিল। সেটি দিয়ে চোখ মুখ বন্ধ করে ধুমধাম বেদম পিটুনি দিতে থাকে সে। পাঙ্গ ইতিমধ্যে মাটিতে ধরাশায়ী। এর মধ্যে একটা বাড়ি মাথায় গিয়ে লাগতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সে। সাঙ্গ ততক্ষণে দৌড়ে বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে। মিলিটারি এক লাফে উঠে দরজার পেছনে ঘরের বেড়ার সাথে সিঁটকে যায়। সাঙ্গ কাঁপতে কাঁপতে শফিকের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। শফিক বিরক্তির চেহারা নিয়ে তাকে মারতে উদ্যত হলে, দুই হাত জুরে কাচুমাচু করে মাটিতে বসে পরে সে। শফিক এবার দরজার দিকে মুখ করে গলা বাড়িয়ে চিৎকার করে বলে, বাইরে আয়, মিলিটারি! সাহস থাকলে বাইরে আয়!


দোতলা ঘরের দরজার সামনে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে পাংগোর স্থুল দেহটি। মিলিটারি ঘরের ভেতরে গা ঢাকা দিয়ে আছে। দরজাটা হা করে খোলা। ভেতরটা কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন।
শফিক আবার বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, বাইরে আয় গোলামের পো!
তারপর সাঙ্গর দিকে একবার কটমট চোখে তাকায় সে। শফিকের চোখের ভাষা বুঝতে পেরে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায় তার। এবার লাঠিটা ফেলে এক পা দু পা করে পিছিয়ে যায় সে। তারপর শফিকের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে পেছনে ফিরে দেয় এক দৌড়। আর কোন তাকা তাকি নেই। সে আর এই মুখ হবে না। তার ওস্তাদ যাই বলুক না কেন, নিজের জীবন বিপন্ন করে এই রাক্ষসের মুখোমুখি হবে না সে।

সাঙ্গর তড়িঘড়ি দৌড়ানো দেখে চরম সীমানায় পৌঁছায় শফিকের রাগ। দাঁত চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার। কিড়মিড় করতে থাকে যেন এখনই ক্ষয়ে যাবে। তারপর দরজার দিকে ফিরে রাগে ক্ষোভে বাশটি একবার মাটিতে ঠুকে দেয়। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর এক পা সামনে বাড়াতে গিয়েও কি একটা ভেবে পা-টা ফিরিয়ে নেয়।

তারপর কটমট করতে করতে নিরাপদ দূরে দাঁড়িয়ে গলা হাকিয়ে চিৎকার করে বলে, তুই বাইর হবিনা? ঠিক আছে! আইতাছি আমি আগুন লইয়া। সব জায়গায় আগুন দিমু আজকে। তোরে আগুনে পুড়ায় মারমু।

মাথার ছোট ছোট চুল গুলির উপর একবার হাত বুলিয়ে পেছনে ফেললো শফিক। তারপর লুঙ্গিটা আধা কাঁচা দিয়ে দ্রুতপায়ে উঠান ছেড়ে আইলে নেমে পড়ল। শফিক জানে মিলিটারি এই প্রখর রোদে ঘর থেকে বাইরে বের হতে পারবে না।

চলবে।

RabbY khan, Debasis sorkar, Md babul, Md jahid, Sajib ahsan, Priya halder, Arjju khan and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

ভাইরাস  - Page 3 Empty Re: ভাইরাস

Mon Jun 14, 2021 3:10 am
২৫|

সারা সকাল দুপুর বাইরে কোনো কিছুর সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। সামসু এরমধ্যে উঠোন থেকে কয়েকবার চক্কর দিয়ে এসেছে। সন্তর্পনে বাড়ির এপাশ ওপাশ ঘুরে দেখেছে। কিন্তু আশেপাশে কোন কিছুর দেখা মেলেনি। না, কোন জন্তু জানোয়ার না পাখপাখালি। কিছুই নেই। যেন দূরদূরান্ত জনমানব শূন্য খা খা মরুভূমি। প্রকৃতি যেন এখানে কিছু একটার আভাস দিচ্ছে। এই নিস্তব্ধ নীরবতা যেন স্বাভাবিক নয়। কিছু একটা ঘটে গেছে এখানে। বড়ই অস্বাভাবিক কিছু একটা। আর সেটারই পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে। প্রকৃতির এই ভাষা এক অশনী সংকেত দিয়ে যাচ্ছে।
সামসু কিছুতেই কিছু ভেবে পাচ্ছেনা। তার মাথা আর কাজ করছে না। হাসেমকে নিয়ে চিন্তিত সে। কি হলো তার? ভোরের আলোর সাথে সাথে হাশেমের হিংস্রতাও গায়েব হয়ে গেল। সকাল থেকে আর তার দেখা মেলেনি। একদমই লাপাত্তা। এর মধ্যে কয়েকবারই ঘরের বাইরে এসেছে সামসু। উঠোনের এক কোনায় একটি গর্ত ছাড়া হাশিমের আর কোন চিহ্ন নেই।

সামসু আবার একবার উঠে যায়। ঘরের জানালাগুলির ফাঁকফোকর দিয়ে অস্থির মনে আবার বাইরে তাকায়। এইদিক ঐদিক সবদিকে তার গোয়েন্দা চক্ষু বসায়।
"আশেপাশে কেউ নেই, মোনা।" দ্বিধান্বিত গলায় একটু নিরভার গলায় কথাটি বলল সামসু। মোনা তার কথার কোন উত্তর দেয় না। কাঠের চোকির এক কোনে চুপ মেরে বসে থাকে। সেই সকাল থেকেই এভাবে বসে আছে সে। যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন। এক মনে কিছু একটা ভেবে চলছে। ছোট্টু মোনার চোখের দিকে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করছে। যেন তার মুখ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা শুনতে যাচ্ছে। একপর্যায়ে মুখ খুলল মোনা। বলল, আমাদেরকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।
যদি বাইরে ওইগুলো আরো থাইকা থাকে। প্রায় সাথে সাথেই কাঁপা কাঁপা গলায় কথাটি বলল ছোট্টু।
হুম তা তো থাকবার পারে। চিন্তিত ভঙ্গিতে উত্তর দিল সামসু।
কিন্তু সকাল থেকে তো কেউ কিছু দেখবার পারলাম না। মোনার দৃঢ় কণ্ঠ।
সেটাই ভাবতেছি। হাশিমও লাপাত্তা। আপন-মনে বিড়বিড় করল সামসু।
ছোট্টু কিছু একটা ভেবে চোখ দুটি বন্ধ করে ফেলে। তারপর তাদের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করে, শামসু চাচা, এই লাশগুলা বেশিরভাগ সময় রাইতের বেলাই বাইর হয়। চোখ খুলে ছোট্ট। তার চোখগুলি যেন ভয়ানক কিছু একটা আচ করতে পারছে। বাজানেরে রাইতের বেলাতেই ধরছিল। বলতে থাকে সে, যেদিন মিলিটারি চাচার সাথে কালাম চাচার মারামারি হয়, সেদিনও রাইতের বেলায়ই ঘটে ঘটনাটা। আমার মনে হয় রাইতের সাথে এগুলোর কিছু একটা সম্পর্ক আছে।
সামসু ছোটুর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। বয়সে ছোট হলেও তার কথাগুলো একদম ফেলনা নয়। তাছাড়া অনেক ঘটনার সাক্ষী সে।

সূর্য ডোবার আগে এই গ্রামছাড়া হওয়া উচিত আমাগোর। মোনা বলল। তার এবারের কথাটিতে আগের চেয়ে একটু বেশি জোর ছিল।
হুম, আমিও সেটা ভাবতেছি। শান্ত গলায় বলল সামসু। কিন্তু যামু তো কই যামু? পাশের গ্রামেও যদি একই অবস্থা হয়। তাছাড়া রাইত নামার আগে যদি নিরাপদ কোথাও আশ্রয় নিতে না পারি।
সামসু ভীত-সন্ত্রস্ত। সে আসলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। তার কাছে একবার মনে হয় এখানে থাকাটাই নিরাপদ, পরক্ষণেই আবার ভাবে যদি হাশেম রাতের বেলায় আবার ফিরে আসে! হাসেম তো তাদের অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। সত্যি সত্যি যদি সে দিনের বেলায় কোথায় গা ঢাকা দিয়ে থাকে। ওৎ পেতে থাকে রাতের অপেক্ষায়। কিন্তু সামসুকে তো একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তার দিকেই তাকিয়ে বাকি দুজন।

সামসু ছোট্টুর দিকে তাকায়। কিছু একটা ভাবে। তারপর মোনার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে, আমরা আইজি এই গ্রাম ছাইড়া চাইলা যামু। কথাটি শুনে মাথা নাড়ে মোনা। ছোট্ট শামসুর দিকে তাক ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে থাকে।
চলবে।

Shamima zakia, Md sabbir, Imrose nabila, Md babul, Taniya akter, Md jahid, Tanjid khan and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

ভাইরাস  - Page 3 Empty Re: ভাইরাস

Wed Jul 14, 2021 11:01 pm
ভাইরাস

২৬|
এখন ভর দুপুর। সারাটা সকাল কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি বাইরে। চারিপাশটা নিরব নিস্তব্ধ। নেই কোন মানুষের আনাগোনা, পাখপাখালির কিচিরমিচির বা গরু ছাগলের হাক ডাক। দুপুরের খা খা রোদে সামনে উঠোনের মাটি ফেটে চৌচির।
সকাল থেকেই ঘরের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে ছিল সামসু। বেড়ার ওপাশ এপাশ থেকে ফাক ফোকর গলিয়ে বাইরের নজর রাখছে ছোট্টু। মোনা এরমধ্যে হাতে বটি নিয়ে কয়েকবার বাড়ির আশেপাশে ঢু মেরে এসেছে। দূর-দূরান্তে কাকপক্ষীও চোখে পড়েনি তার। ভোর থেকে একরকম লাপাত্তা হাশেম। কেউ ভেবে পাচ্ছেনা কোথায় গেল সে? শুধু উঠোনে জন্তু-জানোয়ারের খোড়া দেখতে কয়েকটা গর্ত ছাড়া হাশেমের আর কোন চিহ্ন নেই।

বাইরে কেউ নাই, চাচা। দরজার দুই কপাটের ফাঁক দিয়ে চোখ বুলিয়ে বলল ছোট্টু। কি করবা? শামসুর উদ্দেশ্যে বলল সে।
শামসু গভীর মনোযোগে কিছু একটা ভেবে চলছে। অন্যদিকে মোনা একদম চুপ, মুখে কোনও রা নেই। ছোট্টু তাদের দুজনের উপর থেকে চোখ সরিয়ে আরেকবার তাকালো বাইরে। তারপর নির্বিকার ভঙ্গিতে চৌকির উপর এসে বসল সে।
আমাদের কিছু একটা করা উচিত। কথাটি বলে এক রাশ বুকে আশা নিয়ে মোনার দিকে তাকাল ছোট্টু। যেন এই মুহূর্তে মোনাই কোন একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

আমাদের এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত? ছোটুর মনোযোগ কেড়ে গম্ভীর গলায় কথাটি বলল সামসু।

যদি বাইরে ওইগুলা আরো থাইকা থাকে। এবার নীরবতা ভাঙলো মোনা।
হুম তা থাকবার পারে। একটু ভেবে মাথা ঝাকাল সামসু। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল সে আবার।

আমি ভেবে পাচ্ছিনা হাশেম গেল টা কই? গলায় উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল মোনা।

পরের কয়েক মুহূর্ত কেউ কিছু বলল না।
হঠাৎ চট করে কিছু একটা ভেবে ছোট্টু বলে বসল, শামসু চাচা, এইগুলারে কখনো দিনের বেলায় দেখি নাই। তুমি কি ব্যাপারটা খেয়াল করছো? সামসু চুপ করে রয়েছে। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। ছোট্টু বলে চলল, বাজানেরে রাইতে ধরছিল। মাঝ রাইতে কামড় খেয়ে বাড়ি আসছিল। একটু থেমে একবার দম নিয়ে বলল, আর সেই দিন আমরার বাড়িতে কালাম চাচাও রাইতের বেলাতেই দারজার আঘাত করেছিল।
রাইতের সাথে এগুলোর কোনো একটা সম্পর্ক আছে। চট করে কথাটি বলল মোনা। সামসুও মাথা ঝাকালো। ছোটুর কথাটা একদম ফেলনা নয়। তাছাড়া অনেক ঘটনার সাক্ষীও বটে সে। তার কথাতে গুরুত্ব না দিয়ে পারছে না।

আমাদের কি গ্রাম ছাইড়া চইলা যাওয়া উচিত। শামসুর দিকে তাকিয়ে বললো মোনা। তার গলায় এক ধরনের কাঠিন্য।

হুম, আমি ভাবতেছি। শান্ত গলায় বলল সামসু, কিন্তু যামু তো যামু, কই বা যামু? পাশের গ্রামেও যদি একই অবস্থা হয়! আর তাছাড়া আমরা যদি মাঝপথে আটকায় পরি। পথে রাইত নাইমা যায়! বলতে বলতে চোখেমুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল শামসুর।

আমারার যা করার দিনের বেলাতেই করতে হইবো। দৃঢ় গলায় বলল ছোট্ট। মানুষটা ছোট হলেও কন্ঠে যেন এক ধরনের পরিপক্কতা চলে এসেছে তার, রাইতে এইগুলার আনাগোনা নিশ্চয়ই বাইড়া যায়।

শামসুর চোখেমুখে তখনো আতঙ্ক। আসলে সবাই যে তার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে আছে। নির্ণয় যে তাকেই নিতে হবে!
রাতের সাথে এগুলোর একটা সম্পর্ক আছে। এই ব্যাপারে এখন নিশ্চিত সে। কোনভাবেই রাতে বাইরে বের হওয়া যাবে না। এটাও বোঝা যাচ্ছে রাতের চেয়ে দিনের বেলা কিছুটা হলেও নিরাপদ। তাই যা করার দিনের বেলাতেই করতে হবে।
তাছাড়া হাশেম তাদেরকে ছেড়ে চলে গেলেও যদি প্রতিশোধের নেশায় রাতে আবার ফিরে আসে! এমন তো হতে পারে এখন কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে সে। বাইরে বের হলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু তারপরেও রাতের চেয়ে দিনের বেলায় তার মোকাবেলা করা তুলনামূলক সহজই হবে।
তবুও শামসুর মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। একবার মনে হয় এখানে লুকিয়ে থাকাটাই নিরাপদ। পরক্ষণেই আবার ভাবে যদি সত্যি সত্যিই রাতে হাসেম চলে আসে। বা আরো কয়েকটা লাশ সাথে করে নিয়ে আসে, ঠিক যেমনটা কালাম করেছিল। হাসেম তো তাদের অবস্থান সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল। আর তাছাড়া এই জন্তুগুলি হিংস্র জানোয়ারের মতো হলেও একদম বুদ্ধিহীন নয়। হয়তোবা স্মরণশক্তিও ভালো। ছোট্টুর কথার বিবরণে তার কাছে তাই মনে হয়েছে। রহিম বক্স এর বাড়িতে কালাম একা আক্রমণ করেনি। সাথে করে আরো একটিকে নিয়ে এসেছিল। সামসু ঝট করে ডানে বামে একবার মাথা ঝাকায়। তারপর বলে উঠে, আমরা এই গ্রাম ছাইড়া চইলা যামু! কাপুরুষের মত এইভাবে বইসে থাকলে বাচবার পারুম না। আমাদের শক্ত পদক্ষেপ নিতেই হইবে।

ছোট্টু ও মনা কয়েক মুহূর্ত নিরব হয়ে রইল। শামসু ওদের চোখের দিকে একবার করে তাকালো। তাদের এই নিরবতা যে সম্মতির লক্ষণ।

চলবে।


Last edited by M A Nayeem on Sat Jul 17, 2021 12:40 am; edited 1 time in total

Afifa Mahmud, Arjju khan, Sabbir hosen sumon, Sohag hasan abir, Anik hossain, Sikdar rahat, Jannat islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

ভাইরাস  - Page 3 Empty Re: ভাইরাস

Thu Jul 15, 2021 11:56 pm
ভাইরাস
২৭|

মিলিটারির গা-হাত-পা ক্ষনে ক্ষনে কেপে কেপে উঠছিল। বলা যায় এক ধরনের ঝাকুনি দিচ্ছিল। নিজেকে সে কোনভাবেই সামাল দিতে পারছিল না। মিলিটারি জানে যত শীঘ্রই সম্ভব তাকে এখান থেকে পালাতে হবে। শফিক চলে এলো বলে!
শফিকের হাতে কোনওভাবে ধরা পড়তে চায় না মিলিটারি। তার বিশ্বাস সে সুস্থ হয়ে উঠবে। ওই রকম কোন কিছুতে পরিনত হবে না। এই ব্যাপারটি সে শুরু থেকেই মনে প্রানে বিশ্বাস করে এসেছে। তাই কোনভাবেই শফিকের কাছে ধরা পড়া যাবে না।
রান্নাঘর থেকে একটা ধারালো ছোড়া এনে রেখেছে সে। আজ রাতেই একটা ফয়সালা হয়ে যাবে। যদি তিল পরিমাণ অন্য ধরনের কোন পরিনতি শুরু হয়, তবে সাথে সাথেই ধারালো ছুরির এক পোচ বসিয়ে দিবে গলায়। এই ব্যাপারে প্রচন্ড দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সে। কিন্তু তাই বলে এখনি ধরা পড়তে রাজি নয়। নিজেকে তো অন্তত একটা সুযোগ দিতে হবে।

কিন্তু শফিক প্রচন্ড ঘাড়তেড়া ধরনের লোক। একগুঁয়ে। সে একবার যাকে তার অপছন্দের তালিকায় ফেলে দেয়, তার ক্ষতি করার জন্য উঠেপড়ে লেগে পড়ে। তখন যেন এটাই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। সারা জীবন সে এই কাজটিই করে এসেছে। মানুষের পিছনে লেগেছে, ক্ষতি করেছে। তাই শেষ পর্যন্ত এই গুন্ডামি ছাড়া জীবনে আর অর্জন নেই তার। গ্রামের লোকে তাকে মাথামোটা বলে ডাকে। কারণ নিজের মাথার বুদ্ধি নিজের উন্নতি সাধনের বদলে পরের ক্ষতি করার জন্যই সারাজীবন ব্যবহার করে এসেছে সে। একেই বলে মহামূল্যবান মানব মস্তিষ্কের চরম অপচয়। যা স্রষ্ঠা নিজেও সহ্য করে না। তাই কর্মফল হিসেবে প্রতিদান কোন না কোন দিন ফিরে আসে।

তবে শফিকদের মত লোকদেরও সমাজে প্রয়োজন আছে। নয়তো আকবর মেম্বর, হারিস দেওয়ানের মতো লোকেরা মানুষের উপর ক্ষমতা খাটাতে পারবে না যে। নখর বিহীন দুর্বল বাঘ হয়ে পড়বে।

শত কাঁপুনি নিয়েই খাট থেকে নেমে পড়ল মিলিটারি। রান্নাঘরের দরজার পাশেই তার মায়ের রাখা ট্রাংকটি রয়েছে। খুড়িয়ে খুড়িয়ে সেই দিকে এগিয়ে গেল। পুরনো জরাজীর্ণ কাথা আর চাদরে ভর্তি ট্রাঙ্কটি এক ঝাটকায় খুলে ফেলল।

সামসু তার স্ত্রী মোনার হাত টেনে ধরে ছোট ছোট পায়ে ক্ষেতের আইল ধরে সামনে এগিয়ে চলছিল। পেছনে রয়েছে ছোট্টু, তাদেরকে অনুসরণ করছে। মাথার উপর প্রচন্ড রোদ খাঁ খাঁ করছে। তালু ফেটে যাচ্ছে। কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতেই সবুর দেওয়ানের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। দোতলা বাড়ির ছাদ দূর থেকে উকি দিচ্ছে। এই বাড়িটি পেড়িয়েই পাশের গ্রামের পথ।
আরও কিছুটা সামনে যেতেই মোনার হাতে এক ঝাটকা টান দিয়ে মাটিতে বসে পরলো সামসু। ছোট্টু প্রথমে ব্যাপারটি খেয়াল করেনি। সামসু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে ইশারা করলে সে ধান ক্ষেতের আড়ালে হাটু গেড়ে বসে পরে। যতদূর সম্ভব ধান ক্ষেতের আড়ালে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করছে সবাই।

বাড়ির ভেতর থেকে এক ধরনের হট্টগোল শোনা যাচ্ছিল। ভেতরে লোকজনের জমায়েত চলছে। ক্ষেতের একপাশে উচু টিলার উপর সবুর দেওয়ানের বাড়ি। শক্তপোক্ত ইটের দোতলা দালানের সামনে বিশাল উঠান। চারপাশে টিনের লম্বা বেড়া। বেড়ার ওপাশ থেকে ক্ষণে ক্ষণে মানুষের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে। মাঝে মাঝে উচ্চস্বরে কারো কারো ধমকের সুর শোনা যাচ্ছে। সম্ভবত সবুর দেওয়ান তার দলবলের উদ্দেশ্যে কিছু বলে চলছে। টিনের দেয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে মানুষের অস্পষ্ট চলাফেরা বোঝা যাচ্ছে।

সামসু আর দুই কদম সামনে এগুতেই কে যেন বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, এই কে ওখানে? ক্ষেতের মধ্যে কে রে? সাথে সাথে আরো কয়েকটি গলা খেঁকিয়ে উঠলো। ভিড় থেকে কেউ যেন একজন বলে উঠল, ওই লাশগুলো নয়তো!
কাথাটি শুনে সামসুর বুকটা ধক করে উঠল। এবার উঠোনের ওপাশ থেকে অনেকগুলি লাঠির ঠক্ঠক্ শব্দ পাওয়া গেল।

ওই ধর! ধর! বলে একদল লোক বাড়ির এপাশ ওপাশ দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগলো।

চলবে।

Nishad jaman, Sikdar rahat, Sk rahul ali, Jannat islam, Akash islam, Apon arnob, Parvez ali and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
শুকতারা
শুকতারা
Posts : 68
স্বর্ণমুদ্রা : 343
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-22
View user profile

ভাইরাস  - Page 3 Empty Re: ভাইরাস

Tue Jul 20, 2021 4:31 pm
ভাইরাস

২৮|
ওই বান্দির পো! বাইরে আয়! দাঁত মুখ খিঁচিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল শফিক। মুখ থেকে কয়েক ফোঁটা থুতুর বুদবুদি ছিটিয়ে পড়ল মাটিতে। এক হাতে একটা কেরোসিনের গ্যালন অন্য হাতে একটা ম্যাচ নিয়ে উঠোনের উপর এসে দাঁড়িয়েছে সে। এবার তার হাতে কোন বাশ নেই। না আছে কোন সাগরেদ। রাগে ক্ষোভে বিচার-বুদ্ধি কিছুটা লোপ পেয়েছে তার।

উঠোনের ঠিক ওপারেই ঘরের দরজাটা হা করে খোলা। দরজার ঠিক মুখেই মাটিতে চিত হয়ে পড়ে আছে তার পাঙ্গ। হয়তোবা মৃত অথবা জীবিত। তবে তাতে কোনো যায় আসে না শফিকের। সে মিলিটারির সংস্পর্শে গিয়েছে, তাকেও মরতে হবে।
গ্যালনটি ধপাস করে মাটিতে রাখল শফিক। তারপর ঘরের দরজার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে দুই হাতে লুঙ্গিটা গুটিয়ে নিল। গ্যালনটির মুখটি ছুড়ে ফেলল দূরে। ছোট ছোট পায়ে ঘর বরাবর দৌড় দিল।

তোর বাইচা থাকবার কোন অধিকার নাই! চিৎকার করে বলতে বলতে ঘরের এক পাশে চলে গেল শফিক। দুই-হাতে গ্যালনটি উঁচিয়ে ঘরের বেড়ার উপর ছিটিয়ে দিতে লাগলো কাচা তেল।

তোগোর সবগুলারে পুড়ামু আমি! একটা একটা কইরা মারমু! গোলামের পো! সাহস থাকলে বাইরে আয়! চিৎকার করতে থাকা শফিক ঘরের ভেতর থেকে কোন ধরনের সাড়াশব্দ পেল না।

একবার দরজার দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে উঁকি দিল সে। তারপর আবার কেরোসিন ঢালায় মগ্ন হল। চারিদিকটা কাঁচা কেরোসিনের গন্ধে ভরে উঠেছে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া গিয়ে শফিকের নাকে ঠেকেছে। এই মুহুর্তে যদিও হিতাহিত জ্ঞান নেই তার। পাগলের মতো ঘরের চারপাশে ছুটতে ছুটতে কখন যে গ্যালনটা খালি করে ফেলেছে খেয়ালই করেনি।
সেটি উঠিয়ে মাটিতে এক আছাড়ই দিল। যেন যতো রাগ ক্ষোভ সব গ্যালনের উপর।
তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে ম্যাচটি বের করল। একটা একটা করে কাঠি জ্বালিয়ে ছুড়ে মারল বেড়ার ওপর। কাঁচা কেরোসিনে ভেজা মুলির বেড়ায় মুহূর্তেই দাউ দাউ করে আগুন লেগে গেল। দখিনের দমকা হাওয়ায় কয়েক মুহূর্তেই আগুনের শিখা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তপ্ত রোদে বেড়াগুলো যেন জ্বলে ওঠার জন্য তৈরিই হয়ে ছিল।

আগুনের তাপে শফিক এক ঝটকায় নিজেকে পেছনে সরিয়ে নিল। উঠোনের ঢালু ধরে দৌড়ে নীচে নেমে এলো। ক্ষেতের পানিতে হাটুগেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। যেন সামনে সার্কাস শুরু হবে। সেটি দেখার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কাদায় চপাক চপাক শব্দ করে এবার হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎই ঘরের ভেতর থেকে মানুষের চিৎকারের শব্দ পাওয়া গেল। শফিকের বুকটা যেন আত্মতৃপ্তিতে ভরে উঠলো। চেহারায় খুশির ছাপ ফুটে উঠলো। মুচকি একটা হাসি দিল সে। তারপর মুখ থেকে একরাশ থুতু ফেলে বলে উঠলো, মর গোলামের পুত, মর!
.

হারিস দেওয়ানের বাড়ির উঠোনের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সামসু, মোনা আর ছোট্টু। তাদের ঘিরে সবুরের লাঠিয়াল বাহিনী, যেন কোন তামাশা দেখার অপেক্ষায়!

সবুর রক্তচক্ষু করে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। তার একটা চ্যালা হটাৎ লাঠি উঁচিয়ে ধরল।

সবুর ধমকের সুরে বলে উঠল, ওই দাঁড়া!
চ্যালাটা সাথে সাথেই থেমে গেল, যেন থেমে যাওয়ার জন্যেই লাঠিটা উঁচিয়ে ছিল। আসলে সবুরকে খুশি করাই তার উদ্দেশ্য ছিল। সবুর খুশি হল কিনা বোঝা গেল না।

তোরে তো আমি বুঝদার ভাবছিলাম। সামসুর দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল সবুর। কিন্তু তুই শালা একটা নাদানই ঠেকলি। ভাইরাসটা সারা গ্রামে ছড়ায় পড়তেছে। কে কেমনে কখন আক্রান্ত হইতেছে কেউ জানে না? এতবার বললাম ঘরে থাক, ঘরে থাক কিন্তু শুনলি না!

ভাইজান! আমরা শুধু গ্রাম ছেইড়ে চইলে যাইবার চাইছিলাম। আমরারে চইলে যাইতে দেন! সামসুর গলায় কাকুতি।

তারপর তুই আরেক গ্রামে গিয়া ছড়ায় দে, তাই তো! রাগে ক্ষোভে ফুসছিল সবুর। নিজের অনিচ্ছায় একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল তার মুখ থেকে।

তুই আসলে নিজের ইচ্ছায় ঘরে থাকবার লোক না। কথার সুরে মনে হচ্ছিল কিছু একটা করতে যাচ্ছে সবুর।
মোনা গলা উচিয়ে কিছু একটা বলতে গেলে এক ধমকে তাকে থামিয়ে দিল সে,
এই মহিলা! আমরা দুই ব্যাটা ছেলে কথা বলতেছি না! এতো সাহস তোমার!

শোনেন! ভাইসাব শোনেন! পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে ভেবে সামসু তৎক্ষণাৎ সবুরের উদ্দেশ্যে বলল। আমরা কেউ আক্রান্ত না, ভাইজান। আমরা সবাই ঠিক আছি।

হ, তাই বুঝি! বিদ্রুপের সুরে বলল সবুর। তোমরা কেউই আক্রান্ত না! ঠিক আছে বুঝলাম, তা মিয়ারা আমারে একটু বুঝায়ে বলো, তোমরা তা বুঝলা কি কইরা?

সামসু চুপ করে রইল। কিছু বলতে পারল না। এর সদুত্তর তার কাছে নেই।

তাবৎ গ্রামের মানুষ যে জিনিসটা বুঝবার পারে নাই, তোমরা সেইটা বুইঝা ফালাইছো। সবুর দাত কিড়মিড়িয়ে বলল।

.

দূরে মিলিটারির বাড়ি দাউদাউ করে জ্বলে পুড়ে চলছে। সাথে যেন মিলিটারির বুকের ভেতরটাও। কতো বছরের পুরনো পিতৃস্থান, কতো স্মৃতি। সবকিছু এক নিমেষেই শেষ। এটা তো শুধু একটা বাড়ি নয়, একটা সংসার, পরিবার। বাড়ি নিয়ে আফসোস হচ্ছে না মিলিটারির। তার আসল বাড়িতো অনেক আগেই জলে পুড়ে ছাড়খার হয়ে গেছে।

দুর্বল, আহত বাঘের ন্যায় ক্ষিপ্ত মিলিটারি একটা দোচালা বাড়ির পেছনের ছায়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। বাড়িটা খালি। বাড়ির বাসিন্দারা বহু আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। ভেতর থেকে পঁচা বাসি গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

মিলিটারি সাড়া শরীর মোটা কাঁথায় মোড়ানো। মাথা থেকে পা পর্যন্ত আরেক পরদ চাদরে ঢাকা। মুখটা মোটা গামছায় শক্ত করে বাধা। মাথায় পুরু করে ঘোমটা দেয়া, শুধুমাত্র চোখ দুটো খোলা।

শফিক শুধু মিলিটারির বাড়ি নয় আশেপাশের অনেকগুলি বাড়িতেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ক্ষেতের আইল ধরে পালানোর সময় পুড়ে ছাই হওয়া কিছু বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখে এসেছে মিলিটারি। তার মধ্যে পরিচিত জনের ঘর দোরও ছিল। তারা পালাতে পেরেছে কিনা যানা নেই তার।

শফিক বাহিনী আসলে ভাইরাস নিধণের নামে তাণ্ডব চালাচ্ছে। নিরীহ মানুষ হত্যা করে চলছে। শফিক অবশ্য তা নিয়ে খুবই খুশি। তার মনের ভিতরের সুপ্ত হিংস্রতা যে নিংড়ে বেরিয়ে আসার এটাই সুযোগ।

রৌদ্রের তাপ ইতিমধ্যেই কমে এসেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতে চলেছে। কিছুক্ষণ পরেই আঁধারের চাদরে ঢেকে যাবে পুরো গ্রাম। মিলিটারি কোমরে গুঁজে থাকা ছোড়াটি বের করল। একবার গলার কাছে নিয়ে একটা পোচ বসিয়ে দেয়ার ভঙ্গি করলো। শেষবারের মত বুঝে নিল নিজেকে কিভাবে শেষ করতে হবে। হয়তোবা আজ রাতই তার জীবনের শেষ রাত!

চলবে।

Akhi Khantun, Nisha khan, Afran tarek, Somiya akter sorna, Fahima Tabassum, Sk akitul, Tarek tahan and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum