সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 4
স্বর্ণমুদ্রা : 150
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-30
View user profile

ক্যানভাস  Empty ক্যানভাস

Fri Jun 04, 2021 8:37 pm
প্রথম খন্ড
"এক"

চিৎকারের শব্দ শুনে হাসানের ঘুম ভেঙ্গে গেল, কি হয়েছে বুঝতে কিছুটা সময় নিল। পাশের রুম থেকে আসছে আওয়াজ, মারুফ চিৎকার করেছে!

বিছানা ছেড়ে উঠল হাসান। তার বন্ধু মারুফের এই সমস্যাটা দীর্ঘদিনের। প্রায়ই রাতের বেলা ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করে ওঠে। কয়টা বাজে? বড়জোর ৬টা হবে। এত সকালে মারুফ কি দুঃস্বপ্ন দেখল?

দরজা খুলে পাশের রুমে উঁকি দিল হাসান। মারুফ তার বিছানায় বসে আছে। বুকের কাছে দুই হাঁটু ভাজ করে রাখা। তাকিয়ে আছে বেডের পাশে স্ট্যান্ডে দাঁড় করানো ছবি আকার ক্যানভাসের দিকে। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে কিছু একটা দেখছে।

হাসান বসল মারুফের গা ঘেঁষে। “কি হয়েছে রে? চিৎকার করছিস কেন? খারাপ কোন স্বপ্ন দেখেছিস?”

মারুফ মুখে কিছু বলল না। আঙ্গুল তুলে কিছু একটা দেখানোর চেষ্টা করল। হাসান সেদিকে তাকাল। ক্যানভাসে আটকানো মিডিয়াম সাইজের আর্ট পেপারে তুলির আচরে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একটা জীবন্ত ছবি। মারুফের তুলি যেন কথা বলে! এত চমৎকার ছবি আঁকার ক্ষমতা খুব বেশি মানুষের থাকেনা! সে হয়ত বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভাল পেইন্টারদের মধ্যে একজন হতে পারত। কিন্তু বিশেষ কারণে নিজের ছবি আঁকার এই প্রতিভা লুকিয়ে রেখেছে সবার কাছ থেকে।

“ছ... ছবিটা ভাল করে দেখ”!
হাসান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিটা দেখল। নদীর জলে একটা মেয়ে চিত হয়ে ভাসছে! মুখ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষতচিহ্ন। বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা মৃত। “একটা মেয়ের লাশ ভাসছে নদীতে! এখানে আর দেখার কি আছে?”
“তুই দেখতে পাচ্ছিস না হাসান! ভাল করে দেখ!” মারুফের কণ্ঠে তাগাদা দেওয়ার সুর।

আরও ভাল করে ছবিটা বোঝার চেষ্টা করল হাসান। আচমকা ব্যাপারটা নজরে পড়ল তার! মুখটা ক্ষতবিক্ষত হলেও ঠিকই চেনা যাচ্ছে! নদীর জলে লাশ হয়ে ভাসতে থাকা মেয়েটি আর কেউ নয়! শেফালী! তার বাগদত্তা।
“এ তুই কি ছবি এঁকেছিস মারুফ? কেন এঁকেছিস?”

“আ... আমি জানিনা... আমি কিচ্ছু জানিনা..." মারুফের কণ্ঠে আতংক। "সম্ভবত গতকাল রাতে ব্ল্যাক আউট হয়েছিল। তখন এঁকেছি। এই মাত্র ঘুম ভেঙে চোখে পড়ল”।

হাসানের দৃষ্টিতেও আতংক ফুটে উঠেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে শেফালীর মৃত ছবি আঁকা দেখে এত ভয় পাওয়ার কি আছে? কিন্তু আর কেউ না জানুক, অন্তত হাসান জানে- মারুফ ভবিষ্যৎ আঁকতে পারে! তার আঁকা প্রত্যেকটা কাল্পনিক ছবির ঘটনা ভবিষ্যতে সত্য হয়!

"দুই"
“ এটা হচ্ছে কোন আচরণের বিপরীতে পুরষ্কার বা শাস্তি দেয়ার ফলে আমার যে শিক্ষা গ্রহণ করি তাই হচ্ছে অপারেন্ট কন্ডিশনিং। উদাহারন স্বরূপ বলা যায়- একটা বাচ্চা শিক্ষকের শাস্তি এড়াতে হোমওয়ার্ক করে, আবার একজন কর্মচারী প্রমোশনের আশায় সুন্দরভাবে কাজ করে...”

কথা শেষ করতে পারল না ঢাবির সাইকোলজি বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ড. আশরাফ রবিন। এক ছাত্র হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে বসল, “স্যার, ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিংটা আরও একটু বুঝিয়ে দিলে ভাল হয়”।
মেজাজ খারাপ হল ড. রবিনের। তবুও শান্ত থাকার চেষ্টা করল। “এতক্ষণ যে জিজ্ঞেস করলাম সবাই বুঝেছ কিনা, তখন বলনি কেন?”
ছেলেটা আর কিছু বলছে না। পিছন দিক থেকে একটা মেয়ে বলে উঠল, “স্যার, ও ফ্রুট নিনজা খেলছিল”।

ক্লাসভর্তি সবাই হো হো হেসে উঠল। রবিনও না হেসে পারল না। কিন্তু মনের মধ্যে একটা বিরাট অসন্তুষ্টি কাজ করছে। এই যুগের ছেলে মেয়েরা অনেক বেশি বুদ্ধিমান। এদের বোঝার ক্ষমতা তাদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ কিন্তু বোঝার আগ্রহ অর্ধেকেরও কম!
ক্লাসিক্যাল কন্ডিশনিং এর আলোচনাটা আবার শুরু করতে যাবে এমন সময় মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠল। ডিপার্টমেন্ট এর চেয়ারম্যান বলে দিয়েছেন ক্লাসে শিক্ষকরা যেন মোবাইল সাইলেন্ট রাখে। কিন্তু রবিন প্রায়ই সেটা করতে ভুলে যায়।

পকেট থেকে বিরক্তচিত্তে মোবাইল বের করল সে। কলটা কেটে দিতে গিয়ে খেয়াল হল ফোন করেছে বন্ধু ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর ইকবাল খান। নিশ্চয়ই নতুন কোন কেস! আশরাফ রবিনের চোখে মুখে এক ধরনের ঔজ্জ্বল্য ধরা পড়ল। ছাত্র পড়ানোর মত একঘেয়েমি থেকে হয়ত একটু মুক্তি মিলবে এবার!

“আমার জরুরী একটা ফোন এসেছে। সবাই বই দেখে পড়াটা বুঝার চেষ্টা কর, আমি কথা বলে আসছি...” বলেই ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলো রবিন। পিছনে শুনতে পেল ইতিমধ্যে সব স্টুডেন্ট হই হুল্লোড় শুরু করেছে। হায়রে নেক্সট জেনারেশন, পড়াশোনায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই এদের!

রিসিভ করল সে, “হ্যালো, ইকবাল?”
“হ্যা, খুব বিজি সময় কাটছে নাকি রে?” ওপাশ থেকে প্রশ্ন করল ইকবাল।
“সেটা ডিপেন্ড করছে তুই কি ধরনের কাজের জন্য ফোন করেছিস তার উপরে। যদি আড্ডা দেয়ার উদ্দেশ্য থাকে তাহলে আমার হাতে একদম সময় নেই, কিন্তু যদি নতুন কোন কেসে হেল্প দরকার হয় তাহলে আই হ্যাভ অল দা টাইম অফ দা ওয়ার্ল্ড”।
“ঠিক কেস না। একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার ঘটেছে। একজন যুবক এসেছিল আমার কাছে, সে বলল তার বন্ধু নাকি ভবিষ্যতের ছবি আঁকতে পারে”!
“ওয়াও! ইন্টারেস্টিং তো”! রবিনের কণ্ঠে আগ্রহ প্রকাশ পেল।
তবে ওপাশ থেকে ইকবাল খানের কণ্ঠস্বর অনেক বেশি নিরুৎসাহী! “আমার মনে হচ্ছে সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার স্যাপার। এই ধরনের একটা বিষয় শুধু মুখের কথার ওপর বিশ্বাস করে কেস হিসেবে নেয়া পসিবল না। মনে হচ্ছে পুরোটাই গাঁজাখুরি। তবে তোর যদি আগ্রহ থাকে তাহলে আমি ছেলেটাকে তোর নম্বর দিয়ে দিতে পারি। তুই বোঝার চেষ্টা কর ব্যাপারটা আসলে কি”!
“দিয়ে দে, এমনিতেই বোরিং সময় কাটছে। লাইফে একটু উত্তেজনা দরকার”।

"তিন"
“আপনি বলতে চাচ্ছেন, আপনার বন্ধু মারুফ ভবিষ্যৎ দেখতে পায়?” চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার ফাঁকে জিজ্ঞেস করল রবিন। হাসানের সাথে বসেছে ডিপার্টমেন্টের টিচার্স লাউঞ্জের এক কোনায়।
“ঠিক তা নয়। মারুফ আসলে ভবিষ্যৎ আঁকতে পারে” হাসানকে যখন ইন্সপেক্টর ইকবাল বলেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির একজন শিক্ষকের সাথে দেখা করে কথা বলার জন্য, সে ভেবেছিল হয়ত বয়স্ক কেউ হবেন! কিন্তু রবিনকে দেখে সে যার পর নাই অবাক হয়েছে। কত আর বয়স হবে? ত্রিশ? বত্রিশ? এই বয়সে পি এইচ ডি শেষ করে, নামের পাশে ডক্টর বসিয়ে, একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোফেসর হয়ে গেছে!
“কি ধরনের ভবিষ্যৎ?” আবার প্রশ্ন করল রবিন।
“ধরেন সে একজন সুস্থ মানুষের মৃত অবস্থার ছবি এঁকেছে, তাহলে লোকটা দুদিন পর আসলেও মরে যাবে”!
“আরও একটু খোলাসা করে বলা যায়?” আরেকবার কাপে চুমুক দিল রবিন।
“মানে... গোঁড়া থেকে শুরু করব?” হাসানের হাতের কাপে চা ঠাণ্ডা হচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই।
“হুম, তাহলে তো ভালই হয়”!
“ঘটনার শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে...

মারুফকে বলা চলে চাইল্ড জিনিয়াস। ৪ বছর বয়সেই তার ছবি আঁকার প্রতিভার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কারো কাছে শেখেনি অথচ যে বয়সে বাচ্চারা কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং আঁকত, তখন মারুফ হুবহু মানুষের চেহারার স্কেচ আঁকতে পারত। আমরা প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামে বসবাস করতাম, তাই মারুফের এই প্রতিভার কথা খুব বেশিদূর এগোয়নি। কিন্তু আমরা তখনও জানতাম না মারুফের এই প্রতিভা আসলে অভিশপ্ত!

আমাদের বয়স যখন ৮ তখন সর্ব প্রথম এই অভিশাপের প্রমাণ মিলল। একবার কালবৈশাখী ঝড়ের সময় আমার ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা সবাই দল বেঁধে গ্রামের আমগাছ গুলোর নিচ থেকে আম কুড়িয়ে বস্তা বোঝাই করে ফেরার পথে জালাল দেখে ফেললো। জালাল আমাদের চেয়ে বয়সে দু তিন বছরের বড়, সে ছিল গ্রামের মেম্বারের ছেলে। বাবার ক্ষমতার জোরে সেও ক্ষমতা দেখিয়ে বেড়াত। আমাদের কাছ থেকে জালাল সবগুলো আম কেড়ে রাখল। সেদিন মারুফ অনেক কেঁদেছিল।

পরদিন স্কুলে মারুফ আমাকে একটা ছবি দেখাল। অংক খাতার পিছনের দিকে আঁকা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটা ছেলে বেকায়দা ভঙ্গিতে মাটিতে পড়ে আছে, বুঝা যাচ্ছে তার হাত পা ভাঙা। ছেলেটার মুখ দেখে বুঝলাম এটা জালাল। সেই ছবি সারা স্কুলময় ছড়িয়ে গেল। আমরা সবাই খুব হাসলাম। জালালের অপর বাচ্চারা প্রায়ই সবাই ক্ষেপে আছে, কিন্তু কারো পক্ষে তার টিকি ছোঁয়ার সাধ্য নেই। তাই সবাই মারুফের আঁকা ছবির মধ্যেই সান্ত্বনা খুঁজে পেলাম!
কিন্তু পর দিন একটা আমগাছের নিচে জালালকে হাতা পা ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেল। আমরা সবাই তাজ্জব বনে গেলাম! মারুফের আঁকা ছবিতে জালালকে যেভাবে দেখেছি ঠিক সেই ভাবেই সে পড়ে আছে। বাচ্চাদের মধ্যে একটা আতংক সৃষ্টি হল। সবাই ভাবল মারুফের মধ্যে অদ্ভুত কোন ক্ষমতা আছে, সে যা আঁকে তাই সত্যি হয়ে যায়। বাচ্চারা মারুফের সাথে মেশা বন্ধ করে দিল। মারুফের কাছের মানুষ বলতে কেবল একজন রইল। সে হল আমি।

এর পরের ঘটনাটাতো আরও ভয়াবহ! একদিন আমি আর মারুফ গ্রামের বাজারে গিয়েছিলাম। বাজারে নরহরি কাকার মিষ্টির দোকান ছিল। নরহরি কাকার দোকানের মিষ্টি ছিল আমাদেরর অঞ্চলে বিখ্যাত। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসত মিষ্টি খাওয়ার জন্য। এমন অপূর্ব স্বাদ!

প্রায় সময়ই দুপুরবেলা দোকানে কাস্টমার থাকেনা। নরহরি কাকা এসময় চেয়ারে বসে ঝিমাতে থাকেন। গায়ের ছেলে মেয়েরা এই সুযোগে দোকানে ঢুকে গপাগপ গোটা দশেক মিষ্টি খেয়ে পালিয়ে যায়। সেদিন আমি আর মারুফ সুযোগটা কাজে লাগালাম। নিঃশব্দে দোকানে ঢুকে পড়ে চার পাঁচটা করে মিষ্টি পেটে চালান করে দিলাম। কিন্তু বিপত্তি ঘটাল মারুফ। তার হাত লেগে একটা মিষ্টির ডালা থেকে চামচ পড়ে গেল মাটিতে। শব্দ পেয়ে ঘুম ভেঙে গেল নরহরি কাকার। পালানোর সুযোগ পেলাম না আমরা, তিনি পাকড়াও করে ফেললেন দুজনকে। তারপর দোকানে বেঁধে রেখে আমাদের বাড়িতে খবর পাঠালেন।

বাড়িতে ফিরে দুজনেই বাবার হাতে বেদম পিটানি খেলাম। লজ্জায় বাইরে বে হওয়ার উপায় ছিলনা। গাঁ ভর্তি লোকজন সবাই দেখলেই চোর চোর বলে ক্ষ্যাপাত। ভীষণ রাগ হল নরহরি কাকার ওপর। ধরে যখন ফেলেছিলেন, দুই চারটা চড় থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দিলেই তো পারতেন। বেঁধে রেখে বাড়িতে খবর পাঠিয়ে সারা গ্রামের লোকজনকে জানানোর কি দরকার ছিল?

একদিন মারুফ আমাকে তার হাতে আঁকা একটা ছবি দেখাল। ছবিটা দেখে আমি তো বমিই করে ফেললাম। ছবিতে দেখা যাচ্ছে নরহরি কাকার এক চোখের ওপর কাঁটা চামচ গাথা। চোখ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে গাল ভেসে যাচ্ছে। মারুফ কে নিষেধ করে দিলাম আর কখনও যেন এমন ছবি এঁকে আমাকে না দেখায়। এদিকে মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছিল! আগের বার মারুফের আঁকা ছবিটি সত্য হয়েছিল। যদি এবারো হয়?
হলও তাই! একদিন পরই নরহরি কাকাকে ঐ অবস্থায় পাওয়া গেল। নরহরি কাকা অন্যান্য দিনের মত দুপুরবেলা দোকানে বসে ঝিমাচ্ছলেন, কে যেন সে সময় তার দোকানে ঢুকে পড়ে চোখে কাঁটা চামচ গেঁথে দিয়েছে! ওহ কি ভয়াবহ ব্যাপার! অবশ্য মারুফের দ্বিতীয়বার ছবি আঁকার এই বিষয়টা আমরা কাউকে জানালাম না, নিজেদের মধ্যে গোপন রাখলাম। এর পর এমন আরও অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।

“বড় কারো সাথে এ বিষয়ে কখনও কথা বলেন নি?” কথা শুনতে শুনতে চা খাওয়া শেষ করেছে রবিন।
“না। আমরা দুজনে ভেবেছিলাম এটা হয়ত মারুফের এক ধরনের ক্ষমতা, সে ভবিষ্যৎ আঁকতে পারে। কিন্তু এরকম আরও কিছু ঘটনা ঘটার পর বুঝতে পারলাম আসলে ব্যাপারটা তা নয়। এটা ক্ষমতা নয়, এটা একটা অভিশাপ! মারুফ ভবিষ্যৎ আঁকতে পারেনা, মারুফ যা আঁকে তাই ভবিষ্যৎ হয়ে যায়”!
“এমনটা মনে হওয়ার কারণ?”
“কারণ মারুফ এখন পর্যন্ত কোন পজিটিভ ফিউচারের ছবি আকেনি” হঠাৎ খেয়াল হতেই হাতে ধরা চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিল মারুফ। মুখে বিস্বাদ লাগল, একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। “হয় সে কোন দুর্ঘটনা, কারো মৃত্যু অথবা নৃশংস কোন ঘটনার ছবি আঁকে”।
“যখন বুঝতে পারল ব্যাপারটা আসলে অভিশাপ, তখন মারুফ কি করল?”
“মারুফ ছবি আঁকা ছেড়ে দিল” আরও একবার চুমুক দিতে গিয়েও দিলনা, কাঁপটা নামিয়ে রাখল হাসান। ঠাণ্ডা চা খাওয়া আর না খাওয়া একই কথা! “সে এখন শুধু মাঝে মধ্যে নিজের মনের আনন্দের জন্য ছবি আঁকে। কিন্তু ছবি গুলো কাউকে দেখায় না”।
“তাতে কি সমস্যা দূর হয়েছে?”
“না হয়নি। মাঝে মধ্যে অতি উত্তেজনায় মারুফের ব্ল্যাক আউট হয়। তখন সে অদ্ভুত আচরণ শুরু করে। কলম, পেন্সিল, রং, তুলি, কাগজ- যাই হাতের কাছে পায় তাই নিয়ে ছবি আঁকা শুরু করে! এবং এই ছবি গুলো ভবিষ্যতে সত্যি প্রমাণিত হয়! কিন্তু ব্ল্যাক আউটের পর্যায়টা পার করে এলে মারুফের আর কিছুই মনে থাকেনা। সে কখন এই ছবি এঁকেছে, কেন এঁকেছে- কিছুই বলতে পারেনা”!
“আপনারা এখন থাকেন কোথায়?”
“ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় দুজনের গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে এসেছিলাম। তারপর থেকে একসাথেই আছি দুজনে। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি। এখন ঢাকার মহাখালীতে একটা দুই রুমের ফ্ল্যাট নিয়েছি। আমি একটা সরকারি চাকরী করছি, মারুফ তেমন কিছু করেনা, মাঝে মধ্যে ফ্রি ল্যান্সর হিসেবে টুকটাক ডিজাইনের কাজ করে করে”।
রবিন পকেট থেকে রুমাল বের করল, চশমার কাঁচ গুলো একটু পরিষ্কার করা প্রয়োজন। “একসাথেই তো আছেন! কিন্তু আপনি কি কখনও মারুফকে ব্ল্যাক আউট অবস্থায় ছবি আঁকতে দেখেছেন?”
“না, দেখিনি!”
“এখন পর্যন্ত মারুফের যত গুলো আঁকা ছবি পরবর্তীতে সত্য হয়েছে তার একটাও কি আঁকার সময় আপনি দেখেছেন?”
এক মুহূর্ত চিন্তা করল হাসান। তারপর বলল, “ঠিক মনে করতে পারছি না আসলে... মারুফকে অনেকবার ছবি আঁকতে দেখেছি... কিন্তু তার আঁকা যে ছবিগুলো ভবিষ্যতে সত্যি হয়, তার একটাও আঁকার সময় সম্ভবত দেখিনি”!
রবিন তার চশমার কাচগুলো রুমাল দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করার ফাকে বলল, “এখন বলুন, এতদিন পর কেন বিষয়টা মানুষের কানে তুলছেন? এতদিন তো ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলেন, আজ হঠাৎ পুলিশের শরণাপন্ন হওয়ার কারণ?”!
“কারণ?” এক মুহূর্ত সময় নিলো হাসান কারণটা বলতে। “কারণ আমি চাইনা মারুফ শেষ যে ছবিটি এঁকেছে তা সত্যি হোক”।
“কি আছে সেই ছবিতে?”
“আমি সাথে করে নিয়ে এসেছি। আপনি চাইলে দেখতে পারেন”। বলে ডান কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের চেইন খুলল হাসান। একটা আর্ট পেপার বের করে বাড়িয়ে ধরল রবিনের দিকে।

রবিন ছবিটা হাতে নিয়ে চমকে উঠল! একটা মেয়ের ক্ষত বিক্ষত লাশের ছবি, পানিতে ভাসছে। এত্ত জীবন্ত ছবি, মনে হচ্ছে যেন প্রফেশনাল ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবিতে ইফেক্ট দেয়া হয়েছে! বলে না দিলে কেউ বিশ্বাস করবে না হাতে আঁকা! কি অসাধারণ এক প্রতিভা! এই ছেলের আঁকা ছবি যদি প্রচার পায় তাহলে নিঃসন্দেহে সে বিশ্বের সেরা চিত্রশিল্পীর আখ্যা পাবে! দেশের এই রকম একটা প্রতিভা লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে আছে কেন?

হাসান বলে চলেছে, “ছবিতে যে মেয়ের লাশ দেখছেন তার নাম শেফালী। মেয়েটি আমার হবু স্ত্রী, ইডেন কলেজে পড়ে”।
“আপনার বন্ধু মারুফ নিশ্চয়ই মেয়েটিকে চেনে?” প্রশ্ন করল রবিন।
“হ্যা, মেয়েটি সম্পর্কে মারুফের কাজিন হয়”।
একমুহূর্ত কিছু একটা চিন্তা করল রবিন। তারপর প্রশ্ন করল, “এখন পর্যন্ত এমন কোন ঘটনা ঘটেছে কি যেখানে মারফ যে ছবি এঁকেছে তাই ঘটেছে, কিন্তু মারুফের আঁকা ছবি দেখে যেভাবে ঘটবে বলে মনে হয়েছে ঠিক সেভাবে ঘটেনি?”
“হ্যা, হয়েছে”।
“একটু উদাহারন দিতে পারবেন?”
একটু ভেবে নিয়ে বলল হাসান, “আমার একটা পোষা কুকুর ছিল, খুব আদরের। একদিন মারুফ ছবি আকল কুকুরটার লাশ গলায় দড়ি বাঁধা অবস্থায় পানিতে ভাসছে। পরবর্তীতে গলায় দড়ি বাঁধা অবস্থায় কুকুরটির লাশ পাওয়া গেছে ঠিকই কিন্তু পানিতে নয়, পাওয়া গেছে পুকুর পাড়ে, একটা গাছের নিচে। এমন ঘটনা আরও দুই একবার ঘটেছে। কিন্তু আসল ব্যাপার হল সে যা আঁকবে তা সত্য হবেই। হুবহু মিলছে কিনা সে তো বড় বিষয় নয়”!
“বড় বিষয় নয় সত্যি, কিন্তু এক্কেবারে ফেলে দেওয়ার মত কথাও নয়”! বলল রবিন। “আপনার চা তো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আর এক কাপ দিতে বলব?”
“না থাক। এমনিতেই চা খেতে ইচ্ছে করছে না আর”।
“আপনি তাহলে আজ আসুন মিস্টার হাসান” একটু পরেই একটা ক্লাস নিতে হবে রবিনের, হাতে সময় নেই। “পুরো বিষয়টা নিয়ে আমি আজ রাতে একবার বসব, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করা লাগবে। আপনি বরং কাল ডিবি পুলিশের অফিসে আসুন , সেখানে ইন্সপেক্টর ইকবাল খানের সামনেই পুরো বিষয়টার একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করব। আপনার বন্ধু মারুফের সাথেও একটু দেখা করা প্রয়োজন, তবে ওনার সাথে কথা বলার আগে একটু পরিস্থিতিটা বুঝে নেয়া যাক”!
“যা করার তাড়াতাড়ি করুন স্যার। কারণ দেরি হয়ে যাচ্ছে”!
“হ্যা, আমরা যা করার করব” আশ্বাস দিল রবিন। “এই সময়টা আপনি একটু আপনার হবু স্ত্রীর দিকে খেয়াল রাখুন।

চলবে...
সম্পাদনা : হাসান মির্জা
বিদেশি গল্প অবলম্বনে নেয়া

Abid faraje, Sk nadim, Arif howla, Sk limon, Soneya islam, Sheikh anika, Rohim islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 4
স্বর্ণমুদ্রা : 150
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-30
View user profile

ক্যানভাস  Empty Re: ক্যানভাস

Fri Jun 04, 2021 8:39 pm
২য় খন্ড

"চার"
একই বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুলে পড়া রবিন আর ইন্সপেক্টর ইকবাল খুব ভাল বন্ধু। দুজনেরই সবচেয়ে পছন্দের কাজ হচ্ছে ক্রাইম সলভ করা। রবিন দেখা করতে আসছে বন্ধু ইকবালের সাথে..

ইন্সপেক্টর ইকবাল খানের কণ্ঠে নির্ভেজাল বিস্ময়!!
তোর কথা গুলো আষাঢ়ে গল্পের মত শোনাচ্ছে রবিন”

“আমি ঠিকই বলছি” রবিনের বলার ধরনে কোন হেঁয়ালি নেই। অর্থাৎ যা বলছে তা বিশ্বাস করে। “মারুফের আঁকা ছবিগুলো ভবিষ্যতে সত্য প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি আসলে কোন অলৌকিক ঘটনা নয়। মারুফ নিজেই এর জন্য দায়ী”।
“এখানে মারুফ কীভাবে দায়ী হয়?” ইকবাল খানের বিস্ময় কাটছে না। দুজনে বসে আছে ইকবাল খানের অফিসে। হাসানেরও আসার কথা ছিল কিন্তু এখনও এসে পৌঁছায়নি। “একটু ঝেড়ে কাশ না প্লিজ”!
“সব বুঝিয়ে বলছি, তার আগে বলি কীভাবে বুঝলাম ব্যাপারটা যে অলৌকিক নয়”!
ইকবাল খান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
রবিন বলছে, “মারুফ যে ঘটনার দৃশ্য আঁকে তা সব সময় হুবহু মিলে যায় না। হাসানের মুখ থেকেই শুনেছি বেশ কয়েকবার এর ব্যতিক্রম হয়েছে। এটা যদি কোন অলৌকিক ক্ষমতা হত তাহলে প্রত্যেকবার হুবহু মিলে যাওয়ার কথা! ব্যতিক্রম যেহেতু হচ্ছে তাহলে ব্যাপারটিকে আর অলৌকিক ক্যাটাগরিতে ফেলা যাচ্ছেনা। দুই একটা ঘটনা সত্য হলে ব্যাপারটিকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেয়া যেত। কিন্তু মারুফ যা আঁকে তা প্রত্যেকবারই ঘটে। হুবহু না হোক, ছবির ঘটনা সত্যি হয়। তারমানে কি দাঁড়াচ্ছে? পুরো ব্যাপারটা আসলে প্রি-প্ল্যানড”।
“তুই বলতে চাচ্ছিস মারুফ প্রথমে ছবি আঁকে তারপর সেই ছবির ঘটনা সত্যি করার জন্য কাউকে পাঠায়?” ইকবাল খানের প্রশ্ন।
“কাউকে পাঠায় না। সে নিজেই কাজগুলো করে”।
“তুই কীভাবে এতটা শিওর হচ্ছিস?”
“এখন পর্যন্ত হাসান মারুফকে কখনও ছবি আঁকতে দেখেনি। এমনকি ছবির ঘটনা সত্য হওয়ার সময়টাতেই সে কখনও উপস্থিত থাকেনা। অর্থাৎ মারুফ একটি ছবি আঁকে, সেটা হাসানকে দেখায়, তারপর হাসানের অলক্ষ্যে গিয়ে কাজটি করে আসে”।
“কিন্তু এতে লাভ কি বল?”
“আমার মনে হয় মারফ কোন লাভ লোকসানের হিসেব করেনা। অদ্ভুত কোন মানসিক রোগ আছে তার। কিছু মানুষের সামনে নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে দেখিয়ে তৃপ্তি পাচ্ছে সে”।
“তাহলে শেষ ছবিটার ব্যাখ্যা কি ?” ইকবাল খান রবিনের থিওরিটা পুরোপুরি মেনে নিতে পারছে না। “মারুফ নিশ্চয়ই তার বন্ধুর হবু স্ত্রীকে পাশবিক নির্যাতন করে মেরে ফেলতে চাইবে না! তার উপর মেয়েটি সম্পর্কে মারুফের কাজিন হয়”!
রবিন হাসল, বলল, “বন্ধু আমরা এখানে সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারে ভুগছে এমন পেসেন্টের কথা বলছি। এরা কখনও কাজের ফলাফল নিয়ে চিন্তিত নয়! তুই আমি যেমন যেকোনো বিষয় নিয়ে স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারি ওরা সেটা করেনা। হয়ত মারুফ কোন ডুয়েল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছে। সচেতন মন যে ছবি আঁকে, অবচেতন মনে সে কাজটি করে আসে। কিন্তু সচেতন মনে সেই খবর পৌঁছায় না! এখন মারুফের সাথে কথা বলতেই আমি নিশ্চিত হতে পারব তার সমস্যা কি!”

আরও কিছু হয়ত বলত রবিন কিন্তু হঠাৎ ইকবাল খানের ফোন বেজে ওঠায় কথার রেশ টানতে হল তাকে। ফোন করেছে হাসান। ইকবাল রিসিভ করল, হ্যা”লো! ডিবি ইন্সপেক্টর ইকবাল বলছি”।
“স্যার, আমি হাসান বলছি” হাসানের কণ্ঠে প্রচণ্ড অস্থিরতা টের পাচ্ছে ইকবাল।
“হ্যা, মিস্টার হাসান। আপনার না আজ আসার কথা ছিল?”
“স্যার, আমি আসছিলাম। পথে খবর পেলাম আমার বাগদত্তা স্ত্রী শেফালী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে”।
“বলেন কি?” আঁতকে উঠল ইকবাল।
“জি স্যার। হাসপাতালে এসে জানতে পারলাম মারুফ শেফালীকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ির নিচে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পুলিশ মারুফকে গ্রেফতার করেছে”।

ফোন কেটে দিয়ে কয়েক মুহূর্ত হতবাক চোখে তাকিয়ে রইল ইকবাল। তারপর রবিনকে উদ্দেশ্য করে বলল, “বন্ধু, তোর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে...”

"পাঁচ"

অন্ধকার একটা কক্ষ। জানালা বা ভেন্টিলেটর নেই যে একটু আলো চুইয়ে এসে ভেতরে ঢুকবে। এক মাত্র দরজাটিও বন্ধ। কক্ষের ভেতর আসবাব বলতে একটি ছোট টেবিল ও চেয়ার। চেয়ারের ওপরে বসিয়ে রাখা হয়েছে একজন আসামীকে। তার দু হাত চেয়ারের সাথে হ্যান্ড কাফ দিয়ে আটকানো। সামনে ছোট্ট একটি সাদার রঙের টেবিল। মাথার একটু ওপরে ১০০ পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। বাল্বের চারদিকে প্লাস্টিকের শেড লাগানো থাকায় আসামির মুখের কাছে অংশটুকু আলোকিত হয়ে থাকলেও সমস্ত ঘর অন্ধকার। তাছাড়া সিলিং ফ্যান না থাকায় কক্ষের ভেতর এক ধরনের ভ্যাঁপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রচণ্ড রকমের অস্বস্তিকর এক পরিবেশ।

মারুফ ভেবেছিল এমন ইন্টারগেশন কক্ষের অস্তিত্ব শুধু নাটক সিনেমাতেই দেখা যায়। বাস্তবে এমনটা হওয়া সম্ভব নয়, অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তো অবশ্যই নয়। কিন্তু আজ তার ধারনাটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আসামির চেয়ারে বসে আছে সে নিজেই। ইন্টারোগেশন করছে ইন্সপেক্টর ইকবাল খান।

চোখের সামনে সারাক্ষণ আলো ধরে রাখার ফলে মারুফের চোখে জ্বালা ধরে গেছে। সামনে টেবিলটা ছাড়া রুমের এতরে আর কিছুই নজরে আসছে না তার। ফলে ইন্সপেক্টর ইকবাল খানের প্রশ্নগুলো মনে হচ্ছে যেন অদৃশ্য কেউ করছে!

“মারুফ, যা বলছি তার জবাব দিন” ইন্সপেক্টর ইকবাল খানের কণ্ঠ। “বলুন কেন কাজটি করেছেন?”
“আমি অনেকবারই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করেন নি” থমথমে গলায় বলল মারুফ।
“আমরা সত্যিটা জানতে চাচ্ছি”।
“যা বলছি এটাই সত্যি। আমি চেয়েছিলাম শেফালীর মৃত্যুটা সহজ হোক। অনেক কঠিন মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে তার জন্য”।
“আপনার কেন এমন মনে হচ্ছে?”
“কারণ আমি তার ক্ষত বিক্ষত লাশের ছবি এঁকেছি। কেউ একজন তাকে প্রচণ্ড নির্যাতন করে মেরে লাশটা পানিতে ফেলে দিয়েছে। আমার আঁকা ছবি কখনও ভুল হয়না। আজ পর্যন্ত হয়নি, ভবিষ্যতেও হবেনা”।
“কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে ভেতরে অন্য কোন ব্যাপার আছে”! কৌতুকপূর্ণ কণ্ঠে বলল ইকবাল খান। “এমন কি হতে পারেনা যে আপনি যার অনিষ্ট কামনা করেন, তাকে নিয়ে আজগুবি সব ছবি আঁকেন, তারপর সেই ছবির ঘটনাকে বাস্তবে রূপ দিতে জঘন্য সব কাজ করে বেড়ান”!
“কি বুঝাতে চাচ্ছেন আপনি?”
“আপনি যেখানে শেফালীকে গাড়ির নিচে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন। সেখান থেকে খুব কাছেই একটা জলাশয় আছে। দুর্ঘটনার পর শেফালীকে নিয়ে পানিতে ফেলে দিলে আপনার ছবির ঘটনা কিন্তু সত্যি হয়ে যেত”!
“কক্ষনো না”! দৃঢ় কণ্ঠে বলল মারুফ। “আমি শেফালীর সাথে এমন কাজ করতেই পারিনা”।
“কেন পারেন না?”
“কারণ... কারণ...” কিছুক্ষণ আমরা আমতা করে চুপ হয়ে গেল মারুফ।
“কারণটা আমি বলছি মিস্টার মারুফ”! নাটুকে ভঙ্গিতে এক মুহূর্ত থেমে থাকল ইকবাল খান। তারপর বলল, “কারণ আপনি আপনার খালাত বোন শেফালীকে পছন্দ করতেন। আপনার বন্ধু হাসানের সাথে তার বিয়ের বিষয়টি আপনি মেনে নিতে পারেন নি। এদিকে হাসান বিশ্বাস করে আপনি ভবিষ্যৎ আঁকতে পারেন। সেই সুযোগই আপনি নিতে চেয়েছিলেন”।
“আমি যদি শেফালীকে পছন্দ করি তাহলে তাকে মারতে চাইব কেন?”
“ভালবাসা শুধু গড়তে জানেনা মারুফ! ধ্বংস করতেও জানে”!
“আপনারা মারাত্মক ভুল করছেন ডিটেকটিভ...”
“আমরা ভুল করছি কিনা সে হিসাব করার জন্য আপনাকে এখানে আনা হয়নি” বলল ইকবাল খান। “আমি শুধু জানতে চাই আপনি শেফালীকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ির নিচে ফেলে মারতে চেয়েছিলেন কিনা”!
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। মারুফ সংক্ষেপে বলল, “হ্যা”।
“ব্যাস। আর কিছু জানার নেই আমার” বলল ইকবাল খান। “আপনাকে দেখে আমার লজ্জা হচ্ছে মিস্টার মারুফ! ছবি আঁকার কি অসাধারণ প্রতিভা আপনার মাঝে। সেটা এভাবে অপব্যবহার করে চলেছেন?”
“আপনারা ভুল করছেন”! হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল মারুফ। “ছবিগুলো আমি সচেতন ভাবে আঁকি না। মাঝে মধ্যে আমার ব্ল্যাক আউট হয়, তখন কি ছবি আঁকি তা পরবর্তীতে মনে থাকেনা...”
মারুফের কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে না ইকবাল খান। দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে তখন পিছন থেকে মারুফ প্রায় চিৎকার করে বলল, “শেফালীকে বাঁচান প্লিজ! অনেক বড় বিপদ অপেক্ষা করে আছে তার জন্য”।
“শেফালী এখন বিপদমুক্ত, কারণ আপনি আটক আছেন আমাদের হাতে” বলেই বেরিয়ে এলো ইকবাল।

ইন্টারোগেশন রুমের ঠিক বাইরেই অপেক্ষা করছিল রবিন। ইন্টারকমে ভেতরের সব কথপকথন শুনেছে সে। ইকবাল বেরিয়ে আসতেই বলল, “কি সিদ্ধান্ত নিলি?”
“এটেম্পট টু মার্ডারের কেস করে দিব” ইকবাল খানের চোয়াল দুটি শক্ত হয়ে আছে। “রিপোর্টে ঠাণ্ডা মাথার একজন সাইকো হিসেবে দেখাব মারুফ মুক্তাদির কে”।
“কিন্তু সত্যি যদি সে অবচেতন মনে কাজগুলো করে থাকে? সত্যি যদি তার মধ্যে কোন ডুয়েল পারসোনালিটি সংক্রান্ত সমস্যা থেকে থাকে? তাহলে তো তার যায়গা জেলখানা নয়, মানসিক হাসপাতাল”!

“তুই কি হলিউডের ফিল্মের জগতে বসবাস করিস?” ইকবাল খানকে দেখে মনে হল রেগে যাচ্ছে! “এইটা বাংলাদেশ। এইসব ডুয়েল পারসোনালিটির মামলা এখানে শুধু গল্পেই সম্ভব। একজন বিকৃত চিন্তা ভাবনার আসামীর মানসিক চিকিৎসা করাটা আমাদের জন্য বিলাসিতা! মারুফের অপরাধের বিচার প্রচলিত নিয়মেই হবে, কোন স্পেশাল কন্সেনট্রেশন দেয়া যাবেনা। কেস ক্লোজড!”

চলবে...

বিদেশি গল্প অবলম্বনে
সম্পাদনা : হাসান মির্জা

Abid faraje, Sk nadim, Arif howla, Sk limon, Soneya islam, Sheikh anika, Rohim islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 4
স্বর্ণমুদ্রা : 150
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-30
View user profile

ক্যানভাস  Empty Re: ক্যানভাস

Fri Jun 04, 2021 8:39 pm
৩য় খন্ড

ছয়
আগের ঘটনার সাথে মারুফের তেমন কোন সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, দুর্বল প্রমান। শেফালীর কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে গেল তাই এটেম্পট টু মার্ডার এর কেস ছাড়া আর কিছুই হয়নি। ২ মাসের কারাদণ্ড হল মারুফের।

ইকবাল খান মনে করেছিল কেস ক্লোজড কিন্তু জানত না এই কেস কেবল শুরু হয়েছে। ক্লোজড হওয়ার পথ এখনও অনেক দূর।

মারুফের কারাদণ্ড শুরু হওয়ার কয়েক দিন পরের কথা...

এক মাঝি সকাল বেলা নৌকা নিয়ে বের হয়েছে। সে নদীর জলে একটা মেয়ে ক্ষত বিক্ষত লাশ ভাসতে দেখল। ঠিক যেমনটি এঁকেছিল মারুফ তার ছবিতে। পুলিশ এসে লাশটা উদ্ধার করল। অটোপসি রিপোর্টে দেখা গেল প্রচণ্ড পাশবিক নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে শেফালীর। মৃত্যুর পর লাশটা ফেলে দেওয়া হয়েছে পানিতে।

পরবর্তী একমাস ঘুম ছুটে গেল ডিটেকটিভ ইকবাল খানের। কিছুতেই রহস্যের কূল কিনারা মিলছে না। আশরাফ রবিন ও ইকবাল খানের ধারনা ছিল কাজগুলো মারুফ নিজেই করে কিন্তু মারুফ জেলে থাকা অবস্থায় এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে তাদের ধারনা অমূলক। তবে কি আসলেই মারফের কোন অলৌকিক কোন ক্ষমতা আছে?

যথারীতি দু মাস কাটতেই মারুফ ছাড়া পেয়ে গেল।

এদিকে আশরাফ রবিনের চোখেও ঘুম নেই। দিন রাত শুধু একটাই চিন্তা- কিছু একটা বোঝার ভুল হয়েছে তার! কিছু একটা চোখ এড়িয়ে গেছে! কিন্তু ভুলটা আসলে কোথায় হল? এসময় সে মারুফ ও হাসান দুজনের সাথেই কথা বলল। মারুফের আঁকা ছবিগুলো নিয়ে অনেক স্টাডি করল, ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করল, একসময় সমাধানটা চোখে পড়ল।

পোষ্ট মর্টেমকারী একজন ডাক্তার শেফালীর ডান হাতের নখের নিচে অন্য কারো খানিকটা চামড়ার অস্তিত্ব খুঁজে পেলেন। সম্ভবত নিজেকে বাঁচানোর প্রচেষ্টায় টর্চারকারী ব্যক্তিকে সে খামচি দেয়ার চেষ্টা করেছিল। আশরাফ রবিনের পরামর্শে তদন্তকারী গোয়েন্দারা নখের নিচের পাওয়া এই চামড়ার সাথে শেফালীর হবু বর হাসানের ডিএনএ মেলে কিনা সেটা টেস্ট করে দেখল। ফলাফলটা হল চমকে যাওয়ার মত! ডিএনএ টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ! অর্থাৎ হবু বর হাসানের হাতেই শেফালীর নৃশংস মৃত্যু হয়েছে!

"সাত"
“তুই কি ডিএনএ ম্যাচ করার আগেই বুঝতে পেরেছিলি যে কাজটার পেছনে হাসানের হাত আছে?”

“নিশ্চিত ছিলাম না। একটা ঝাপসা মত ধারনা করতে পেরেছিলাম”। বলল রবিন। “কিন্তু এই ডিএনএ টেস্ট ছাড়া তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করার মত কোন প্রমান ছিলনা”।

“কীভাবে এটা সম্ভব হল বল তো?” এখনও ডিএনএ টেস্টের রেজাল্ট দেখার চমক কাটেনি ইকবাল খানের! “ হাসান নিজেই আমাদের কাছে শেফালীর নিরাপত্তার জন্য এসেছিল! তাছাড়া সে শেফালীকে ভালবাসত। কেন সে শেফালীকে মারতে চাইবে?”

“সে কথায় পরে আসছি। আগে ব্যাপারটা প্রথম থেকে খুলে বলি। যদিও এখনও অনেক প্রশ্নের জবাব আমি পাইনি, কিন্তু কিছু বিষয় চোখের সামনে পরিষ্কার...”

দুই বন্ধু বসে আছে বাংলাদেশ পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের হেডকোয়ার্টারে। হাসানকে খুনের অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়ার আগে একবার রবিনের সাথে পরামর্শ করে নিচ্ছে ইকবাল খান।

রবিন বলে চলেছে, “... মারুফ আর হাসান ছোটবেলা থেকেই একসাথে বড় হয়েছে, দুজনে খুব ভালো বন্ধু, কিন্তু হাসান সবসময় মারুফকে অনুকরণ করার চেষ্টা করত। মারুফের ছবি আঁকার প্রতিভাকে সে হিংসা করত। তাই সে চাইত না মারুফ ছবি এঁকে মানুষের প্রশংসা কুড়াক।
...সম্ভবত প্রথম যে ঘটনাটি ঘটেছিল তাদের গ্রামে, জালাল নামের একটি ছেলেকে হাত পা ভাঙা অবস্থায় আম গাছের নিছে পাওয়া গিয়েছিল, তা ছিল একটা কাকতালীয় ঘটনা। জালালকে অন্য কেউ এসে মেরে রেখে গিয়েছিল যা মারুফের আঁকা ছবির সাথে মিলে যায়! কিন্তু ঘটনাটা হাসানের মনে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।
... মারুফের মনে এক ধরনের ফ্যান্টাসি কাজ করত। সে কারো ওপর রেগে গেলে তার অনিষ্ট কামনা করে ছবি আঁকত। ব্যাপারটা হাসানের জানা ছিল। ছবিতে কখনও দেখা যেত কারো হাত পা ভেঙে গেছে, কেউ মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়েছে, এমনকি মৃতদেহের ছবিও সে আঁকত। মারুফ যদিও বলছে সে অবচেতন মনে ছবিগুলো আঁকে কিন্তু আমার মনে হয় কিছু কিছু ছবি সে ইচ্ছে করে এঁকেছে। কারণ তার নিজের ধারনা তার আঁকা ছবিগুলো ভবিষ্যতে বাস্তব হবেই। এখানেই সুযোগটা খুঁজে পেয়েছে হাসান।
... আগেই বলেছি হাসান চাইত না মারুফের ছবি আঁকার অসাধারণ প্রতিভার কথা মানুষ জানুক। তাই সে গোপনে গোপনে মারুফের আঁকা ছবিগুলো সত্যি প্রমাণিত করার চেষ্টা করত। এর ফলে মারুফের মনে ধারনা জন্মাল তার এই ছবি আঁকার ক্ষমতা এক ধরনের অভিশাপ। তাই মারুফ ছবি আঁকা ছেড়ে দিল। হাসানের কুটিল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে এদেশের এক অসাধারণ প্রতিভা সব সময় লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেল!
... আরও একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য জানাই তোকে, হাসান আমাদেরকে মারুফের ছবি আঁকার ক্ষমতার কথা বলেছে কিন্তু যে বিষয়টি গোপন করে গেছে তা হল সে নিজেও চমৎকার ছবি আঁকতে পারে। বললাম না সে সব কাজে মারুফকে অনুসরণ করত? তাই গোপনে গোপনে একজন বিখ্যাত চিত্র শিল্পীর কাছে সে ছবি আঁকা শিখেছে। হতে পারে মারুফ ছবি আঁকা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে ব্ল্যাক আউট হয়ে ছবি আঁকার ব্যাপারটা আসলে ভুয়া। হাসান তার অজান্তে ছবি এঁকে রাখত, আর মারুফ ভাবত সে নিজে ব্ল্যাক আউটের সময় ছবিটা এঁকেছে! এভাবে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য মারুফ নিজের ছবি আঁকার ক্ষমতাকে দায় করেছে কিন্তু ফায়দা লুটেছে হাসান।
... আমি ধারনা করছি মারুফ আর শেফালীর মধ্যে এক সময় প্রেমের সম্পর্ক ছিল যা হাসান জানত না। কিন্তু শেফালীর বাড়ি থেকে হাসানের সাথে তার বিয়ে ঠিক হওয়ার পর ব্যাপারটা হাসান জানতে পারে। যেহেতু সব কাজে মারুফকে সে হিংসা করত তাই মারুফের প্রতি শেফালীর টান হাসান মেনে নিতে পারেনি। একদিন মারুফের অজান্তে হাসান শেফালীর মৃতদেহের ছবি আঁকে। মারুফ ধারনা করে ছবিটা তার নিজের আঁকা। আরও একবার মারুফের ছবি আঁকার ক্ষমতাকে অভিশাপ হিসেবে দেখানোর সুযোগ পেয়ে গেল হাসান।
... এসবই আসলে আমার ধারনা! জোর দিয়ে বলার মত নিরেট কোন প্রমাণ হাতে পাইনি”।

“কিন্তু একটা জিনিস এখনও পরিষ্কার হচ্ছেনা”। রবিন একটু থামতেই ইকবাল খান বলল। “হাসান কেন পুলিশের সাহায্য চাইল শেফালীকে বাঁচানোর জন্য?”“এই প্রশ্নের সরাসরি কোন কোন উত্তর দেয়া সম্ভব নয়”। মাথা নাড়ল রবিন। “সম্ভবত হাসানের মনের একটা অংশ চাইছিল শেফালীকে বাঁচাতে। হতে পারে তার মধ্যে একটা দ্বৈত স্বত্বার বাস! তাই পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছিল”।

“তাহলে বল হাসান কেন এমন একটা সময় শেফালীকে খুন করল যখন মারুফ জেলখানায় বন্দী?” আবার রবিন কে লক্ষ করে প্রশ্ন ছুঁড়ল ইকবাল খান। “সে যদি মারুফের জেলমুক্তির পর শেফালীকে খুন করত তাহলে আমাদের সব সন্দেহ মারুফের ওপর গিয়ে পড়ত। মারুফকে ফাঁসিয়ে দেয়ার এমন চমৎকার সুযোগ হাসান কেন হাতছাড়া করল?”

“বললাম তো অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও পাইনি আমি”। বলল রবিন। “তবে ধারনা করতে পারি যে এখানেই মানসিক অসুস্থতার প্রসঙ্গটি চলে আসছে! হাসান মারুফকে যতই হিংসা করুক। তারা আসলে খুব কাছের বন্ধু! তারা দুজনে ছিল দুই দেহে এক আত্মার মত। আমাদের সন্দেহের হাত থেকে মারুফকে বাঁচানোর জন্য সে খুনটা ঐ সময় করেছে। যেন আমরাও ধারনা করে বসি মারুফের অলৌকিক কোন ক্ষমতা রয়েছে! মারুফ ও হাসান এঁকে অপরের প্রতি অবসেসড। তাদের বন্ধুত্ব বন্ধুতা ছাড়িয়ে মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে চলে গেছে। তারা দুজন এক সাথে থাকে, এক সাথে চলে, একসাথে খায়, এক ভাবে চিন্তা করে, একে অপরকে ছাড়া চলতে পারেনা”।

“কিন্তু তুই যা যা বলছিস এগুলো সবই নিছক ধারনা! কোন নিরেট প্রমাণ ছাড়া পুলিশ এক পাও এগোতে পারবে না। আমরা হাসানকে শুধু শেফালীর খুন ছাড়া আর কোন অপরাধের সাথে জড়াতে পারছি না। অবশ্য তার ফাঁসি হয়ে যাওয়ার জন্য ঐ একটা অপরাধই যথেষ্ট”! এক মুহূর্ত থেমে থেকে আবার ইকবাল প্রশ্ন করল রবিনকে। “আমার রিপোর্টের ব্যাপারে তোর কি কোন সাজেশন আছে?”

“আমার মনে হয় রিপোর্টে তোর উচিৎ হাসানকে মানসিক রোগী হিসেবে দেখানো”! বলল রবিন। “কেন যেন মনে হচ্ছে এর ভেতরে আরও কিছু ব্যাপার রয়ে গেছে যা আমাদের নজরে পড়ছে না। সে যে কাজ গুলো করেছে তা কোন স্বাভাবিক চিন্তা-বুদ্ধি সম্পন্ন লোকের পক্ষে করা সম্ভব নয়! তার মত একজন সাইকোলজিকাল ডিসঅর্ডারে ভোগা মানুষের চিকিৎসা হওয়া প্রয়োজন”!

চলবে...

বিদেশি গল্প অবলম্বনে
সম্পাদনা : হাসান মির্জা

Abid faraje, Sk nadim, Sume akter, Arif howla, Sk limon, Soneya islam, Sheikh anika and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 4
স্বর্ণমুদ্রা : 150
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-30
View user profile

ক্যানভাস  Empty Re: ক্যানভাস

Fri Jun 04, 2021 8:40 pm
শেষ খন্ড

"আট"
শহরের বাইরে খুব সুন্দর প্রায় প্রাসাদসম বাগান বাড়ি, সবুজের ঘাসে হেটে হেটে মেঠো পথে হারিয়ে যাওয়া যায়। মারুফ নাম দিয়েছে আপন হারা পথ। বাগানবাড়িতে মারুফ সম্পূর্ণ একা। মারুফের এক চাচা এই বাড়ির মালিক। ভদ্রলোক পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে থাকেন বলে বাড়িটা প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থাতে পড়ে আছে। মারুফ আর হাসান প্রায়ই এসে কিছুদিন থেকে যায় এখানে। কিন্তু আজ মারুফের পাশে হাসান নেই!!
হাসান পুলিশের হাতে বন্দী।

প্রিয় বন্ধুকে ছাড়া খুব একা লাগছে মারুফের। এতটা নিঃসঙ্গতা তাকে আগে কখনও গ্রাস করতে পারেনি। ছোট বেলা থেকে এক সাথে বেড়ে উঠেছে দুজন! কত অসংখ্য ঘটনা জমে আছে স্মৃতির পাতায়!
২০ বছর আগে...

স্কুল ছুটির পর হাসানকে ডেকে একপাশে নিয়ে গেল মারুফ। “হাসান, আমাকে বাঁচা। একটা সমস্যা হয়ে গেছে”!

“কি সমস্যা?”

“সেদিন জালালের হাত পা ভাঙা অবস্থার যে ছবি এঁকেছিলাম, সেই খবর জালাল জেনে গেছে”।

“কি বলিস?” হাসানের চোখে ভয় ফুটে উঠল।

“জালাল আমাকে বলেছে আজ বিকেলে ঐ বড় আমগাছের নিচে দেখা করতে। একটা জরুরী বিষয়ে নাকি কথা বলবে”!

“কথা বলবে না মারুফ! ও তোকে পিটাবে। তুই ছবিতে জালালকে যেভাবে পড়ে থাকা দেখিয়েছিস। জালাল তোকে পিটিয়ে ঠিক সেভাবেই ফেলে রাখবে”।

“আমি জানি। এজন্যই তো সে আমাকে আমগাছের নিচে ডেকেছে! কিন্তু এখন উপায় কি?”

“দরজা আঁটকে বাসায় বসে থাকবি। ভুলেও ওদিকে যাবিনা”!

“কিন্তু তুই তো জালালকে চিনিস! আজ যদি আমি না যাই তাহলে পরে আমাকে একলা পেলে আরও বেশি মারবে”।

“পরেরটা পরে দেখিস। এখন থেকে একলা বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দে। সব সময় বড়দের সাথে চলা ফেরা করবি। কদিন বাদেই দেখবি ঘটনাটা জালাল ভুলে গেছে”!

হাসানের পরামর্শটা মারুফের পছন্দ হলনা। জালাল সহজে বিষয়টা ভুলবে না, আজ না হোক কাল, এক সময় শোধ তুলবেই। কতদিন সাবধানে বড়দের সাথে চলাফেরা করবে সে? মারুফ সিদ্ধান্ত নিলো জালালের সাথে দেখা করবে। জালাল কিছু বলার আগেই তার পা চেপে ধরে মাফ চাইবে। এছাড়া বাঁচার আর কোন উপায় নেই।

বিকেল বেলা মারুফ সাহস করে বাসা থেকে বের হল। গাঁয়ের মসজিদের সামনের রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে গেলে শেষ মাথায় বড় আমগাছটা পড়ে। মসজিদ পার হয়ে এসে বড় রাস্তায় উঠতেই সামনে হাসানকে দেখতে পেল মারুফ। হাসানের হাতে একটা মোটা লাঠি! ঘটনা কি?

আমগাছের কাছ পর্যন্ত গিয়ে রাস্তা ছেড়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে গেল হাসান। মারুফও তার দেখাদেখি লুকিয়ে পড়ল। বিষয়টা তার বোধগম্য হচ্ছেনা। হাসান ঝোপের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। জালাল এদিকে পেছন ফিরে বড় রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
মারুফ দেখল হাসান নিঃশব্দে একেবারে পেছনে গিয়ে হাতের লাঠিটা জালালের মাথায় সজোরে নামিয়ে আনল! প্রায় সাথে সাথেই মাটিতে পড়ে গেল জালাল। আর নড়া চড়া করছে না সে। সম্ভবত অজ্ঞান হয়ে গেছে! নাকি মরেই গেল। জালালের নিস্তেজ দেহটাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করল হাসান। মারুফ দৌড়ে এসে থামাল হাসানকে। হাসানের চোখে মুখে এখন অন্যরকম এক অভিব্যক্তি। এই দৃষ্টির অর্থ মারুফের জানা নেই। সে ধাক্কা দিয়ে মারুফকে সরিয়ে দিল। তারপর লাঠিটা মাটিতে ফেলে বড় রাস্তা ধরে দৌড় লাগাল। পালাচ্ছে সে। মারুফ বুঝল তারও পালান দরকার। কিন্তু বন্ধুর ওপর সে খুব কৃতজ্ঞ বোধ করছে। মারুফের বিপদ দেখে হাসান কত্ত বড় ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে এসেছে!

পরদিন হাসান স্কুলে যেতেই দেখল সব বাচ্চারা তাকে ভয় পাচ্ছে! কেউ সাহস করে কাছে আসছে না! তার আঁকা ছবি সত্য হয়েছে, এই ঘটনার কথা সবার কানে পৌঁছে গেছে! হাসান হঠাৎ প্রায় দৌড়ে এসে বলল, “মারুফ তুই আর ছবি আঁকবি না! তোর ছবি আঁকার হাত অভিশপ্ত!”
“কি বলছিস?”

“হ্যা, তুই ছবি এঁকেছিস বলেই তো জালালের এই অবস্থা হয়েছে”!
“আমার জন্য এই অবস্থা হয়েছে? গতকাল বিকেলের কথা কি ভুলে গেছিস? কোথায় ছিলি তুই?”

“কেন ভুলব? বাসাতেই ছিলাম”!

মারুফ ভাবল হাসান হয়ত দায় এড়ানোর জন্যই মিথ্যা বলছে। তবুও বন্ধুর প্রতি সে কৃতজ্ঞ বোধ করছে! বড় একটা বিপদ থেকে তাকে বাঁচিয়েছে হাসান।

কয়েকদিন পার হয়ে গেল। গ্রামের ছেলে মেয়েরা এখন আর মারুফের সাথে মেশেনা। সবাই তাকে ভয় পায়। এমনকি জালালও তাকে ভয় পেয়ে এড়িয়ে চলে। এখন তার একমাত্র বন্ধু হাসান! অবশ্য সেদিন বিকেলের কাণ্ড নিয়ে হাসান আর মারুফের মাঝে আর কোন কথা হয়নি।

একদিন চুরি করে নরহরি কাকার দোকান থেকে মিষ্টি খেতে গিয়ে ঘটল আরেক বিপত্তি। সারা গ্রামে দুজনে চোর অপবাদ পেয়ে গেল। এবার নরহরি কাকার একটা ছবি আকল মারুফ। এক চোখে গেঁথে আছে একটা কাটা চামচ। ছবিটা শুধু হাসানকে দেখাল মারুফ। আর কাউকে না।

পরদিন দুপুরে হাসানের সাথে দেখা করতে তার বাড়িতে গিয়েছিল মারুফ। বাড়ির গেট থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকতেই সে দেখল হাসান বাসা থেকে বেরিয়ে দ্রুত গতিতে কোথাও যাচ্ছে। নীরবে তার পিছু নিলো মারুফ। হাঁটতে হাঁটতে দুজনে বাজারে চলে এলো। নরহরি কাকা তখন অন্যান্য দিনের মত মিষ্টির দোকানে বসে ঝিমোচ্ছে। দুপুরবেলা আশে পাশে মানুষজন কম। দোকানে কাস্টমারও নেই।
হাসান নিঃশব্দে দোকানে ঢুকে পড়ে একটা কাটা চামচ হাতে তুলে নিলো। নরহরি কিচ্ছু টের পেলনা। মারুফ আড়ালে লুকিয়ে সবকিছু দেখছিল। আচমকা ক্ষিপ্র গতিতে কাঁটা চামচটা নরহরির এক চোখে বসিয়ে দিল হাসান। চোখের মধ্যে চামচের কাঁটা গুলো ঢুকে যাওয়ার এক বিচ্ছিরি শব্দ হল। নরহরি কাকা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু ততক্ষণে দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছে হাসান। কোনদিকে না দেখে সোজা দৌড় লাগালো পালিয়ে যাওয়ার জন্য।

পরদিন হাসানের সাথে বিষয়টা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করল মারুফ। কিন্তু হাসান ভান করল যেন কিছুই জানেনা। এর পর এমন আরও কিছু ঘটনা ঘটার পর একটা সময় মারুফ বুঝতে পারল হাসান আসলে কাজগুলো করার পর ভুলে যায়! হাসান মনে প্রাণে বিশ্বাস করে মারুফের কোন অলৌকিক ক্ষমতা আছে। কিন্তু অবচেতন মন সে ধারনা সত্য প্রমাণের জন্য কাজ করে চলেছে।

আর একটু বড় হওয়ার পর হাসানের এই সমস্যার একটা নাম খুঁজে পেল মারুফ। ডুয়েল পারসোনালিটি!

হাসানের মধ্যে দ্বৈত স্বত্বার বাস! ব্যাপারটা ধরতে পেরে ঘাবড়ে গিয়েছিল মারুফ। ছবি আঁকা ছেড়ে দিল। কিন্তু হাসানের এই মানসিক অসুস্থতার সুযোগ নিতে সে কখনও ছারেনি। হাসানের এই দ্বিতীয় সত্ত্বাটি প্রচণ্ড পরিমাণে বুদ্ধিমান ও অত্যন্ত কৌশলী। মারুফ যে ছবি আঁকে তা বাস্তব করা অসম্ভব হলেও সে ঠিকই একটা পথ খুঁজে নেয়! ফলে মারুফের জীবনে যারাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, ছবি এঁকে তাদেরকে সরিয়ে দেয়ার কাজটা সে খুব সচেতন ভাবেই করে চলেছে। ওদিকে হাসান জানেনা তার ভেতরের দ্বিতীয় সত্ত্বাটির রূপ যে কতটা ভয়ংকর!

বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মারুফের ঠোঁটের কোনে একটু হাসি খেলে গেল! আরও একজন বুদ্ধিমানের দেখা পেয়েছে সে। লোকটা হচ্ছে ড. আশরাফ রবিন! ঘটনার প্যাঁচে ফেলে লোকটাকে ঘোল খাওয়ানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছে মারুফ। কিন্তু লোকটা সাইকোলজির শিক্ষক, ঠিকই গন্ধ শুকে শুকে সমাধানের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে! এবার চূড়ান্ত একটা ব্যবস্থা না নিলে ঝামেলা হয়ে যেতে পারে!

"নয়"
মারুফের বিরুদ্ধে এটেমট টু মার্ডারের কেস করার পর তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র সব পুলিশ কাস্টডিতে আনা হয়েছিল প্রমাণ সংগ্রহের জন্য। তার মধ্যে একটা পুরনো ডায়েরী ছিল। ডায়েরীটা রবিন নিয়ে এসেছে পড়বে বলে। তারপর মনের ভুলে ফেলে রেখেছিল ডেক্সের ওপর। মাঝখানে ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষার খাতা দেখা নিয়ে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এখন অবসর হতে ডায়েরীটা চোখে পড়েছে।

হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখল রবিন। ডায়েরীর বেশির ভাগ পৃষ্ঠাই খালি। কয়েক যায়গায় কলম দিয়ে স্কেচ এঁকে ফুটিয়ে তুলেছে দুর্দান্ত কিছু ছবি। তবে মাঝে মধ্যে মুক্তগদ্যের মত কিছু লেখা চোখে পড়ছে। ছেলেটার মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল! মুক্তগদ্য বিষয়টাকে কেমন যেন হেঁয়ালি মনে হয় রবিনের কাছে, খুব একটা বুঝতে পারেনা সে।

পুরো ডায়েরী উল্টে পালটে দরকারি কিছু না পেয়ে ফেরত দিবে বলে ভাবছিল রবিন, ঠিক তখনই একটা মুক্তগদ্যে চোখ পড়ল। গদ্যের ভেতর একটা যায়গায় “শেফালী” নামটা নজরে এসেছে তার। পুরোটা পড়তে শুরু করল সে...

আমার চোখের সামনে প্রায়ই ভেসে ওঠে এক চিরচেনা পথের ছবি। এই পথ আমাকে চিনিয়েছিলো এক গ্রাম্য কিশোরী, তার নাম শেফালী। শেফালী ছিল আমার মনের ক্যানভাসে আঁকা ছবির তুলি। এই তুলিতে এঁকেছিলাম জীবনের প্রথম শ্রাবণ। শেফালী তার সন্ধেবেলার পড়া ফেলে দুটি নগ্ন পায়ে কাদার আলতা মেখে এগিয়ে আসত এই পথ ধরে। আমি আকাশ থেকে বৃষ্টি হয়ে তার গায়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়তাম। দুজনে আলতো পায়ে হেঁটে জীবনের গল্পগুলো মাখিয়ে দিতাম সবুজ ঘাসের বুকে।

তবে একদিন শেফালী তার রূপ বদলে নিলো। আপনহারা ঐ পথ ধরে হেঁটে আসার সময় মেলে ধরল ছাতা, আমি সেদিন আর বৃষ্টি হয়ে তার গায়ে ঝরে পড়তে পারিনি। ছাতার গায়ে মাথা ঠুকতে ঠুকতে একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম পথের মাঝে। শেষ হয়ে গেল শ্রাবণ মেঘের সন্ধ্যা। এলো ঘরভাঙা রোদের দুপুর।

তবে শেফালী যে রোদের হাত ধরে বর্ষার দিনে কথা ভুলে গেল, সে জানেনা ঐ রোদ আসলে আমার আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের জ্বিন। আমি হুকুম করতেই সে জ্বিন সমস্ত পৃথিবীকে ওলট পালট করে দেয়! শেফালীকে রোদের সাথে মিলে এক হতে দেবনা আমি। একদিন তুলির আঁচরে লিখে দেব তার নৃশংস মৃত্যু! আমার জ্বিন তার মুণ্ডুটা টেনে ছিঁড়ে এনে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে!

তারপর আমি কোনো এক নিঃসঙ্গ দুপুরবেলা একাই চলে যাব এ পথের শেষ মাথায়, যেখানে আমার এক রাজ প্রাসাদ আছে! যাওয়ার সময় বুক পকেট খালি রাখতে হবে, নইলে আপনহারা পথে মিশে থাকা শেফালীর শোকের ছায়া আমি কোথায় রাখব? আমাকে কেউ দেখতে পাবেনা। আমি আর আমার জ্বিন মিলে নতুন করে লিখব ঐ আপনহারা পথের ইতিহাস।

এর পর দ্রুত পাতা উল্টে অন্যান্য মুক্ত গদ্য গুলো পড়া শুরু করল রবিন। সবগুলো গদ্যতে আলাদীনের এক আশ্চর্য প্রদীপের জ্বিনের কথা বলেছে মারুফ। যে তার হয়ে সব ধরনের কাজ করে দেয়! রবিনের আর বুঝতে বাকি নেই যে আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের জ্বিন বলতে সে আসলে হাসানের কথাই বুঝিয়েছে। এই মুক্তগদ্যগুলো আসলে এক একটা ছবি আঁকার আগের প্ল্যান! খুব চমৎকার ভাবে প্ল্যান করে নিজের জীবনের যত অপছন্দের মানুষ আছে তাদের অনিষ্ট করে বেড়াচ্ছে মারুফ।

ডায়েরী ফেলে ঝট করে উঠে দাঁড়াল রবিন! তার ধারনাই ঠিক! হাসানের মাঝে আসলেই দ্বৈত-সত্ত্বার বসবাস। অবচেতন মনে সে মারুফের আঁকা ছবি গুলো সত্য প্রমাণিত করছে ঠিকই কিন্তু সচেতন মন সে খবর পাচ্ছেনা।
কিন্তু রবিন ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে সব কিছুর আড়ালে বসে কলকাঠি নাড়ছে মারুফ। হাসানের এই অসুস্থতার কথা জানে সে। এটাকে ব্যবহার করছে নিজের সুবিধার জন্য। সর্বশেষ শেফালীকেও সরিয়ে দিয়েছে তার ভালবাসা ফিরিয়ে দেয়ার অপরাধে!

এখন সব প্রশ্নের উত্তর খুব সহজেই মিলে যাচ্ছে! প্রথম থেকেই রবিনকে প্যাঁচে ফেলার জন্য অদ্ভুত সব চাল চেলেছে মারুফ! কিন্তু এইবার ধরা পড়ে গেছে!

দ্রুত মোবাইল বের করে ইকবাল খানের নম্বরে ডায়াল করল রবিন। কিন্তু কি বলবে সে? এই মুক্তগদ্য গুলো তো তার কথার প্রমাণ হিসেবে টিকবে না! নিরেট প্রমাণ সে দেবে কি করে? জেলে যাবে? হাসানের সাথে দেখা করবে?

"দশ"
জেলখানায় হাসানকে একা একটা সেলে রাখা হয়েছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে চিন্তা করলে বিলাসিতাও বটে! সেলের ভেতরকার অবস্থাও খুব একটা খারাপ না। একটা লোহার খাটিয়া, শক্ত তোষক সাদা চাদর, বালিশ শাহী আয়োজন। সেলের সাথেই একটা টয়লেট আছে ফলে যখন তখন প্রকৃতি ডাকলেও সাড়া দিতে সমস্যা হবে না। ঠিক ভিআইপি না হলেও সেমি ভিআইপি কারাগার বলা চলে।

হাসান ভেবে পায়না তাকে এমন একটা সেলে রাখা হয়েছে কেন? খুব ভায়োলেন্ট টাইপের কয়েদীদের সাধারণত এভাবে অন্যান্য কয়েদীদের থেকে একটু আলাদা রাখা হয়। বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয় যেন উলটা পালটা কিছু করার চিন্তা মাথায় আসার অবকাশ না পায়। তবে কি তাকে ভয়ংকর ঠাণ্ডা মাথার খুনি হিসেবে ট্রিট করা হচ্ছে?

আপন মনে একটু হাসল হাসান। শুনেছে খুব দ্রুত তাকে একটা আধা সরকারি মানসিক ইন্সটিটিউশনে ট্রান্সফার করা হবে। সে নাকি কঠিন একটা সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারে ভুগছে! মানুষের খোলসের আড়ালে মাঝে লুকিয়ে আছে এক অমানুষ! যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে এসে সব কিছু ধ্বংস করে দেবে। পাগলে বিশ্বাস কি?

“ হাসান”!

নাম ধরে ডাক শুনে চমকে উঠল হাসান। গভীর চিন্তায় নিমগ্ন থাকায় কারো হেঁটে আসার শব্দ শুনতে পায়নি সে। উত্তর দিল। “জী?”

“তোমার জন্য একটা চিঠি এসেছে”! বলল সেলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ডিউটি অফিসার।

“ধন্যবাদ স্যার”। হাত বাড়িয়ে চিঠিটা ধরল হাসান। খামের ওপর প্রেরকের নামটা পড়ল- মারুফ মুক্তাদির। খামটা খোলাই আছে। তার কাছে দেওয়ার আগে চিঠিটা খুলে পড়ে দেখেছে জেল কর্তৃপক্ষ। চিঠিটা বের করল হাসান। খুব সংক্ষিপ্ত চিঠি...হাসান,

আমি জেলখানায় তোর সাথে একবারও দেখা করতে আসিনি দেখে তুই হয়ত খুব অবাক হচ্ছিস। কেন আসিনি সেই কারনটা শোন- আমি তোকে ঘৃণা করি মারুফ। কেমন করে পারলি শেফালীর মত নিষ্পাপ একটা মেয়েকে এভাবে খুন করতে? সারাটা জীবন তুই আমাকে ধোঁকা দিয়ে এসেছিস! আমার ছবি আঁকার প্রতিভা সবার কাছ লুকিয়ে রেখে তোর কি লাভ হল?

তোর মানসিক অসুস্থতা আমি মানিনা। আমি প্রার্থনা করি যেন তোর খুব কঠিন শাস্তি হয়।

ইতি
মারুফ মুক্তাদির

কাগজের খালি যায়গাতে হাত বুলাতেই চিকন করে কাঁটা মোম ঘষে ঘষে কিছু একটা লেখার অস্তিত্ব টের পেল হাসান। ছোট বেলা থেকে গোপন মেসেজ আদান প্রদানের এই খেলাটা খেলে আসছে তারা দুজন! বোকা জেলার সেটা ধরতেই পারেনি। হো হো করে হেসে উঠল হাসান। চিঠিটা সেলের ভিতরে জ্বলতে থাকা বাল্বের দিকে উঁচু করে ধরল। আলোর বিপরীতে ধরতেই এবার চিঠির ভেতরে আরেক চিঠির সন্ধান পাওয়া গেল...

প্রিয় হাসান,
জীবনের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তুই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিস। আজ আমারও উচিত তোর পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। কিন্তু আমি মনোবল হারিয়ে ফেলেছি। তার মানে কখনও ভেবে নিস না যে তুই আর আমি আলাদা কিছু।

আর কেউ না জানুক, আমি জানি তুই একজন জিনিয়াস। তোর পক্ষে কোন কাজই অসম্ভব নয়। জেলখানার চার দেয়াল তোকে আঁটকে রেখেছে- এই কথা আমাকে বিশ্বাস করতে বলিস? আমি জানি তুই ঠিকই নিজেকে মুক্ত করে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজে নিতে পারবি।
আমি এখন কোথায় আছি জানিস? আমাদের সেই বাগানবাড়িতে! খুব একা লাগছে রে! তাড়াতাড়ি চলে আয় না! তোকে ছাড়া এভাবে একা কখনও থেকেছি বল? আর ভাল লাগছে না। জলদি চলে আয় বন্ধু! আমি তোর অপেক্ষায় বসে আছি!

আর একটা কথা! গতকাল রাতে একবার ব্ল্যাক আউট হয়েছিল আমার। তখন নতুন একটা ছবি এঁকেছি। দেখিস!

ইতি
তোর প্রাণের বন্ধু
মারুফ মুক্তাদির

চিঠি ফেলে খামটা হাতে নিলো হাসান। কোথায় ছবি? ভেতরে তো আর কোন কাগজ নেই! কিছুক্ষণ খামটা উল্টে পালটে দেখেই ব্যাপারটা ধরতে পারল সে। আসলে চিঠির খামটাই বানানো হয়েছে ছবি দিয়ে। আস্তে আস্তে আঠা ছাড়িয়ে খামটা পুরোপুরি মেলে ধরল হাসান। খামের ভেতর দিকে ছবিটা আঁকা ছিল বলে জেলারের চোখে পড়েনি! একজন মানুষ গলায় দড়ি বাঁধা অবস্থায় সিলিং থেকে ঝুলছে। আধ হাত জিভ বেরিয়ে এসেছে! চেহারারা চেনা চেনা লাগছে হাসানের। আরও ভাল করে লক্ষ করতে বুঝল মৃত লোকটা আসলে আশরাফ রবিন!

চোখ দুটো হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠল হাসানের। সেলের বাইরে উঁকি দিয়ে দেখল করিডোরের শেষ মাথায় দুই জন গার্ড দাঁড়িয়ে আছে! রাতের বেলা জেলে খুব একটা কড়া পাহারা থাকেনা। এই দুজনকে কাবু করতে পারলে জেল থেকে বেড়িয়ে যেতে খুব একটা বেগ পেতে হবেনা!

হঠাৎ পেট চেপে ধরে শুয়ে পড়ল হাসান। “আহ... উহ... মাগো... মরে গেলাম গো... পেটে কি ব্যথা...”

গার্ড দুজন হাসানের সেলের দিকে দৌড়ে আসার দুপ দাপ শব্দ শোনা যাচ্ছে!

(সমাপ্ত)

বিদেশি গল্প অবলম্বনে
সম্পাদনা : হাসান মির্জা

Abid faraje, Sk nadim, Sume akter, Arif howla, Sk limon, Soneya islam, Sheikh anika and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum