সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:23 pm
(পর্ব : এক)

'আলো জ্বালাই?'
'আগে কাপড় পরো, তারপর।'
নিতু বিছানায় হেলান দিয়ে বসলো। পাতলা চাদর দাঁত দিয়ে ধরে ব্লাউজ পরে নিল। বাদলের পিঠে আলতো করে হাত রাখল। বাদল উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। খালি গা। শরীরের তাপমাত্রা একটি বেশি।
নিতু বলল, 'শরীর খারাপ?'
বাদল বিরক্তির স্বরে বলল, 'না।'
নিতু ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে নামল। সুইচ টিপে আলো জ্বালাল। বিছানার এক পাশে শাড়ি পড়ে আছে। বাদল ভ্রু কুঁচকে ধীর গলায় বলল, 'তোমাকে না বললাম, কাপড় পরে আলো জ্বালাতে!'
নিতু জবাব দিলো না। ওয়াড্রোব খুলল। একটি তাকে দু'টো শাড়ি রাখা। একটি গাঢ় নীল অন্যটা কালো। সে কালো শাড়ি হাতে নিল। শোবার ঘরের সাথে অ্যাটাচ বাথরুম। বাথরুমের দিকে পা বাড়াল।
শাওয়ার ছেড়ে গা ভেজাল মিতু। বৃষ্টির ন্যায় পানি ঝড়ছে। প্রথমে মাথায়, কপাল বেয়ে নাকে, তারপর গলায়, একসময় পেটে। তারপর পা বেয়ে বাথরুমের টাইলসে মিশে যাচ্ছে অজস্র জলের শ্রোত। শীত লাগছে। ভালোও লাগছে। শীতের রাতে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করতে অন্যরকম এক ভালোলাগা কাজ করে। সবচে' মজার বিষয় হলো, গোসলের সময় পানি থেকে ধোঁয়া বেরোয়। দেখতে মনে হয় গরম পানি। আসলে ঠান্ডা।
গায়ে সাবান মাখতে মাখতে আয়নার দিকে তাকাল নিতু। সে একটু বুড়িয়ে যাচ্ছে কি? চোখ বন্ধ করল। বিড়বিড় করে বলল, 'তেত্রিশ, তেত্রিশ।'
শাওয়ার থেকে পানি পড়া বন্ধ হয়ে গেল। টুপ টুপ করে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। শাওয়ার বন্ধ করে আবার ছাড়ল। টেপ ছেড়ে দেখল। পানি নেই। অগত্যা সাবান মাখা অবস্থায় বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল নিতু। বিছানায় বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করল। রফিকের নাম্বার ডায়েল করল।
ওপাশ থেকে রফিকের কণ্ঠ, 'স্লামালিকুম, ম্যাডাম।'
'রফিক ভাই, ঘুমাচ্ছিলেন?'
'না, ম্যাডাম। বসে ছিলাম।'
'আচ্ছা শুনুন, বাথরুমে পানি নেই। এখনি পানির প্রয়োজন। একটু আর্জেন্ট।'
'পানি নাই, ম্যাডাম?'
'না, নেই।'
'আচ্ছা আমি দেখতেছি, ম্যাডাম।'
'দেখুন। একটু তাড়াতাড়ি।'
কল কেটে হাতে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল মিতু। মিনিট দু'-এক পর বাথরুমের টাইলসে পানি পড়ার শব্দ হলো। ফোন বালিশের নিচে রেখে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল সে।
গোসল শেষে শোবার ঘরে এল নিতু। বাদলের পাশে বসে ধীর এবং শান্ত গলায় বলল, 'বাদল, এ্যাই বাদল!'
বাদল গোঙ্গানির মতো শব্দ করে ঘুমিয়ে পড়ল। নিতু বাদলের চুলে আলতো করে হাত রেখে বলল, 'এ্যাই, যাচ্ছি কিন্তু।'
বাদল ঘাড় ঘুরিয়ে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে তাকাল। চোখ টিপে চেয়ে দেখল। তারপর উঠে বসতে বসতে বলল, 'এখনি যাবে?'
'হুঁ।'
'ক'টা বাজে?'
'সাড়ে এগারোটা।'
'একা যেতে পারবে?'
'খুব পারব। আচ্ছা, তোমার কি শরীর খারাপ?'
বাদল মাথা নেড়ে বলল, 'না।'
'এখনো কাপড় পরনি?' বাদল ভ্রু কুঁচকে বলল।
নিতু একগাল হেসে বলল, 'গোসল করলাম মাত্র। তাছাড়া কাপড় তো পরাই আছে, শুধু শাড়ি...'
'শাড়ি তুমি আমার সামনে পরবে কেন? তুমি কি আমার বিয়ে করা বউ?'
নিতু ধীর গলায় বলল, 'তার থেকে বেশি।' বলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শাড়ি পরতে লাগল।
'সত্যিই তোমার শরীর খারাপ না?'
বাদল হাই তুলতে তুলতে বলল, 'না। আচ্ছা, একটা কথা বলি?'
নিতু আগ্রহ নিয়ে বলল, 'বলো।'
'তোমাকে আপনি করে ডাকলে হয় না? বয়সে তুমি আমার ছয় বছরের বড়। তুমি করে বলতে কেমন যেন অন্যরকম লাগে।'
নিতু কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বয়স, বয়সের জন্যই সে বাদলের এতটা কাছে থেকেও অনেক দূরে। যদি নিতু আর বাদল সমবয়েসি হত, তবে হয়তো এরকম হত না। বাদল যখন বয়সের ব্যাপারে কিছু বলে, নিতুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বুক ফেটে কান্না আসে। নিঃশ্বাস ভারী হয়। আচ্ছা, জীবনে বয়সটা কি খুব জরুরি? অনেকেই তো বলে, বয়স নাম্বার মাত্র। এই কথাটা সবাই মেনে নিতে পারে না কেন?
'আসি, বাদল।' বলে ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল নিতু। বাদল হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে দায়সারা হয়ে শুয়ে পড়েছে। সে একটু ঘুমকাতুরে। একটু না, অনেক বেশি ঘুমকাতুরে। একবার মাঝ রাতে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল নিতুর। পুরো ব্যাগ খোঁজার পর বুঝল, ইনহেলার সাথে আনেনি। বাদলকে বহুবার ডেকেছে। হাত দিয়ে সজোরে ধাক্কা দিয়েছে। চোখের পাতা শক্ত করে মেলে ধরেছে। বাদল উঠেনি। গোঙ্গানির মতো মৃদু শব্দ করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। সেদিনের পর আর কখনো বাদলের সাথে রাত কাটায়নি সে।
বাইরে একটু একটু শীত পড়েছে। জনমানবহীন রাস্তা। কুয়াশার কারণে কিছু দেখা যাচ্ছে না। মিনিট পাঁচেক দাঁড়ানোর পর একটি রিকশা এসে থামল। বুড়ো রিকশাঅলা কাশতে কাশতে বলল, 'কই যাইবেন?'
'হাউজিং এস্টেট। সি ব্লক।'
'উঠেন।'
নিতু রিকশায় চড়ে বসল। শীত লাগছে। গায়ের পাতলা চাদর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে। অন্যমনষ্ক হয়ে ব্যাগ খুলল। ব্যাগে বাদলের পাসপোর্ট সাইজের একটি ছবি। নিতু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আজ সে ফিরে আসতে চায়নি। পুরোটা রাত বাদলের পাশেই থাকত। সে জানে, বাদলের গায়ে একটু একটু জ্বর। আসার আগে কতবার ফিরে ফিরে তাকিয়েছে। বাদল যদি একবার বলতো, 'না গেলে হয় না?' নিতু থেকে যেত।
একবার ডোরবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিলো জাফর। নিতু যেদিন বাড়ির বাইরে থাকে, জাফর ঘুমায় না। জেগে থাকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। রাত তিনটায় ডোরবেল বাজালেও সাথে সাথে দরজা খুলে দেবে সে।
জাফর অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, 'আজ এত তাড়াতাড়ি চলে এলে যে...'
'কেন, না এলে খুশি হতে?'
'না, না। অমন করে বলছো কেন! আমি ভাবলাম আরো দেড়ি করে আসবে। আচ্ছা শুনো, আজ তোমার জন্য একটা স্পেশাল জিনিস এনেছি।'
'কী সেটা?'
'তুমি নিজেই দেখো।' জাফর নিতুকে ডায়নিং-এ নিয়ে গেল। টেবিল থেকে একটি প্লেট হাতে নিয়ে বলল, 'এই নাও তোমার প্রিয়...'
নিতু ধীর গলায় বলল, 'ফুচকা?'
'ইয়েস।'
'আমার প্রিয় কে বলল?'
'ওমা! ভার্সিটি লাইফে কত খেতে, মনে নেই?'
'খেতাম। তখন প্রিয় ছিল। এখন না।' বলে টেবিলে প্লেট রেখে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল নিতু।
'খাবে না?'
'খিদে নেই।'
'খেয়ে এসেছো?'
'না, খাইনি। আচ্ছা, মুসকানকে খাইয়েছ?'
'হ্যাঁ।'
'তুমি?'
জাফর অসহায় ভঙ্গিতে বলল, 'তোমাকে ছাড়া খাই কী করে?'
'তোমাকে ছাড়া আমি যেভাবে খাই, ঠিক সেভাবে খাবে।' বলে দরজা বন্ধ করে দিলো নিতু।
বিছানার ঠিক মাঝখানে কাঁচুমাচু হয়ে শুয়ে আছে মুসকান। নিতু বহুবার বলেছে বিছানার এক পাশে ঘুমাতে। মুসকান শুনেনি। সে বলে, তার বাবা এক পাশে ঘুমাবে আর নিতু এক পাশে। এসব কথা শুনে জাফর দাঁতে দাঁত চেপে হাসে, মুসকানের গালে-কপালে চুমু খায়, কোলে বসিয়ে বলে, 'না আম্মু। তোমার মা আমাকে ওই সোফায় ঘুমাতে বলেছে।'
মুসকান গাল ফুলিয়ে বলে, 'মা কি তোমার উপর রেগে আছে, বাবা?'
জাফর হাসতে হাসতে বলে, 'না, আম্মু। আমি ঘুমিয়ে পড়লে প্রচুর নাক ডাকি তো। তাই তোমার ঘুম ভেঙে যাবে। তুমি আর ঘুমাতে পারবে না। এজন্যই তোমার মা আমাকে সোফায় ঘুমাতে বলেছে।'
তারপর বাপ-মেয়ের অনেক কথা হয়। নিতু গম্ভীর ভাব নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে দেখে। একসময় বিরক্ত হয়ে চলে যায়। বাপ-মেয়ের কথা ফুরোয় না।
মুসকানের পায়ের নিচ থেকে বুক পর্যন্ত চাদর টেনে দিলো নিতু। ছোট্ট, পাঁচ বছরের মেয়েটা। এই মেয়েই নিতুর একমাত্র সম্পদ। বেঁচে থাকার ওষুধ। বুকের ধন।
জানালা খুলে বাইরে দৃষ্টি রাখল নিতু। দুতলা বিল্ডিং। ওপাশে কুয়াশা চাদরে ঢাকা সরু রাস্তা। শীত পড়েছে। গায়ের চাদরটা আরো একটু জড়িয়ে নিয়ে বাদলের নাম্বার ডায়েল করল। দু'বার কল কাটার পর তৃতীয় বার রিসিভ করে বলল, 'হ্যালো!' গলাটা ভারী।
নিতু ধীর গলায় বলল, 'বাসায় চলে এসেছি।'
'আচ্ছা।'
'তোমার কি শরীর খারাপ করেছে?'
'না, আমি ঠিক আছি।'
'জ্বর কিংবা মাথা ব্যথা?'
'না, নেই।'
'বাদল, তুমি কি আমার থেকে কিছু গোপন করছো?'
ওপাশ থেকে জবাব আসলো না। নিতু কড়া গলায় বলল, 'বাদল! এ্যাই বাদল!'
এবারও কোনো জবাব আসলো না। কানের কাছে আলতো করে ফোন ধরে রাখল নিতু। সে জানে, বাদল ঘুমিয়ে পড়েছে। কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যেস তার বহু পুরনো। গভীর দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিশে গেল।
দরজায় দু'বার টুকা দেওয়ার শব্দ হলো। তৃতীয় বার টুকা দেওয়ার আগে নিতু দরজা খুলল। ধীর গলায় বলল, 'কী চাই?'
জাফর অসহায় ভঙ্গিতে বলল, 'আজ তোমাদের সাথে ঘুমাই?'
নিতু লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে ভ্রু কুঁচকে বলল, 'না, দরকার নেই। প্রতিদিন তো ও-ঘরে ঘুমাও। আজ কী হলো?'
জাফর ধীর গলায় বলল, 'আজ কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে, বড় কোনো বিপদ হবে আজ রাতে। কী বিপদ হতে পারে বলো তো?'
নিতু বিরক্ত গলায় বলল, 'আর কিছু বলবে?'
'তোমার ওই ভ্যাগাবন্ডের সাথেও কি এরকম আচরণ করো তুমি? আগে তো এরকম ছিলে না!'
নিতু ভ্রু কুঁচকে বলল, 'ভ্যাগাবন্ড কে?'
'তোমার প্রেমিক। কী যেন নাম...'
'তুমি ওঁকে ভ্যাগাবন্ড বলো কোন সাহসে?'
'ওমা! সে তো ভ্যাগাবন্ড-ই!'
'না, সে ভ্যাগাবন্ড না। কখনোই না। তুমি আর কখনো ওঁকে ভ্যাগাবন্ড বলবে না।' বলে দুম করে দরজা বন্ধ করে দিলো নিতু। জাফর দরজায় টুকা দিয়ে বলল, 'আচ্ছা। আর বলব না। একটু জায়গা হবে, তোমার ঘরে? বিছানার এক পাশে শুয়ে পড়ব।'
ওপাশ থেকে সাড়া না পেয়ে জাফর বলল, 'ফ্লোরে শুয়ে পড়ব। এতটুকু দয়া করো।'

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Abid faraje, Sume akter, Abul basar, Santa akter, Sakib sikdar, Nafisa akter, Pk monish and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty Re: নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:39 pm
(পর্ব : দুই)

'এই যে, শুনছেন?'
বাদল থমকে দাঁড়াল। সড়ক বাতির নিচে একটি মেয়ে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। শীতকালে ছাতা! বাদল ভ্রু কুঁচকে তাকাল। নিচু গলায় বলল, 'আমাকে বলছেন?'
মেয়েটি এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, 'হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি।'
'জি, বলুন।'
'আপনি বাদল ভাইয়া না?'
'হ্যাঁ। আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?'
'আমি এক সময় নিতু ম্যামের কাছে পড়তাম। শুনলাম আপনিও নাকি উনার ছাত্র। আপনিও ছাত্র আমিও ছাত্র, এক্ষেত্রে আমরা ফ্রেন্ড, তাই না?'
'শুনুন মিস... আপনার নাম?
'আরফা।'
'শুনুন মিস আরফা, আমি নিতুর ছাত্র নই। আর আপনার ফ্রেন্ডও নই।' বলে হাঁটতে লাগল বাদল। সন্ধ্যার পর খুব বেশি কুয়াশা পড়েছে। দূরের কোনো কিছু দেখা যাচ্ছে না। আরফা দ্রুত পা চালিয়ে এসে বাদলের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল, 'আ-হা-হা, রাগ করছেন কেন? আমি তো এমনিই বললাম।'
বাদল থমকে দাঁড়াল। লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর কড়া গলায় বলল, 'আমি রেগে আছি? আমাকে দেখে কি মনে হয়, আমি রেগে আছি, বলুন?'
'দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।' বলে ফিকফিক করে হাসল আরফা। অনেকটা জোরপূর্বক হাসি থামাল। তারপর শান্ত এবং ধীর গলায় বলল, 'শুনুন মি. বাদল, আমি সোজা কথার মানুষ। যা বলি, সোজা সাপটা বলি। আই অ্যাম ইন ডিপ লাভ উইদ ইউ। সহজ বাংলায়, আমি আপনাকে ভালোবাসি। ভীষণ রকমের ভালোবাসি।'
বাদল কিছু বলল না। চুপচাপ হাঁটতে শুরু করল। দেখে মনে হচ্ছে, সে আরফার কথা শুনতে পায়নি।
আরফা চেঁচিয়ে বলল, 'তাহলে কি হ্যাঁ ধরে নেব?'
বাদল গম্ভীর ভাব নিয়ে ফিরে তাকাল। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল। সামনে ড্রেনের কাজ চলছে। ফুটপাত থেকে নেমে পিচঢালা রাস্তায় হাঁটছে সে। একটু গরম লাগছে। চামড়ার জ্যাকেটের চেইন খুলে সাত তলা বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল। নিতু কফি শপ। ভিতরে এসি চলছে। শপে পাঁচটি টেবিল। প্রতিটি টেবিলের দু'দিকে দু'টো করে চেয়ার পাতা। সবগুলো টেবিল ফাঁকা। চেয়ারে বসতেই শ্যামলা বর্ণের রোগা টাইপের একজন কোমল গলায় বলল, 'কী লাগবে, স্যার?'
'এক কাপ কফি। আর শোনো, গরম কফি ঠান্ডা করে নিয়ে আসবে। যেন এক চুমুকে জলের মতো গিলে ফেলতে পারি। বুঝেছো?'
'জি, স্যার।'
মিনিট পাঁচেক পর রোগা টাইপের লোকটি এক কাপ কফি নিয়ে এল। বাদল বলল, 'বসো। তোমার পদবী কী? ওয়েটার?'
জাফর কাস্টমারের সামনে কখনো নিজেকে শপের মালিক বলে পরিচয় দেয় না। ওয়েটার বলেই পরিচয় দেয়। আজও তাই করল। বলল, 'জি, স্যার।'
বাদল বলল, 'তোমাদের বসের নাম কী? জাফর?'
'জি, স্যার।'
'সে তো সরকারি কর্মকর্তা। তাই না?'
'জি, স্যার।'
'চাকরির পাশাপাশি কফি শপ চালায়! গুড, ভেরি গুড। কফিশপে আসে, না কি টাকা-পয়সা সব বাসায় পাঠিয়ে দিতে হয়?'
'জি, স্যার।'
'কী জি স্যার, জি স্যার করছো! জাফর শপে আসে?'
'জি, স্যার।'
'কখন আসে?'
'সন্ধ্যার পর।'
'আজ আসেনি?'
'না, স্যার।'
'তোমাদের বস আস্ত একটা ভীতু, কাপুরুষ।'
জাফর ভ্রু কুঁচকে বলল, 'বলছেন?'
'বলছি।'
'কিন্তু কেন?'
'নিজের বউকে যে ভয় পায় সে তো ভীতুই। তাই না?'
জাফর হাতের আঙুল মুখে রেখে বলল, 'বুঝলাম।'
'কাপুরুষ কেন বলেছি, জানো?'
'কেন?'
'থাক। বললে তুমি কষ্ট পাবে। শত হোক, তোমার বস।' বলে কফির কাপে একটি চুমুক দিয়ে বিল মিটিয়ে বেরিয়ে পড়ল বাদল। একটি রিকশা নিয়ে বাসায় চলে এল। পাঁচ তলা বিল্ডিং। চার তলায় বাদলের ফ্ল্যাট। দু'টো চাবি। একটি নিতুর কাছে, অপরটি বাদলের কাছে। লিফট দিয়ে চারতলায় উঠল বাদল। বিছানায় উবু হয়ে বসে আছে নিতু। বাদলকে দেখে বলল, 'কোথায় গিয়েছিলে?'
বাদল দুম করে বিছানায় বসল। সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে বলল, 'কখন এলে?'
'কিছুক্ষণ আগে।'
এস্ট্রেতে সিগারেট রেখে গায়ের শার্ট খুলল বাদল। আলমারি থেকে টি-শার্ট বের করে গায়ে দিলো। জানালা খুলে বাইরে তাকাল। ফ্লোরে খালি পায়ে হাঁটল কিছুক্ষণ। হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। মাথার চুল হাতের মুঠোয় ভরে বলল, 'সুন্দরী মেয়েরা গাধাদের কপালে জুটে! আশ্চর্য! আশ্চর্য!'
নিতু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বসে রইল। বাদলের কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝেনি সে।
বাদল বলল, 'তুমি ওই গাধাকে বিয়ে করলে কীভাবে?'
নিতু বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকাল। বাদলের এমন কথার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে।
'গাধা কেন বলছো?'
'গাধাই তো। নিজের বউ কী করে না করে, সব জানে। তবুও কিছু বলে না। গাধা নয়তো কি ঘোড়া বলব?'
নিতু ধীর গলায় বলল, 'সে আমাকে ভালোবাসতো।'
'বাসতো?'
'এখনো বাসে।'
'তুমি বাসো না?'
নিতু জবাব দিলো না। বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ধু ধু বাতাস বইছে। হিমশীতল বাতাস। শীত লাগছে। একটু একটু কাঁপছে সে।
বাদল একটা চাদর নিতুর গায়ে জড়িয়ে দিলো। নিতুর হাতে হাত রাখল। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে দু'জন। নিতু ধরা গলায় বলল, 'আজ আমায় তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।'
বাদল নির্লিপ্তভাবে বলল, 'আচ্ছা।'
নিতু বাদলের কপালে হাত রাখল। ধীর গলায় বলল, 'জ্বর তো নেই।'
'জ্বর থাকবে কেন? কাল রাতে ওষুধ খেয়েছি।'
'সত্যি বলছো?'
বাদল মুচকি হেসে বলল, 'তিন সত্যি। আচ্ছা, জাফর কি খুব হ্যান্ডসাম?'
নিতু ধীর গলায় বলল, 'একটু।'
বাদল ভ্রু কুঁচকে বলল, 'একটু?'
নিতু হেসে ফেলল। বলল, 'না, একটু না। অনেকটা হ্যান্ডসাম।'
'আমার থেকেও বেশি?'
নিতু আহ্লাদী গলায় বলল, 'আর ইউ জেলাস, বাদল?'
বাদল কিছু বলল না। শোবার ঘরে গিয়ে সিগারেট জ্বালাল। গলা বাড়িয়ে ডাকল, 'নিতু!'
নিতু শুনল না। গ্রিল ধরে নীরবে চেয়ে রইল কুয়াশা ঢাকা আকাশের দিকে।
বাদল আবার ডাকল, 'এ্যাই নিতু!'
নিতু শোবার ঘরে চলে এল।
'আরফা নামের কোনো মেয়েকে পড়িয়েছো?'
নিতু নির্লিপ্ত ভাবে বলল, 'পড়িয়েছি হয়তো। কেন?'
'আজ দেখা হয়েছিল। বলল তুমি নাকি পড়িয়েছো।'
'আর কী বলেছে?'
'বলেছে, আই অ্যাম ইন ডিপ লাভ উইদ ইউ।'
নিতু চোখ বড় বড় করে বলল, 'প্রথম দেখাতেই প্রপোজ!'
বাদল তাচ্ছিল্য করে বলল, 'ওসব মেয়েদের ভালো করে জানা আছে। এখন ভালো লেগেছে, প্রপোজ করেছে। ক'দিন পর অন্য একটি ছেলেকে ভালো লাগবে। তারপর আরো একটি ছেলে...'
নিতু আগ্রহ নিয়ে বলল, 'আমার বিষয়ে তোমার কী মত?'
'আমার কী মনে হয়, জানো?'
'কী?'
'আমার মনে হয়, তুমি এখনও জাফরকে ভালোবাসো।'
নিতু বাথরুমে গেল। এক ঝাপটা পানি মারল মুখে। তারপর বেরিয়ে এল। ধীর গলায় বলল, 'আসি তবে।'
বাদল সিগারেটের পোড়া অংশ এস্ট্রেতে ফেলে বলল, 'কাল আসবে?'
'জানি না।'
'এসো, প্লিজ। আমার খুব একা একা লাগে। তোমার তো স্বামী-সন্তান সব আছে। আমার কে আছে বলো, তুমি ছাড়া? কী হলো, আসবে তো?'
'দেখা যাক।' বলে বেরিয়ে গেল নিতু। গেটের সামনে পায়চারি করছিল রফিক। নিতুকে দেখে বলল, 'স্লামালিকুম, ম্যাডাম।'
'রফিক ভাই, একটা রিকশা ডেকে দিন তো।'
'দিচ্ছি ম্যাডাম।'
রফিক রিকশা নিয়ে এল। রিকশায় বসে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল নিতু। বারান্দায় গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাদল। মুখে সিগারেট। হাতে কী যেন একটা, ঠিক বুঝা যাচ্ছে না।
একবার ডোরবেল বাজাতেই দরজা খুলে গেল। জাফর কোমল গলায় বলল, 'শুভ সন্ধ্যা।'
নিতু ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কয়টা বাজে?'
জাফর হাতঘড়ি দেখে বলল, 'দশটা একুশ।'
'এখন কি সন্ধ্যা?'
জাফর আমতা আমতা করে বলল, 'না, রাত।'
'তাহলে সন্ধ্যা বললে যে!'
জাফর অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইল।
নিতু শোবার ঘরে যাচ্ছিল। জাফর বলল, 'একটা মজার ঘটনা শুনবে?'
'গুড নাইট।' বলে শোবার ঘরে চলে গেল নিতু। দরজা বন্ধ করল না। জাফর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আহ্লাদী গলায় বলল, 'আজ কী হয়েছে জানো...'
নিতু বিরক্ত গলায় বলল, 'গুড নাইট বলেছি, শুনতে পাউনি? তোমার কমন সেন্স তো দিন দিন লোপ পাচ্ছে, জাফর! এখন আমি ঘুমাব। ডিস্টার্ব করো না, প্লিজ।'
জাফর কোমল গলায় বলল, 'শুনোই না!'
নিতু হাই তুলতে তুলতে বলল, 'বলো।'
'আজ তোমার ভ্যাগাবন্ড শপে গিয়েছিল।'
'এ্যাই, তুমি আবার ওঁকে ভ্যাগাবন্ড বললে!'
'স্যরি, স্যরি, আর বলব না।'
নিতু কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল।
'সে আমাকে কী কী বলেছে, জানো?'
নিতু কাঁথার ভিতর থেকে মাথা বের করে বলল, 'কী বলেছে?'
'বলেছে আমি নাকি ভীতু, কাপুরুষ।'
নিতু উত্তেজিত হয়ে বলল, 'বলবেই তো! তোমাকে কতবার বলেছি, আমাকে ডিভোর্স দাও। দিয়েছো? উল্টো চোখ-নাকের জল এক করে মেয়েদের মতো কাঁদতে বসেছো। লজ্জা করে না তোমার? তুমি কাপুরুষ। আস্ত একটা কাপুরুষ।'
জাফর কিছু বলল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিতু দ্রুত এসে দরজা বন্ধ করে দিলো।
বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জাফর। মাথা নিচু করে হাঁটছে সে। নিতুর কথাটা কাঁটার মতো বিঁধেছে। ইচ্ছে করছে, হাউমাউ করে কেঁদে ফেলতে। উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে গেল জাফর। আজ কী হতে চলেছে, কেউ জানে না। কেউ না।

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Abid faraje, Sume akter, Abul basar, Santa akter, Sakib sikdar, Nafisa akter, Pk monish and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty Re: নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:40 pm
(পর্ব : তিন)

'স্যার, একটা মেয়ে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।'
'কোন মেয়ে?'
'চিনি না, স্যার। শুধু বলল, আপনার সাথে দেখা করতে চায়।'
'বলো আমি বাসায় নেই। বিদেয় করে দাও।'
'মেয়েটা খুব সুন্দরী, স্যার। একদম পরীর মতো।'
'বেশি সুন্দর?'
'জি, স্যার। খুব বেশি সুন্দর।'
'বসতে বলো। আমি আসছি।'
'আচ্ছা, স্যার।'
রফিক চলে গেল। বাদল বিছানা ছেড়ে নামল। দাঁত ব্রাশ করে ঘরে আসতেই রফিক আবার এল। মুখ বেজার করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
বাদল বলল, 'কী হলো, এভাবে করে দাঁড়িয়ে আছো যে!'
'মেয়েটা চলে গেছে, স্যার। কিছু না বলেই চলে গেছে।'
'মন খারাপ করো না। আবার আসবে।'
'আরো একজন এসেছে, স্যার।'
'সে-ও কি সুন্দরী?'
'পুরুষ মানুষ, স্যার। বলল, সম্পর্কে আপনার মামা হয়।'
বাদল কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'লোকটার মাথার চুল কি সব সাদা?'
'জি, স্যার।'
'গায়ের রং কালো? মুখে গোঁফ আছে?'
'জি, স্যার।'
'পরনে কি সাদা লুঙ্গি আর ফতুয়া?'
'জি, স্যার।'
'রফিক, জলদি যাও। গিয়ে বলো, আমি বাড়িতে নেই। ফিরতে ফিরতে রাত হবে।'
'বলেছি, স্যার। লোকটা বলেছে, আপনি কাল ফিরলেও সমস্যা নেই। সে নাকি অপেক্ষা করবে।'
বাদল অসহায় ভঙ্গিতে বলল, 'সোফায় আরাম করে বসে আছে কি?'
'জি, স্যার। বসে বসে টিভি দেখছে।'
'শুনো, একটু পরেই উনি চা খেতে চাইবে। তুমি বলবে, ঘরে চিনি নেই। বুঝেছো?'
'কেন, স্যার? চা না দিলে কী হবে?'
'চা না দিলে উনার দম বন্ধ হয়ে যাবে। উনি চায়ের পোকা। ঘন্টায় এক কাপ চা অন্তত খেতে হয়। চা না পেলে দ্রুত বিদেয় হবে।'
'কিন্তু স্যার, বাসায় তো চিনি আছে।'
'থাক। তবুও তুমি বলবে, বাসায় চিনি নেই।'
'তাহলে কি স্যার, দোকান থেকে চিনি কিনে এনে চা বানিয়ে দেব?'
বাদল দাঁত কটমট করে বলল, 'রফিক! তুমি চা দেবে না, মানে দেবে না। উনি যেভাবেই বলুক, তুমি বাহানা বানাবে, মিথ্যে বলবে। তবুও চা দেবে না। বুঝতে পেরেছো?'
রফিক বোকার মতো তাকিয়ে বলল, 'উনি তো স্যার, সকাল থেকে চার কাপ চা খেয়েছে।'
'সকাল থেকে মানে? কখন এসেছে উনি?'
'সকাল সাতটায় এসেছে, স্যার। এখন বাজে সাড়ে নয়টা। সকালে আপনাকে ডাকিনি। উনি চা খেতে চেয়েছিল, তাই দোকান থেকে চা এনে খাইয়েছি।'
বাদল প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'তোমাকে কে বলেছে, চা এনে খাওয়াতে?'
'আমি ভাবলাম স্যার, আপনার আত্মীয়। তাই... '
'হ্যাঁ, আমার আত্মীয়। তাই বলে তুমি আমাকে না জিজ্ঞেস করেই আপ্যায়ন শুরু করে দিলে? তুমি জানো, উনি কী পরিমাণ বাচাল? কথা বলতে বলতে আমার কান...'
আরব আলী দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, 'বেশি কথা বলব না, ভাগিনা। দরকারি কয়েকটা কথা বলতে তোমার মা আমাকে পাঠিয়েছে। বলেই চলে যাব।'
বাদল লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। আরব আলী হঠাৎ দরজার সামনে চলে আসবেন ভাবতে পারেনি সে।

সোফায় বসে বসে আঙুর খাচ্ছেন আরব আলী। একটি আঙুর মুখে দিয়ে আরো একটি আঙুর নিচ্ছেন। টেবিলের উপর একটি পাত্রে পানি রাখা। তিনি একটি একটি আঙুর পানিতে চুবিয়ে মুখে দিচ্ছেন। আঙুর খাওয়া শেষ করে বললেন, 'ভাগিনার চোখ দেখি লাল। রাতে ঘুম হয়নাই?'
'ঘুম হয়েছে, মামা। আমার চোখ এমনিতেই লাল দেখায়।'
'নেশা-টেশা করো নাতো আবার?'
'না, না, মামা। নেশা করি না।'
'ভালো। শুনো, তোমার মা আমাকে যে কারণে পাঠিয়েছেন...'
'বলুন।'
'আপা-দুলাভাইয়ের তুমি একমাত্র সন্তান। এক্ষেত্রে তোমার থেকে উনাদের চাওয়া-পাওয়া থাকতেই পারে। তাই না, বলো?'
'হুঁ।'
'আমি শুনেছি, তুমি নাকি ইদানীং একটি মেয়ের সাথে মেলামেশা করছো। মেয়েটির নাকি একটি কন্যা সন্তানও আছে?'
বাদল দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচু গলায় বলল, 'ওসব বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।'
'আপার এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এখন তোমার উচিত ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করা। আপার খেদমতের জন্য অন্তত...'
'কিছু খাবেন, মামা?'
'না, ভাগিনা। কিছু খাব না। এই কথাগুলো বলতে এসেছিলাম। আজ আবার গ্রামে চলে যাব।'
'আমাদের বাসায় ক'দিন থেকেছেন, মামা?'
'দু'দিন। আসি তাহলে?'
'জি আচ্ছা।'
মুচকি হেসে বিদায় নিলেন আরব আলী। রফিক দ্রুত এসে নিচু গলায় বলল, 'আপনি তো বললেন, লোকটা খুব বাচাল। সারাদিন কথা বলবে। কিন্তু উনি তো কয়েকটা কথা বলে চলে গেল!'
বাদল উদাসীন ভঙ্গিতে বলল, 'মানুষ খুব দ্রুত বদলে যায়, রফিক।'

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ বেরোতে যাচ্ছিল নিতু। তখনই জাফর এল। হাতে মিষ্টির ব্যাগ। চোখে-মুখে হাসির ছাপ। নিতু বলল, 'ভালো হয়েছে, তুমি এসে গেছ। মুসকানকে একা রেখে যেতে মন সায় দিচ্ছিল না।'
জাফর কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'কেন, আলেয়া আসেনি?'
'না। আলেয়ার ছেলে এসে বলে গেছে, ওর নাকি খুব জ্বর। কালকেও আসবে না।'
জাফর মিষ্টির প্যাকেট খুলে একটি মিষ্টি নিতুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, 'ধরো, মিষ্টি খাউ।'
নিতু ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কীসের মিষ্টি?'
'প্রমোশান।'
নিতু চমকে উঠার মতো ভাব করে বলল, 'আবার প্রমোশান!'
'লোকজন ঘুষ দিয়ে প্রমোশান পায় আর আমি বিনে পয়সায়। তাও আবার ঘন ঘন। কপাল, সবই কপাল। হাহ্-হা!'
নিতু মিষ্টি খেল না। নিচু গলায় বলল, 'ভালো।'
'এবার প্রতিষ্ঠান আমাকে গাড়ি দেবে। ডিজেল খরচ, ড্রাইভারের বেতন সব প্রতিষ্ঠান বহন করবে। গাড়ি কেনার টেনশান আর রইল না। কী বলো?'
'হুঁ।'
'তোমাকে একটা স্কুটি কিনে দেব, ভেবেছি। এমনিতে পার্লারে, শপিংয়ে আরো কত জায়গায় যেতে হয়। স্কুটি থাকলে আর রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। তুমি তো সাইকেল চালাতে পারো, তাই না?'
'পারি।'
'তাহলে তো হলোই। আমার অফিসের উল্টো পাশে একটি ড্রাইভিং স্কুল আছে। ওখান থেকে ড্রাইভিং শিখে ফেলবে। তারপর একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স করে ফেলব। কী, পারবে না?'
'পারব।'
'নিতু!'
'হুঁ।'
'আজ একসাথে ডিনার করলে হয় না?'
নিতু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, 'আমি আসছি, জাফর। তুমি খেয়ে নিও।'
জাফর অসহায় ভঙ্গিতে বলল, 'রাতে ফিরবে না?'
'জানি না।' বলে বেরিয়ে গেল নিতু। জাফর মিষ্টির প্যাকেট টেবিলের উপর রাখল। শোবার ঘরে চেয়ে দেখল। বিছানার মাঝখানে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে মুসকান। জাফর মুচকি হাসলো। মেয়েটার একটা বিশেষ গুণ আছে। একবার তার দিকে তাকালে পৃথিবীর সব বিষাদ-বেদনা দূর হয়ে যায়। দেহে সজীব প্রাণের সঞ্চার হয়। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা আবার জেগে উঠে।

রিকশায় চড়ে রওনা হলো নিতু। বাদলের বাসা থেকে খানিকটা দূরে রিকশা থেকে নামল। তারপর ধীর গতিতে হাঁটতে লাগল। ঘন কুয়াশা পড়েছে চারদিকে। শীতে জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। গায়ের চাদর আঁটোসাঁটো করে জড়িয়ে ধরে হাঁটছে সে।
বাড়িটা শহর থেকে খানিকটা দূরে। সরু রাস্তায় যানবাহন চলাচল নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে একটি-দু'টি রিকশা ধীর গতিতে ছুটে যাচ্ছে।
শোবার ঘরে মেঝেতে বসে সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকছিল বাদল। নিতুকে দেখে অপ্রস্তত ভঙ্গিতে বলল, 'এসেছো। আমি ভাবলাম, আসবে না।'
বাদলের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসল নিতু। ধীর গলায় বলল, 'তুমি জাফরের কফিশপে গিয়েছিলে?'
বাদল নিতান্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'গিয়েছিলাম।'
নিতু সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'কেন গিয়েছিলে? কী বলেছ, ওঁকে?'
বাদল সিগারেটের উচ্ছিষ্ট অংশ এস্ট্রেতে রেখে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের উপর থেকে সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে একটি সিগারেট জ্বালাল। বিছানায় পা দুলিয়ে বসে বলল, 'বলেছি ভীতু, কাপুরুষ।'
'কীঃ! এগুলো বলতে একটুও ভয় হয়নি তোমার? একটুও না?'
বাদল তাচ্ছিল্য করে বলল, 'ভয় হবে কেন, আমি জাফরকে সরাসরি বলেছি নাকি!'
'নয়তো কী'
'ওয়েটারকে বলেছি। জাফর তখন শপে ছিল না।'
'ওটা ওয়েটার ছিল না।'
'কে ছিল তবে?'
'জাফর।'
বাদল বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। স্তিমিত গলায় বলল, 'কী ভীতু পুরুষ রে বাবা! মুখের উপর এতকিছু বলে ফেললাম। অথচ, শুধু জি স্যার, জি স্যার করল!'
নিতু উঠে দাঁড়াল। নাকের সামনে হাত নাড়াল কয়েকবার।
'তুমি জানো, আমি সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে পারি না। তবুও আমার সামনে ধোঁয়া ফুঁকো। কেন এমন করো, বাদল?'
বাদল ঠোঁট গোল করে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, 'অভ্যেস হয়ে গেছে। সিগারেট না খেয়ে থাকতে পারি না।'
'তাই বলে আমার সামনে! জাফর ওতো সিগারেট খায়। একবার শুধু বলেছিলাম, সিগারেটের গন্ধ আমার সহ্য হয় না। তারপর থেকে বাইরে খেয়ে আসে। আসার আগে ভালো করে মুখ পরিষ্কার করে আসে, যাতে গন্ধ না পাই।'
বাদল ভ্রু কুঁচকে বলল, 'এত ভীতু! ও গড, ও গড!'
'ভীতু নয়। আমার যাতে কষ্ট না হয় তাই...'
বাদল উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে গেল। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়াল। বাইরে দৃষ্টি রেখে বলল, 'মা, বারবার খবর পাঠাচ্ছে। মেয়েও দেখছে। তোমার কথা জেনে গেছে। আমার মনে হয়, তোমার কথা জানতে পেরে আরো তাড়াহুড়ো করেছে। তুমি তো জানো, মায়ের অবস্থা খুব একটা ভালো না। কখন কী হয়...'
নিতু শান্ত গলায় বলল, 'খু্ব শীঘ্রই বিয়ে করতে যাচ্ছো?'
বাদল দ্রুত পায়ে ফিরে এল। ধীর গলায় বলল, 'তুমি জাফরকে ডিভোর্স দিয়ে দাও। মুসকানকে আমরা বড় করব। তোমার মেয়ে মানে তো আমারও মেয়ে। তুমি শুধু ওই কাপুরুষকে ডিভোর্স দাও।'
নিতু উদাসীন ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তার মাঝে মাঝে মনে হয়, সে এখনও জাফরকে ভালোবাসে।

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Abid faraje, Sume akter, Abul basar, Santa akter, Sakib sikdar, Nafisa akter, Pk monish and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty Re: নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:40 pm
(পর্ব : চার)

যে মেয়েটিকে জাফরের পি.এস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার অদ্ভুত এক স্বভাব আছে। সেই অদ্ভুত স্বভাবটা কী তা বুঝে উঠতে পারছে না জাফর। শুধু মনে হচ্ছে, মেয়েটির একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে।
জানালার পরদা সরিয়ে বাইরে দৃষ্টি রাখল জাফর। ওপাশে সরু রাস্তার পরিসর। তারপর উঁচু দালান।
'শুভ সকাল।'
জাফর ফিরে তাকাল। কাচের দরজা একটু ঠেলে ধরে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। বয়স চব্বিশ-পঁচিশ হবে। পরনে গাঢ় সবুজ রঙের জামা। সাদা ওড়না। বুকে ছোট্ট একটি নাম ফলক। সেখানে লেখা, "বারিশ"। মেয়েটিকে গতকাল জাফরের পারসোন্যাল সেক্রেটারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জাফর অতিশয় কোমল গলায় বলল, 'আপরার ভালো নাম কী?'
মেয়েটি হকচকিয়ে উঠল। জাফরের এমন প্রশ্নের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে। বিনীত ভঙ্গিতে শান্ত গলায় বলল, 'আমার একটাই নাম, বারিশ। আর কোনো নাম নেই।'
জাফরের বিশ্বাস হলো না। তার ধারণা, মেয়েটি মিথ্যে বলছে। বাঙালী মেয়েদের নাম কখনো এক শব্দে শেষ হয় না। তিন-চারটি নাম একত্র করে এদেশের মেয়েদের নাম রাখা হয়।
'আমি তবে আপনাকে মিসেস বারিশ বলেই ডাকব।'
'মিসেস নয়, মিস।'
জাফর ভ্রু কুঁচকে বলল, 'আমি শুনেছিলাম, আপনি বিবাহিত।'
'বিয়ে হয়েছিল, ডিভোর্স হয়ে গেছে।'
জাফর কাতর গলায় বলল, 'অ্যারেঞ্জ মেরেজে হয় এরকম। অচেনা একজনের সাথে হুট করে মানিয়ে নেওয়াটা সত্যিই কঠিন।'
মেয়েটি ধরা গলায় বলল, 'অ্যারেঞ্জ মেরেজ না। লাভ মেরেজ হয়েছিল আমাদের।'
জাফর কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'তাহলে ডিভোর্স?'
মেয়েটি কুৎসিত ভঙ্গিতে বলল, 'পুরুষ মানেই পশু, জঘন্য জানোয়ার।' বলে কাচের দরজা ছেড়ে চলে গেল। যেতে যেতে বিড়বিড় করে কী যেন বলে গেল। জাফর ঠিক শুনতে পারল না।

এ ঘরটা বিশাল বড়। পুরো ঘরে মেরুন রঙের কার্পেট বিছানো। ঘরের মাঝখানে চারকোনা ছাদের কাচের টেবিল। টেবিলের সামনে একটি রিভলভিং চেয়ার। টেবিলের উপর একটি মনিটর। একটি মাউস। কি-বোর্ড। একটি সুচালো কাটাঅলা গাছ। গাছটার নাম এখন মনে পড়ছে না। টেবিলের এক পাশে ছোট্ট একটি লাল রঙের বোতাম। বোতাম টিপতেই বারিশ এল। কোমল গলায় বলল, 'ডেকেছেন?'
জাফর রিভলভিং চেয়ারে বসে বলল, 'বারিশ নামের অর্থ আছে?'
'জি, আছে।'
'বারিশ অর্থ কী?'
'বৃষ্টি।'
'বাঃ, সুন্দর নাম তো! আমি তবে আপনাকে বৃষ্টি বলেই ডাকব।'
'না, বৃষ্টি আমার নাম না। আপনি আমাকে বারিশ বলে ডাকবেন।'
'আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে। বারিশ বলেই ডাকব।'
'আর কিছু বলবেন?'
'আপাতত বলার মতো কিছু নেই।'
বারিশ চলে গেল। জাফর একবার হাতঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়িতে দশটা বেজে তিন মিনিট। ঘুম পাচ্ছে। ঘুম তাড়ানোর জন্য কী করা যায়? চা? চা খেলে সবার ঘুম চলে যায়। জাফরের তেমন হয় না। হয় উল্টো। চা খেলে ঘুমে চোখ লেগে আসে। টেলিফোন করা যায়। অবেলায় টেলিফোন করলে নিতু গম্ভীর গলায় কথা বলবে। মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে উঠবে। এতে ঘুম কাটার সম্ভাবনা আছে।
জাফর টেলিফোন কানে লাগাল। ওপাশ থেকে গম্ভীর গলার আওয়াজ আসলো, 'হ্যালো?'
'নিতু, আমি জাফর। অফিসের টেলিফোন থেকে ফোন দিয়েছি। আমার ফোনটা হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিক করতে পারছি না। তুমি ফোন দিয়ে না পেলে অযথা ট্যানশান করবে, তাই...'
'আচ্ছা।'
'মুসকান ঘুম থেকে উঠেছে?'
'হুঁ।'
'তোমরা খাওয়া-দাওয়া করেছো তো?'
'খেয়েছি।'
'বেশ। আমিও খেয়েছি। ইদানীং ক্যান্টিনের খাবার খুব একটা ভালো হচ্ছে না। খিচুড়ি থেকে কেমন যেন একটা বিচ্ছিরি গন্ধ বেরোচ্ছিল।'
'আচ্ছা।'
'জানো, আমার পি.এস হিসেবে যে মেয়েটিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার একটা সুন্দর নাম আছে।'
'কী নাম?'
'বারিশ। বারিশ নামের অর্থ জানো তো?'
'না।'
'বারিশ অর্থ হচ্ছে বৃষ্টি। নামটা সুন্দর না?'
'হুঁ।'
'মেয়েটির একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে।'
'কী সেটা?'
'এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। বুঝতে পারলে তোমাকে জানাব।'
'আচ্ছা। রাখছি, জাফর।'
'আসল কথাটাই তো বলা হয়নি!'
'কী কথা?'
'মেয়েটির ডিভোর্স হয়ে গেছে। লাভ মেরেজ হয়েছিল। তবুও ডিভোর্স হয়ে গেছে। তার খুব মন খারাপ। পুরুষদেরকে গালিগালাজ করেছে সে।'
'করবেই তো।'
'তা করুক। আমি তো জানি, সবাই তোমার মতো না। তুমি হলে গালি দিতে না।'
'আমি হলেও গালি দিতাম।'
'দেবেই তো। ভুল করলে গালি দেবে না?'
'রাখি জাফর?'
জাফর টেলিফোন রেখে উঠে দাঁড়াল। ভারী কার্পেটের উপর খালি পায়ে পায়চারি করল কিছুক্ষণ। রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বোতাম টিপতেই বারিশ এল। ধীর গলায় বলল, 'জি?'
'মিস বারিশ, আপনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারবেন?'
'স্বপ্ন? ইউ মিন, ড্রিম?'
'হ্যাঁ।'
'না। আপনি বরং বই কিনে ফেলুন। বাজারে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা অসংখ্য বই আছে।'
'বই থেকে খোঁজে বের করতে অনেক সময় লাগবে। কোনো সহজ সমাধান নেই কি?'
'আপনি কি খুব বেশি স্বপ্ন দেখেন?'
'আগে দেখতাম না। ইদানীং খুব বেশি দেখছি।'
'কীরকম স্বপ্ন দেখেন, আপনি?'
জাফর টেবিলের সামনে ঝুঁকে বসে বলল, 'আমি স্বপ্নে দেখি, বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছি। বাতাস আমাকে কানে কানে বলছে, দাঁড়িয়ে থেকো না, লাফিয়ে পড়ো। দেখিয়ে দাও, তুমি ভীতু না। আমি লাফ দিতে যাই। কী যেন একটা ভেবে লাফ দেই না। ফিরে আসি।'
'এসব স্বপ্ন নয়। বাস্তব।'
জাফর চোখ বড় বড় করে বলল, 'কী বলেন!'
'ঠিকই বলছি। আমাদের চারপাশ যখন বিষাদের দেয়ালে ঢেকে যায়, তখন বাতাস কানে কানে অনেক কিছুই বলে বেড়ায়।'
'বলছেন?'
'বলছি।'
'কিন্তু, আমি তো রোজ দেখি।'
'একই স্বপ্ন কেউ বারবার দেখে না। ওটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব।'
'আমার এখন কী করা উচিত?'
'আপনার উচিত, একজন সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করা।'
'তাহলেই হবে?'
'হ্যাঁ।'

অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাড়তি টাকা খরচ করে শহরের নামকরা সাইক্রেটিস্টের টিকিট হাতে পেয়েছে জাফর। ডাক্তারের নাম আদুরী রয়। জাফর ভেবেছিল, বৃদ্ধা কেউ হবে। কিন্তু চেম্বারে এসে পুরো ধারণা পাল্টে গেল। চেয়ারে বসা মেয়েটি যুবতী বয়েসী। টেবিলের চার বাই দশ ইঞ্চি সাইজের নাম ফলকে ইংরেজি বোল্ড অক্ষরে লেখা, ডা. আদুরী রয়। মেয়েটি মুচকি হেসে বলল, 'বসুন।'
ডাক্তার মেয়েরা সাধারণত গম্ভীর স্বভাবের হয়। অন্তত পুরুষদের সামনে। এই মেয়েটি এরকম না। চোখ-মুখে বিনীত হাসি লেপ্টে আছে।
জাফর চেয়ারে বসল।
'আপনার নাম?'
'জাফর।'
'বয়স?'
'সত্যিকারের বয়স বলব না কি সার্টিফিকেটে যা আছে তাই বলব?'
'সত্যিটা বলুন।'
'পয়ত্রিশ।'
'কী সমস্যা, আপনার?'
'আমার কোনো সমস্যা ছিল না। তবে, ইদানীং খুব বেশি স্বপ্ন দেখছি।'
'কীরকম স্বপ্ন দেখছেন?'
'দেখছি, আমি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছি। বাতাস আমাকে কানে কানে বলছে, বেলকনি থেকে নিচে লাফ দিতে। আমি লাফিয়ে পড়তে গিয়ে ফিরে আসি। সারা রাত ঘুম হয় না।'
'এটুকুই?'
'জি।'
'আমার মনে হচ্ছে, আপনার কোনো সমস্যা নেই। আপনি এসব বানিয়ে বানিয়ে বলছেন।' গলাটা ভারী।
'বানিয়ে বলব কেন?'
'সেটা আপনি ভালো জানেন।'
'আমি কি তবে আসব?'
'জি, আসুন।'
জাফর উঠতে উঠতে বলল, 'আপনি কি বিবাহিত?'
অচেনা একজনকে কেউ হঠাৎ এমন প্রশ্ন করে না। জাফর জানে, প্রশ্ন করাটা ঠিক হয়নি। তবুও করেছে। তার উদ্দেশ্য মেয়েটাকে চমকে দেওয়া। বাঙালী মেয়েরা চমকে উঠলে ভালো দেখায়।
মেয়েটি চমকে উঠল না। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'বসুন।'
জাফর হাত-পা ছেড়ে চেয়ারে বসল।
'মি. জাফর, একজন পাগলের ভাষা অন্য একজন পাগল বুঝতে পারে। আর, একজন পাগলের চিকিৎসা একজন পাগলই করতে পারে।'
জাফর ধীর গলায় বলল, 'আপনি কি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন?'
'যদি বলি হ্যাঁ?'
জাফর বোকার মতো তাকিয়ে থাকল।
'এখন আমি যদি আপনার চিকিৎসা করার জন্য নিজেকে পাগল মনে করি, তবে বলব আমি বিবাহিত। আমার স্বামী শহরের ছোট্ট একটি রেস্তোরাঁর ওয়েটার। এবং আমি আমার স্বামীকে নিয়ে বেশ সুখেই আছি।'
'প্রবাসী?'
'না।'
জাফর ভ্রু কুঁচকাল। কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'এদেশের রেস্তোরাঁয় ওয়েটার! শহরের নামকরা সাইক্রেটিস্টের স্বামী রেস্তোরাঁর ওয়েটার! এ-ও কি হয়?'
'অপ্রত্যাশিত অনেক কিছুই হয়, মি. জাফর। এই ধরুন, গতকাল পর্যন্ত আমি আপনাকে চিনতাম না। অথচ, আজ আপনি আমার পেশেন্ট। এটা কি পূর্ব পরিকল্পিত ছিল?'
জাফর কৌতূহলী ভঙ্গিতে ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর ধীর গলায় বলল, 'আমাকে সবাই ভীতু, কাপুরুষ এসব বলে। আপনার কী ধারণা, আমি ভীতু, কাপুরুষ?'
'কারা বলে এসব?'
জাফর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'আমার স্ত্রী এবং তার প্রেমিক।'
'আপনার স্ত্রীর প্রেমিক!'
'জি।'
'বড় অদ্ভুত লোক তো আপনি!'
'অদ্ভুত-ও বলে মাঝেমধ্যে।'
'আপনি কি রসিকতা করছেন, মি. জাফর?'
'রসিকতা নয়, সত্যি বলছি।'
'আমার মনে হয়, আপনি আমাকে বহুদিন যাবত ফলো করছেন। আমাকে ভালো করে চেনেন, জানেন। ইচ্ছে করেই নতুন নতুন গল্প পাকাচ্ছেন। আমার এটাও মনে হচ্ছে, আপনি অবিবাহিত এবং আপনার বয়স আঠাশ।'
জাফর চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল, 'এবার মনে হচ্ছে, আপনি পেশেন্ট আর আমি ডাক্তার। হা-হা-হা!'

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Sume akter, Abul basar, Sakib sikdar, Nafisa akter, Pk monish, Soneya islam, Sm shorif and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty Re: নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:41 pm
(পর্ব : পাঁচ)

বাদলের পাশে শুয়ে ছিল নিতু। হঠাৎ ডোরবেল বাজল। নিতু বিছানা ছেড়ে নামল। দরজা খুলতেই বাইশ-তেইশ বছর বয়েসী একটি মেয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, 'ম্যাম, আপনি! আমাকে চিনতে পেরেছেন?'
নিতু কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'কোথায় যেন দেখেছি মনে হয়...'
মেয়েটি আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, 'আমি আরফা। আপনার কাছে দু'বছর পড়াশোনা করেছি।'
নিতু মেয়েটিকে ভালোভাবে চিনল না। হাতে গুণা কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়িয়েছে সে। তন্মধ্যে এই মেয়েটি ছিল বলে মনে পড়ছে না। তবুও বিনীত কণ্ঠে বলল, 'ওঃ, আচ্ছা।'
'আপনি দেখছি ম্যাম, এখনও আগের মতোই আছেন। রাগী রাগী ভাব, গলায় গাম্ভীর্য, চোখে-মুখে বিনীত হাসি...'
নিতু সহজ ভঙ্গিতে হাসল।
'এটা বাদল ভাইয়ার বাসা না, ম্যাম?'
নিতু হকচকিয়ে উঠল। বাদল বলেছিল, আরফা নামের একটি মেয়ে তাকে প্রপোজ করেছে। এই কি সেই মেয়ে?
নিতু ধীর গলায় বলল, 'হ্যাঁ, এটা বাদলের বাসা।'
'বাদল ভাইয়াকে একটু ডেকে দেবেন, প্লিজ?'
'সে বাইরে গেছে। তোমার কী দরকার, আমাকে বলো। সে এলে আমি তাকে বলে দেব।'
আরফা ইতস্তত করে বলল, 'কিছু বলতে হবে না, ম্যাম। আমি এসেছি শুনলে উনি রাগ করতে পারে।'
'আচ্ছা, তাহলে বলব না।'
আরফা চলে গেল। নিতু দরজা বন্ধ করে ফিরে এল। বাদলের পাশে শুয়ে পড়ল। ঘরে কম আলোর বাতি জ্বলছে। বাদল বিছানায় হেলান দিয়ে বসে সিগারেট টানতে টানতে বলল, 'কে এসেছিল?'
'আরফা নামের একটা মেয়ে।'
'আরফা? মেয়েটা বাসা পর্যন্ত চলে এসেছে!'
নিতু মৃদু হেসে বলল, 'বাদ দাও। বেচারি সহজ-সরল মানুষ।'
বাদল ভ্রু কুঁচকে বলল, 'সহজ-সরল?'
'নয়তো কী?'
বাদল কিছু বলল না। নিতু বাদলের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর ধীর গলায় বলল, 'বিছানা থেকে নামো তো, বাদল।'
বাদল ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কেন?'
'নামোই না!'
বাদল অগত্যা বিছানা ছেড়ে নামল।
'টি-শার্ট খুলো।'
বাদল কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'কেন?'
'এত কেন, কেন করছো কেন? খুলতে বলেছি খুলো।'
বাদল গায়ের টি-শার্ট খুলে বিছানায় রাখল। নিতু বাদলের পিঠে হাত রেখে বলল, 'এই দাগটা কীসের?'
'কোন দাগ?'
'এইযে এটা।'
বাদল তার পিঠের কাটা দাগে হাত রেখে বলল, 'এটা?'
'হ্যাঁ, এটা।'
'এ-এক বিশাল কাহিনি। শুনবে তুমি?'
'অবশ্যই শুনব।'
বাদল টি-শার্ট পরে বিছানায় বসল। একটি সিগারেট জ্বালাল। নিতুর হাত ধরে তার পাশে বসাল। কিছুক্ষণ সিগারেটের ধোঁয়া ফুঁকল। নিতু বিরক্ত হয়ে বলল, 'বলবে না কি সিগারেট টানবে?'
'বলছি, শুনো।'
'বলো।'
'আমার বয়স তখন দশ বছর। ক্লাস ফাইভে পড়ি। একদিন মাঝ রাতে আমাদের বাসায় ডাকাত এল।'
নিতু অবাক হয়ে বলল, 'ডাকাত!'
'হ্যাঁ। বাসার সবাইকে এক ঘরে বন্দি করল। ওদের সাথে ছুরি, চাকু সব ছিল। আমি ভয়ে কেঁদেই ফেললাম। বৃষ্টি কাঁদেনি। ঘুমঘুম চোখে দাঁড়িয়ে ছিল।'
নিতু কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'বৃষ্টি কে?'
'আমার জমজ বোন।'
'তোমার বোন আছে! আগে বলোনি তো!'
'এখন বলছি, শুনো। ডাকাতের একজন বাবাকে বলল আলমারির চাবি দেওয়ার জন্য। আলমারিতে তখন মোটা অঙ্কের নগদ টাকা আর গহনা ছিল। বাবা আলমারির চাবি দিলো না। ডাকাত গেল রেগে। চেঁচিয়ে বলল, চাবি দে। নাহয় সব ক'টা মারা পড়বি। বাবা তবুও চাবি দিলো না। ডাকাতের হাত-পা ধরল।'
নিতু কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'তারপর, ডাকাত কী করল?'
'বৃষ্টির গলায় ছুরি চালিয়ে দিলো। বাবার হাতে কোপ দিলো। বাবার এক হাত গেল কেটে। আর আমার পিঠে একটু খোঁচা লাগল।'
নিতু শান্ত হয়ে বলল, 'এজন্যই তোমার বাবার এক হাত নেই?'
বাদল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল।
'আর বৃষ্টি? বৃষ্টির কী হলো?'
বাদল ধরা গলায় বলল, 'বৃষ্টি আমাদের ছেড়ে চলে গেল।'
নিতু চুপ করে গেল। বাদল একটি সিগারেট শেষ করে আরো একটি সিগারেট জ্বালাল। তার চোখ টলমল করছে।
'ক'টা বাজে, নিতু?'
'সাড়ে এগারো।'
'বাসায় যাবে না?'
'যাব।'
'কখন?'
'এক্ষুণি।'
বিছানা ছেড়ে নামল নিতু। সুইচ টিপে বাতি জ্বালাল। ওয়াড্রোব খুলল। টাওয়াল ও কাপড় নিয়ে বাথরুমে গেল। শোবার ঘরের সাথে অ্যাটাচ বাথরুম। বাদল গলা বাড়িয়ে বলল, 'দরজা বন্ধ করে দিও।'
নিতু দরজা পুরোপুরি বন্ধ করল না। বাথরুমে গিয়েই শাওয়ার ছেড়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল। হিমশীতল পানি মাথার উপর ঝড়ে পড়ছে। নিতু হাঁটু ভাঁজ করে হাঁটুর আড়ালে মুখ ঢাকলো। শাওয়ার থেকে পড়ন্ত ঠান্ডা জলের সাথে যুক্ত হয়েছে নিতুর চোখের জল।
আচ্ছা, চোখের জল দেখতে হুবহু স্বচ্ছ পানির মতো কেন? চোখের জল দু'ভাগে ভাগ করে দু'টো আলাদা আলাদা রঙ করে ফেলতে পারলে ভালো হত। একটা আনন্দের অশ্রু। যার রং থাকবে গোলাপি। অন্যটা বিষাদ, বেদনা, যন্ত্রণার। যার রং থাকবে লাল। গাঢ় লাল। যদি সত্যিই এমন হত, তবে নিতুর চোখ বেয়ে টপটপ করে পড়ন্ত অশ্রুজল হত টকটকে লাল। সেই লাল অশ্রুজল ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে।
নিতু উঠে দাঁড়াল। বাথরুমের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করল। তারপর দেয়ালে আটকে রাখা চারকোণা আয়নায় তাকাল। আজ তাকে একটু বেশিই সুন্দর দেখাচ্ছে। মুসকানকে যখন গর্ভে ধারণ করে, তখন প্রথমবার এতটা সুন্দর রূপে দেখেছিল সে নিজেকে। আজ আবার দেখল। মেয়েরা যখন মা হতে চলে, তখন হঠাৎ করেই তাদের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। এটা হচ্ছে মা হবার পূর্বাভাস। সবার চোখে এ-সৌন্দর্য ধরা দেয় না। শুধু যিনি মা হতে চলেছেন, তিনিই বুঝতে পারেন।
নিতু ট্যাপ ছেড়ে একটু পানি খেল। গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল। পানি খাওয়ার পর একটু ভালো লাগছে।
বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচাল বাদল, 'নিতু, এ্যাই নিতু, আর কত? ঠান্ডা লেগে যাবে তো!'
নিতু স্পষ্ট শুনতে পেল বাদলের গলা। তবুও জবাব দিলো না। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শান্ত হয়ে বসে রইল। সে জানে, তার দেহে যার বসবাস সে বাদলের অংশ। তবুও বাদলকে বলতে ভয় লাগছে।
বাদল আবারো বলল, 'নিতু, কী হলো!'
নিতু কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। টাওয়াল দিয়ে গা মুছে কাপড় পাল্টাল। আয়নার দিকে তাকাল একবার। চোখ দু'টো লাল হয়ে আছে।
'শীতের রাতে এত সময় নিয়ে কেউ গোসল করে? ঠান্ডা লাগলে কী হবে, বলতে পারো?'
'লাগুক ঠান্ডা। কী হবে? বড়জোর মরে যাব, তাইতো? ঠিক আছে। মরলে মরব।'
'এ কেমন কথা, নিতু?'
নিতু বিছানায় পা দুলিয়ে বসল। বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করে ব্যাগে ভরল। দ্রুত পায়ে বাথরুমে গেল। বাথরুমের টাইলসে পড়ে থাকা ভেজা কাপড় ব্যাগে ভরল।
বাদল চেঁচিয়ে বলল, 'কী করছো, নিতু! ভেজা কাপড় ব্যাগে ভারছো কেন? ব্যাগের সব জিনিসপত্র ভিজে যাবে তো!'
ব্যাগে কাপড় জায়গা হচ্ছিল না। নিতু জোরজবস্তি করে কোনো রকম ব্যাগের চেন আটকাল। তারপর ধীর গলায় বলল, 'আসছি, বাদল।'
বাদল নিতুর হাত ধরে ফেলল।
'দাঁড়াও। কী হয়েছে তোমার?'
'কিছু হয়নি।' বলে হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল নিতু।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আরফা। নিতুকে দেখে মৃদু হেসে বলল, 'ম্যাম, বাসায় যাবেন?'
'হুঁ।'
'আমি ওদিকেই যাব। দেখুন না, সেই তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি। রিকশা নেই।'
রফিক নিতুর সামনে এসে হাতে হাত বেধে দাঁড়িয়ে বলল, 'ম্যাডাম, রিকশা নিয়ে আসব?'
'হ্যাঁ।'
রফিক রিকশা আনতে গেল। কিছুক্ষণ পর একটি রিকশা নিয়ে এল। নিতু রিকশায় উঠতেই আরফা বলল, 'ম্যাম, আমাকে একটু নিয়ে গেলে ভালো হয়। অনেক রাত হয়েছে। ফোনটাও বন্ধ হয়ে গেছে। মা বোধহয় এতক্ষণে হাঁসফাঁস করতে শুরু করেছে।'
নিতু ধীর গলায় বলল, 'রফিক ভাইকে বলে রিকশা আনিয়ে দেব?'
'না, ম্যাম। একা যেতে ভরসা পাচ্ছি না। আসলে এখানে আমার এক ফ্রেন্ড থাকে, আনিশা। আজকে ওঁর জন্মদিন। আড্ডা দিতে দিতে কখন যে রাত বেড়ে গেল, টেরই পাইনি।'
'আচ্ছা, এসো আমার সাথে।'
আরফা রিকশায় চড়ে বসল। আজ একটু বেশিই ঠান্ডা পড়েছে। কিছুক্ষণ আগে গোসল করায় নিতুর শরীরটা এখনও শীতল হয়ে আছে। এছাড়াও খোলা রিকশার চারদিক দিয়ে ধু ধু বাতাস বইছে। নিতু জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।
'ম্যাম, জাফর স্যার কেমন আছেন?'
নিতু একটু অবাক হলো। এ মেয়ে জাফরকেও চেনে!
'ভালো আছে।'
'আপনাদের বিয়ের দিন স্যারকে দেখেছিলাম। স্যার কিন্তু দেখতে অনেক হ্যান্ডসাম। হি-হি।' মৃদু হাসল আরফা।
'আপনাদের একটি মেয়ে আছে। কী যেন নাম?'
'মুসকান।'
'বাব্বাঃ, বেশ সুন্দর নাম তো! কে রেখেছে নামটা?'
'জাফর রেখেছে।'
'প্রথমেই ভেবেছিলাম, এত সুন্দর নাম একমাত্র জাফর স্যার-ই রাখতে পারেন।'
নিতু একটু বিরক্ত হলো। আরফা মেয়েটা দেখতে সুন্দর। তবে কথা বেশি বলে। যারা বেশি কথা বলে, তারা বাচাল। কিন্তু আরফা তার থেকেও বেশি কথা বলছে। বাচালের চেয়ে বেশি কথা বললে তাকে কী বলে?
'ম্যাম!'
'বলো।'
'শুনেছি, বাদল ভাইয়ার সাথে আপনি ইমুশন্যালি ইনভলভ। এটা কি সত্যি?'
'আমাকে নামিয়ে দিন।'
রিকশাঅলা রিকশা থামাল। নিতু নামতে যাচ্ছিল। আরফা বলল, 'ম্যাম, আপনার বাসা তো এখান থেকে অনেকটা দূরে!'
'এখানে আমার একটা কাজ আছে।' বলে নেমে গেল নিতু। রিকশাঅলাকে ভাড়া দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Sume akter, Abul basar, Nafisa akter, Pk monish, Sm shorif, Sheikh anika, Saima siddiki and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty Re: নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:41 pm
(পর্ব : ছয়)

যে মেয়েটির সাথে জাফর সেদিন দেখা করেছিল, সে সাইক্রেটিস্ট না। জাফরের একটু একটু সন্দেহ হচ্ছিল। আজ যখন জাফর বারিশকে বলল, 'মিস বারিশ, আপনার কথায় ডা. আদুরীর সাথে দেখা করলাম। উনি আমার কোনো উপকার করলেন না। উল্টো আমাকে আজেবাজে কথা বলেছেন। আমার তো মনে হয়, উনাকে আগে সাইক্রেটিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার।'
জাফরের ঘরের সামনে চারকোণা ছাদের কাঠের টেবিল। একটি চেয়ার। বারিশ চেয়ারে বসে ছিল। জাফরের কথা শুনে উঠে দাঁড়াল। কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'আপনি কি ডা. আদুরীর কাছেই গিয়েছিলেন? উনি আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয়। আমি তাকে মামুনি বলে ডাকি। যতদূর চিনি, মামুনি খুব ভালো একজন সাইক্রেটিস্ট।'
জাফর বলল, 'মামুনি মানে?'
'চাচার ওয়াইফ। চাচী।'
জাফর অবাক হয়ে বলল, 'আপনার চাচী! আমি ভাবলাম উনি অবিবাহিত।'
'এজন্যই আপনাকে সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করতে বলেছি। উনি শুধু বিবাহিত নন, তিন সন্তানের জননী।'
জাফর ভড়কে গেল, 'একে তো আমার টাকা এবং সময় নষ্ট করেছেন, এখন আবার রসিকতা করছেন!'
বারিশ লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, 'দেখুন, আমি রসিকতা করছি না। আপনি হয়তো ভুল কারো সাথে দেখা করেছেন।'
জাফর পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। ডা. আদুরীর ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলল, 'দেখুন তো এই অ্যাড্রেস কিনা?'
বারিশ কার্ড হাতে নিয়ে বলল, 'হ্যাঁ। আচ্ছা, মামুনি কি আপনাকে কিছু দিয়েছে? চকোলেট, বল, কলম কিংবা অন্য কিছু?'
'না, কিছুই দেয়নি।'
'এবার আমি নিশ্চিত, আপনি ভুল কারো সাথে দেখা করেছেন। মামুনি তার সব পেশেন্টকে কিছু না কিছু উপহার দেয়। আপনি যদি উনার কাছে যেতেন, আপনাকেও দিত।'
জাফর উদভ্রান্তের মতো ঘরে গেল। ভারী কার্পেটের উপর পায়চারি করল কিছুক্ষণ। জানালার পরদা সরিয়ে দিলো। এয়ার কন্ডিশন বন্ধ করল। ঘরের এক কোণে পিতলের টবে লাগানো ছোট্ট গাছে গোলাপি রঙের ফুল ফুটেছে। সেটা খুব কাছ থেকে দেখল। রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটু পানি খেল। লাল বোতাম টিপতেই বারিশ এল।
'জি?'
'আপনার মামুনির বয়স কত হবে? চব্বিশ-পঁচিশ?'
বারিশ মৃদু হেসে বলল, 'আপনি ভুল মানুষের সাথে দেখা করেছেন। মামুনির বয়স কম করে হলেও পঞ্চান্ন হবে।'
জাফর আরো একটু পানি খেল। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'তাহলে এ মেয়ে নিজেকে ডাক্তার বলে পরিচয় দিলো কেন?'
'ওটা আপনি ভালো জানেন।' বলে বারিশ চলে গেল।
জাফর টেলিফোন কানে লাগাল। ওপাশ থেকে, 'স্লামালিকুম, স্যার।'
'হ্যালো, পাপন?'
'জি, স্যার।'
'গতকাল ডা. আদুরির টিকিট এনেছিলে, মনে আছে?'
'জি, স্যার।'
'আজকেও একটি টিকিট লাগবে।'
'আজকেই লাগবে?'
'হ্যাঁ।'
'কাল আনলে হয় না?'
'না। আজকেই লাগবে। ভেরি আর্জেন্ট। পারবে না?'
'পারব, স্যার।'
'গুড। অফিসে এসে টাকা নিয়ে যেও।'
'আচ্ছা, স্যার।'
'রাখি?'
'আচ্ছা, স্যার।'
টেলিফোন রেখে লাল বোতাম টিপল জাফর। বারিশ এল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার টিপল। এবারও এল না। বাইরে থেকে কোনো সাড়া-শব্দও পাওয়া গেল না। তৃতীয়বার বোতাম টিপতেই বারিশ এসে বলল, 'বারবার বোতাম টিপছেন কেন? জরুরি কাজ থাকলে বোতাম টিপবেন। অযথা বিরক্ত করবেন না।'
জাফর এতটাই অবাক হল, মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। শুধু মনে মনে বলল, 'ম্যান ইজ মরট্যাল, ম্যান ইজ মরট্যাল।' কিন্তু বারিশের রাগ দেখানোর সাথে মানুষের মৃত্যুর কী সম্পর্ক সেটা ভেবে পেল না সে।
বারিশ আবার এল। দরজা ঠেলে ধরে যথেষ্ট শান্ত গলায় বলল, 'স্যরি।'
জাফর এখনও কিছু বলতে পারল না। পাথুরে মূর্তির মতো বসে রইল শুধু।

টেবিলের ওপাশে উঁচু চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রমহিলার নাম আদুরী রয়। তিনি একজন সাইক্রেটিস্ট। তার চোখে গোলাকার ফ্রেমের চশমা। মাথায় ওড়না। মুখে বিনীত হাসি।
জাফর বলল, 'আপনি ডা. আদুরী রয়?'
'জি।'
'গতকাল যিনি এখানে বসে ছিলেন, তিনি কে?'
ভদ্রমহিলা কোমল গলায় বললেন, 'উনার নামও আদুরী রয়। আমার নিয়মিত পেশেন্ট।'
জাফর চোখ বড় বড় করে বলল, 'পেশেন্ট?'
'জি।'
'পেশেন্টকে নিজের চেয়ারে বসিয়ে রেখে আপনি চলে যান। সেই পেশেন্ট বাকিদের ট্রিটমেন্ট করে। কী অদ্ভুত, কী অদ্ভুত!'
ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বললেন, 'না, না। কাল ওঁকে এখানে বসিয়ে ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম।'
'উনি ক'দিন যাবৎ আপনার পেশেন্ট?'
'ছ'মাস।'
'ছয় মাস?'
'জি।'
'তাহলে তো উনার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা হয়ে গেছে আপনার?'
'তা বলতে পারেন।'
'উনাকে কোথায় পাওয়া যাবে, বলতে পারেন?'
'দুঃখিত। পেশেন্টের প্রাইভেসি দেওয়া আমার দায়িত্ব এবং কর্তব্য। আমি আমার পেশেন্টের অ্যাড্রেস কোনো মতে আপনাকে দিতে পারি না।'
'আচ্ছা, ঠিক আছে। শুধু এটা বলুন, আজ উনি কি আপনার সাথে দেখা করতে আসবে?'
'আসবে।'
'কখন?'
'সাড়ে সাতটা নাগাদ।'
জাফর ঘড়ির দিকে তাকাল। সাতটা বাজতে এখনও দশ মিনিট বাকি। হাতে আছে চল্লিশ মিনিট। এতক্ষণ কী করা যায়? সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলার সাথে গল্প? উনি হয়তো এত লম্বা সময় গল্প করে ব্যায় করতে রাজি হবেন না। সবাই এখন সময়ের মূল্য বুঝে। রিকশাঅলা-ও বলে, টাইমের ভ্যালু আছে ভাইজান, পাঁচ মিনিট জ্যামে আটকায়া আছিলাম। দশ টাকা বাড়ায়া দেন। শিক্ষিত সমাজ বলে, টাইম ইজ মানি।
ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল জাফর। রাস্তার উল্টো পাশে একটি কফিশপ। কফিশপের সামনে ফুটপাতে ভ্যানগাড়ি দিয়ে ফুচকা-চটপটি বিক্রি করছে দু'জন। ফুটপাতে চারটি প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। জাফর আরাম করে চেয়ারে বসল। একজন জিজ্ঞেস করল, 'কী দিমু, মামা?'
'ফুচকা দাও। ঝাল কম দিও।'
লোকটি ফুচকা দিলো ঠিকই। কিন্তু ঝাল কম দিলো না। উল্টো বেশি দিয়েছে। ইচ্ছে করেই হয়তো দিয়েছে। ফুচকা-চটপটিঅলাদের ঝাল কমিয়ে দেওয়ার জন্য বলতে নেই। ঝাল কম দেওয়ার কথা বললে ওঁরা ঝাল বাড়িয়ে দেয়।
জাফর ফুচকার প্লেট রেখে উঠে দাঁড়াল। ঝালে চোখ-নাক বেয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে। জিহ্বা পুড়ে ছাই হওয়ার উপক্রম। ভ্যানগাড়ি থেকে পানির জগ নিয়ে হা করে মুখে পানি ঢালল জাফর। একটু পানি খেল। ঠান্ডা পানি দিয়ে কুলকুচি করল। ঝাল কমেনি। জিহ্বা বের করে বসে রইল জাফর। কিছুক্ষণ পরে আরো একটু পানি খেল। ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকাতেই দেখল, সেদিনের সেই মেয়েটি তার পাশে বসে আপনমনে ফুচকা খাচ্ছে। জাফরের দিকে তাকাচ্ছে। শব্দ না করে দাঁতে দাঁত চেপে হাসছে। জাফর তাকাতেই বলল, 'সহ্য না করতে পারলে খান কেন এত ঝাল?'
জাফর কিছু বলতে পারল না। ঝালটা এখনও কেটে উঠেনি। জিহ্বাটা জ্বলে যাচ্ছে।
মেয়েটি আবার বলল, 'কী হলো, ঝাল কাটেনি?'
'কেটেছে।'
'আর কখনো খাবেন না।' বলে আবারো একটু হাসলো সে।
'আপনি সেদিন মিথ্যে বললেন কেন আমাকে?'
আদুরী কোমল স্বরে বলল, 'আপনি খু্ব সহজে আমার মিথ্যে কথাগুলো মেনে নিচ্ছিলেন, তাই।'
'আপনি কি সব সময় মিথ্যে বলেন?'
'সব সময় না। মাঝে মাঝে বলি। আপনার মতো কাউকে পেলে সবচে' বেশি মিথ্যে বলি।'
'আমার মতো মানে?'
'উমম, আপনার মতো মানে বোকাসোকা মানুষ।' বলে আবারও হাসল সে।
'সাইক্রেটিস্টের কাছে কেন যান, আপনি?'
আদুরী এক প্লেট ফুচকা খেয়ে আরো এক প্লেট ফুচকার অর্ডার দিলো। একটু পানি খেয়ে বলল, 'আপনি কেন যান?'
'আমি যাই না। কাল প্রথম গিয়েছিলাম।'
'ওঃ, তাই?'
'জি।'
'সাইক্রেটিস্টের কাছে যাওয়ার স্পেসিফিক কোনো কারণ নেই। তবে আমার খুব ভালো লাগে সাইক্রেটিস্টদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে। আমার মনে হয় পুরো পৃথিবীর মানুষ এক রকম আর সাইক্রেটিস্টরা অন্যরকম।'
জাফর ভ্রু কুঁচকাল, 'আপনার বাবা-মা কিছু বলে না, এ ব্যাপারে?'
ফুচকাঅলা এক প্লেট ফুচকা নিয়ে এল। আদুরীর দিকে এগিয়ে দিলো। আদুরী বলল, 'ঢেকে রাখুন। একজন মেহমান আসছে। সে খাবে।'
ফুচকাঅলা প্লেট ঢেকে রাখল।
'কে আসবে?'
আদুরী প্রশ্ন এড়িয়ে বলল, 'আমার বাবা আমাকে প্রথমবার বলেছিলেন সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করতে।'
'আর কেউ বলেছে কি?'
আদুরী তাচ্ছিল্য করে বলল, 'বাবা, স্কুল শিক্ষক, কলেজ শিক্ষক, সহপাঠী, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই বলেছেন। ক'জনের নাম বলব?'
'আপনার মা বলেনি?'
'না। মা বলেনি। মা জানে, আমি পাগল নই।'
'আপনি হয়তো জানেন না, অনেক ভালো মানুষও সাইক্রেটিস্টদের সাথে দেখা করে।'
'জানি।' বলে উঠে দাঁড়াল আদুরী। দু'প্লেট ফুচকার দাম দিয়ে পা বাড়াল ডা. আদুরীর চেম্বারের দিকে।
জাফর পকেট থেকে ফোন বের করল। নিতুর নাম্বার ডায়েল করে ফোন কানের কাছে ধরে রাখল।
'হ্যালো, নিতু?'
'হুঁ।'
'একটু আগে অদ্ভুত এক মেয়ের সাথে দেখা হলো। মেয়েটার নাম আদুরী রয়...'
'কোথায় তুমি, জাফর?'
'রাস্তায়।'
'বাসায় আসবে কখন?'
'কিছুক্ষণ পর।'
'একটু তাড়াতাড়ি এসো। অস্থির লাগছে। রাখি?'
'মেয়েটার কথা শুনবে না?'
'বলো।'
'মেয়েটির নাম আদুরী রয়। খুব সুন্দর একটি মেয়ে। কাল সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করতে গিয়ে ওঁকে ওখানে দেখে ভাবলাম সে-ই বুঝি সাইক্রেটিস্ট।'
'তুমি সাইক্রেটিস্টের কাছে কেন গিয়েছিলে?' গলাটা ভারী।
জাফর ফোন রেখে দিলো। সে ভেবেছিল, সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করার কথা কাউকে বলবে না। নিতুকেও না। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। নিতু জেনে গেল। জাফর নিতুর কাছ থেকে কিছু লুকাতে পারে না। শত চেষ্টা করলেও না।

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Abid faraje, Sume akter, Abul basar, Sakib sikdar, Pk monish, Soneya islam, Sm shorif and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty Re: নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:42 pm
(পর্ব : সাত)

জাফর কখনো রাত করে বাড়ি ফেরে না। সন্ধ্যার পর কফিশপে যায়৷ ওখানে আধঘন্টা কাটায়। তারপর বাসায় ফিরে আসে। আজ সে এখনও ফিরেনি। টেবিলে ভাত রেখে শুয়ে পড়েছিল নিতু। বারোটা বাজার সাথে সাথে ঘড়িতে ঘন্টা বাজল। সেই শব্দে ঘুম ভাঙল নিতুর। সে ঘুমঘুম চোখে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে দরজার ওপাশে দৃষ্টি রাখল। জাফর প্রতিদিন বাসায় এসে এক পলক নিতু আর মুসকানকে দেখে দরজা বন্ধ করে দেয়। আজ দরজা খোলা দেখে নিতু মনে মনে গালাগাল করল জাফরকে। হাই তুলতে তুলতে সতর্ক পা ফেলে বিছানা ছেড়ে নামল। দরজার সামনে গিয়ে অবাক হয়ে গেল। সোফা খালি পড়ে আছে। এখন জাফর সোফায় শুয়ে শুয়ে নাক ডেকে ঘুমানোর কথা। একবার ওয়াশরুমের দিকে চেয়ে দেখল নিতু। ওয়াশরুমের দরজা বাইরে থেকে আটকানো। তার মানে জাফর এখনও আসেনি। নিতুর একবার মনে হলো, সে স্বপ্ন দেখছে। তারপর আবার ভাবল, না স্বপ্ন নয়। স্বপ্নে কখনো হাঁটা যায় না। সে হাঁটতে পারছে।
নিতুর বাঁ চোখের পাতা খুব দ্রুত গতিতে কাঁপছে। মা বলেছিলেন, বাঁ চোখ কাঁপলে বুঝতে হবে সামনে বিপদ।
নিতু চোখ বন্ধ করে রাখল কিছুক্ষন। তারপর আবার তাকাল। নাঃ, এখন আর কাঁপছে না। তবে চোখ দু'টো ঝাঁপসা হয়ে আসছে ক্রমশ। ঘুমে চোখ লেগে আসছে। ঘুম তাড়ানোর জন্য চা খাওয়া যেতে পারে। নিতু রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। যেতে যেতে ভাবল, জাফর কোনো বিপদে পড়ল না তো!
দু'কাপ চা বানাল নিতু। এক কাপ নিজের জন্য, অন্যটা জাফরের জন্য। জাফরের চা টেবিলে রেখে সোফায় বসল নিতু। একটু একটু চুমুক দিয়ে চা খেল। ঘুম কাটল না। টি-টেবিল থেকে পত্রিকা হাতে নিল। স্বভাবত পত্রিকা পড়ে না সে। একসময় ভালো ভালো ম্যাগাজিন বেরোত। ওগুলো পড়তো। ইদানীং পড়া হয় না।
পত্রিকার প্রথম পাতায় নজরে পড়ল, 'রাজপথে মৃত্যুর হানা।' সারা দেশে সড়ক দূর্ঘটনায় এগারো জনের মৃত্যু।
নিতু পাতা ওল্টাল। পুরো পত্রিকায় শুধু খুন, রাহাজানি, ছিনতাইয়ের খবর চোখে পড়ল তার। এসব দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মৃদু ভয় হতে লাগল। ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজে। নিতু বিড়বিড় করে বলল, 'জাফরটা কোথায়!'
মুসকানের পাশে বসল নিতু। মুসকানের চুলে বিলি কেটে দিলো। হাত-পা টিপে দিলো। গালে-কপালে চুমু খেল। তবুও শান্তি লাগল না। অজানা এক অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে, কেউ একজন বুকের উপর বসে গলা চেপে ধরেছে। চাইলেও তার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। চিৎকার দেওয়া যাচ্ছে না। নড়াচড়া অবধি করা যাচ্ছে না।
নিতু উঠে দাঁড়াল। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। বারোটা তেতাল্লিশ বাজে। স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে এগিয়ে গেল। স্লাইড উইন্ডো খুলল। আকাশটা আজ কেমন যেন থমথমে হয়ে আছে। ঘন অন্ধকার। চাঁদ নেই, তারা নেই। আঁধার, আঁধার আর আঁধার। নিতু জানালা বন্ধ করল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বারান্দার দিকে পা বাড়াল।
এক চিলতে বাড়ান্দা। একটি ইজি চেয়ার। ছোট্ট একটি টেবিল। কয়েকটি ফুলের টব। বারান্দার কার্নিশে চড়ুই পাখি বেঁধেছে বাসা। নিতু ইজি চেয়ারে জড়োসড়ো হয়ে বসল। শীত লাগছে। মাথা ধরেছে। ঘুমে টলে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিচ্ছে সে। বাসার গেটে খচখচ শব্দ হলো। নিতু উঠে দাঁড়াল। গ্রিলের বাইরে দৃষ্টি রাখল। উপর তলার ভাড়াটিয়া মঈন উদ্দিন সাহেব এসেছেন। উপরতলার পুরো ফ্ল্যাটে তিনি একা থাকেন। ভোর সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে যান, গভীর রাতে ফেরেন। শুক্রবারেও একই রুটিন। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় বলেছেন, এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা করেন তিনি। নিতুর তেমনটা মনে হয় না। একটু একটু সন্দেহ হয়। কোট-টাই পরে ব্রিফকেস হাতে নিয়ে বেরিয়ে যায় লোকটা। রাতে টলতে টলতে বাসায় ফেরে। দেখে মনে হয় নেশা করেছে। একবার নিতু দাঁড়োয়ানকে বলেছিল, 'উপরতলার মঈন উদ্দিন সাহেব বাসায় ফেরার সময় উনার মুখে কোনো গন্ধ পাউ, মতি?'
দাঁড়োয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কীরকম গন্ধ, আপা?'
'মদ-গাঁজা এসব?'
দাঁড়োয়ান ভড়কে গেল। প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'আপনে বহুত খারাপ লোক, আপা। মঈন স্যারের মতো ভালা মাইনষের নামে এইসব বলতেছেন। আপনে বহুত খারাপ লোক, বহুত।'
নিতু তৎক্ষণাৎ ফিরে এল। আর কখনো কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
ইজি চেয়ারে দুম করে বসল নিতু। একবার ভাবল, জাফরকে ফোন দেবে। আবার ভাবল, কী দরকার!
ডায়নিং টেবিলের উপর এক কাপ চা রাখা ছিল জাফরের জন্য। নিতু চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সোফায় বসল। আপাতত চা'টা নিতুর দরকার। জাফর এলে রেঁধে দেওয়া যাবে।
ঠান্ডা চায়ে ঘুম কাটল না নিতুর। সে বাদলকে ফোন করল।
'হ্যালো, বাদল?'
'হুঁ।'
'ঘুমাচ্ছিলে?'
'হুঁ।'
'সিগারেট জ্বালিয়েছো?'
'না, লাইটার খুঁজে পাচ্ছি না। পেলেই জ্বালাব।'
'খবরদার, সিগারেটে হাত দেবে না বলে দিলাম।'
'আচ্ছা।'
'বাদল!'
'হুঁ?'
'জাফর এখনও ফেরেনি।'
'ক'টা বাজে?'
'বারোটা পঞ্চান্ন।'
'কোথাও আড্ডা দিচ্ছে বোধহয়। চিন্তা করো না, চলে আসবে।'
'জাফর এত রাত পর্যন্ত আড্ডা দেবার মতো মানুষ না।'
'তাহলে হয়তো কোনো মেয়ে ফ্রেন্ডের বাসায়...'
'ওঁর কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড নেই। এটা তুমি নিজেও জানো, বাদল।'
'জাফর কয়টায় বাসায় ফিরে?'
'আট-ন'টার মধ্যেই ফিরে। কফিশপ থেকে সোজা বাসায় আসে।'
'কীভাবে আসে? বাইক?'
'না, রিকশা করে আসতো। এখন তো ওঁকে গাড়ি দিয়েছে অফিস থেকে। গাড়িতে করেই আসে।'
'গাড়ি সে নিজেই চালায়?'
'না, ড্রাইভার আছে।'
'নিতু!'
'বলো।'
'তুমি কি কাঁদছো?'
'কই, না-তো!'
'চিন্তা করো না। জাফর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরবে। দেখে নিও।'
ফোন কেটে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নিতু। সে বাদলের কাছ থেকে শান্তনা চায়নি। ভেবেছিল বাদল কিছু একটা বলবে যাতে নিতুর মন ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু বাদল তেমন কিছু বলল না। উল্টো বাদলের সাথে কথা বলে নিতুর মন আরো খারাপ হয়ে গেল।
ডায়নিং টেবিলে মাছ, মাংস, ডাল, সবজি সব আছে। এসবের কিছুই জাফরের প্রিয় না। জাফরের প্রিয় খাবার গরম ভাতের সাথে সরষে তেল দিয়ে আলু ভর্তা আর ডিম ভাজা। নিতু ভাবল, আজ জাফরের প্রিয় খাবার রাঁধা যাক। এ বাহানায় সময় কাটানো যাবে।
নিতু ডিম ভাজল। সরষে তেল দিয়ে আলু ভর্তা করে টেবিলে এনে রাখল। চা রাঁধল দু'কাপ। এক কাপ চা ঢেকে রাখল জাফরের জন্য। বাকি এক কাপ চা হাতে নিয়ে বারান্দায় এল সে। রাত বাড়ার সাথে সাথে শীত বাড়ছে৷ অস্বস্তি বাড়ছে।
নিতুর একটু একটু বমি বমি ভাব করছে। পেটে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়েছে। মাথা ধরা বেড়েছে একটুখানি। বারান্দায় বসে থাকা আর সম্ভব হলো না। ওয়াশরুমে গেল। কুলকুচি করল। মুখে এক ঝাপটা ঠান্ডা পানি মারল। তারপর আয়নায় তাকাল সে। চোখ দু'টো ফুলে আছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে কত রাত ঘুমায়নি!
একটি বই খুলে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল নিতু। বিদেশী বই। বাংলায় অনুবাদ করা। শুরুর কিছুটা অংশ আগে পড়ে রেখেছে সে। এখন যে অংশে আছে সেখানে গল্পের নায়ক একটি ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল নদীর বুকে চারকোনা পিলারের উপর দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজটা। দুঃখজনকভাবে ব্রিজের কিনারা নেই। একটাই রাস্তা, ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়ে সাঁতরে নদী পার হওয়া। ভাঙা ব্রিজে গল্পের নায়ক কীভাবে উপস্থিত হয়েছে সেটা আগে পড়ে রেখেছিল নিতু। এখন সেটা মনে পড়ছে না। গল্পের নায়ক ব্রিজের নিচে তাকাল। ঘন অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখতে পেল না সে। কারণ গল্পটা মাঝ রাতে এসে থেমেছে। আকাশে গুরুগুরু মেঘ। একটুও আলো নেই। নায়ক পকেট থেকে লাইটার বের করল। নিতু ভ্রু কুঁচকাল। সিগারেট খাওয়ার প্লাস-পয়েন্ট আছে তবে!
হাই তুলে আবার বইয়ে মনুযোগ দিলো নিতু। গল্পের নায়ক লাইটারের আলো জ্বলে এক মনে বলতে লাগল, 'সময় আমায় রাস্তা দেখাও, সময় আমায় রাস্তা দেখাও...' অমনি বৃষ্টি পড়তে শুরু হলো। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সাধারণের তুলনায় একটু বড় বড়। একটু ভারী, শীতল। নায়কের গায়ে পড়তেই সে চিৎকার দিয়ে উঠছে। একসময় নায়ক ব্রিজের উপর লম্বালম্বিভাবে শুয়ে পড়ল। বৃষ্টি থেমে গেল। নায়ক কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসল। বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাওয়া লাইটার জ্বালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু লাইটার জ্বলল না।
বই রেখে উঠে দাঁড়াল নিতু। এসব বইয়ে রস থাকে না। মন ভালো হওয়া তো দূর, উল্টো মন খারাপ হয়ে যায়।
'হ্যালো, বাদল।'
'হুঁ।'
'ঘুমাচ্ছিলে?'
'ঘুম আসছিল না। আলো নিভিয়ে শুয়ে ছিলাম। জাফর ফিরেছে?'
'না।'
'ক'টা বাজে?'
'একটা উনপঞ্চাশ।'
'মাই গড, এত রাত পর্যন্ত বাইরে!'
'এখন কী করব, বাদল?'
'শুয়ে পড়ো। কাল সকালে থানায় জিডি করব।'
নিতুর বুক কেঁপে উঠল। চোখে এক ফোঁটা জল জমে গেল। শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। সে কাঁপা গলায় বলল, 'জিডি করব কেন? জিডি করার মতো কিছু হয়েছে নাকি!'
'একটা মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ হলো। জিডি করবে না? তুমি কি খুঁজে বের করতে পারবে তাকে?'
'তুমি কি বলছো, জাফর বিপদে পড়েছে?'
'বিপদে না পড়লে তো এতক্ষণে চলে আসত। এখনও যেহেতু আসেনি...'
'আমার কী মনে হয়, জানো?'
'কী?'
'আমার মনে হয় জাফর যেখানে আছে, সুস্থ আছে। এবং সে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় ফিরবে।'
'এলেই ভালো। যা ভীতু, বেচারা।' বলে ফিকফিক করে হাসল বাদল।
নিতু ফোন রেখে বারান্দায় গেল। ইজি চেয়ারে বসতেই দরজায় খটখট আওয়াজ এল। নিতু দ্রুত পায়ে ছুটে গেল। একটু গম্ভীর ভাব নিল। তারপর দরজা খুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে ভেবেছিল, জাফর ভয়ে ভয়ে বলবে, 'শুভ সন্ধ্যা।' তারপর সোজা ওয়াশরুমে চলে যাবে। হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসবে। কিন্তু এমন কিছুই হলো না। জাফর আসেনি। দরজার বাইরে এক জোড়া স্যান্ডেল ব্যতিত আর কিছুই দেখতে পেল না সে।

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Sume akter, Abul basar, Sakib sikdar, Nafisa akter, Pk monish, Soneya islam, Sm shorif and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty Re: নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:42 pm
(পর্ব : আট)

নিতু আর জাফর সহপাঠী না হলেও ওঁদের মধ্যে খুব ভাব ছিল। ভার্সিটি ক্যাম্পাসে মাঝে মাঝে দেখা হলে নিতু মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করত, 'কেমন আছেন, ভূত ভাই?'
জাফর শুকনো হেসে বলত, 'ভালো।'
শুধু নিতু না, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই জাফরকে এক নামে চিনত। জুনিয়ররা ভূত ভাই বলে ডাকত। সহপাঠী আর সিনিয়ররা ভূত। এর একটা কারণ আছে। জাফর যখন-তখন, যেখানে-সেখানে ভূতের মতো বই খুলে বসে পড়ত। তখন ভূমিকম্প হয়ে গেলেও তার খবর হত না। যেন এক নির্লিপ্ত ভূত।
সেসময় জাফরের কাঁধে একটা ঝোলাব্যাগ থাকত৷ ব্যাগে কয়েকটি বই। বলপেন ও নোটপ্যাড। স্পেশালি এক প্যাকেট সিগারেট ও লাইটার। সিগারেট সে সবার সামনে খেত না৷ লুকিয়ে খেত। ক্যাম্পাস থেকে অনেক দূরে। বস্তি এলাকার এক সরু গলিতে দাঁড়িয়ে নেশা মিটিয়ে চুইংগাম চাবাতে চাবাতে ভালো মানুষের মতো বেরিয়ে আসতো সে।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্যারের বিবাহ বার্ষিকীতে সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হলো। শিক্ষার্থীদের সাথে নিতুও গেল। জাফরও ছিল সেখানে। তবে সবার থেকে একটু দূরে বাহারি রঙের আলোর নিচে বই খুলে বসে ছিল সে। হঠাৎ ভীড়ের মাঝখান থেকে নিতুর কান্নার আওয়াজ শুনা গেল। জাফর বইয়ে মনোযোগ দিলো। মূল ঘটনা নিতুর ভ্যানিটি ব্যাগ হারানো নিয়ে। ব্যাগে টাকা খুব একটা ছিল না। তবে নিতুর মায়ের দেওয়া সোনার চেন ছিল ওই ব্যাগে। কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নিতুর কান্নার আওয়াজ আরো বাড়ল। শুরু হলো শোরগোল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেপেলেরা হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল নিতুর ভ্যানিটি ব্যাগ আর চেন। ওঁদের সবার নজর শুধু এক জায়গায় পড়েছিল তখন। জাফরের উপর। এমন হুলস্থুল পরিবেশে একটা মানুষ কীভাবে এতটা শান্ত হয়ে বসে বসে বই পড়তে পারে!
একজন এগিয়ে এসে বলল, 'ভূত!'
জাফর চশমার ফ্রেম আঙুলের খোঁচায় নাকের ডগা থেকে উপরে তুলে ভ্রু কুঁচকে বলল, 'জি?'
'তোমার ঝোলাব্যাগটা দাও, চেক করব।'
জাফর ঝোলাব্যাগ দেয়নি। কারণ সে জানত, ব্যাগে সিগারেটের প্যাকেট আছে। যা দেখলে তার মানহানি হবে। কিন্তু সে এটা জানত না, তার ঝোলাব্যাগে নিতুর সোনার চেন আছে।
কৌতূহলবশত জাফরের ঝোলাব্যাগ চেক করা হলো। সেখান থেকে নিতুর ভ্যানিটি ব্যাগ এবং চেন পাওয়া গেল। সবাই ওগুলোই দেখল কেবল। সিগারেট আর লাইটার দেখল না। জাফর মনে মনে হাসল, 'সবাই কী কানা রে বাবা!'
চুরির দায়ে জাফরকে পুলিশে দেওয়া হত। অনেকের দাবী ছিল, চোর ব্যাটাকে পুলিশে দেওয়া হোক। সেদিন নিতুর অনুরোধে জাফরকে পুলিশে দেওয়া হয়নি। দাঁড়োয়ান এসে জাফরের ফতুয়ার কলার ধরে টেনে বের করে দেয়। জাফর যেতে যেতে বই মেলে ধরে। পড়তে পড়তে হাঁটে। নিতু অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল সেদিন। লোকটা এত নির্লিপ্ত! কী অদ্ভুত, কী অদ্ভুত!
পরদিন নিতুর সাথে ক্যাম্পাসে দেখা হলো জাফরের। নিতু মুচকি হেসে বলল, 'কেমন আছেন, ভূত ভাই?'
জাফর ভ্রু কুঁচকে বলল, 'গতকাল লোকজন আমায় চোর বলল কেন? আমি কি চোর?'
'আমার জিনিস আপনার ব্যাগে পাওয়া গিয়েছে, তাই বলেছে।'
'ওগুলো তো তুমি রেখেছো। কেন রেখেছিলে আমার ব্যাগে?'
'এমনি রেখেছি। আমার ইচ্ছে হয়েছে, তাই রেখেছি। আপনার কোনো সমস্যা? মারবেন আমাকে?'
জাফর জবাব দেয়নি। হাঁটু গেঁড়ে বই খুলে বসে পড়ে।
জাফর তখন লোকাল কোচিং সেন্টারে পড়াত। একদিন বিকেলে নিতু গেল তার কোচিং সেন্টারে। জাফর ওখানে নেই। ছোট্ট একটি পাকা ঘর। কয়েকটি টেবিল-চেয়ার। চেয়ারে বসে আছে দশ-বারো বছর বয়েসী ছেলে-মেয়ে। নিতু বলল, 'তোমাদের ভূত স্যার কোথায়?'
নিতু ভেবেছিল ভূত স্যার শুনে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়বে। কিন্তু তেমনটা হলো না। কেউ হাসল না। কয়েকজন একসাথে বলল, 'স্যারের শরীর খারাপ। আজ পড়াবে না।'
ছোট্ট একটি ঘরে থাকত জাফর৷ স্টিলের নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল নিতু। কাঠের দরজায় কাড়া নাড়তেই জাফর দরজা খুলে দিলো। নিতুকে দেখে ইতস্তত করে বলল, 'আপনি!'
'হ্যাঁ, আমি। ভয় পেয়েছেন বুঝি?'
'না।'
'বসতে বলবেন না?'
জাফর ইতস্তত করে বলল, 'বসুন।'
ঘরে চেয়ার নেই। বিছানায় বসতে দিলো নিতুকে। নিতু বসল। জাফর হাতে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল।
নিতু বলল, 'মেহমান এসেছে, কিছু খেতে দেবেন না?'
জাফর বেরোতে যাচ্ছিল। নিতু জাফরকে টেনে ধরে বলল, 'থাক, লাগবে না।' বলে ফিকফিক করে হাসল।
জাফর বোকার মতো চেয়ে বলল, 'রাগ করেছেন?'
'না, রাগ করিনি। শুনলাম, আপনার নাকি শরীর খারাপ?'
জাফর হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বলল, 'মাথা ধরেছে।'
নিতু ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কোচিং-এ না যাওয়ার ধান্দা, হুঁ?'
জাফর ভয়ে ভয়ে বলল, 'সত্যি বলছি, মাথাটা খুব ধরেছে।'
নিতু শব্দ করে হেসে বলল, 'ভয় পাচ্ছেন কেন, আমি তো মজা করলাম!'
নিতু মাঝে মাঝে ভেবে পায় না, সেই ভীতু লোকটা, যাকে পুরো ক্যাম্পাস রসিকতা করে ভূত বলে ডাকত, সে আজ তার মেয়ের বাবা! বিছানা ছেড়ে জানালার সামনে দাঁড়াল নিতু। স্লাইড উইন্ডো খুলল...
দরজায় খটখট শব্দ হলো। নিতু ঘড়ির দিকে তাকাল। তিনটা এগারো মিনিট। একবার মনে মনে ভাবল, মনের ভুল নাতো! আবার ভাবল, দরজা খুলেই দেখা যাক।
এবার আর গম্ভীর ভাব নিল না সে। খুব স্বাভাবিক ভাবে দরজা খুলে দিলো। জাফর কিছু না বলে সোজা ওয়াশরুমে গেল। নিতুর দিকে তাকাল না। নিতু দরজা বন্ধ করতে করতে জাফর ওয়াশরুমে থেকে বেরিয়ে টাওয়াল হাতে নিল। হাত-মুখ মুছে খাবার টেবিলে বসল। নিতু ভাত বেড়ে দিলো। ডিম ভাজা, আলু ভর্তা এগিয়ে দিলো। জাফর এসবের কিছুই ছুঁয়ে দেখল না। ঢুকঢুক করে এক গেলাস পানি খেল। তারপর শান্ত হয়ে বসল কিছুক্ষণ। নিতু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তার পাশে। ওঘর থেকে ঘড়ির টিকটিক আওয়ার স্পষ্ট শুনা যাচ্ছে। হঠাৎ জাফর বলল, 'পুড়া মানুষ দেখেছো নিতু?'
নিতু হকচকিয়ে উঠল। এতটাই অবাক হলো, তার মুখে দিয়ে টু-শব্দ বেরোল না।
জাফর বলল, 'আমার ড্রাইভারকে চেনো তো? ওঁর নাম রাজিব।'
নিতু কিছু বলল না।
'রাজিবের ছোট্ট একটি মেয়ে ছিল, আমাদের মুসকানের মতো।'
নিতু ধরা গলায় বলল, 'ছিল বলছো কেন? এখন কোথায়, সে?'
জাফর কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, 'পাঁচ বছরের ফুটফুটে মেয়েটা আগুনে পুড়ে ঝলসে গেল...' বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ল।
নিতু জাফরের কাঁধে হাত রেখে বলল, 'কীভাবে হলো এসব?'
জাফর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 'মশারী টানিয়ে ঘুমিয়েছিল মেয়েটা। ওঁর মা কয়েল জ্বালিয়ে বিছানার পাশে রাখল, যাতে মশা কোনো মতে তার ধারেকাছে না যায়। অথচ, সেই কয়েলের আগুনে পুড়ে মরল মেয়েটা। কয়েল থেকে কীভাবে যে মশারীতে লেগে গেল! ইশ, ইশ!'
'লাশ দাফন করে এসেছো?'
জাফর চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। শোবার ঘরে চেয়ে দেখল মুসকান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে ফিরে এসে আবার খাবার টেবিলের সামনে এসে বসল। এক গেলাস পানি খেল। নিচু স্বরে বলল, 'কাল হবে জানাজা। রাজিবকে যদি একবার দেখতে। কম করে হলেও পাঁচবার অজ্ঞান হয়েছে। এত যন্ত্রণা।'
নিতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'খাবে না?'
'খিদে নেই।'
'তাহলে শুয়ে পড়ো।'
'ঘুম-ও নেই। মেয়েটার মায়াময় চেহারাটা এখনও চোখে ভাসছে...'
নিতু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
'আমার গায়ে একটু হাত রাখো না, নিতু। শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। তুমি ছুঁলে কমবে বোধহয়।'
'অনেক রাত হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ো, জাফর।' বলে শোবার ঘরে চলে গেল নিতু। জাফর বসে রইল খাবার টেবিলের সামনে। ঘুমন্ত মুসকানের ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছে সে। নিতু শোবার ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল, 'গুড নাইট।'
কিছুক্ষণ পর শোবার ঘরে গেল জাফর। ঘুমন্ত মা মেয়েকে চেয়ে দেখল। মুসকানটা দেখতে হুবহু তার মা'র মতো হয়েছে। চোখ, নাক, ঠোঁট, কপাল সব। নিতুর কপালের বাঁ পাশে ছোট্ট একটি তিল আছে। মুসকানেরও আছে। জাফর নিতুর পাশে বসল। নিতু গভীর ঘুমে টলে পড়েছে। জাফর সেই সুযোগে নিতুর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। বিয়ের পর নিতু নিজেই বলতো, তার চুলে বিলি কেটে দেওয়ার জন্য। মুসকানের জন্মের পর সে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে। এখন নিতুর চুলে বিলি কাটা তো দূর, তার সামনে দাঁড়িয়ে দু'টো কথা বলা যায় না। সে রেগে যায়।
হঠাৎ জাফরের মনে হলো, সে ঘুমে টলে পড়ছে। এমনি হবার কথা। নিতুর চুলে বিলি কাটলে আপনাআপনি ঘুম চলে আসে। এটা তার পুরনো অভ্যেস।
কখন শুয়ে পড়েছিল, মনে নেই৷ হঠাৎ যখন চোখ খুলল, তখন ঘড়িতে তিনটা উনষাট মিনিট। জাফর খেয়াল করল, তার পাশে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে নিতু। জাফর একবার ডাকল, 'এ্যাই নিতু, এ্যাই।'
নিতু গোঙানির মতো শব্দ করে আবার শুয়ে পড়ল। জাফর বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গেল। কিছুক্ষণ পায়চারি করে ইজি চেয়ারে বসল৷ সিগারেট জ্বালাল। এতক্ষণ সে রাজিবের মেয়ের মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়েছিল। এখন আবার মনে পড়েছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জাফর। সিগারেটে লম্বা লম্বা টান দিয়ে উচ্ছিষ্ট অংশ বারান্দা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলল। চুইংগাম মুখে দিলো। কিছুক্ষণ চিবিয়ে ডায়নিং রুমে গেল। খাবার টেবিলে বসে এক গেলাস পানি খেল। তারপর শোবার ঘরে আসতেই চমকে উঠল। নিতু ঘুম থেকে উঠে চোখ বড় বড় করে বসে আছে। জাফর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলল, 'তুমি কি আমার পাশে শুয়ে ছিলে এতক্ষণ?'
জাফর আমতা আমতা করে বলল, 'তোমার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে কখন যে শুয়ে পড়েছিলাম...'
নিতু ভারী গলায় বলল, 'তোমাকে কে বলেছে, আমার চুলে বিলি কেটে দিতে?'
জাফর হাতে হাত বেঁধে আসামির মতো দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর বিনয়ী কণ্ঠে বলল, 'মুসকানের পাশে শুয়ে পড়ি?'
নিতু কড়া গলায় বলল, 'না। দরকার নেই।'
'তাহলে মুসকানকে আমার কাছে দাও। আমার আজকে ঘুম আসছে না। মুসকানকে কোলে নিয়ে শুয়ে থাকব।'
নিতু দ্রুত এগিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিলো। জাফর নিচু স্বরে বলল, 'মেয়েটা বুঝি তোমার একার? আমার একটুও অধিকার নেই? তুমিওতো আমার, তাই না? এমন করো কেন? মেয়েটাকে ছুঁতে পর্যন্ত দাও না। আমি কী করেছি, বলো?'

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Sume akter, Abul basar, Sakib sikdar, Nafisa akter, Pk monish, Soneya islam, Sm shorif and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty Re: নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:45 pm
(পর্ব : নয়)

চেয়ারে বসে বসে টলছিল বারিশ। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। জাফরকে দেখে সোজা হয়ে বসে বলল, 'শুভ সকাল।'
সাদা শার্ট পরে কনুইয়ের ভাঁজে কালো কোট রেখে সোজা হয়ে হেঁটে আসছিল জাফর। হঠাৎ দাঁড়াল। একবার চেয়ে দেখল। তারপর ধীর গলায় বলল, 'আজ শাড়ি পরেছেন?'
বারিশ শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বলল, 'জি।'
জাফর নিতান্ত সহজ গলায় বলল, 'না পরলেও পারতেন।'
বারিশ হকচকিয়ে উঠল। চেয়ার থেকে দড়বড় করে উঠে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। জাফর বলল, 'আপনাকে সালোয়ার কামিজে ভালো মানায়।' বলে নিজ কক্ষে চলে গেল। নিতু চেয়ারে টলে পড়ল। কিছুক্ষণের জন্য ভয় পাইয়ে দিয়েছিল লোকটা।
ঘরে ঢুকতেই সর্বপ্রথম নজরে পড়ল টেবিলের উপর কাটাঅলা গাছটা। গাছের গায়ে লম্বা লম্বা সুচালো কাটা। তবে দেখতে সুন্দর।
চেয়ারের হাতলে কোট ভাঁজ করে রাখল জাফর। জানালার পরদা সরিয়ে দিলো৷ এয়ার কন্ডিশন চালু করল। চেয়ারে বসে এক গেলাস পানি খেল। লাল বোতাম টিপতেই বারিশ এল। দরজা ঠেলে ধরে গলা বাড়িয়ে বলল, 'জি?'
'শাড়িতেও আপনাকে বেশ মানায়।'
'থ্যাংক য়্যু। আর কিছু?'
'না।'
বারিশ চলে গেল। জাফর টেলিফোন কানে লাগাল, 'হ্যালো,নিতু?'
'বলো।'
'মুসকান ঘুম থেকে উঠেছে?'
'হ্যাঁ।'
'খেয়েছো তোমরা?'
'খেয়েছি।'
'গুড। আমি এখনও খাইনি। পানি খেয়েছি এক গেলাস। আপাতত খিদে নেই। খিদে লাগলে ক্যান্টিন তো আছেই, হা-হা!'
'রাখি জাফর?'
'রাখো। আচ্ছা শুনো...'
'বলো।'
'বারিশ নামের একটা মেয়ের কথা বলেছিলাম না?'
'বলেছিলে।'
'আজ সে শাড়ি পরে এসেছে। গাড় নীল শাড়ি। অসম্ভব সুন্দর লাগছে দেখতে। আসার সময় একটা নীল শাড়ি নিয়ে আসব?'
'না, দরকার নেই।'
'তাহলে খয়েরী?'
'লাগবে না, জাফর। আমার যথেষ্ট আছে। রাখছি।'
'তোমার জ্বর কি কমেছে?'
'আমার জ্বর, তোমাকে কে বলল?'
'কাল রাতে যখন কপালে হাত রেখেছিলাম, তখন তোমার শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেশি ছিল। বাসায় তো থার্মোমিটার নেই। থাকলে তখনই মেপে দেখতাম।'
'মাপার দরকার নেই। আমার শরীরে জ্বরের ছিটেফোঁটা নেই। আমি একদম সুস্থ আছি। রাখি?'
'রাখো।'
নিতু ফোন রেখে দিলো। জাফর টেলিফোন কানের কাছে ধরে রাখল কিছুক্ষণ।
লাল বোতাম টিপতেই বারিশ এল। জাফরের মাঝে মাঝে মনে হয়, মেয়েটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বোতাম টিপতেই দরজা ঠেলে বলে, 'জি?'
'মিস বারিশ, আপনাকে আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।'
বারিশ কোমল গলায় বলল, 'কোথায়?'
'সেটা পরে বলব।'
'দুঃখিত। আমি আপনার কথা রাখতে পারছি না। অফিসের কোনো কাজ থাকলে বলুন।'
জাফর করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, 'আপনাকে নিয়ে যাওয়া খুব দরকার। না করবেন না, প্লিজ।'
বারিশ সহজ ভঙ্গিতে বলল, 'আমি আপনার সাথে কোথাও যাচ্ছি না।'
জাফর অতিশয় নরম গলায় বলল, 'জোর করব না। শুধু এটুকুই বলব, আপনি না গেলে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।'
বারিশ শেষমেশ রাজি হলো। গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে বসল। জাফরকে ড্রাইভিং সিটে বসতে দেখে বলল, 'আপনি চালান? ড্রাইভার নেই?'
জাফর গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, 'ড্রাইভার আছে। ছুটিতে।'
'আপনি আর কী কী পারেন?'
জাফর মৃদু হেসে বলল, 'সবকিছু পারি এমন না। ড্রাইভিং শিখেছিলাম পেটের দায়ে। আজও কাজে লাগছে।'
'পেটের দায়ে? আপনার মতো একজন পেটের দায়ে গাড়ি চালাবে?'
জাফর শব্দ করে হাসল, 'আপনার কি মনে হয়, চাকরিটা হাতে নিয়ে জন্মেছিলাম?'
বারিশ মাথা নেড়ে বলল, 'তা-না। আচ্ছা, আমরা যাচ্ছি কোথায়?'
'একজনের সাথে দেখা করতে।'
'কার সাথে?'
'যার সাথে দেখা করার জন্য শাড়ি পরেছেন। হাতে পরেছেন কাচের চুড়ি। কানে ঝুমকো। কপালে টিপ...'
'এতকিছু লক্ষ করেছেন?'
'করেছি।'
'কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, বললেন না..'
'যার সাথে আজ আপনার দেখা করার কথা। তবে এখন নয়। আপনার দেখা করার কথা বিকেলে। আমরা সকালেই রওনা হয়েছি। আপনি দরকার পড়লে আবার যাবেন।'
বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'আপনি সোহানের কথা জানেন?'
'জানি। এবং এ-ও জানি, সোহানের সাথে আপনার কিছু একটা চলছে।'
বারিশ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল, 'আপনি এসব বিষয় তদন্ত করতে যান কেন?'
'আমি তদন্ত করিনি। সে নিজেই আমাকে জানিয়ে গেছে।'
'কে? সোহান?'
'হ্যাঁ।'
'সোহান আপনার সাথে দেখা করেছিল?'
'হ্যাঁ।'
'কোথায়?'
'অফিসে।'
বারিশ প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'সোহান অফিসে এসেছিল!'
জাফর শান্ত গলায় বলল, 'এসেছিল।'
'কী বলেছে, আপনাকে?'
'বলেছে, আপনার দিকে যেন চোখ তুলে না তাকাই। তাকালে চোখ উপড়ে ফেলবে।'
বারিশ চোখ বড় বড় করে বলল, 'এসব বলেছে?'
'হ্যাঁ।'
'আর কী বলেছে?'
'বলেছে আমি নাকি খারাপ লোক।'
বারিশ ইতস্তত করল। লোকটা মিথ্যে বলছে নাতো! এমনওতো হতে পারে, লোকটা বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে।
বারিশ শান্ত হয়ে বসে বলল, 'সোহান আপনাকে বলেছে এসব?'
'বলেছে।'
'তাহলে আমরা কেন সোহানের কাছে যাচ্ছি?'
'কারণ, আপনি আমার সামনে সোহানকে বলবেন, আমি আপনার দিকে তাকাই না।'
বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'তাকান তো মাঝেমধ্যে..'
জাফর বোকার মতো চেয়ে বলল, 'আপনি চান, আমার চোখ উপড়ে ফেলুক? চোখ উপড়ে ফেললে আমাকে ভালো দেখাবে, বলুন?'
বারিশ মৃদু হেসে বলল, 'মোটেও ভালো দেখাবে না।'
গাড়িটা পাকা রাস্তা পেরিয়ে বাঁয়ে মোড় নিলো। এ-রাস্তাটা খুব বেশি ভাঙা৷ রাস্তার মাঝখানে ইয়া বড় বড় গর্ত। কিছুটা পথ পেরোলেই সোহানের এলাকা। সেখানে সোহান লোকাল ছাত্রনেতা। যদিও সে আর ছাত্র নেই। শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে চাকরি খুঁজছে।
'আপনি সোহানের বাসা চেনেন?'
'চিনি।'
'সোহান ঠিকানা দিয়েছে আপনাকে?'
'না। আমি খোঁজ নিয়েছি।'
'ও-বাবা, স্পাইং?'
জাফর জবাব দিলো না। রাস্তার বাঁ পাশে গাড়ি দাঁড় করাল। তারপর গাড়ি থেকে নেমে বলল, 'তিনতলা বাড়িটা দেখছেন? সোহান দোতলায় থাকে।'
বারিশ গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, 'জানি, জানি।'
কষ্ট করে দোতলায় উঠতে হলো না৷ সোহান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। বারিশকে দেখে চমকে উঠল। খুশিতে গদগদ হয়ে যখনই কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখন জাফরকে চোখে পড়ল। মুহূর্তেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। শুরু হলো ওঁদের কথোপকথন। জাফর গাড়িতে বসে নিতুর নাম্বার ডায়েল করল, 'হ্যালো, নিতু?'
ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে আসলো, 'নিতু নেই। কী চাই?'
'নেই মানে? এটা তো নিতুর নাম্বার...'
'নাম্বার ঠিকই আছে। কিন্তু এখন ওঁর কাছে দেওয়া যাবে না। যা বলার আমাকে বলুন।'
'নিতুর ফোন আপনার কাছে গেল কীভাবে? কে আপনি?'
'আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি বাদল।'
জাফর ফোন রেখে দিলো৷ একজন পুরুষের কাছে এরচে' ভারী বোঝা আর কিছু হতে পারে না। যদি সম্ভব হত, নিতুকে বুক পকেটে লুকিয়ে রাখত সে।
বারিশ গাড়িতে উঠে বসল। জাফর বলল, 'বলেছেন আমার কথা?'
'বলেছি।'
'আর কখনো আমাকে বকাঝকা করবে না তো?'
বারিশ শব্দ করে হাসল, 'হি-হি, করবে না।'
বাইরে রোদ পড়েছে। সূর্য মাথার উপর। বারিশ গাড়ির কাচ নামাতে যাচ্ছিল। জাফর বলল, 'কাচ নামাবেন না। বৃষ্টি নামবে।'
বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কিন্তু আকাশ তো পরিষ্কার!'
'তবুও নামবে।'
বারিশ গাড়ির কাচ নামাল না। সিট বেল্ট বাঁধল। তারপর বলল, 'আপনার একটা ভালো দিক আছে।'
জাফর কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'কী সেটা?'
'আপনি সব সময় হাসিমুখে থাকেন। কথা বলার ভঙ্গিও হাসিমাখা। আমার মনে হয়, আপনি পৃথিবীর সবচে' সুখী মানুষ। কীভাবে পারেন সবসময় হাসিখুশি থাকতে?'
জাফর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'নিতু বলেছিল, সব পরিস্থিতিতে যেন মুখে হাসি থাকে। সেই থেকে অভ্যেস গড়েছি।'
'নিতু কে? আপনার ওয়াইফ?'
'হ্যাঁ। খুব ভালোবাসে আমাকে।'
'আপনি বাসেন না?'
জাফর চুপ করে গেল। অফিসের পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে গাড়ি থেকে নামল। নিজ কক্ষে গিয়ে চেয়ারে বসল। এক গেলাস পানি খেল। তৃষ্ণা মিটল না। গলাটা শুকিয়ে আছে। পেটে ভীষণ খিদে। তবে খেতে ইচ্ছে করছে না। ক্যান্টিনের খাবারের কথা মনে পড়লেই বমি চলে আসে। লোকাল রেস্তোরাঁগুলো থেকে খাবার খেলে পেটে গ্যাস হয়।
জাফর টেলিফোন কানে লাগাল। বলল, 'হ্যালো, নিতু?'
'হুঁ।'
'দুপুরের খাবার খেয়েছো?'
'না, খাইনি।'
'কী বলো, এখনও খাউনি! ক'টা বাজে দেখেছো?'
'একটা বাজে। আরো এক ঘন্টা পরে খাব।'
'তোমার শরীর এখন কেমন?'
'ভালো।'
'সোহান ছেলেটাকে যেমন মনে করেছিলাম, তেমন না৷ ছেলেটা খুবই শান্ত স্বভাবের। ভালোও।'
'সোহান কে?'
'ওমা! সোহানকে চেনো না? যে অফিসে এসে আমাকে থ্রেট দিয়েছিল।'
'তোমাকে তো অনেকেই থ্রেট করে। ক'জনকে মনে রাখব?'
'তা ঠিক। মুসকান কী করছে?'
'খেলছে।'
'ফোনটা ওঁর কানে দাও।'
'খেলছে খেলুক। অযথা বিরক্ত করে কী লাভ? রাখি জাফর?'
'আচ্ছা।'
টেলিফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জাফর। তার হাতে একটি বলপেন। টেবিলে রাখা একটি এ-ফোর সাইজ কাগজ। কাগজের সাদা জমিনে আনমনে কী যেন লিখেছে জাফর। সামনে ঝুঁকে ভালোভাবে চেয়ে দেখল। সাদা কাগজে কালো কালিতে লেখা, "জীবন্মৃত"। জাফর ভ্রু কুঁচকাল। জীবন্মৃত! এর মানে কী? দ্রুত গুগলে সার্চ করল। জীবন্মৃত মানে বেঁচে থেকেও মৃতপ্রায়। জাফর সোজা হয়ে বসে বলল, 'সত্যিই তো!'

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Sume akter, Abul basar, Sakib sikdar, Pk monish, Soneya islam, Sm shorif, Sheikh anika and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 20
স্বর্ণমুদ্রা : 202
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-01
View user profile

নীরব ঘাতক  Empty Re: নীরব ঘাতক

Fri Jun 04, 2021 9:46 pm
(পর্ব : দশ)

চেয়ারে বসে বসে টলছিল বারিশ। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। জাফরকে দেখে সোজা হয়ে বসে বলল, 'শুভ সকাল।'
সাদা শার্ট পরে কনুইয়ের ভাঁজে কালো কোট রেখে সোজা হয়ে হেঁটে আসছিল জাফর। হঠাৎ দাঁড়াল। একবার চেয়ে দেখল। তারপর ধীর গলায় বলল, 'আজ শাড়ি পরেছেন?'
বারিশ শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বলল, 'জি।'
জাফর নিতান্ত সহজ গলায় বলল, 'না পরলেও পারতেন।'
বারিশ হকচকিয়ে উঠল। চেয়ার থেকে দড়বড় করে উঠে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। জাফর বলল, 'আপনাকে সালোয়ার কামিজে ভালো মানায়।' বলে নিজ কক্ষে চলে গেল। নিতু চেয়ারে টলে পড়ল। কিছুক্ষণের জন্য ভয় পাইয়ে দিয়েছিল লোকটা।
ঘরে ঢুকতেই সর্বপ্রথম নজরে পড়ল টেবিলের উপর কাটাঅলা গাছটা। গাছের গায়ে লম্বা লম্বা সুচালো কাটা। তবে দেখতে সুন্দর।
চেয়ারের হাতলে কোট ভাঁজ করে রাখল জাফর। জানালার পরদা সরিয়ে দিলো৷ এয়ার কন্ডিশন চালু করল। চেয়ারে বসে এক গেলাস পানি খেল। লাল বোতাম টিপতেই বারিশ এল। দরজা ঠেলে ধরে গলা বাড়িয়ে বলল, 'জি?'
'শাড়িতেও আপনাকে বেশ মানায়।'
'থ্যাংক য়্যু। আর কিছু?'
'না।'
বারিশ চলে গেল। জাফর টেলিফোন কানে লাগাল, 'হ্যালো,নিতু?'
'বলো।'
'মুসকান ঘুম থেকে উঠেছে?'
'হ্যাঁ।'
'খেয়েছো তোমরা?'
'খেয়েছি।'
'গুড। আমি এখনও খাইনি। পানি খেয়েছি এক গেলাস। আপাতত খিদে নেই। খিদে লাগলে ক্যান্টিন তো আছেই, হা-হা!'
'রাখি জাফর?'
'রাখো। আচ্ছা শুনো...'
'বলো।'
'বারিশ নামের একটা মেয়ের কথা বলেছিলাম না?'
'বলেছিলে।'
'আজ সে শাড়ি পরে এসেছে। গাড় নীল শাড়ি। অসম্ভব সুন্দর লাগছে দেখতে। আসার সময় একটা নীল শাড়ি নিয়ে আসব?'
'না, দরকার নেই।'
'তাহলে খয়েরী?'
'লাগবে না, জাফর। আমার যথেষ্ট আছে। রাখছি।'
'তোমার জ্বর কি কমেছে?'
'আমার জ্বর, তোমাকে কে বলল?'
'কাল রাতে যখন কপালে হাত রেখেছিলাম, তখন তোমার শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেশি ছিল। বাসায় তো থার্মোমিটার নেই। থাকলে তখনই মেপে দেখতাম।'
'মাপার দরকার নেই। আমার শরীরে জ্বরের ছিটেফোঁটা নেই। আমি একদম সুস্থ আছি। রাখি?'
'রাখো।'
নিতু ফোন রেখে দিলো। জাফর টেলিফোন কানের কাছে ধরে রাখল কিছুক্ষণ।
লাল বোতাম টিপতেই বারিশ এল। জাফরের মাঝে মাঝে মনে হয়, মেয়েটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বোতাম টিপতেই দরজা ঠেলে বলে, 'জি?'
'মিস বারিশ, আপনাকে আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।'
বারিশ কোমল গলায় বলল, 'কোথায়?'
'সেটা পরে বলব।'
'দুঃখিত। আমি আপনার কথা রাখতে পারছি না। অফিসের কোনো কাজ থাকলে বলুন।'
জাফর করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, 'আপনাকে নিয়ে যাওয়া খুব দরকার। না করবেন না, প্লিজ।'
বারিশ সহজ ভঙ্গিতে বলল, 'আমি আপনার সাথে কোথাও যাচ্ছি না।'
জাফর অতিশয় নরম গলায় বলল, 'জোর করব না। শুধু এটুকুই বলব, আপনি না গেলে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।'
বারিশ শেষমেশ রাজি হলো। গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে বসল। জাফরকে ড্রাইভিং সিটে বসতে দেখে বলল, 'আপনি চালান? ড্রাইভার নেই?'
জাফর গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, 'ড্রাইভার আছে। ছুটিতে।'
'আপনি আর কী কী পারেন?'
জাফর মৃদু হেসে বলল, 'সবকিছু পারি এমন না। ড্রাইভিং শিখেছিলাম পেটের দায়ে। আজও কাজে লাগছে।'
'পেটের দায়ে? আপনার মতো একজন পেটের দায়ে গাড়ি চালাবে?'
জাফর শব্দ করে হাসল, 'আপনার কি মনে হয়, চাকরিটা হাতে নিয়ে জন্মেছিলাম?'
বারিশ মাথা নেড়ে বলল, 'তা-না। আচ্ছা, আমরা যাচ্ছি কোথায়?'
'একজনের সাথে দেখা করতে।'
'কার সাথে?'
'যার সাথে দেখা করার জন্য শাড়ি পরেছেন। হাতে পরেছেন কাচের চুড়ি। কানে ঝুমকো। কপালে টিপ...'
'এতকিছু লক্ষ করেছেন?'
'করেছি।'
'কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, বললেন না..'
'যার সাথে আজ আপনার দেখা করার কথা। তবে এখন নয়। আপনার দেখা করার কথা বিকেলে। আমরা সকালেই রওনা হয়েছি। আপনি দরকার পড়লে আবার যাবেন।'
বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'আপনি সোহানের কথা জানেন?'
'জানি। এবং এ-ও জানি, সোহানের সাথে আপনার কিছু একটা চলছে।'
বারিশ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল, 'আপনি এসব বিষয় তদন্ত করতে যান কেন?'
'আমি তদন্ত করিনি। সে নিজেই আমাকে জানিয়ে গেছে।'
'কে? সোহান?'
'হ্যাঁ।'
'সোহান আপনার সাথে দেখা করেছিল?'
'হ্যাঁ।'
'কোথায়?'
'অফিসে।'
বারিশ প্রায় চেঁচিয়ে বলল, 'সোহান অফিসে এসেছিল!'
জাফর শান্ত গলায় বলল, 'এসেছিল।'
'কী বলেছে, আপনাকে?'
'বলেছে, আপনার দিকে যেন চোখ তুলে না তাকাই। তাকালে চোখ উপড়ে ফেলবে।'
বারিশ চোখ বড় বড় করে বলল, 'এসব বলেছে?'
'হ্যাঁ।'
'আর কী বলেছে?'
'বলেছে আমি নাকি খারাপ লোক।'
বারিশ ইতস্তত করল। লোকটা মিথ্যে বলছে নাতো! এমনওতো হতে পারে, লোকটা বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে।
বারিশ শান্ত হয়ে বসে বলল, 'সোহান আপনাকে বলেছে এসব?'
'বলেছে।'
'তাহলে আমরা কেন সোহানের কাছে যাচ্ছি?'
'কারণ, আপনি আমার সামনে সোহানকে বলবেন, আমি আপনার দিকে তাকাই না।'
বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'তাকান তো মাঝেমধ্যে..'
জাফর বোকার মতো চেয়ে বলল, 'আপনি চান, আমার চোখ উপড়ে ফেলুক? চোখ উপড়ে ফেললে আমাকে ভালো দেখাবে, বলুন?'
বারিশ মৃদু হেসে বলল, 'মোটেও ভালো দেখাবে না।'
গাড়িটা পাকা রাস্তা পেরিয়ে বাঁয়ে মোড় নিলো। এ-রাস্তাটা খুব বেশি ভাঙা৷ রাস্তার মাঝখানে ইয়া বড় বড় গর্ত। কিছুটা পথ পেরোলেই সোহানের এলাকা। সেখানে সোহান লোকাল ছাত্রনেতা। যদিও সে আর ছাত্র নেই। শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে চাকরি খুঁজছে।
'আপনি সোহানের বাসা চেনেন?'
'চিনি।'
'সোহান ঠিকানা দিয়েছে আপনাকে?'
'না। আমি খোঁজ নিয়েছি।'
'ও-বাবা, স্পাইং?'
জাফর জবাব দিলো না। রাস্তার বাঁ পাশে গাড়ি দাঁড় করাল। তারপর গাড়ি থেকে নেমে বলল, 'তিনতলা বাড়িটা দেখছেন? সোহান দোতলায় থাকে।'
বারিশ গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, 'জানি, জানি।'
কষ্ট করে দোতলায় উঠতে হলো না৷ সোহান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। বারিশকে দেখে চমকে উঠল। খুশিতে গদগদ হয়ে যখনই কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখন জাফরকে চোখে পড়ল। মুহূর্তেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। শুরু হলো ওঁদের কথোপকথন। জাফর গাড়িতে বসে নিতুর নাম্বার ডায়েল করল, 'হ্যালো, নিতু?'
ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে আসলো, 'নিতু নেই। কী চাই?'
'নেই মানে? এটা তো নিতুর নাম্বার...'
'নাম্বার ঠিকই আছে। কিন্তু এখন ওঁর কাছে দেওয়া যাবে না। যা বলার আমাকে বলুন।'
'নিতুর ফোন আপনার কাছে গেল কীভাবে? কে আপনি?'
'আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি বাদল।'
জাফর ফোন রেখে দিলো৷ একজন পুরুষের কাছে এরচে' ভারী বোঝা আর কিছু হতে পারে না। যদি সম্ভব হত, নিতুকে বুক পকেটে লুকিয়ে রাখত সে।
বারিশ গাড়িতে উঠে বসল। জাফর বলল, 'বলেছেন আমার কথা?'
'বলেছি।'
'আর কখনো আমাকে বকাঝকা করবে না তো?'
বারিশ শব্দ করে হাসল, 'হি-হি, করবে না।'
বাইরে রোদ পড়েছে। সূর্য মাথার উপর। বারিশ গাড়ির কাচ নামাতে যাচ্ছিল। জাফর বলল, 'কাচ নামাবেন না। বৃষ্টি নামবে।'
বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল, 'কিন্তু আকাশ তো পরিষ্কার!'
'তবুও নামবে।'
বারিশ গাড়ির কাচ নামাল না। সিট বেল্ট বাঁধল। তারপর বলল, 'আপনার একটা ভালো দিক আছে।'
জাফর কৌতূহলী ভঙ্গিতে বলল, 'কী সেটা?'
'আপনি সব সময় হাসিমুখে থাকেন। কথা বলার ভঙ্গিও হাসিমাখা। আমার মনে হয়, আপনি পৃথিবীর সবচে' সুখী মানুষ। কীভাবে পারেন সবসময় হাসিখুশি থাকতে?'
জাফর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'নিতু বলেছিল, সব পরিস্থিতিতে যেন মুখে হাসি থাকে। সেই থেকে অভ্যেস গড়েছি।'
'নিতু কে? আপনার ওয়াইফ?'
'হ্যাঁ। খুব ভালোবাসে আমাকে।'
'আপনি বাসেন না?'
জাফর চুপ করে গেল। অফিসের পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে গাড়ি থেকে নামল। নিজ কক্ষে গিয়ে চেয়ারে বসল। এক গেলাস পানি খেল। তৃষ্ণা মিটল না। গলাটা শুকিয়ে আছে। পেটে ভীষণ খিদে। তবে খেতে ইচ্ছে করছে না। ক্যান্টিনের খাবারের কথা মনে পড়লেই বমি চলে আসে। লোকাল রেস্তোরাঁগুলো থেকে খাবার খেলে পেটে গ্যাস হয়।
জাফর টেলিফোন কানে লাগাল। বলল, 'হ্যালো, নিতু?'
'হুঁ।'
'দুপুরের খাবার খেয়েছো?'
'না, খাইনি।'
'কী বলো, এখনও খাউনি! ক'টা বাজে দেখেছো?'
'একটা বাজে। আরো এক ঘন্টা পরে খাব।'
'তোমার শরীর এখন কেমন?'
'ভালো।'
'সোহান ছেলেটাকে যেমন মনে করেছিলাম, তেমন না৷ ছেলেটা খুবই শান্ত স্বভাবের। ভালোও।'
'সোহান কে?'
'ওমা! সোহানকে চেনো না? যে অফিসে এসে আমাকে থ্রেট দিয়েছিল।'
'তোমাকে তো অনেকেই থ্রেট করে। ক'জনকে মনে রাখব?'
'তা ঠিক। মুসকান কী করছে?'
'খেলছে।'
'ফোনটা ওঁর কানে দাও।'
'খেলছে খেলুক। অযথা বিরক্ত করে কী লাভ? রাখি জাফর?'
'আচ্ছা।'
টেলিফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জাফর। তার হাতে একটি বলপেন। টেবিলে রাখা একটি এ-ফোর সাইজ কাগজ। কাগজের সাদা জমিনে আনমনে কী যেন লিখেছে জাফর। সামনে ঝুঁকে ভালোভাবে চেয়ে দেখল। সাদা কাগজে কালো কালিতে লেখা, "জীবন্মৃত"। জাফর ভ্রু কুঁচকাল। জীবন্মৃত! এর মানে কী? দ্রুত গুগলে সার্চ করল। জীবন্মৃত মানে বেঁচে থেকেও মৃতপ্রায়। জাফর সোজা হয়ে বসে বলল, 'সত্যিই তো!'

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

সন্ধ্যার পর নিতুর শরীরটা খারাপ করেছে। মাথা ভনভন করছে। বমি বমি ভাব। গায়ের তাপমাত্রা বেড়েছে খানিকটা। চোখদু'টো বন্ধ করা যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে পুড়ে যাবে। নিতু কপালে হাত রাখল। কপালটা ব্যথায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম। এ সময় বাদলটা কোথায় গেল! কয়েকবার ফোন দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে নিতু। ফোন বাজছে ঠিকই, বাদল রিসিভ করছে না। সে ইদানীং ঘন ঘন বাড়ির বাইরে সময় কাটাচ্ছে। নিতু একবার জিজ্ঞেস করেছিল, 'বাড়ির বাইরে তোমার এত কী কাজ?'
বাদল সোজা জবাব দিলো, 'আমাকে জেরা করার অধিকার তোমায় কে দিয়েছে? তুমি কি আমার বিয়ে করা বউ?'
নিতু আর কিছু বলতে পারল না। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল শুধু। সে জানে, বাদল ইদানীং অতিরিক্ত নেশা করছে। বাজে ছেলেদের সাথে মিশছে। তবুও কিছু বলতে পারছে না। বললেই বাদল বলবে, 'তুমি কি আমার বিয়ে করা বউ?'
বিছানার পাশে টেবিলে এক গেলাস পানি রাখা। নিতু ঢুকঢুক করে পানি খেল। পানি এতটাই ঠান্ডা, মনে হয়েছে বরফ কুঁচি খাচ্ছে। পানি খাবার পর বমি ভাবটা আরো বাড়ল৷ নিতু দ্রুত বাথরুমে গেল। বমি করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। বমি হলো না। হয়ে গেলে ভালো হত। নিতু বিছানায় পা দুলিয়ে বসল। ঘড়ির দিকে তাকাল। দেয়াল ঘড়িতে নয়টা তেতাল্লিশ। হাতের চিকন বেল্টের ঘড়িতে নয়টা পয়তাল্লিশ বাজে। নিতু ভাবল, কোনটা সঠিক, দেয়াল ঘড়ি না কি হাতঘড়ি? প্রয়োজন ছাড়া অদ্ভুত কিছু ভাবলে বমি ভাব কেটে যায়। নিতু আরো কিছু অপ্রয়োজনীয় জিনিস ভাবল। জাফরের শরীর ইদানীং খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। যদি জাফর মারা যায়, তবে জাফরকে তার মা-বাবার পাশে কবর দেবে। প্রতি শুক্রবার মুসকানকে নিয়ে যাবে জাফরের কবরে। জাফরের কবরটা পাকা করা হবে। যেখানে চারকোণা সাইজের একটি টাইলস লাগানো থাকবে। টাইলসে জাফরের নাম বাংলা বোল্ড অক্ষরে থাকবে।
বমি ভাবটা আর নেই। এখন একটু হালকা লাগছে। তবে মাথা ব্যথাটা কমেনি। বরং বেড়েছে। ব্যথা এতটাই তীব্র, ইচ্ছে করছে দেয়ালে মাথা ঠুকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে। নিতু ফোন কানে লাগালো, 'রফিক ভাই?'
'জি, ম্যাডাম।'
'বাদল কোথায়, বলতে পারেন?'
'জানি না, ম্যাডাম। স্যার তো বলে যায় না।'
'সে কখন আসবে, বলে গেছে?'
'না, ম্যাডাম।'
'আমার কথা কিছু বলেনি?'
'বলেছে, ম্যাডাম।'
'কী বলেছে?'
'বলেছে, উনি আসার আগে যেন আপনাকে যেতে না দেই। স্যার আসার পর যেতে বলেছে।'
নিতু ফোন রেখে বারান্দায় গেল। গ্রিল ধরে দাঁড়াল। আনমনে গুনগুন করল কিছুক্ষণ৷ তারপর বিছানায় ফিরে এল। বিছানায় বসতেই বাদল এল। নিতু বলল, 'কোথায় ছিলে, বাদল?'
'ছিলাম এক মজার জায়গায়। তোমাকে বলা যাবে না।'
'নেশা করোনি তো?'
বাদল মুখ চেপে বলল, 'মোটেও না।'
নিতু জানে বাদল নেশা করেছে। তবুও বলল, 'আচ্ছা।'
বাদল সিগারেট জ্বালাল। বিছানায় বসে নিতুর হাতে হাত রাখতেই নিতু উঠে দাঁড়াল। বলল, 'ছুঁবে না।'
বাদল ধোঁয়া টানতে লাগল। নিতু বাথরুমে গেল। হড়হড় করে বমি করল। হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে এল। বাদল শান্ত গলায় বলল, 'কী হয়েছে?'
'কিছু হয়নি।'
'সত্যি করে বলো।'
'বললাম তো কিছু হয়নি।'
বাদল শক্ত করে টেনে ধরল। নিতু আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বিছানায় বাদলের পাশে বসল। বাদল বলল, 'কী হয়েছে?'
নিতু বাদলের হাত টেনে নিয়ে তার পেটে রাখল। বাদলের চোখের দিকে চেয়ে বলল, 'টের পাউ?'
বাদল শান্ত গলায় বলল, 'পাই।'
'কী টের পাউ?'
'তোমার শরীরে আমার খুব আপনজনের বসবাস।'
নিতু অবাক হয়ে বলল, 'তুমি জানো!'
'যেদিন তুমি জেনেছো, সেদিন আমিও জেনেছি।'
'কীভাবে জেনেছো?'
'সেটা নাহয় অজানা থাক।'

দেখে কেউ বলবে না, এই মেয়েটা সাইক্রেটিস্টের রোজকার পেশেন্ট। রেস্তোরাঁর চেয়ারে ঝুঁকে বসে নিঃশব্দে কফি খাচ্ছে। চোখের পলক অবধি সাবধানে ফেলছে, যাতে শব্দ না হয়৷ জাফর চুপচাপ বসে আছে। টেবিলে মগ থেকে গরম কফির ধোঁয়া উড়ছে। সে আবার গরম কিছু খেতে পারে না। খেলেই জিহ্বা পুড়ে যায়। টানা তিন-চারদিন কিছু খেতে পারে না। আদুরী কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল, 'কফি শীতল হয়ে যাচ্ছে তো!'
জাফর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'শীতল হবার জন্যই রেখেছি।'
একজন ওয়েটার আসলো। বিনীত গলায় বলল, 'আরকিছু লাগবে, স্যার? আরকিছু লাগবে, ম্যাম?'
আদুরী বলল, 'লাগবে না।'
জাফর বলল, 'জি, স্যার। লাগবে।'
ওয়েটার বিস্মিত চোখে তাকাল। এর আগে কেউ বোধহয় স্যার বলে ডাকেনি তাকে। সে একটু ইতস্তত করে বলল, 'কী লাগবে, স্যার?'
'টিস্যু পেপার।'
ওয়েটার তার পকেট থেকে টিস্যু পেপার এগিয়ে দিলো। জাফর টিস্যু পেপার দিয়ে টেবিল মুছতে শুরু করেছে মাত্র, ওয়েটার বলল, 'স্যার, স্যার আপনি কেন করছেন! আমি করছি স্যার, দাঁড়ান।' বলে দ্রুত চলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে রোগা টাইপের সতেরো-আঠারো বছরের একটা ছেলে এল। টেবিল ভালো করে পরিষ্কার করে গেল। আদুরী হাই তুলতে তুলতে বলল, 'এবার বলুন, কী এমন কাজ, যার জন্য ডেকে এনেছেন?'
'আপনি ক'দিন ধরে সাইক্রেটিস্টদের সাথে দেখা করছেন?'
'হবে চার বছর। কিন্তু কেন?'
'চার বছরে ক'জন সাইক্রেটিস্টের সাথে দেখা করেছেন?'
'বহু। হিসেব নেই।'
জাফর টেবিলে আস্তে করে থাবা বসিয়ে বলল, 'এজন্যই আপনাকে ডেকেছি। আপনিই বলতে পারবেন, কোন সাইক্রেটিস্ট আমার সমস্যার সমাধান দিতে পারবে।'
'কিন্তু আপনার সমস্যা কী, তা-ই তো জানি না! আগে সমস্যার ব্যাপারে বলুন।'
'সেটা আমি ডাক্তারকে বলব। আপনি শুধু এমন একজন ডাক্তারের নাম বলুন, যাকে চোখ বুজে ভরসা করা যায়।'
'দেখুন, পৃথিবীর কোনো ডাক্তার চাইবে না, তার পেশেন্ট সুস্থ না হোক। কিন্তু তাই বলে যে সবার পেশেন্ট সুস্থ হয়ে যায়, এমন তো না।'
'তা বলিনি। আমার সমস্যাটা একটু জটিল। আমি চাচ্ছিলাম, এক্সপার্ট কারোর সাথে দেখা করতে। কিংবা পুরনো কেউ। যে কিনা মানুষ দেখতে দেখতে চামড়ায় ভাঁজ ফেলেছেন।'
আদুরী ভ্রু কুঁচকে বলল, 'আপনার প্রভলেমটা কি খুব সিরিয়াস?'
'জি।'
'তাহলে এক কাজ করুন।'
'কী কাজ?'
'মহসিন সাহেবের সাথে দেখা করুন।'
'মহসিন সাহেব? কে উনি?'
'গ্রাম্য চিকিৎসক। হোমিওপ্যাথিক।'
'আমি সাইক্রেটিস্টের কথা বলেছি, মিস আদুরী।'
'আপনি মানুষ চেনার কথা বলেছেন না? এ বিষয়ে উনি এক্সপার্ট।'
'বলছেন?'
'বলছি।'
'কোথায় পাব উনাকে?'
'ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত পাবেন।'
'আচ্ছা।'
'উনাকে একই প্রশ্ন দু'বার জিজ্ঞেস করবেন না। যা যা জানতে চায়, সোজা সাপটা উত্তর দেবেন।'
'একই প্রশ্ন দু'বার জিজ্ঞেস করলে কী হবে?'
'উনি রাগ করবে। আপনার সাথে আর কথা বলবে না।'
'কিন্তু আমি তো টাকা দেব।'
'উনি টাকা নেবে না, জাফর সাহেব।'
'তাহলে কী নেবে?'
'রক্ত নেবে।'
জাফর চমকে উঠল। দ্রুত চোখের পলক ফেলে বলল, 'রক্ত নিয়ে কী করবে!'
আদুরী একটু হেসে বলল, 'ভয় পাবেন না। এক ফোঁটা রক্ত নেবে ব্লাড টেস্টের জন্য। যদি আপনার রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ হয়, তবে উনি আপনার সাথে একটি কথাও বলবে না। আপনাকে ফিরে আসতে হবে।'
জাফর ভ্রু কুঁচকে বলল, 'এ পজিটিভ রক্ত হলে কথা বলবে না কেন?'
'কারণ উনার ছেলের ব্লাড গ্রুপ এ পজিটিভ।'
'ছেলের সাথেও কি কথা বলে না?'
'না। ছেলে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তাই ছেলের সাথে কথা বলে না। ছেলের রক্তের গ্রুপ যাদের সাথে মিলে, তাদের সাথেও কথা বলে না।'
'অদ্ভুত তো!'
'জি, অদ্ভুত। তবে আপনার কাজে আসবে।'
জাফর উঠতে উঠতে বলল, 'উঠি তাহলে। বৃষ্টি নামার আগে বাড়ি যাই।'
আদুরী উঠল না। কৌতূহলী ভঙ্গিতে চেয়ে বলল, 'শীতের মৌসুমে বৃষ্টি নামবে কীভাবে!'
'নামবে, নামবে। আসুন আপনাকে পৌঁছে দেই।'
'লাগবে না। হেঁটে যেতে পারব। আপনি আসুন, মি. জাফর।'
জাফর বেরিয়ে গেল। গাড়ি স্টার্ট দিলো। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর সত্যি সত্যি বৃষ্টি নামল। ঝুম বৃষ্টি। আকাশ পরিষ্কার। একটুও মেঘ নেই। খোলা আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। অথচ বৃষ্টি পড়ছে। বাদলের বাসার সামনে গাড়ি থামল। নিতু বৃষ্টিতে ভিজছিল। জাফর গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিলো। বলল, 'তাড়াতাড়ি এসো, ঠান্ডা লেগে যাবে তো!'
নিতু ভেজা শরীর নিয়ে গাড়িতে বসে কাঁপতে লাগল৷ জাফর তার গায়ের জ্যাকেট খুলে নিতুর গায়ে জড়িয়ে দিলো। নিতু তবুও কাঁপছে৷ জাফর বলল, 'বেশি শীত লাগছে?'
'না। তুমি হঠাৎ এদিকে?'
'কেন জানি মনে হয়েছে, তুমি আজ আমার জন্য অপেক্ষা করবে। অথচ দেখো, সত্যি সত্যি অপেক্ষা করছিলে।'
'তোমার অপেক্ষা করছিলাম না। রিকশার অপেক্ষা করছিলাম।'
'সে যাই হোক, পেয়ে গেলাম তো?'
'হুঁ।'
'তোমার জ্বর কমেছে?'
'হুঁ।'
জাফর নিতুর কপালে হাত রেখে বলল, 'কই কমেছে? এত জ্বর নিয়ে তুমি বৃষ্টিতে ভিজছিলে? আমাকে জানালে না কেন? আমি আগেভাগে চলে আসতাম।'
নিতু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'জাফর!'
'বলো।'
'তুমি কি সত্যিই এমন না কি সবই তোমার অভিনয়?'
জাফর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, 'অভিনয় বলো আর সত্যি বলো আমি এমনি।'
'আর তোমার ভিতরের সত্তা?'
'সে-ও আমার মতোই।'
ধীর গতিতে ছুটে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল গাড়িটা। রয়ে গেল দীর্ঘশ্বাসের প্রবল ঢেউ।

চলবে
~ মো. ইয়াছিন

Abid faraje, Sume akter, Hasibul hasan santo, Abul basar, Sakib sikdar, Pk monish, Sk limon and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum