সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 307
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-05
View user profile

রক্তচোষা Empty রক্তচোষা

Sat Jun 05, 2021 8:19 pm
১ম পর্ব

গভীর রাতে বুকের উপর কিছু একটার অস্তিত্ব টের পায় রাহাত। কয়েক সেকেন্ড পরপর উষ্ণ নিঃশ্বাস যেন তার কানের গোড়ায় সুড়সুড়ি দিচ্ছে। চোখের পাতা খুলে দেখতে ইচ্ছা হয়, সে জানতে চায় তার শরীরের উপরে আদৌ কেউ আছে কি না। কিন্তু চোখদুটোও যেন কেউ চেপে রেখেছে এক অদৃশ্য শক্তিতে। এক ঝটকায় হঠাৎ ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠে সে। ডিমলাইটের মৃদু আলোতে রুমটা যেন অশরীরীর ছায়া বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সবখানে। দেওয়াল ঘড়িটাও নিজ গতিতে টিকটিক করে চলেছে। টেবিল ল্যাম্পের সুইচ অন করতেই পায়ের দিকে নজর পড়ে তার। বিড়ালটা আগের মতই হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিল। লাইটের আলো বুঝতে পেরে একবার চোখ মেলে হাই তুলে আবার আগের মতো শুয়ে পড়লো। কই, কিছুই তো নেই! তাহলে এতক্ষণ কিসের চাপ সহ্য করছিল রাহাত? স্বপ্ন ছিল নিশ্চয়, একটা দুঃস্বপ্ন।

বিছানা ছেড়ে চোখে একটু পানি ছিটিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখতে যায় কোনো খাবার আছে কি না। ক্ষুদা লেগেছে প্রচুর। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে ক্ষুদাও যেন তাকে পেয়ে বসেছে। কিছুই করার নেই। পেটকে তো আর বুঝ দিয়ে ঠাণ্ডা করিয়ে রাখা যায় না। কিংবা ধমক দিয়েও চুপ করানো যায় না। বিকেলের রান্না করা মাংস রাখা ছিল কিছুটা। কিন্তু তা এখন আবার চুলা জ্বালিয়ে গরম করতে কে যাবে? মা থাকলে নাহয় তাকে দিয়ে কাজটা সেরে নেওয়া যেত। কিন্তু রাহাতের বলতে গেলে একটামাত্র বিড়ালটা বাদে অন্য কেউ নেই। সে তো আর পারবে না মাংস গরম করে রাহাতকে খাওয়াতে। ফ্রিজ থেকে একটা আপেল বের করে খেতে থাকে সে।

বাবা-মায়ের এক্সিডেন্টের পর আত্মীয়রা যে যার মতো পারে সম্পদ লুট করে নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কেসও করেছিল সে, লাভ হয়নি। অবশিষ্ট বলতে তার এই বাড়িটা আর তার চাকরিটা, যেটা নিয়ে এতদিন খেয়ে পরে বেঁচে আছে। বন্ধুবান্ধব আছে কয়েকজন। বিকালের অবসর সময়টা প্রায় তাদের সাথেই পার করে দেয়।

ঝিঁঝিঁ পোকাগুলোও আজ বিরক্ত করছে খুব। কোনো কাজ নেই অথচ এই মাঝরাতে ঝিঁ ঝিঁ করে ডাকতে হবে তাদের? কী চায় তারা? ক্ষুদা লেগেছে রাহাতের মতো? তো খাবার খুঁজলেই তো পারে, অযথা কান ঝালাপালা করার কী দরকার? তার কাছে চাইলে তো ফ্রিজ থেকে একটা আপেলও বের করে দিতে পারে সে। কিন্তু আপেল খায় কি তারা? যদি না খেয়ে থাকে তো কী খায়? রক্ত?

ধ্যাত, এই মাঝরাতে ঘুম ভাঙাই ঠিক হয়নি। কিসব উদ্ভট চিন্তাভাবনা খেলছে তার মাথায়। অবশ্য এতে তার দোষ নেই। ঘুম তো আর সে নিজে ইচ্ছা করে ভাঙ্গেনি। সেকথা চিন্তা করলে হয়তো আবারো শিরদাঁড়া শীতল হয়ে উঠবে। বুকে কিছুটা ব্যথা করছে এখনো। আদৌ কি সেটা স্বপ্ন ছিল এ ব্যাপারে সে এখনো সন্দেহে ভুগছে। যাক গে এসব। এ ব্যাপারে ভেবে ভেবে বাকি রাতের ঘুম হারাম করার মানে হয় না কোনো। ঢকঢক করে দু'গ্লাস পানি পান করে আবারো বিছানায় গা এলিয়ে দেয় সে। সকালে আবার অফিসে যেতে হবে।

-----

"গতকাল রাইতে কী ঘটনা ঘটিছে হুনছো তুমরা কেউ?"-কাপগুলোতে চা ঢালতে ঢালতে বলতে থাকে টঙের দোকানী আজাদ মিঞা। "কেডায় জানি গফুর তালুকদারের পোলাডারে গত রাইতে মাইরা ফালাইছে।"

চোখের সামনে থেকে পেপার নামিয়ে আজাদ মিঞার দিকে তাকায় রাহাত, সাথে তার বন্ধুরাও। প্রায় প্রতিদিন বিকালে এই টঙের দোকানে ছোটখাটো এক আড্ডা হয়ে যায় তাদের। আজাদ মিঞা কোনো কিছুর বর্ণনা দিতে হলে এমনভাবে শুরু করে যে শ্রোতারা নড়েচড়ে বসতে বাধ্য। টঙের দোকানীগুলোর একটু বাকপটু না হলে আবার চলে না। সেই ঐতিহ্য যথাযথভাবে বজায় রেখেছে আজাদ মিঞা।

"সাদা পোলাডা মরার পরে আরও সাদা হইয়া গেছে।"-চায়ের কাপগুলো সবার হাতে ধরিয়ে দেয় সে।

"মরার পরে আরও সাদা হয়ে গিয়েছে মানে?"-উৎসুক চোখে জিজ্ঞাসা করে রাহাতের বন্ধু আবির।

"মানে বুঝেন না সাহেব? মনে হইতাছে গায়ে এক ফোঁটাও রক্ত নাই। হরিণ ধরবার পরে বাঘে যেইরাম সব গোশত খাইয়া খালি হাড়গুলো ফালাইয়া যায়, হেরাম কইরা অই পোলাডারে কেডা মাইরা সব রক্ত চুইস্যা খালি শরীলখানা ফালাইয়া রাইখা গেছে। মাইনষে তো কয় ভূতের কাম এইডা। কিন্তু কন, এই যুগে ভূতে বিশ্বাস করবে কেডা?"

চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়েও থেমে যায় রাহাত। পরক্ষণেই জিজ্ঞাসা করে,"চাচা আপনি কি লাশটাকে নিজের চোখে দেখেছেন?"

"দেখিনাই, তয় হুনছি। ঐযে ওপাড়ার জব্বার, সকালে চা খাইতে আইছিলো, ও নাকি নিজের চোখে দেইখা আইছে।"

"আরে রাখেন মিঞা, জব্বার যে কতবড় ফাঁপরবাজ তা এলাকার সবাই জানে। তার গায়ে কেউ ঢিল ছুঁড়েলে বলে ইট মারছে আর তার কথা আপনি এতো সময় ধরে পাঠ করতেছেন?"-কিঞ্চিৎ রেগে যায় রাহাত। আসলেই জব্বার একটু ঘটলে আরেকটু যুক্ত করে তা রটিয়ে বেড়ায়। তার কথা পুরোপুরি মেনে নেওয়া মানে বিড়ালকে বাঘের ছানা মনে করা।

"তয় তার মার্ডারে এলাকার কিছু মাইনষে খুশি হইছে বটে; কিন্তু তার বাপের ভয়ে কিছু প্রকাশ করতে পারতাছে না।"- রাহাতের কথা তেমন আমলে নেয় না আজাদ মিঞা। "এলাকার মাইয়া থেকে শুরু কইরা বুড়া মাইনষেরেও জ্বালাইয়া মারতো।"- ঠোঁট বাকিয়ে দাঁত বের করে বলে আজাদ মিঞা।

"সিগারেট দেন একটা"-চায়ে চুমুক দিয়ে বলে রাহাত। সিগারেট খেত না সে, তবে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকেই এই বদঅভ্যাস ঘিরে ধরে তাকে। মানুষ তো সামান্য প্রেমিকা চলে গেলেই কতকিছুর নেশায় জড়িয়ে পড়ে। আর তার তো মা-বাবার সাথে আত্মীয়স্বজনসহ সব সম্পত্তিও হারিয়েছে। তবে সে নেশা করে সিগারেট খায় না। আড্ডার ফাঁকে মাঝে মাঝে দু-একটা ধরায়।

"পোলাডার গ্যাং আইসা গ্রামভইরা চিল্লাইয়া বেড়াইতাছে। গফুর মিঞার ভয়ে তাদেরও কেউ কিছু কইবার পারে না।"-চায়ের কাপে চিনি ঢালতে ঢালতে বলে আজাদ মিঞা, নতুন কাস্টমার এসেছে।

"গ্যাং বলতে?"-সিগারেট ধরিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞাসা করে রাহাত।

"ওর বন্ধুবান্ধব। যাদের লগে দিনভর ঘুইরা বেড়াইতো।"-আজাদ মিঞার উত্তর।

"কীভাবে খুন হয়েছে এর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি?"-রাহাতের অপর এক বন্ধু প্রশ্ন করে।

"আমি কী জানি সাহেব? ক্যামনে কমু? হেসব কাম পুলিশে করবো। আমি যতদূর হুনছি হেইডাই কইলাম আপনাগোরে।"

সত্যিই তো, এতকিছু সে কীভাবে জানবে? আর তাছাড়া লাশটিও নাকি দেখেনি সে। রাহাতের ইচ্ছা করছে লাশটিকে একবার দেখে আসতে। "সাদা পোলাডা মরার পরে আরও সাদা হইয়া গেছে।"-কথাটি কেমন যেন লেগেছে তার কাছে। মানুষ মারা যাওয়ার পর শীতল হয়ে যায় বলে জানতো সে, সাদা হয়ে যায় এই প্রথমবার শুনলো। মানুষের শরীর তখনই অতিরিক্ত সাদা হয় যখন তার শরীর থেকে সব রক্ত বেরিয়ে নেওয়া হয়। তার উপর আজাদ মিঞা আরেকটা কথা বলেছিল যে শরীর থেকে সব রক্ত চুষে দেহটাকে ফেলে গেছে। অতোটা ভেবেচিন্তেও হয়তো বলেনি সে, কিন্তু কথাটা দাগ কাঁড়ার মতো। রক্তচোষা কথাটা ভাবতেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে যায় রাহাতের। এসব বিদঘুটে ভাবনা মাথায় আনতে চায় না সে। তবে কেন জানি তা সামাল দিতে পেরে ওঠে না মাঝে মাঝে।

ছেলেটির খুনের ব্যাপার নিয়েও মস্তিষ্ক তাকে ভাবিয়ে তোলে। হালকা গা ঝাড়া দিয়ে নড়েচড়ে বসে মনেমনে ভাবতে থাকে, আসলেই তো এ খুনের ব্যাপারে মাথা ঘামানোর দায়িত্ব সম্পূর্ণ পুলিশের। আড্ডা দ্রুত শেষ করে বাসার পথে রওনা হয় সে। শরীরটা ক্লান্ত লাগছে খুব। হাতমুখ ধুয়ে কোনরকম জামাকাপড় পালটে বিছানায় তার অবসাদগ্রস্ত শরীর এলিয়ে দেয়। ঘুম ভাঙ্গে প্রায় রাত আটটার দিকে। চোখে মেলেই বুকের উপর বিড়ালটাকে আবিষ্কার করে। নামাতে চায় না রাহাত। গুটিসুটি মেরে বিড়ালের ঘুমিয়ে থাকা তার খুব পছন্দের। কিন্তু রাতের খাবারও যে তৈরি করতে হবে, বাসায় অন্য কেউ থাকে না যে তার খাবার প্রস্তুত করে রাখতে পারে। বিয়েও করেনি এখনও, করার ইচ্ছাও হয়নি বোধহয়।

অনিচ্ছা সত্বেও বিড়ালটাকে বুকের উপর থেকে নামিয়ে খাটে শুইয়ে দেয় সে। সেও হয়তো বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা। ক্ষীণস্বরে 'মেঁও' বলে আবারও গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে। বিড়ালগুলোকে সবসময় ঝামেলামুক্ত প্রাণি বলে থাকে রাহাত। কোনও কাজ নেই, যখন তখন ঘুমিয়ে যেতে পারে আবার ঘুম থেকে উঠতেও পারে। খাবার প্রস্তুত করে টিভিটা চালু করে সে। ব্রেকিং নিউজ আছে কি না কোনো সেটা দেখেই খেতে বসবে। বিড়ালটাও পাশে এসে বসেছে। হঠাৎ করেই রাহাত লক্ষ্য করলো বিড়ালটির মুখে লাল বর্ণের কিছু লেগে আছে।

- রক্ত! কিছুটা অবাক হয় সে। তখন হয়তো ঘুম ঘুম চোখে নজরে পড়েনি। তবে এটাকে অস্বাভাবিকভাবে নেয়নি সে। ইঁদুর মেরেছে হয়তো কোথাও। হতেই পারে সেখান থেকে কিছুটা রক্তের ছাপ লেগে আছে। রাতের খাবার শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ে সে, বিড়ালটিকে পাশে রেখেই।

গতরাতের মতো আজও সে বুঝতে পারে তার বুকের উপর কিছু চেপে বসেছে, অনেক ভারী কিছু। গরম নিঃশ্বাসের ছোঁয়া তার ঘাড় বরবার নেমে আসছে। উঠতে চাইছে রাহাত। কিন্তু শরীরে যেন শক্তি নেই এক বিন্দু পরিমাণও। আবারও গতরাতের মতোই এক ঝটকায় লাফিয়ে ওঠে সে। টেবিল ল্যাম্পের সুইচ অন করে কিন্তু বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলটা খুঁজে ফ্ল্যাশলাইট অন করেই আশেপাশে পায়চারী করতে থাকে। খুঁজে পায় না কিছুই, বিড়ালটিও পাশে নেই। খাট থেকে নেমে পানির জগটা খুঁজতে থাকে। গলা একদমই শুকিয়ে গেছে।

বিড়ালটিকে দেখতে পায় টেবিলের নিচে চুকচুক করে কী যেন খাচ্ছে। ইঁদুর, উঁকি মেরে দেখার পর টেবিল থেকে জগটা হাতে নেয় রাহাত। গ্লাসে পানি ঢালার সময় নেই। জগ উঁচু করেই কয়েক চুমুক দেওয়ার পর বাম হাতের উলটা পিঠ দিয়ে হালকাভাবে ঠোঁটের উপর থেকে পানি মুছে নেয়।

"সেদিন রাত করে বাড়ি ফেরা একদমই ঠিক হয়নি"- মনে মনে ভাবে আর ফ্রিজের দিকে এগুতে থাকে সে। সে রাতে ঘটে যাওয়া বিদঘুটে ঘটনাকে কিছুতেই মনে করতে চায় না রাহাত। অশরীরী ছায়া যেন পিছু করছিল তার। কোনোমতে হুশ নিয়ে বাসায় পৌঁছেছিল এই ঢের।

ফ্রিজ থেকে আপেল নিয়ে বিছানার দিকে এগুতে থাকে। আপেলটিতে এক কামড় দিয়ে নিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকায় সে। রাত একটা বাজে প্রায়। পরের কামড় দেওয়ার সময় আপেলের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করে রক্তের দাগ। অনেক বেশি পরিমাণেই লেগে আছে। দাঁত দিয়ে এতো রক্ত পড়ার কথা নয়। তবুও নিশ্চিত হতে আয়নার সামনে দাঁড়ায় রাহাত। ঠোঁটে স্পষ্ট রক্তের ছাপ। মুখের মাঝেও অল্প পরিমাণে রক্ত লেগে আছে।

পানি খাওয়ার পর বাম হাতের অপর পিঠ দিয়ে কোনোরকমে ঠোঁট মুছে নিয়েছিল। যদি আগে থেকে রক্ত লেগে থাকে তাহলে হাত দিয়ে মোছার কারণে হাতের পিঠেও রক্ত লেগে থাকার কথা। সেটা দেখলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে রক্তটা আগে থেকেই লেগে ছিল কি ছিল না। হাত উঁচু করে চোখের সামনে ধরতেই আঁতকে ওঠে রাহাত,
রক্ত!

চলবে...

Sayhan Ahmed

Abul basar, Santa akter, Raihan khan, Tanusri roi, Sumaiya akter, Sumon khan, Fahad islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 307
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-05
View user profile

রক্তচোষা Empty Re: রক্তচোষা

Sat Jun 05, 2021 8:20 pm
২য় পর্ব

দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে নাক সিটকিয়ে বেসিনের দিকে পা বাড়ায় রাহাত। আপেলটি ফেলে দিয়েছে। রক্ত এখনো শুঁকায়নি, তার মানে রক্তটা লেগেছে খুব বেশি সময় হয়নি। বিষয়টা স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিকভাবে নেবে তা নিজেও বুঝে উঠতে পারে না। ঠোঁটদুটো ভালো করে ধুয়ে নেয় সে। এরপর মুখের মধ্যে পানি নিয়ে গড়গড় কলে কুলি করে কয়েকবার। শব্দটা তার কাছে কেমন অদ্ভুত মনে হয় প্রথমবারের মতো। যেন কড়ইতে টগবগিয়ে পানি ফুটানো হচ্ছে কিংবা অন্য কোনো তরল পদার্থ। রক্ত?

এই বিদঘুটে শব্দটা বারবার রাহাতের মাথায় চলে আসে না চাইলেও। "বিড়ালটা কি ইঁদুর মেরা তার ঠোঁটের সাথেও রক্ত লাগিয়ে দিলো?" ভাবতেই যেন মুখ দিয়ে ওয়াক শব্দটা বেরিয়ে আসে। ভুলভাল চিন্তা মাথায় আসছে ঠিক, তবে এসব বিশ্রী চিন্তা মাথায় আনার কী দরকার? পরক্ষণেই আবার ভাবতে থাকে, না এনেই বা উপায় কী? রক্ত তো আর আকাশ থেকে পড়েনি! আপাতত বিশ্রী চিন্তাটিকেই মেনে নিয়ে বিছানার দিকে পা বাড়ালো সে। কাল ছুটি, আরামে ঘুম দেওয়া যাবে।

সকালে তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে চেঁচামেচির শব্দে। মনে হচ্ছে ফ্লাটের নিচে অনেক মানুষের জটলা লেগেছে। চোখ কচলাতে কচলাতে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকায় সে। কিছু একটাকে ঘিরে গোল করে দাঁড়িয়ে আছে তারা। ব্যাপারটি স্বচক্ষে দেখতে কোনোরকমে হাতমুখ ধুয়ে গায়ে শার্ট চড়াতে চড়াতে বের হয়।

"ছাদ থেকে লাফিয়ে মরেছে"- কথাটি কানে গেলেই বুঝতে পারে কারো লাশ পড়ে আছে। ভীড় ঠেলে সামনে এগুতেই লাশটি নজরে পড়ে তার, কোনো যুবকের লাশ। সুইসাইড কেস হবে হয়তো। এখনকার যুগের ছেলেপেলেরা প্রচণ্ড মাথাভারী। সামান্য কিছু হলেই নিজের প্রাণনাশের মতো জঘন্যতম সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে। মাথা দুলাতে দুলাতে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিলো সেখান থেকে। হঠাৎ কী মনে করে থেমে গিয়ে আবার লাশের দিকে ভালো করে লক্ষ্য করে রাহাত।

ছেলেটি আটতলা ভবন থেকে লাফিয়েছে ঠিক আছে, তাহলে লাশের পাশে তো রক্তের ধারা বয়ে যাওয়ার কথা ছিল। মাথার পাশে রাস্তায় কোনরকম সামান্য রক্তের ছাপ। কিন্তু এতো উপর থেকে পড়লে এতো কম রক্ত প্রবাহিত হওয়ার কথা নয়। লাশের কাছে যাওয়া মোটেও উচিত হবে না। মিথ্যা মামলায় ফেঁসেও যেতে পারে বৈকি।

"কেউ কি পুলিশে সংবাদ দিয়েছেন?"-উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন ছোঁড়ে রাহাত। ভীড়ের মাঝ থেকে কেউ একজন বলে ওঠে, "হ্যাঁ, জানানো হয়েছে পুলিশকে।" "যাক! এখন মানুষ তাহলে আগের থেকে অনেক সচেতন হয়ে গিয়েছে বলতে হয়।"-মনে মনে ভাবে রাহাত। লাশটিকে কাছ থেকে দেখতে খুব ইচ্ছা হয় তার। কিন্তু যতক্ষণ না পুলিশ আসছে ততক্ষণে এক পা ও এগোতে রাজি না সে।

একটু পরেই এম্বুলেন্স আসার শব্দ শুনতে পায় সে। তাকিয়ে দেখে পিছে পিছে একটি পুলিশ ভ্যানও আসছে। এম্বুলেন্সের শব্দ ছোটবেলা থেকেই কিছুটা ভয় পায় রাহাত। কেমন যেন হৃদয় বিদারক সুর, থমথমে কিন্তু ভয়ানক একটা ঝংকার। তার একটু কাছে এসেই থামে এম্বুলেন্সটি। ভ্যান থেকে দু'জন পুলিশ নেমে লাশটির চতুর্দিকে ঘোরে একবার।

"কখন থেকে লাশটা পড়ে আছে এখানে?"- একজন পুলিশ জিজ্ঞাসা করে।

"কইতে পারি না স্যার, সকালে যহন দোকান খুলতে যাইতাছিলাম তহন দেখি লাশডা এইহানে পইড়া আছে। এরপর আশেপাশের কয়েকজনরে ডাইকা জড়ো করি। সেইখান থেইকা এক পোলায় আপনাগোরে কল দেয়।"-পিছন থেকে উত্তর দেয় কেউ।

"আচ্ছা আপনারা এখন যে যার কাজে যান।"-হাতে থাকা লাঠিটা ঘুরাতে ঘুরাতে বলে পুলিশ।

"আর হ্যাঁ, এই ফ্লাটে কে কে থাকেন?"-আবারো জিজ্ঞাসা করে। কয়েকজন সায় দেয়, সাথে রাহাতও।

"ছেলেটিকে চিনেন কেউ?" পুলিশের এ প্রশ্নে না-বোধক উত্তর তাদের। রাহাত চেনে না তাকে, একই ফ্লাটে থাকে। দেখা হয়েছে কয়েকবার কিন্তু কথা হয়নি কখনো। তবুও স্বীকার করে নেয় যে সে চেনে ছেলেটিকে। কেন জানে না, হয়তো এটা জানার জন্য যে আসলেই এটা সুইসাইড? নাকি খুন। পুলিশ এবার বাকি সবাইকে চলে যেতে বলে, রাহাত বাদে।

"কীভাবে চেনেন তাকে?"-প্রশ্ন পুলিশের।

"একই ফ্লাটে থাকি যেহেতু, মাঝে মাঝে দেখা হতো। কথাও হয়েছিল দু-একবার।"-পরের অংশটুকু মিথ্যা বলে সে।

"ছেলেটি কী করে এ ব্যাপারে জানেন কিছু?"

"না, এতসব নিয়ে কথা হয়নি কখনো। একটু চাপা স্বভাবের মনে হতো তাকে। কয়েকবার ছাদে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।"

"আচ্ছা, যদি প্রয়োজন হয় তো আপনাকে ডাকা হবে।"

"আচ্ছা।"

লাশটিকে এবার এম্বুলেন্সে উঠানোর জন্য স্ট্রেচারে তোলা হয়েছে। রাহাত হয়তো কিছু একটা খুঁজতে চেষ্টা করছে মৃতের শরীর থেকে। "পেয়েছি"-মনে মনে চিৎকার করে ওঠে রাহাত। আঘাতের দাগ, ঠিক ঘাড়ের উপর।

"দাঁতের চিহ্ন কি এটা? রক্তচোষার? যেটা দিয়ে সে ছেলেটির শরীরের সব রক্ত চুষে নিয়েছিল? যার কারণে এতো উপর থেকে পড়ার পরেও শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হয়নি?"- নিজেকে একের পর এক প্রশ্ন করে রাহাত।

"আচ্ছা রক্তচোষার ইংরেজি প্রতিশব্দ যেন কী? শব্দটা শুনলেই যেন পশম দাঁড়িয়ে যায়।" শব্দটা জানে রাহাত। কিন্তু এ মুহূর্তে কিছুতেই মনে করতে পারছে না সে।

"ভ্যাম্পায়ার!"-এবার মুখ দিয়ে শব্দ করে বলে ফেলে সে। যাক একেবারে ভুলে যায়নি তাহলে।

-----

এদিকে গত দুই রাত ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিও মনের মধ্যে সাড়া জাগায় রাহাতের। আসলেই স্বপ্ন ছিল কি না সে নিজেই সন্দেহভাজন। এখনো পর্যন্ত কোনো বন্ধুর সাথেও শেয়ার করেনি ব্যাপারটি। তবে ভাবছে আজ বিকালে আড্ডার আসরে তুলবে। সকালের নাস্তাটা করা হয়নি। বাইরে থেকে কোনোমতে নাস্তার কাজ সেরে নেয় আজ। বাসায় গিয়ে বিড়ালটিকে একটু দুধ গরম করে দিলেই হবে। বিকালের আড্ডায় কথার ফাঁকে রাহাত তার প্রসঙ্গ তুলে ধরে। বিষয়টা অন্য কেউ বললে রাহাত নিজেই হেসে উড়িয়ে দিত। কিন্তু আজ শিকার সে নিজেই।

"ওঝা দেখা তুই।"-মজার ছলে চায়ে চুমুক দিয়ে বলে আবির।

"ওঝায় কাজ হবে না দোস্ত। বুঝিস না কেন? বন্ধুর বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে অথচ এখনো বিয়ে তো দূর, একটা প্রেমিকাও নেই। আমি বলি কী, তোর বিয়ে করা প্রয়োজন। এজন্যই কিসব স্বপ্ন দেখিস।"-বলেই হেসে দেয় সাজ্জাদ।

একবার বিরক্ত হয়ে চোখ কুঁচকে ওদের দিকে তাকায় রাহাত। কোথায় তাদের কাছে সাহায্যের জন্য এসেছে আর ওরা তা নিয়ে মজা করছে। ইচ্ছা করছে যেন গরম চায়ের কাপ সম্পূর্ণটা তাদের মাথায় ঢেলে দিক।

"মোটেও মজা করার মতো বিষয় না কিন্তু এটা।"- অর্ণব সিগারেটটা ধরিয়ে বলতে থাকে, "অশুভ শক্তির প্রভাব পড়া খুব ভালো কথা নয়।"

"কিন্তু তুই কীভাবে বলছিস যে এটা অশুভ শক্তির প্রভাব?"-হাসি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করে সাজ্জাদ।

"তাই নয় তো কী? ভালো করে ভেবে দেখ একবার। এটা মোটেই স্বাভাবিক বিষয় না।"-অর্ণবের উত্তর।

"রাহাত, তুই কী ভাবছিস?"

"ভাবছি কোনো সাইকোলোজিস্টের সাথে কথা বলে দেখবো।"

"কিন্তু আমার মনে হয় না যে এটা সাইকোলোজিক্যাল প্রবলেম। নিশ্চয় প্যারানর্মাল কোনো বিষয় হবে।"-রাহাতের দিকে ঘুরে বসে অর্ণব।

কোনো কথা বলছে না রাহাত। অর্ণব আবার বলতে শুরু করে,"আমি তোকে একটা ঠিকানা দিচ্ছি। সেখানে গিয়ে কথা বলে দেখ।"

"কার ঠিকানা?"-নড়েচড়ে বসে রাহাত।

"ফাদার মাইকেলের।"

"ফাদার মাইকেল?"-দাঁড়িয়ে পড়ে রাহাত।

"হ্যাঁ, তুই শুধু একবার তার সাথে কথা বলে দেখ। আমার বিশ্বাস তোর সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবি।"

"কিন্তু..."

"আমার উপর বিশ্বাস করতে পারিস। ভুল মানুষের সান্নিধ্যে পাঠাচ্ছি না তোকে।"

রাহাতের কাছে এই মুহূর্তে দ্বিতীয় কোনো সমাধান নেই। সন্ধ্যার পরপরই অর্ণবের দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছে যায় সে। বাড়িটা কেমন যেন নিস্তব্ধতায় ঘেরা। কলিং বেলে চাপ দিয়ে আশেপাশের দৃশ্যগুলোতে চোখ বুলাতে থাকে। একটু পরেই কেউ এসে দরজা খুলে জিজ্ঞাসা করে,
"আপনি রাহাত?"

"জ্বি!"

"ফাদার আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। ভেতরে আসুন।"

অপেক্ষা করছে মানে? আর তার নামই বা জানে কিভাবে? তার মানে এখানে আসার আগেই অর্ণব ফাদারের সাথে কথা বলে নিয়েছে।

"তোমার সমস্যার কথা শুনেছি, অর্ণব জানিয়েছে।"

রাহাতের ধারণা তাহলে সত্যি। সত্যিই বা হবে না কেন? গোয়েন্দাগিরি করার মতো বিষয় না এটা। "বোকা" নিজেকে নিজে গালি দেয় রাহাত। সেটা অবশ্য মনে মনে।

"এখন আমি কী করতে পারি ফাদার?"

"কী ঘটেছিল সে রাতে?"

বসা থেকে লাফিয়ে ওঠে রাহাত। আশ্চর্য, ফাদার জানলো কীভাবে যে গত দু'দিন আগে সে রাত করে বাসায় ফেরার সময় কিছু একটা ঘটেছিল, অস্বাভাবিক, ভৌতিক।

"অবাক হওয়ার কারণ নেই। নির্ভয়ে বলো কী হয়েছিল সেই রাতে?"

"কিসের রাত? কোন রাত? কোনো রাতেই কিছু হয়নি। ভুল বকছেন আপনি। এসব ভণ্ডামিতে বিশ্বাস নেই আমার।"-প্রচণ্ড ভয় পেয়ে রাহাত দরজার দিকে এগোতে থাকে। ঐ রাতের ঘটনা সে কিছুতেই মনে করতে চায় না। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে সে আবারও বলতে থাকে, "এখানে আসা ঠিক হয়নি আমার। আপনি একজন মিথ্যাবাদী। চললান আমি।" হাত পা কাঁপছে রাহাতের। তবুও দরজার দিকে এগিয়ে চলেছে সে। এখানে থাকতে চায় না এক মুহূর্তের জন্যও।

"তোমার মঙ্গলের জন্য বলছি বৎস্য। থেমে যাও, অশুভের ছায়া পড়েছে তোমার উপর। প্রতি রাতেই সে ভর করবে তোমার শরীরে। কোনো অশরীরী শক্তি, হয়তো কোনো মেয়ে কিংবা মহিলা।"

চলবে...

Sayhan Ahmed

Abul basar, Santa akter, Raihan khan, Tanusri roi, Sumaiya akter, Sumon khan, Fahad islam and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 23
স্বর্ণমুদ্রা : 307
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-05
View user profile

রক্তচোষা Empty Re: রক্তচোষা

Sat Jun 05, 2021 8:21 pm
৩য় ও শেষ পর্ব

"...প্রতি রাতেই সে ভর করবে তোমার শরীরে। কোনো অশরীরী শক্তি, হয়তো কোনো মেয়ে কিংবা মহিলা।"

রাহাত থেমে যায়। এখনো পা কাঁপছে তার। পিছনে ঘুরবে কি ঘুরবে না এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে হয়তো। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে আবার দরজার দিকে পা বাড়ায়। অজানা আতঙ্কে ছেয়ে গেছে তার সারা শরীর। বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। ছাতাও নিয়ে আসেনি সাথে। কে জানতো এরকম হুট করেই আকাশ চিরে পানির স্রোত বইবে? মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। রাহাতের মোটেও ইচ্ছা নেই বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লাগানোর। কিন্তু সে এখানেও থাকতে চায় না এক সেকেন্ডের জন্যও। ফাদারের সামনে থেকে কেটে পড়াটাই এখন মূল কাজ।

অন্ধকার বৃষ্টির রাতে একাকী রাস্তায় হাঁটা অনেকটা ভয়ানক হলেও রাহাতের মনে সেদিকে খেয়াল নেই। যে করেই হোক তাকে আগে বাসায় পৌঁছাতে হবেই। কিন্তু এত তাড়াহুড়া কিসের সে নিজেও জানে না। বিদ্যুৎ চমকানোর ঝলকানিতে মাঝে মাঝে চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠছে। হঠাৎ আলোয় কলাগাছের দিকে তাকালেও মনে হয় দাঁড়িয়ে আছে কোনো প্রতিশোধপ্রবণ প্রেতাত্মা। তবুও এগিয়ে চলেছে রাহাত। রিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না। পাবেই বা কী করে? কারো মাথায় ভূত চাপেনি যে এই ঝুমবৃষ্টির মাঝেও কেউ রিকশা নিয়ে রাস্তায় যাত্রীর অপেক্ষা করবে।

আধাঘন্টা সময়ের ব্যবধানে সে বাসায় পৌঁছায়। ভিজে একেবারে দাঁড়কাক হয়ে গেছে। কোনোমতে কাপড়টা ছেড়ে শুইয়ে পড়ে সে। খাওয়াদাওয়ার চিন্তা একদমই আসছে না মাথায়। রাহাত কাঁপছে, প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিচ্ছে তার পা থেকে মাথা অব্দি। কয়েকবার উঠে আয়নার সামনে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে দাঁড়ায়। চোখ লাল হয়ে আছে; যেন সারা শরীরের রক্ত চোখে এসে ভীড় জমিয়েছে। ঢকঢক করে দু'গ্লাস পানি নিঃশেষ করে দেয় মুহূর্তেই। আবারো গিয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়।

কাঁপছে সে, ভয়ে? নাকি ঠাণ্ডায়? মনে করে ফাদারের বলা শেষ কথাটি; "সে আসবে, প্রতি রাতেই। ভর করবে তার শরীরে।" এখানে থাকতে একদমই ইচ্ছা করছে না তার। একে তো রাত তার উপর আবার বৃষ্টি। কাউকে ফোন দিয়েও ডাকতে পারবে না সে। দুটো স্লিপিং পিল খেয়ে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দেয় নিজেকে।

-----

"তোমাকে কালই বলেছিলাম বৎস। প্রতিরাতেই ঘটবে এমন তোমার সাথে। এর থেকে ভালো হয় আমায় বলে দাও সব, যা ঘটেছিল তোমার সাথে। এর সমাধান অবশ্যই আছে।"

"আমি...আমি আর পারছি না এই দুঃস্বপ্নের যন্ত্রণা পোহাতে।"-ফুঁপাতে ফুঁপাতে বলে রাহাত।

"এটি দুঃস্বপ্ন নয়। কোনো এক অশুভ শক্তির প্রভাব।"

"আমি জানি না ফাদার, আমি মুক্তি চাই এই যন্ত্রণা থেকে।"-রাহাতের বিচলিত কণ্ঠের জবাব।

"সৃষ্টিকর্তার উপরে বিশ্বাস রাখো বৎস। শয়তানের শক্তি তাঁর থেকে বেশি নয়। এখন নির্ভয়ে বলো কী হয়েছিল সে রাতে?"

"আ আমি পারবো না। আমি মনে করতে চাই না। প্লিজ ফাদার।"-কাঁপতে কাঁপতে বলতে থাকে সে।

"ভয় পেয়ো না, কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।"

"বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। রিকশা পাচ্ছিলাম না কোনো। ভেবেছিলাম শর্টকার্ট রাস্তা দিয়ে যাই, সময় কম লাগবে।"-ঢোক গেলে রাহাত। আবার বলতে শুরু করে, "ওখানের পরিত্যক্ত শ্মশানটির কথা অনেক আগে থেকেই শুনতাম। তবে আমলে নেইনি কখনো। ওখানে নাকি কোনো এক মেয়েকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।"-এটুকু বলেই থেমে যায় রাহাত। আশেপাশে তাকায় কয়েকবার। রৌদ্রজ্জ্বল দিন, তারপরও তার কাছে মনে হচ্ছে যেন সে অদৃশ্য আতঙ্কের বেড়াজালে বন্দি।

"এক গ্লাস পানি হবে ফাদার?"-ক্ষীণকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে রাহাত। ফাদার মাথা নাড়িয়ে নিজেই উঠে গিয়ে পানি নিয়ে আসেন এক গ্লাস। এক ঝটকা টান দিয়ে ফাদারের হাত থেকে পানির গ্লাসটি কেড়ে নিয়ে নিমিষেই শেষ করে দেয়। ফাদার বুঝতে পারেন ছেলেটি প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে আছে। গ্লাসটি রেখে আবারও বলতে শুরু করে রাহাত,
"ঐ রাস্তা দিয়ে আসার আগে এতকিছু আমার মাথায় আসেনি। কিন্তু শ্মশানের কাছে আসতেই ভয় আমাকে প্রচণ্ডভাবে ঘিরে ধরে। অনিচ্ছা স্বত্বেও বারবার তাকাচ্ছিলাম শ্মশানটির দিকে। বারবার মনে হচ্ছিল কেউ ডাকছে আমায়। দৌঁড়ে ছুটে আসতে চাচ্ছিলাম কিন্তু পায়ের সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে গিয়েছিল। আশেপাশে কোনো বাড়িও নেই। চিৎকার করতে ইচ্ছা হচ্ছিল খুব কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন কেউ গলা চেপে ধরে রেখেছে।"-বলেই একেবারে নিশ্চুপ হয়ে যায় সে।

ফাদার হয়তো বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারটি। এর পর কী ঘটেছিল আর জানতে চাননি। জানার প্রয়োজনও মনে করেননি। কিছু সময় চুপ থেকে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, "তুমি কি জানো ঐ মেয়েটি কে ছিল যাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল?" মাথা নাড়িয়ে না-বোধক উত্তর দেয় রাহাত।

"শয়তানের উপাসক।"-উত্তর দেন ফাদার। "শয়তানকে খুশি করার জন্য তার সমীপে বলি দেওয়া নতুন কথা নয়। কেউ এমনটা করেছে নিজের সৌন্দর্য ও যৌবন চিরতরে ধরে রাখার জন্য আবার কেউ করেছে দুনিয়াকে তার আয়ত্বে নিয়ে আসার জন্য। একের পর এক বলি দিয়ে সে শয়তানকে খুশি করে চলেছিল। তার শিকার হয়ে চলেছিল কখনো শিশু আবার কখনো বৃদ্ধ কেউ। গ্রামবাসীরা যখন জানতে পারে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মানুষ পর্যন্ত গায়েব হয়ে যাওয়ার কারণ এই মেয়েটি, তখনই তাকে তার কালো যাদুর সামগ্রীসহ ঐ শ্মশানে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলে তারা।"

"কিন্তু তাকে মেরে ফেলার পরেও সে আবার জেগে উঠতে পারে কীভাবে?"

"এমনটা হয়েছিল হয়তো যে, মেয়েটার এতগুলো বলি উৎসর্গ করার কারণে শয়তান খুশি হয়ে তাকে দ্বিতীয়বার জন্ম দিয়েছে। এতদিনে তার একটি শরীরের প্রয়োজন ছিল। আর অবশেষে তুমিই হলে শয়তানের শিকার, ঐ মেয়েটিকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার শরীর।"

"কিন্তু কী চায় সে?"

"কোনো আত্মা ফিরে আসলে সর্বপ্রথমই সে চায় বদলা। তাকে যারা পুড়িয়ে মেরেছিল তাদের সবার উপর প্রতিশোধ নিতে চায় সে।"

"তাহলে এখনো সে কেন নিচ্ছে না? তিন রাত সে আমার শরীরে রাজত্ব বিস্তার করেছে।"

"হয়তো নিজেকে সতেজ করে তুলছে সে, রক্তচোষা রুপে। বিগত দুই রাতে একে একে সে গফুর মিয়ার ছেলে তারেক, তোমার ফ্লাটের ঐ ছেলেকে খুন করেছে, তাদের শরীর থেকে রক্ত চুষে নিয়ে।"

"কী? এই আত্মা মানে? মানে সে আমাকে দিয়ে খুন করিয়েছে?"-রাহাত আবারও কাঁপতে শুরু করে।

"হ্যাঁ, মাঝরাতেই সে তোমার শরীরটাকে নিজের দখলে করে নিতো। এরপর আশেপাশে শিকারের খোঁজে বের হতো। দূর্ভাগ্যবশত প্রথম রাতে সর্বপ্রথম তার নজরে পড়ে তারেক আর তার পরের রাতে তোমার ফ্লাটের ছেলেটি। মাঝরাতে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মোটেই উচিত হয়নি তার। প্রাণ হারালো বেচারা। শিকার শেষে আবার তোমাকে নিজ বিছানা পর্যন্ত নিয়ে এসে তোমার শরীর ত্যাগ করতো। যে কারণে হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙ্গে যেত তোমার আর তুমি বুঝতে পারতে না যে তা স্বপ্ন ছিল নাকি বাস্তব।"

"কিন্তু কাল রাতেও তো সে এসেছিল। আগের দু'দিনের মতোই আবারও হঠাৎ করে জেগে উঠেছিলাম ঘুম থেকে। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই ঠোঁটে রক্ত দেখতে পেলাম। বাকি রাত আর ঘুমাতে পারিনি। অপেক্ষা করছিলাম সকাল হওয়ার। আর সকাল হতেই ছুটে আসি আপনার কাছে। এমনটা নয়তো যে সে কাল রাতেও কারো রক্ত চুষে খেয়েছে?"

"হয়তো। খুব শীঘ্রই সে বদলা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। আমার আশংকা হচ্ছে এরপর তাকে কেউ থামাতে পারবে কি না। প্রতিশোধপ্রবণ আত্মাগুলো অনেক ভয়ংকর। থামাতেই হবে থাকে। দুনিয়াতে শয়তানের রাজত্ব বিস্তার করতে দেওয়া চলবে না।"

"কোনো উপায় কি নেই এই রক্তপিপাসুকে থামানোর জন্য?"

"থামাতে হলে তাকে দ্বিতীয়বারের মতো মৃত্যুবরণ করতে হবে।"

"মৃত্যু! অশরীরীর মৃত্যু কীভাবে সম্ভব?"

"ও এমন এক আত্মা, যেটা কারো শরীর ছাড়া চলতে পারে না। তাকে যদি কোনোভাবে কোনো মৃতদেহের মাঝে গ্রাস করে নেওয়া যায় তাহলে হয়তো চিরকালের জন্য তার মৃত্যু হতে পারে।"

"মানে আমি যদি কোনো ডেডবডি সংগ্রহ করে আমার শোবার জায়গায় রেখে দেই তারপর আত্মাটি ঐ মৃতদেহের শরীরে প্রবেশ করলেই চিরকালের জন্য তার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে?"-কৌতুহল হয়ে প্রশ্ন করে রাহাত।

"যেতে পারে।"-নিচের দিকে কয়েকবার মাথা দুলিয়ে ফাদারের উত্তর।

"কিন্তু অশরীরী তো আমার দেহকেই তার গ্রাসে করে নিয়েছে। সে কেন অন্য কারো দেহে প্রবেশ করবে? কিংবা কোনো মৃতদেহের?"

"করবে কি না জানি না। তবে মৃতদেহের মাঝে তার আত্মাকে প্রবেশ করানো ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।"

"যদি আমি মৃতদেহ এনেও রাখি আর সে যদি তার শরীরে প্রবেশ না করে আজও আমার শরীরে প্রবেশ করে তাহলে আবারও আরেকটি খুন হবে?"

"হুম।"-গম্ভীরভাবে উত্তর দেন ফাদার।

"আচ্ছা ফাদার, আমি ব্যবস্থা করছি কী করা যায়।"-উঠে দাঁড়ালো সে।

" গড ব্লেস ইউ মাই চাইল্ড।"

ফাদারের থেকে বিদায় নিয়ে সোজা বাড়িতে চলে আসে রাহাত। ভাবতে থাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত৷ যদি ফাদারের কথা মেনে নেয়, তাহলে এখন মৃতদেহ কোথায় পাবে সে? আর যোগাড় করার পর যদি রক্তচোষাটা লাশটির শরীরে না গিয়ে তার শরীরেই প্রবেশ করে তাহলে আবারও কারো খুন হবে? এভাবেই কী চলতে থাকবে প্রতিদিন? রাহাত রুমের মধ্যে পায়চারী করছে আর ভাবছে। অর্ণবকে ফোন দিয়ে ব্যাপারটা জানায়। সে বলেছে বিকালে আড্ডায় বসে কী করা যায় ভাবা যাবে। "পারলে যাবে"-জানায় সে। "দুনিয়াতে শয়তানের রাজত্ব বিস্তার করতে দেওয়া চলবে না।"-ফাদারের কথাটি মনে করে আবারও। কিছু একটা করতে হবেই তাকে।

-----

সে বিকালে রাহাত যায়নি আড্ডায়। পরের দিনেও যায়নি। দু'দিন ধরে রাহাতকে বিকালের আড্ডায় না পেয়ে সোজা তার বাড়িতে চলে আসে তার বন্ধুরা। ফোনও ওঠায়নি এই দু'দিন। এমনকি তার অফিসে খোঁজ নিয়ে জানে যে দু'দিন ধরে সে সেখানেও অনুপস্থিত। প্রথমদিন তেমন আমলে নেয়নি তারা। দ্বিতীয় দিনেও তাকে না পেয়ে সে সন্ধ্যায় তার বাড়িতে চলে আসে তারা। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, মানে সে ভিতরেই আছে। কয়েকবার কলিং বেল চাপার পরেও ভিতর থেকে সাড়া নেই। আবারও বেল বাজায় অর্ণব। একবার..দু'বার..তিনবার..

সাড়া নেই। উপায় না পেয়ে দরজা ধাক্কাতে থাকে। একটা সময় দরজার ছিটকিনি ভেঙ্গে ভেতরে চলে যায় তারা। রুমের লাইটটা অন করে।

"ঘুমাচ্ছে? পাছায় লাথি মার শালার।"-কিঞ্চিৎ চেচিয়ে উঠে আবির। রাহাতের বিড়ালটা তার পাশ দিয়ে ঘুরছে আর মেঁও মেঁও করছে।

"থাম।"-বলেই অর্ণব টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। নোট, সুইসাইড নোট!

"দ্বিতীয় কোনো উপায় পাইনি আমি। অন্য মৃতদেহ জোগাড় করার পরে যদি অশরীরীটা তার দেহে প্রবেশ না করে আমার দেহেই করে, তবে আরেকটা মৃত্যু হবে৷ তিন তিনটা মৃত্যু হয়েছে আমার জন্য। আমি চাই না আর কোনো মৃত্যু হোক। তাই অন্য কোনো লাশ যোগাড় করার প্রয়োজন মনে করিনি। কারণ এটাই, রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারটা আমাকেই, আমার শরীরকেই গ্রাস করে নিবে; অন্য কারোটা নয়। এজন্য নিজেকেই লাশ বানিয়ে নিলাম আমি। মাফ করে দিস তোরা আমায়। আর বিড়ালটার খেয়াল রাখিস কেউ।"

চক্ষু ভারী হয়ে আসছে অর্ণবের। ঝাপসা দেখতে শুরু করেছে। হয়তো পানির ধারা বইবে এখন চোখ দিয়ে। নোটটা বাকিদের কাছে দিয়ে রাহাতের নিথর দেহটার দিকে একবার তাকায় সে। বিড়ালটা ঘুরছে তার লাশের চারপাশে। মাঝে মাঝে মাথার পাশে গিয়ে বসে পড়ছে। মাথা দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে আর ডেকে উঠছে মেঁও বলে৷ হয়তো উঠতে বলছে তাকে। সে তো আর জানে না, মারা গিয়েছে তার মালিক!!

[Only admins are allowed to see this link]াপ্ত

Sayhan Ahmed

Abul basar, Santa akter, Raihan khan, Tanusri roi, Sumaiya akter, Sumon khan, Abir nill and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum