সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 4
স্বর্ণমুদ্রা : 144
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-05
View user profile

দ্য কুইনস থিফ অনুবাদ  Empty দ্য কুইনস থিফ অনুবাদ

Sat Jun 05, 2021 11:27 pm
অধ্যায়= ১
-----
কতদিন ধরে যে এই কারাগারে বন্দী সেটার হিসেব ভুলেই গিয়েছি। প্রতিটি দিনই একই রকম, বৈচিত্র্যহীন। শুধু একটা ব্যাপারই ঠিক মত চলছে তা হল আমার চামড়ার ওপরে জমতে থাকা ময়লার স্তর- রোজই যেন একটু করে পুরু হচ্ছে আগের দিনের চেয়ে। সকাল হলেই কারারক্ষীরা রাতে জ্বলতে থাকা মশাল নিভিয়ে দিয়ে যায়, আর আমার বাকি দিন কাটে মাথার ওপরে ছোট জানালা দিয়ে আসা একফালি সূর্যের আলোর দিকে চেয়ে চেয়ে। এরপর যখন সন্ধ্যা নামে তখন আমি আবার নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিই হয়ত শীঘ্রই এই গাড্ডা থেকে পালাতে পারব। এরপরে সময় কাটানোর জন্য অতীতের মধুর স্মৃতির মাঝে ডুব দিই কখনো কখনো। তারপরে আবার আমার পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে বসি। জেলে আসার আগে পর্যন্ত পরিকল্পনামাফিকই চলছিল, তারপরেই সব যেন ভেস্তে গেল। দেবতাদের কসম, যদি একবার এখান থেকে বের হতে পারি, জীবনেও আর এমন বোকার মত ফাঁদে পা দেব না।
জেলের খাবার খেয়ে খেয়ে আমার স্বাস্থ্যের বেশ উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। কোমরের শিকলটা আগে বেশ আঁটসাঁট হত, এখন সেটা ঢিলে হয়ে কোমরের সাথে কোনরকমে ঝুলে আছে। বন্দীদের ব্যাপারে এ রাজ্যের রাজা বেশ উদার বলতে হবে। রাজামশাই যাদের বেশি অপছন্দ করেন শুধু তাঁদেরকেই এভাবে শিকল পরিয়ে রাখা হয়। যেমন রাজার অর্থমন্ত্রী, রাজকোষে পয়সা কম আছে সেটা জানানোর জন্য তাঁরও এই দশা হয়েছিল । আমার অপরাধ অবশ্য এরকম কিছুর মধ্যেই পড়ে না, কিন্তু কোন এক অজানা কারনে মনে হচ্ছে আমিও মহারাজের অপছন্দের তালিকায় ঢুকে গিয়েছি। যদিও তিনি হয়ত আমার নামটাও ঠিকভাবে মনে করতে পারবেন না, তবে এ ব্যপারে আমি নিশ্চিত যে তিনি এত সহজে আমাকে ছেড়ে দিবেন না। সেকারনেই মনে হয় এত কড়াকড়ি। কোমরে বাঁধা শিকলের পাশাপাশি আরও কিছু অলঙ্কার তিনি আমাকে উপহার দিয়েছেন- এই যেমন হাতে হাতকড়া, পায়ে লোহার বেড়ি। প্রথম প্রথম হাতকড়া থেকে হাত গলিয়ে বের করার চেস্টা করাতে আমার কব্জির চামড়া উঠে হাতের বারোটা বেজে গিয়েছিল। তাই এখন আর এসব নিয়ে ভাবিই না। এর থেকে শুয়ে শুয়ে এই গাড্ডা থেকে বের হবার পরিকল্পনা করলে কাজে দেবে। কিন্তু কতক্ষন আর শুয়ে থাকা যায়? তাই উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারী শুরু করলাম। জেলের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত পায়চারি করার মত শিকলটা যথেস্ট লম্বা বলতে হবে।
আমার জেলের সামনের দিকটায় কয়েকটা লোহার রড ছাড়া আর কিছু নেই। প্রতিবার পালা বদল করার সময় কাররক্ষীরা একবার হলেও আমার দিকে তাকিয়ে দেখে, বোধহয় আমার অপরাধী হিসেবে যে সুখ্যাতি আছে সেটাই যাচাই করতে আসে। আমি নিশ্চিত আমার মত চৌর্যবিদ্যায় বিশারদ জগতে আর কেউ নেই। কিন্তু এই বিদ্যা নিয়ে ঘরে বসে থাকলে কি আর কেউ আমাকে চিনবে? তাই আমি শহরে মদের দোকানে গিয়ে গিয়ে আমার চৌর্যবিদ্যায় পারদর্শীতার কথা জনে জনে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম। এবং তাতে কাজও হয়েছিল। ধরা পড়ার পরে আমার বিচারের সময় পুরো শহরের লোক জমায়েত হয়েছিল, আর এর পর থেকেই আমার সুনাম (দুর্নাম!!) এখন মানুষের মুখে মুখে। জেলে আসার পরে পুরো কারাগারের রক্ষীরা আমাকে একনজর দেখতে আমার জেলের সামনে জড়ো হয়েছিল। আর আমার সুখ্যাতির পুরস্কারস্বরূপ আমি এখন সারা গায়ে শিকল পরে বসে আছি, আর অন্য বন্দীরা আরামসে জেলের ভেতরে হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে।
আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে একজন রক্ষী এগিয়ে এল, মুখে তাচ্ছিল্যর হাসি। “কি এখনো পালাতে পারো নি এখান থেকে?” তার হাসি দেখে আমার গা জ্বলে যাবার উপক্রম।
প্রতিবারই সে আমার কারাকক্ষের সামনে দিয়ে যাবার সময় এমন হাসি দেয়। আমিও কম যাই না। প্রচুর গালাগালি করি তাকে প্রতিবারই , কিন্তু আমার গালাগালি শুনে মনে হয়ে বেটা আরও বেশি মজা পায়। তাই এবার কিছু না বলে চুপ করে বসে রইলাম।
প্রচন্ড শীতে হাত পা কাঁপছে। স্পস্ট মনে আছে সময়টা ছিল বসন্তের প্রথম দিন, যেদিন রাজার সৈন্যরা আমাকে শেড ওক নামের মদের দোকান থেকে হিঁচড়ে বের করেছিল। তারপরে মনে হয় গ্রীস্মকালও কেটে গেছে, তবে এই ছোট ঘরের মধ্যে ঋতুর পরিবর্তন খুব কমই টের পাওয়া যায়। প্রথম যেদিন এই ঘরে রাত কাটিয়েছিলাম সেদিনও এমন স্যাঁতস্যাঁতে আর ঠান্ডা ছিল ঘরটা, আজও তেমনই আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় সূর্যের আলো গায়ে লাগলে কেমন লাগে সেটাই ভুলতে বসেছি।
মাঝে মাঝে মাথার ওপরে জানলা দিয়ে বাইরে পৃথিবীটা দেখার চেস্টা করি। আমার কক্ষটা সবচেয়ে ওপরে তলায়, আর সেখান থেকে বাইরের প্রাসাদগুলির পুরু দেয়ালগুলির কিছুটা অংশ দেখা যায়। দেয়ালগুলি প্রায় দশ থেকে পনের ইঞ্চি পুরু এবং অনেক পুরুনো, কোন মানুষের পক্ষে এমন পুরু দেয়াল তৈরি সম্ভব নয়। গল্পে আছে দেবতারা নাকি একরাতে এই শহর তৈরি করেছিলেন।
কারাগারটা শহরে একদম মাঝখানে, আর রাজার প্রাসাদ ছাড়া এটাই এই শহরে সবচেয়ে বড় এবং সুরক্ষিত স্থাপনা। এছাড়াও আগে এখানে পুরানো দিনের দেবতাদের একটা মন্দির ছিল, কিন্তু সেটার বদলে এখন সেখানে নতুন দেবতাদের জন্য মন্দির তৈরি হয়েছে। আগে সেই মন্দিরে প্রতিদিন দেবতারদের উদ্দেশ্য পুজো হত, আর পুজোর পরে শহরে গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বাকিদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতেন। এরপর অন্যদেশ থেকে বড় বড় জাহাজে করে ভিনদেশীরা এল, প্রথমে শুধুই বানিজ্যের উদ্দেশ্যে। কিন্তু একসময় বনিকের মানদন্ড পরিনত হল রাজদন্ডে আর শহরের সব সম্মানিত ব্যক্তিরা হলেন বন্দী। এভাবে কয়েকশো বছর কাটার পড়ে সোনিসের জনগন আবার জেগে উঠল, আবার স্বাধীনতার স্বাদ পেল। সোনিস পেল তার নতুন রাজা। কিন্তু ভিনদশীদের প্রভাব কখনোই আর পুরোপুরি চলে যায়নি। তাই পুরোনো দেবতারাও আর ফিরে আসেননি। আর নতুন রাজার ভাবসাবও নিজের দেশের মানুষের থেকে ভিনদেশীদের সাথে বেশি মিলে। এমনকি তার পরিবারের কেউই কখনো সোনিসের নাগরিকই ছিল না। কিন্তু সেসব নিয়ে এখন আর কেউ চিন্তা করে না। নতুনের স্বাদ পেয়ে সবাই পুরোনো ইতিহাস ভুলে গিয়েছে।
চিন্তা করতে করতে কখন যে রাত হয়ে গিয়েছে টেরই পাই নি আজ। এদিকে জেলের সুস্বাদু খাবার গলা দিয়ে নামতেই চায় না আর। খাবারের থালাটা একপাশে ঠেলে দিয়ে মাটিতেই শুয়ে পড়লাম। বাড়িতে থাকলে অন্তত কিছু পরিস্কার কাপড় আর ভাল খাওয়া তো জুটত। যাই হোক- কপাল আর কি। বাইরে রক্ষীদের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বেটারা এত ধুপধাপ শব্দ করে হাঁটে কেন কে জানে? প্রথম প্রথম শব্দের চোটে ঘুমই আসত না, এখন অবশ্য অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। ক্ষুধা্র চোটে পেট চোঁ চোঁ করছে, আবার এদিকে ঘুমেও চোখটা লেগে আসছিল। এমন সময় এক তীব্র আলোকচ্ছটা চোখের ওপর পড়তেই ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কিন্তু তীব্র আলোর চোটে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমি সবধানে এক পা পিছিয়ে এলাম। যেই হোক, এক হাত দেখে না নিয়ে ছাড়ছি না।
“এই কি সেই?”
কন্ঠস্বরের মালিক মনে হল আমাকে দেখে একটু অবাকই হয়েছে। আমি দেয়াল আকড়ে দাঁড়ানোর চেস্টা করলাম। আলোটা এখনো সরাসরি আমার চোখের ওপরে। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। এক রক্ষী আগন্তুককে নিশ্চিত করল যে সে যাকে খুঁজছে সে ব্যক্তিটি আমিই।
“ঠিক আছে। একে বের করে নিয়ে এস।“
“জ্বী , মহামান্য পুরোহিত।“ রক্ষীর স্বরে বিনয় যেন ঝরে পড়ছে। দরজা খোলার মৃদু শব্দ পেলাম, এবং আগন্তুক ভেতরে প্রবেশ করলেন। আলোটা এখন একপাশে সরিয়ে রেখেছে রক্ষী। আমি বার দুই পলক ফেললাম। চোখের সামনে এখনো অন্ধকার পর্দাটা ঝুলছে। আবার পলক ফেলে আগন্তুকের মুখের দিকে তাকালাম। হুম, এবার লোকটাকে চিনতে পারছি। ইনি সোনিসের রাজার পুরোহিত এবং মন্ত্রী, রাজসভার এক অন্যতম ক্ষমতাশালী সদস্য। আগেরদিনে এই পুরোহিতরা অনেক জাদুটোনাও জানত, কিন্তু এখন এসবের চল নেই। তাই সোনিসের রাজপুরোহিতের কোন জাদুক্ষমতা নেই (অবশ্য মাথাভর্তি বদবুদ্ধি ছাড়া)। ইনি অনেক পন্ডিত লোক বলে শুনেছি- পৃথিবীর এমন কোন ভাষা নাকি নেই যা ইনি বলতে, পড়তে এবং লিখতে পারেন না। রাজামশাইয়ের সব প্রশ্নের উত্তর নাকি তার ঠোঁটের আগায়। যদি রাজামশাই রাজ্যের প্রতি ইঞ্চি জমিতে কোন শস্য কতটুকু ফলে তা জানতে চান, তার উত্তর এই পুরোহিত জানেন। আবার যদি রাজকোষ ভরাতে কতজন কৃষকের জমির ফসল হাতাতে হবে সেটাও এই পুরোহিত বলে দিতে পারেন অনায়াসে। আর তাঁর জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা তাঁকে এনে দিয়েছে রাজার অগাধ বিশ্বাস। শুনেছি রাজপুরোহিতের প্রতিটি কথা নাকি রাজা অন্ধের মতন বিশ্বাস করেন। আমার বিচারের সময় এনাকে দেখেছি রাজসভায়- বিচারকের পেছনের একটা আসনে বসে তীব্র দৃস্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন সারাক্ষণ।
একজন রক্ষী আমার হাতের বেড়ী খুলে দিল, তারপরে পায়েরটা। শেষ পর্যন্ত কোমরের শিকলটা খুলে, হাত ধরে টেনে আমাকে রাজপুরোহিতের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। রাজপুরোহিত একবার আমার আপাদমস্তক নিরীক্ষন করলেন, তারপরে নাক কুচকালেন। ওহ হো, এতদিন গোসল না করায় যে সুন্দর গন্ধ আমার গা থেকে আসছে সেটার কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। যাই হোক পুরোহিত আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন।
“জিন,” আমি উত্তর দিলাম। তিনি নামের বাকি অংশ আর জানার প্রয়োজন বোধ করলেন না বলে মনে হল।
“ওকে নিয়ে চল আমার সাথে।“ রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন তিনি। দুজন রক্ষী দুপাশ থেকে এসে আমার হাত চেপে এমন জোরে চেপে ধরল যে ব্যথায় সামান্য ককিয়ে উঠলাম আমি, কিন্তু তারা সেসবের তোয়াক্কা না করে আমাকে টেনে নেয়া শুরু করল। আমরা রক্ষীদের কক্ষ পার হয়ে কারাগার এবং মূল প্রাসাদের মধ্যেকার ছোট উঠানে এসে পৌঁছলাম। রাজপ্রাসাদের তিনদিক উঁচু দেয়ালে ঘেরা। যেদিকে দেয়াল নেই সেদিকটায় অসংখ্য রক্ষীতে গিজগিজ করছে। আমরা উঠোনের শেষমাথায় পৌছে প্রাসাদের গায়ে একটা ছোট দরজার কাছে পৌঁছলাম এবং রাজপুরোহিতকে দেখে এক রক্ষী দরজা খুলে দিল।
দরজার ওপাশে সিঁড়ি। দুপাশের দেয়ালে এতগুলি মশাল জব্লছে জ্বলছে যে আলোর তীব্রচ্ছটায় আমার প্রায় অন্ধ হবার উপক্রম। এতগুলি মাস ছোট এক অন্ধকার কারাগারে কাটানোর পরে এত আলোর ঝলকানি অসহ্য লাগছে। আমি কোনরকমে একটা হাত রক্ষীদের শক্ত মুঠি থেকে ছাড়িয়ে চোখ ঢাকলাম। এরকম আর বেশি চললে সত্যি সত্যিই অন্ধ হয়ে যাব দেখছি। একজন রক্ষী আমার হাতটা টেনে নেয়া শুরু করতেই একটা বিশ্রী গালি বেড়িয়ে এল আমার মুখ থেকে।
“ওকে একটু সময় দাও অভ্যস্ত হতে।“ পুরোহিত না থেমেই বললেন।
আর কিছুক্ষন পরেই আমার চোখ অভ্যস্ত হওয়া শুরু করল আলোর মাঝে। আমি চোখের কোনায় জমে থাকা পানি মুছে নিয়ে আবার চলা শুরু করলাম। আরেকদফা সিড়ি আর সরু পথ পার হবার পরে সিংহখচিত বিশাল এক দরজার সমানে আমাদের যাত্রা শেষ হল। রাজপুরোহিত দরজার গায়ে আলতোকরে ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে আমি ভেতরে ঢুকলাম, চেস্টা করলাম দেখার ভেতরে কে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু ভেতরে কেউ ই তো নেই দেখছি।
“তোমরা বাহিরে অপেক্ষা কর।“ রাজপুরোহিত রক্ষীদের নির্দেশ দিলেন। “আধাঘন্টা পরে আবার এসে একে নিয়ে যেও।“
আধাঘন্টা? ভাবছিলাম পালানোর চেস্টা করে দেখব নাকি একবার, কিন্তু পুরোহিতের মুখের দিকে তাকিয়ে সে চিন্তা একেবারে কর্পূরের মত উবে গেল। কক্ষটা ছোট। কক্ষে মাঝামাঝি একটা টেবিল এবং কয়েকটা চেয়ার ছাড়া আর কিছু নেই। পেছনের জানলাগুলিও অনেক উঁচুতে। আর আমার যা অবস্থা তাতে এতদূর উঠে জানলা গলে পালানোর চেস্টা করাটা অসম্ভব। এর চেয়ে চেয়ারগুলি বেশ আরামদায়ক মনে হচ্ছে। আমি ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। যদি পালাতেই না পারি তাইলে একটু আরাম করে নিতে দোষ কোথায়। আমাকে বসতে দেখে পুরোহিতের ভুরুদুটি কুচকে গেল। বেটা বেশ বিরক্ত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
‘ওঠ, ওঠ।“ যেন আমি কোন নরকের পোকা, এমনভাবে তিনি বলে উঠলেন। আমি সেসবে পাত্তা না দিয়ে আরও আরাম করে বসলাম। হুম, চেয়ারটা আসলেই আরামের। এত দিন শক্ত মেঝেতে বসে বসে কোমর ব্যথা হয়ে গিয়ছে। সুযোগ যখন পেয়েছি একটু আরাম করার, এখন বেটা শত গালাগালি করলেও নড়ছি না।
আমার বসার ভঙ্গী দেখেই মনে হয় পুরোহিত হাল ছেড়ে দিলেন শেষ পর্যন্ত। আমারকে ছেড়ে তার এবার মনোযোগ টেবিলের ওপরে রাখা বইগুলির দিকে গেল, কি যেন খুজছেন তিনি। যাই খুজুক এখন আমাকে আদব কায়দার ওপরে ভাষণ দেয়া শুরু না করলেই হয়। বাড়িতে সেসব বহুত শুনেছি। তবে আমার আদব কায়দার অভাব তাঁকে বেশ হতাশ করেছে বলেই মনে হল।
“একদিন তুমি হয়ত আমার কথা ঠিকমত শুনবে।“ একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল তার মুখ থেকে। অবশ্যই, শুনব, যদি দেবতারা নিজে স্বর্গ থেকে নেমে এসে যদি আমাকে বলেন, তবেই। তবে সেটি তো আর হচ্ছে না। “যাই হোক এখন আমি তোমাকে যে কথাগুলি বলব সেগুলি অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেই চলবে।“ এবার তার গলার স্বর একটু কড়া শুনাল।
বেটার মতলবখানা কি? যাই হোক আমি আমার আরামের চেয়ার ছেড়ে নড়ার কোন চেস্টাই যখন করলাম না তখন বুঝলাম বেটা আরো বেশি হতাশ হচ্ছে। “যাই হোক, তুমি যাবার পরে চেয়ারগুলি ধোয়া লাগবে।“
এবার বেটার কথায় কিছুটা রাগই লাগা শুরু হল। তাদের রাজার জেলের ভেতরে গোসলের ব্যবস্থা নেই, তো সেটা কি আমার দোষ? একে কিছুদিন ঐ স্যাতস্যাতে জেলের ভেতরে বন্দী করে রাখলে দেখা যেত কেমন গন্ধ আসে এর গা থেকে। পুরোহিত কিছুক্ষন আবার আমাকে আপাদমস্তক দেখলেন। মুখের ভাব দেখেই বুঝা যাচ্ছে আমাকে দেখে তার বিশেষ পছন্দ হয়নি। তবে তাতে আমি থোড়াই কেয়ার করি।
“আমি তোমাকে তোমার বিচারের দিন থেকেই লক্ষ্য করেছি।“ পুরোহিত বললেন।
আমি মাথা নাড়লাম। আমিও যে তাকে লক্ষ্য করেছি সে কথাটা আর বললাম না।
‘হুম,” পুরোহিতকে একটু চিন্তিত মনে হল, “ সেদিন তুমি বলেছিলে যে পৃথিবীর কোন জেলখানাই নাকি তোমাকে বেশিদিন আটকে রাখতে পারবে না। কিন্তু তুমি এখনো এখান থেকে পালানোর চেস্টা করো নি কেন সেটাই ভাবছি। নাকি আমাদের জেলখানাটা তোমার বেশি পছন্দ হয়েছে?”
আমি পা দুটো চেয়ারের ওপর তুলে আরও আরাম করে বসলাম। চেয়ারের দুর্দশার কথা চিন্তা করেই কিনা কে জানে বেটার চোখেমুখে বেদনার ছাপ স্পস্ট ফুটে উঠতে দেখলাম।
“কিছু কিছু কাজ করতে সময় লাগে।“ আমি অবশেষে উত্তর দিলাম।
“হুম,” পুরোহিতকে চিন্তিত বলে মনে হল, “কতক্ষন সময় লাগতে পারে বলে তুমি মনে কর?”
আরো আধাঘন্টা, আমি মনে মনে ভাবলাম।
“হয়ত আরো বেশি সময় লাগবে।“ পুরোহিত অন্যমনস্কভাবে বললেন, তারপরেই আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, “হয়ত তোমার সারাজীবনটাও লেগে যেতে পারে, কি বল? মরে গেলে অবশ্য তোমার লাশটা জেলের ভেতরে পচার জন্য ফেলে রাখা হবে না সেটার নিশ্চয়তা অবশ্য দিতে পারি। ”
হা হা, বেটা কি মজা করছে আমার সাথে? যদিও এমন উদ্ভট মজা আমার মোটেও পছন্দ নয়।
“তুমি তোমার বিচারের দিনে রাজসভায় কিছু কথা বলেছিলে, সেগুলি কি সত্য?” পুরোহিত জিজ্ঞাসা করলেন। “আমি তো বলেছি আমি পৃথিবীর যেকোন কিছুই চুরি করতে পারি।“ আমি উত্তর দিলাম।
“হুম, “ পুরোহিত আমার সামনা সামনি থাকা একটা চেয়ারে বসে আমার দিকে তাকালেন। হঠাত পুরোহিতের চেহারা থেকে সব মজার ভাব মুছে গেল, তার তীব্র দৃস্টি আমার ওপরেই নিবদ্ধ। কিছু একটা মতলব আছে এর নির্ঘাত।
“তাহলে, তুমি আমাদের কারাগার থেকে পালাতে পারনি কেন এখনো?” পুরোহিতে তীব্র দৃস্টির যেন চামড়া ভেদ করে আমার হাড়গোড় পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে। আমি গায়ের ছেড়া শার্টটা আরেকটু টেনে নিলাম।
“আমি পৃথিবীর যেকোন কিছুই চুরি করতে পারি।“ আমি বললাম আবারও, প্রতিটা শব্দের ওপরে আলাদা আলাদা করে জোর দিয়ে, “এবং এটা মিথ্যা নয়।“
আমার মাথায় অবশ্যই জেল থেকে পালানোর পরিকল্পনা আছে, কিন্তু প্রতিটাই বেশ সময়সাপেক্ষ। তবে স্পস্ট বুঝতে পারছি, রাজার পুরোহিত আরেকটু সোজা কোন পথ আমার জন্য খুলে দেবার অপেক্ষায় আছে।
“তোমার মতন এমন কুশলী চোরকে আমি জেলে বসে পচতে দিতে পারি না।“ পুরোহিত আমার দিক থেকে দৃস্টি সরিয়ে টেবিলে পড়ে থাকা একটা বই তুলে নিলেন। হুম, এবার পথে আসছে বেটা। আমি চুপচাপ তার পরবর্তী পরিকল্পনা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
“আমি চাই তুমি আমার হয়ে কাজ কর। আমার জন্য একটা জিনিস চুরি করে দিতে হবে।“ অবশেষে পরিকল্পনাটা ফাঁস করেই দিলেন পুরোহিতমশাই।
আমি হাসলাম। যাক শেষ পর্যন্ত বেটা পথে এসেছে। “কি চুরি করতে হবে বলুন। রাজার রাজমোহর? এটা তো একদম পানির মতন সোজা কাজ।”
“চুপ করে পুরো কথাটা শোন।“ পুরোহিত ধমকে উঠলেন। আমি ভাল করেই জানি রাজার রাজমোহরের ওপরে পুরোহিতের দৃস্টি আছে অনেকদিন থেকেই। সেটা যে মোহরের ওপরে রাজচিহ্ন খচিত রুবির জন্য তা নয়, এর সাথে যে ক্ষমতা জড়িত সেটাই আসল লক্ষ্য।
“ না রাজমোহর নয়। তুমি আমার জন্য একটা বিশেষ জিনিস চুরি করে এনে দিবে। যদি ঠিকঠাকমত কাজটা হয়ে যায় তবে আমি চেস্টা করব যে তোমাকে যেন আবার জেলে ফিরে যেতে না হয়।“
রাজকারাগার থেকে ছাড়া পাওয়াটা এত সহজ নয়। প্রতিদিনই অনেক মানুষ জেলে এসে ঢোকে কিন্তু খুব কমই জেল থেকে জীবিত ফিরতে পারে। আর মনে হচ্ছে পুরোহিত তার পরিকল্পনাটা বেশ ভাল ভাবেই ফেঁদেছে। তবে আমার জেল থেকে বের হওয়াটাই এখন মূল লক্ষ্য।
“বলুন তাহলে কি চুরি করতে হবে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
পুরোহিত আমার কথাটা যেন পাত্তাই দিলেন না। “তুমি সব কিছু পরে বিস্তারিত জানতে পারবে। এখন শুধু বল যে তুমি আমার হয়ে কাজটা করতে পারবে কিনা?”
“আমি রাজি। নিশ্চিন্তে আমার ওপরে ভরশা করতে পারেন।“ আমি উত্তর দিলাম, “কিন্তু জিনিসটা কি?”
“বললাম তো সব কিছু পরে তোমাকে বিস্তারিত জানানো হবে।“ পুরোহিতকে একটু বিরক্তই মনে হল এবার। কিন্তু আমিও ছাড়বার পাত্র নই।
“চুরি করার আগে আমার জানা দরকার কি চুরি করতে হবে, নাইলে কাজটা করব কিভাবে?’
“আমি তো ভেবেছিলাম তুমি যেকোন কিছুই চুরি করতে পার।“ পুরোহিত বেটা এবার আবার মজা নেয়া শুরু করেছে।
“শুধু জেল থেকে পালানো ছাড়া।“ আমিও কম যাই না।
“বেশি চালাকি করার চেস্টা করো না, ছেলে।“ পুরোহিত মাথা নাড়লেন। “তুমি নিজেকে যতই চালাক ভাব না কেন, তুমি আসলে ততটা চালাক নও।“
একদম আঁতে ঘা। আমি প্রতিবাদ করার জন্য মুখ খোলার চেস্টা করতেই, পুরোহিত আমাকে চুপ করিয়ে দিলেন। “কাজটা করার জায়গায় যাবার আগে আমাদের কিছুদূর ভ্রমন করতে হবে। পথে তোমাকে সবকিছু খুলে বলা হবে।“
আমি স্তভিত হয়ে কিছুক্ষন বসে রইলাম। ভাগ্যটা এত ভাল হয়ে যাবে তা আশাই করি নি। একদম আমার মনের মত পরিকল্পনা এটা। একবার যদি আমি সোনিসের সীমানার বাইরে যেতে পারি, আমাকে আর ধরবে কে। আমার মনের ভাব মনে হয়ে কিছুটা মুখেও প্রকাশ পেয়েছিল কারন পুরোহিত ঠিক সেই সময়েই আমার দিকে ঝুঁকে আমার কানে ফিসফিস করে বললেন। “আমাকেও অতটা বোকা ভেব না ছেলে।“
আমি মোটেও তাঁকে বোকা ভাবছি না। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য আর আমার লক্ষ্য এক নয়। পুরোহিত চেয়ারে বসে পড়লেন আবার, যেন কারো জন্য অপেক্ষা করছেন। এদিকে আমি মনে মনে এই অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যের জন্য দেবতাদের ধন্যবাদ জানালাম। ঠিক সেই সময়ে আমাদের পেছনের দরজা খোলার শব্দ পেলাম, আমার বুক আবার ধুকধুক করতে শুরু করল। রক্ষীরা কি আবার আমাকে সেই বিশ্রী জেলে নিয়ে যাবার জন্য ফেরত এল নাকি?
কিন্তু না রক্ষী নয়। একজন বেঁটে, চওড়া ভূরিওলা এক লোক ভেতরে প্রবেশ করলেন। পরনে তাঁর বেশ চাকচিক্যময় পোষাক, মাথার পাক ধরা চুলের রং হয়ত কোন এক সময় সোনালী ছিল। নতুন আগন্তুক ভেতরে প্রবেশ করেই কিছুক্ষন আমার আপাদমস্তক নিরীক্ষন করলেন, তারপরেই পুরোহিতের দিকে ফিরলেন।
“এই সেই ছেলে?”
“জ্বী, মহারাজ।“ পুরোহিত তাঁর আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন ইতিমধ্যে, আমাকেও ইঙ্গিতে দাঁড়াতে বললেন। এবার আমি তার কথামত উঠে দাঁড়ালাম আর ভাল করে রাজাকে দেখতে পেলাম এবার।
সোনিসের রাজা বেঁটে খাটো মানুষ। ছোটবেলায় মায়ের কাছে গল্পে যেমন বিশালদেহী বীর রাজাদের কাহিনী শুনেছি, ইনি তেমন কিছুই নন। তিনি সাধারনের তুলনায় খাটো, বেঁটেই বলা যেতে পারে, বিশাল ভুরি, আর চোখে মুখে ঔদ্ধত্যের ছাপ। রাজ্যের কেউই যে রাজাকে পছন্দ করে তেমন নয়। বছর বছর কর বাড়ানোর কারনে প্রজারা এমনিতেই ক্ষুব্দ, প্রায়ই বিদ্রোহ লেগেই থাকে রাজ্য জুড়ে। এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য রাজা বিশাল সেনাবাহিনী পোষেন। আবার সেনবাহিনী বিদ্রোহ শুরু করলে তাদেরকে পাশের রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করার জন্য পাঠিয়ে দেন। রাজ্য জুড়ে গুজব যে রাজা প্রতিবেশী রাজ্য ইড্ডিসের রানীকে বিয়ে করে,তার সাহায্যে তার পাশের রাজ্য আটোলিয়া দখল করে, তিন রাজ্যের সম্রাট হিসেবে নিজেকে ঘোষনা করার পরিকল্পনা করছেন।
রাজামশাই পুরোহিতকে অগ্রাহ্য করে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। কিছু না বলে হাতের পোটলাটা উপুড় করে ধরলেন টেবিলের ওপর। তার মধ্যে থেকে যা বের হল, তা দেখে আমার চোখ কপালে ওঠার যোগাড়।
স্বর্নমুদ্রা। অনেক অনেক। এত বেশি যে এগুলি দিয়ে আমি নিশ্চিত একটা ছোটখাট জমিদারী কিনে ফেলা যাবে। একটা স্বর্নমুদ্রা টেবিল থেকে ছিটকে পড়ে আমার পায়ের কাছে এসে পড়ল। আমি সেটা তোলার জন্য ঝুকতেই রাজা হাত তুলে আমাকে থামালেন।
“কি জীবনে দেখেছ এত স্বর্নমুদ্রা?” তাঁর চোখেমুখে কৌতুকের ছাপ। আমার বিস্ময় দেখে মজা পাচ্ছেন তিনি বোঝা যাচ্ছে।
“অবশ্যই।“ আমিও কম যাই না। “আমার চাচার বালিশের নিচে স্বর্নমুদ্রার থলি রাখতেন, আর রোজ রাতে গুনে দেখতেন ঠিক আছে কিনা।“
“মিথ্যুক।“ রাজা ধমকে ঊঠলেন। আমার উত্তরটা মনে হয় তার পচ্ছন্দ হয়নি। “তোমার চৌদ্দগুষ্ঠির সৌভাগ্য হয় নি এতগুলি স্বর্নমুদ্রা একসাথে দেখার।“
আমি চুপ করে রইলাম। যদি এখন বলি যে এরচেয়েও বেশি দেখেছি আমার চাচার সিন্দুকে তাইলে রাজা আরো ক্ষেপে যাবেন। রাজাকে ক্ষেপানোর মতন ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই এখন আমার নেই।
“তুমি যদি কাজটা করে দিতে পার তাইলে এই সবগুলি মুদ্রা তোমার।“ মুঠোভরে স্বর্নমুদ্রাগুলি আবার পোটলায় ভরে রাখতে রাখতে বললেন। “কি কাজটা করবে তো?”
আমি একবার মুখটা হা করে আবার বন্ধ করলাম। এতগুলি স্বর্নমুদ্রা প্রত্যাখান করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু না। আর যদি এখন এই কাজ না করি, আমি নিশ্চিত তিন রাজ্যের কোন কোনায় পালিয়ে আমি রাজার ক্রোধের হাত থেকে বাচতে পারব না।
“অবশ্যই মহারাজ।“ আমি মাথা নিচু করে রাজাকে সম্মান জানালাম।
আর এভাবেই আমি এক গাড্ডা থেকে আরেক গাড্ডায় ফেঁসে গেলাম। পালানোর পরিকল্পনাটা যত সহজ ভেবেছিলাম ততটা সহজ হবে না দেখছি। যাই হোক, যেভাবেই হোক দ্রুতই আমি এই জেলের স্যাঁতস্যাঁতে কক্ষ থেকে বের হয়ে খোলা বাতাসে শ্বাস নিতে পারব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

চলবে

Sk sagor, Sk imran, Rasel islam, Raihan khan, Badol hasan, Mr faruk, Saiful Osman and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 4
স্বর্ণমুদ্রা : 144
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-05
View user profile

দ্য কুইনস থিফ অনুবাদ  Empty Re: দ্য কুইনস থিফ অনুবাদ

Sat Jun 05, 2021 11:28 pm
অধ্যায়= ২
----
প্রথম অধ্যায়ের লিংক কমেন্টে দেয়া আছে।
নেটফিক্স বা ডিজনী এটা নিয়ে সিরিজ বানানোর প্ল্যান করছে শুনলাম। সম্ভাব্য টাইটেল সিকুয়েন্সের ইউটিউব লিংক কমেন্টে আছে। (তবে এই সিকুয়েন্সে ২য় বইয়ের স্পয়লার পেতে পারেন কিছুটা)
----
পরের দিন সকালে যখন দুজন রক্ষী আমাকে রাজপুরোহিতের কাছে আবার নিয়ে যাবার জন্য এল তখন বেশ অবাক হলাম। মাত্রই তো গতকাল রাজা তার পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে রাজি হলেন। এরই মধ্যে এত তাড়াতাড়ি সবকিছু যোগাড়যন্ত্র করে ফেলেছেন সেটা ভাবতেই পারিনি। কিন্তু কোথায় যাব, কতদূর যেতে হবে এই কাজ সম্পন্ন করতে তার কিছুই এখনো জানতে পারি নি। যাই হোক শিকল আর জেলখানা থেকে যে মুক্তি পাচ্ছি আপাতত সেটাই অনেক।
গতকালের মতই কারাগার এবং রাজপ্রাসাদের মাঝের উঠোন পার হয়ে প্রাসাদের সামনের সেই দরজার কাছে পৌঁছলাম যখন তখন প্রায় দুপুর। সূর্যের আলো চারদিকের হলুদ পাথরের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে ঠিক উঠোনের ওপরেই পড়ছে। কারাগার থেকে বের হতেই তীব্র সূর্যালোকে শরীর প্রায় ঝলসে যাবার উপক্রম। এর চেয়ে বাড়িতে থাকলে এত গরম সহ্য করতে হত যতটা এখানে করছি। বিরক্তিতে আমি পুরোনো সব দেবতাদের নামে অভিশাপ দিলাম। অবশ্য এখন আর কেউ পুরানো দেবতাদের পূজো করে না, তবে অভিশাপ দেবার সময় ঠিকই তাদের নামেই দেয়। সৌভাগ্যক্রমে আজ আর বেশিক্ষন এই তপ্ত উঠোনের মধ্যে দাড়িয়ে থাকা লাগে নি। কিছুক্ষনের মধ্যেই দরজা খুলে গেল এবং রক্ষীরা আবার আমাকে হিঁচড়ে সিড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া শুরু করল। বেটাদের হাতের এত জোর যে মনে হয় যেন গায়ে ফোসকা পড়ে যাবার যোগার। নিজের অজান্তেই একটা বিশ্রী গালি মুখ থেকে বের হয়ে এল।
সিড়ির শেষ মাথায় পুরোহিত অপেক্ষা করছিলেন। তাকে দেখে মাথাটা আরো গরম হয়ে গেল। “শালার বজ্জাত।“ বিড়বিড় করে বললাম। আমার গালি শুনে পুরোহিত একটু ভ্রু কুচকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। তিনি রক্ষীদের আমার হাত ছেড়ে দেবার নির্দেশ দিলেন। রক্ষীরা আমার হাত ছেড়ে দিল, কিন্তু পেছনে ঠিকই মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল। আমি ডান হাত দিয়ে বাম হাতের ব্যাথার জায়গাটা ডলতে ডলতে এতক্ষনে চারপাশটা একবার দেখে নেবার সুযোগ নিলাম।
আমরা এক যাচ্ছি না তাহলে। আরো পাচটি ঘোড়া আর তিনজন লোকও অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। এদের একজন ঘোড়ার পিঠে জীন আর লাগাম পরানোর চেস্টা করছে, কিন্তু ঘোড়াটা বারবারই তার হাত থেকে পিছলে যাচ্ছে। আরেকজন কিছু মালপত্র নিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠাল। পুরোহিত মালপত্রের তালিকা দেখেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। “আমার বইপত্রের বস্তাটাই তো আনিস নি বলদ।“ পুরোহিত মালামাল উঠাচ্ছিল যে লোকটা তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমি তো বলেছি ঐটাই প্রথমে আনতে।“
যাকে বলদ বলে সম্মোধন করা হল সে কিছুক্ষন পরে ভেতর থেকে একটা চামড়ার বাক্স নিয়ে মালপত্রের সাথে তুলল। ঘন্টাখানেক পরে সব মালপত্র তোলা শেষ হল আর পুরোহিতমশাইও সব ব্যবস্থায় শেষপর্যন্ত সব ব্যবস্থায় সন্তুস্ট হলেন বলে মনে হল। আমি এক ছায়া পড়ে এমন এক কোনায় দাঁড়িয়ে সবকিছু অবলোকন করছিলাম। প্রস্তুতির বহর দেখে তো মনে হচ্ছে যাত্রাটা বেশ লম্বাই হতে যাচ্ছে, যদিও দলে লোকজন খুব বেশি হবে না বলে মনে হচ্ছে। পাচটি ঘোড়া, আর আমিসহ পাঁচজন মানুষ। যাক ভালই হল। পুরোহিত সবকিছু একবার দেখেশুনে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “বেলা থাকতে থাকতেই বেরিয়ে পড়া উচিত।“ এর পরে কিছুক্ষন আগে যাকে বলদ বলে সম্মোধন করেছিলেন তার দিকে তাকালেন, “তুমি বাকিদের ঘোড়ায় উঠাও, পোল।“ এরপর আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি আরেকটা মালপত্রের বস্তা, “ আমি এই চোরটাকে উঠাচ্ছি।“
তবে মালপত্রের বস্তাও এর থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ন পুরোহিতের কাছে আমার চেয়ে, কারন এরপরে তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই ডাকলেন, “এই চোরের বাচ্চা, এদিকে আয়।“ তিনি একটা ঘোড়ার কাছে গিয়ে থামলেন, “এটার পিঠে ওঠ।“
বেটার আবার বোধ হয় আমাকে নিয়ে মজা নেবার শখ হয়েছে। ঘোড়ার পিঠে চাপব আমি? জি না। আমি ঘোড়া নামক প্রানীটা একদমই পছন্দ করি না। এগুলি দেখতে যতই সুন্দর আর রাজকীয় হোক না কেন, সবাই জানে সুযোগ পেলে পিঠ থেকে আরোহীকে ফেলে দিতে ওস্তাদ এরা। আমাকে জায়গা থেকে নড়তে না দেখে পুরোহিত একটু বিরক্ত হলেন বলে মনে হল।
“কি ব্যাপার?”
“কি?” আমি আমার জায়গায় অনড় রইলাম।
“ এই ঘোড়াটার পিঠে চড়, গাধা।“
“আমি?”
“অবশ্যি তুমি, বলদ।“
হ্যাঁ, আমাকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলি বলা হয়েছে, কারন দলের আর বাকি তিনজন নিজ নিজ ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাবার জন্য তৈরি। আমাকে অনড় দেখে পুরোহিত ঘাড় ধরে টেনে একটা খালি ঘোড়ার পাশে দাঁড়া করিয়ে দিলেন। এরপরে কাঁধ ধরে সেটা পিঠে তোলার চেস্টা করলেন। আমি শক্ত হয়ে রইলাম। যদি আমার থেকে আটগুন বড় কোন কিছুর পিঠে চড়তেই হয় তাইলে আগে একটা পরিকল্পনা করা দরকার।
কিন্তু কোন পরিকল্পনা করার আগেই পুরোহিত আমাকে ঠেলে ঘোড়ার পিঠে উঠিয়ে দিলেন। বেটা দেখতে শুকনা পাতলা হলে হবে কি, জোর আছে বলতে হবে। বেটার ঠেলাঠেলির চোটে কাধের কাছ থেকে শার্টটাই ছিড়ে গেল খানিকটা। কিন্তু বেটা আমার হাত ছাড়ল না।
“প্রথমে বাম পা জিনের ওপরে দাও।“ তিনি বললেন। তার কথামত কাজ না করলে দেখছি ছাড়বেই না। তাই তার কথামত বাম পাটা ঘোড়ার জিনের ওপরে দিলাম। বেটা এবার খুশি হল বলে মনে হল। “হুম এবার ডান পা।“
যাক বেটার কথামত শেষ পর্যন্ত ঘোড়ায় চড়তে পারলাম। কিন্তু নিচের দিকে তাকাতেই মাথাটা ঘুরে উঠল। আমার পা দুটো মাটি থেকে প্রায় ছয় ফুট উপরে ঝুলছে। সেদিকে আর মনোযোগ না দিয়ে সামনের দিকে তাকালাম। চুলগুলি বড় হয়ে চোখের উপরে পড়ছে। সেগুলি ঠেলে কানের পেছনে নেবার একটু ব্যর্থ চেস্টা করলাম। মাথাটা ঘোরানো একটু বন্ধ হলে চারপাশে তাকালাম আবার। লোকে যাই বলুক না কেন মাটি থেকে ছয় ফুট উপরে বসে, নিজের মাঝে এমনিতেই একটু রাজকীয় ভাব চলে আসে।
সবাই যাবার জন্য তৈরি হলে পুরোহিত যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। প্রথমে পুরোহিত, তারপরে আমি এবং পেছনে বাকি তিনজন প্রাসাদের পেছনের ছোট একটা দরজা দিয়ে বের হলাম। নাহ, রাস্তায় আমাদের বিদায় জানানোর জন্য দেখি কেউ জমায়েত হয়নি। একটু আশাহত হলামই বলা যায়। শত হলেও শহর জুড়ে আমার নামডাক তো আর কম নয়, তার ওপরে এত বড় আর এত কঠিন একটা কাজে যাচ্ছি... কিছুটা তো সম্মান আশা করতেই পারি, তাই না?
আমরা যখন প্রধান সড়কে পৌছলাম তখন প্রায় দুপুরের শেষ। রাস্তায় মানুষজনের ভীড়। বেশিরভাগই নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার আগে কাজ গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। মানুষ ছাড়াও কিছু ঘোড়া আর গাধাও আছে পথচারীদের মাঝে। ব্যবসায়ীরা দিনের শেষভাগটা কাজে লাগাচ্ছে বাড়িতে ফিরে যাবার আগে। চারদিকে শব্দ আর মানুষের কোলাহল। বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নিলাম। কে জানত যে মানুষের কোলাহলের শব্দও এত মধুর লাগতে পারে। আমরা মানুষের ভীড় ঠেলে এগিয়ে চললাম। পুরোহিতমশাই যতই চেস্টা করুন না কেউ কিছু কিছু কৌতুহলী চোখ একবার হলেও আমাদের দিকে নজর দিচ্ছে, বিশেষ করে আমার দিকে। দলের বাকিরা বেশ ভাল কাপড়চোপড় পরা হলেও আমার গায়ে এখনো জেলখানায় যে শার্টটা পরেছিলাম সেটাই আছে। সেটা রং অবশ্য কোন সময় মিস্টি হলুদ ছিল, কিন্তু এখন অবশ্য মানুষের বর্জ্যের রং ধারন করেছে। হাতাটা কনুইয়ের কাছ থেকে খানিকটা ফেঁসে গিয়েছে, আর কাধের কাছে বেশ বড়সড় ছেঁড়া, অবশ্য সেটার জন্য রাজপুরোহিতকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। বেটার যদি আবারো আমার কাপড় চোপড় ধরে টানাটানির ইচ্ছে জাগে তখন কি পরব সেটাই মাথায় ঘুরছে এতক্ষন।
শহর পেড়িয়ে মফস্বলের দিকে ঢুকতেই ভীড় একটু কমে এল। আমি কেবলই চারপাশে দেখছি পরিচিত কাউকে পাওয়া যায় কিনা। কারো মাধ্যমে বাড়িতে আমি যে ছাড়া পেয়েছি এই খবরটা জানানো দরকার, নাইলে যে সবাই চিন্তা করতেই থাকবে। কিন্তু এই শহরে আমি তেমন কাউকেই চিনি না। বন্দরের কাছে আসতেই মাছের গন্ধ পেলাম। রাজার যুদ্ধজাহাজের আস্তানার পাশেই মাছের বাজার। যাবার পথে আমি মন দিয়ে জাহাজ আর কামানের সংখ্যা গুনতে শুরু করতেই দেখি ইলিনিকোস রাস্তার পাশে দাড়িয়ে আমার দিকে হাত নাড়ছে।
“ইলিনিকোস”, আমিও ডাকলাম, যাক কেউ একজন তো আমার ছাড়া পাবার খবরটা দিতে পারবে বাড়িতে। “আমি ছাড়া পেয়ে গিয়েছি।‘ আমি হাত নাড়ানোর জন্য হাত তুলতেই, পুরোহিত আমার শার্টের হাতা খামচে ধরে তার পাশে টেনে নিয়ে এলেন।
“এই কি করছ তুমি?” ধমকে উঠলেন তিনি। আমার ঘোড়ার পেটে জোরে একটা লাথি কষাতেই ঘোড়াটা জোরে দৌড় লাগাল, আর ইলিনিকোস ভীড়ের মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার কথা সে ঠিকমত বুঝতে পারল কিনা বুজলাম না। পুরোহিত আমার ঘোড়ার লাগাম ধরে টেনে আরেকটা গলিতে নিয়ে গেলেন, বাকি তিনজনও আমারদের পিছু পিছু ঘোড়া ছুটিয়ে এল।
“কি করছিলে তুমি?” পুরোহিত আবার ধমক লাগালেন আমায়।
“ইলিনিকোস আমার বন্ধু।“ আমি কিছু না বোঝার ভান করে উত্তর দিলাম। “আমি তো শুধু একটু আলাপ করছিলাম।“
“তুমি কি আমাদের উদ্দেশ্যটা জগতের সবাইকে জানিয়ে বেড়াতে চাও নাকি?” পুরোহিত ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। বেটা বিরক্তভাব দেখে বেশ মজাই লাগছে।
“কেন নয়?” আমিও নিস্পাপভঙ্গীতে উত্তর দিলাম “রাজার জন্য কাজ করার সৌভাগ্য কয়জনের হয়? এটা মানুষকে জানাতে হবে না?”
“চুরি করার আগে কি তুমি সবাইকে জানিয়ে চুরি কর? “ বেটার বিরক্তি আরো বেড়ে চলছে। ““হ্যাঁ?” আমিও ভাল মানুষের মত জবাব দিলাম, “এতবড় একটা কাজ করতে যাচ্ছি সেটা মানুষ জানবে না তা কি আর হয়? আমার সুনাম নাইলে ছড়াবে কিভাবে?”
“অবশ্যি, অবশ্যি।“ পুরোহিত এবার হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গি করে সামনের দিকে ফিরলেন। “কিন্তু এখন দয়া করে মুখটা বন্ধ রাখলে আমি খুশি হব।“
“যা আপনার ইচ্ছে।“ আমি মাথা নাড়লাম। শহরের শেষ প্রান্তে এসে পৌছেছি আমরা। হাসিটা চেপে রেখে পুরোহিতকে অনুসরন করায় মন দিলাম আবার।
শহর শেষে গ্রাম শুরু হল। চারপাশে ফসলের মাঠ, মাইলকে মাইল বিস্তৃত- হেপাস্টিয়া পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত। পাহাড়ের ওপারে সাগর, আর তার মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে সেফারিয়া নদী। যদিও নদীটা কাছাকাছি কোথাও হবে, কিন্তু ঘোড়ার পিঠে চড়েও এত উঁচুতে চোখ যায় না। এদিকে এত ক্লান্ত লাগা শুরু করেছে যে আমার পা দুটো ঘোড়ার পিঠে চড়ার পরেও কাপা শুরু করেছে। হঠাতই আমার ঘোড়াটা বেশ জোরে ডেকে উঠল।
“এত শক্ত করে লাগামটা টেনো না।“ আমার পাশের আরোহী বলল।
কখন যে লাগামটা শক্ত করে টেনে ধরেছি নিজেও বুঝি নি। পাশের জনের কথা শুনে লাগামের রাশ আলগা করলাম। এদিকে রাস্তার পাশের ক্ষেতে বড় বড় শশা আর তরমুজ ফলে রয়েছে। সেগুলির দিকে চোখ যেতেই পেটের মধ্যে ক্ষুধাটা আরো চাগিয়ে উঠল। এদিকে মাথার ওপরে সূর্য ক্রমেই চড়া হচ্ছে। এবার মৌসুমী বাতাসও আসতে দেরী করছে মনে হয়। চারপাশ কেমন যেন থমথমে, রাস্তায় ধুলোটাও উড়ছে না। এদিকে রোদে পুড়ে পুড়ে আমার বাদামী চামড়া ঘন কৃষ্ণবর্ন হবার যোগাড়।
জেলে থাকতে একটু সূর্যালোকের জন্য মনটা আঁকুপাঁকু করত সারাক্ষণ। মনে হত একবার বাইরের বাতাস গায়ে মাখার জন্য আমি সবকিছু দিয়ে দিতে পারি। আর এখন মনে হচ্ছে তপ্ত কড়াইতে জ্যান্ত ভাজা হচ্ছি। ময়লা জামা ঘামে গায়ের সাথে লেপ্ট যাচ্ছে। পুরো শরীরটাই কিটকিট করে চুলকাচ্ছে। এদিকে গা থেকে যে পরিমান দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে তাতে আমি নিশ্চিত আমার ঘোড়া্টাও অসহ্য হয়ে গেছে।
বেলা যতই বাড়ছে আমি ক্রমেই দলের পেছনে পড়ে যাচ্ছি। এদিকে ঘুম ঘুমও লাগছে। ঘুম তাড়ানোর জন্য আমার সংগীদের দিকে মনোযোগ দেবার চেস্টা করলাম। সবার সামনে রাজপুরোহিত আগে আগে চলেছেন। আমার ডানে যে যন্ডামতন লোকটা চলেছে তার কোমরে একটা তলোয়ার ঝুলছে। একেই তো পুরোহিত সকালে একবার বলদ আরেকবার পোল বলে ডেকেছিল। বলদ নিশ্চয়ই মানুষের নাম হতে পারে না, তবে মনে হয় এর নাম পোল-ই হবে। পোষাক দেখে মনে হয় লোকটা এক সময় কোন সৈন্যদলে ছিল। দলের বাকি দুজনের বয়স অনেক কম, আমার কাছাকাছি হবে। দুজনেই গাঢ় নীল রংয়ের শার্ট পরা, সেগুলি কোমরে দিকে আবার একটু ফোলানো। দুই ভাই হতে পারে। বড়জনের চুল কালো আর দেখতে শুনতেও বেশ ভাল। আমি নিশ্চিত এই নিয়ে তার গর্বে মাটিতে পা পড়ে না। যেভাবে নাক উঁচিয়ে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলছে যেন আমি কোন মানুষের মধ্যেই পড়ি না। ছোটজন আমার পেছন পেছন চলছে। যতবারই আমি তার দিকে তাকাই, দেখি সে বেটাও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঘটনাটা কি বুঝছি না। যাই হোক এরা দুজনেই বেশ বড়লোকের ছেলে বলে মনে হচ্ছে, এবং অকর্মার ধাড়ি। নাম তো জানি না, কিন্তু একটাকে বড় অর্কমা আরেকটাকে ছোট অকর্মা বলেই আপাতত মনে রাখি।
এদিকে গরমটাও অসহ্য হয়ে উঠেছে, আর ঘোড়ার পিঠে বসে ঝাঁকুনি খেতে খেতে যে কি অবস্থা সেটা নাই বললাম। আর কিছুদূর চলার পরে মনে হল এবার আমি পড়েই যাব ঘোড়ার পিঠ থেকে। আর না পেরে শেষ পর্যন্ত চিৎকার করে উঠলাম, “এই থামুন সবাই। একটু থামুন।“ কিন্তু কে শোনে কার কথা। এদের দেখছি ক্লান্তি ক্ষুধা কোন বোধই নেই। ঠিক আছে, এরা না থামলে কি হয়েছে, আমিই থামি তাইলে।
আস্তে করে এক পা ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে, আরেক পাও ছেড়ে দিলাম। ঘোড়াটারও দেখছি থামার কোন লক্ষন নেই। সুতরাং ধপ করে পপাত ধরনীতল। কোন রকমে উঠে দাঁড়িয়ে, খানিকটা লেংচিয়ে লেংচিয়ে রাস্তার পাশে একটু ছায়া পড়ে এমন জায়গায় গেলাম, আর তার পরেই ধুলাবালিকে থোড়াই কেয়ার করে তার উপরেই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। একন যাই হোক, কিছুই যায় আসে না।
সৈনিক বেটা মনে হয় আমাকে দেখতে পেয়েছে, কারন কিছুক্ষনের মধ্যেই তার গোবদা হাত দিয়ে আমার শার্টের কলার খামচে ধরে তোলার চেস্টা করল। যাক বুদ্ধিটা কাজে দিয়েছে দেখছি। কারন একটু পরেই বাকিরাও ঘোড়া থেকে নেমে আমার পাশে জড়ো হল। আমি চোখ মেলে নাকের সামনে তাদের জুতাগুলির ডগা দেখতে পেলাম। যথেস্ট হয়েছে। আমি উঠার কোনরকম চেস্টা না করেই আবারও চোখ বুজলাম।
“এর আবার কি হল?” ছোট অকর্মার গলা শুনতে পেলাম।
“ধুত। আমরা মেথানা যাবার রাস্তার মাত্র অর্ধেক এসেছি। আজ রাতের আগেই সেখানে পৌছাতে হবে।“ কেঊ একজন জুতোর ডগা দিয়ে আমাকে একবার গুতো মারল। “এদিকে এ দেখি অর্ধেক রাস্তাতেই চিৎপাত। একে এখানেই রেখে চলুন চলা যাক।“
যাও যাও, আমাকে এখানেই ছেড়ে যাও। আর উঠে দাঁড়ানোর মতন শক্তি নাই শরীরে। ভালই হয় যদি এরা আমাকে এখানেই ছেড়ে যায়, আর আমি এই রাস্তার পাশে ধুলোর মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিই। পথের পাশে ভাল একটা মাইলফলক হিসেবেও কাজ হবে। লোকে বলবে একসময়, যদি মেথানার রাস্তা খুঁজতে যাও তাইলে রাস্তার পাশে চোরটাকে পড়ে থাকতে দেখলেই বুঝবে সেখানে যাবার অর্ধেক রাস্তা পার করেছ, যদিও মেথানা কতদূর সেটা আমার জানা নেই ।
কিন্তু কপাল খারাপ, তাদের আমাকে ছেড়ে যাবার কোন মতলবই নেই দেখছি। সুতরাং বাকিরা এখানে থেমে দুপুরের খাবারটা খেয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নিল, আর আমি সেই সময়টা ছায়ার নিচে শুয়ে ঘুমিয়ে পার করলাম।
ঘুমটা বেশ ভালই জমে উঠেছিল, কিন্তু পোলের জুতোর গুতায় সেটা ভেঙ্গে গেল। ঘুম ভেঙ্গে কিছুক্ষনের জন্য কোথায় আছি তা ঠাহর করতে বেশ কস্টই হল। একবারের জন্য মনে হল যেন আমি বাড়িতে আমার নিজের বিছানাতেই শুয়ে আছি। জেলে থাকার সময়ও এরকম কয়েকবার হয়েছে। নিজের অজন্তেই হাতের শিকলটা বোধ করার জন্য কব্জির ওপরে হাত বোলালাম। কিন্তু কোন শিকল নেই। উঠে বসে চোখ ডলে দেখি বেলা প্রায় পড়ে এসেছে। তবে ঘুমটা ভাল কাজ দিয়েছে। পেটটা ক্ষুধায় চোঁ চো করলেও মাথাটা এখন বেশ পরিস্কার লাগছে। আমি আবারও শুয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম, কিন্তু পোল এক হাতেই আমাকে তুলে ধরে ঘোড়ার ওপরে বসিয়ে দিল। আবার সেই বিরক্তিকর যাত্রা শুরু। তবে এবার পুরোহিত ঘোড়ায় ওঠার আগে হাতে একটুকরো রুটি আর পনির ধরিয়ে দিলেন। আমি একহাতে লাগাম ধরে, আরেক হাত দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। ঘোড়ায় চড়াটা দেখছি পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে একটা কাজ। এরা এর চেয়ে একটা ঠেলাগাড়ি আনলেও বেশ আরামে যাওয়া যেত।
শেষ পর্যন্ত যখন মেথানাতে পৌছলাম তখক্ষনে সূর্য ডুবে গিয়েছে। মেথানা আসলে ছোট একটা শহর, অল্প কিছু বাড়িঘর আর ঘোড়ার আস্তাবল ছাড়া তেমন কিছুই দেখলাম না শহরের মধ্যে। কিন্তু আমরা সেখানেও থামলাম না। রাত হয়ে গিয়েছে। মাথার ওপরে একফালি চাঁদ ছাড়া আর কোন আলো নেই চারপাশে। তবে রাতের বাতাসটা বেশ ঠান্ডা, সকালের গা পোড়ানো রৌদ্রের চেয়ে। শেষ পর্যন্ত পুরোহিত সৈনিক পোলকে ঘোড়া থামাতে বললেন। বাকিরা নামল না কেউ। পোলকে আমার ওপর চোখ রাখতে বলে বাকিদের নিয়ে শহরের ভেতরে গেলেন পুরোহিত।
দুপুরের ঘুমটা ভাল হলেও রাতের ঠান্ডা বাতাসে বেশ আরাম লাগা শুরু হয়েছে এবার। একটু একটু ঘুম ঘুমও পাচ্ছে। কিছুক্ষন পরে পুরোহিত বাকিদের নিয়ে ফেরত এলেন এবং আমাকে ঘোড়া থেকে নামতে নির্দেশ দিলেন। আমার আলাদা করে নামার দরকার ছিল না, ঘুমে এমনিতেই ঢুলে পড়ে যাচ্ছিলাম। পোল এসে পাশ থেকে আমাকে ধরল, আর এক ঝটকায় ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে নিল, যেন আমি কিছুই না। অবশ্য পোল এর পাশে আমি কিছুই না। আমার মাথা বড়জোর তার কাধ পর্যন্ত পৌছাবে। বয়সের তুলনায় আমি বরাবরই ছোটখাট এবং শুকনো। এজন্য মাঝে মাঝে অনেকে আমাকে গুরুত্বই দিতে চায় না। সেজন্য কখনো কখনো রাগও লাগে মাঝে মাঝে। এবারেও খানিকটা রাগ হচ্ছিল, কিন্তু পোল সেটা পাত্তাই দিল না।
সরাইখানার মালিকের কাছে পুরোহিত নিজেকে এক ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিলেন। মনে হয় আগেই লোক পাঠিয়ে সব ব্যবস্থা ঠিক করে রাখা ছিল। কারন মালিক পুরোহিতকে দেখে খুশিই হলেন এবং সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন। কিন্তু মালিকের স্ত্রী আমাকে দেখেই নাক কুচকালেন।
“এই ছেলেটা,” তিনি ডান হাত দিয়ে নাক চেপে ধরে বাম হাতটা এমনভাবে আমার দিকে নাড়লেন যেন আমি কোন একটা ছাড়পোকা বা আরশোলা। “এ কোনমতেই আমার বাড়ির ভেতরে থাকতে পারবে না।“ পেছনে দাঁড়ানো তার স্বামী জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
“আরে বাদ দাও।“
“না,” তার স্ত্রী কোনভাবেই মানতে রাজী নন, “কোনভাবেই নয়। এ যদি জমিদারের নিজের ছেলেও হয় তবুও এই ময়লার স্তুপকে আমার ঘরে থাকতে দেয়া যাবে না। বাইরের গোয়ালে এর থাকার ব্যবস্থা করছি।“
অপমানে আমার চোখ মুখ লাল হবার যোগাড়। কোনমতে নিজেকে সামলাম। নাহ, এখন রাগলে চলবে না। খুব বুঝে শুনে পা ফেলতে হবে। সৌভাগ্যক্রমে রাজপুরোহিত মালিকের স্ত্রীর কথায় পাত্তাই দিলেন না। তিনি দৃঢভাবে জানালেন যে, আমিও তাঁর দলেরই একজন, সুতরাং আমাকে বাইরের গোয়ালে রাখা যাবে না। তবে বিছানার বদলে আমার জন্য মেঝেতে শোবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তিনি মালিকে আমার জন্য অতিরিক্ত একটা রৌপ্যমুদ্রা দিলেন এবং বললেন যে আমাকে দ্রুতই গোসল করিয়ে ভদ্র মানুষ বানানো হবে। মালিকের স্ত্রী অনিচ্ছাসত্তেও রাজি হলেন এবং বাহিরে কলের দিকে দেখিয়ে দিলেন। পোল একরকম টেনেই আমাকে কলের দিকে নিয়ে গেল।
কলটা উঠোনের পেছনে। একদিকে গোয়াল, আরেকদিকে আস্তাবল, বাকি দিক খোলা। মোটেও গোসল করার জন্য উপযুক্ত কোন স্থান নয়। কলের কাছে যেতেই পোল আমার জামা ধরে টান দিল। আমি প্রতিবাদ করতেই এমন জোরে টান দিল যে জামাটাই ছিঁড়ে তার হাতে চলে এল। এরপরে তার লক্ষ্য আমার পাজামা। নাহ, অনেক হয়েছে। এবার কিছু বলতেই হয়। আমি হাত তুলে পোলকে থামিয়ে দিলাম।
“এই কাজ,” আমি কলের দিকে তাকালাম, “আমি নিজেই করতে পারব। জেলে অনেকদিন ছিলাম বলে তো আর গোসল কিভাবে করতে হয় সেটা ভুলি নি।“
পোল চোখদুটো একটু সরু করে আমার দিকে তাকাল, মনে হয় ঠিক বিশ্বাস করতে পারে নি কথাটা। বেটাকে কিভাবে বোঝাই যে বাড়িতে এর চেয়ে অনেক আলিশানভাবে আমার জন্য গোসলের ব্যবস্থা আছে। আমি তাকে পাত্তা না দিয়ে কলের মুখ ছেড়ে দিলাম। ঠান্ডা পানি ছিটকে আমার গায়ে এসে পড়ল। সাবধানে ভিজে না যায় এমনভাবে জুতোদুটো খুলে রাখলাম। পায়ে মোজা নেই, সুতরাং এর পরে পাজামা। ঠান্ডা পানি আমার নগ্ন পায়ের ওপর পড়াতেই শীতে দাঁত কনকন করে উঠল।
গোসল করতে করতেই দেখি ছোট অকর্মা আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার কাপড়গুলি সাবধানে পানি পড়ে না এমন জায়গায় সরিয়ে রাখল। বাহ, বেশ তো। তাইলে একে যতটা অকর্মা ভেবেছিলাম ততটা অকর্মন্য নয় দেখছি।
“এর জন্য কিছু শুকনো কাপড় নিয়ে এসো।“ পোল ছোট অকর্মাকে নির্দেশ দিল। নতুন কাপড়? বাহ, ভাগ্যটা ভালই মনে হচ্ছে তাইলে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ছোট অকর্মা কিছু শুকনো কাপড় আর একটুকরো সাবান নিয়ে হাজির। সাবানটা হাতে নিতেই দেখি সেটা দিয়ে পুরোহিতের গায়ের সুগন্ধীর মতন গন্ধ বের হচ্ছে। বাহ, মনে হয় ছোট অকর্মা এটা পুরোহিতের মালপত্র থেকে মেরে দিয়েছে। ভাল, ভাল। আমি ভাল করে সাবান ঘসে পুরু করে ফেনা তুললাম। পায়ের নিচে পানির রং কয়লার চেয়েও কালো, যেন গায়ের হাজার বছরের ময়লা ধুয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। এতক্ষনে নিজেকে একটু সভ্য মানুষ মনে হচ্ছে।
ছোট অকর্মা দেখি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার গোসল করা দেখছে। কি ভাবছে আমার সম্পর্কে কে জানে। লোহার হাতকড়া পরতে পরতে হাতের কব্জিতে বড় বড় ফোসকা পড়ে গিয়েছে, সারাগায়ে ছাড়পোকার কামড়ের বড় বড় দাগ। কিছু কিছু পেকে পুজ হয়ে গিয়েছে, তবে কব্জির ফোসকাগুলির অবস্থা বেশি খারাপ। চুলের সাবানের ফেনা ভাল করে পরিস্কার করে কলের নিচে বসে পড়লাম কব্জির ফোসকাগুলির কোন ব্যবস্থা করা যায় নাকি সেটা দেখতে। ফোসকাগুলির বেশিরভাগই পুঁজে ভর্তি। কলের নিচে হাত পেতে বসলাম, যদি পুজগুলি একটু ধুয়ে ফেলা যায় এই আশায়। রাতের বাতাস বেশ ঠান্ডা, আর আমার সারা গা ভিজে। ঠান্ডা পানির ধারা চামড়ার ওপরে আবার পড়তেই কাঁপতে শুরু করলাম।
আমাকে কাপতে দেখে পোল এগিয়ে এল। মোমবাতির টিমটিমে আলোতে ফোসকাগুলি দেখল আরেকবার। “ছেড়ে দাও এবার।“ সে বলল, “ভেতরে গিয়ে ওগুলি পরিস্কার করার ব্যবস্থা করছি।“ এই বলে আমার দিকে একটা শুকনো গামছা আর কাপড় ছুড়ে মারল। আমি কোনরকমে গা মুছে কাপড়গুলি পরে নিলাম। জুতোর খোজ করতেই দেখি ছোট অকর্মা পুরোনো সব কাপড় নিয়ে কোথা যেন যাচ্ছে।
“এই,” আমি ডাকলাম তাকে। আমার ডাক শুনে ছোট অকর্মা ফিরে তাকাল। “কোথায় যাচ্ছ আমার পুরোন কাপড় নিয়ে?” দ্রুত পায়ে ছোট অকর্মার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“রাজপুরোহিত বলেছেন এগুলি সব পুড়িয়ে ফেলতে।“ছোট অকর্মা উত্তর দিল।
ভাল বুদ্ধি। “আচ্ছা,” আমি বললাম, “ঠিক আছে। কিন্তু আমার জুতোজোড়া রেখে যাও।“
ছোট অকর্মা হাতের ময়লা কাপড়গুলির দিকে তাকিয়ে নাক কুচকাল, কিন্তু বেশি ঝামেলা করল না আর। “ঠিক আছে। কিন্তু এব্যপারে রাজপুরোহিতকে বুঝিয়ে বলার দায়িত্ব তোমার।“
“বেশ, বেশ।“ আমি জুতোজোড়া এক প্রকার ছিনিয়েই নিলাম বলা যায় তার হাত থেকে। এতো জানে না যে এই জুতোজোড়া বিষেশভাবে বানানো। বিশেষ করে তলাটা। শক্ত কাঠের বদলে এতে নরম চামড়ার সুকতলা লাগিয়েছি আমি। হাটলে যেন কোন শব্দ না হয়। এ জুতো আমি হাজার মুদ্রার বিনিময়েও দিতে রাজি নই। জুতো নিয়ে দ্রুত বাকি কাপড়চোপড় পরে নিলাম। শার্ট ও পাজামা দুটোই নরম সুতির। পাজামাটা একটু ঢোলা হয় কোমরে, কিন্ত সমস্যা নেই, কোমরবন্ধনী আছে এর সাথে একটা। শার্টটাও খানিকটা বড় হয়েছে। কাপড়চোপড়ের বেলায় আমি সব সময়ই একটু খুঁতখুঁতে। তবুও এতদিন পরে পরিস্কার কাপড় গায়ে দিয়ে কি যে ভাল লাগছে তা কথায় বলে বুঝানো যাবে না।
“দেবতাদের আশির্বাদ সর্বদা রাজপুরোহিতের সাথে থাকুক। তিনি সবকিছু ভালভাবেই ভেবে বের হয়েছেন তাই না?” একটু হেসে পোলের দিকে তাকালাম। কিন্তু পোল কোন উত্তর না দিয়ে ভেতরের দিকে যাবার ইংগিত করল।
সরাইখানার ভেতরের একটা কক্ষে পুরোহিত এবং দুই অকর্মা আমার জন্যই মনে হয় অপেক্ষা করছিল। আমাকে বসতে বলে পোল একটা ছুরি, পরিস্কার কাপড় আর বাটিতে কিছুটা ঔষধি মলম নিয়ে ফেরত এল। প্রথমে সে আমার ডান হাতের ক্ষতটা ভাল করে ধুয়ে, ঔষধ লাগিয়ে কাপড় দিয়ে বেধে দিল। এর পরে কিছু বোঝার আগেই সে আমার হাত চেপে ধরে ছুরির আগাটা বাম কব্জির একটা ফোসকার মধ্যে বসিয়ে দিল। অনিচ্ছাসত্তেও একটা আর্তচিৎকার আমার গলা চিরে বের হয়ে এল। এমনকি পুরোহিত আর দুই অকর্মা আমার চিৎকার শুনে খাওয়া ফেলে আমার দিকে তাকাল। হলুদ পুঁজ হাত বেয়ে পড়ছে। ছোট অকর্মা কোনমতে ঢোক গিলে আবার খাওয়াতে মনোযোগ দিল। কিন্তু এ তো সবে শুরু। পোল নির্মমভাবে একের পর এক ফোসকার ওপর ছুরি চালিয়ে যেতে থাকল, আর আমিও শরীরের যত শক্তি আছে তা দিয়ে চিৎকার করে যেতেই লাগলাম। শেষে বিরক্ত হয়ে পোল একটা দড়ি বের করে আনল ঔষধের পোটলা থেকে।
“আর যদি একবার চিৎকার কর, তাইলে মুখ বেঁধে ফেলে রাখব এখানে।“
নাহ, বহুত হয়েছে। এত মাস লোহার শিকলে বাঁধা অবস্থায় কাটানোর পরে এখন মুখ বাঁধা অবস্থায় রাতটা পার করার কোন ইচ্ছেই নেই আর। তাছাড়া ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। মুখ বাধা থাকলে খাবই বা কিভাবে? আমি দড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে মুখ বন্ধ করলাম। বাকি সময়টা যন্ত্রণাটা কোনরকমে গিলে পার করলাম। যতক্ষনে পোল সবগুলি ফোসকা থেকে পুঁজ বের করার পর ঔষধ লাগিয়ে ভাল করে বেঁধে দিল, আমার দুগাল বেয়ে অশ্রুর ধারা নেমেছে। অবশেষে ছাড়া পেয়ে চোখ মুছে খাবারের দিকে মনোযোগ দিলাম।
খেতে খেতে খেয়াল করলাম বড় অকর্মা দেখি আমার দিকেই কেমন করে তাকিয়ে আছে। “যতটা শক্তপোক্ত ভেবেছিলাম তোমায়, ততটা নও দেখছি।“ ফিচেল একটা হাসি ছুড়ে দিল সে আমার দিকে। গা জ্বলে যাবার উপক্রম হল আমার।
“ আমার দিকে না তাকিয়ে নিজের চরকায় তেল দাও।“ পাত্তা না দিয়ে খাবার খাওয়াতে মন দিলাম আবার। কথা শুনে পোল আমার পেটে কনুই দিয়ে একটা গুতো মারল। সাবধান বানী এটা। কিন্তু আমি থোড়াই কেয়ার করি। তবে খাবারটা ভাল হওয়াতে বিরক্তিটা অনেকটাও কমে এল। বাকিরা পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে, কিন্তু আমার মাথায় সেসব কিছুই আর ঢুকছে না। খেতে খেতে শুধু এটাই খেয়াল করলাম যে পুরোহিত বড় অর্কমাকে অ্যামোয়ডিস আর ছোটটাকে সোফোস নামে ডাকছেন। এরা ভাই নয় বরং দুজনেই রাজপুরোহিতের ছাত্র। আমি বাকি কথা আর না শুনে খাবারের থালার ওপরেই ঘুমে ঢলে পড়লাম।
চলবে।

Sk sagor, Rasel islam, Raihan khan, Badol hasan, Saiful Osman, Sumon khan, Abir nill and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 4
স্বর্ণমুদ্রা : 144
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-05
View user profile

দ্য কুইনস থিফ অনুবাদ  Empty Re: দ্য কুইনস থিফ অনুবাদ

Sat Jun 05, 2021 11:29 pm
অধ্যায়= ৩
---
প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ের লিংক কমেন্টে দেয়া আছে।

এই অধ্যায়টা আমার অনেক প্রিয় কারন লেখিকা এখানে প্রধান চরিত্রের আসল পরিচয় সম্পর্কে অনেকগুলো ক্লু রেখেছেন, দেখি ধরতে পারেন কিনা। মূল বইটা অনেক মজার, জানি না সেই হিউমারটা কতখানি তুলে আনতে পেরেছি। এতদূর পর্যন্ত কেমন লাগছে এবং বাকি ৯টা অধ্যায় অনুবাদ করব কিনা জানাবেন।
-----
পরদিন সকালে নিজেকে আবিস্কার করলাম সরাইখানার উপরের তলার একটা কক্ষে। পাশেই একটা খাটে পোল নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। মনে হয় কাল রাতে এই আমাকে এখানে বয়ে নিয়ে এসেছে। কি করব বুঝতে না পেরে কিছুক্ষন পোলের আরাম করে ঘুমানো দেখলাম। হিংসেই হল কিছুটা। আমি কিনা এখানে মেঝেতে শুয়ে আছি আর বেটা নরম বিছানায় আরাম করে নাক ডাকছে। অবশ্য এটা ঠিক যে শত হলেও একরাত আগে যে শোবার ব্যবস্থা ছিল আমার জন্য তার সাথে তুলনা করলে আজকের অবস্থাকে রাজকীয়ই বলা যায়। পাথরের মেঝের বদলে কাঠের মেঝে, পিঠের নীচে একটা তোষক আর গায়ের ওপরে একটা কম্বল- খুব বেশি অভিযোগ করাটা ঠিক হবে না এখন।
উঠে বসে অবাধ্য চুলগুলোকে চোখের ওপরে সরিয়ে দিলাম। সাধারনত আমি চুল একটু লম্বাই রাখি। কিন্তু জেলে থাকতে থাকতে চুলগুলি আমার পছন্দের চেয়েও বেশি লম্বা হয়ে গিয়েছে। তার ওপরে ময়লা। গতকালকে গোসল করাতে চিটচিটে ভাবটা কিছুটা কেটেছে বটে, কিন্তু পরিস্কার নয়। সাধারনত আমি ঘাড়ের ওপরে একটা ছোট বেনী করে রাখতে পছন্দ করি, তাতে নাকি আমার চেহারায় একটা অভিজাত ভাব আসে। কিন্তু চুল বাঁধার ফিতেটা কোথায় যে হারিয়ে গেছে কে জানে। এদিকে যদি পোলের কাছে চুল কাটবার জন্য ছুরি চাই তাইলে তো বেটা দিবেই না, উল্টে নিজেই বসে যাবে আমার চুল কাটার জন্য। না বাবা, চুল কেটে কাজ নেই। অবশ্য লম্বা চুলের কিছু সুবিধাও আছে। চুরি করা ছোট ছোট জিনিস বেনীর ভাজে লুকিয়ে রাখা যায়। কোনমতে চুলের মাঝে আঙ্গুল চালিয়ে ঠিকঠাক করার ব্যর্থ চেস্টা করলাম, এর পরে ছেড়ে দিলাম। অনেক জট পড়ে গেছে। এখন একটু প্রাতকৃত্য সারতে যাওয়া দরকার। উঠে দাঁড়ানোর চেস্টা করতে দেখি, আমার ডান পাটা একটা লোহার বেড়ি দিয়ে খাটের সাথে বাঁধা। তবে বেড়ির মাঝে একটা শার্ট দেয়া যেন পায়ের চামড়ায় আঘাত না লাগে। কোন বেচারার শার্টের এমন করুন দশা হয়েছে কে জানে? নির্ঘাত পোলেরই হবে। এ বেটা অন্যদের মত নিজের চেহারা নিয়ে অত মাথা ঘামায় না।
পোল ঘুম থেকে উঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। শেষ পর্যন্ত বেড়িমুক্ত হয়ে কলের কাছে যেতেই দেখি রাজপুরোহিত আর তাঁর দুই ছাত্র ইতিমধ্যে গোসলের জায়গা দখল করে বসে আছে। আমাকে দেখেই বড়জন নাক কুচকাল, যেন আমি ইচ্ছে করে তাদের সাবান খরচ করতে এসেছি। গোসল করার ইচ্ছেটাই উবে গেল।
“কাল রাতেই গোসল করেছি।“ রাজপুরোহিতের দিকে তাকিয়ে বললাম, “দেখুন, এই যে- সব ময়লা ধুয়ে ফেলেছি।“ হাতদুটো উঁচু করে ঠিক পুরোহিতমশাইয়ের চোখের সামনে নাড়ালাম যেন ভাল করে দেখতে পায়। “এখন আর গোসলের দরকার নেই।“
পুরোহিত দাড়ি কামানো ছেড়ে আমার দিকেই এগিয়ে এলেন। কিছু বোঝার আগে খপ করে হাতদুটো ধরে আলোর দিকে ধরলেন। দেখি আঙ্গুলের ফাঁকে ফাঁকে এখনো পুরু ময়লার স্তর জমে আছে। “এই হল তোমার পরিস্কার?” হাত ছেড়ে দিয়ে যেন বিজয়ীর হাসি হাসলেন একটু। “নাও আবার গোসল কর।“
পোল যেন এই মূহূর্তেরই অপেক্ষায় ছিল। পেছন থেকে খপ করে এসে আমার ঘাড় চেপে ধরল, তারপরে টেনে কলের দিকে নিয়ে যাওয়া শুরু করল। “আমি নিজেই গোসল করে নিতে পারর।“ আমি মৃদু প্রতিবাদ জানানোর চেস্টা করলাম। কিন্তু বলা বাহুল্য যে তাতে কোনই ফল হল না।
পোল একটা পরিস্কার কাপড় সাবান পানিতে ভিজিয়ে এত জোরে জোরে আমার মুখে ঘসা শুরু করল যে ব্যথায় চিৎকার করে উঠলাম। তাতে ফল আরও খারাপ হল। সাবান পানির অনেকটাই আমার পেটে চলে যাবার উপক্রম। দেব নাকি বেটা পায়ের উপর জুতো দিয়ে একটা পাড়া? কিংবা হাঁটুর পেছনে জোরসে একটা ল্যাং? পিছল মাটির ওপরে বেটা নিশ্চিত আর তাল সামলাতে পারবে না। নাহ থাক, সব সময় সব ক্ষমতা প্রদর্শন করাটা ঠিক নয়। আর এখন তো নয়ই। আগে আমার কাজটা হয়ে যাক, তারপর দেখা যাবে। এখন আপাতত সবাই যেমন বলদ ভাবছে, তেমনটাই থাকা যাক।
গোসল শেষ হতে পোল আমার দিকে একটা তোয়ালে এগিয়ে দিল। জামাকাপড় ছাড়ার সময়টাও দেয়নি এবার। কোন রকমে গা আর চুল ভালভাবে মুছে নিলাম। কিন্তু জামাকাপড় যেমন ভিজে তেমনই রইল। সর্দি না লাগিয়ে দেখছি এরা ছাড়বে না।
‘আমার পাজামাটাই ভিজিয়ে ফেলেছ।“ সরাইখানার ভেতরে ঢুকে শুকনো কাপড় খোজ করলাম। নাহ একটাও নেই। কোমরবন্ধনীটাও ভিজে একাকার। পোল কোনই উত্তর দিল না, কিন্তু চেহারা দেখে বুঝছি আমার অবস্থা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। কি আর করা, এখন এই ভিজে কাপড়েই থাকতে হবে আর কি। কোন রকমে গায়ের পানি ঝরিয়ে নিচে নেমে এলাম। পুরোহিত আর দুই অকর্মা আমাকে ফেলে রেখেই খেতে বসে গিয়েছে। আমিও তাদের পাত্তা না দিয়ে টেবিলের এক কোনায় বসে পড়লাম।
একবাটি ওটমিল খাওয়া শেষ করে চুলের জটগুলোর মাঝে আঙ্গুল চালিয়ে কোন রকম ঠিকঠাক করার চেস্টা করলাম। কয়েক গোছা ছিড়ে হাতে চলে এল, তবে শেষ পর্যন্ত কোন রকমে ঘাড়ের ওপরে একটা বেনী বাধা গেল সেগুলি দিয়ে। এবার বেনীর শেষ মাথা কি দিয়ে গিঁট দেব ভাবছি, তখন দেখি সরাইখানার এক পরিচারিকা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি ইঙ্গিত করতেই সে বুঝে গেল কি চাচ্ছি, আর কিছুক্ষনের মধ্যেই একটুকরো ফিতে নিয়ে ফেরত এল। ফিতে দিয়ে বেনীটা বেঁধে বাকিদের দিকে ফিরতেই দেখি বড় অকর্মা আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে। আজব তো। আমি আবার কি করলাম? যাই হোক সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আরেক বাটি ওটমিল খাওয়াতে মন দিলাম।
কিছুক্ষন পরে সুন্দরী মেয়েটা আরও খাবার নিয়ে ফেরত এল। যাবার পথে বড় অকর্মার দিকে একটা ঘৃনাভরা দৃষ্টি হেনে বেরিয়ে গেল। হুম এবার বুঝতে পারছি ঘটনাটা কি। এই মেয়ের আমার প্রতি আলাদা মনোযোগ দেয়াটা বাবুর পছন্দ হয়নি।
“মেয়েটা কিন্তু বেশ ভালই।“ আমি বললাম। উত্তরে অ্যামোয়ডিস আর তার গুরু রাজপুরোহিত দুজনের কাছ থেকেই কড়া ধমক খেলাম। যাক ব্যাপারটা তাইলে অন্যদের নজর এড়ায়নি। মনে হচ্ছে পুরোহিতমশাই তাঁর ছাত্রদের নিয়ে বেশি খোঁচাখুঁচি পছন্দ করেন না।
“এবং বেশ সুন্দরী।“ আমি সেসবে পাত্তা না দিয়ে দ্বিতীয় বাটিটাও শেষ করায় মনোযোগ দিলাম। খাবারটা বেশ ভাল খেতে না হলেও ভেতরে মধু আর মাখন দেয়াতে বেশ চলে যায়। একবাটি দইও ছিল টেবিলে, সেটাও খেয়ে নিলাম। কিন্তু ক্ষুধাটা যে কিছুতেই মিটছে না। ছোট অকর্মা, সোফোসের বাটিতে কিছু দই বাকি ছিল। সবার চোখের অগোচরে সেটুকুও যে কখন পেটের ভেতরে চালান করে দিলাম বেচারা টেরই পেল না শুধু অ্যামোয়ডিস আমার দিকে চেয়ে একটু ফিচেল হাসি হাসল, কিন্তু কেউই পুরোহিতমশাইকে জানানোর সাহস করল না। পুরোহিতের থালায় তিনটে কমলা ছিল, সেটার দিকে হাত বাড়াতেই দেখে তিনি আমার দিকে কটমট করে চেয়ে আছেন।
“আমার ক্ষুধা লেগেছে।“ তাঁকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই দুটো কমলা শার্টের পকেটে চালান করে দিলাম। তৃতীয়টা মাত্র ছোলা ছাড়াতে আরম্ভ করেছি এমন সময় সরাইখানার মালিকের স্ত্রী এলেন। সবাইকে ফেলে আমার দিকেই তাঁর দৃষ্টি স্থির হল। গতকালের চেয়ে তাঁর মুখের ভাব অনেকটাই নরম হয়ে গিয়েছে। আমিও আমার সেরা নিস্পাপ হাসিটা দেবার চেস্টা করলাম।
“এবার তো পরিস্কার লাগছে আমায় তাই না?”
“তাই তো দেখছি।“ তিনিও হেসে ফেললেন, “তা তুমি এত ময়লা লাগালে কোথা থেকে?”
“জেলখানায়।“
সাথে সাথে তাঁর মুখের হাসিটা এক মূহূর্তের জন্য ম্লান হয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষন পরেই নিজেকে সামলে নিলেন। “ইদানিং অনেকেই রাজার সৈন্যরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তবে তোমার সৌভাগ্য যে সেখান থেকে বের হতে পেরেছ।“
“জি, আর এখানের খাবারটাও খুব ভাল।“
তিনি আরেকবার আমার দিকে তাকিয়ে হেসে পুরোহিতের দিকে ফিরলেন, “আপনাদের দুপুরের খাবারটা সাথে দিয়ে দেব?”
“ধন্যবাদ, দুপুরের খাবারটা আমরা এলভিসাতে পৌঁছে খেয়ে নেব।“ পুরোহিত উত্তর দিলেন, মুখে কোন হাসি নেই তাঁর।
বাকিরা যোগাড়যন্ত্র করতে লেগে গেল, আর আমি এবং পুরোহিত চুপচাপ টেবিলে বসে রইলাম। কিছুক্ষন পরে পোল এসে খবর দিল যে সব তৈরি। এবার এটা দেখে খুশি হলাম যে, ঘোড়ায় ওঠার জন্য আমার জন্য একটা কাঠের পাটাতনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঊঠার সময়ে এবার সোফস ঘোড়ার লাগামটা ধরে রইল যাতে ঘোড়াটা যেন আগেই দৌড় না দেয়।
“এবার আবার গতকালের মত পিছলে পড়ে যেও না।“ সে হেসে বলল, “নাইলে কিন্তু ঘোড় তোমাকে ফেলেই চলে যাবে।“
“যেতেই পারে।“ আমি উত্তর দিলাম। ঘোড়া নামক প্রানীটার প্রতি আমার মোটেও বিশ্বাস নেই।
আমরা রওয়ানা দেবার উদ্যেগ নিতে নিতে, সরাইখানার মালিকের স্ত্রী আমার দিকে এগিয়ে এলেন, হাতে কাপড়ে জড়ানো একটা পোটলা।
“এখানে কিছু খাবার আছে তোমার জন্য। এলভিসা যাবার পথে খেয়ে নিও।“ আমার হাতে পোটলাটা দিয়ে বললেন। আমি একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাতেই, তিনি মৃদু হাসলেন। “আসলে আমার ছোট ছেলেটাও অনেকদিন ধরে জেলে। কোন খবর পাই নি এখনো।“ কাপড়ের কোনা দিয়ে চোখ মুছলেন তিনি।
“ওহ,” কি বলে তাঁকে সান্তনা দেব বুঝতে পারছিলাম না। তবে কথাটা শুনে অবাক হইনি তেমন। কর সংগ্রাহককে সম্ভবত যথেস্ট ঘুষ দেয়নি এরা , তাই মিথ্যে কোন অভিযোগে ফাসিয়ে দিয়েছে। “চিন্তা করবেন না।“ কিছুক্ষনের জন্য ভুলে গেলাম আমি আসলে এখানে কি করতে এসেছি, এবং তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। “যতটা ভাবছেন জেলের ভেতরটা অতটাও খারাপ না।“ আমার হাসি দেখে তাঁর মুখটা একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল কিছুক্ষনের জন্য।
“আসলে এটা একটা ডাহা মিথ্যা।“ বিড়বিড় করে বললাম যেন মহিলা শুনতে না পায়। সরাইখানা থেকে বের হয়ে আবার পথ চলা শুরু হল। দুপাশে জলপাই গাছের সারি। সরাইখানাটা চোখের আড়াল হতেই পুরোহিত তাঁর ঘোড়া ছুটিয়ে আমার কাছে আসলেন। কোন কিছু না বলেই মাথার ওপরে একটা চাঁটি মেরে খাবারের পোটলাটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন।
“এই,” রেগে চিৎকার করে উঠলাম, “ওটা আমার জন্য ছিল।“
“সরাইখানার মালিকের বউয়ের সাথে ঢলাঢলি করার শাস্তি এটা।“
“আমি মোটেও ঢলাঢলি করিনি।“ মাথার পেছনে হাত বুলোতে বুলোতে উত্তর দিলাম। বেটার হাতের আংটির বাড়িতে বেশ বড়সড় একটা আলু গজিয়ে উঠছে সেখানে। “ আমি তো ভদ্রভাবেই তার সাথে কথা বলেছি।“
পুরোহিত আবার মারার জন্য হাত তুলেলন, কিন্তু আমি সময়মত নাগালের বাইরে সরে গেলাম। “তোমার ভদ্রতা তোমার নিজের কাছেই রাখ,ছেলে।“ সূর্যের তাপে বেটার মেজাজটা বোধহয় বেশ তেতে উঠেছে। “এখন থেকে যেখানেই যাব, দয়া করে মুখটা বন্ধ রাখবে। বুঝেছ?”
‘বুঝলাম।“ মাথা নাড়লাম, “এখন তো খাবারটা ফেরত দিন।“
না, খাবারটা আর ফেরত এল না। পুরোহিত জানালেন এটা পরে খাওয়া যাবে। আমি থুম মেরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বাকিদের অনুসরন করতে লাগলাম। মেজাজ ঠান্ডা করার জন্য চারপাশের দৃশ্য দেখায় মনোযোগ দেবার চেস্টা করলাম, কিন্তু তাতে ফল হল উল্টা। পথের পাশে ফলে থাকা রসালো আঙুর আর আতা দেখে পেটের মধ্যে ক্ষিদেটা আরও চাগিয়ে উঠল। কিছুক্ষন পরে আর সহ্য করতে না পেরে পুরোহিতকে বলেই ফেললাম যে আমার খিদে লেগেছে।
কিন্তু তিনি মোটেও পাত্তা দিলেন না, আমিও আমার ঘোড়ার পিঠে বসে রাগে গজরাতে গজরাতে চললাম। এদিকে বসে থাকতে থাকতে ঘাড়টাও ব্যথা করছে। পকেট থেকে একটা কমলা বের করে সেটাই খাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। এতদিন শহরের মধ্যে থেকে থেকে নিজেকে কেমন অপরিচিত মনে হচ্ছিল। এখন পাহাড়ী পথ একবার উঁচুতে উঠে আবার নিচুতে নেমে যাচ্ছে পাহাড়ের কিনারা ধরে। চারপাশের ফসলের ক্ষেতগুলিও ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। আর সামনে যতদূর দেখা যায় শুধু মেঘে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া। একবার মনে হল যেন আবার বাড়ির পথে ফিরে যাচ্ছি। যদিও বাড়ির কাছাকাছিও নেই আমরা। জানি না রাজা মহারাজারা কিভাবে নিজ নিজ রাজ্যের সীমানা মনে রাখে।
হঠাতই পাশ থেকে সোফসের গলা শুনে ঘোর কেটে গেল। “তাহলে ঐ জায়গাটা তেমন খারাপ নয় বলছ?”
“কোন জায়গা?” দৃশ্য দেখা বাদ দিয়ে এবার ছোট অকর্মার দিকে মনোযোগ দিলাম।
“জেলখানা?”
ও, সরাইখানার মালকিনের সাথে কথাবার্তা এ শুনে ফেলেছে তাইলে। এবার একবার ভাল করে সোফোসের দিকে লক্ষ্য করলাম। দামী কাপড়ে মোড়ানো শরীর, ঘোড়াটাও বেশ দামী মনে হচ্ছে। বাইরের জগত সম্পর্কে এর কোন ধারনাই নেই দেখছি। বেচারার জন্য একটু মায়াই হল।
“না,” সত্য কথাটাই বলা যায় একে, “ আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে বাজে জায়গা এই জেলখানা।“
“ওহ,” সোফোস একটু করুনার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল, যেন আমার জীবনে একের পর এক বাজে অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নেই। এরপরেই সে ঘোড়া ছুটিয়ে আমার পাশ থেকে সরে গেল। মনে হয় সত্যিটা সহ্য করতে পারে নি বেচারা।
পোল পেছনই আছে আমার, সব সময় যেমন থাকে। এদিকে পুরোহিত তার ছাত্রদের পড়া ধরা শুরু করে দিয়েছেন। সোফোসকে তিনি ইউক্যালিপ্টাস গাছের শ্রেনীবিন্যাস জিজ্ঞাসা করছেন। বেচারা শুধু এটায় ফল ধরে কি ধরে না সেটুকুই উত্তর দিতে পারল। বাকিটা কি বলল সেটা শুনতে পেলাম না, কিন্তু পুরোহিতের চেহারা দেখে মনে হল সে সঠিক উত্তর দিয়েছে। অ্যামোয়ডিস জলপাই গাছের সম্পর্কিত কিছু একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে থতমত খাচ্ছে, আর পুরোহিতের চেহারাটাও হচ্ছে দেখার মত। অ্যামোয়ডিস ঘোড়া ছুটিয়ে তার গুরুর কাছ থেকে একটু দূরে সরে গেল। তার মানে মাথার ওপর চাঁটি শুধু আমার একার জন্যই বরাদ্দ নয় মনে হচ্ছে। সোফোস একই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয়াতে অ্যামোয়ডিস তার দিকে কটমট করে তাকাল। মানে দুই অকর্মার মধ্যেকার সম্পর্ক যতটা ভাল ভেবেছিলা আসলে ততটা নয় দেখছি। তবে সোফোস মনে হল অ্যামোয়ডিসের জন্য একটু খারাপই বোধ করছে।
“সোফোস ভালই পড়াশুনো করছে।“ পুরোহিত অ্যামোয়ডিসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এবার বল তো এই শ্রেনীবিন্যাস জানা আমাদের দরকার কেন?”
“আমার এ ব্যাপারে কোন আগ্রহই নেই, পুরোহিতমশাই।“ অ্যামোয়ডিস নিরাসক্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল।
“তবুও বলার চেস্টা তো করে দেখ।“
“এখানে কি ধরনের গাছ লাগালে ভাল হবে সেটা জানার জন্য।“ অ্যামোয়ডিস চেস্টা করল।
“আর কিছু?”
অ্যামোয়ডিসের কাছে আর কিছুই বলার নেই। বেচারার অবস্থা দেখে আমার হাসিও পাচ্ছে আবার দুঃখও লাগছে কিছুটা।
“তুমি যদি ঠিকঠাক মত গাছগুলি চিনতে পার, তাইলে বুঝতে পারবে কোন ফলটা খাওয়ার উপযুক্ত আর কোনটা নয়। সোফোস চেস্টা করল তাকে সাহায্য করার।
“জলপাই গাছে তো জলপাই ছাড়া আর কি হবে?” অ্যামোয়ডিস একটু রেগেমেগেই উত্তর দিল। আমি পেছনে ফিরে সোফোসের চেহারাটার অবস্থা দেখা চেস্টা করলাম। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। অপমানে বেচারার চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে।
“ঠিক তাই,” পুরোহিতও ছাড়ার পাত্র নন, “কিন্তু তুমি আগে জলপাই গাছটা ঠিকমত চিনে দেখাও।“
এবার অ্যামোয়ডিসের লজ্জা পাবার পালা। সাথে চেহারায় বিরক্তি ছাপ। হুম, এ তো দেখছি বেশ ঝামেলার মাল। যাক সেটা নিয়ে এখন আর চিন্তা না করলেও চলবে। যেতে যেতে পুরোহিত তাদের ডুমুর গাছের শ্রেনীবিন্যাস জিজ্ঞেস করতে থাকলেন। আমি অবশ্য ততক্ষনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। এর চেয়ে আরেকটা কমলা খাওয়া যাক।
এলভিসা যাবার আগেই আমার অবস্থা খারাপ হবার যোগার। আর থাকতে না পেরে পুরোহিতকে জানালাম যে আমার খিদে লেগেছে। অনিচ্ছাসত্তেও শেষ পর্যন্ত খাবারের পোটলাটা ফেরত দিলেন তিনি, কিন্ত এক শর্তে যে সব খাবার বাকি দুই অকর্মার সাথে ভাগ করে নিতে হবে। যদিও আমি প্রতিবাদ করে উঠলাম যে খাবার ভাগ করে নেবার মতন কোন অবস্থাই নেই আমার, কিন্তু বাকিরা সেটা অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নিল। শেষ পর্যন্ত অ্যামোয়ডিস তার ভাগেরটুকু আমাকে দিয়ে দিল, কিন্ত এমন তাচ্ছিল্যভরা ভঙ্গীতে কাজটা করল যে মেজাজটাই গরম হবার উপক্রম।
এলভিসা পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেল। এজন্য পুরোহিত আমাকেই দায়ী করলেন। আমি নাকি ভাল করে ঘোড়ায় চড়তে পারি না, এই জন্য দেরী হয়েছে। কিছু না বলে অপমানটা হজম করে নিলাম।
এলভিসাতে কোন সরাইখানা নেই, তাই গাছের নীচেই খেতে বসে গেলাম। একজন শক্তপোক্ত চেহারার মহিলা আমাদের খাবার দিয়ে গেল- শুকনা রুটি আর শক্ত পনির। অ্যামোয়ডিস এবং সোফোস দুজনেই খাবার দেখে নাক কুচকাল, কিন্তু আমি সবই সাবাড় করে তারপর ঊঠলাম। জেলে আর রাস্তায় থাকতে গেলে এত বাছবিচার করলে চলে না।
“বলেছিলাম না ওদের খিদে নেই।“ পুরোহিতকে বাকি দুজনের খাবার ভর্তি থালা দেখিয়ে বললাম। “আপনি শুধু শুধু আমাকে মাংসটা খেতে দিলেন না।“
পুরোহিত আমার কথায় তেমন খুশি হলেন না মনে হল। ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকালেন। “এত খেলে পেট খারাপ হবে।“ এই বলে হাত থেকে জলপাই ভর্তি বাটিটা টেনে নিয়ে গেলেন। তবে টেনে নেবার আগে কয়েকটা জলপাই শার্টের পকেটে চালান করে দিলাম। তবে একদিক দিয়ে বেটা ঠিক কথা বলেছে। আর খেলে পেটটা এবার বিদ্রোহ ঘোষনা করবে। সুতরাং হাত ধুয়ে সটান ঘাসের ওপরেই শুয়ে পড়লাম। খাওয়া শেষ। এবার একটা জম্পেশ ঘুম দেয়া যাক। কিন্তু পোলের জুতোর গুতোয় ঘুমের বারটা বেজে গেল।
“উঠে পড়।“
“আরে বিরক্ত করো না তো।“
“যদি নিজে না উঠ, তাইলে ঘাড় ধরে টেনে উঠাব কিন্তু।“ এটা এবার সাবধানবানী। নাহ, আর থাকা গেল না। মনে মনে পোলকে হাজারটা অভিশাপ দিয়ে শেষ পর্যন্ত উঠেই পড়লাম। কোনরকমে কয়েক পা সামনে গিয়ে একটা টেবিলে উপরে শুয়ে পড়লাম। কিছুদূরে ঘোড়া নিয়ে অ্যামোয়ডিসকে দাঁড়ানো দেখে ডাকলাম, “এই, ঘোড়াগুলি এদিকে নিয়ে এসো তো। আমি এখন টেবিল নিয়ে ওদিকে যেতে পারব না।“
অবশ্যই অ্যামোয়ডিস আমার মত একটা ছিঁচকে চোরের হুকুম মানতে যাবে না, এটা ভাল করেই বুঝেছি। এর মত মানুষেরা শুধু তার চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালীদের হুকুমই তামিল করে, এবং দুর্বলদের ওপর হুকুম চালাতে পছন্দ করে। এর চোখে আমি সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তরেই পড়ি। অ্যামোয়ডিস নড়ল না তার জায়গা থেকে, আমিও আমার জায়গায় অটল রইলাম। আমি যে নিজেকে এতটা দুর্বল মনে করি না সেটা এর জানা দরকার। পুরোহিত বা পোলের মত লোকেরা আমার ওপর হুকুম চালাতে পারে, কিন্তু অ্যামোয়ডিসের মত নাক উঁচু মানুষেরা নয়।
পুরোহিত এবং পোল একবার আমাদের দিকে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। পুরো ব্যাপারটা আমাদের উপরেই ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। অ্যামোয়ডিস ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও নড়ল না জায়গা থেকে। আবার এটাও বুঝতে পারছে যে আমার কথা না শুনলে বাকিরাও তাকে কোন সাহায্য করতে আসবে না। আর সে যদি আমার সাথে ঝগড়া করতে চায় তাইলে আমিও ছেড়ে দিয়ে কথা বলব না। শেষ পর্যন্ত সোফোস এগিয়ে এল। ঘোড়ার লাগাম ধরে আমার হাতে দিয়ে হাসল, “এবার তো উঠ ঘোড়ায়। দেরী হয়ে যাচ্ছে যে।“
অ্যামোয়ডিসকে এই ঘটনায় বেশি খুশি হল না মনে হল। সে কটমট করে একবার সোফোসের দিকে তাকাল, যদিও এবেলা সোফোসই তার ইজ্জত বাঁচিয়েছে। শহর থেকে বের হবার পথে পুরোহিতকে বললাম, “আপনারা একটা ঠেলাগাড়ি আনলেই তো পারতেন।“
‘ঠেলাগাড়ি?” পুরোহিতকে একটু বিভ্রান্ত দেখাল।
“হ্যাঁ।“ আমি ভাল মানুষের মত উত্তর দিলাম, “চার চাকার কাঠের গাড়ী, যা ঘোড়া দিয়ে টানা যায়।“
“কেন?”
“তাইলে আমি এতক্ষন পেছনে বসে ঘুমুতে পারতাম।“
“তোমার আরামের কথা ভেবে তো আর এই যাত্রা শুরু করি নি।“ পুরোহিত এবার রেগেমেগেই উত্তর দিলেন।
“অবশ্যই।“ আমি একটু হেসে আবার চলা শুরু করলাম।
---
সারাদিন চলার পরে পাহাড়ের পাদদেশে এসে পৌছলাম না আমরা। শেষ পর্যন্ত পুরোহিত আমার অগ্রগতি দেখে হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গী করে এগিয়ে এলেন। “তা ঘোড়াটা আরেকটু জোরে ছোটানো যায় না?” আমাকে বললেন তিনি।

“পথের মধ্যে পড়ে যাবার সম্ভাবনাও তাহলে অনেক বেড়ে যাবে।“ আমিও যে বিরক্ত ঘোড়ায় চড়তে চড়তে সেটা কিভাবে বোঝাই এদের।
“তোমাকে তো শিখতেই হবে। এভাবে চললে জীবনেও জায়গামত পৌছানো যাবে না।“ পুরোহিতও দেখছি হাল ছাড়ার পাত্র নন। তিনি অ্যামোয়ডিসকে ডেকে আমাকে ঘোড়ায় চড়া শেখাতে বললেন। কিন্তু অ্যামোয়ডিস গুরুর কথা মান্য করার কোন লক্ষনই দেখাল না।
“কপালটা ভাল বলতে হবে তোমার।“ পোল টিপ্পনী কাটল পেছন থেকে। এই প্রথম একে কারো নির্দেশ ছাড়াই কথা বলতে শুনলাম। বাধ্য হয়ে পুরোহিতমশাই সোফোসকে ডাকলেন, এবং সে খুশি মনেই আমাকে শেখাতে শুরু করল। কিন্তু কিছুক্ষন পরেই বুঝতে পারলাম সোফোসের দশাও আমারই মত। সুতরাং পুরোহিতমশাই দুজনকেই শেখাতে শুরু করলেন। একসময় তিনি বলেই উঠলেন, “কপাল খারাপ যে সোফোসের বদলে অ্যামোয়ডিসকে ডিউক হবার জন্য ফেরত পাঠাতে পারব না।“
“সোফোস ডিউক হতে যাচ্ছে নাকি?” এবার আমার অবাক হবার পালা। কখনো কোন ডিউকদের উত্তরাধিকারী্কে এভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখি নি।
“যদি সোফোস শেষ পর্যন্ত জীবিত থাকে তবেই তো।“ এবার অ্যামোয়ডিস উত্তর দিল।
---
ঘোড়ায় চড়া শিখতে আমরা দুজন পেছনে পড়লাম, আর পুরোহিত সামনে এগিয়ে চললেন। এর মধ্যে এবার অ্যামোয়ডিস পাশে এসে সোফোসের কানে ফিসফিস করে বলল, “সত্যি বলতে কি, তোমাদের ঘোড়ায় চড়া দেখে, গাধার পিঠে আলুর বস্তার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।“ সোফোসের চোখমুখ লাল হয়ে উঠল । আমি কটমট করে তাকাতেই সে সামনে এগিয়ে পুরোহিতের সাথে যোগ দিল। পুরোহিতও তাকে বাগে পেয়ে এবার আরেকটা গাছের শ্রেনীবিন্যাস জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন।
এদিকে পোল সোফোসকে ঘোড়ার পিঠে সৈনিকের বসার ভঙ্গী শেখানো শুরু করেছে। দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে কিভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা যায় সেটাই এখনকার প্রধান পাঠ। সোফোস একবার ভুল করতেই হাত দিয়ে সে তার মাথার পেছনে একটা চাটি দিল। সেটা দেখে হঠাতই বাবার কথা মনে পড়ে গেল। বাবাও এভাবে ভুল করলে আমার মাথায় থাবড়া দিতেন। অবশ্য সেটা হাত দিয়ে নয়, তলোয়ারের পেছন দিক দিয়ে।
পোলের মনোযোগ শুধু সোফোস নয়, আমার দিকেও আছে। সুতরাং তার কথামত ঘোড়ায় চড়ার বিভিন্ন কৌশল অনুসরন করতে করতে দিন শেষে মনে হল যেন মাথার সব ঘিলু গলে কান দিয়ে বের হয়ে যাওয়াটাই শুধু বাকি আছে আর। সুতরাং সেই রাতে আবারো খাবার টেবিলেই মড়ার মত ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে উঠে আগের মতই আবিস্কার করলাম খাটের সাথে পা বাঁধা অবস্থায়। কিন্তু আজকে পোল আগেই উঠে পড়েছে, সুতরাং অপেক্ষা করতে হল না বেশিক্ষন। বাকি সবাইও উঠে পড়েছে। শুধু সোফোস ছাড়া। পাশে একটা বিছানায় এমনভাবে ঘুমুচ্ছে যেন আঠা দিয়ে কেউ এর চোখ দুটো জুড়ে দিয়েছে একসাথে। পোল অবশ্য এসবের তোয়াক্কা না করে একটা ঝাঁকুনিতে বেচারার ঘুমের বারটা বাজিয়ে দিল।
অবশেষে ঠান্ডা পানিতে পুরোহিতের গোলাপের গন্ধযুক্ত সাবান দিয়ে গোসল করে জেলখানার সব ময়লামুক্ত হলাম। আজকের নাস্তাটা বেশ ভাল- ওটমিল আর দই। সবাই খাবার টেবিলে জড়ো হতেই পুরোহিত প্রশ্ন করলেন, “সকালে তোমাদের কক্ষে এত গন্ডগোল কিসের ছিল?”
অ্যামোয়ডিস আড়চোখে সোফোসের দিকে তাকাল, আর লজ্জায় বেচারার চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। পোল খাবারসুদ্ধ চামচটা সোফোসের মুখের সামনে নাড়তে নাড়তে বলল, “এই যে, ইনি। কানের পাশে কামান দাগলেও এর ঘুম ভাঙ্গবে না। একে উঠাতেই এত গন্ডগোল।“
সোফোস যেন লজ্জায় টেবিলের তলায় লুকাতে পারলে বাঁচে।
‘হুম,” পুরোহিত সোফোসের দিকে দৃস্টি না দিয়েই বললেন, “একজন সৈনিকের ঘুম অবশ্যই পাতলা হওয়া উচিত। সর্বদা সতর্ক থাকা সৈনিকোচিত গুনের একটি।“
“সৈনিক কে হতে চায়?” সোফোস বিড়বিড় করে উত্তর দিল।
“আমি চাই না।“ হঠাত আমি বলে উঠলাম। বাকি সবাই খাওয়া ফেলে আমার দিকে ফিরে তাকাল।
“তোমাকে কে জিজ্ঞেস করেছে?” অ্যামোয়ডিস ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকাল।
“তোমার বন্ধুই তো করছে, বয়রা।“ আমিও খাবারসুদ্ধ চামচটা সোফোসের দিকে নেড়ে উত্তর দিলাম। অ্যামোয়ডিস একবার হাত দিয়ে নিজের মাথায় বাড়ি মারল।
“তোর মত আস্তাকুড়ের ময়লা কি সৈনিক হবার ব্যাপারে কি জানে?” অ্যামোয়ডিস এত সহজে আজকে আমাকে ছেড়ে দিচ্ছে না।
“আমাকে আর একবারও আস্তাকুড়ের ময়লা বলবে না।“ যথেস্ট হয়েছে। আজকে আমিও আর ছেড়ে কথা বলছি না। “আমার বাবা একজন সৈনিক। কিন্তু অহেতুক মানুষ হত্যা ছাড়া আর কি আছে এই কাজে? না আছে কোন সম্মান, না একটু কৃতজ্ঞতা কারো কাছ থেকে। শুধু যারা বোকা তারাই একাজ করার স্বপ্ন দেখে। বুঝেছ?“ যদিও আমার বাবা সম্পর্কে এতটা খারাপ ধারনা পোষন করি না, তবে তার পেশা সম্পর্কে আমার মনের ভাব কখোনোই ভাল ছিল না। তবে এতগুলি ব্যক্তিগত কথা এখানে না বলাটাই বোধ হয় ভাল ছিল। কখনো কখনো নিজেই বুঝতে পারি না যে নিজের মুখের লাগাম কখন নিজেই আলগা করে ফেলি।
সবাই ঘুরে পোলের দিকে তাকাল, কিন্তু আমার কথায় সে কিছু মনে করেছে বলে মনে হল না। শুধু পুরোহিত আমাকে ভবিষতে কথার ওপরে কথা বলতে বারন করে দিলেন। বাকি সময়টা নীরবে খাওয়া শেষ করলাম। পুরোহিত খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। “এবার রওয়ানা করা সময় হয়েছে।“ আমাকে উঠতে না দেখে মাথার পেছনে আবার চাটি মারলেন।
“কথাটা কি আমাকে বলা হল?” মাথা ডলতে ডলতে জিজ্ঞেস করলাম।
পুরোহিত চোখ সরু করে আমাকে কিছুক্ষন দেখলেন, তারপরে বললেন, “আমার কাছে ঘোড়া পেটানোর একটা চাবুক আছে। আবার যদি কোন বদমায়শি কর, তাইলে কিন্তু তোমার পিঠেই পড়বে ওটা।“ তার গলার স্বরে সতর্কতার সুর। নাহ, এখন চাবুকের বাড়ি খাবার কোন ইচ্ছেই নেই আর।
‘চলুন, তাইলে।“ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাডালাম।
--
যেতে যেতে পোলের কথা ভাবলাম। সোফোস এবং অ্যামোয়ডিস দুজনেই একে বেশ সম্মান করে। তার মানে এ কোন সাধারন সৈনিক নয়। পুরোহিতও এর কথার বেশ গুরুত্ব দেয়। অবশ্য আমার ক্ষেত্রে। চাবুকটা যদি পিঠে পড়ে তাহলে এর হাতেই পড়ার সম্ভাবনা বেশি।
চলতে চলতে বুঝতে পারলাম পুরোহিত বেটা কেন একটা ঠেলাগাড়ি আনে নি। পাহাড়ি রাস্তা ক্রমেই উঁচু আর সরু হচ্ছে। যতই উপরে উঠছি ঘোড়াগুলিও ক্রমশ হাপিয়ে উঠছে। প্রধান সড়ক পার হতেই রাস্তা দুভাগে ভাগ হয়ে গেল। পুর্বদিকেরটা গিয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে, পশ্চিম দিকেরটা সোজা গিয়ে উঠেছে হেপাস্টিয়া পর্বতের গায়ে। আমরা পশ্চিম দিকের রাস্তা ধরেই চলা আরম্ভ করলাম। যতই যাচ্ছি মানব বসতি আর সভ্যতার চিহ্ন ক্রমেই কমে আসছে। এপথে খুব বেশি লোক চলাচল নেই বললেই চলে। এদিকে ঘোড়ার জিনের ঘসায় দুই উরুর মাঝখানের চামড়া বলে আর কিছু নেই। আর ঝাঁকুনি খেতে খেতে আমার অবস্থা খারাপ। কখন যে পড়ে যাই সেটাই ভয় পাচ্ছি।
“আচ্ছা এবার তো একটু কিছু খেয়ে নেয়া যাক?”
আমার কথায় কেউ কান না দিয়ে চলতেই লাগল। তবে অল্প কিছুক্ষন পরে একটা সমতল জায়গায় পৌছে পুরোহিত সবাইকে থামতে নির্দেশ দিলেন। আমি ঘোড়া থেকে নামলাম, কিন্তু ঘোড়াটা আমার পেছনে মূর্তির মত দাড়িয়ে রইল।
“বালের ঘোড়াটা আমার পেছন কেন ছাড়ছে না?” রাগের চোটে ঘোড়ার লাগাম ধরে টাল দিলাম জোরে। পুরোহিত এবার জোরে হেসে উঠলেন। “লাগামটা আস্তে টানো, তাইলে ও পেছনে যাবে।“
আমার দশা দেখে সোফোস পাশে এসে দাঁড়াল। “এরা মালবাহী ঘোড়া। এদের সর্বদা আরোহীর পাশে পাশে থাকার প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছে।“ আস্তে করে সে বলল।
“ও” আমি লাগামটা ছাড়তেই ঘোড়াটা বাকিদের সাথে গিয়ে দাড়াল, আর আমি অবাক হয়ে দেখলাম। ‘বেশ বুদ্ধি আছে জন্তুগুলোর দেখছি।“
“তোমার চেয়ে বেশি।“ অ্যামোয়ডিস কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পাই নি।
‘তাই,” আমি একটা ভ্রু বাকিয়ে তাকালাম তার দিকে, “এদের কেউই কিন্ত প্রাসাদ থেকে মহারাজের রাজকীয় সিলমোহর চুরি করতে পারে নি।“
অ্যামোয়ডিসের মুখটা দেখতে হল যেন জোকের মুখে চুন ছেড়ে দেবার মতন। “তোমার জিভটা যে কেন খসে পড়ে না।“ গজগজ করতে করতে সে যাওয়া শুরু করল। “এই জিভের কারনেই তো এত দিন জেলের খাবার খাওয়া লেগেছে তোমার।“
আমি একটু হাসলাম। রাজকীয় সিলমোহর চুরি এবং সেটা নিয়ে মদের দোকানে বলে বেড়ানো, পুরোটাই ছিল একটা পরিকল্পনার অংশ সে কথা না হয় তাকে নাই বললাম আর।
বাকিদের সাথে বসে পনির, জলপাই আর শুকনো রুটি খেয়ে ঘাসের ওপরে শুয়ে পড়লাম। বাকিটুকু পুরোহিত অন্যন্য মালপত্রের সাথে গুছিয়ে রাখা শুরু করলেন।
“যথেস্ট খাবার নেই এখানে।“ আমি অলসভাবে মন্তব্য করলাম। পুরোহিত কটমট করে আমার দিকে তাকালেন, “রাতে কোন এক জায়গা থেকে খেয়ে নেয়া যাবে।“
“আমি সেটা বলছি না।“ মৃদু হাসলাম আমি, ঘুমে চোখ বুজে আসছে। “অ্যামোয়ডিসের ভাগের খাবারটা আমাকে দিলেই হবে।“
“তোমার মত তুচ্ছ মানুষের জন্য বাকিরা তো আর না খেয়ে থাকবে না।“ পুরোহিত রাগান্বিত স্বরে বললেন।
“হুম,” চোখ না খুলেই উত্তর দিলাম আমি, “কিন্তু এই অভিযানে আমার ভূমিকাই সবার চেয়ে গুরুত্বপূর্ন সেকথা কি অস্বীকার করতে পারবেন?”
কোন উত্তর এল না আর ওদিক থেকে। আমিও পাহাড়ি বাতাসে বুকভরে নিঃশ্বাস নিয়ে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম।

চলবে

Sk sagor, Sk imran, Rasel islam, Raihan khan, Badol hasan, Saiful Osman, Sumon khan and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 4
স্বর্ণমুদ্রা : 144
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-05
View user profile

দ্য কুইনস থিফ অনুবাদ  Empty Re: দ্য কুইনস থিফ অনুবাদ

Sat Jun 05, 2021 11:29 pm
অধ্যায়= ৪
---
আগের অধ্যায়গুলির লিংক কমেন্টে দেয়া আছে।
প্রথমেই বলে রাখি এটা একটা হার্ডকোর রাজনৈতিক ফ্যান্টাসি সিরিজ, যদিও প্রথম বইটাতে সে ব্যাপারটা খুব কমই উঠে এসেছে। তবে এই অধ্যায়ে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কিছু আভাস পাওয়া যায়। রাজ্যগুলির অবস্থান বোঝার জন্য এবার ম্যাপ যোগ করে দিলাম সাথে।
---
সারারাত এবং দিন এবং পরে বিকালে আমরা বিশ্রাম নেবার জন্য অবশেষে থামলাম। যদিও রাজপুরোহিতের থামার কোন ইচ্ছেই ছিল না, কিন্তু আমার অবস্থা দেখে বোধহয় তাঁর একটু মায়াই হল। আর বেশিক্ষন চললে আমি নির্ঘাত পিছলে পড়ে পথের পাশে অতল খাদে তলিয়ে যেতাম। হাড়গোড়ও খুঁজে পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ। থামতেই ঘোড়া থেকে নেমে ঘাসের ওপরে সটান শুয়ে পড়লাম, আর ওদিকে অ্যামোয়ডিস সোফোসকে রান্না করার জন্য আগুন জ্বালাতে সাহায্য করতে লাগল। তবে সে যতটা না কাজ করে তার চেয়ে কথাই বেশি বলে চলেছে। এদিকে আগুনের ধোঁয়ায় সোফোসের নাকের পানি চোখের পানি এক হবার দশা।
“তা কালকে রাতে কি শিকার করলে?” অ্যামোয়ডিস আগুনে আরো দুটো কাঠ গুঁজে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, “একাই গেলে নাকি? বেশ সাহস হয়েছে তো তোমার আজকাল।“
“একা নয়।“ বিব্রতভাবে সোফোস উত্তর দিল, “পোলও ছিল আমার সাথে।“
অ্যামোয়ডিস অবাক হবার ভান সোফোসের দিকে তাকাল, এদিকে বেচারা বিব্রতভাব কাটাতে কি করবে বুঝতে না পেরে আগুনে আরও দুটো কাঠ গুঁজে দিল। আসলে অ্যামোয়ডিস সোফোসকে খোঁচা মারার জন্যই যে একাজ করছে সেটা বুঝতে আমার বাকি নেই।
“আজকে অন্তত আগুনটা তো নিজে জ্বালানো শিখলে।“ টিপ্পনী কাটল সে, “এতগুলি কাঠ আগুনে দিও না। তাইলে আগুন নিভে যাবে। একটু নিজের কাজ নিজে করা শেখো, বুঝলে? বাঁচতে হলে অনেক কিছুই জানা লাগে।“ এরপরে সোফোসকে দেখানোর জন্যই কিনা কে জানে, বাড়তি কাঠগুলো আগুন থেকে টেনে বের করে, কিছুক্ষন ফুঁ দিল বাঁশের চোঙা দিয়ে আর আগুনটা আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
“বুঝলাম”, সোফোস মৃদু স্বরে বলল, এরপরে সরে গিয়ে পোলকে রান্নার সব কিছু বুঝিয়ে দিল। রান্না হতে হতে আমি শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা গোনায় মনোযোগ দিলাম। অনেকদিন পরে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে মনের যত মান অভিমান কিছু সময়ের জন্য যেন ভুলে গেলাম। কিছুক্ষন পরে অ্যামোয়ডিসের জুতোর গুঁতোয় ঘোর ভাঙল। “এই আস্তাকুড়ের আবর্জনা, এবার উঠে পড়ুন। খাবার তৈরি।“
বিন্দুমাত্র বিরক্তির ভাব না দেখিয়ে, উঠে বসে আড়ামোড়া ভাঙলাম। এরপরে হাসিমুখে অ্যামোয়ডিসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “হে জ্ঞানের জাহাজ, তা আপনি কি ডুমুর আর জলপাই গাছ চিনতে পেরেছেন এতদিনে?”
অপমানে বেচারার চোখমুখ লাল হয়ে উঠল, আর আমিও শান্তিমত রাতের খাবারটা পেটে চালান করলাম।

খাওয়াদাওয়া শেষ হতে এই প্রথমবার পুরোহিত আমার জন্য আলাদা বিছানার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন বলে মনে হল। সুতরাং রাতের শোবার জন্য একটা আলাদা তোষক পেলাম, আর গায়ে দেবার জন্য পুরোহিতের একটা পুরোনো আলখাল্লা। পুরোনো হলেও জিনিসটা দামী। ভেতরটা গাঢ় নীল বর্নের উলের আস্তরণে মোড়া, বাহিরটা উজ্জ্বল সোনালী। উলের ওপর হাত বোলাতেই বুঝলাম বেশ যত্ন করেই তৈরি জিনিসটা। মাথা তুলে তাকাতেই দেখি পুরোহিত সরু চোখে আমাকে লক্ষ্য করছেন। কি ভাবছেন কে জানে? হয়ত ভাবছেন এমন দামী জিনিস জীবনে স্পর্শ করতে পেরেছি সেটাই আমার যেন অনেক সৌভাগ্য। তা যা ভাবে ভাবুক গে, শুয়ে পড়াটাই এখন সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষের কাজ হবে। আলখাল্লাটা গায়ে জড়িয়ে আরাম করে শুয়ে পড়লাম।

পরের দিন দুপুরে একটা ছোট সরাইখানায় পৌছলাম। এটাই আমাদের যাত্রাপথের শেষ মানব বসতি। আমাদের দেখেই উস্কোখুস্কো চুলের একজন লোক বেড়িয়ে এল। “ভেবেছিলাম আপনারা আরও আগেই এসে পৌছাবেন এখানে।“ আমাদের মালপত্রগুলো নিতে নিতে লোকটা বলল। পুরোহিত আড়চোখে আমার দিকে তাকালেন, এর পর একটু কাষ্ঠহাসি হাসলেন লোকটার দিকে চেয়ে, “না, পথে কিছু অসুবিধায় পড়েছিলাম সেকারনেই একটু দেরী।“ যাক, এবার সোজাসুজি আমার ঘাড়ে দোষ চাপায় নি রক্ষা।
“আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করা আছে তো?” পুরোহিত জিজ্ঞেস করলেন লোকটাকে।
‘জি,” লোকটা মাথা নেড়ে সায় দিল, “দুই সপ্তাহের মত খাবার এবং নতুন ঘোড়ার ব্যবস্থা করেছি জনাব।“
পুরোহিতকে সন্তুষ্ট দেখাল, আর সরাইখানার মালিক আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। একটা বড় কক্ষে আমাদের সবার রাতে থাকার ব্যবস্থা করা হল।
“কাল থেকে আমরা পাহাড়ে ওঠা শুরু করব।“ পুরোহিত ঘোষনা করলেন। “আর তুমি,” একটু মুচকি হেসে আমার দিকে তাকালেন, “ আজ রাতে যত ইচ্ছে খেয়ে নাও। কাল থেকে যতটুকু ভাগে পড়বে ঠিক ততটুকুই খেতে পাবে, বুঝেছ?” আমি মাথা নাড়লাম। তিন আমার অন্য দিনের মত মজবুত করে পায়ের বেড়িটা খাটের পায়ার সাথে বেঁধে পোলকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন। আমি কিছুক্ষন অসহায়ের মত পায়ে জড়ানো লোহার শিকলটার দিকে চেয়ে রইলাম। এ থেকে কবে যে মুক্তি মিলবে কে জানে? শিকলের ঘষায় ঘসায় গোড়ালিতে কড়া পড়ে গেছে। হয়ত সারাজীবন এই দাগ বয়ে বেড়াতে হবে।
কক্ষটা বেশ ঠান্ডা, আর দক্ষিনা বাতাসও বইছে। রোদটাও বেশ পড়ে এসেছে। বসে থাকতে থাকতে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। এক পাশে সোফোস এবং অ্যামোয়ডিস কাঠের তলোয়ার নিয়ে অস্ত্রবিদ্যা অনুশীলন করছে। তাদের দেখতে দেখতে একবারের জন্য বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল। আচ্ছা, বাবা কি খুব চিন্তা করছেন আমার জন্য? ঘর ছাড়ার আগে একবার বলেও বের হইনি। বাড়ির আর সবাই বা কেমন আছে? আর বোনটি? সে কি আমার জন্য খুব বেশই চিন্তা করছে? আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টেরও পেলাম না।
সারারাত মরার মতন ঘুমিয়ে কাটালাম। ভোরে সোফোসের ডাকে ঘুম ভাঙল। সকালের খাবার তৈরি। বেশি কিছু নয়- থিকথিকে জঘন্য দেখতে ওটমিল, পুরাতন দই, কিছু শুকনো রুটি আর পনির। সাথে কিছু জলপাই আর খুবই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি কমলা। আমি খাবার নাক কুঁচকাতেই বাড়াতেই পুরোহিত হেসে উঠলেন, “খেয়ে নাও যত পার, বাছাধন। এর পরে কিন্তু আর খাবার জুটবে না।“
এরপরে আর কোন কথা চলে না। কোন প্রতিবাদ না করে যা আছে তাই মুখে পুরে নিলাম। খেতে খেতে পুরোহিত আমাকে মুখ হাঁ করে শব্দ করে খাবার চিবাতে মানা করলেন, কিন্তু তাতে ফল আরও বিপরীত হল। ঐসব ভদ্র মানুষের মত খেতে গিয়ে মুখটা আরও বেশি হাঁ হয়ে গেল, ঠোটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল দুফোটা লালা। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজের খাবারের দিকে মন দিলেন। পোল হাতের ক্ষতগুলি একবার দেখে নিল। বেশ শুকিয়ে এসেছে ওগুলো। সুতরাং বাঁধন খুলে এবার ক্ষতগুলি উম্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিল।
আমি আড়চোখে ক্ষতগুলির অবস্থা দেখে নিলাম। পুঁজ আর নেই, চারপাশের লালভাবটাও কমে এসেছে। কপাল ভাল যে জেলে থাকতে বড় কোন অসুখে পড়ি নি। আমার স্বাস্থ্য বরাবরই খারাপ। অল্পকিছুতেই আমি প্রায়ই অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ি, এজন্য বাড়িতে থাকতে সবাই দিনরাত চিন্তিত থাকে। এবার কোন বড় ধরনের অসুখ ছাড়াই কিভাবে জেলের মধ্যকার জঘন্য পরিবেশে বেঁচে রইলাম কে জানে। পুরোহিত অবশ্য আমাকে দিকে কখনোই ভারী জিনিস বহন করান নি। বাকিদের ওপরে সেই ভার ছেড়ে হাত পা একটু খেলিয়ে নিলাম, পাহাড়ে উঠার জন্য যথেষ্ট শক্তি বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
এতদিন আমরা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলছিলাম, এবার সত্যিকারের পাহাড় শুরু। সারি সারি পাহাড়ের গর্বিত চূড়া মেঘ ভেদ করে উঠে গিয়েছে উপরে যেন সূর্যকে ছোবার আশায়, এখানে সেখানে পাথরের চাই মৃত মানুষের খুলির মত দাঁত বের করে হাসছে। যেন বলছে সাহস থাকলে কাছে এসে দেখোই না। কিছুকিছু জায়গায় মার্বেল পাথরের চেয়েও মসৃন পাহাড়ের গা, সাবধানে পা না ফেললে মৃত্যু নিশ্চিত। পাহাড়ের ওপারের আছে পাহাড়কন্যা ইড্ডিস, ছোট্ট এক পাহাড়ী রাজ্য। এই পাহাড়ের সারি হাজার বছর ধরে সযত্নে পাহারা দিয়ে রেখেছে ছোট্ট দেশটিকে। খুব কম মানুষই সাহস করে এই পাহাড় পাড়ি দিয়ে সেই রাজ্যে ঢুকতে পেরেছে আজ পর্যন্ত। পাহাড়ের গায়ে জায়গায় জায়গায় পানি প্রবাহের দাগ। কোন পাহাড়ী ঝরা শুকিয়ে গিয়েছে হয়ত এখানে, আর মানুষেরাও ত্যাগ করেছে এই স্থান। যতদূর চোখ যায় জনমানবের কোন চিহ্নই নেই আর। আমি নিশ্চিত না কোথায় এসে পড়েছি, কিন্তু চারপাশ দেখে মনে হচ্ছে ইড্ডিসের সীমানায় সেপারিয়া মালভূমির মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা এখন।
ভাবতে ভাবতে কখন পাহাড়ী রাস্তার কিনারে চলে গিয়েছিলাম খেয়াল করি নি। পুরোহিতের ডাকে সম্বিত ফিরল। আমরা এখন দুই পাহাড়ের মাঝে শুকিয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদীর পথ ধরে চলেছি। পথটা খুবই সরু কোনমতে একজন মানুষ যেতে পারে। এখন যদিও পানির কোন চিহ্নই নেই কিন্তু বর্ষা আসলে এই পথের আর হদিস থাকবে না। চারপাশে চুনাপাথরের চাই বের হয়ে আছে, গা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে। আর যেখানেই পানি, সেখানে জায়গায় জায়গায় বুনো জলপাই গাছ শিকড় গেড়েছে। এছাড়া শক্ত পাথুরে দেয়ালে জীবনের কোন চিহ্নই নেই।
পথটা জায়গায় জায়গায় অপ্রত্যাশিত বাঁক নিয়েছে- কখনো শুকনে ঝোড়া, কখনো বা ছোট পাহাড়ী গুহার মুখ। তবে পথ যতটা ভেবেছিলাম ততটা দূর্গম নয়। হাত রাখার মত ছোট ছোট খাঁজ অনায়াসেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। বাকিদের চোখেমুখে ইতিমধ্যে বেশ কষ্টের ছাপ পড়লেও, আমার পাতলা চামড়ার জুতোর বদৌলতে চলতে কোন সমস্যা হচ্ছে না।
ঘন্টাখানেক পরে দম নেবার জন্য থামলাম সবাই। এটা নিশ্চিত যে পুরোহিত আমাদের সুনিস রাজ্য পার করে পাহাড় পাড়ি দিয়ে ইড্ডিসের পথে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করেছেন। কিন্তু কেন? জিজ্ঞেস করার আগেই অ্যামোয়ডিস আমার মনের কথাটা বলে ফেলল।
“কোথায় আছি এখন আমরা, পুরোহিতমশাই?”
‘ইড্ডিসের পথে। সম্ভবত ইড্ডিসের সীমানায় ঢুকে পড়েছি আমরা।“
“কেন?”
প্রশ্ন শুনে আমার চোখ কপালে ওঠার যোগাড়। তাহলে পুরোহিত তার গোটা পরিকল্পনার ব্যাপারে তার ছাত্রদেরকেও কিছু জানান নি। বেটার মতলবটা আসলে কি? পোলের দিকে তাকালাম। এও কি সবার মতন অন্ধকারেই আছে নাকি?
পুরোহিত অবশ্য অ্যামোয়ডিসের প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়োজনবোধ করলেন না। প্রসঙ্গ বদলের জন্য সোফোসকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা ইড্ডিস রাজ্য সম্পর্কে তোমাকে কি পড়িয়েছিলাম মনে আছে?”
সোফোস মাথা নাড়ল। খাওয়া বাদ দিয়ে তোতাপাখির মতন পেটে যত বিদ্যা ছিল সব উগরে গেল। ইড্ডিসের শাসন ব্যবস্থার প্রধান একজন রানী, সাথে আছে প্রধানমন্ত্রীসহ এগারোজন মন্ত্রী। প্রধান রপ্তানিযোগ্য পন্য খনিজ রূপা এবং কাঠ। বেশিরভাগ ভোগ্যপন্য যেমন জলপাই, মদিরা, এবং খাদ্যশস্য আমদানির ওপরে নির্ভরশীল। উত্তরে সুনিস এবং দক্ষিনে আটোলিয়া রাজ্যের মধ্যবর্তী পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এর অবস্থান এবং দুই রাজ্যের সাথেই এর সীমানা আছে।
শুনতে শুনতে হাই তুললাম। “আমাদের প্রতিবেশী” নামের বাচ্চাদের বই থেকে পুরোই মেরে দিয়েছে দেখছি। এর জ্ঞান যদি এখনো এতটুকুর মধ্যেই আটকে থাকে তবে এর ভবিষ্যত নিয়ে আমার বেশ সন্দেহ আছে। এসব জিনিস আমরা আরও ছোট থাকতেই শিখেছি।
সোফোসের পরীক্ষা শেষ হলে পুরোহিত এবার বড়জনকে নিয়ে পড়লেন। তবে এতে অ্যামোয়ডিসকে তেমন খুশি বলে মনে হল না। আসলে এর ভাবসাব দেখে কখনো মনে হয় যে পুরোহিতের কাছে এভাবে ছাত্র হিসেবে গন্য হওয়াটাই তার অপছন্দ। এমনকি সোফোসকেও যে বিশেষ পছন্দ করে তা নয়। সুযোগ পেলেই বেচারাকে খোঁচা দিতে ছাড়ে না। এটা কি হিংসা? এমনটা নয় তো যে সোফোস ডিউকের ছেলে, আর সে সাধারন পরিবারের বলে হিংসে করছে?
তবে তার গলার স্বরে এসব কিছুই প্রকাশ পেল না। ভাল ছেলের মত সে তার গুরুর প্রশ্নের উত্তর দিল। “ইড্ডিস সুনিস এবং আটোলিয়ার মধ্যে একমাত্র যাতাযাতের রাস্তা নিয়ন্ত্রন করে। দুটিই এ অঞ্চলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাজ্য। ইড্ডিসে মাত্র একটি সামুদ্রিক বন্দর আছে, কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ খুব বেশি নেই। ইড্ডিসের প্রধান আয়ের উৎস এই পথে যাতাযাতকারী মালবাহী গাড়ি থেকে প্রাপ্ত কর। এছাড়াও সুনিস এবং আটোলিয়াতে কাঠ বিক্রি করেও কিছু আয় করে। যেহেতু দুই রাজ্যের মধ্যবর্তী স্থানে এর অবস্থান, ইড্ডিস সব সময়ই রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার চেষ্টা করেছে। এমনকি হাজার বছর আগে ভিনদেশীরা সুনিস এবং আটোলিয়ার দখল নিলেও, ইড্ডিস সব সময়ই স্বাধীন থেকেছে। স্বাধীন হবার পরে সুনিস বারবার আটোলিয়া আক্রমন করার চেষ্টা করলেও ইড্ডিস সব সময়ই মধ্যস্থতা করেছে। “
“অসাধারন,” এই প্রথমবার পুরোহিতকে অ্যামোয়ডিসের প্রশংসা করতে দেখলাম। তিনি অ্যামোয়ডিসকে ছেড়ে এবার সোফোসের দিকে ফিরলেন, “তুমি কি এই ঘটনা সম্পর্কে আরো কিছু বলবে?”
“কোনটা?” সোফোস জিজ্ঞেস করল, “ যখন তারা সেফারিয়া নদীর ওপরের সেতুটা ভেঙ্গে দিল?”
‘ঠিক তাই, “ পুরোহিত মাথা নাড়লেন। “জান এটা তারা কেন করেছিল? কারন এই সেতু অতিক্রম করা ছাড়া সুনিসের সেনাবাহিনী কোনভাবেই আটোলিয়ার সীমানায় পৌঁছাতে পারত না। আর সুনিস এবং আটোলিয়ার মধ্যে যুদ্ধ ইড্ডিসের বানিজ্যর জন্য বিশাল ক্ষতি বয়ে আনবে।“
“আসলে ইড্ডিস একটা কাপুষের দেশ।“ অ্যামোয়ডিস রাগত স্বরে বলল। “তারা ভাবে যে পাহাড়ের পেছনে লুকিয়ে সারা জীবন সুরক্ষিত থাকবে।‘ শুনে একটু রাগ লাগল। এভাবে কিছু না জেনে কোন দেশের মানুষ সম্পর্কে ঢালাওভাবে মন্তব্য করা ঠিক নয়। অবশ্য একে বেশি দোষ দেয়া ঠিক না। বেশিরভাগ সুনিসের নাগরিকরাই ইড্ডিস সম্পর্কে এই ধারনাই পোষন করে।
“ যুদ্ধে যদি ইড্ডিসের বানিজ্যর ক্ষতি হয় তাইলে তারা কেনই বা সেধে সেধে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধতে দেবে?” আর সুনিসই বা কেন খামাখা আটোলিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে এত মুখিয়ে আছে?” এবার মুখটা খুলেই ফেললাম, যদিও জানি এর জন্য আবার ঝাড়ি খেতে হবে।
ঝাড়ি খেতে হল না, কারন কেউ কিছু বলার আগেই সোফোস উত্তরটা দিয়ে দিল, “ কারন, আটোলিয়া মিথ্যা কথা বলেছিল। যখন ভিনদেশীরা আক্রমন করল ইড্ডিস আটোলিয়ার সৈন্যকে এই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে সুনিসে ঢুকতে দিয়েছিল। সেই সৈন্যবাহিনী সুনিসকে সাহায্য করার বদলে ভিনদেশীদের সুনিস দখল করতে সাহায্য করেছিল।“
“মানে এত বছর ধরে সুনিস শুধু প্রতিশোধ নেবার জন্য বসে আছে? কিন্তু সে তো কয়েকশো বছর আগের ঘটনা। তার জন্য এখনো যুদ্ধ করার দরকার কি?”
“স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়?” পুরোহিত বিড়বিড় করে বললেন, এরপরেই আমার দিকে তাকালেন, “এ কথা তোমার চেয়ে আর কারো বেশি জানার কথা নয়, জেন।“
কথাটা সত্য। আমি আর প্রতিবাদ করার সাহস পেলাম না। যদিও সোফোস এব্যাপারটার কিছুই বোঝেনি, কিন্তু পেছন থেকে অ্যামোয়ডিসের হাসি শুনলাম। আমার কথায় হাসির কি আছে বুঝলাম না।
“কিন্তু ইড্ডিস কখনোই তো স্বাধীনতা হারায় নি, তাই না?”
“না,” পুরোহিত উত্তর দিলেন, “ভিনদেশীরা পরবর্তীতে আটোলিয়া এবং সুনিস দখল করে নেবার পরেও, ইড্ডিসের ক্ষমতা কখনোই হাতবদল হয় নি। এখন চল সবাই, অনেক পথ বাকি।“
খাওয়ার পর্ব চুকে গিয়েছে অনেক আগেই, সুতরাং সময় নষ্ট করার কোন মানেই হয় না আর। এদিকে বেলাও পড়ে আসছে। সুতরাং আমরাও আবার পাহাড়ি পথে যাত্রা শুরু করলাম।
--
সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়তেই চারপাশের ছায়াগুলি দীর্ঘ হতে শুরু করল। যতক্ষন আলো ছিল ততক্ষন আমরা যতদূর সম্ভর উঠেছি। অন্ধকার গাঢ হওয়া শুরু করেছে। এর পরে আর উঠতে গেলে পথ ভুলে যাবার সম্ভাবনা আছে। আমরা একটা সমতল স্থানে রাতের মত বিশ্রাম নেবার জন্য থামলাম। পাহাড়ের এই অংশে মানুষের আনাগোনা আছে। পথচলতি দু একটা মালবাহী গাড়ি কখনো কখনো এখানে বিশ্রাম নেবার জন্য থামে। একটা গুহার মাঝে আগুন জ্বালানোর একটা কুন্ড পেয়ে গেলাম। আশপাশ থেকে কিছু কাঠ সংগ্রহ করে আনল পোল। বেশ ঠান্ডাও লাগছে। রাতের খাবার পরে সবাই আগুনের পাশে গোল হয়ে বসলাম। অ্যামোয়ডিস আবার একই প্রশ্ন তুলল পুরোহিতের কাছে।
“আমরা আসলে ইড্ডিসে কি করতে যাচ্ছি?”
কিন্তু পুরোহিত তার স্বভাবমত সোজাসুজি কোন উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তার আগে আমাকে বল ইড্ডিসের ক্ষমতার পালাবদল কিভাবে হয়?”
অ্যামোয়ডিস অবশ্য তেমন অবাক হল না পালটা প্রশ্নে। গুরুর এ স্বভাবের সাথে ভালভাবেই পরিচিত সে। “ইড্ডিসের বর্তমান শাসক একজন নারী। তার মানে আটোলিয়ার মতন এখানেও নারীরাও সিংহাসনের দাবী করতে পারে। তার মানে ক্ষমতার বংশানুক্রমিকভাবেই অর্পিত হয় পরবর্তী শাসকের কাছে। সুনিসের মতন।“
“কবে থেকে এই নিয়ম চালু রয়েছে?”
“ভিনদেশীরা আসার সময় থেকেই।“
“এর আগের নিয়মটা কেমন ছিল?”
“আপনি কি হ্যামিয়ান্থেসের রত্নের কথা বলছেন?” অ্যামোয়ডিস দ্রুতই পুরোহিতের আসল উদ্দেশ্য ধরে ফেলল।
“এই তো ধরতে পেরেছ,” পুরোহিত এবার সোফোসের দিকে ফিরলেন, “তুমি এই রত্ন সম্পর্কে কিছু জান?” সোফোস জানে না, সুতরাং পুরোহিত নিজেই উত্তর দিলেন।
“তোমাদের অবশ্য জানার কথা নয়। ভিনদেশীরা সুনিস এবং আটোলিয়া দখল করে নেবার পরে বেশিরভাগ মানুষকেই তারা ধর্মান্তরিত করে ফেলে। কিন্তু এক সময় আমরাও প্রাচীন দেবতাদের পূজা করতাম যেমনটা আজও ইড্ডিসের অধিবাসীরা করে থাকে। তারা নদী, ঝরনা, পাহাড়, জঙ্গল সবকিছুকেই দেবতা মনে করে। তবে সকল দেবতাদের প্রধান হলেন দেবী হেপাস্টিয়া, আগুন এবং বজ্রের দেবী। তাকে আকাশ এবং পৃথিবীর সন্তান হিসেবে কল্পনা করা হয়। প্রাচীন কিংবদন্তী অনুযায়ী, দেবী হেপাস্টিয়া ইড্ডিসের প্রথম রাজা হ্যামিয়ান্থেসকে একটি মূল্যবান পাথর উপহার দেন যার অমরত্ব প্রদানের ক্ষমতা ছিল। এই যতদিন পাথর যার কাছে থাকবে তার মৃত্যু হবে না। কিন্তু রাজা হ্যামিয়ান্থেস বৃদ্ধ বয়সে সেটা তার পুত্রকে প্রদান করেন এবং স্বাভাবিক মানুষের মতন মৃত্যুকে বেছে নেন। এরপর থেকে এই পাথর বংশানুক্রমিকভাবে হাতবদল হতে থাকে, এবং ইড্ডিসের রাজক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় এটি। কিন্তু এক বিদ্রোহী এই পাথর চুরি করে নিয়ে যায়, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সে মারা যায়। এরপর থেকে পূর্রবর্তী শাসক তার যোগ্য উত্তরসুরীকে এই পাথর প্রদান করেন। এরপর থেকে এই কথাই প্রচলিত হয় যে, এই রত্ন যার কাছে থাকবে সেই হবে ইড্ডিসের আসল শাসক।“
“কিন্তু এ তো শুধুই একটা কিংবদন্তী।“ অ্যামোয়ডিস প্রতিবাদ করে উঠল। আমিও এই প্রথমবার তার সাথে একমত না হয়ে পারলাম না।
“হয়ত কিংবদন্তী, হয়ত না। “ পুরোহিতকে এই প্রথমবার নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে একটু অনিশ্চিত দেখাল, “কোনটা সত্য আর কোনটা গল্প বলা কঠিন। হয়ত আসলেই হ্যামিয়ান্থেস নামে এক রাজা ছিলেন। হয়ত এমন রত্ন আসলেই তার কাছে ছিল। এমনকি ভিনদেশীরা এই পাথরের খোঁজে আসার আগে পর্যন্ত এর অস্তিত্ব সম্পর্কে অন্য রাজ্যের কেউ জানত না। কিন্তু যখন তারা এই পাথর খুজে পেল না, তখন তারা ইড্ডিসকে ছেড়ে সুনিস এবং আটোলিয়া দখল করে নেয়।“
“কিন্তু সেই পাথরের কি হল শেষ পর্যন্ত?” সোফোস জিজ্ঞেস করল।
“বলা হয় যে, তৎকালীন ইড্ডিসের রাজা এই পাথর তাঁর ছেলেকে না দিয়ে কোন এক জায়গায় লুকিয়ে রেখেছেন। এবং এরপর থেকে কেউই সেটা খুঁজে পায় নি।“
“এই রত্ন কি খুঁজে বের করা যাবে?” সোফোস আবারও প্রশ্ন করল।
পুরোহিত কিছুক্ষন চুপ করে রইলেন, তারপরে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
“মানে আপনি কি এই রত্ন খুঁজে পেতে চাইছেন?” অ্যামোয়ডিসের চোখদুটি জ্বলজ্বল করে উঠল। কিন্তু আমার মনে হল সেটা যতটা না উত্তেজনায়, তার চেয়েও বেশি লোভে।
পুরোহিত আবারও মাথা নাড়লেন।
“মানে,” কেউ কিছু বলার আগেই মুখ ফসকে কথাটা বের হয়ে গেল, “আমরা এই পাহাড়ে অন্ধকারে ঘুরে মরছি শুধু এক রূপকথার বলা গুপ্তধনের পেছনে? যা আসলেই আছে কিনা কেউ জানে না।”
পুরোহিত কিছুক্ষন আমার দিকে কটমট করে তাকালেন। আমিও তার চোখ থেকে দৃষ্টি সরালাম না। যদি ডুমুরের ফুল খুজতেই হয়, তাইলে জেনে বুঝে খুঁজতে যাওয়া ভাল।
“এ ব্যাপারে আমি যথেষ্ট খোজখবর নিয়েই বের হয়েছি, জেন।“ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন তিনি, “প্রাচীন অনেক কাগজপত্রেই এই রত্ন সম্পর্কে উল্লেখ আছে।“
“মানে আপনি জানেন যে সেটা কোথায় আছে?” অ্যামোয়ডিস প্রায় চিৎকার করে ঊঠল উত্তেজনায়।
“হ্যাঁ, আমি জানি।“
“কোথায়?”
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। ভাল গাড্ডায় পড়া গেল। “আচ্ছা, মানলাম এই রত্নের ব্যাপারটা কোন গল্প নয়,” আমি পুরো ব্যাপারটা মধ্যে যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করলাম, “তাহলে এত যুগ পরে আপনিই কিভাবে প্রথম এর খোঁজ পেলেন?”
“আমি প্রথম নই,” পুরোহিতের কথা শুনে আমার চোখ কপালে ওঠার যোগার, “ঘাঁটাঘাঁটি করে যতদূর জানতে পেরেছি, আমার আগেও অনেকেই এই রত্নের খোঁজে বের হয়েছিল, কিন্তু যারাই এই রহস্যের কাছাকাছি গিয়েছে তারা কেউই আজ পর্যন্ত ফিরে আসেনি। হয়ত তাদের পরিকল্পনায় কোন ভুল ছিল।“ তিনি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন, “কিংবদন্তী অনুযাযী একমাত্র চৌর্যবিদ্যায় অসাধারনভাবে পারদর্শী কেউই এই রত্ন উদ্ধার করতে পারবে। আর সেজন্যই তোমাকে আমাদের এই অভিযানে নেওয়া।“
“আপনি এই সব অলীক গল্প বিশ্বাস করেন? আপনাকে অনেক পন্ডিত লোক মনে করেছিলাম।” যতই বলুক না কেন আমি মোটেও এসব অলীক জিনিসে বিশ্বাস করি না। আর যেসব প্রমানের কথা তিনি বলছেন, নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত এ ব্যাপারে আমার মত কেউই পাল্টাতে পারবে না।
“অবশ্যই,” পুরোহিত আমার কথায় একটুও বিচলিত হলেন না। তিনি হাটুর ওপরে দুহাত রেখে সামনে জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে তাকালেন, “তবে প্রমান এখন আমি দেখাতে পারব না। কাজ শেষ হতেই সব প্রমান আমি ধবংস করে ফেলেছি, যাতে আর কেউ আমাদের পিছু না নিতে পারে।
আমি ঢোক গিললাম। এর থেকে বেটা এসবের খোঁজ কোনদিন না পেলেই ভাল হত। আমাকেও আর বনের মোষ তাড়াতে দৌড়ে বেড়াতে হত না। এদিকে অ্যামোয়ডিসের উত্তেজনা চরমে উঠেছে, “তাহলে সেই রত্ন পেতে আর কতদূর যেতে হবে, পুরোহিতমশাই?”
“গেলেই দেখতে পাবে।“ পুরোহিত নির্বিকারভাবে উত্তর দিলেন।
কিন্তু এই বেটা এই রত্ন দিয়ে আসলে কি করতে চায় সেটাই বুঝতে পারছি না। “তা আপনি কি এই রত্ন নিয়ে ইড্ডিসের রাজা হবার পরিকল্পনা করছেন?” একটু ব্যাঙ্গাত্মক সুরেই বললাম আমি, “মানে গরীব কাঠুরেদের দেশের রাজা হবার স্বপ্ন দেখেন আপনি?”
পুরোহিত অবশ্য আমার ব্যাঙ্গটা ধরতে পারেন নি। “আমি এই রত্ন নিজের জন্য খোজ করছি না। আমি এটা আমাদের মহারাজকে উপহার দেব। এর ক্ষমতাবলে তিনি ইড্ডিসের সিংহাসন দাবী করতে পারবেন। আর আমি তাঁর বিশ্বস্ত এবং একাজের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানজনক ‘রাজকীয় তস্কর’ খেতাব লাভ করতে পারব।“
এবার আমার আত্নসম্মানে বেশ লাগল। বলে কি বেটা? কাজ করব আমি, আর খেতাব নেবেন উনি? আমি কষ্ট করে গাড্ডা থেকে রত্নটা উদ্ধার করব, আর এনার নামে মিনার তৈরি হবে, সেটি হচ্ছ না। যদি খেতাব পেতে হয়, তবে সেটা আমারই পাওয়া উচিত। “আপনি ভাবলেন কি করে যে রত্ন উদ্ধার করে আমি আপনাকে এমনি এমনি দিয়ে দেব, আর আপনি আরামসে আমার পিঠে ছুরি মেরে চলে যাবেন? নাকি কাজটা পোলকে দিয়ে করাবেন?”
পুরোহিত অবশ্য টোপটা গিললেন না। আগুনের ওপাশ থেকে পোল আমার দিকে তীর্যক দৃষ্টি হানল। তার চোখ দেখে আমার মেরুদন্ড বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল।
“এটার কোন প্রয়োজন নেই,” পুরোহিত আগের মতই নির্বিকারভাবে বলে চললেন, “তুমি যত কিছুই কর না কেন, জিন, সবাই এমনিতেই বুঝবে সব কিছুর মূলে আসলে কে ছিল। তুমি তো দাবার একটা ঘুটি মাত্র।“ আমার দিকে ফিরে শীতল একটা হাসি হাসলেন, “কোন তলোয়ার যদি খুব মজবুত হয় তবে কে বাহবা পায়- কামার, নাকি হাতুড়ি? আর তুমি যেভাবে তোমার কৃতিত্বের কথা সারা দুনিয়াকে জানিয়ে বেড়িয়েছ এর আগে, তাতে মনে হয় না কেউ তোমার কথা এরপরে আর বিশ্বাস করবে।“
তাঁর কথা শুনে লজ্জাই লাগল। আসলেই তো যেভাবে বোকার মত রাজকীয় সিলমোহর চুরির কথা বলে ধরা পড়েছিলাম, এরপরে মনে হয় না আমার কথাকে কেউ পাত্তা দিবে। আমার অবস্থা দেখে বাকিরা সবাই হেসে উঠল। কি যে রাগটাই না লাগছে। এখন এই গাড্ডার মধ্যে না থাকলে, সবার মাথার ওপরে এই পাথরগুলি ভাঙতাম।
“রাজকীয় খেতাব দিয়ে তুমি কি ই বা করবে, জিন?” কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেবার মতন এবার অ্যামোয়ডিস হেসে উঠল, “রাজসভার পেছনে বসে মুখ হা করে খাবার সাটাবে? নাকি তোমার গ্রাম্য ভাষায় রাজকুমারীদের সাথে ঢলাঢলি করবে? তোমার চালচলনই বলে দেয় তুমি কোন আস্তাকুড় থেকে উঠে এসেছ। সুতরাং ওসব রাজকীয় খেতাব পাবার স্বপ্ন দেখা বাদ দাও।“
“কিন্তু আসল কাজটা তো আমিই করব।“ মৃদুভাবে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলাম, যদিও কোন কাজ হবে না জানি।
“সেটার পুরস্কার তো তুমি পাবে।“ একটু করুনার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল সে। আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। মানুষের কাছ থেকে দয়া ভিক্ষা করাটা আমার ধাতে নেই। মেজাজটা খারাপ হবার আগেই এ প্রসঙ্গ থেকে বের হওয়া দরকার।
“সুনিসের রাজা আপনার এই গল্প বিশ্বাস করলেন?” পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলাম।
“কেন নয়।“ পুরোহিত এবার তেতে উঠছেন। জায়গামত তীর লেগেছে মনে হচ্ছে। অবশ্যই। এতদিন ধরে এত পরিকল্পনা বানিয়েছেন তিনি, সব প্রমান নষ্ট করেছেন যেন আর কেউ তার পরিকল্পনায় ভাগ বসাতে না পারে।
“আপনি নিশ্চিত?” আরেকটু গুঁতোলে মন্দ হয় না, “আপনি কি এখানে সবাইকে বিশ্বাস করেন? হয়ত আপনার পিঠেই ছুরিটা মারার জন্য ওত পেতে আছে কেউ।” আগুনের আভায় পুরোহিতের গাল লাল হয়ে উঠছে, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। যাক, বেটাকে শেষ পর্যন্ত রাগাতে পেরেছি। মজাই লাগছে।
“গাধার মত কথা বলো না। এরা সবাই বিশ্বস্ত।“
“কিন্তু মহারাজ ইড্ডিসের সিংহাসন দিয়ে কি করবেন?” বেটাকে আরও রাগালে খারাপ হতে পারে, তাই প্রসঙ্গ বদলালাম, “একই গরীব দেশ, আর সেখানে খালি বড় বড় গাছ ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি কি জাহাজের ব্যবসায় নামবেন নাকি?”
“না,” পুরোহিত এখনো আমার দিকে কটমট করে চেয়ে আছেন, তবে রাগটা কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছ, “ তিনি আসলে ইড্ডিসের রানীকে চান।“
এবার আমার অবাক হবার পালা। “মানে আমরা এই জঙ্গলে ঘুরে মরছি যাতে মহারাজ- “ কথাটা আমাকে আর শেষ করতে দিলেন না তিনি।
“- একটা বিয়ে করতে পারেন।“ কথাটা শেষ করলেন তিনি। “ইড্ডিসের রানী প্রতিবারই তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আর নয়। এবারে যদি আমরা এই রত্ন নিয়ে হাজির হই তাইলে রানী কিছুতেই এই প্রস্তাব ফেলতে পারবেন না।“
“কিন্তু এই রত্ন যে আসলেই যে হ্যামিয়ান্থেসের রত্ন সেটা বুঝবে কিভাবে? আর সেটা নিয়ে গেলেই যে ইড্ডিসের রানী বিয়েতে রাজী হয়ে যাবেন তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়?”
যেন বোকার মত প্রশ্ন করেছি, সেভাবেই পুরোহিত আমার কথা শুনে হাসলেন। “ একেই ইড্ডিসের শাসক একজন নারী, এবং এই রত্নের সাথে শত হলেও দেশের মানুষের ধর্মবিশ্বাস এর সাথে জড়িত। কোন শাসকই চাইবে না মানুষের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে নাড়া দিতে।“
আমি আর কথা বাড়ালাম না। চুপচাপ আগুনের দিকে চেয়ে রইলাম। সুনিসের রাজা আসলে ইড্ডিসের সিংহাসন শাসন করার জন্য দখল করতে চান না, বরং এর মধ্যে দিয়ে আটোলিয়া যাবার যে পথ আছে সেটার নিয়ন্ত্রন নিজের করে নিতে চান, যাতে সহজেই আটোলিয়া আক্রমন করতে পারেন। বাকিদের দিকে তাকালাম। পোল বা অ্যামোয়ডিস, কেউই পুরোহিতের কথা বিশ্বাস করেছে বলে মনে হল না। তবে তাতে কিছু যায় আসে না। পা কাদার অনেক গভীরে চলে গিয়েছে। আর ফিরে আসার পথ নেই।
“এসব নিয়ে তোমাদের আর চিন্তা না করলেও চলবে।“ খাওয়া শেষ হতে বাসলগুলি ধোবার জন্য পোলকে দিতে দিতে বললেন পুরোহিত, “যা করতে এসেছি সেটা এখন ভালভাবে করাটাই আমাদের লক্ষ্য।“
কথাটা সত্য। যদি শুধুমাত্র দাবার ঘুঁটিই হয়ে থাকি, তাহলে কে কিভাবে আমাকে নিয়ে চাল দেবে সেটা না ভাবলেও চলবে।
---
পরের দিন ভোরের আলো ফুটতেই আমাদের যাত্রা আবার শুরু হল। গতরাতের কথাগুলি কেবলই মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। যতদূর সম্ভব মুখ হা না করে খাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু সেটা বৃথাই বলতে হবে। ঠোটের কোনা বেয়ে গড়িয়ে পড়া খাবার দেখে পুরোহিত বিরক্ত হয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। এখন আমরা যে পথ ধরে চলছি তার দুপাশে জুনিপার এবং পাইন গাছের সারি। পাহাড়ের পাদদেশে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। একটু অসাবধান হলেই পা ফসকে নির্ঘাত ওপারে। এবড়ো থেবড়ো পথে চলতে চলতে পা ব্যাথা করছে।
“বিরক্ত লাগছে।“ আনমনে বললাম, “আর কতদূর?”
কেউ কোন উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করল না। সুতরাং আবার চলা শুরু হল। আরেকটু সামনে এগোতেই বড় বড় পাইন গাছের বনে এসে পড়লাম। মাথার ওপরে আকাশটা পর্যন্ত গাছের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। চারপাশে বাতাসটাও বেশ আরামদায়ক। আমরা কোন কথা না বলে চলতে লাগলাম।
“এখন তো থামা যায় নাকি?” আমি এবার বিরক্তির চরমে পৌঁছে গিয়েছি।
“চুপ-“ পুরোহিত পেছন না ফিরেই ঝাড়ি মারলেন। পোল পেছন থেকে আমার পিঠে ধাক্কা মারল সামনে এগিয়ে যাবার জন্য।
--
অন্ধকার হবার আগেই পাইন বন পেড়িয়ে আরেকটা রাস্তার মুখে এসে পড়লাম। ভাল করে চারপাশ দেখে অবশেষে পুরোহিত এখানেই রাতের মত থামার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই জায়গাটা একটু অদ্ভুত। চারপাশে পাহাড় থাকলেও এই রাস্তাটা পাথর দিয়ে এমনভাবে তৈরি যেন প্রতিটি পাথর মাপ দিয়ে কেটে কেটে বসানো হয়েছে, এবং মার্বেল পাথরের মত মসৃন। প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত এই রাস্তা একবারের জন্যও বদলায় নি বা চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে যায় নি। লোকে বলে এই রাস্তা দেবতারাদের হাতে বানানো।
“এই রাস্তা কতদূর গিয়েছে?” আগুন জ্বালতে জ্বালতে অ্যামোয়ডিস জিজ্ঞেস করল।
“ইড্ডিসের রাজধানীর মধ্যে দিয়ে আটোলিয়া এবং ইড্ডিসের মধ্যবর্তী এলাকা পর্যন্ত। পুরোটাই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছ।“ পুরোহিত উত্তর দিলেন।
“কিন্ত কিভাবে এই রাস্তা তৈরি করেছে এই দূর্গম পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে?” সোফোসকে বেশ কৌতুহলী লাগল।
“পলিফেমাস।“ এবার অ্যামোয়ডিস উত্তর দিল, “পুরাণে বর্নিত একচোখা দানব। কথায় আছে এই দানব নাকি এই রাস্তা, রাজপ্রাসাদের পুরোনো দেয়াল এবং বর্তমান জেলখানার প্রাচীর তৈরি করেছিল।“
‘কি?” সবজান্তা সোফোস দেখি এই ব্যাপারে অজ্ঞ। বেশ, বেশ। কিছুক্ষন পরেই সে মাথা নাড়ল, “এসব সব রূপকথার গল্প। আমার বাবা বলেন যে পুরোনো দেবতাদের নিয়ে যেসব গল্প সেগুলি বিশ্বাস করাটা ঠিক নয়। একসাথে দুটো ধর্মে বিশ্বাস করা যায় না।“
হুম, কথাটা মন্দ বলেনি অবশ্য।
এদিকে পোল রান্না শেষ করে খাবার নিয়ে চলে এসেছে। আমি খাবার খেতে খেতে ভাবলাম পুরোহিতকে একটু খোঁচাই। খোঁচালে বেটা বেশ রেগে যায়, ব্যাপারটা এই একঘেয়ে জীবনে একমাত্র বিনদোনের উৎস। সুতরাং যখন তিনি পোলকে নিয়ে কিভাবে আরেকটু দ্রুত যাওয়া যায় সেটা পরিকল্পনা করতে বসলেন, আমি আবারও ঠেলাগাড়ির প্রসঙ্গ তুললাম। এরপরে আবারও খাবার চাইলাম। পুরোহিতের চেহারাটা হল দেখার মত।
“যদি আসলেই বুদ্ধিমানের মত কোন কিছু বলার থাকে তাহলে বলতে পার, নাইলে আর বিরক্ত না করে নিজের চরকায় তেল দাও।“
“সেটাই তো দিচ্ছি।“ আরাম করে একপাশে শুয়ে হাই তুললাম?

Sk imran, Rasel islam, Raihan khan, Badol hasan, Mr faruk, Saiful Osman, Sumon khan and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum