সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 10
স্বর্ণমুদ্রা : 263
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-16
Age : 33
Location : Dhaka, Bangladesh
View user profile

প্রকৃতির প্রতিশোধ Empty প্রকৃতির প্রতিশোধ

Wed Jun 16, 2021 2:58 pm
প্রকৃতির প্রতিশোধ

মাঝে মধ্যেই সেই একটা দিনের স্মৃতি ভেসে ওঠে মনের পর্দায়, অত্যন্ত স্পষ্ট যেন শতাব্দীর সেরা এক অস্কারজয়ী ছবির জ্বলজ্বলে দৃশ্য। অথচ বাস্তবেই ছিল সেই দিনটা।  

দীর্ঘ এক ঘন্টা কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে থেকে যখন চোখের পেছনটাতে মস্তিষ্কের মধ্যে চিনচিনে ব্যাথা অনুভুত হল, তখন স্ক্রীন থেকে চোখে তুলে তাকালো রুবিনা। বা হাতের পাশের বেল টিপে অফিস সহকারীকে ডাকল। একুশ বছর বয়সী ভারী অঙ্গের মেয়েটা ঘরে ঢুকলে তাকে বলল, একটু চা টা দাও, নীলিমা ।
মেয়েটা উপর নীচ মাথা ঝাকিয়ে কোন আওয়াজ না করে বেরিয়ে যাচ্ছিল, রুবিনা আবার বলল, কে যেন বসে আছে, ভেতরে আসতে বলো।

প্রায় দু ঘন্টা অপেক্ষায় থাকার পর ভেতরে ঢুকল ছেলেটা। রুবিনা লক্ষ্য করল ছেলেটা যেন বহুদিনের চেনা! হুম। ঝটিকায় মনে পরে গেল--বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা। কি অসাধারণ আর রূপময় ছিল দিনগুলি! আর অতুলনীয় সুন্দরী রুবিনার চারপাশে মুগ্ধ চোখের সমাগম। এই ছেলেটাও ছিল সেই ভীরের মধ্যে। রুবিনা অন্যদের সেভাবে লক্ষ্য করতো, আবছাভাবে! সেভাবেই হয়ত একে লক্ষ্য করেছিল এক দুইবার। কোন অনুষ্ঠানে বড় সর ক্যামেরা দিয়ে ছবি টবি তুলেছিল, কিংবা চলার পথে চোখে পরেছিল কোন কোন দিন।

ছেলেটির দিকে একপলক চেয়ে রইল রুবিনা। মাথায় ঝাকড়া চুল ব্যাক ব্রাশ করা, পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থেকে নিচের ঘন জঙ্গল দেখতে যেমন। চওড়া কপাল থেকে শুরু হয়ে একটা উঁচু এবং অহঙ্কারী নাক নীচে নেমে এসেছে, তাকালেই প্রাচীন গ্রীক দেবতা এপোলোর মুর্তির কথা মনে পরে যায়। কাজল পরানো চোখে এক রাশ মায়া! আসলে কাজল পরানো নয়। চোখের দুই সারি পাতার ঘনত্ব বেশি থাকার কারণে এমন মনে হয়। এমন চোখের দিকে তাকালে রমণী হৃদয় গলে গলে পরে। উপর ঠোঁটের আগার সুক্ষ্ম ভাবটা ছেলেটার চোখের মায়া বাড়িয়ে দেয় আরেক প্রস্থ। চোখে ফুটে ওঠা মুগ্ধতা ঝপ করে লুকিয়ে ফেলে ছেলেটির দিকে নিরসভাবে চেয়ে বলল, আপনি তিন দিন ধরে আমার সাথে দেখা করার জন্য এসেছেন! কেন বলুনতো?
লাজুক হেসে ছেলেটা বলল, আপনি অভয় দিলে একটা কথা বলতে চাই। আমার হাতে বেশি সময় নেই।
--সময় নেই মানে!
--আমি চলে যাচ্ছি।
--কোথায়?
--কানাডাতে একটা ছোট খাটো জব হয়েছে।
--আর আসবেন না, নাকি?
--আসবো হয়ত, তবে কবে আসি তার ঠিক নেই।
--কি বলবেন বলুন।
কি বলবে সেটা মনে মনে গুছিয়ে এনেছিল আরিফ নামের ছেলেটা। কিন্তু হৃদয়ে কালবৈশাখী ঝড় তোলা এই অপরুপ সুন্দরী রমনীকে এত কাছ থেকে দেখে গুছিয়ে ফেলা কথাগুলো হয়ে গেলো ছিটিয়ে দেওয়া তাসের মত বিক্ষিপ্ত। সে শুধু আমতা আমতা করে বলল, আমি আপনার ভার্সিটির জুনিয়র।
--হ্যা। আমার কাছে আপনার চেহারাটা পরিচিত লেগেছে। দেখেছি হয়ত কয়েকবার।
--আমাকে তুমি করে বললে খুশি হব।
হঠাৎ রূঢ় গলায় রুবিনা বলল, আমি আপনাকে কেন খুশি করব? যা বলতে চান, বলে চলে যান।
মুখ ফসকে বলে ফেলা একটা রূঢ় কথা কথা যে একটা মানুষের জীবনের কত বড় অভিশাপ হতে পারে সেটা ভাবলে আজো রুবিনার শরীরটা বেদনায় মুষড়ে পরে। এই কথাটা প্রায় প্রতিদিন তাকে উপহাস করে ফেরে।

ছেলেটা সেদিন শুকনো মুখে বলেছিল, আজ কথাটা না বললে আর কোনদিন বলতে পারব না।
তো বলছেন না কেন? --কণ্ঠের রুক্ষতা বজায় রেখেছিল রুবিনা।
ছেলেটা চোখ তুলে চেয়ে, তার মনের সমস্ত শক্তি একত্র করে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, আমি গত তিন বছর ধরে আপনাকে ভালোবাসি। এটা বলার জন্যেই আজ এখানে এসেছি।
কথাটা শুনে রুবিনা মনে মনে আপ্লুত হলেও চেহারায় তার প্রকাশ ঘটতে দিল না। শক্ত গলায় বলল, বলে লাভটা কি হল?
ছেলেটা হতাশ গলায় বলল, জানিনা।
রুবিনা ভেতরে ভেতরে খুশি হয়েছিল সেদিন। ছেলেটা অত্যন্ত রূপবান আর ভদ্র। এমন একটা ছেলে ভালোবাসার কথা বললে কোন মেয়েরই খারাপ লাগার কথা নয়, বরং খুশি হবার কথা। কিন্তু রুবিনার নিজেরও ছিল চিরাচরিত রূপের অহঙ্কার। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রচুর ছেলেকে ভেপু বাঁশির মত বাজিয়ে, নাচিয়ে ছিবড়ে করে ছেড়ে এসেছে। সেই নেশাটা সহজে যায় কি করে! মনে মনে ছেলেটাকে একটু নাচাতে চাইল।  তবে অদূর এনং দূর ভবিষ্যতে সে এই নাচানোর ফলটা তিক্তভাবেই ভোগ করেছে। ছেলেটাকে শুধু বলল, আপনি তো কানাডা চলে যাবেন! আমাকে এখন ভালোবাসার কথা বলে লাভ কি?
--লাভ নেই কোন।
--তো বলা আর না বলা তো সমান কথা।
--সমান কথা নয়।
--কিভাবে?
--যে মানুষটাকে ভালোবাসলাম, তাকে জানিয়ে গেলাম। এটা একটা মানসিক পরিতৃপ্তি।
ছেলেটার মতি গতি না বুঝেই রুবিনা বলে ফেলল, আমি তোমার ভালোবাসাকে গ্রহণ করলাম। তুমি কি আমার জন্যে বিদেশ যাওয়াটা বন্ধ করতে পারবে?

আরিফের চোখ দুটো প্রত্যাশায় ভরে উঠল। সে শুধু একটা কথা এই রূপবতী নারীকে বলতে এসেছিল কিন্তু প্রতি উত্তরে এতটা আশা করেনি। সে চেয়েছিল ঠাস করে কথাটা বলে বিদেয় হয়ে চলে আসবে। ভালোবাসার কথা জানানোটাই ছিল তার একমাত্র উদ্দেশ্য। তবে রুবিনার কথায় আশান্বিত হয়ে মায়া ভরা চোখে চেয়ে সে শুধু বলেছিল, আমি যাব না।
কথাটা বলার সময় তার চোখে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের হাসি, সেই সাথে ছিল স্বপ্নালু এক গভীরতা। এই হাসিটাই রুবিনার বুকের ভেতরে গিয়ে বিঁধেছিল সেদিন, যদিও সেটা উপলদ্ধি করতে পারেনি। রুবিনা বলল, আপনার ফ্লাইট কবে?
--পাঁচ দিন বাদে।
--এক সপ্তাহ আমি ব্যস্ত থাকবো। এরপর একদিন আসবে, তুমি। নিজেদেরকে চেনা জানাটা তো দরকার!
রুবিনার মুখে আবারো 'তুমি' শুনে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করল আরিফ। বাসায় ফিরে এসে সবাইকে জানিয়ে দিল সে কানাডা যাচ্ছে না। ওর মধ্যবিত্ত বাবা সেদিন অবাক হয়ে কারণ জানতে চেয়েও জানতে পারলেন না। অতগুলো টাকা গচ্চা গেল বলে ছেলেকে কিছু বললেনও না। কারণ এই ছেলে কোনদিন তার ক্ষতির কারণ হয়নি। একবার কিছুটা ক্ষতি করলে সেটা সয়ে নেওয়া যাবে। বন্ধুরা কেউ কেউ খুশি হল ওর সিদ্ধান্তে। আত্বীয় স্বজন শুধু বলল, সিদ্ধান্তটা ভাল হলোনা। সিদ্ধান্তটা যে ভাল হল না সেটা আরিফ জানতে পারল পরের সপ্তাহে।

পরের সপ্তাহে রুবিনার সাথে দেখা করতে এসে তাকে পাওয়া গেল না। সে হল সহকারী ককিশনার(ভূমি); জায়গা জমির হিসাব নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত; চাইলেই দেখা করা সম্ভব নয়। পরের দিন আবার গেল আরিফ। রুবিনা সেদিন ছিল। আরিফকে ডেকে শুধু বলেছিল, তুমি কানাডা যাওনি?
আরিফ অস্থির গলায় বলল, না, যাইনি। আপনি না দেখা করতে বললেন!
--আরে ও তো ফাজলামো করে বলেছিলাম! তাই বলে তুমি চাকরি করতে যাবে না!

অবাক হয়ে তাকিয়েছিল সুপুরুষ ছেলেটা৷ ঈষৎ ভ্রু কোচকানো অবাক করা ভঙ্গীটা তাকে আরো বেশি মোহময় পুরুষে পরিনত করে। কিন্তু সেই অবাক হবার ভাষাটা দ্রুত নীল কষ্টে ভরিয়ে দেয় তাকে। সে ফিরে যায় এক বুক হাহাকার নিয়ে৷ বুকের ভেতর ভীষণ জোর নিয়ে সে ভালোবেসেছিল ভার্সিটির সিনিয়রকে। ভেবেছিল, তাকে পাই বা না পাই আমার ভালোবাসার জোর তাকে একদিন দেখাবো। কিন্তু কিভাবে দেখাবে সেটা কোনদিন ভাবেনি। আর সেটা দেখানোও হল না কখনো।

এই ঘটনার এক মাস পর্যন্ত রুবিনা অপেক্ষায় ছিল, ছেলেটা হয়ত আবার আসবে। কিন্ত্য এলো না। তার এই না আসাটা রুবিনার চিত্তের কোথায় যেন সুঁচের মত বিঁধতে লাগলো। সে ভুলেই গিয়েছিল এটা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কোন ঘটনা নয়, তার আশে পাশে অসংখ্য ছেলে আর চোখ বড় বড় করে চেয়ে থাকছে না। আশ পাশের সবার দৃষ্টিতে রয়েছ সমীহ আর সাবধানতা। তবে সে আশা করেছে, অন্য ছেলেদের যেভাবে ভুলে গিয়েছিল সেভাবেই ভুলে যাবে এই ছেলেটির কথা। কিন্তু ব্যস্ততা আর কাজের ফাকে যখন এক জোড়া মায়াবী চোখ মনের পর্দায় উঁকি দিয়ে যেত তখন থেমে যেতে হত। চোখ বন্ধ করে দেখে নিত সেই সুপুরুষ লোকটাকে। ছয় মাস বাদে ফোন নাম্বার ম্যানেজ করে একদিন তাকে ফোন করেছিল রুবিনা। কথা বলে গভীর আফসোস বোধ অনুভুত হয়েছিল সেদিন। এত দ্রুত একটা ছেলে পিছু ছেড়ে দেবে, ভাবেনি সে। অতি ক্ষুদ্র এই অবহেলায় এক অস্থিরতায় আক্রান্ত হল রুবিনা নামের বড় এই সরকারি কর্মজীবী মহিলা।
ততদিনে আরিফ বিয়ে করে থিতু হয়েছে। কম বয়সী আর ঝড়ের মত উশৃংখল একটা মেয়ে এসে তার জীবনটা সুখের ঝামেলায় ভরিয়ে দেয়। বউয়ের নিরর্থক চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভুলে বসে তার অতীতের গভীর প্রেম। তখনো চাকুরী পায় নি আরিফ, তবে প্রস্তুতি চলছে। বিয়েটা তার অস্থিরতাকে স্তিমিত করেছিল। বিয়ে করে বোধ হয় সে তখন সঠিক কাজটাই করেছিল।

এক বছর ধরে রুবিনা বিয়ের করার জন্যে ছেলে খুঁজেছে, কোরবানীর হাটের গরু খোঁজার মত করে। দেড় বছর বাদে মিলে গেল একজন বা একটা। লোকটা একই বিসিএস ব্যাচের কাস্টমস অফিসার। মাঝারি গড়নের চৌকস অফিসার। দেখতে কেমন সেসব এখন আর খুব একটা গুরুত্ব বয়ে আনে না, ছেলে কি করে, প্রতিষ্ঠিত কিনা সেটাই মূখ্য ব্যাপার। লোকটা খুব হিসেবি আর মেয়ে মানুষের চাহিদার ব্যাপারে একশ ভাগ ওয়াকিবহাল। সোনায় সোহাগা ব্যাপার স্যাপার হল।

দুজনে চাকুরি করে দ্রুত সব গুছিয়ে নিল ওরা৷ অর্থ, নাম, আশেপাশের মানুষের প্রশংসার স্তুপে ডুবে গেল। জীবনটা একদম পূর্নতায় ভরে উঠলো। তবুও ব্যস্ততার মাঝে কখনো সখনো এক জোড়া মায়াবী চোখ উঁকি মেরে যায় রুবিনার মনের পর্দায়। এটা ওর কাছে সুখে থাকতে ভুতে কিলায় ধরণের ব্যাপার মনে হয়। মাছি তাড়াবার ভঙ্গীতে সেই চোখ জোড়া তাড়িয়ে দিতে চায় রুবিনা। তাড়িয়েও দেয় কিন্তু দুদিন চারদিন বাদে সেই চোখ জোড়া আবার ঘুরেফিরে হাজির হয় মনের পর্দায়। অবাক হয় রুবিনা। এত প্রাপ্তির পরেও কেন এই মনটা ওদিকে যায়? সে তো ভালোবাসেনি ছেলেটাকে!

তিন বছর বাদে রুবিনা দেখল, সে জীবনে সব পেয়েছে। অতিরিক্ত সুপুরুষ না হলেও তার হাজবেন্ড দেখতে ভাল। সে বিছানায় ভীষণ কর্মদক্ষ। তার পরিবার অত্যন্ত উঁচুমানের এবং রুবিনাদের কালচারে মিশ খেয়েছে ভাল। দু বছর বাদে ওদের একটা ছেলে সন্তান এসেছে। ছেলেটা রুবিনার রূপ পেয়েছে। সবার আদরের আর ভালোবাসায় মুখরিত হল নতুন মানুষটা।

সব কিছুর পর-ও গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় রুবিনার। স্বপ্নে এক জোড়া চোখ গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে৷ সে চেহারা মায়াময়, আর তার অবয়ব গ্রীক দেবতার মত আকর্ষণীয়।
এগারো বছর পেরিয়ে গেল। রুবিনা এখন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব। ভীষণ ব্যস্ত জীবন! সংসার আর সরকারি অফিস মিলিয়ে দম ফেলবার ফুরসত পাওয়া যায় না। তবু কাজের ফাঁকে উদ্ভট দিনের সেই দৃশ্যটা ঘুরে ফিরে এসে অমনোযোগী করে দেয় তাকে। মাঝে মাঝে ভীষণ উদ্ভট আর অস্বস্তিকর অবস্থায় পরে যেতে হয়। এমনিতেই তার হাজবেন্ড আজকাল তাকে যথেষ্ট এড়িয়ে চলে। মাস খানেকের মধ্যে একবার তাকে শরীরের ভাষায় ডাকা যায়, তবুও তা বেশি সময়ের জন্যে নয়। অথচ রুবিনা বুড়িয়ে যায়নি, কিংবা তার পতি-ও নয়। সেদিন এমন এক রাতের বেলায় অল্প সময়ের নিরস শারীরিক প্রেমের সময় চোখ বন্ধ করে সেই মায়াবী দু-চোখ দেখে চমকে গেল রুবিনা। অস্থিরতার বুনো একটা স্রোত দোলায়মান কামবেগকে স্থবির করে দিল।

বারো বছর ধরে তৃপ্ত রয়েছে সে। মাত্র দু বছর হলো শরীরের সক্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে যদিও দুকূল ছাপিয়ে জোয়ার ঠিকই আসে। তবুও সে অসুখী নয়। কিন্তু বারো বছর ধরে এক অস্থিরতা বার বার অমনোযোগী করে রেখেছে। কোনদিন কাউকে বলতে-ও পারেনি। দিন দিন এই অস্থিরতা ইদানীং তার বিছানার শয্যাকে আক্রমণ করে বসেছে। এখন সে কি করবে?

আরো দু বছর পেরিয়ে গেল। ধীরে ধীরে সেই অস্থিরতা গ্রাস করে তাকে চুয়াল্লিশ বছরের যৌবন প্রায় প্রান্তের দিকে এসে পৌছেছে। রুবিনার শুধু মনে হয় এই জীবনে আর অস্থিরতা কেটে গিয়ে শান্তি পাবে না। স্থুলতায় আক্রান্ত তার হাজবেন্ড আর তাকে সেভাবে ভালোবাসতে পারে না; শরীরের সাথে সাথে মনটাও স্থবির হয়ে আসে তার৷ রুবিনা অস্থিরতা লুকাতে গিয়ে কম বয়সী এক সক্ষম পুরুষের দারস্থ হয়। এক বছরের গোপন এবং বুনো এক সম্পর্ক তার শরীরের নতুন জোয়ার ফিরিয়ে দেয়। তবে পূর্বেকার সেই অস্থিরতা কখনই তাকে ছেড়ে যায় না। বুনো সঙ্গমের মাঝেও এক জোড়া মায়াবী চোখ তার দিকে গভীর ভালোবাসা নিয়ে চেয়ে থাকে। শেষ হয়ে যায় বুনো শুকরের মত উদ্দাম প্রেম। শান্তির জন্যে বিশ্বাসঘাতক হল সে, কিন্তু সেই শান্তি তো আর মিলল না! অস্থিরতা তো কাটলো না! শেষ মেশ নিজের ইগোকে জলাঞ্জলি দিয়ে খোঁজ শুরু করল সেই রূপবান লোকটাকে, মায়াবী এক জোড়া চোখ আছে যার। তাকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়! দীর্ঘ এক বছর ধরে খোঁজ খবর করেও পাওয়া যায় না তাকে। তারপর একদিন জেলা শহরে ডিসি হয়ে নতুন অফিসে যায়। জেলার ছোট বড় সব সরকারি অফিসের প্রধান কর্মকর্তা কর্মচারীরা অভিবাদন জানিয়ে গেল। চার-পাঁচদিন বাদে এক সরকারি ব্যাংকের ম্যানেজার আসলো সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে। ম্যানেজার দেখতে লম্বা, বিশাল শরীর, পেট গলা থেকে কোমর পর্যন্ত দশাসই, গাল ফুলে কুমরোর মত হয়ে গেছে। শেভ করেছে কিন্তু দাড়ির ঘনত্বে ঈষৎ নীলচে হয়ে আছে গালটা৷ শুধু এক জোড়া চোখ সেই রকম মায়াবী-ই রয়ে গেছে, আর আছে সেই খারা নাকটা। ব্যস্ত অফিস ঘরে ব্যাংক ম্যানেজারের সুখী চেহারাটা দেখে থেমে গিয়েছিল ব্যস্ত অফিস প্রধান রুবিনা। সেই রূপবান পুরুষকে এই অবস্থায় দেখে প্রথমে চিনতে পারেনি,  কিন্তু সেই চোখ জোড়া তো ভোলার নয়, যা স্থায়ী ভাবে গেথে আছে তার অন্তরে।
রুবিনাকে এক পলক দেখেই চিনে নিয়েছে আরিফ। এক গাল হেসে বলল, আরে স্যার! কেমন আছেন? চিনতে পেরেছেন আমাকে? আমি আরিফ!
সহজ স্বাভাবিক গলা। সেই যে ভালোবাসায় মাখা কাঁপা কাঁপা গলার স্বর, সেটা আর নেই! কিভাবে থাকে? সময় যে পেরিয়ে গেছে বহু।
আন্তরিক হাসি দেখে রুবিনা ভদ্রতার হাসি হাসলো। আরিফের কুঁচকে যাওয়া শক্ত গালের স্তুপাকৃতির মাংস  যে ভাষাটা উপহার দিল তা শুধুই আন্তরিকতার, সেখানে কোন আক্ষেপ নেই, নেই কোন না পাওয়ার বেদনা, নেই কোন অস্থিরতা। সেই মায়বী চোখের মায়া এখনো আছে কিন্তু তার চোখে দৃঢ় পুরুষালী দৃষ্টি চকমক করছে৷ বহুদিন বাদে ভালোবাসার মানুষকে দেখলে দুচোখ যেমন খুশি হয় সেই খুশি আরিফের মায়াবী চোখে অনুপস্থিত। সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে ফিরে যায় ব্যস্ত আরিফ। তার স্ত্রী কচি লাউ দিয়ে পায়েস রান্না করেছে। তার হাতের রান্না দশে দশ, এক বসায় দুই সের লাউয়ের পায়েশ খেয়ে ফেলা তার জন্যে আহামরি কঠিন ব্যাপার নয়। ভোজনরসিক মানুষটা বাসার দিকে এগিয়ে যায় দ্রুত।

রাতের বেলায় রুবিনার অস্থিরতা তাকে জেকে ধরে। গলা টিপে ধরে অতৃপ্তি। কিসের অতৃপ্তি এটা? না পাওয়ার? কি পায়নি সে? যৌবনের এই শেষ অংশে এসেও কয়েকজন উত্তম পুরুষের যৌবন সুধা আশ মিটিয়ে পান করেছে। প্রতিষ্ঠিত স্বামী, টাকা পয়সা, ঘর বাড়ি, সন্তান, সব পেয়েছে কিন্তু এক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পায় নি। যে লোকটার জন্যে সেই অস্থিরতা তাকে দেখে তো মনে হল না, সে একই রকম অতৃপ্তি নিয়ে আছে! তাহলে? সে কেন এই অস্থিরতায় ভুগবে?
এই প্রশ্নের উত্তর মেলে না।
ব্যস্ততার মাঝেও কখনো কখনো রুবিনা ব্যাংক ম্যানেজারকে খবর দিয়ে কথা টথা বলে। অবাক হয়ে মেলায় সেই মায়াবী দুচোখ। একই রকম আছে কিনা। মায়ায় বাধানো দুচোখ মিলে যায়--একই রকম। শুধু সেই দুচোখে নেই সেদিনের মুগ্ধতা। রুবিনার জন্যে কামনা বোধ বা বুনো অস্থিরতা খুঁজে পাওয়া যায় না সেখানে। লোকটার নিরুদবিগ্ন এবং সৌম্য চেহারা রুবিনাকে আরো বেশি অস্থিরতায় ডুবিয়ে দেয়।

Sabbir ahmed, Shopon shill, Sm samim, Alom khan, Israt zahan, Salman reja, Foisal Hossain and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum