সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 10
স্বর্ণমুদ্রা : 263
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-06-16
Age : 33
Location : Dhaka, Bangladesh
View user profile

একজন সরকারি কর্মচারীর আত্বহত্যা Empty একজন সরকারি কর্মচারীর আত্বহত্যা

Tue Jun 22, 2021 3:43 pm
--কিরে চুমকি, কি খবর?
--খবর ভালো। কেমন আছো, খালেদ ভাই?
--তোরে না কইছি আমারে তুমি করে বলবি না? আগে তো তুই করে বলতিস!
--এহহ! আইছে! আগের কতা আগে গ্যেছে! এহন আমার যা ইচ্ছা বলব! তুমিও আমারে তুমি করে বলবা। কদিন বাদে তো আমাদের বিয়ে হবিই।
--তোরে না এই প্রসঙ্গে কথা বলতে না করছি!
--ইষ! না করলেই আমি শুনবো নাকি? তুমি আমার বর। আমি একশ বার বলব!
--আমারে বর বানানোর জন্যে আরো কত মানুষ আছে জানিস?
--থাকলে কি! আমার বাপের টাকায় তুমি পড়ছ! বড় অইছ! চাকরি পাইছ! আমিই তোমার বউ হবার আসল হকদ্বার। আমিই তোমার বউ!
ফোনটা না কেটে নামিয়ে রাখলাম। ও ওর মত বলতে থাক। মাথার পেছনের দিকে একটা চিনচিনে অস্বস্তি অনুভুতি তৈরি হল আমার। বিষয়টা বেশিরভাগ পুরুষের জন্যে উপভোগ্য হলেও আমি অন্তরে যাতনা বোধ করি, তাই এই প্রসঙ্গ এলে চুপ করে থাকি অথবা কিছু না বলে ফোন কেটে দেই। কি-ই বা বলার আছে? ও যা বলেছে তা সত্য। চুমকির বাবা মানে আমার চাচা কলিমুদ্দিন আমার বাবার বড় ভাই। বড় মানে খুব বেশি বড় না, এক দেড় বছরের বড়। এই চাচা আমার বহু উপকার করেছে। ছাত্র জীবনে আমার পড়ালেখার খরচ নিয়মিত দিয়েছে। সুবিধা অসুবিধার খোঁজ খবর নিয়েছে। উপকারের বিনিময়ে সে চায় প্রতিদান। তার মেয়েকে আমার বিয়ে করতে হবে এবং তার পরিবারের দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো চুমকির প্রতি আমার ভেতরে কোন দৈহিক বা মানবিক আকর্ষণ বোধ জন্ম নেয় নি। আমি চেষ্টা করেছি চুমকির প্রতি একটা আকর্ষণ বোধ নিজের মধ্যে জন্ম দিতে, তৈরি করতে, কিন্তু পারিনি। চাইলেই কারো প্রতি আকর্ষণ বোধ তৈরি হয় না। তার উপর ছোটবেলা থেকে যে মেয়েটাকে নিজের বোন হিসেবে জেনেছি তার প্রতি হঠাৎ করেই আকর্ষণ বোধ তৈরি করে ফেলব, সেটা আশা করাও ঠিক হবে না। হয়ত ভবিষ্যতে কিছু একটা তৈরি হবে। একসাথে থাকতে থাকতে নাকি বহু কিছু হয়ে যায়। পরিপূর্ণ নারী দেহের প্রতি পুরুষের সহজাত আকর্ষণ বোধ কাজ করে কিন্তু সেটা চোখের আড়াল হলে খুব বেশি থাকে না, মিইয়ে যায়। চোখের আড়াল হলেই যেটা মিইয়ে যায় না, মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে মনের পর্দায়, সেটা অন্য কিছু। সেটা আবার চাইলেই পাওয়া যায় না।

আমার বাবা একজন দিন মজুর। নিয়মিত ভ্যান চালায় আর ফসল কাটা, তোলার সময় দিন প্রতি চুক্তিতে মানুষের ক্ষেতে কাজ করে৷ এখনো করে, অর্থাৎ আমি চাকুরি পাবার পরেও করে। আমি নিষেধ করেছি। নিষেধ করার পরে এক দুই বার বাদ-ও দিয়ে দিয়েছিল কিন্তু বাধ্য হয়ে আবার একই কাজে ফিরে এসেছে। আমি আমার বাবা মায়ের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম টাকা পাঠাতে পারি। এর কারণ বহুবিধ। প্রথম কারণ, এদিক সেদিক করে আমার বাবা বহু ঋণী হয়ে গেছে। এই ঋণের পরিমাণ একেবারে কম নয়। নিয়মিত পাওনাদারদের কিছু কিছু টাকা দিতে হয়। আর একটা কারন এই যে, আমি মানুষ হিসেবে ছোট বেলা থেকেই অক্ষম; কোনকিছুই আমি সেভাবে ম্যানেজ করতে পারি না। এখন চাকুরি পাবার পরও তেমনই আছি। মানুষ জব করলে বদলে যায়, এটা সত্য নয়। আমি সাকুল্যে সাতাশ হাজার টাকার নীচে বেতন পাই। আমার দুই চাচা আমার বেতনের হকদ্বার। হ্যা, কথা সত্য। শুধু বড় চাচাও নয়, আমার বাবার ছোট ভাই ছলিমুদ্দিনও আমার বেতনের হকদ্বার৷ দুই চাচা আমার জন্যে যা করেছে তা আমার বাবা তা করেনি বা করতে পারেনি। তারা দুজনেই আজ আমাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তাই দুই চাচার দাবী আমাকে মেটাতে হয়। ছোট চাচা ছলিমুদ্দিন-ও বড় চাচার মত একই স্বপ্নে বিভোর। তার-ও একটা বিবাহ যোগ্য মেয়ে আছে, সেই মেয়ের নাম ঝুমকি। চুমকি আর ঝুমকি দুই চাচাতো বোনদ্বয় পাচ বছরের ছোট বড়। কিন্তু একই উচ্চতা বিশিষ্ট, একই চেহারার গঠন, একই ধরনের স্থুল বুদ্ধির দুই নারী। চুমকির বয়স ২৩ বছর, ঝুমকির ১৮ বছর হল মাত্র। শুধুমাত্র মেধাভিত্তিক মিল-ই নয়, অন্যান্য বহু কিছু বিষয়ে একজনের সাথে অপর জনের মিল রয়েছে। যেমন দুজনের-ই ধারণা গায়ের রঙ কিছুটা ফর্সা হলেই নারীর জীবন স্বার্থক হয়ে যায়। আর একটা মিল হচ্ছে, দুজনের জীবনের লক্ষ্য-ই এক--দারোগার বউ হবে। আমার মতে, 'দারোগা' হল ব্রিটিশ আমলে জন্ম নেওয়া কুৎসিত আর বিশ্রী একটা শব্দ; গালির মত ব্যাপার। কিন্তু মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কন্যার বাপ-মা গালভরে, তৃপ্তি সহকারে এই শব্দটি উচ্চারণ করে। যাহোক, আমার চাচাতো দু'বোনের পিতামাতা-ই চায় তাদের জামাই একজন পুলিশ হোক। এটা তাদের অন্যায় দাবী নয়। তাদের দুই পরিবারের কাছে আমি বড় রকমের ঋণী। ঋণ শোধের ব্যাপারটা আমার কাছে বড় ব্যাপার। তাই তাদের চাওয়াটা অযৌক্তিক বলা যাবে না।
মাস শেষ হতে না হতেই চাচারা ফোন বড় সর কয়েকটা বাজেট ধরিয়ে দেয়। যেমন, একটা সেগুন কাঠের আলমিরা, একটা মেহগনি কাঠের বক্স খাট ইত্যাদি। তারা এটাও বলে, কষ্ট করে আমাকে বাড়িতে গিয়ে ওগুলো কিনে দিতে হবেনা, টাকা পাঠিয়ে দিলেই হবে। আমি বুঝি--সরাসরি টাকা চাইতে একটু লজ্জ্বা বোধ করে। আশা করি অদূর ভবিষ্যতে তাদের এই বিরক্তিকর লজ্জ্বাবোধ থাকবে না; পেঁচিয়ে না বলে সরাসরি টাকা চাইবে। আমি সহজ সোজা মানুষ, প্যাঁচ ঘোঁচ কম বুঝি। শুধু চাচারা নয়, যৌথ পরিবারের সকলেই কম বেশি দাবী দাওয়া নিয়ে আসে। এর কারণ পড়ালেখা শুরুর সময় থেকে শুরু করে চাকুরিতে বেতন শুরু হওয়া অবধি এর ওর কাছ থেকে টাকা ধার করে চলেছি আমি। আজ তারা ফেরত চাইলে জান থাকতে সেটা আমাকে দিতেই হবে। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছি। কিন্তু তাদের এই চাওয়াটা আমার বেতন ছাড়িয়ে চলে যায়। কোথায় পাব আমি? তাদের অনেক বড় একটা অভিযোগ, পুলিশের তো অনেক ইনকাম, শুধু আমি কেন এত কম টাকা পাই? এত কম কেন দেই? এই অভিযোগের জবাব আছে কিন্তু তা এদেশের মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
আমার মা বাবার কথা কি লিখবো? মা তো মা-ই। তার কোন তুলনা হয় না। তবে তাদের শিক্ষা অল্প। অল্প শিক্ষার বুঝ-ও অল্প। শিক্ষা অল্প হলে ভালোবাসা বেশি হয়। কিন্তু আমি কেন যেন ভালোবাসা সেভাবে পাইনি। কিংবা পেয়েছি কিন্তু উপলব্ধি করতে পারিনি। ভালোবাসা শুধু পাবার বিষয় নয়, উপলব্ধি করার ব্যাপারও আছে। আবার আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমি নিজে কি তাদের সেভাবে ভালবাসি? ভালোবাসার ক্ষমতা আমার মধ্যে খুব-ই অল্প। তাই আমি আমার বাবা মাকে সেভাবে ভালোবাসতে পারিনি, পারলে কেন মাঝে মাঝে নিজেকে এত অসহায় মনে হয়? কেন মনে হয়, আমি একা! বড্ড একা! কেন মনে হয়, একাকী আমি চলে যাই কোথাও! বহু দূরে কোথাও! এতদুর যেখানে চাচাতো বোনরা আমাকে ফোন করে বলতে পারবে না, তাদেরকে আমার বিয়ে করতে হবে, কারন তার বাবার কারনেই আমি আজ সরকারি কর্মজীবী।
মাঝে মাঝে আমি মনে মনে খুব হাসি! সরকারি কর্মজীবী! কি চাকুরী করি আমি? একজন এসআইকে দূর থেকে কত বড় মনে হয়? মানুষ যা ভাবে আসলেই কি তাই? কি ক্ষমতা আছে তার? কি-ই বা করতে পারে সে?
আমি যে থানাতে চাকুরী করি সেখানে বড় কর্মকর্তা যেসকল বৈশিষ্ট্যের কারণে এসআইদের ভালোবাসে সেসব আমার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় নি, কোনদিন যাবেও না হয়ত, তাই আমার দিকে ভালোবাসাটাও গড়াতে শুরু করেনি। আমি চাই-ও না ভালোবাসা। ভালোবাসা কিভাবে চাইব? আমি তো নিজেই কাউকে ভালোবাসতে পারি না! যে ভালোবাসতে পারে না, সে কি ভালোবাসা পাবার অধিকার রাখে? আমার অন্তরের ভালোবাসা দেবার এবং পাবার চাহিদা শূন্য হয়ে গেছে।
আর মোহনা! মোহনা কি আমাকে ভালবাসে? তিন বছর আগে যে মেয়েটির চোখের হাসি দেখে আমার হৃদপিণ্ডটা থরথর করে কেপে উঠেছিল? তাকে একবার দেখতে পাবার আকঙখা আমার সময় গুলোকে গাঢ় নীল রঙে রাঙিয়ে দিত। একবার আমাকে ফোনকল করলে বেঁচে থাকার আকঙখাটা জোড়ালো হতে থাকতো! তাকেও কি ভালবাসতে পেরেছি আমি? হয়নি ভালোবাসা, তাই সম্পর্কটাও উন্নত হয়নি। অবশ্য মনে মনে আশা করেছিলাম খুব!
সেদিন আমার বড় চাচাকে বলতে চেয়েছিলাম, আমার সব ইচ্ছাই তো আপনারা পূরণ করলেন! আর একটা কি করবেন? চাচাতো আমাকে নিয়ে 'পুলিশ জামাই' যুদ্ধটা থামিয়ে দিবেন আর মোহনা নামের একটা মেয়েকে এনে দিবেন। সেই মেয়েটা মাস শেষে টাকা চাইবে না, বলবে, 'তুমি বাড়িতে এস! কতদিন খেজুরে গুড়ের পায়েস খাও না!' চাচাকে এই প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হয়েছিল। পারবেন আপনি? আমি এই প্রশ্ন করতে পারিনি। তার মনে কিভাবে কষ্ট দেই? সে যে বড় আশা করে বসে আছে! 'দারোগা জামাই' হবে তার! যদি শেষ অবধি বেচে থাকি তো এক কন্যার জনক হব আমি। তাকে পুলিশের সাথে বিয়ে দেব না। তাকে একজন শক্ত মনের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলব। বিয়েটা সে নিজেই করবে।
চুমকি আর ঝুমকিকে দোষ দেই না আমি। মানুষের কথাবার্তা, আচরণ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ হয় শিক্ষার মাধ্যমে। শিক্ষা উন্নত না হলে এগুলোও উন্নত হয় না। আর শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ে থাকে না৷ শিক্ষা থাকে বাবার একটা শান্তিময় বাক্যে, আর সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে মায়ের প্রার্থনায়। যে প্রার্থনায় থাকে, 'হে আল্লাহ, আমার সন্তানকে আপনি ভাল রাখুন, সুস্থ রাখুন, সে যেন ভাল মানুষ হয়ে বাঁচে।'
আমার যৌথ পরিবারের সব বাবা মা তাদের মেয়েদের জন্যে আল্লাহর কাছে চায় ভাল জামাই আর ছেলেদের জন্যে চায় সরকারি চাকুরি। আল্লাহ কি ম্যারেজ ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি খুলে বসে আছে? নাকি সে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক? তার কাছে এ ছাড়া কি আর চাইবার কিছু নেই? কিন্তু আমি জানি এ-ই আমাদের বাবা মা, আত্বীয় স্বজনের চাওয়া। উত্তম চাকুরি আর উত্তম সম্পদ প্রাপ্তি। আমি তো সম্পদ হতে পারলাম না। আর হবার কি সম্ভাবনা আছে? এই সামান্য টাকা দিয়ে আমি এতগুলো মানুষের সফল প্রার্থনার কারন কিভাবে হব?

একারণে আর একটু ভাল চাকুরি প্রাপ্তির চেষ্টায় রত আছি; আর একটু বেশি বেতনের চাকুরি। সেই বেশিটুকু যদি মানুষগুলোর হাসিটা আরো চওড়া করতে পারে তো দোষ কি? এ চেষ্টা সফল হওয়া খুবই শ্রম সাপেক্ষ ব্যাপার। তবুও লেগে আছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই কি মানব জীবনের উদ্দেশ্য হতে পারে? একটা বড় অবস্থান?
মানুষের অবস্থান কি সৃষ্টিকর্তার হাতে নয়? আমি ধনী মানুষ হতে চাইব কেন? সৃষ্টিকর্তা কেন আমাকে ধনী মানুষের সন্তান করে পাঠালেন না? যেহেতু তিনিই চাননি আমি ধনী হই, তাহলে আমি ধনী কেন হতে চাইব? তাহলে আমি কি চাইব? কি চাইব সেটার প্রশ্নের উত্তর কি আমি জানি? আমি এখন চাই আর একটু ভাল জব, আর একটু বেশি বেতন যাতে আমার ঋণগুলো শোধ হতে থাকে। আর আমি সেটা যদি পেয়েও যাই, তারপর আমি কি চাইব? পদন্নোতি, সম্মান, বৈধ বা অবৈধ পথে প্রচুর অর্থ। এগুলোও যদি মিলে যায়! তারপর কি চাইব? একদিন কি আমি মৃত্যু চাইব না? যে মৃত্যু রোধ করে দিবে এই দৌড়াদৌড়ি? বিরামহীন ছুটে চলা? যে মৃত্যু জানিয়ে দিবে একথা। বলবে, 'তুমি তো আমার প্রতিক্ষাতেই ছিলে এতদিন!'
মৃত্যুর জন্যে প্রতিক্ষাই কি আসল প্রতিক্ষা নয়? মৃত্যুই কি আসল চাওয়া নয়? অনেকে আমার সাথে একমত হতে পারবে না। বলবে, মৃত্যু কেন মূল চাওয়া হবে? পৃথিবী কত সুন্দর! বেঁচে থাকাটা কত আনন্দের! আমি বলি, পৃথিবী হোক আর অন্য জায়গায় অন্য সময়ে হোক, এ এক মহাযাত্রা। মৃত্যু শুধু পথের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যাত্রা থামিয়ে দিতে পারে না। অদেখা সেই অপর পথটি যদি ক্লান্তিহীন, ব্যস্ততা বিহীন, প্রতিযোগিতা বিহীন হয়! যদি প্রত্যাশা পূরণ বলে কিছু না থাকে সেখানে! যদি টন কে টন ঋণের বোঝা না থাকে সেখানে! তাহলে মৃত্যুর পরের সেই পথ, সেই সময়টা আমাদের এই সময়ের চেয়ে খারাপ কোন অংশে? তাছাড়া যদি সে জগতটা হয় পৃথিবীর থেকে বেশি রূপময়?

মোহনা বহুদিন বাদে সেদিন আমাকে ফোনকল করেছিল। বলল, তুমি কি একবার দেখা করতে পারবে?
আমি বললাম, যদি বিসিএস পরীক্ষা দিতে আসি, তো সেদিন দেখা হবে।
--তুমি কি এখনো বিসিএস ক্যাডার হতে চাও?
সে ভেবেছিল আমি দৌড়টা থামিয়ে দিয়েছি।
বিষন্ন গলায় বললাম, কেন? আমার কি সেটা হতে নেই?
--হুম। এই যে এত ব্যস্ত থাকো। তারপরও পড়ালেখা করতে হবে?
আমি পড়ালেখা সেভাবে করিনা, বা করতে পারিনি। তবুও বললাম, করতে তো হবেই। এখানে অনেক জ্বালা। অন্য কোথাও কিছু একটা হলে জ্বালাটা যদি একটু কমে?
--জ্বালা সবখানেই আছে। এ জীবনটা জ্বালায় মাখামাখি।

হুম। মোহনা সেদিন বলেছিল জ্বালা সবখানেই আছে। আসলেই পৃথিবীটা একটা জ্বালাময় জায়গা। মোহনার মত করে কেউ কথা বলে না। কেউ ভাবে না, এত কষ্ট কেন করব? এখানেও জ্বালা, সেখানেও জ্বালা। তাহলে কেন এত চাপ নেব? এভাবে কেউ বলে না। মোহনার মত কেউ কোথাও নেই। তবুও সে বহু দূরের মানুষ। কোন সম্পর্কেই আমি তাকে বাধতে পারিনা। চুমকি, ঝুমকি, ওরা এভাবে ভাবতে পারেনা। বোঝেও না। বিসিএস ক্যাডার কি জিনিস সেটা ওরা যদি বুঝতো, তাহলে আমাকে জোড়সে চাপ দিয়ে ধরত। বলত, ওরা বিসিএস ক্যাডারের বউ হতে চায়। ওদের চোখে দারোগার বউ মানে ভীষণ বড় কিছু। এর থেকে বড় কিছু আর এ জীবনে কিভাবে হওয়া যায়? দারোগা! মনে হয়, এই শব্দটা উচ্চারণ করলেই একটা বিশ্রী গন্ধ বের হচ্ছে! এছাড়াও শব্দটার মধ্যে একটা জাদরেল জাদরেল গন্ধ আছে। এদেশের বেশিরভাগ মেয়ে এটায় চায়--বরটা জাদরেল হবে। সমাজের মানুষ তার বরের জোরে তাকে সমঝে চলবে। কি আর করবে? আমাদের দেশের মেয়েদের নিরাপত্তার বড় অভাব! শিক্ষার চেয়ে এটা আরো বড় অভাব বোধ।

আমি জানি মোহনা আমার হবে না। সে-ও জানে। তার সাথে আমার কোন প্রেম হয়নি। সে হতে দেয়নি, আমিও না। দূরের কিন্তু এটা পরিচিতের চেয়েও বেশি এক ধরনের সম্পর্ক। তবে মনে হয়, আমরা দুজন দুজনের খুব বেশি পরিচিত। সে আমাকে খুব ভাল করে চেনে, যেন আমার মনটা শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের পাতার মত পড়তে পারে। সে জানে, আমি অকৃতজ্ঞ হতে পারব না, আমার যৌথ পরিবারের ঋণ না শোধ করে আমার আত্বা শান্তি পাবে না। তবুও সে মাঝে মাঝে আমাকে একবার দেখতে চায়। আমার চোখের তারায় নাকি সবসময় একটা হাসি ভেসে বেড়ায়! আমি ভাবি, আমার চোখেও হাসি থাকে! শুনতে অদ্ভুত লাগে তার কথাবার্তা। তবে সে আমার চোখে কি পাক বা না পাক সেটা আসল কথা নয়। তার পাশে বিশ পচিঁশ মিনিট বসে থেকে আমি আমি যে শান্তি পাব, তাতে দশ দিন আমাকে মৃত্যুপ্রেম থেকে দূরে রাখবে। তার পাশে আমি মাত্র একবার-ই মিনিট বিঁশেক বসে ছিলাম। সে এক অনন্য অনুভূতি। চাইলেই যেসব অনুভুতি কথায় প্রকাশ করে যায় না, এই অনুভুতি ছিল সেরকম একটা বোধ। ঠান্ডা আর শান্ত একটা অনুভূতি আমার অস্তিত্বকে ছেয়ে রেখেছিল।

মাঝে মাঝেই ভাবি, মৃত্যুপ্রেম আবার কি? মৃত্যুর প্রতি প্রেম? নাকি অপেক্ষার অবসান? জীবনটা কি মৃত্যুর প্রতি অপেক্ষা নয়?

আমার ছোট চাচা খুব-ই গোছালো স্বভাবের মানুষ। প্রথম থেকে শুরু করে আজ অবধি আমার পেছনে তিনি যত টাকা খরচ করেছেন সেগুলো ব্যাক্তিগত ডায়েরীতে হিসেব করে রেখেছেন। হিসেব করে রাখাটা খুব-ই ভাল একটা গুণ। তিনি আমাকে কখনো টাকার খোটা দেননা। কিন্তু মাঝে মধ্যে পারিবারিক ব্যাপারে মতের অমিল হলে আমাকে আর আমার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি তোদের পিছনে এত টাকা(নির্দিষ্ট এমাউন্ট) খরচ করেছি সেটা আমি কাউকে বলি কখনো? সেই টাকা কি আমি চাই? আমাকে সে টাকা দেওয়া লাগবে না। কারো উপকার করে বিনিময়ে আমি কিছুই চাইনা।
এই রকম পরিস্থিতিতে পরলে আমার মাথার মধ্যে সুক্ষ্ম যন্ত্রণাবোধ তীব্রতর হয়। মনে হয় নিজের ভেতরকার সমস্ত মূল্যবান কলকব্জা বিক্রি করে দিয়ে যদি প্রচুর টাকা পেতাম, তা দিয়ে সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে ফেলতাম। এ ছাড়া এই চাচা আমাকে আর একটা কথা বলেন, যা আমার জন্যে প্রিতিকর নয়। এই ব্যাপারটা খুটিয়ে না বললে কেউ বুঝবে না। গত মাসের পনের তারিখে তিনি ফোন কল করে বললেন, কিরে আছিস কেমন?
--ভাল আছি, আপনি কেমন আছেন?
--ভাল নারে। কোমরের ব্যাথাডা বাড়ছে।
--ডাক্তারের কাছে গিছিলেন?
--না। ডাক্তার দেখাবো না। কাম অয় না। তর বড় কাকা কি তরে ফোন দিছিল নাকিরে? কিছু কইছে?
--কি আর বলবে!
--টাকা চায় কেন?
--টাকা দরকার হলে তো চাইবেই।
--দেখ! তুই যা মনে করবি তাই কর।
--হুহ।
--আমার কথাডা ফেলিস নে যেন!
--কি কথা যেন, কাকা!
--আমার যা খরচ অইচে অইডা কোন ব্যাপার না, বাপ! আমারে টাকা পয়সা কিছু দিতি হবেন না। শুধু ঝুমকির ব্যাপারটা দেহিস!
--আচ্ছা দেখি!
--ওর সাথে একটু কথা কইস!
--আচ্ছা কথা বলব।

আমি কি খাচ্ছি, নাচ্ছি কোথায়, শুচ্ছি কোথায় এটা কেউ জিজ্ঞাসা করে না। সবাই ভাবে পুলিশ হল রাজার জাত। তারা উন্নত খায়, উন্নত জায়গায় ঘুমায়, রাজদিঘিতে রোজ স্নান করে শরীরের গন্ধ দূর করে।
আমার কাকা তার মেয়ের ব্যাপারে ভাবতে বলল। যখন এসব বলে তখন আমি সেসব ব্যাপারে একটু আধটু ভাবার চেষ্টা করি। ঝুমকি মেয়েটা বেশ সাহসী। গতবার বাড়িতে গেলে যখন আমি ফরমালিটি দেখাতে ওদের ঘরে গিয়েছিলাম তখন আমাকে জোর করে ওর বুকের সাথে চেপে ধরেছিল। ঝুমকিকে ভাবতে গেলে এই দৃশ্যটাই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। অশ্লীলতা, দৈহিক সংযোগ মানব মনের অত্যন্ত প্রিয় বিষয়। লোক চক্ষুর আড়ালে মানুষের মন অশ্লীলতা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে খুব-ই ভালোবাসে। মানুষের মন কখন কি ভাবছে সেটা যদি ত্রিমাত্রিক ভিডিও দৃশ্যের মত দেখা যেত তাহলে বোঝা যেত মানুষের মত অশ্লীলতা কতখানি ভালোবাসে। তবে শরীরের জৈবিক বৈশিষ্টের তারতম্যের কারনে এই ভাবনার ভিন্নতা ঘটে।
ঝুমকির প্রতি জৈবিক আকর্ষণ থাকুক বা না থাকুক ঐ একটা স্মৃতি আমার নিজের মন আমার বিরুদ্ধে গিয়ে আউড়ে যায়। তবে এই স্মৃতি কখনোই তার প্রতি আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়নি। সম্ভবত যাবেও না কোনদিন।

মানুষ নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে খুবই কম সময়ের জন্যে। বাকি বেশিরভাগ সময়ে মানুষের মন থাকে লাগামছাড়া। নির্দিষ্ট কোন কিছু নিয়ে মানুষের মন ভাবতে ভালোবাসেনা, মানুষের মন যেটা করে সেটার নাম হল চেতনাপ্রবাহ। মনের মধ্যে একটা ঘটনা প্রবাহিত হলে সেটার সূত্র ধরে আরেকটা ঘটনা আসে, সেটার সূত্র ধরে আরেকটা। এভাবে মানুষের মন নিত্য কিছু না কিছু ভাবে। এটা একটা স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। মানুষ ঘুম থেকে উঠলেই এই প্রক্রিয়া চালু হয়ে যায়। আমি যা ইচ্ছা করে ভাবতে চাই তা বেশিক্ষণ ধরে ভাবতে পারিনা; চেতনাপ্রবাহ সুতো ছিরে ভাবনার ধারা অন্য কিছুতে নিয়ে যায় আমাকে।
ইদানীং আমার মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত্যু নিয়ে ভাবছে। আমি বার বার নিষেধ করি তাকে। মৃত্যু নিয়ে কেন ভাবিস, ভাই? তবুও সে তাই-ই ভাবে। হয়ত আমার অবচেতন মন অকারণ যন্ত্রণা সইতে পারে না বলে আমাকে সবসময় মৃত্যুচিন্তার দিকে চালিত করে।
এই যে বিশাল একটা পরিবার হা করে আছে। তাদের শুধু খাওয়াতে হবে। আমি তো রাজী ছিলাম তাদের খাওয়াতে-- আজীবন। যতটুকু পারি নিজের সাধ্যের মধ্য থেকে। বিনিময়ে আমি একটু শান্তি চেয়েছি ওদের কাছে। সেটুকু পেয়েছি কিনা তা আমার মন-ই বলতে পারবে। আর আমার বিশাল পরিবার কখনো ভেবেছে, আমার মনের একটা চাওয়া থাকতে পারে? একটা ভালোলাগার অনুভুতি থাকতে পারে? এটা কেউ ভাবেনি।
এই যে বেড়ে ওঠা, ভাল ছাত্র হয়ে বাঁচতে চাওয়া, নাম করা প্রতিষ্ঠানে পড়া, সরকারি চাকরি করা, এগুলো কি আমি এই মৃত্যু প্রেম তৈরি হবার উদ্দেশ্যে করেছিলাম? না কি আমার একটা চাওয়া ছিল? পরিকল্পনা ছিল? এখন কোথায় গেল সেই পরিকল্পনা? আরো একটা বড় চাকুরী পাবার প্রচেষ্টা তো আমাকে শান্তি দিল না! আমার শান্তি প্রাপ্তি কি মৃত্যুর মধ্যে নিহিত? বার বার কেন মুক্তি চায় এ মন?

সেদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘূর্ণনরত ফ্যানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম। উঠে গিয়ে ফ্যানটা বন্ধ করে আবার শুয়ে পরলাম৷ মার্চ মাসের এই সময় ফ্যান চালু রাখলে হালকা শীত লাগে, না রাখলে গরম। একটা বিশ্রী অবস্থা। ফ্যানের পাখা গুলো থেমে যেতে মনে হলো, একটা রশি বেধে ঝুলে পরি। তবে তার জন্যে দরকার একটা চেয়ার আর একটা রশি। এছাড়া ঘরে অন্য একজন লোক আছে। কাজটা করতে হবে নির্জনতার সাথে। নির্জনতা মৃত্যুর জন্যে খুবই প্রয়োজনীয় --একটা শান্ত সমাহিত ভাব আসবে। তাছাড়া পাশে কেউ থাকলে আমাকে ঝুলে পরতে দেবে না, বাধা দেবে।
ব্যাপারটা কল্পনা করতে গিয়ে আমার একটা ভীষণ ভাল রকমের অনুভুতি হল। মাথার মধ্যে ভেসে বেড়ানো চিনচিনে যাতনাযুক্ত হিজিবিজি ভাবনা গুলো মাথা থেকে বেড়িয়ে গেল। মাথাটা একদম হালকা এবং পরিষ্কার লাগলো। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, মাঝে মাঝে আত্বহত্যার পরিকল্পনা করা দরকার। মরি বা না মরি একটা ভালোলাগা তো কাজ করবে!

আত্বহত্যা করতে চাওয়ার এই পরিকল্পনা আমাকে বেশ স্বস্তি এনে দিল। তাই মাঝে মাঝে কল্পনা করি, নিজ প্রচেষ্টায় আমি মরে যাচ্ছি। শুধু কল্পনাই নয়, নিজের অজান্তে এখানে সেখানে লিখেও রাখছি,'আমি মরে যেতে চাই'। পৃথিবীতে কোন মানুষের মরে যাওয়ার ইচ্ছা বা কল্পনা এতটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে সেটা আমি আগে কখনো বুঝিনি। আমার সাথে অনেকেই একমত হবে না, কিন্তু ইহা সত্য। একবার ভাবুন, পৃথিবীতে প্রতি চল্লিশ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্বহত্যা করে। এটা একটা পরিসংখ্যান, কিছু কমবেশি হতে পারে। মানুষ অবর্ননীয় মানসিক যাতনা থেকে মুক্তির পথ হিসেবে এই উপায়কে বেছে নেয়। আমার মত যারা প্রতিনিয়ত বীভৎস যন্ত্রণার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় তাদের কাছে মৃত্যু চিন্তা কতটা স্বস্তিদায়ক সেটা অন্যেরা কেউ কখনো অনুধাবন করতে পারবে না।

বিসিএস পরীক্ষা তো দেব কিন্তু পড়িনি তো কিছুই৷ গত একটা বছর ধরে মনে মনে পরিকল্পনা করে এসেছি পরদিন থেকে পড়ালেখা করব। কিন্তু গাফলতি এবং করোনা মহামারীতে থানা পুলিশের ব্যস্ততার কারনে পড়ালেখা করাটা সেভাবে হয়ে ওঠেনি। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার এক সপ্তাহে আগে সিদ্ধান্ত নিলাম, পরীক্ষা দেব না। বিসিএস পরীক্ষা এমন একটা ব্যাপার, যেটা অল্প পড়ালেখা করে দিতে যাওয়াটা বড় রকমের বোকামি। তাছাড়া ইদানীং আমি মানসিকভাবে অত্যন্ত অমনোযোগী এবং অস্থির হয়ে আছি৷ এই অস্থিরতার মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আরো বেশি অস্থির হতে চাইনি। আমার মা যখন ফোনে জিজ্ঞাসা করল, বিসিএস পরীক্ষা দিবিনে, বাপ?
আমি বললাম, স্যার ছুটি দেবেনা।
মিথ্যা করে বললাম। বাবা মাকে সত্য বললে তারা বেশি চিন্তা করবে। আমি যদি তাদের বলি, আমি বিসিএস পরীক্ষা দেব না; আমি বড় হতে চাই না; আমি আর কোন লেন দেনের অংশ হতে চাইনা; আমি শান্তি চাই, বিপুল আর মহাশান্তি, তাহলে তারা সেটা বুঝবে না কিংবা বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই। আমার বাবা মা এত পরিমাণে ব্যস্ত থাকে যে মৃত্যুর কথা ভাবার সময় হয় না তাদের। কিন্তু ব্যস্ত থাকলেও আমার সময় হয়, আমি মৃত্যু নিয়ে ভাবি। যেদিন মৃত্যু নিয়ে ভাবি সেদিন আমি কিছুটা শান্তিপূর্ণ সময় কাটাতে পারি।
বিসিএস পরীক্ষা চলে গেল। আমার আর একটা স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে গেল। তবে এক দিক দিয়ে ভাবলে এটা কিছুই না। আমি তো মরে যেতে চাই। যে মানুষ মরে যেতে চায় তার বিসিএস অফিসার না হলেই ভাল। তবুও ভেতর ভেতর একটা আফসোস দানা বেঁধে উঠতে থাকে৷ একটা সময় বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, প্রচুর অধ্যয়ন করেছিলাম। স্বপ্নও কম দেখিনি। এই সেদিনও বিশ্বাস করতাম, পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না। কিন্তু আমার সব প্রস্তুতি-ই জলে চলে গেল। কত শত নির্ঘুম কাটানো রাত অপ্রাপ্তির হতাশায় বিস্মৃতি হয়ে গেল। সব পরিশ্রম-ই ফল বয়ে আনে না।
এই মুহুর্তে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, আমার এত কষ্ট লাগছে কেন? কেন মাথার মধ্যে চিন চিনে যাতনাবোধ কাজ করছে? তাহলে কি আমি স্থায়ী রোগাক্রান্ত হয়ে গেলাম? আমি কি ডিপ্রেশনের চুড়ান্ত মাত্রায় পৌছে গেলাম? এই মাত্রায় পৌছে গেলে একজন রোগী সবকিছুর মধ্যে হতাশা খুঁজে পেতে থাকে। নিজের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অপ্রিয় কিছু ঘটলেই তাকে চরম হতাশায় পেয়ে বসে। এই যেমন, আমি নিজের ইচ্ছায়-ই পরীক্ষাটা দিলাম না, আবার দিলাম না বলেই আমার মধ্যে আফসোস আর কষ্টবোধ কাজ করছে। এই কষ্ট বোধের কারণ হল চুড়ান্ত হতাশা। আমি অল্পতেই কেন এত হতাশ হয়ে যাই? বিসিএস দিলাম না তো কি হয়েছে? কত মানুষ-ই তো আবেদন করে পরীক্ষা দেয় না!

মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। পুরো একটা দিন মাথার মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা বয়ে বেড়ালাম। রাতে শুয়ে আছি কিন্তু ঘুম আসছে না দুচোখে। এ যাবতকালের সব অশান্তি যেন চেপে ধরলো আমার মস্তিষ্কটাকে। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির একটা পথ আমার জানা আছে। একমাত্র মৃত্যুচিন্তা-ই আমাকে শান্তি দিতে পারে। মৃত্যুই হয়ত অন্য এক শান্ত জগতে নিয়ে যেতে পারে।
গত বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছিলাম, সরকারি পিস্তলটা মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগারটা টিপে দেই। এক সেকেন্ডে মহানিরবতা আমাকে গ্রাস করবে। এরকম একটা দৃশ্য কল্পনা করতেই ভেতরটা শান্ত হয়ে আসে। আজ মধ্যরাতে ট্র‍্যাংকের তালা খুলে পিস্তলটা নিয়ে বের হলাম। ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। ম্যাগজিনে আটটা গুলি ভরা আছে। মনে মনে হাসি পেল। একজন মানুষের জন্যে একটা গুলি-ই যথেষ্ট, সেখানে আটটা গুলি দিয়ে কি করব? তাছাড়া আমি যে আজ সুইসাইড করব-ই তার কোন নিশ্চয়তা নেই। মন চাইলে ট্রিগার চেপে দিব, না চাইলে হবে না। এর আগেও কয়েকবার পিস্তল নিয়ে মধ্য রাতে ছাদে গিয়েছিলাম; নলটা মাথায় ঠেকিয়ে-ও ছিলাম কিন্তু শেষ অবধি কাজটা করা হয়ে ওঠেনি। আজ মনটা বেশি বিষাদময়। এই বিষাদময়তার নির্দিষ্ট কোন কারণ নেই। আমার মনটা-ই আসলে বিষাদে মাখা; যে কোন ছুতোয় গাঢ় হতাশায় ফেনিয়ে ওঠে। বিষাদ জমে জমে অন্তরের ভেতরটা মনে হয় ক্ষত হয়ে আছে, একটু জল পেলেই ক্ষতটা দগদগিয়ে কাঁচা হয়ে ওঠে। আজ কি পিস্তলটা মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করব? কি হবে ট্রিগারটা টিপে দিলে? হয়ত এক সেকেন্ডে মারা যাব। তারপর? কি হবে আমার পেছনে অর্থ লগ্নকারীদের? আমার বাবা মা? কি হবে ঝুমকির? আমাকে বুকে চেপে ধরে ভালোবাসা আদায় করতে চেয়েছিল যে মেয়েটি? আমি একটা উদ্ভট মাত্রার প্রাণী। আগেই বলেছি, অন্য মানুষ বহু দূরের ব্যাপার, বাবা মা, আত্বীয় স্বজনের প্রতি আমার ভেতরে ভালোবাসা তেমন কাজ করে না বললেই চলে৷ তাদেরও একই অবস্থা। ভালোবাসা আসলে দ্বিমুখী। ভালো না বাসলে ভালোবাসা মেলানো দুস্কর। মানুষের প্রতি, এই পৃথিবীর প্রতি আমার ভালোবাসা কদিন আগে ছিল ১০% এর মত। এখন তা কমে গিয়ে ০০% এ এসে ঠেকেছে। আমার আর বেঁচে থাকতে মন টানছে না। পিস্তলের গুলিতে আমার মৃত্যু হলে আমি কিছু পাই বা না পাই, চির শান্ত সমুদ্রে লীন হয়ে যেতে পারব। আত্বহত্যা কারী নাকি জাহান্নামে যায়। আমিও হয়ত সেখানেই যাব। জাহান্নাম বড় কষ্টের জায়গা। বার বার পোড়ানো হয় শরীরটা। পুড়ে ছাই হয়ে গেলে আবার নতুন করে রক্ত মাংস গড়ে দেওয়া হয়। তারপর আবার পোড়ানো হয়। রক্ত আর পুঁজের সাগরে হাবুডুবু খেতে হয়। আরো বহুত শারীরিক পেরেশানি আছে। মানসিক কোন যাতনা জাহান্নামে আছে কিনা কে জানে? ধর্মগ্রন্থ ভাল করে পড়া উচিত ছিল।
আনমনে চিন্তা করতে করতে নিজের অজান্তে পিস্তলটা কক করে ফেললাম। মাথায় নলটা ঠেকিয়ে ট্রিগারে তর্জনিটা ঠেকালাম। একটা চাপ দিলেই বিকট শব্দের সাথে এই জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে যাবে। ঘটুক না! আমার বহুদিনের ইচ্ছা মৃত্যুর পরের জগতটা দেখব। সেটা কি শান্ত সুন্দর? মানসিক যাতনা বিহীন, সুতীব্র শব্দ বিহীন একটা জগত? বহুক্ষণ ধরে রাখলাম পিস্তলটা। পিস্তলটার ওজন প্রায় এক কেজি। বেশিক্ষণ ধরে রাখতে গিয়ে হাতের কনুইতে খিল ধরে আসতে চাইছে। একবার নামিয়ে নিলাম। কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার ধরে রাখলাম। একবার মনে হচ্ছে, টিপে দেই ট্রিগারটা, আবার মনে হচ্ছে, নাহ! বেঁচে থাকি। জীবনে বহু কিছু দেখার আছে। আবার জগতের ভয়াবহ দাবীদাওয়ার কথা মনে হতেই মনটা ট্রিটার টিপে দেওয়ার পক্ষেই কথা বলছে। শেষবার কি কারো সাথে কথা বলার দরকার আছে? মোহনার চেহারাটা ভেসে উঠলো মনের পর্দায়। পিস্তলটা মাথা থেকে নামিয়ে ডায়াল করলাম তার নাম্বারে। মোহনার নাম্বার বিজি আছে। বুকের ভেতর কি একটু খানি বেজে উঠল একটা বেদনার সুর? বেজে উঠলেও সেটা তেমন জোড়ালো নয়। অন্য সকল যাতনা আমার অন্তরে এমনভাবে অবস্থান নিয়ে আছে যে, এই ছোট খাটো ব্যাথা আমার মনে আঁচড় কেটে যেতে পারে না। যাহোক, এত রাতে মেয়েটা হয়ত কোন সার্থক পুরুষের সাথে গভীর আবেগ ভাগাভাগি করছে। কি করবে? আমি তো তাকে কিছুই দিতে পারিনি! কয়েকদিন কথা হলেই তাকে শুনিয়েছি আমার বদ্ধ এই জীবনের গল্প, যেখানে আমার অস্তিত্ব একটা মেশিনের মত, কোন ভালোবাসা পাবার ব্যাপার নেই, কোন ভালোবাসা বাসি নেই। এই একঘেয়ে গল্প শুনিয়ে কোন নারীকে মগ্ন রাখা যায় না। বেশিরভাগ নারী-ই উঁচু দরের স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে।
হাতটা আবার তুলে পিস্তলের মাজলটা কপালের পাশে ঠেকালাম। স্পষ্ট অনুভব করলাম আমার তর্জনীটা ট্রিগারে চেপে বসল। আমি কি নিজের ইচ্ছায় এটা করলাম? একবার মনে হল, নিজের ইচ্ছায় এটা করিনি। আমার তর্জনীর স্বতন্ত্র ইচ্ছাশক্তি আছে, সে নিজের গতিতে ট্রিগারে চেপে বসছে। প্রথমবার ট্রিগার প্রেস করে ট্রিগারটা দাবিয়ে দিল সে, মানে আমার তর্জনী। অস্ত্রের ভাষায় একে বলে 'ফার্স্ট স্লাব' আর একটু খানি চাপ দিলেই ঠুক করে একটা পিন গিয়ে বুলেটের পেছনে আঘাত করবে। তর্জনীটা কি সেটুকু-ও করবে? হঠাৎ মনের মধ্যে ফুটে উঠলো এক ঝলক অন্ধকার। কি হবে বেঁচে থেকে? আমি মরতে চাই। এই 'মরতে চাওয়া' অনুভুতিটা আমার তর্জনীটাকে আরো একটু উৎসাহিত করল; ঠুক শব্দে পুরোপুরি বসে গেল সে। কানের কাছে তীব্র একটা বিস্ফোরণের আওয়াজ কানের পর্দাকে ফাটিয়ে দেবার আগেই একটা তীর ব্যাথার অনুভুতি মস্তিস্কে প্রবেশ করল। যন্ত্রনার তীব্র অনুভুতিটা মস্তিষ্ক জুড়ে বিস্তার লাভ করার আগেই সব শুন্য হয়ে গেল। গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে গেল আমার জগতটা৷
সেখানে ব্যস্ততার কোলাহল নেই, মানুষের নিষ্ঠুরতার আওয়াজ চুকে বুকে গেল এক লহমায়।

Tarek Hossain Rimon, Ns sordar, Golam kibreia, Sirajul islam, Siddik ahmed, Md mohewiddin, Mofej howladar and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum