সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 2
স্বর্ণমুদ্রা : 55
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-08-31
View user profile

পরিত্যক্ত ডায়েরি Empty পরিত্যক্ত ডায়েরি

Wed Sep 29, 2021 12:30 am
লেখকঃ কা ব্য

রাত এখন প্রায় ১১টা বাজে। নিজের বাড়ির উঠানে একা একা বসে আছি। হাতে একটা ভুতের গল্পের বই। বাড়িতে একা রয়েছি তার উপর আবার পূর্নিমার রাত। আবার চারিদিকে হালকা হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছিলো। এরকম পরিবেশে ভূতের গল্প পড়া যে কি মজার তা শুধু যারা এই পরিবেশে বই পড়ে অভ্যস্ত তারাই বলতে পারবে। আমার বাড়িটা গ্রামের অনেক ভেতরে অবস্হিত। তাই বেশ নির্জন একটা বাড়ি। আশেপাশে অন্য আর কোন বাড়ি নেই। আমার বাড়ি থেকে একটু দুরেই শুধু পরিত্যাক্ত একটা বাংলো রয়েছে। বাংলোটার নাম হরিনাথ বাংলো। বাংলোটা দেখতে বেশ সুন্দর। যদিও এখানে এখন কেউ থাকে না।
.
বই পড়তে আমি ভীষণ ভালোবাসি। বিশেষ করে ভূতের বা কোন রহস্য গল্পের বই হলেতো আর কোন কথাই নেই। অবশ্য এই শেষ বয়সে আর কিইবা করতে পারি! আমার বয়স ৪০ পেরিয়ে ৫০ এর কাছাকাছি। এখন আর ঠিক আগের মতো কাজ করতে পারি না। অবশ্য কাজই বা করবো কাদের জন্য! এই পৃথিবীতে যে আমি বড় একা। খুবই একা। আমার কোন আপনজন আর বেঁচে নেই। সবাই ওপারের দুনিয়ায় পারি দিয়েছে।
.
আমার জন্মের ৩ মাস আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় আমার বাবা মারা যান। আর আমার জন্মের সাথে সাথেই আমার মা মারা যায়। এরপর থেকে আমাকে আমার বড় ভাই রহিম শেখ লালন-পালন করে
বড় করেন। কিন্তু আমার যখন ১৭ বছর বয়স তখন এক রাতে নৌকা ডুবিতে আমার সেই বড় ভাইও মারা যায়। পুরো পৃথিবীতে আমি বড় একা হয়ে যাই। ঠিক সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত আমার দেখাশোনা করতে থাকেন রমিজ চাচা। রমিজ চাচা আমার রক্তের সম্পর্কে কেউ না। আমাদের বাড়িতে টুকটাক কাজ করতো। আমার বাবা এবং বড় ভাইয়ের খুব বিশ্বস্ত কাজের লোক ছিলো। রমিজ চাচার এই পৃথিবীতে মা ছাড়া আর আপন কেউ বেঁচে নেই। যদিও তার মা এখান থেকে অনেক দুরে একটা গ্রামে থাকেন। রমিজ চাচা আমাকে তার সন্তানের মতোই ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে। রমিজ চাচা আমারো খুব বিশ্বস্ত। এরপর আমার যখন ২৭ বছর বয়স হয় তখন রেহেনা আক্তার নামে একটা মেয়ের সাথে আমার বিয়ে হয়। এরপর থেকে আমার জীবন খুব ভালোভাবেই চলছিলো। আমার তখন বয়স ৩৫। তখন আমার একটা ৫ বছরের ছেলেও ছিলো। নাম তার ছিলো রাফি। একরাতে আমি, রেহেনা আর রাফি গাড়ি করে এক দাওয়াত থেকে ফিরছিলাম। হঠাৎ একটা ট্রাক এসে আমাদের গাড়িতে ধাক্কা দেয়। আমি কোনভাবে সেই দুর্ঘটনায় বেঁচে যাই। কিন্তু রাফি আর রেহেনাকে কোনভাবেই বাঁচাতে পারিনি। এরপর থেকে এই পৃথিবীতে আমি একা। বড় একা। এরপর থেকে নির্জন এই বাড়িতে থাকতে শুরু করি। এখন আমার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বলই এই বইগুলো।
আর আমার দেখাশোনা করার দায়িত্বটা নেন এই রমিজ চাচা। তাই এখন আমি আর রমিজ চাচাই শুধু এখানে থাকি।
.
সব ছেড়ে এই বাড়িতে চলে আসারো একটা কারণ আছে। এই বাড়ির উঠানের পাশে ৫ টা কবর রয়েছে। এইগুলো আমার বাবা,মা, ভাই, স্ত্রী ও ছেলের কবর। এদের কবরের পাশে আরেকটা কবরের জায়গাও রাখা আছে। আমার ইচ্ছা কবরটা আমার হবে।
.
তাই প্রতি রাতেই উঠানে বসে আমি গল্পের বই পড়তে বসি। মাঝেমধ্যে মনে হয় তারা আমার পাশেই আছে।
.
প্রতিদিনই আমার পাশে এখানে রমিজ চাচা থাকে। কিন্তু আজ সেও বাড়িতে নেই। তাই আমি একা। আসলে হঠাৎ গতকাল রমিজ চাচা খবর পায় যে তার মা নাকি মারা গেছে। তাই রমিজ চাচা তার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন গতকাল। যাওয়ার আগে বলে গেছেন ফিরতে ৩-৪ দিন লাগবে। আমিও তাকে আটকাইনি। যদিও রমিজ চাচাকে ছাড়া থাকার অভ্যাস আমার খুব একটা নেই। বসে বসে গল্পের বই পড়ছিলাম আর রমিজ চাচার কথা মনে করছিলাম। সে এখন এখানে থাকলে হয়তো আমাকে এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়াতো।
.
.
সব চিন্তা বাদ দিয়ে বইটার দিকে আবার মনোযোগী হলাম। খুব মনোযোগ দিয়ে বইটা পড়ছিলাম। হঠাৎ আমার মনোযোগটা নষ্ট করে দিলো একটা তাজা গোলাপের গন্ধ। আমি বেশ অবাক হলাম। এতোরাতে এখানে গোলাপের গন্ধ আসলো কিভাবে!! আমার বাড়িতেতো আমি একা
রয়েছি। আর পুরো বাড়িতে কোন গোলাপের পারফিউম নেই। আর গোলাপ গাছ! আমাদের গ্রামতো দুরে থাক আশেপাশের চৌদ্দ গ্রামের ভেতর কোন গোলাপ গাছ নেই!!
.
হঠাৎ গোলাপের গন্ধে বেশ অবাকই হলাম। হঠাৎ আমার অবাক দৃষ্টিকে আরো অবাক করে দিয়ে আমার সামনে এসে হাজির হলো রমিজ চাচা। আমি রমিজ চাচাকে দেখে খুব অবাক হলাম। চাচারতো এখন তার গ্রামে থাকার কথা! সে এখন এখানে কি করছে! আমি অবাক হয়ে রমিজ চাচাকে প্রশ্ন করলাম:-
-রমিজ চাচা! তুমি এতো রাতে?! তোমার না মা মারা গেছে?! তোমারতো এখন গ্রামে থাকার কথা ছিলো?
-জ্যাঁ বাবু। মায়ের দাফন আজ সকালেই দেওয়া হইয়া গেছে। আপনারে ছাড়া মনটা কেমন যেনো করতাছিলো। তাই দাফন শেষ কইরাই চইলা আসছি। সেখানেতো আর আমার আপন কেউ নাই।
-তা যা বলেছো। তোমাকে ছাড়াও আমার খুব একা লাগছিলো। এসে যখন পড়েছো। ঘরে চলে যাউ। গোসল করে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। সকালে আবার কথা হবে।
-জ্যাঁ বাবু। আচ্ছা একটা কথা কইতে চাইছিলাম যে!
-কি কথা? বলো!
-আসলে বাবু! আমি ট্রেনে কইরা এইখানে আসতেছিলাম। ট্রেন যখন প্রায় এই স্টেশনে আইসা পৌছাইলো তখন আমার লগে একটা মাইয়াও ট্রেন থিকা নামছিলো। মাইয়াটা আমারে একটা ডায়েরি দিয়া কইলো যে ডায়েরিটা একটু ধরতে। সে একটু পরেই আইসা নিয়া
যাইবো। এরপর মাইয়াটা পাশের একটা জঙ্গলে চইলা গেলো। আমি ভাবলাম হয়তো কোন টয়লেটে গেছে। তাই এক ঘন্টা ধইরা সেইখানে মাইয়াটার লাইগা দাড়াইয়া ছিলাম। কিন্তু জঙ্গল থিকা আর কেউ বাহির হইয়া আসে নাই। এরপর আমি জঙ্গলে গেলাম কিন্তু কাউরে খুইজা পাইলাম না। এরপর আর কিছু না বুইঝা ডায়েরিটা লগে কইরা নিয়া আইছি। আমিতো মুর্খ মানুষ কি লেখা আছে পড়তে পারি না। তাই ডায়েরিটা আপনেই রাখেন।
-কোথায় ডায়েরিটা? দেখি!
.
.
এরপর রমিজ চাচা তার পটলা(ব্যাগ) থেকে একটা ডায়েরি বের করে আমাকে দিলেন। ডায়েরিটা দেখেই বুঝতে পারলাম যে ডায়েরিটা খুব পুরাতন একটা ডায়েরি। হয়তো কারো ব্যাক্তিগত কথা লেখার ডায়েরি। কারো অনুমতি ছাড়া তার ব্যাক্তিগত ডায়েরি পড়া উচিত হবে না। তাই ডায়েরিটা রমিজ চাচার কাছ থেকে নিয়ে উঠানের পাশে থাকা একটা টেবিলে রাখলাম। রমিজ চাচাকে বললাম:
-আচ্ছা পরে পড়ে নিবো আমি।
.
.
রমিজ চাচা আমার কথা শুনে বললেন:
-ঠিক আছে বাবু। আচ্ছা আপনার জন্য কি চা বানাইয়া নিয়া আসবো?
-তোমার হাতের চা না খেলেতো আমার রাতে ঘুমই হয় না চাচা। কিন্তু তুমিতো মাত্র কত দুর থেকে আসলে। থাক! আজ বাদ দাও।
-কি যে বলেন বাবু! চা বানাইতে আর কতক্ষন সময় লাগবো। আপনি বসেন একটু। আমি চা বানাইয়া নিয়া আসতেছি।
.
এরপরেই রমিজ চাচা চা বানাতে বাড়ির ভেতরে গেলেন। রমিজ চাচা এতো দ্রুত গ্রাম থেকে চলে আসায় মনে মনে বেশ খুশিই হলাম। আসলে তাকে ছাড়া আমি খুব একটা থাকতে পারি না। এরপর আবার উঠানের চেয়ারে বসে সেই ভূতের গল্পের বই পড়তে শুরু করি। সেই ডায়েরিটা আমার থেকে বেশ কিছুটা দূরে টেবিলেই পরেছিলো। ডায়েরিটা সম্পর্কে এতোটাও আগ্রহ ছিলো না আমার। আমি টানা এক ঘন্টা মনোযোগ দিয়ে সেই বইটাই পড়তে থাকলাম। হঠাৎ আমার মনে পড়লো। আরে! রমিজ চাচা না সেই কখন গেলো চা বানাতে! তারতো এতক্ষন সময় লাগার কথা না! তাহলে কি রমিজ চাচা চা বানানোর কথা ভুলে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে! অবশ্য রমিজ চাচা ভুলে জাওয়ার মানুষো না। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ খটকা লাগলো। তাই বইটা টেবিলে রেখে রমিজ চাচাকে খুজতে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাম। আমি জোরে জোরে শব্দ করে তাকে ডাকছিলাম:-
.
-রমিজ চাচা? রমিজ চাচা? কোথায় তুমি? ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? রমিজ চাচা?
.
কিন্তু বাড়ির ভেতর থেকে কোন উত্তরই এলো না। এরপর আমি পুরো বাড়ি খুজলাম কিন্তু কোথাও রমিজ চাচাকে খুজে পেলাম না। আমি খুব অবাক হলাম। রমিজ চাচা কি উধাও হয়ে গেলো নাকি!! আমি আরো কয়েকবার রমিজ চাচাকে ডাকতে ডাকতে পুরো বাড়ি তাকে খুজলাম। কিন্তু তাকে কোথাও খুজে পেলাম না।
অবেশেষে তাকে খুজে না পেয়ে খুব বিরক্ত হয়ে মোবাইলটা বের করে তাকে কল দিলাম। কিছুক্ষন কল বাজার পরেই রমিজ চাচা কলটা ধরলেন। রমিজ চাচা কলটা ধরতেই খুব গম্ভীর আর কিছুটা রাগান্বিত কন্ঠে আমি তাকে বললাম:
-রমিজ চাচা? চা বানাতে গিয়ে তুমি কোথাও উধাও হয়ে গেলে। এখন তুমি কোথায়?
.
.
এরপর রমিজ চাচা আমাকে যা বললো তা শুনে যেনো আমি আকাশ থেকে পড়লাম। রমিজ চাচা বললেন:
-কি বলেন এসব বাবু?? আমি চা বানামু কেমনে? আপনি কি ঘুমের তালে আমারে কল দিলেন নাকি!? আমিতো এখনো আমার গ্রামের বাড়িতেই আছি। আপনারেতো কইয়াই আসছিলাম যে আমার মা মারা গেছে তাই আসতে ৩-৪ দিন বেশি সময় লাগবো।
-তুমি কি সত্যিই আজ গ্রাম থেকে ট্রেনে করে আসোনি?
-কি বলেন বাবু! আজকা সকালেই মারে দাফন দিলাম। এইখানে এখন মেলা কাম তাই আরো ২ দিন থাকা লাগবো। আর আমি ট্রেনে কইরা আসুম কেন? আমিতো বাসে যাতায়াত করি। আপনের কি হইছে বাবু? আমি কি তাড়াতাড়ি চইলা আসুম?
-আরে! কিছু হয়নি। তুমি গ্রামের কাজ শেষ করে ধীরেসুস্হ্যে আসো। হয়তো বই পড়ার নেশায় ভুল কিছু দেখেছি। আচ্ছা ঘুমাও। তুমি চিন্তা করোনা।
.
.
এই বলেই কলটা আমি কেটে দিলাম। রমিজ চাচাকেতো বেশ চিন্তা করতে না করে দিলাম। কিন্তু আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম।
.
রমিজ চাচা যদি না এসে থাকে তাহলে একটু আগে আমি যাকে দেখলাম যার সাথে কথা বললাম। সে কে ছিলো! আর আসলেইতো রমিজ চাচাতো ট্রেনে করে যাতায়াত করেন না। তিনি সব সময় বাসে যাতায়াত করেন। তাহলে কি একটু আগে রমিজ চাচা আমার কাছে এসেছিলো এটা শুধুমাত্র আমার কল্পনা ছিলো!! এরপর গম্ভীরভাবে বাড়ির উঠানে গেলাম। সেখানে গিয়ে টেবিলে যা দেখলাম আমি পুরো অবাক হয়ে গেলাম। টেবিলে এখনো সেই ডায়েরিটা পরে রয়েছে যেটা কিছুক্ষন আগে রমিজ চাচা আমাকে দিয়েছিলো। রমিজ চাচা যদি নাই আসে তাহলে এই ডায়েরিটা আমার কাছে এলো কিভাবে! ব্যাপারটা যদি আমার কল্পনা হতো তাহলেতো আর ডায়েরিটা এখানে পরে থাকতো না!
আর রমিজ চাচাও মজা করার মানুষ না।
.
বুঝলাম এই সকল রহস্যের সমাধান এই ডায়েরির ভেতরেই রয়েছে। এরপর ডায়েরিটা টেবিল থেকে নিয়ে পড়া শুরু করলাম . . . . . . . . . . .

ডায়েরিটা খুলেই দেখলাম যা ভেবেছিলাম তাই। এটা একটা ব্যাক্তিগত ডায়েরি ছিলো। ডায়েরিটা বেশ পুরাতন ছিলো। ডায়েরি পুরোটাই বাংলা ভাষায় লেখাছিলো। যে ডায়েরিটা লিখেছে তার লেখার প্রশংসা করতে হয়। অসাধারণ সুন্দর হাতের লেখাছিলো ডায়েরিটাতে! ডায়েরির শুরুতেই যে লিখেছে তার নাম লেখা ছিলো। ডায়েরিটার লেখিকার নাম ছিলো:-
"-সানজিদা আফজাল মিশি।"
.
এরপর পুরো ডায়েরিটা পড়া শুরু করলাম। সেখানে লিখাছিলো: .
.
" আমার নাম সানজিদা আফজাল মিশি। আমার জন্ম হয় বাংলাদেশে। আমার যখন ১৩ বছর বয়স ছিলো তখন আমার বাবা-মা এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় । এরপর থেকে আমার মামা-মামিই আমাকে বড় করে তোলে। আমি ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বাংলাদেশেই ছিলাম। এরপর আসিফুর রহমান আসিফ নামের একজন ছেলের সাথে আমার বিয়ে হয়ে যায়। এরপর আমি আসিফের সাথে অ্যামেরিকায় চলে যাই। আসিফ অ্যামেরিকার একটা সফটওয়্যার কম্পানিতে কাজ করতো। আমরা খুব ভালোভাবেই সেখানে বসবাস করতে থাকি। আসিফো অনেক ভালো একটা ছেলে ছিলো। সেও আমার মতো অনাথ। আমি ছাড়া এই পৃথিবীতে তার আপন আর কেউ ছিলো না। তাই সে আমায় অনেক ভালোবাসতো। যদিও সে দেশের বাহিরে ছিলো সে বাংলাদেশকে অনেক ভালোবাসতো। সে চাইতো এই দেশে এসেই মৃত্যুর আগে পর্যন্ত থাকবে। কিন্তু কাজের চাপে সে দেশে ফেরার সময়ো পায়না। দেখতে দেখতে আমাদের বিয়ের ৭ বছর কেটে যায়। এর মধ্যে আমাদের একটা মেয়েও হয়ে গিয়েছিলো। ভালোবেসে আসিফ নাম দিয়েছিলো রাত্রি। তখন রাত্রির বয়স ছিলো ৫ বছর। সেবার আসিফের সফটওয়্যার কম্পানি থেকে হঠাৎ আসিফকে এক মাসের ছুটি দেওয়া হয়। ছুটি পাওয়ায় আসিফ, আমি আর রাত্রি ৩ জনেই বেশ খুশি হয়েছিলাম।
একদিন রাতে আসিফ হঠাৎ এসে আমার হাতে একটা খাম গুজে দেয়। খামটা খুলে দেখলাম সেখানে ৩ টা পাসপোর্ট ছিলো। পাসপোর্টগুলো বাংলাদেশে যাওয়ার। আমি বেশ অবাক হলাম। আসিফ আমাকে বললো আমরা এই ছুটিতে বাংলাদেশে যাবো ঘুরতে। সেখানেই আমরা ছুটি কাটাবো। আমি আর আমার মেয়ে রাত্রি দুজনেই অনেক খুশি হলাম। এরপর আমরা বাংলাদেশে চলে আসি। প্রথমে আমরা চট্রোগ্রামের কক্সবাজারে যাই, এরপরে সিলেটের জাফলং, রাঙামাটি,বান্দরবান সহ বাংলাদেশের আরো অনেক সুন্দর এলাকা ঘুরে বেড়াই। দেখতে দেখতে আমাদের ছুটির এক মাস কেটে যায়। কিন্তু আমরা ৩ জনেই বাংলাদেশের প্রেমে পরে যাই। আমি আর রাত্রি দুজনেই আসিফকে অনুরোধ করলাম যে আমরা আর অ্যামেরিকায় ফিরে যাবো না। আমরা সাধারণ ভাবেই হোক বাংলাদেশে থাকতে চাই। এই দেশেই আমার মেয়ে বেলার হাজারো স্মৃতি রয়েছে। আসিফও এই দেশকে অনেক ভালোবাসে। তাই সে আর না করলো না। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম বাংলাদেশেই থাকবো। এরপর অ্যামেরিকায় আমাদের যে সম্পদ ছিলো সেগুলো বিক্রি করে ফেলি আমরা। আসিফো তার চাকরি ছেড়ে দেয়। আমরা বাংলাদেশের ভেতরেই একটা গ্রামাঞ্চলের দিকে একটা পরিত্যাক্ত বাড়ি কিনি। বাড়িটা আমাদের অনেক পছন্দ হয়েছিলো। আসলে বাড়িটার সৌন্দর্য বলে প্রকাশ করার মতো না। কিন্তু বাড়িটার সৌন্দর্যের তুলনায় দাম ছিলো
খুবই কম। এর প্রধান কারণ ছিলো বাড়িটা নাকি ভুতের বাড়ি নামে খ্যাত। এখানে নাকি ভূতেরা থাকে। এর আগেও কয়েকটা পরিবার এখানে এসে থাকার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু তারা নাকি ভুত থেকে পালিয়ে গেছে। ভূতের কথা শুনে আমরা বেশ মজা পেলাম। ভুতে বিশ্বাস আমাদের কখনোই ছিলো না। কিন্তু বাড়িটা যেহেতু শহর থেকে অনেক দুরে, গ্রামেরও অনেক ভেতরে নির্জন একটা জায়গায় রয়েছে সেহেতু এই বাড়ি সম্পর্কে একটু কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। তাই আমরা এইকোথায় কোন কান দিলাম না। এরপর আমরা সেই বাড়িতে গিয়ে উঠি। বাড়িটা আসলেই অনেক বড় ছিলো। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিলো যে বাড়ি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা হয়নি। তাই পুরো বাড়িতেই ময়লা দিয়ে ভরা ছিলো। এরপর আমি আর আসিফ মিলে পুরো বাড়ি পরিষ্কারের কাজে লেগে পড়ি। আমাদের মেয়ে রাত্রিও যতটুকু পারে আমাদের সাহায্য করছিলো। এছাড়াও আমাদের প্রয়োজনীয় সব আসবাব পত্র আসিফ বাজার থেকে কিনে এনেছিলো। আমরা পুরো এক সপ্তাহ কঠোর পরিশ্রম করে পুরো বাড়ি পরিষ্কার করে গুছাতে পেরে ছিলাম। কিন্তু এতো পরিশ্রমের পরেও আমরা অনেক খুশি ছিলাম। কারণ আমরা যে জন্য বাংলাদেশে আসি সেটা হলো এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। আর আমাদের বাড়িটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের একটা রুপ।
চারিপাশে গাছে ঘেরা একটা বাড়ি আমাদের। বাড়ির উঠানেও নানান প্রজাতির গাছ লাগালাম আমরা। এতো সুন্দর একটা বাড়িকে মানুষ ভূতের বাড়ি কিভাবে বলে এটাই জানা নেই আমাদের! আমরা খুব আনন্দের সাথেই দিন কাটাতে লাগলাম সেখানে। কিন্তু আমাদের ভালো দিন বেশিদিন থাকলো না। এক রাতে হঠাৎ বাহিরে প্রচুর বাতাস হচ্ছিলো। মনে হয়েছিলো বড় কোনো ঝড় হবে। তাই আমি দ্রুত ঘরের জানালা আটকাতে গেলাম। জানালা আটকাতে গিয়ে যেই জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালাম দেখলাম আমাদের বাড়ির উঠানে একটা সাদা কাপড় পড়া বৃদ্ধা বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধার দৃষ্টিটা অনেক ভয়ংকর ছিলো। সে যেনো তার চোখের ইশারায় আমায় কিছু বলতে চাচ্ছিলো। কিন্তু আমি হঠাৎ বৃদ্ধাকে দেখে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। ভয় পেয়ে চিৎকার করে আসিফকে ডাকতে লাগলাম, - আসিফ!!কোথায় তুমি ?? তাড়াতাড়ি এইদিকে আসো!! আমার চিৎকার শুনে আসিফ দ্রুত আমার কাছে এসে জানতে চাইলো যে, আমি কেনো চিৎকার দিলাম!! যেই আসিফকে সেই বৃদ্ধাকে দেখাতে বাহিরে তাকালাম। দেখলাম সেখানে কেউ নেই। আমি আসিফকে বৃদ্ধাটার কথা বললাম। আসিফ আমাকে বললো যে এটা হয়তো আমার মনের ভুল ছিলো। আমিও তাই এটাকে স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলাম। এরপরে যখন রাতে ঘুমাতে যাবো ঠিক তখনি আমি আর আসিফ দুজনেই ঘরের বাহির থেকে একটা বৃদ্ধার কান্নার আওয়াজ পেলাম। একেই রাত ছিলো। এরপর আবার নির্জন একটা বাড়িতে শুধু আমরা ৩ জন ছিলাম। তারউপর চারিদিকে ঝড়বাতাস বইছিলো। সেই বৃদ্ধার কান্নার শব্দও যেনো আমাদের কাছে বেশ ভয়ংকর লাগছিলো। রাত্রি তখন ঘুমিয়ে ছিলো।
না হলে সে হয়তো আরো বেশি ভয় পেয়ে যেতো। এরপর আমি আসিফকে বলি যে, এতোরাতে এখানে কোন ভালো মানুষ আসবে না। আর আমাদের আশেপাশেও তো কোন বাড়িও নেই। তাহলে নিশ্চই এখানে খারাপ কেউ এসেছে। .
কিন্তু আসিফ আমার কথা শুনলো না। সে বললো, আর যেই হোক না কেনো! কোন ভুত তো আর আসবে না। হয়তো কোন বৃদ্ধা বিপদে পরেই এখানে এসেছে। আমাদের তাকে সাহায্য করা উচিত। এরপর আসিফ ধীরে ধীরে দরজাটা খুলতে যায়। আমি বেশ ভয় পেয়েই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার চোখে শুধু ভেসে আসছিলো জানালা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা সেই বৃদ্ধাটার মুখ আর তার ভয়ানক দৃষ্টি। এরপর আসিফ দরজাটা খুলে যা দেখলো,,"
.
.
উপরের এতটুকু লেখা একটানা পড়লাম ডায়েরি থেকে। কিন্তু এর পরে কি হলো?!! আসিফ আর মিশি কাকে দেখেছিলো! এই প্রশ্নটাই মাথা দিয়ে ঘুরতে লাগলো। এরপরের কি ঘটেছে তা জানতে পরের পৃষ্ঠা উল্টাতে গেলাম কিন্তু কিছুতেই পরের পৃষ্ঠা উল্টাতে পারছিলাম না। আমি স্পষ্ট দেখছিলাম ডায়েরিতে আরো অনেকগুলো পৃষ্ঠা রয়েছে পড়ার জন্য এবং সেগুলো কোন ভাবেই আঠা দিয়ে লাগানো ছিলো না। কিন্তু আমি হাজার চেষ্টা করেও পরের পৃষ্ঠাটা কিছুতেই পাল্টাতে পারছিলাম না। একেই মনে থাকা প্রশ্নগুলো আমার মাথায় ঘুরে মাথাটা নষ্ট করছিলো তার উপর এতো চেষ্টা করার পরেও কিছুতে পৃষ্ঠা পাল্টাতে পারছিলাম না।
এর জন্য আমার মাথায় প্রচুর যন্ত্রনা শুরু হয়ে যায়। আমার মাথা প্রচুর ব্যাথা করতে শুরু করে। হঠাৎ আবার আমি সেই গোলাপের গন্ধ পেয়ে আৎকে উঠলাম। গোলাপের গন্ধ পেয়ে যেই পিছনে তাকালাম দেখলাম রমিজ চাচা চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি রমিজ চাচাকে দেখে আৎকে বসা থেকে দাঁড়িয়ে উঠলাম। রমিজ চাচা না একটু আগে মোবাইলে আমাকে বললো যে সে এখনো গ্রামেই আছে!! তাহলে এখন আবার কে আসলো!! অবাক হয়ে রমিজ চাচাকে প্রশ্ন করলাম:-
-রমিজ চাচা!! তুমি?
.
এরপর রমিজ চাচা উত্তর দিলো:
-জ্যা বাবু। আসলে চা বানাইতে গিয়া একটু ঘুমাইয়া গেছিলাম। হঠাৎ ঘুম থিকা উইঠা মনে পড়লো যে আপনে চা খাইতে চাইছিলেন। তাই আপনের লাইগা চা বানাইয়া নিয়া আইছি।
. . . . . . . . চলবে . . . . . . .
avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 2
স্বর্ণমুদ্রা : 55
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-08-31
View user profile

পরিত্যক্ত ডায়েরি Empty Re: পরিত্যক্ত ডায়েরি

Thu Sep 30, 2021 12:09 am

এরপর আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম কিছুক্ষন আগেইতো আমি পুরো বাড়ি খুজে এসেছিলাম কিন্তু রমিজ চাচাকেতো কোথাও খুজে পাই নি। আর রমিজ চাচাতো মোবাইল করার পর আমাকে বললেন যে সে এখনো গ্রামের বাড়িতেই আছেন আর তার ফিরতে আরো ২ দিনের বেশি সময় লাগবে। তাহলে আমার সামনে এখন কে দাড়িয়ে আছে!! আমি কিছুটা কাঁপা কন্ঠে রমিজ চাচাকে প্রশ্ন করলাম:
-আমিতো পুরো বাড়ি তোমায় ডাকতে ডাকতে খুজলাম কিন্তু তোমাকেতো কোথায় দেখতে পেলাম না। তুমি কোথায় ঘুমিয়ে ছিলে?!!
-জ্যা বাবু। খুব গরম লাগতাছিলো তাই ছাদে গিয়া ঘুমাইতাছিলাম। আপনেতো জানেনই যখন আমি ঘুমাই আমার আর কোন হুশ থাকে না। তাই হয়তো ডাক
শুনতে পাই নাই।
-কিন্তু আমিতো তোমায় কল দিলাম। তুমি বললে যে তুমি এখনো তোমার গ্রামের বাড়িতেই আছো! আসতে আরো ২ দিন লাগবে?
-কি কন বাবু? আমার মোবাইল তো নষ্ট। আর এইসব কথা আমি কেন কমু?!!
.
.
আমি রমিজ চাচার কথা শুনে অনেক চিন্তায় পরে গেলাম। রমিজ চাচাকে দেখে মনে হচ্ছে না যে সে মিথ্যা কথা বলছে। কিন্তু আমিতো একটু আগেই রমিজ চাচার সাথে ফোনে কথা বললাম। এরপর মোবাইলটা বের করে যেই দেখতে গেলাম যে রমিজ চাচার সাথে কয়টা বাজে মোবাইলে কথা বলেছি তখন আরো বেশি অবাক হয়ে গেলাম। আমার মোবাইল দেখাচ্ছিলো গত ২ দিনের মধ্যে রমিজ চাচার সাথে মোবাইলে আমার কোন কথাই হয়নি। আমি অবাক হয়ে রমিজ চাচার মুখের দিকে তাকালাম। তাহলে আমি একটু আগে কার সাথে মোবাইলে কথা বললাম!! আমার মাথায় তখন কিছুই আসছিলো না। আমি দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার সাথে এসব কি ঘটছে! কি এই ডায়েরির রহস্য! আর কোনটা আসল রমিজ চাচা!! এটা নাকি যার সাথে আমি কিছুক্ষন আগে কথা বললাম সে!! আর এই ডায়েরির পরের পৃষ্ঠাগুলোই বা কেনো খুলছে না! এইরকম আরো অনেক প্রশ্নই আমার মস্তিস্কে ঘুরতে থাকে। তখন আমার মাথা প্রচন্ড যন্ত্রনা শুরু করতে থাকে। আমি প্রচুর ভয় পেতে থাকি। আমি বুঝতে পারছিলাম যে ভয়ে আমার পুরো
শরীর কাঁপছিলো। আমার মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে যায়। আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে যেতে নেই। ঠিক তখনি রমিজ চাচা আমার দিকে ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাকায়। আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে:
-বাবু। আপনে অনেক ক্লান্ত। আপনে অনেক অসুস্হ্য হইয়া পড়ছেন। আপনের এখন ঘুম প্রয়োজন। আপনে আমার লগে ঘরে চলেন। আপনে এখন ঘুমাইবেন।
.
.
আমি আর কিছুই বলতে পারছিলাম না। আমার যেনো মনে হচ্ছিলো কেউ আমাকে হিপনোটাইস করেছে। আমার পুরো শরীর যেনো অবশ হয়ে যেতে লাগলো। আমার চোখ গুলো লেগে আসতে লাগলো। আমি বুঝতে পারলাম যে রমিজ চাচা আমাকে ধরে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর আমার চোখ লেগে গেলো। আমি মনে হয় অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
.
এরকিছুক্ষন পর আমার জ্ঞান ফিরলো। আমার জ্ঞান ফেরার পর চোখ খুলে তাকিয়ে দেখলাম আমি ঘরের বিছানায় শুয়ে আছি। আমার কপালে পানিতে ভেজানো একটা রুমাল। আমার নিজেকে অনেক ক্লান্ত মনে হচ্ছে। আমার শরীরে মনে হয় এক বিন্দু পরিমাণও শক্তি নেই। আমি ঘরের দিকে ভালো করে দেখতে লাগলাম ঘরে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। একটু পর রমিজ চাচা হাতে এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আমার কাছে এসে আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে সে আস্তে আস্তে আমায় বললো:
-বাবু! আপনার প্রচুর জ্বর হইছে। কাল রাত থিকা কিছু খান নাই। এই দুধটুকু খাইয়া নেন। ভালো লাগবো।
.
আমি বেশ অবাক হলাম যে এতোরাতে রমিজ চাচা দুধ পেলো কোথায়!! কিন্তু তাকে এটা জিজ্ঞাস করার মতোও ক্ষমতা আমার নেই। আমার শরীরে কথা বলার মতোও কোন শক্তি নেই। তাই আমি রমিজ চাচাকে কিছু বলতে পারলাম না। রমিজ চাচা আমার মাথা কিছুটা উঁচু করে আমাকে দুধটা খাইয়ে দিলো। আসলেই দুধটা খাওয়ার পর একটু ভালো লাগছিলো। এরপর রমিজ চাচা একটা বাটিতে করে পানি এনে সেটাতে রুমাল ভিজিয়ে ভিজিয়ে আমার পুরো শরীর মুছে দেয়। রমিজ চাচা সব সময়ই আমার জ্বর আসলে এমন করতেন। কিন্তু আজ তার ব্যবহার একটু অদ্ভুত রকমের মনে হচ্ছিলো। তার শরীরের ভেতর কেমন যেনো একটা মেয়েলি ভাব ছিলো। তার হাঁটা চলা আর কথা বলা আমার কাছে বেশ ভিন্ন রকম লাগছিলো। আমার পুরো শরীর অবশ থাকার পরেও আমি নাক দিয়ে তখনো স্পষ্ট গোলাপের গন্ধঁ পাচ্ছিলাম। এর কিছুক্ষন পরে আবার আমার চোখ গুলো লেগে গেলো। চোখ যখন খুললাম তখন সকাল হয়ে গেছে। সূর্যের আলো এসে পুরো আমার চোখের উপর পড়ছে। এখন দেখলাম আমার জ্বর এবং ক্লান্তি অনেকটাই কমে গেছে। শরীরো আর অবশ নেই। আমি আমার হাত আর পা ভালো করেই নড়াতে পারছিলাম। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে গেলাম।
উঠানে গিয়েই প্রথমে সেই ডায়েরিটা খুজতে থাকি। কিন্তু উঠানের টেবিলটাতে ডায়েরিটা ছিলো না। আমি ভাবলাম হয়তো রমিজ চাচাই ডায়েরিটা ঘরে নিয়ে রেখেছে। এরপর রমিজ চাচাকে ডাকতে থাকি। কিন্তু সেই গতকাল রাতের মতো একই ঘটনা ঘটলো। রমিজ চাচাকে পুরো বাড়িতে খুজে পেলাম না। আবার রমিজ চাচা কোথায় গেলো!! আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না যে হঠাৎ আমার সাথে এসব কি ঘটছে!! রমিজ চাচা কি তাহলে গতকালকে আর আসেনি!! কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে যে রমিজ চাচা সারারাত আমার সেবা করে আমাকে সুস্হ্য করে তুলেছেন। এরপর আমি চুপচাপ উঠানের চেয়ারে এসে বসে ছিলাম। হঠাৎ আমার মোবাইলে একটা কল আসলো। মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে দেখলাম রমিজ চাচার নাম্বার থেকে কল এসেছে। কিন্তু রমিজ চাচার মোবাইল থেকে কল আসায় আমি মোটেও অবাক হলাম না। আসলে গতকাল রাত থেকে আমার সাথে যা যা ঘটছে তাতে আমার সকল অনুভূতিগুলো মারা গেছে। এখন ধীরে ধীরে যেনো আমার চিন্তা শক্তি কমে যেতে লাগলো। প্রথমবার কলটা ধরলাম না। ২য় বার কলটা ধরে বললাম:
-হ্যালো। রমিজ চাচা! কোথায় তুমি?
-জ্যা বাবু। আমি এখনো গ্রামেই আছি। তয় আজকা রাইতেই রওনা দিমু। আপনার কাছে পৌছাইতে পৌছাইতে কালকে সকাল হইয়া যাইবো। কালকা সকালেই তাইলে আমাদের দেখা হইতাছে।
-আচ্ছা। দেখেশুনে
ভালো করে আসো। আর কিছু বলবে?
-না বাবু।
.
এরপর আমি কলটা কেটে দিলাম। চুপচাপ বসে থাকলাম বাড়ির উঠানে। রমিজ চাচা তাহলে কাল সকালে আসবেন। রমিজ চাচা বাড়িতে না আসলে আমার মাথা কিছুতেই ঠান্ডা হবে না।
.
এরপর মোবাইলটার কল লিস্ট থেকে দেখতে লাগলাম যে গতকাল রমিজ চাচার সাথে আমার কথা হয়েছিলো কিনা! এটা দেখে কিছুটা অবাক হলাম। গতকাল রাতে যখন রমিজ চাচার সামনে মোবাইল থেকে চেক করছিলাম যে রমিজ চাচা কল দিয়েছিলো কিনা। তখন দেখেছিলাম যে গত ২ ধরে রমিজ চাচার সাথে আমার কোন কথাই হয়নি। কিন্তু এখন স্পষ্ট দেখতে পারছি গতকাল রাতে রমিজ চাচার সাথে আমার মোবাইলে কথা হয়েছে।
.
আমি এবার মাথা ঠান্ডা করে সব কিছু চিন্তা করতে লাগলাম। এরপর বুঝতে পারলাম যে গতকাল রাতে যে আমার কাছে এসেছিলো সে রমিজ চাচা ছিলো না। কারণ তার ভেতর একটা অন্য রকম আচরণ আমি দেখতে পেয়েছিলাম। হয়তো সে কোন অন্য দুনিয়ার মানুষ ছিলো। কিন্তু সে যেই হোক না কেনো আমার কাছে কেনো আসলো?! আর সে আমাকে এই ডায়েরিটাই বা কেনো দিলো?! আর এই ডায়েরির পরের অঃশেই বা কি আছে?! কে এই সানজিদা আফজাল মিশি?! আর সে এখন কোথায় আছে?!
.
এই সকল প্রশ্নের উত্তর এবং সকল রহস্যের সমাধান পেতে আমাকে প্রথমে সেই ডায়েরিটা খুজে বের করতে
হবে। কিন্তু ডায়েরিটা এখন কোথায়?! এরপর পুরো বাড়িতে ভালো করে কয়েক বার ডায়েরিটা খুজলাম। কিন্তু পুরো বাড়ি খুজেও কোথাও ডায়েরিটা খুজে পেলাম না। আমি খুব হতাশ হয়ে পড়লাম। তাহলে কি আমার আর রহস্য জানা হবে না!
.
এরপর ভাবলাম। থাক! ডায়েরিটা আর খুজে না পেলেই ভালো হবে। এই ডায়েরিটা আমার জন্য অভিশপ্ত। ডায়েরিটাই আমার বাড়িতে অভিশাপ বয়ে নিয়ে এসেছে। এই একটা অভিশপ্ত আত্মাকে রমিজ চাচার বেশে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছে।
.
এরপর সারাদিন স্বাভাবিক ভাবেই কাটিয়ে দিলাম। সারাদিনে আর সেই ডায়েরিটা চোখে পড়েনি। আমি শুধু ভাবছিলাম যাতে রমিজ চাচা কাল সকালেই দ্রুত চলে আসুক।
.
এরপর দেখতে দেখতে রাত প্রায় ১০ টা বেজে গেলো। আমি ভাবলাম তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি। এরপর বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুমানোর পর রাতে একটা অদ্ভুত ভয়ংকর স্বপ্ন দেখলাম।
.
স্বপ্নে যা দেখলাম! "আমি একটা অচেনা অদ্ভুত বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাড়িটা দেখতে অদ্ভুত সুন্দর। বাড়িটা বেশ নির্জন ছিলো। তাই দেখতে কিছুটা ভুতুরে ছিলো। কিন্তু বাড়িটা চারিদিক থেকে অনেক সুন্দর গাছে ঘেরা ছিলো। বাড়ির উঠানেও নানান রকমের সুন্দর গাছ ছিলো। কিন্তু হঠাৎ দেখলাম চারিদিক পুরো অন্ধকার হয়ে গেলো।
আমি অন্ধকারে কিছুই আর দেখতে পারছিলাম না। হঠাৎ মোমবাতি হাতে একটা মেয়ে আমার সামনে এসে দাড়ালো। মোমবাতির আলোতে মেয়েটাকে ভালোমতে দেখা যাচ্ছিলো না। তার মুখটা একটু একটু দেখতে পারছিলাম। এরপর মেয়েটা মোমবাতিটা আমার হাতে দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে আমাকে বলে। বাড়ির ভেতরে চলুন। আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। মোমবাতিটা হাতে নিয়ে মেয়েটার সাথে ধীরে ধীরে বাড়িটার ভেতরে ঢুকলাম। এরপর মেয়েটা আমাকে আঙুলের ইশারা করে একটা গোলাপ গাছ দেখালো এবং আমাকে একটা কোদাল দিয়ে বললো গোলাপ গাছ টার নিঁচে খুঁড়তে। আমি তখনো তাকে কিছু বলতে পারলাম না। আমি কোদালটা নিয়ে গোলাপ গাছটার নিচের মাটি খুঁড়তে লাগলাম। মেয়েটা মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি কিছুক্ষন খোঁড়ার পর বুঝতে পারলাম যে আমি শুধু কোন গোলাপ গাছের নিচে খুড়ছিলাম না। আমি একটা পুরাতন কবর খুঁড়ছিলাম। একটা পুরাতন কবরের উপর এই গোলাপ গাছটা ছিলো। এটা একটা কবর ভেবে আমি ভয়ে ভয়ে কবরটা খুঁড়তে লাগলাম। কবর খুঁড়ার পর যা দেখলাম তাতে আমি একটু বেশিই ভয় পেয়ে গেলাম। দেখলাম কবরটার নিচে একটা পাটি বিছানো রয়েছে। মনে হচ্ছিলো যে পাটির নিচে কিছু একটা আছে। এরপর আমি ভয়ে ভয়ে পাটিটা সড়ালাম। দেখলাম কাফনে মোরা ৩ টা তাজা লাশ। কবরটা অনেক পুরাতন ছিলো কিন্তু লাশগুলো দেখে মনে হচ্ছিলো কিছুক্ষন আগেই কেউ একজন এখানে কবর দিয়ে গেছে। আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম এই লাশগুলো দেখে। এখানে ২ টা বড় মানুষের এবং একটা বাচ্চার লাশ ছিলো। এরপর সেই মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা আমাকে বললো লাশ গুলোর উপর থেকে কাফনের কাপড় সড়াতে। আমি বেশ ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু কিছু বলতে পারি না। কি ভয়ানক দেখতে লাগছিলো সেই কাফনে মোরা লাশগুলো। তার উপর আমি আবার একা কবরের ভেতরে ছিলাম। আমি ভয়ে ভয়ে লাশ গুলোর শরীর থেকে কাফনের কাপড় সড়ালাম। দেখলাম সেখানে এক পাশে একটা বাচ্চা মেয়ের লাশ ছিলো, আরেকপাশে একজন পুরুষের লাশ। আর মাঝখানে একটা মেয়ের লাশ। ৩ টা লাশের চেহারাই বেশ ভয়ংকর ছিলো। কিন্তু আমার কাছে মাঝখানের সেই মেয়েটার লাশের চেহারা বেশি ভয়ংকর আর চেনা চেনা লাগছিলো। এরপর মনে পড়লো। আরে এটাতো সেই মেয়েটার লাশ যে এখন কবরের উপর থেকে মোমবাতি ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এরপর আমি ভয়ে ভয়ে কবরের উপরে তাকালাম। দেখলাম সেই মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা আর এই কবরে যে মেয়েটার লাশ রয়েছে দুজনে একই চেহারার। এরপর কবরের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা আমার দিকে বড় বড় লাল চোখ করে তাকিয়ে ভয়ংকর ভাবে হাসছিলো। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। এরপর মেয়েটার কাছে জানতে চাই -তুমি কেনো হাসছো!! কিন্তু মেয়েটা কোন উত্তর না দিয়ে হেসেই চলে। এরপর আমি মেয়েটার লাশের দিকে তাকালাম। দেখলাম মেয়েটার লাশ ভয়ংকর ভাবে চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি ভয়ে আৎকে উঠলাম। এরপর মেয়েটার লাশ আমার হাতটা শক্ত করে ধরে ভয়ংকর ভাবে হাসতে শুরু করলো। আমি উপরে তাকিয়ে দেখলাম মোমবাতি হাতে সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ংকর ভাবে হাসছিলো। আবার সেই মেয়েটার লাশই আমার হাত শক্ত করে ধরে কবরের ভেতর ভয়ংকর ভাবে হাসছে। একই চেহারার দুজন মেয়ের এই ভয়ংকর হাসি দেখে আমি ভয়ে চিৎকার করতে শুরু করলাম -বাঁচাও! কে কোথায় আছো? আমাকে সাহায্য করো! রমিজ চাচা!?
"
.
.
এরপরেই আমার ঘুমটা ভেঙে যায়। আমি আৎকে শুয়া থেকে বসে পড়লাম। এতো রাতে এইরকম ভয়ংকর স্বপ্ন দেখার কোন মানে হয়?! এই রকম একটা স্বপ্নই বা কেনো দেখলাম তার উত্তরো আমার কাছে নেই।
.
ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত তখন প্রায় ২ টা বাজে। হঠাৎ আমার চোখ গেলো আমার বিছানায় আমার পায়ের কাছে। আমি দেখলাম আমার পায়ের পাশেই সেই ডায়েরিটা খোলা অবস্হায় পরে রয়েছে। হঠাৎ ডায়েরিটা এখানে কিভাবে আসলো তাও বুঝলাম না।
.
এরপর ডায়েরিটা হাতে নিলাম। হাতে নিয়ে দেখলাম, গতরাতে যেখানে ডায়েরিটা শেষ করেছিলাম ঠিক তার পরের অংশের পৃষ্ঠা বেরিয়ে রয়েছে। এরপর আবার আমি ডায়েরিটা পড়া শুরু করলাম, . . . . .
. . . . . . চলবে. . . .
Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum