সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 13
স্বর্ণমুদ্রা : 395
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-26
View user profile

টেল অব টু সিস্টার্স Empty টেল অব টু সিস্টার্স

Wed May 26, 2021 2:57 am
১|

"আমার বোনের মানসিক সমস্যা আছে ডক্টর।"

"কেমন ধরণের সমস্যা?"

"সে নাকি ভূত দেখতে পায়!"- মাথা নিচু করে উত্তর দেয় লিজা। তার কথা শুনে একপ্রকার হেসে ফেললেন ড. আলফাজ। বললেন, "এই যুগেও কেউ ভূতে বিশ্বাস করে?"

"একজন মানসিক রোগের ডাক্তারের জন্য রোগীর সম্পর্কে মজা করা সাজে না।"- চোখ বাকিয়ে বললো লিজা।

"দুঃখিত।"- ইতস্তত করে নিজেকে সামলে নিলেন ডাক্তার। "পুরো বিষয়টি বলো।"

"তার ধারণা সে মৃত মানুষের আত্মাকে দেখতে পায়।"

"অদ্ভুত! এটা সে বলেছে তোমাকে?"

"হ্যাঁ। সামিরের খুন হওয়ার নিউজ দেখেছেন নিশ্চয়ই। নিশি নাকি তাকে কাল রাতে কলোনির সামনের ফুটওভার ব্রিজের নিচ দিয়ে রাস্তা ক্রস করতে দেখেছে। আমি ভয় পেয়ে আজ সকালেই আপনার চেম্বারে ছুটে আসি।"

"তোমাদের মধ্যে কী আলাপ হয়েছিল বলতে পারবে?"- চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন ডাক্তার।

"হ্যাঁ অবশ্যই। কাল রাতে বাড়ি ফেরার পর সে আমাকে বলেছিল,
 --আপা জানো আমি ভূত দেখতে পারি।

আমি ভূত দেখার মতোই চমকে উঠি। সে পুনরাবৃত্তি করে বললো,
 --হ্যাঁ! পৃথিবীর বুকে ফিরে আসা মৃত মানুষের আত্মা।

চোখেমুখে উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করলাম,
 --তুই জানিস তুই কী বলছিস? মৃত মানুষ কীভাবে ফিরে আসে?

সে ভর্ৎসনার ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিল,
 --না আসলে আমি দেখলাম কীভাবে?

প্রশ্ন করলাম কাকে দেখেছে সে।

সে উত্তর দিল- সামিরকে।

আমি বিছানা থেকে প্রায় লাফিয়ে ওঠেছিলাম। নিশির আচরণে কোনো পরিবর্তন ছিল না, যেন আগে থেকেই জানতো এমনই করবো আমি। আনমনে নিজের হাতের নখ খুঁটছিল সে।

আবার প্রশ্ন করলাম,
 --তুই কীভাবে জানিস যে সামির মারা গিয়েছে?

সে উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করলো,
 --ভুল বললে না আপা?

আমি বিস্ময় নিয়ে আবারও প্রশ্ন করলাম,
 --কী ভুল বললাম?

আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে সে উত্তর দেয়,
 --সামির মারা যায়নি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।

আমি ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্ন করলাম,
 --ত-তুই কীভাবে জানিস?"

বিরক্ত হয়ে সে উত্তর দেয়,
 --আজব প্রশ্ন করো তুমি! প্রত্যেকটা নিউজ চ্যানেলের হট টপিক এখন এটা। পরশু রাতে নাকি তার এপার্টমেন্ট থেকে তার ডেডবডি উদ্ধার করে পুলিশ।

আমি চুপ করে মাথা নিচু করে থাকলাম। আমার দিকে চোখ বাকিয়ে তাকায় নিশি। প্রশ্ন করে,
 --কিন্তু তুমি এমনভাবে রিএক্ট করলে যেন তাকে খুন করা হয়েছে এই খবর শুধু তুমিই জানতে। কেন আপা? এমন ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন তুমি?

বলেছিলাম,
 --দেখ নিশি, তুই জানিস যে সামির আমার...

এখানেই সে আমার কথাকে আটকে দেয়। ফের বলতে থাকে,
 --বয়ফ্রেন্ড ছিল, তাইতো? পরশু রাতে তার খুন হলো কিন্তু তুমি জানালেও না আমাকে। কেন?

তার প্রশ্নে নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল। নিজেকে সামলে উত্তর দিলাম,
 --আমি কীভাবে জানবো পরশু রাতে তার খুন হয়েছে? আজ সকালেই না জানলাম। তোর মতো, নিউজ থেকে।"

নিশি রেগে গিয়েছিল। বললো,
 --তাহলে গাধার মতো প্রশ্ন করলে কেন যে আমি কোত্থেকে জেনেছি? নিজেকে কি খুব চালাক মনে করো?

আমি চুপ হয়ে গেলাম। নিশি খুব বুদ্ধিমতী। আমাকে চুপ থাকতে দেখে সে ফের বলতে শুরু করে,
 --প্রস্তুত থেকো আপা।

প্রশ্ন করলাম,
 --কিসের জন্য?

সে উত্তর দিল,
 --সামির উঠতি একজন উদ্যোক্তা। বাবা-মা, ভাই-বোন বা কোনো আত্মীয়স্বজন কেউ নেই তার। থাকার মধ্যে শুধু তুমিই আছো। পুলিশ অবশ্যই খোঁজ করতে করতে তোমার কাছেই আসবে।

আমি বললাম,
 --আমি জানি। কিন্তু তুই কী যেন বলছিলি? সামিরকে কোথায় দেখেছিস? আর কখন?

সে উত্তর দেয়,
 --আজ রাতে। রিকশা করে যখন ফিরছিলাম আমি। ওকে স্পষ্ট দেখেছি রাস্তা পার হতে।

আমি প্রচণ্ড বিস্মিত হয়ে বলি,
 --অসম্ভব! সে পরশু রাতেই মারা গিয়েছে।

সে আমার আচরণে ভ্রুক্ষেপ না করেই বললো
 --মৃত্যু দেহের হয় আপা, আত্মার না।

আমিও বলেছিলাম,
 --মৃত্যুর পরে আত্মা পৃথিবীতেও থাকে না।

সে দৃঢ়তার সাথে বলে বসলো,
 --সময় হলে দেখা যাবে, আমাদের মধ্যে কে সঠিক।

ব্যাস এটুকুই কথা হয়েছিল কাল রাতে।"

"শুধুমাত্র সে বলেছিল যে সে সামিরকে কাল রাতে দেখতে পেয়েছে আর এতেই আপনি তাকে মানসিক রোগীর তকমায় বসিয়ে দিচ্ছেন? মজা করেও তো বলতে পারে সে তাই না?"- এখনও চেয়ারে হেলান দিয়ে দোল খাচ্ছেন ডাক্তার।

"আমি পঁচিশ বছর ধরে আমার বোনকে চিনি। সে মজা করার মতো মেয়ে না। সে অবশ্যই এমন কিছু দেখেছে যেটা বাস্তবে সম্ভব না। আর সে আমাকে চ্যালেঞ্জও ছুঁড়েছে যে, দেখা যাবে আমাদের মধ্যে কে সঠিক। আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা দেখতে পেয়েছিলাম। তার মানে সে সত্যিই বলছিল যে সে সামিরকে দেখেছে। আর একজন মৃত মানুষকে কেউ কীভাবে দেখতে পারে ডক্টর? তো বলুন এটাকে আমি মানসিক সমস্যা বলতে পারি না?"- একনাগাড়ে বলে গেল লিজা।

"হুম।"- হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে বসলেন ডাক্তার। বললেন, "বিষয়টি ভাবার মতোই। আচ্ছা পুলিশ বা গোয়েন্দা বিভাগ থেকে কেউ এসেছিল আপনার কাছে?"

"না, তবে আজ কিংবা কাল ঠিকই আসবে।"- কথাটি বলে কয়েক সেকেন্ডের বিরতি নেয় লিজা। আবার বলতে থাকে, "কিন্তু আমি এখানে সামিরের কেইসের ব্যাপারে না, আমার বোনের সমস্যা নিয়ে কথা বলছি ডক্টর।"

"সে কিন্তু সামিরকেই দেখেছে মিস. লিজা। সামিরের ব্যাপারটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়।"

"কী বলতে চাইছেন আপনি?"

"আপাতত কিছুই বলতে চাচ্ছি না। খুব শীঘ্রই আমি নিশির সাথে দেখা করবো। আপনি নামকরা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে এসেছেন। সমাধান অবশ্যই পাবেন।"

নিজের ঢোল নিজে পেটানোকে পছন্দ করলো না লিজা। কিন্তু ডাক্তার মিথ্যাও বলেনি। আসলেই সে একজন নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট। তার সাথে এপয়েন্টমেন্ট শেষে বিদায় জানিয়ে ফিরে আসে লিজা।

_____

(১৪ এপ্রিল, খুনের দুইদিন পর।)

সামিরের এপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার মৃতদেহ। ময়নাতদন্তের পর জানা গিয়েছে তার খুন পরশু তথা ১২ এপ্রিল আনুমানিক রাত ১১টার আশেপাশে করা হয়েছে।
এমন নৃশংস খুন হোমিসাইড ডিপার্টমেন্ট আগে কখনও দেখেছে বলে মনে হয় না। ভিক্টিমের চেহারার নকশা পুরো বদলে দেওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে ভারী কিছু দিতে বারবার আঘার করার কারণে থিতলে গিয়েছে তার মুখ। মাথার পিছে জমাটবাঁধা রক্ত। অবশ্যই খুনি পিছন দিক থেকে ভারী কিছুর আঘাত ফেলেছে তার মাথার উপরে। আঙুলগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে লাশের ধারেকাছেও পাওয়া যায়নি।

"সামিরের ব্যাপারে কতটুকু জানতে পারলে আয়াজ?"- পার্টনারকে প্রশ্ন করলেন ওরহান।

"সন্তুষ্টিজনক কিছু নয়। তার পরিবার বা আত্মীয় বলতে কেউ নেই। তবে একটা মেয়ে তার এপার্টমেন্টে প্রায়ই যাওয়া আসা করতো।"- আয়াজ উত্তর দিলেন।

"কে সে?"

"ধারণা করা হচ্ছে সামিরের প্রেমিকা, লিজা নাম। সেন্ট্রাল রোডের মসজিদের পাশের কলোনিতে একটি ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে তারা।"

"তারা বলতে কে কে?"

"সে আর তার ছোট বোন নিশি।"

"বেশ তো! মোটামুটি কেইস ঘাটার যাত্রাপথের সন্ধান তো পেলাম।"- টেবিলে থাকা পেপারওয়েটটি ঘুরালেন কয়েকবার।

"আমরা কি লিজার সাথে কথা বলার জন্য বের হবো?"- প্রশ্ন করলেন আয়াজ।

"অবশ্যই আমরা সেটাই করবো।"- মুচকি হাসলেন ওরহান।

______

(১৫ এপ্রিল, বর্তমান)

গেটে থাকা দারোয়ানের সাথে কুশল বিনিময়ের পর নিশি এলিভেটরের দিকে পা বাড়ায়। আজ বাসায় ফিরতে একটু রাত হয়েছে। বেশ কয়েক পা এগোনোর পর খুট করে একটা শব্দ হয় পিছনে। সেদিকে তাকিয়েই চমকে যায় নিশি। এলোমেলো চুলে দাঁড়িয়ে আছে তার বয়সী একজন মেয়ে। হাতে একটা কিচেন নাইফ। মুখ দিয়ে একটা জান্তব শব্দ করে নিশির ওপর ছুরি বাগিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটা। বিদ্যুতবেগে এলিভেটরের দিকে সরে যায় নিশি। আঘাতটি তার গায়ে না লাগায় নিজেকে সামলাতে না পেরে পড়ে যায় মেয়েটি। উঠে দাঁড়িয়ে ফের নিশির দিকে এগোতে থাকে। এলিভেটরের দরজা বন্ধ হতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিশি। কোনোমতে বেঁচে গিয়েছে। কিন্তু চিন্তার শেষ হয়নি। মেয়েটা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নিশি তার আগেই নিজের ফ্ল্যাটে পৌঁছে যাবে।

দরজায় ঠকঠক করে লিজাকে ডাকার জন্য সময় নেই তার হাতে। হ্যান্ডব্যাগ থেকে চাবি বের করে দরজায় ঢুকাতে যাবে এমন সময় দেখতে পেল মেয়েটা এতক্ষণে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসেছে। আঁতকে ওঠে নিশি। হাতে থাকা হ্যান্ডব্যাগটি তার দিকে ছুঁড়ে মারে সে। জীবনবাজি রেখে ছুটে যায় ছাদের দিকে। পেছনে জান্তব শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসে মেয়েটা। ছাদে উঠেই সিঁড়িঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় নিশি। ভেবেছিল মেয়েটি দরজা ধাক্কাতে শুরু করবে। কিন্তু তার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে মেয়েটা ছাদে উপস্থিত হয়। নিশি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। এই মেয়ে ছাদে আসলো কীভাবে? মেয়েটার চেহারার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে , মুখ বেয়ে কষ গড়িয়ে পড়ছে। পরের সেকেন্ডেই উদভ্রান্তের মত নিশির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটি।

নিশি আবারও বিদ্যুৎগতিকে সেখান থেকে সরে আসে। ছাদে থাকা ইটের বড়বড় কয়েকটা খোয়া দেখতে পেয়ে সেগুলো হাতে নিয়ে বৃষ্টির মতো নিক্ষেপ করে মেয়েটির দিকে। কপালে একটা আঘাত লেগে মেয়েটি ছিটকে পড়ে যায়। এই সুযোগে দৌঁড়ে গিয়ে তার বুকের উপর চেপে বসে নিশি। হাতে একটা ইট নিয়ে কপালের উপর একের পর এক আঘাত হানতে থাকে সে। মেয়েটির নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মারা গিয়েছে সে- নিশি বুঝতে পারে। রক্তের ক্ষীণ একটা স্রোত বয়ে যায় ছাদের মেঝেতে- তরলের নিম্নগামীতার সূত্র মেনে নিয়ে।

রাত ১২টা।

কলোনির পাশেই খালি একটা প্লট। বেলচা দিয়ে যতদূর সম্ভব নিঃশব্দে কবর খোঁড়ে নিশি। আলতো করে শুইয়ে দেয় মেয়েটাকে। ছাদ থেকে তার মৃতদেহ বয়ে নিয়ে আসতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে তার। খুনটা করে ফেলার পরই তীব্র আতংক গ্রাস করে ওকে। যদিও স্রেফ আত্মরক্ষার খাতিরেই কাজটা করতে হয়েছে ওকে, কিন্তু মানুষ খুন যে কাওকে স্বাভাবিক বুদ্ধি থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে । নির্জন ছিল জায়গাটা । ও ছাড়া কোন সাক্ষী নেই, তাহলে  ‘জলবৎ তরলং’ একটা ব্যাপারকে থানা-পুলিশের পর্যায়ে নিয়ে যাবে কেন?

লাশটাকে মাটিচাপা দিয়ে নিশ্চিন্ত হয় নিশি। এই প্লটে আগামী বছরের আগে কাজ শুরু হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই, জানে সে। তারপর কংকাল উদ্ধার করে ছাই করে ফেলবে পুলিশ। ছাদের দিকে ক্লান্ত পায়ে ফিরে চলে ও। রক্তের দাগ পরিষ্কার করতে হবে।

_____

কাল রাতের ঘটনা শুরু থেকে সব কিছুই খুলে বলে নিশি এক নাগাড়ে। ড. আলফাজ মন দিয়ে শোনেন।

"নিশি, ফাইয়েজের সাথে তোমার ঠিক কি ধরণের সম্পর্ক ছিল?"

"ডক্টর?"- অবাক হয়ে প্রশ্ন করে নিশি।

"আমার কাছে সত্য লুকালে তোমাকে আমি কিভাবে সাহায্য করব বল?"

কিছুক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করে নিশি। তারপর মুখ খোলে, "আমরা একে অপরকে ভালোবাসতাম। কিন্তু আপনি তার ব্যাপারে কীভাবে জানলেন?"

"তোমার বোন বলেছে।"

নিশি একবার আড়চোখে লিজার দিকে তাকায়। ডাক্তার আলফাজ তাকে আবারও প্রশ্ন করলেন, "এর থেকে বেশি কী সম্পর্ক ছিল তোমাদের?"

নিশি চুপ করে আছে।

বাধ্য হয়ে আবারও মুখ খোলেন ড. আলফাজ, "দেখ, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সাইকিয়াট্রিস্ট বলা হয় আমাকে। কেন, জানো? আমি প্রতিমুহূর্তে দেখা মানুষের মনের অবস্থা বুঝতে পারি। এখন অনেক কিছুই বুঝে ফেলাটা আমার মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে। কিন্তু বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হলে আমার তোমার সাহায্য দরকার। এবং কেবল এভাবেই তোমাকে সাহায্য করা সম্ভব আমার পক্ষে।"

মিনিট দুয়েক চুপ থেকে তাকায় নিশি, "আমি অন্ত্বঃসত্তা ছিলাম। ফাইয়াজের সন্তান নিয়ে। ওটা ছিল একটা অ্যাকসিডেন্ট। বিয়ের ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য বলি তাকে।" চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি মোছে নিশি। আবার বলতে থাকে, "সে আমাকে ফিরিয়ে দেয়। আমি এবরোশন করাতে বাধ্য হই।"- কথা শেষ করে অনুশোচনার দৃষ্টিতে তাকায় তার বোনের দিকে।

"ছাদে যাওয়া যাবে এখন, নিশি?"- প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে প্রশ্ন করেন ডাক্তার।

তারা তিনজনেই ছাদে যায়। ড. আলফাজ খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন সবকিছু। এরপর বলেন, "নিশি, তোমার সিজোফ্রেনিয়া আছে। এটা অডিটরি এবং ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশনের সমন্বয়। যা আসলে ঘটছে না এমন কিছু দেখতে পাও তুমি, শুনতে পাও। তোমার মস্তিষ্কের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এটা।"

"ডক্টর আমি জানি সিজোফ্রেনিয়া কী। কিন্তু আপনি কীভাবে.."

"তোমার অনাগত সন্তানের ব্যাপারটি নিয়ে মানসিক চাপ পেয়ে বসো তুমি। এজন্য নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলে না। হতে পারে তুমি নিজেই একদিক থেকে তোমাকে শাস্তি দিতে চাইছিলে। এজন্য ঐ কাল্পনিক মেয়েটা এসে তোমার ভাবনায় উপস্থিত হয় এবং এখন পর্যন্ত তোমাকে বিরক্ত করে আসছে। এটা তোমার নিজেকে দেওয়া নিজের পক্ষ থেকে শাস্তি।"

"আমি নিজের হাতে ইট দিয়ে আঘাত করি তার মাথায়। ওকে একটা পশুর মত পুঁতে রাখি খালি প্লটে।"

"এমন কোনো মেয়ের সাথে তোমার সাক্ষাৎ হয়নি।"

"অসম্ভব, আমি ওর দিকে ইটও ছুঁড়ে মারি।"

"তুমি বলেছ, তুমি ইটের আঘাতে তাকে ধরাশায়ী করে ফেল?"

"এক্স্যাক্টলি, ডক্টর।"

পাশে পড়ে থাকা ইটটিকে হাতে তুলে তাকে দেখালেন ডাক্তার।
"তোমার বর্ণনায় তুমি শুধু ছাদের রক্ত পরিষ্কারের কথা বলেছ। ইটের থেকে রক্ত মোছার কথা বলোনি। মানে তুমি যদি তাকে এই ইট দিয়ে আঘাত করে থাকো তবে এই ইটে তার রক্ত লেগে থাকার কথা। কিন্তু তা নেই। মানে এগুলো সম্পূর্ণই তোমার ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন। আর সামিরের বিষয়টিই ভাবো, মৃত মানুষকে দেখবে কীভাবে তুমি?"

"তাহলে ডক্টর, আমি খুনটা করিনি?"- বিশাল বোঝা নেমে যায় নিশির বুক থেকে।

"না।"- মুচকি হাসেন ড. আলফাজ।

_____

(১৬ এপ্রিল, রাত ১২ টা।)

নিশির বর্ণনা অনুযায়ী খালি প্লটটায় চলে আসেন ড. আলফাজ। কৌতুহলই তাকে টেনে আনে। সকালে নিশিকে দেওয়া ব্যাখ্যাটার সত্যতা জানার একটাই উপায়। বেলচা চালিয়ে নিঃশব্দে খুঁড়ে যান ড. আলফাজ। নরম কিছুতে বেলচা পড়তেই থমকে যান তিনি। মাটি সরিয়ে মোবাইলের আলো ফেললেন সেদিকে, আধপঁচা মেয়েলি একটা হাতের দিকে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ড. আলফাজ।

চলবে..

সায়ান

Sahin, Shuvo, Hasibul hasan, Nasim, Mr kiddo, Mahmud, Akash and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 13
স্বর্ণমুদ্রা : 395
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-26
View user profile

টেল অব টু সিস্টার্স Empty Re: টেল অব টু সিস্টার্স

Wed May 26, 2021 2:58 am
২য় পর্ব

লিজা দরজা খুলে দেখে বাইরে দু'জন লোক দাঁড়িয়ে। তাদের মধ্যে একজন জ্যাকেটের পকেট থেকে পুলিশের ব্যাজ দেখিয়ে বললো, "আমি ওরহান, হোমিসাইড ডিটেক্টিভ। আর আমার সাথে আমার পার্টনার আয়াজ।"

লিজা তাদের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম একটা হাসি দেয়। ওরহান লিজার ব্যাপারে মোটামুটি আন্দাজ করতে শুরু করেছে। লিজা যৌবনবতী, চেহারার মধ্যে ক্ল্যাসিক্যাল একটা ভাব আছে। তার অনন্যসাধারণ রূপ যেন তাকে স্পর্শের বাইরে রেখেছে৷ গলার স্বর নিচু এবং নরম। ওরহানের মনে হতে লাগলো সে জনম জনম ধরে তাকে চেনে। যেন তার ভিতরে জমে থাকা মৃত আবেগগুলো ছিঁটকে বেরিয়ে এসেছে লিজাকে দেখার পর। নিজের আবেগকে সামাল দিয়ে ভিতরে আসার অনুমতি নেন ওরহান।

"কাল সকালেও এসেছিলাম আমরা। বাসায় কাউকে পাইনি।"- ওরহান বললেন।

"আসলে আমার বোনের সমস্যার জন্য ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।"- লিজা উত্তর দেয়।

"ড. আলফাজ হোসেনের কাছে?"

লিজা অবাক হয়ে উত্তর দেয়, "আপনি কীভাবে জানলেন?

"আসার সময় তাকে দেখলাম এলিভেটর থেকে বের হতে। আপনার কথা শুনে মনে হলো তিনি আপনাদের এখানেই আসতে পারেন হয়তো। ধারণা করলাম আর কী!"

"ও আচ্ছা।"- আবারও কৃত্রিম হাসি লিজার মুখে।

"একচুয়ালি, কথাটা কীভাবে শুরু করবো বুঝে উঠতে পারছি না।"- আয়াজের দিকে একবার চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফের বললেন ওরহান, "সামিরের খুন হওয়ার খবর দেখেছেন বা শুনেছেন নিশ্চয়ই?"

"জি, দেখেছি। খুনি নাকি তার মুখ থেতলে দিয়েছে৷"

"হ্যাঁ। যতদূর জেনেছি, আপনি তার প্রেমিকা ছিলেন। কথাটা কি সত্য?"

"জি, সত্য।"

"কতদিনের সম্পর্ক হয়েছিল আপনাদের?"

"দুই মাসের মতো।"

"বেশিদিন নয়।"

"জি।"

"আচ্ছা এই দুইমাসে আপনি এমন কাউকে পেয়েছেন যার সাথে সামিরের কোনো শত্রুতা থাকতে পারে?"

"জি না।"

আপাতত প্রশ্ন করা থামালেন ওরহান। কিছু সময় চুপ থাকেন। ফের প্রশ্ন করেন, "আপনাদের লাভ এফেয়ার কেমন চলছিল?"

"আপনি আমাদের পার্সোনাল বিষয়ে ইন্টারফেয়ার করছেন।"- ক্রুদ্ধ লিজা।

"আচ্ছা ছাড়ুন। আপনাদের মাঝে কখনও ঝগড়া হতো?"

"ঝগড়া কমবেশি সব সম্পর্কেই দেখা যায়।"

"আপনার বয়ফ্রেন্ড, আই মিন সামির কি স্মোকিং করতো? বা ড্রাগস নিতো?"

"মোটেও না।"

"আচ্ছা তার কী অন্য কোনো মেয়ের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল?"

"কী ধরনের সম্পর্কের কথা বলছেন আপনি?"- বেশ বিরক্ত লিজা।

"যৌনসম্পর্ক।"

"হোয়াট?"- বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে লিজা।

"অবাক হবেন না প্লিজ, বসুন। আমরা তার সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি তা হলো, সে নাকি বেশ কিছু মেয়েদের সাথে এমন সম্পর্ক তৈরি করেছিল। শয্যাসঙ্গীনী বানানো বলে যেটা। আপনি জানতেন কি এ ব্যাপারে?"

"মাত্র জানলাম।"

"আচ্ছা মিস. লিজা। আরেকটি প্রশ্ন।"

"হ্যাঁ শুনছি।"

"রাত ১১ টার দিকে অবশ্যই সে তার সদর দরজা লক করে রাখবে তাই না? তাহলে খুনী কীভাবে তার রুম অব্দি পৌঁছে তাকে খুন করতে পারে?"

"আমি কীভাবে জানবো?"

"আশ্চর্য! তার দরজার দুটি চাবির একটি তার কাছে আর অন্যটি আপনার কাছেই তো থাকতো তাই না?"

"হ্যাঁ এটা সত্যি কিন্তু.."

"কিন্তু কী?"

"অন্য কেউ তো চাবির একটা কপি করে নিতে পারে। পারে না কি?"

"যদি আপনার কথা মেনে নেই, তবে চাবিতে অবশ্যই প্যারাফিনের দাগ থাকবে? কিন্তু সামিরের কাছে থাকা চাবি থেকে আমরা কোনো প্যারাফিনের দাগ পাইনি। বাকি থাকলো আপনার কাছে থাকা চাবিটা। ওটা কি পেতে পারি প্লিজ?"

লিজা ইতস্তত করলো। উঠে গিয়ে চাবিটি এনে ওরহানের হাতে দিলো সে। ওরহান ধন্যবাদ জানিয়ে বললো, "এটাকে পরীক্ষা করে অবশ্যই জানানো হবে আপনাকে।"

"জি। ধন্যবাদ।"

"শেষ প্রশ্ন, ঐ রাতে আপনি কোথায় ছিলেন মিস?"

"আশ্চর্য, আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?"- অবাক হয়ে প্রশ্ন করে লিজা।

"দেখুন মিস, বিষয়টি মূলত সন্দেহের না। সামিরের সাথে সম্পর্কযুক্ত যারা আছে প্রত্যেকের অ্যালিবাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"

"আমার মনে নেই ঠিক।"

"অদ্ভুত না? খুন হলো ১২ এপ্রিল আর আজ ১৬ এপ্রিল। এরই মধ্যে ভুলে গেলেন কীভাবে?"

"অ্যামেনসিক ফিউগ, ভুলে যাওয়ার রোগ। বিষণ্ণতার সময় হয় এটা। সামিরের খুনের ঘটনায় আমার মধ্যে বিষণ্ণতা ভর করে যে কারণে ঠিক মনে করতে পারছি না। মনে পড়লে অবশ্যই জানাবো।"

ওরহান উঠে দাঁড়ালেন। লিজার দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিয়ে বিদায় নিলেন সেখান থেকে। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, "প্রয়োজন পড়লে আবার আসতে পারি। হয়তোবা খুব শীঘ্রই।"
এতক্ষণে যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল লিজার। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে দরজা বন্ধ করে দেয় সে।

_____

লিজাদের বাসা থেকে ফেরার সময় ওরহান আর আয়াজের সাথে চোখাচোখি হয় ডাক্তারের। বুঝে গিয়েছেন তিনি যে তারা লিজার কাছেই যাচ্ছে। নিশি হয়তো এখনও ভীষণ চিন্তিত। বিষয়টি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। স্বপ্নে হোক কিংবা ভ্রমে, কাউকে খুন করাটা মোটেও সুখদায়ক বিষয় নয়। যদিও ড. আলফাজ মোটামুটি আন্দাজ করে নিয়েছেন যে এটা নিশির হ্যালুসিনেশন। সিজোফ্রেনিয়ার কারণে এমনটা হয়েছে। কিন্তু তবুও তিনি ভাবছেন বিষয়টি নিজেই একবার খতিয়ে দেখবেন। নিজের বাসায় পৌঁছে বড়সড় একটা ঘুম দিয়ে উঠলেন প্রায় সন্ধ্যার দিকে। রাতের খাওয়া সেরে নিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। এরপর বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে।

(১৬ এপ্রিল, রাত ১২ টা।)

নিশির বর্ণনা অনুযায়ী খালি প্লটটায় চলে আসেন ড. আলফাজ। কৌতুহলই তাকে টেনে আনে। সকালে নিশিকে দেওয়া ব্যাখ্যাটার সত্যতা জানার একটাই উপায়। বেলচা চালিয়ে নিঃশব্দে খুঁড়ে যান ড. আলফাজ। নরম কিছুতে বেলচা পড়তেই থমকে যান ডক্টর। মাটি সরিয়ে মোবাইলের আলো ফেললেন সেদিকে, আধপঁচা মেয়েলি একটা হাতের দিকে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ড. আলফাজ।

পরমূহুর্তে ছিটকে আসেন কয়েক পা। ভয় পেয়ে যান প্রচণ্ড। তার ব্যাখ্যানুযায়ী, নিশির যদি হ্যালুসিনেশন হয়ে থাকে তবে এখানে কারো লাশ থাকার কথা নয়। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ভয়ের অজানা সাগরে ডুবছেন। ঘাড়ের চুলের গোড়া দিয়ে ঘাম বেয়ে পড়ছে। চলে যাবেন নাকি পুলিশে ফোন দেবেন বুঝে উঠতে পারেন না তিনি। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেন, এখন পুলিশে ফোন দিলে অবশ্যই ফেঁসে যাবেন তিনি। এতো রাতে এখানে তিনি কী করছিলেন?- এটাই হবে তাদের প্রথম প্রশ্ন। এর থেকে ভালো তিনি বাসায় ফিরে যান। সকালে কারও নজরে পড়লেই পুলিশে খবর পৌঁছে যাবে।

পরদিন সকালে চা হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসতে ল্যান্ডফোনটি বেজে উঠলো। চায়ের কাপটিকে টেবিলের উপর রেখে সেদিকে এগিয়ে যান ডাক্তার। ফোন উঠালে ওপাশ থেকে মেয়ে কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, "হ্যালো ডক্টর, আমি লিজা বলছি।"

"হ্যাঁ বলো লিজা।"

"সকালের খবরটি দেখেছেন?"

"এখনও দেখিনি।"

"দ্রুত দেখে নিন। আর দেখা শেষ হলে দ্রুত আমাদের বাসায় চলে আসুন।"

ওপাশ থেকে লাইন কেটে দেয় লিজা। ডাক্তার বিস্ময় নিয়ে টিভির রিমোট হাতে নিলেন। চ্যানেল ঘোরাতে একটি নিউজ চ্যানেলে দেখলেন, কলোনির পাশ থেকে একটি ফাঁকা প্লট থেকে তরুণীর মৃতদেহ উদ্ধার। অবাক হয়ে তার চক্ষুজোড়া কপালে ওঠার কথা। কিন্তু তিনি অবাক হলেন না। তিনি জানতেন যে আজ তার এমন নিউজ দেখতে হবে। এখন শুধু চিন্তা হচ্ছে লিজা বা নিশির জন্য তার কাছে কী ব্যাখ্যা আছে।

_____

(১৭ এপ্রিল, দুপুর ২টা)

"আমি কালই বলেছিলাম ডক্টর। আমি আসলেই খুন করে বসেছি।"- চোখ থেকে জল মুছে বলতে থাকে নিশি।

ডাক্তার বিচলিত গলায় উত্তর দিলেন, "আমি এখনও আমার সিদ্ধান্তের উপর অটল আছি।"

"সকালের নিউজটি দেখার পর আপনি কীভাবে এখন নিজের পক্ষে রায় দিচ্ছেন?"

"কাল রাতে আমি গিয়েছিলাম তোমার কথার সত্যতা যাচাই করতে।"

"মানে?"- অবাক হয় নিশি, সাথে লিজাও।

"হ্যাঁ, তোমার বলা স্থানটিতে খুঁড়তে খুঁড়তে এক পর্যায়ে ঐ মেয়েটির ডেডবডির উপস্থিতি টের পাই।"

"তবুও আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না?"

"অবশ্যই না।"

"কেন?"

"প্রথমত, আমি তোমাদের গেটের দারোয়ানের সাথে কথা বলেছি। সে বলেছে কাল রাতে তুমি একাই বের হয়েছিলে, কারও লাশ নিয়ে নয়। আর দ্বিতীয়ত ও সবথেকে বড় বিষয় হলো, মেয়েটির শরীর প্রায় পঁচে গিয়েছে। পরশু রাতে খুন করে তুমি তাকে পুতে রাখলেও কাল রাতেই এসে এমন পঁচা দেহ দেখতে পেতাম না। মাত্র একরাতের ব্যবধানে একটি লাশ এতো পঁচে যায় না। অর্থাৎ লাশটি সেখানে আরও আগে থেকেই ছিল।"

"কিন্তু ডক্টর, লাশটি সেখানে আসলো কোত্থেকে?"

"হতে পারে কাকতালীয়। ঘেটে দেখতে হবে। আর তাছাড়া পুলিশ যখন লাশটিকে পেয়েছে, খুব শীঘ্রই তার পরিচয় পাওয়া যাবে। এতো দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। জানোই তো তাড়াহুড়ো আসে শয়তানের পক্ষ হতে৷"

(বিকাল ৪টা)

সেই দু'জন গোয়েন্দাদের থেকে একজন আবারও এসেছে তাদের বাসায়। এবারে ইউনিফর্ম চড়ানো আছে গায়ে। গতবারের মতো এবারও লিজা দরজা খুলে দেয়। তাকে বসতে বলে সে। কিন্তু তিনি না করে দেন। বললেন, "এখন হাতে সময় নেই।"- পকেট থেকে মোবাইল বের করে তা লিজার মুখের সামনে ধরেন আয়াজ। আজ সকালে যার লাশ পেয়েছে তারা তারই ছবি। জিজ্ঞাসা করলেন যে লিজা তাকে চেনে কি না। লিজা বেশ কয়েক সেকেন্ড লাশটির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে না-সূচক উত্তর দেয়।

আয়াজ আবার প্রশ্ন করলেন, "আপনাদের ফ্ল্যাটের পাশেরই একটা প্লট থেকে তার দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আপনি কি কখনও সন্দেহজনক কাউকে ও জায়গাটিতে দেখেছেন?"

"আমাদের এখানে মানুষজনের আনাগোনা খুবই কম। মাঝরাতের পর এসে কেউ লাশ পুতে গেলেও দেখার মতো কেউ নেই। হয়তো তেমনটাই হয়েছে।"

"আচ্ছা ধন্যবাদ।"- একটি হাসি দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন আয়াজ।

(রাত ৯টা)

"আপা।"

"বল।"

"একটা সত্যি কথা বলবে?"

"হু, বল।"

"১২ তারিখের রাতে তুমি কোথায় ছিলে?"

লিজা চমকে ওঠে নিশির প্রশ্নে। উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করে, "কেন?"

"ঐ রাতে তুমি বাসায় ছিলে না। মানে, যখন সামিরের খুন হয়। ফিরে আসলে ১২টারও পরে। কিন্তু তুমি এত রাত অব্দি বাইরে থাকার মতো মেয়ে না। কোথায় ছিলে আপা?"

"আমি মনে করতে পারছি না।"

"আমার সামনে অভিনয় করবে না অন্তত। আমি পুলিশ বা গোয়েন্দা নই, আমি তোমার বোন। তোমার চালচলন সম্পর্কে যথেষ্ট আইডিয়া আছে আমার। দিনরাত একসাথেই থাকছি আমরা। তুমি কী বুঝতে পারছো না যে ঐ রাতের পর থেকে তোমার মধ্যে আমূল পরিবর্তন দেখছি আমি?"

লিজা একেবারে নিশ্চুপ। নিশি তার দিকে একের পর এক প্রশ্নের গোলা নিক্ষেপ করছে। আর সেই গোলার ঘায়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে লিজার দেহ।

"সামিরের এপার্টমেন্টে গিয়েছিলে তাই না?"

লিজা মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করেছে।

"খুনটি তুমি-ই করেছ না আপা?"

লিজার কান্নার মাত্রা বেড়ে যায়। বাতাসে মাথা ঝাঁকিয়ে ভাঙা ও ক্ষীণস্বরে উত্তর দেয়, "হ্যাঁ।"

চলবে...

Sahin, Shuvo, Hasibul hasan, Nasim, Mr kiddo, Mahmud, Akash and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 13
স্বর্ণমুদ্রা : 395
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-26
View user profile

টেল অব টু সিস্টার্স Empty Re: টেল অব টু সিস্টার্স

Wed May 26, 2021 2:58 am
৩য় পর্ব

"মেয়েটির মধ্যে নজর কেড়ে নেওয়ার মতো ক্ষমতা আছে।"- দুই আঙুলের মাঝে কলম ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন ওরহান।
"কার কথা বলছো?"- আয়াজ প্রশ্ন করেন।
"লিজা।"
"প্রেমে পড়ে গেলে নাকি?"- প্রশ্নটি করে হেসে দেন আয়াজ।
"অবশ্যই না।"
"তাহলে?"

"সুন্দরের প্রশংসা করা বলতে পারো।"- কিছু সময় থামলেন ওরহান। ফের বললেন, "আচ্ছা একটা বিষয় ক্লিয়ার করো তো।"
"হ্যাঁ?"
"সামিরের মুখ থেতলে দিয়েছিল কেন খুনি? আর আঙুলগুলোই বা কেটে নিবে কেন?"
"মোটামুটি ধারণা করা যায়, খুনি সামিরের ডেডবডির পরিচয় গোপন করতে চেয়েছিল। মোটামুটি না, নিশ্চিত হয়েও বলা যেতে পারে।"
"ব্যাপারটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়ালো না?"- কলমটিকে টেবিলের উপর রেখে প্রশ্ন করলেন ওরহান।
"যেমন?"

"ধরলাম যে খুনি এটা চেয়েছে যে আমরা যেন সামিরের পরিচয় না পাই এজন্য মুখ থেতলে দিয়েছে আর আঙুলগুলো কেটে নিয়েছে যাতে আঙুলের ছাপ না পাই।"
"হ্যাঁ তেমনটা-ই।"
"যদি খুনি এভাবেই তার পরিচয় গোপন করতে চায় তাহলে তার এপার্টমেন্টেই তার লাশ রেখে গেল কেন? অদ্ভুত!"
"তাহলে অন্য কোনো কারণ আছে।"
"তা তো অবশ্যই আছে। আমাদের খড়ের গাদা থেকে সূঁচ বের করতে হবে এই যা।"

"আর কলোনির পাশের প্লট থেকে যে লাশটি পাওয়া গিয়েছে ওটার কী হলো?"
"ময়নাতদন্তের পর জানা গিয়েছে মেয়েটির মৃত্যু তেরোদিন আগে হয়েছিল। শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে।"
"নিশ্চিত হচ্ছো কীভাবে যে তাকে মার্ডার করা হয়েছিল?"
"যেখানে তার ডেডবডি পাওয়া গিয়েছে ওটা কবরস্থান নয়। স্পষ্টতই কেউ যেন জানতে না পারে সেজন্য পুতে রাখা হয়েছে। মেয়েটি মুসলিম হলে অবশ্যই কাফনের কাপড় জড়ানো থাকতো আর হিন্দু হলে সৎকার করে ফেলা হতো। মানে তার মৃত্যুর খবর গোপন রাখা হয়েছে।"
"এমনটা হয় যদি? সে আত্মহত্যা করেছে আর অন্য কেউ এসে তার লাশ পুতে রেখে গিয়েছে?"
"কেউ এমন কেন করবে? যদি করেও থাকে তবে তার পিছেও অবশ্যই কোনো কারণ আছে। আর আমাদের তা খুঁজে বের করতে হবে।"
"একসাথে দু'টো কেইস?"
"আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে সামির আর এই মেয়ের মৃত্যুর মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে।"

"আমার একটা প্রশ্ন আছে।"
"হ্যাঁ?"
"মেয়েটির লাশের সন্ধান আমরা পেয়েছি ঠিকই। কিন্তু কীভাবে পেলাম?"
"সকালে কেউ খুঁড়ে ফেলা মাটির নিচে তার লাশকে দেখে আমাদের জানিয়েছে।"
"এক্সাক্টলি! মাটি খোঁড়া হয়েছে। কিন্তু কে খুঁড়লো?"
আয়াজের প্রশ্নে চিন্তায় ডুব দেন ওরহান। আসলেই, কেউ না কেউ তো খুঁড়েছেই। কুকুর বিড়াল হবে না এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিত৷ এ প্রশ্ন আগে কেন তার মাথায় খেলেনি?

"যে-ই খুঁড়ুক, আমার সন্দেহ যে সে জানতো ওখানে ঐ লাশটি আছে। সম্ভবত খুঁড়েছে এজন্য যেন আইনের লোকের চোখে আসে বিষয়টা।"
"কিন্তু কেউ এমন করার পিছনে কারণ কী থাকতে পারে?"

"প্রত্যেকটা কাজের পিছনেই কারণ থাকে। ঐ যে কথায় আছে না? 'নো স্মোক উইথাউট ফায়ার'। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে যে, যদি কেউ ইচ্ছা করেই লাশটিকে আমাদের চোখে পড়াতে চায় তবে সে যানে তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল। এমনও হতে পারে, এই মেয়েটিকে কেউ খুন করে পুঁতে রেখেছে যেটা সে জানতো আর তাকেই ধরিয়ে দেওয়ার জন্য লাশটিকে আমাদের নজরে এনে দেয়।"
"এমনটা হলে মেয়েটির লাশ থেকেই তার খুনি কে ছিল এটা জানা সম্ভব?"
"হতে পারে সম্ভব।"

_____

রুমের মধ্যে পায়চারি করছেন ড. আলফাজ। লাশটি ওখানে কীভাবে আর কোথা থেকে এলো এটাই ভাবছেন তিনি। যদিও এটা পুলিশ বা আইনের লোকের কাজ, কিন্তু বিষয়টি তার রোগীর সাথে জড়িত। একেবারে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না এটাকে। নিশির সিজোফ্রেনিয়া থাকুক আর না থাকুক, সম্ভবত সে জানতো যে ওখানে লাশটি আছে। আর এটাকে সে মিডিয়া বা হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টের নজরে নিয়ে আসতে চেয়েছে। যেটা হয়েছেও বটে।

তিনি যেটা ভাবছেন সেটা কী আদৌ সত্যি? নাকি স্রেফ অনুমান?- নিজেকেই প্রশ্ন করলেন ডাক্তার। গতরাতের কথা ভাবতেই গা গুলিয়ে আসছে। কখনও মাটি খুঁড়ে আধপঁচা কোনো লাশ পেতে হবে এমনটা কস্মিনকালেও চিন্তা করেননি তিনি। তবে পৃথিবীতে মাঝে মাঝে রহস্যজনক কিছু ঘটে। এ বিষয়টি কি তেমনি কোনো রহস্যের সাথে জড়িত?- আবারও নিজেকে প্রশ্ন করলেন তিনি। রহস্য তো বটেই৷ মানুষের জীবনটাই একটা রহস্যের গোলকধাঁধায় বন্দি।

_____

প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে দাবার গুটিগুলোকে নড়াচড়া করিয়ে শেষ অব্দি দু'টি পেয়াদা দিয়েই রাজাকে চেক দিয়ে পরাস্ত করলেন ওরহান। আয়াজ হতাশামূলক একটা নিশ্বাস ছাড়লো। সামান্য পেয়াদা বা সৈন্যকে দিয়ে এভাবে তাকে পরাস্ত করা হবে সে কল্পনাও করতে পারেনি।

"তোমার উচিত ছিল কুইন বা রুক দিয়ে রাজাকে আটকানো।"- দুঃখ করে বললেন আয়াজ।
"কেন?"- মুখে হাসি ফুটিয়ে প্রশ্ন করলেন ওরহান।
"আমি ভেবেছিলাম এমনটাই করবে। পেয়াদা দিয়ে আমাকে আটকাবে এমন কিছু মাথায়ও আসেনি আমার।"
"কেন? পেয়াদা দিয়ে পরাজিত করেছি বলে কষ্ট লাগছে নাকি?"- আবারও হাসলেন তিনি।
"তোমার মতো দাবাড়ুর সাথে বসলে হারতে হবে সেটা তো আগের থেকেই জানতাম। কিন্তু তাই বলে পেয়াদা দিয়ে!"

"দাবার কোর্টে সব গুটিগুলোকেই সঠিকভাবে চালানো উচিত। হোক সেটা মন্ত্রী বা পেয়াদা। ছোট বলে এই পেয়াদাগুলোকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। আটটা ঘর পেরুতে পারলে সেও কিন্তু যেকোনো একটা পদ পেয়ে যাবে- কুইন, রুক, নাইট বা বিশপ।"
"হুম।"
"আমাদের হাতে থাকা কিছু কিছু কেইসও কিন্তু এই দাবা খেলার মতোই।"
"যেমন?"

"প্রতিটা কেইসে ছোট বা বড় বেশ কিছু সূত্র থাকতে পারে। আমরা সচরাচর বড় কোনো সূত্র ধরে এগোই৷ ছোট সূত্রগুলোকে উপেক্ষা করি বা আমাদের চোখেও পড়ে না সেগুলো। কিন্তু এই ছোট সূত্রগুলোই পেয়াদার মতো করে রাজাকে ধরাশায়ী করতে পারে৷"
আয়াজ মনযোগী শ্রোতা হয়ে তার কথাগুলো শুনতে লাগলেন।

"এখন আমাদের হাতে যে কেইসটি আছে, সামির হত্যার- এই কেইসের ক্ষেত্রেও আমরা বড় কোনো সূত্রের পিছনে ছুটছি আর ছোট সূত্রগুলোকে উপেক্ষা করছি। এমনটাও হতে পারে ছোট একটা সূত্র দিয়েই আমরা এই কেইসের তলা অব্দি পৌঁছাতে পারবো।"

"আমার একটা প্রশ্ন আছে।"
"হ্যাঁ?"
"সামিরকে হত্যার পিছনে কী কারণ থাকতে পারে?"
"সেটা জানি না। তার বাসা থেকে কিছু চুরি যায়নি তাই এ দিকটা বাদ। হতে পারে কেউ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তার খুন করেছে৷"

"প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তো শত্রু থাকা প্রয়োজন।"
"তার শত্রু ছিল কি না এটা আমরা জানি না। হতেও পারে এদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।"
"আর ঐ মেয়েটার ব্যাপারে?"
"আমরা খুব শীঘ্রই তার পরিচয় বের করতে পারবো আশা করি।"

দাবার গুটিগুলোকে ফের বোর্ডের উপর সাজাতে সাজাতে আয়াজ বললেন, "চলো আরেকবার হয়ে যাক।"
ওরহান মুচকি হেসে হেলান ছেড়ে খেলায় মনোনিবেশ করলেন।

_____

"মোটেও ন্যাকা কান্না করবে না আপা।"- চোখেমুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বললো নিশি। লিজা এখনও কান্না করে যাচ্ছে।
"আপা আমি থামতে বলেছি কিন্তু।"- নিশির জোরগলায় বলা কথাকে আমলে নেয় এবার লিজা। মুখ তুলে তাকায় তার দিকে।
"তুমি সেই রাতে সামিরের ফ্ল্যাটে যাও আর তার খুন করো- এমনটা যদি পুলিশ বা ঐ পাক্কা সেয়ানা গোয়েন্দাদু'টো জেনে যায় তবে?"- নিশি প্রশ্ন করে।
"আমি জানি না।"- চাপা কান্না লুকিয়ে রেখে উত্তর দেয় লিজা।

"তুমি ঐ রাতে সেখানে ছিলে না।"
"মানে?"- অবাক হয়ে লিজা প্রশ্ন করে।
"হ্যাঁ, তুমি ঐ রাতে সাফরন গার্ডেনে সামিরের সাথে ডিনারে গিয়েছিলে।"- অবিচলিত কণ্ঠে উত্তর দেয় নিশি।
"তোর কথার কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।"

"গোয়েন্দা দু'টো আবার আসবে। অবশ্যই তোমার অ্যালিবাই চাইবে আবারও। তখন তাদের এই উত্তর দেবে।"
"কিন্তু মিথ্যা বলবো?"
"ওরে সত্যবাদী! তাহলে বলে দাও ঐ রাতে সামিরের ওখানেই গিয়েছিলে তুমি আর খুনটাও তুমিই করেছ।"- চোখ বাকিয়ে বললো নিশি।

লিজা থ মেরে আছে। কোনো উত্তর নেই তার কাছে। সে জানেও না নিশি তাকে এমনটা বলতে বলছে কেন। তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে না তো আবার? পরক্ষণে ভাবে, এমনটা না বললেও তো ফাঁসবে সে৷ চিন্তায় নিজের চুলগুলোকে একটা একটা করে টেনে ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। নিশিকে সে প্রচণ্ড বিশ্বাস করে, কিন্তু এই মূহুর্তে পারছে না। তার সামনে অন্য কোনো রাস্তাও নেই আর।

"আর ঐ জুনিয়র গোয়েন্দা কাল এসে কী দেখাচ্ছিলো তোমাকে?"- নিশি আবার প্রশ্ন করে।
"ঐ মেয়ের ছবি, যেটিকে আমাদের পাশের প্লটে পাওয়া গিয়েছে।"
"চেন তাকে?"
"না।"
"সত্যি বলছো তো?"
"হ্যাঁ, চিনি না।"
"আচ্ছা।"- দম নেয় নিশি, ফের বলে, "মনে থাকে যেন, যেমনটা বলতে বললাম। এদিক সেদিক হলে তোমারই বিপদ।"
"আচ্ছা।"- মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় লিজা।
"ঘুমাতে গেলাম। সকালে ড. আলফাজের সাথে এপয়েন্টমেন্ট আছে।"

_____

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্প করছে তারা। অফিসের ল্যান্ডফোনে কল আসে। আয়াজ ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকালেন। আবার সামনে তাকিয়ে ইশারায় ওরহানকে বললেন, "আমি দেখছি।"

মিনিটখানেকের মতো কথা বলে ফিরে আসলেন তিনি। ওরহান প্রশ্ন করলেন, "জরুরি কিছু?"
"হুম।"- গম্ভীরমুখে উত্তর দেন আয়াজ।
"কোন ব্যাপারে?"
"ব্লক-ডি এর কনস্ট্রাকশনরত একটা বিল্ডিংয়ের নিচে একটি লাশ পাওয়া গিয়েছে। মনে হয় ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছে।"

"উফ! আবার লাশ।"- হতাশার সুর তুললেন ওরহান। হোমিসাইড ডিপার্টমেন্টে আসাই ভুল হয়েছে- এমনই অভিব্যক্তি তার। হোমিসাইড ডিপার্টমেন্ট মানেই মার্ডার কেইস। আর মার্ডার কেইস মানেই মার্ডার৷ আর মার্ডার মানেই লাশের সমাহার- তা জানা কথা। তবুও ওরহানের মুখে হতাশার নিশ্বাস। কয়েক সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে আবার প্রশ্ন করলেন, "লাশটির পরিচয় পাওয়া গেছে?"

"হুম।"
"কার লাশ?"
"সামিরের।"
প্রচণ্ড বিস্ময়ে ফেটে পড়েন ওরহান। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আবারও প্রশ্ন করলেন, "কার লাশ?"
বিস্মিত কণ্ঠে আয়াজও উত্তর দিলেন, "সামিরের।"

চলবে...

Sahin, Shuvo, Hasibul hasan, Nasim, Mr kiddo, Mahmud, Akash and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 13
স্বর্ণমুদ্রা : 395
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-26
View user profile

টেল অব টু সিস্টার্স Empty Re: টেল অব টু সিস্টার্স

Wed May 26, 2021 2:59 am
৪র্থ পর্ব

"নিশি আপনার কাছে কেন আসে?"
"ডাক্তারের কাছে রোগী যে কারণে আসে।"
"মানে আমি বুঝাতে চেয়েছি তার রোগটা কী?"

ওরহানের প্রশ্নে মুচকি হাসলেন ড. আলফাজ। বললেন, "আপনি আমার সম্পর্কে ভুলে যাচ্ছেন হয়তো। আমি কখনও আমার রোগীর অসুখের ব্যাপারে বাইরের কাউকে জানাই না।"
"কিন্তু এ মূহুর্তে তার ব্যাপারে জানা উচিত আমাদের।"
"জানি। কিন্তু প্রত্যেক রোগীর অসুখ গোপনীয় আমার কাছে। আমি আপনাদের কাউকেই সাহায্য করতে পারবো না সেজন্য দুঃখিত।"
জোরে নিশ্বাস ফেলে ওরহান বললেন, "তাহলে আমাদের কাজটি আপনি করে দিন।"
"মানে?"
"এই কেইসের শুরু থেকে নিশি বা লিজার প্রতিটি পদক্ষেপ যেগুলোর সাথে আপনি পরিচিত, তা আবারও ভাবুন। আপনি ক্ষুরধার বুদ্ধির অধিকারী, আমি জানি একটা সূক্ষ্ম বিষয়ও আপনার নজর এড়াতে পারবে না।"

নিচের ঠোঁট কামড়ে মাথা ঝাকালেন ডাক্তার। বললেন, "তো আপনাদের তদন্ত আমাকে দিয়ে করাতে চাইছেন?"
"তেমনটা নয়। আপনার মনেও অবশ্যই এই কেইসের কিছু বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন জাগ্রত হচ্ছে। শুধু সেগুলোরই উত্তর খুঁজুন। আমি জানি এটা আমরা না বললেও করবেন। তবে উত্তর পাওয়ার পর যদি মনে করেন আমাদের জানানো উচিত, অবশ্যই জানাবেন।"
ওরহানের বলা কথাগুলো সত্য। তার মনে কিছু প্রশ্ন অবশ্যই জাগ্রত হয়েছে। তিনি কৌতুহলী, উত্তরগুলো খুঁজে বের করতেন-ই। তবে ওরহান এ ব্যাপারে তাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্ভবত তার মাথায় খেলছে কিছু। সেও বুদ্ধিদীপ্ত, দক্ষ গোয়েন্দা। অনেক কিছু ইতোমধ্যে আঁচও করতে পেরেছে সম্ভবত- ভাবলেন তিনি। সে ব্যাপারে জানতে পারলে তার জন্যই ভালো হতো। কিন্তু ডাক্তার নিজে যেখানে তাদেরকে কিছু জানাচ্ছেন না, তারা কেন জানাবে?
নিশির ব্যাপারে কি বলে দেবেন তাদেরকে? তার অসুখের ব্যাপারে?- নিজেকে প্রশ্ন করলেন ডাক্তার। কিন্তু কিছুতেই সায় দিচ্ছে না তার ভিতর থেকে। তার স্বভাববিরোধী কাজ এটা৷ তার নিজেকেই জানতে হবে সবকিছু, পুলিশ-গোয়েন্দার সাহায্য সহ অথবা ছাড়া।

_____

"ডাক্তারের কি আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিত ছিল না?"- আয়াজ প্রশ্ন করেন।
"ছিল, কিন্তু তিনি কিছুতেই জানাবেন না নিশির অসুখের ব্যাপারে।"- উত্তর দেন ওরহান।
"মানে তুমি আগে থেকেই জানতে তিনি তার ব্যাপারে আমাদের নাকোচ করে দিতেন?"- অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন আয়াজ।
"হ্যাঁ।"
"তাহলে তার কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল?"
"তিনি রহস্যের তল অব্দি পৌঁছাতে আমাদের সাহায্য করবেন।"
"কীভাবে?"
"সময় এলে দেখতে পাবে।"
"এখন কী করা উচিত আমাদের?"
"লিজার সাথে দেখা করবো।"

পনেরো মিনিটের মাথায় পৌঁছে যান তারা। কলিং বেলের সুইচ চাপার কয়েক মিনিট বাদে লিজা এসে দরজা খুলে দেয়। ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসলেন তারা। লিজার মুখে কৃত্রিম হাসি লেগে আছে। ভিতরে ভিতরে ভয়ও কাজ করছে বেশ। একটাই আশংকা- ধরা পড়ে যাব না তো?

"১২ তারিখের রাতে কোথায় ছিলেন মনে করতে পেরেছেন মিস?"- প্রশ্ন করলেন ওরহান।
"হ্যাঁ!"- উত্তর দিতে গিয়ে তার বুকের ধকফকানি আগের থেকে অনেকগুণে বেড়ে যায়। কাঁপা গলা আর ভয়কে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বজায় রেখে সে বললো, "আসলে ঐ রাতে সামিরের সাথে ডিনারে গিয়েছিলাম আমি।"
অবাক হলেন ওরহান, সাথে আয়াজও।
বিস্ময় চেপে রেখে প্রশ্ন করলেন, "কোথায়?"
"সাফরন গার্ডেনে।"- নিশির শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো বলে যাচ্ছে লিজা।
"যতদূর জানি, সাফরন গার্ডেনে বিলের রসিদ ধরিয়ে দেওয়া হয়। আপনাদের রসিদটি দেখাতে পারবেন?"
"আসলে.."- ইতস্তত করলো লিজা, "আমাদের ডিনার করা হয়নি।"
"কেন?"- আবার অবাক হলেন তারা।
"সামির এসেছিল না ঐ রাতে। তাই কিছু খাওয়া হয়নি আর বিলও হয়নি।"
"এরপর ফিরে আসলেন আপনি?"
"জি।"
"ক'টা নাগাদ?"
"এগারোটার আশেপাশে হবে।"
"আচ্ছা একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি।"
"হ্যাঁ?"
"সামিরের সাথে আপনার কোনো বিষয়ে মনোমালিন্য ছিল? বা ঝগড়া হচ্ছিল?"
"হ্যাঁ। তার খুনের আরও বেশ কিছুদিন আগে সে তার বিয়ের কথা বলেছিল। আমি অবাক হচ্ছিলাম সে আমাকে ধোঁকা দিচ্ছিল এজন্য।"
"কার সাথে বিয়ের কথা হচ্ছিল জানেন কি?"
"না, সেটা জানায়নি। তবে সে আমাকে তার ছবি দেখিয়েছিল।"- আয়াজের উদ্দেশ্য করে লিজা আবার বলে, "আপনি সেদিন একটি মেয়ের ছবি দেখিয়েছিলেন যার লাশ পাওয়া গিয়েছে আমাদের পাশের প্লটে। ওটা আরেকবার দেখতে পারি?"
আয়াজ হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে ফোন বের করে তার চোখের সামনে ধরলে লিজা প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, "হ্যাঁ এই মেয়েটাই। দুঃখিত, তার চেহারা প্রায় পঁচে গিয়েছে এজন্য প্রথমে চিনতে অসুবিধা হয়েছিল।"

কিছু সময় ভাবলেন ওরহান। পরে আর কিছু জিজ্ঞাসা না করেই তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে আসলেন তারা। জিপে বসে আয়াজের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, "ঐরাতে যদি সামির সেখানে না গিয়ে থাকে আর লিজাও যদি এগারোটার আশেপাশে সেখান থেকে ফিরে আসে তবে সামিরের ফ্ল্যাটে গিয়ে খুনটি করা লিজার পক্ষে সম্ভব নয়।"
"কিন্তু সামিরের বাসায় যে লাশটি পাওয়া গিয়েছে সেটা তো সামিরের লাশই নয়।"
"জট তো এখানেই পাকাচ্ছে। ধরলাম লিজার মোটিভ ছিল সামিরকে খুন করার, কিন্তু ঐ অজ্ঞাত লাশটির ব্যাপারে কোনো মোটিভ নেই।"
"থাকতেও তো পারে৷"
"যদি থেকেও থাকতো তবে সে সামিরের ফ্ল্যাটেই খুনটি করবে কেন? আর সে যদি ঐ রাতে সাফরন গার্ডেনেই থাকে তাহলে খুনটি করা তার জন্য একেবারেই অসম্ভব।"
"তুমি লিজার কথায় বিশ্বাস করছো?"
"হ্যাঁ।"
"কেন?"
"দেখ, যদি আমরা দ্বিতীয়বারের মতো সামিরের লাশ না পেতাম তবে বিষয়টি সহজ হতো৷ পুরো বিষয়টা মিলাও। সামিরের ফ্ল্যাটে একটি খুন, সামির হঠাৎ উধাও আর কয়েকদিন পরে সামিরেরই লাশ।"
"কিছুই বুঝলাম না।"
"সাধারণ প্রেক্ষিতে এমনটাই মনে হচ্ছে যে, সামির তার ফ্ল্যাটে ঐ খুনটি করার পরে নিজেকে আড়াল করে নেয়। মুখ থেতলে আর আঙুল কেটে নেওয়া থেকে এটা প্রমাণ হয় যে সে চাচ্ছিল সবার নজরে পড়ুক সামিরই মারা গিয়েছে।"
"নিজের মৃত্যুর খবর প্রচার করবে কেন সে?"- অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন আয়াজ।
"হতে পারব লাইফ ইন্সুরেন্স। আমরা যে মেয়েটার আধপঁচা লাশ পেয়েছি, লিজার ভাষ্যমতে সে সামিরের বাগদত্তা ছিল। হতে পারে ইন্সুরেন্সের টাকা পাওয়ার জন্য একজন নমিনি দরকার ছিল তার। আর এই সেই মেয়েটা। মেয়েটির মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল জানি না, তবে যেহেতু সে সামিরের নমিনি ছিল এজন্য সামির তার মৃত্যু গোপন করে আর তাকে ঐ প্লটে পুঁতে আসে। এরপর সে নিজেরই খুনের একটা নাটক সাজায় যাতে সে ইন্সুরেন্সের টাকাগুলো পায়, আর যেগুলো পেত ঐ মেয়েটি। হয়তো সে কোনো একভাবে অন্য কাউকে মেয়েটির স্থানে বসিয়ে টাকাগুলো হাতিয়ে নিয়েছে।"

"আর সদ্য যে ব্লক-ডি এর কনস্ট্রাকশনরত একটি বিল্ডিং এর নিছে তার লাশ পাওয়া গেল এ ব্যাপারে কী বলবে? এতকিছুর পর আত্মহত্যা করবে কেন সে?"
"এটা আত্মহত্যা কি না আমরা সে ব্যাপারে কিছুই জানি না। আর এইমাত্র যেমনটা বললাম এটাও আমার স্রেফ অনুমান মাত্র। সামিরের নামে কোনো লাইফ ইন্সুরেন্স করা হয়েছিল কি না এ ব্যাপারেও তদন্ত করতে হবে।"
"কিন্তু সামিরের মৃত্যুর ব্যাপারে লিজাকে জানাওনি কেন?"
"ড. আলফাজ নিষেধ করেছেন।"
"কেন?"
"জানি না, তবে অবশ্যই তিনি কিছু একটা ধরতে পেরেছেন। আমরা যতটুকু জেনেছি এ ব্যাপারে শীঘ্রই তাকে জানানো উচিত। এতো ধারালো বুদ্ধির একজন মানুষের সাহায্য পাওয়া কম সন্তুষ্টিজনক নয়।"

_____

ব্লক-ডি এর নির্মাণাধীন বিল্ডিংটিতে পৌঁছানোর পর চারপাশটায় ভালো করে চোখ ঘুরিয়ে নিলেন ওরহান। নিচে যেখানে সামিরের লাশ পাওয়া গিয়েছে, পুলিশ ঘিরে রেখেছে। অবশ্য এটা এমন একটা জায়গা যেখানে ঘিরে রাখা আর না রাখা দু'টোই সমান। মানুষের আনাগোনা নেই৷ উত্তর ও পূর্ব পাশে উঁচু দু'টি ভবন এই নির্মাণাধীন ভবনটিকে রাস্তা থেকে আড়ালে রেখেছে। মিডিয়ার লোক ছাড়া এখানে ঝামেলা করতে আসার মতো কেউ নেই। এখানে লাশটি পড়ে থাকলেও সকাল ন'টার আগে কারও চোখে পড়ার কথা না। আর তেমনটাও হয়েছে বৈকি। ওরহান উপরের দিকে তাকালেন। সূর্যের আলো সোজা চোখের উপর পড়ছে। কপালে হাত দিয়ে চোখদু'টোকে রোদের থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করছেন। আটতলা বিল্ডিংটির ছাদে গেলেন ওরহান আর আয়াজ। চারপাশে ঘুরে দেখলেন। একেবারে কিছুই নেই। প্রচণ্ড রোদে ঘামতে শুরু করেছেন তারা। ভাগ্য ভালো এলিভেটরটি চালু আছে নইলে সিঁড়ি বেয়ে এতো উপরে আসতে হলে আধমরা হতে হতো। কোনো এক কারণে ভবন নির্মাণের কাজটি থেমে আছে তাই কনডাকটর বা শ্রমিক কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।

ছাদ থেকে অষ্টম তলায় আসলেন তারা। চারপাশে বালু-সিমেন্টের ধুলোয় ভর্তি। কলামগুলোর গোঁড়ায় যেন ধুলোর স্তুপ। একে একে পুরো ফ্লোরটাতে চোখ বুলালেন ওরহান। একটি কলামের নিচে একপাশে ধুলোর পরিমাণ কিছুটা কম। মনে হচ্ছে কিছু রাখা ছিল সেখানে। সেখান থেকে সরু সমান্তরাল দু'টি দাগ গিয়েছে সামনের দিকে। সেদিকটায় পা বাড়ালেন তিনি। হিসেবে মিলে যাচ্ছে, নিচে তাকাতেই সেই স্থানটিই চোখে পড়লো যেখানে সামিরের লাশ পাওয়া যায়। সেখানে রাখা নিচের দিকে একটু ঢালু করে রাখা তক্তার উপর লক্ষ্য করলেন তিনি। মনে হচ্ছে তক্তাটির অপর প্রান্ত পানি শুষে নিয়েছে। তবে এখানে পানি পড়ার বা আসার কোনো প্রশ্ন আসে না।

"কী দেখছো এতো খেয়াল করে?"- আয়াজ প্রশ্ন করলেন।
"তাপ ও চাপে পদার্থের পরিবর্তন ঘটে।"- সেদিকটাতেই লক্ষ্য রেখে উত্তর দেন ওরহান।
"মানে?"- কিছু বুঝতে না পেরে আয়াজ আবারও প্রশ্ন করলেন।
"ভালো করে লক্ষ্য করো। ঐ কলামটিতে কাউকে বেঁধে রাখা হয়েছিল যে কারণে ওখানে বেশি একটা ধুলো জমতে পারেনি। ফ্লোরে চিকন ও সমান্তরাল দু'টি দাগ জুতোর- কাউকে টেনে এ দিকটাতে নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থাৎ সে অজ্ঞান অবস্থায় ছিল। এখানে এই ঢালু তক্তাটির উপরে একটা বড়সড় বরফের টুকরো রাখা হয়েছিল আর তার সাথে উক্ত অচেতন ব্যক্তিকে তার সাথে কোনোভাবে রাখা হয়েছিল। বরফখণ্ডটি তাকে তক্তার উপর স্থিতিশীল হতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু গরমে এবং লোকটির চাপে ধীরে ধীরে তা গলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে গলে যায়। ফলে তার দেহ তক্তার উপরে ভারসাম্যহীন হয়ে নিচে পড়ে যায়। আর হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে এটা সামির। সে সুইসাইড করেনি, সুপরিকল্পিতভাবে মার্ডার করা হয়েছে।"

আয়াজ অবাক হয়ে কিছু সময় ধরে পুরো বিষয়টি মেলাতে থাকে। মনে মনে ওরহানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির প্রশংসা করে সে৷
বেশ কয়েক মিনিট বাদে সে প্রশ্ন করে, "আমরা শুধু ব্লাড গ্রুপের ভিত্তিতে প্রথমবারে পাওয়া লাশটিকে সামিরের লাশ বলে ধরে নিয়েছিলাম।"
"হ্যাঁ। কিন্তু ঐ খুনটি যদি সামির করে থাকে তবে সামিরের খুন কে করলো? স্পষ্টতই খুনি চাচ্ছিলো যে তার উপস্থিতি ছাড়াই সামিরের মৃত্যু হোক, আর সেটা সুইসাইড হিসেবেই ধরে নেওয়া হোক। কিন্তু ছোট কিছু সূত্র ছেড়ে গিয়েছে সে।"

ওরহানের কথা শেষ হতে না হতে আয়াজের ফোন বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোন বের করে তিনি বললেন "ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের ফোন।"
ওরহান লাউডস্পিকার অন করে কথা বলতে বলেন।
ওপাশ থেকে কণ্ঠ ভেসে আসছে, "সামিরের শরীরে ট্রাঙ্কুইলাইজার পাওয়া গিয়েছে।"
ওরহান এইটারই সন্দেহ করছিলো এতক্ষণ। ঔষধটি দিয়েই তাকে অবচেতন করে এখানে রাখা হয়েছিল। কোনো উত্তর দেওয়ার আগে ওপাশ থেকে ফের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, "তবে একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পেয়েছি আমরা। সামিরের এবং পূর্বে পাওয়া লাশটির ডিএনএ টেস্ট করিয়েছি। আশ্চর্যজনকভাবে দু'জনের ডিএনএ-ই ম্যাচ করছে।"

বিস্ময়ের মাত্রা বেড়ে যায়। ওরহান আশ্চার্যের সাথেই প্রশ্ন করলেন, "দু'জন আলাদা মানুষের ডিএনএ এক হয় কীভাবে?"

চলবে...

Sahin, Shuvo, Hasibul hasan, Nasim, Mr kiddo, Mahmud, Akash and লেখাটি পছন্দ করেছে

avatar
ধুমকেতু
ধুমকেতু
Posts : 13
স্বর্ণমুদ্রা : 395
মর্যাদা : 20
Join date : 2021-05-26
View user profile

টেল অব টু সিস্টার্স Empty Re: টেল অব টু সিস্টার্স

Wed May 26, 2021 2:59 am
৫ম ও শেষ পর্ব

"সামিরের ব্যাপারে লিজা কিংবা নিশি কেউ জেনেছে?"
"আপনি নিষেধ করার পরে কাউকে জানাইনি।"
"তবে তারা ইতোমধ্যে হয়তো জেনেও গিয়েছে।"
"কিন্তু তার মৃত্যুর ব্যাপারটি তাদের থেকে গোপন রাখতে চাচ্ছেন কেন?"
"শীঘ্রই জানতে পারবেন। তবে আমাদের নিশ্চিত হওয়া উচিত তারা এ ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছে কি না।"

টেবিল ছেড়ে উঠলেন ড. আলফাজ। তাকে অনুসরণ করে ওরহানও উঠে দাঁড়ালেন।
"আপনি কি কোথাও যাচ্ছেন ডক্টর?"- ওরহান প্রশ্ন করলেন।
"চেম্বারে যাব। কিছু রোগীর সাথে এপয়েন্টমেন্ট আছে। আপনি যতদ্রুত সম্ভব খোঁজ নিয়ে জানান যে তারা এ ব্যাপারে আদৌ কিছু জানে কি না।"

ড. আলফাজ পা বাড়ালেন দরজার দিকে। ওরহানও তাকে অনুসরণ করেই এগোচ্ছেন। পিছন থেকেই প্রশ্ন করলেন, "আপনি কি কিছু জানতে পেরেছেন ডক্টর? বা সাসপেক্ট কে খুঁজে পেয়েছেন?"
ডাক্তার তার প্রশ্নে থেমে গেলেন। তার দিকে ঘুরে তাকিয়ে কিছু বলার আগে ওরহান বলে ওঠেন, "আশা করি আবারও বলবেন না যে এটাও পরে জানতে পারবো।"
ডাক্তার মুচকি হাসলেন এবার। বললেন, "কিছু বিষয় মেলানো জরুরী। নইলে আমি আন্দাজ করেই কিছু একটা বলতে পারবো না।"
সামনের দিকে ঘুরে আবার পা বাড়ালেন ডাক্তার৷ হাঁটতে হাঁটতে বললেন, "আমার মনে হচ্ছে আমি সঠিক দিকে এগোচ্ছি৷ এখন অপেক্ষা শুধু সঠিক সময়ের।"

_____

"কিছু জানতে পারলে ডক্টরের থেকে?"- মাথা তুলে প্রশ্ন করলেন আয়াজ।
ঠোঁট দিয়ে অসন্তোষজনক ভাব ফুটানোর মতো একটা শব্দ করে না-সূচক মাথা নাড়ালেন ওরহান। বললেন, "ডক্টরের মাথায় এমন কিছু খেলছে যেটার কোনো সূত্র আমাদের কাছে নেই। এ ব্যাপারে কিছু বলছেনও না তিনি।"
"মনে হচ্ছে বিষয়টি তার রোগীর সাথে জড়িত৷ যেকারণে নিশ্চিত না হওয়া অব্দি তিনি মুখ খুলছেন না। সরাসরি নাকোচ করে দিচ্ছেন আমাদের।"
"আমারও তেমনটাই মনে হচ্ছে।"

"কেইসটা শুরু থেকেই ঘোলাটে।"
"একজন মৎস্য শিকারীর জন্য ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা আরও বেশি সহজ।"
"বুঝলাম না।"
"পানি যখন অত্যাধিক ঘোলা করা হয় তখন পানির মধ্যের কাদা বা মাটির কণাগুলো মাছের শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্নতা ঘটায় অর্থাৎ মাছ পানি থেকে ঠিকমত অক্সিজেন নিতে পারে না। ফলস্বরূপ মাছ গুলো অক্সিজেন নেওয়ার জন্য উপরে খাবি খেতে থাকে এবং দূর্বল হয়ে যায়। এই সুযোগটাই শিকারীরা গ্রহন করে থাকে।"
"কিন্তু এই কেইসের মধ্যে মাছ শিকারকে টানছো কেন তুমি?"- চোখেমুখে বিস্ময় ফুটিয়ে প্রশ্ন করেন আয়াজ।

"যখন কোনো আনাড়ি সত্যকে লুকানোর চেষ্টা করে তখন সে খুবই জটিল ছদ্মবেশ ধারণ করে। আর বিষয়টিকে বেশি ঘোলাটে করে তোলে। যে কারণে মাছের মতোই খাবি খেতে থাকে ও পরবর্তীতে শিকারীর মেলানো জালে আটকে যায়।"
"কিন্তু আমরা আঁচও করতে পারছি না ঠিক কী হচ্ছে।"
"এজন্য কখনও আগে থেকে কিছু ভেবে রাখা উচিত নয়। চিন্তার ক্ষেত্রটা ছোট হয়ে আসে তখন। সহজ কোনো সূত্রও চোখে পড়ে না। আমাদের ব্যাপারটা ঠিক তেমনই হয়েছে। আমরা শুধু সামিরের সাথে কাদের সম্পর্ক, প্রথমে পাওয়া লাশটিকে কেন বিকৃত করা হলো, ঐ প্লটে পাওয়া লাশটি কার এগুলো নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছি। হয়তো কোনো একটা যোগসূত্র রয়েছে এর মধ্যে কিন্তু তা আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রটির বাইরে অবস্থান নিচ্ছে। আর এই সূত্রটিই সম্ভবত ড. আলফাজের কাছে ধরা দিয়েছে।"
"তাহলে ডক্টর এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাচ্ছেন না কেন?"
"ঐ যে শুরুতে যেমনটা বললে- বিষয়টি হয়তোবা তার রোগীর সাথে সম্পর্কিত।"

কিছু সময়ের জন্য কথার বিরতি নিলেন তারা। ওরহানের মস্তিষ্ক এখন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মেলানোর চেষ্টা করছে। অংক কষার জন্য পদ ও অপারেটর দু'টোই লাগে৷ শুধুমাত্র একগাদা পদ জড়ো করলে যেমন সমাধান বের হয় না তেমনি শুধুমাত্র অপারেটর পেলেও সমাধান করা সম্ভব না। এ মূহুর্তে তার কাছে অনেকগুলো পদ রয়েছে, অভাব শুধু একটি অপারেটরের। সেটা কী হতে পারে তা মোটেও মাথায় আসছে না তার। সম্ভবত ড. আলফাজের কাছে এই অপারেটরটি আগে থেকেই আছে। আর পদগুলো ড. পাচ্ছেন তাদের থেকেই। ব্যাস, অংক কষতে তার কোনো বাধা নেই। ওরহান মোটামুটি নিশ্চিত যে, ড. অবশ্যই অংকের সমাধানটি বের করে ফেলবে।

"সামিরের ফ্ল্যাটে পাওয়া লাশ সামিরের আইডেন্টিক্যাল টুইন ছিল। আর আইডেন্টিক্যাল টুইন্সদের ডিএনএ এক হয়ে থাকে। তবে তার ব্যাপারে কিছুই জানতে পারিনি আমরা। সামিরের সাথে তার কোনো যোগাযোগের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি তার নাম পর্যন্ত আমরা জানি না। সামির তাকে কোত্থেকে জোগাড় করেছে এ ব্যাপারে শুধু সে-ই জানে।"- নিরবতা ভেঙ্গে বলতে লাগলেন আয়াজ।

"ডিএনএ-র মিল থাকলেও কোনো টুইন্সের ফিঙ্গারপ্রিন্ট একে অন্যের সাথে ম্যাচ করে না। আর এজন্যই খুনের পর তার আঙুল কেটে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মুখ থেতলে দেওয়ার কারণ কী?"
"ড. আলফাজকে এ ব্যাপারে জানানো উচিত?"- আয়াজ প্রশ্ন করলেন।
"হ্যাঁ, যতদ্রুত সম্ভব জানানো উচিত।"

_____

সামিরের নামে কোনো ইন্সুরেন্স করা ছিল কি না সেটা বেশ দ্রুতই জানা গেল। আপাতত কম্পিউটারের স্ক্রিনে একটি মেইল ভাসছে। যার দিকে তাকিয়ে আছেন ওরহান ও আয়াজ। সামিরের নামে করা ইন্সুরেন্সের পুরো ডিটেইলস মেইল করা হয়েছে। একটা জায়গায় এসে চোখ আটকে যায় তাদের। নমিনি হিসেবে যার ছবি দেওয়া সেটা ঐ মেয়ে নয় যার লাশ তারা কলোনির পাশের প্লটে পেয়েছিল। অবাক হলেন দু'জনেই। তবে আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে তারা নমিনি হিসেবে থাকা মেয়েটির ব্যাপারে খোঁজ নিতে শুরু করলেন।

_____

মেয়েটির নাম রাফিয়া। মেইলে পাঠানো তথ্যানুযায়ী তার খোঁজ পেতে বেশি বেগ পেতে হয়নি। তবে তাদের কাছে অবাক করার বিষয় এটা দাঁড়িয়েছে যে, এই মেয়েটি সামিরের বাগদত্তা ছিল। কিন্তু লিজার ভাষ্যমতে তার বাগদত্তা ছিল ঐ মেয়েটি যার লাশ পেয়েছিল তারা। তবে লিজা মিথ্যা বলেছে? কিন্তু কেন?
আরও একটা অদ্ভুত বিষয় হলো, এই মেয়েটির সাথে নাকি তার বিয়ে ভেস্তেও যায়। যেকারণে সামিরের কেইসে সে এখন অব্দি সামনে আসেনি। ইন্সুরেন্সে তার নমিনি হিসেবে এখনও রাফিয়াই আছে। কিন্তু তার সাথে যদি সামিরের বিয়ে না-ই হয় তবে সামির অবশ্যই নমিনি পরিবর্তন করতে চাইবে। এর মানে এটা দাঁড়ায়, নমিনি পরিবর্তন না করে সে ইন্সুরেন্সের টাকা পাওয়ার পরিকল্পনাটি করবে না, যেমনটা অনুমান করেছিলেন ওরহান।
বেশ বড়সড় গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছেন তারা। সেখান থেকে বের হতে একটি সাহায্যের হাত দরকার৷ আর এ হাত একমাত্র ড. আলফাজেরই হতে পারে।

পুরো বিষয়টি ড. আলফাজকে জানানোর পর তিনি আর কয়েক ঘণ্টা সময় চেয়ে নিলেন। ওরহান কোনোরকম আপত্তি ছাড়াই সম্মতি জানালেন। প্রায় সন্ধ্যার দিকে ড. আলফাজের ফোন এলো।
ওপাশ থেকে তিনি প্রশ্ন করলেন যে ওদের দুই বোনের কেউ সামিরের ব্যাপারে জানতে পেরেছে কি না।

"হ্যাঁ তারা জানতে পেরেছে যে নির্মাণাধীন ভবনের উপর থেকে সামির লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। মিডিয়া ঠিক এইভাবেই ঢোল বাজিয়েছে।"
"যেমনটা আশা করেছিলাম। আমার মেলানো সব তথ্যানুযায়ী আর আপনার বলা কথানুযায়ী এটা আত্মহত্যা না, মার্ডার। কিন্তু সেটা ভুলেও তাদের দু'জনের কারও সামনে বলতে যাবেন না।"
"আপনার পরিকল্পনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।"
"আমি নিশির কাছে ফোন করবো। আপনাদের দিয়ে করাবো না কারণ আপনারা আইনী লোক। আমার কথায় সে বা তার বোন কেউই সন্দেহ করবে না।"
"কোন কথা?"- ফোনের এপাশ থেকে বিস্ময়ের ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলেন ওরহান।
"বলবো সামির এখনও জীবিত আছে। আর সে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুলিশকে জানাতে চায়। কিন্তু তার আগেই সে জ্ঞান হারায়। ডাক্তার বলেছে সকাল হতে হতে তার জ্ঞান ফিরতে পারে। ব্যাস এটুকুই।"
"কিন্তু কেন?"
"সচক্ষে দেখবেন। নিশি আমার কাছে জানতে চাইবে সামিরের চিকিৎসা কোথায় হচ্ছে।"
"কিন্তু তার চিকিৎসা-ই তো হচ্ছে না।"

"এটা আমি-আপনি জানি, সে জানে না। আমার পরিচিত একজন ডাক্তারের ক্লিনিকের ঠিকানা ও রুম নম্বর দিয়ে বলবো সে ওখানে আছে৷ বাকিটুকু আমি আর আপনি সেখানে উপস্থিত থেকেই দেখতে পাবো।"

_____

রাত ১০ টার আশেপাশে। টিফিনবক্সে কিছু খাবার নিয়ে কেউ একজন প্রবেশ করলো ক্লিনিকের মধ্যে। একেবারে কেউই সন্দেহ করেনি। হাসপাতালগুলোর সিকিউরিটি সিস্টেম এখনও থার্ড ক্লাস রয়ে গেল- মনে মনে চিন্তা করলো সে। ভালোই হলো, তারই সুবিধা। সামির কোনো ওয়ান্টেড আসামীও নয় যে তার পাহারায় পুলিশ এসে থাকবে এখানে। এজন্য চিন্তা নেই তার, হাসপাতাল গার্ড আর নার্সদের ফাঁকি দেওয়া কোনো কঠিন কাজ নয়। শুধুমাত্র কেবিনে কারও উপস্থিতি না থাকলেই হলো। আর থাকলেই বা কী? এ ব্যবস্থাও সে করে এসেছে আগে থেকে। মৃদু পায়ে ২০৬ নম্বর কেবিনটির দিকে এগুচ্ছে সে।

কেবিনের মৃদু আলোতে সে স্পষ্ট দেখতে পায় বেডে কেউ-ই নেই। চমকে যায়- শিরদাঁড়া বয়ে অজানা আতঙ্কের শীতল স্রোত বয়ে যায় তার। কেবিনের লাইট জ্বলে ওঠামাত্রই বুঝতে পারে সে ফাঁদে পড়েছে। পালানোর কোনোরকম বৃথা চেষ্টা না করেই খালি বেডের উপর বসে পড়লো নিশি।

ওরহানের চোখেমুখে বিস্ময়, ড. আলফাজের মুখে বিজয়ীর হাসি। ওরহানের মতো মোটেও চমকে যাননি তিনি। যেন সবকিছু আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন কী হবে। তিনি জানতেন যে, সামিরের খবর পেয়ে নিশি মরিয়া হয়ে ছুটে আসবে তাকে খুন করতে। কিন্তু কেন? নিশি নীরবে বেডের উপর বসে ডুকরে কাঁদছে।

বিষয়টির বর্ণনা করতে শুরু করেন ড. আলফাজ।
"১২ এপ্রিলের রাতে লিজা সামিরের বাসায় গিয়ে সামিরের জমজ ভাইয়ের খুন করে বসে। সামির এটা আগে থেকে আন্দাজ করতে পেরে তার ভাইকে ব্যবহার করে। লিজাকে ফাঁসানোর মতো বেশ কিছু তথ্য ছিল তার কাছে৷ কিন্তু লিজা জানতোই না যে সে সামিরের নয়, তার ভাইয়ের খুন করেছে।"- ওরহানের দিকে লক্ষ্য করে ড. বললেন, "আপনি মনে করেছিলেন সামির ইন্সুরেন্সের টাকার জন্য এমনটা করেছে কিন্তু আদতে তা নয়। সামিরের এমন কোনো পরিকল্পনা ছিলই না। লিজা তার ভাইয়ের খুন করে যাওয়ার পর সামির নিজেই তার আঙুলগুলো কেটে দেয় আর মুখ বিকৃত করে দেয় যেন সে নিজে ফেঁসে না যায় যে সে তার ভাইকে ব্যবহার করেছে। মোটকথা সে বাদে কেউই জানতো না তার জমজ ভাই আছে। আর তাকে গোপন রাখার জন্যই সে এমনটা করেছে।"

কিছু সময়ের জন্য দম নেন ডক্টর। ফের বলতে শুরু করেন, "নিশি বুঝে গিয়েছিল তার বোন খুনটি করেছে। কিন্তু ১৪ তারিখের রাতে সে যখন ফুটওভার ব্রিজের নিচে সামিরকে দেখতে পায় তখনই গণ্ডগোল পেঁকে যায়। লিজাকে সেই রাতে আগ বাড়িয়ে ভূত দেখার কথা বলে যেন সে পরদিন সকালে কোনো সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে দেখা করে। ঠিক এভাবেই সে ১৫ তারিখ সকালে আমার সাথে তার বোনের ব্যাপারে আলোচনা করে আর এই সুযোগে নিশি সামিরকে আটক করে নেয়। যেকারণে আপনি আর আয়াজ ১৫ তারিখে তার বাসায় গিয়ে কাউকেই পাননি অথচ নিশির ঐসময়ে বাসাতেই থাকার কথা। নিশি জানতো, সামির তার বোনকে খুব দ্রুতই ফাঁসাতে পারবে কারণ তার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। আর এজন্য সে নিজের বোনকে বাঁচাতে এমন ঘৃণ্য খেলা শুরু করে।"

"কিন্তু আপনি নিশিকে সন্দেহ করা শুরু করলেন কেন?"- ওরহান মুখ খুললেন।

"নিশি চেয়েছিল আমি ধরে নেই যেন তার সিজোফ্রেনিয়া আছে। যেকারণে সে পরদিন রাতে একটা খুন করার ভ্রমের নাটক করে। আর আমাকে পরদিন সেটার বর্ণনা করতে থাকে। আমি কৌতুহল নিয়ে ঐ স্থানটিতে খুঁড়ে মেয়েটির লাশ পাই। আর এরপর সে আপনাদের নজরে আসে। আর এ বিষয়টিকেই আমি গোপন রেখেছিলাম।"
আবারও থামলেন ডক্টর। নিশির দিকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে ফের বলতে শুরু করলেন, "কিন্তু সামিরও একজন পাক্কা খেলোয়াড়। সে যখন দেখলো তার বাঁচার কোনো রাস্তা নেই আর। সে নিজেই ফাঁদ পাতলো। সে নিশিকে ঐ মেয়েটির ব্যাপারে বললো, যার লাশ কলোনির পাশের প্লটে পাওয়া গিয়েছে, তার সাথে সামিরের বিয়ের কথা চলছে। ব্যাস এটুকু মিথ্যার জালেই ফেঁসে গেল নিশি। সে এটা জানার পরেই ১৫ তারিখের রাতে হ্যালুসিনেশনের নাটক করে, যেন আমরা মেয়েটির লাশ অব্দি পৌঁছাই আর ঠিক তেমনটাই মনে হয় যেমনটা আপনি ভেবেছেন- সামিরের ইন্সুরেন্সের ব্যাপারে। সামির জানতো এ ব্যাপারে পুলিশ যখন খোঁজ করবে তখন জানতে পারবে সামিরের সাথে ঐ মেয়েটির নয়, বরং রাফিয়ার বিয়ের কথা হচ্ছিল। আর এভাবেই নিশি ফেঁসে যাবে নিজের অজান্তেই।"

"ঠিক তেমনিভাবে, নিশি সামিরের বলা মিথ্যা দিয়ে গল্প সাজালো, যেটা সে লিজাকে দিয়ে বলিয়েছিল আপনাদের। যেন আপনারা কেউ লিজাকে সন্দেহ না করেন। আর আপনারই বলা বর্ণনানুযায়ী সে ঐ নির্মাণাধীন ভবনে ওভাবে সামিরকে অচেতন করে রেখেছিল যাতে সে ওখান থেকে পড়ে মারা যায় আর নিশির সেখানে উপস্থিত হবারও প্রয়োজন হয় না। আর ঐ সকালে সে আমার সাথে এপয়েন্টমেন্ট নেয়, যাতে করে তার শক্ত একটা অ্যালিবাই তৈরি হয়ে যায়। ব্যাস, নিশির উপরেও সন্দেহ করার জায়গা থাকলো না। আর ঠিক এমনটাই হতো, যদি না সামির তাকে মিথ্যা বলে ফাঁসিয়ে দিয়ে না যেত। আর আমরা ঠিক তেমনটাই ধরে নিতাম যেমনটা নিশি পরিকল্পনা করেছে। এ ব্যাপারে সামিরের ক্রেডিট শতভাগ, কিন্তু বেচারা এখন এ জগতেই নেই।"

"নিশিকে সন্দেহ করার কারণ সর্বোপরি এটাই যে, তার বর্ণনানুযায়ী লাশ পাওয়া আমার কাছে কাকতালীয় মনে হয়নি। তাছাড়া যখন ইন্সুরেন্সের ব্যাপার থেকে রাফিয়ার পরিচয় পেলাম, বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়। বুঝাই যাচ্ছিল লিজা আপনাদের মিথ্যা কথা বলেছে যেমনটা নিশি তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল।"

"কিন্তু ঐ মেয়েটি কে? যার লাশ পেয়েছিলাম? আর নিশিই বা সামিরের খোঁজ কোথায় পেল?"
"সামিরের সাথে অনেক মেয়েই বিছানায় গিয়েছে। ঐ মেয়েটি হয়তো তেমনই কেউ। আর কোনো এক দূর্ঘটনায় সে সামিরের হাতে খুন হয়, তাই সামির তাকে ওখানে পুঁতে তার মৃত্যু লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। সম্ভবত এমনটাই হয়েছিল, সামির নেই তাই এ সত্য আমরা জানতে পারবো না। আর নিশি শুধু হাঙর ধরতে পানিতে রক্ত ছড়িয়ে দিয়েছিল। সামিরের নারীদেহের লোভ ছিল, আর ঠিক সেভাবেই নিশি তাকে কব্জা করা ফেলে।"- নিশির দিকে আবারও তাকালেন ড. আলফাজ। প্রশ্ন করলেন, "আমি কি ঠিক বললাম সবকিছু?"

নিশি কোনো কথা বলে না। শুধুমাত্র কান্নার শব্দটা আগের থেকে একটু জোরালো হয়েছে। ঠোঁটের কোণায় বাকা হাসি ফুটিয়ে তুললেন ডক্টর। এরপর বললেন, "তুমি বেশ ভালোমতোই পরিকল্পনা এঁটেছিলে। কিন্তু সফল হতে পারোনি৷"

শব্দ করে গাড় এক নিশ্বাস নিলেন ড. আলফাজ। মুখের আকৃতি গোল করে তা ত্যাগ করে বললেন, "নজরুলের ঐ কথাটি খুব মনে পড়ছে- সাপ লইয়া খেলিতে গেলে তাহাকে পুরোদস্তুর সাপুড়ে হইতে হয়।"

Sahin, Santo, Shuvo, Hasibul hasan, Nasim, Mr kiddo, Mahmud and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum