সাদা কাগজ
Would you like to react to this message? Create an account in a few clicks or log in to continue.
Go down
avatar
নবাগত
নবাগত
Posts : 1
স্বর্ণমুদ্রা : 173
মর্যাদা : 10
Join date : 2021-05-31
View user profile

কেউ কারো না Empty কেউ কারো না

Mon May 31, 2021 6:45 am
মিরপুরের বস্তি থেকে নাকি এক ছেলে বিদেশে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।
আমি আর আমার ক্যামেরাম্যান রাজন তাই রওনা হলাম তার ছোটো খাটো একটা ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য। বস্তি বলে ঠিক ঠাক লোকেশন ছিল না। তাও ভাবলাম এত বড় খবর ঠিক ই পেয়ে যাবো ঠিকানা।
লক্ষ লক্ষ টাকা বাজেট এর কোনো চিহ্নই নেই বস্তির আশে পাশে। এই টাকা গুলো খুব সম্ভবত বস্তির মানুষ খেয়ে তাদের নিজেদের উন্নয়ন করতে দেয় নি।কারণ উন্নয়ন হলে তারা বিভিন্ন ত্রাণ মিস করবে যে।
যাই হোক বৃষ্টির দিন নেই তবুও রাস্তার পাশে কাদা। আর সেই কাদার গন্ধ থেকে বুঝতে পারলাম মানুষ এখানে মূত্র বিসর্জন দেয় লোকচোখের আড়ালে। আমার সেই ধারণা সম্পুর্নভাবে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ১৩/১৪ বছরের এক ছেলে বসে গেলো মূত্র বিসর্জন দিতে । লোকচোখের আড়াল হবার প্রয়োজন বোধ করলো না।
সামনের দিকে কিছু পথ যাওয়ার পড় এক দোকানদারের সাথে কথা। তিনি টাকা নিয়ে মানুষের মেমোরি কার্ড এ গান - বাজনা , নাটক, সিনেমা লোড করে দেন। সম্ভবত বয়সন্ধিকাল পেরোয়নি এমন ৫ থেকে ৬ জন ছেলের একটি দল এসে দোকানদারকে বলল,
-ওই মামা সরকারি মাল হইবো?
-হইত না ২ দিন আগে টাকা দিছস শালা???
-আরে হুদাহুদি চিল্লাও না দিয়া দিমু। আমগোরে ফকিন্নি মনে কইরো না।
-পরেরবার টাকা ছাড়া দিমু না মনে রাখিস।

প্রথমত,সরকারি মালের বিশেষ ভাবার্থ বুঝতে পারছিলাম না।তবে সরকারি মাল পাওয়ার পরে ঐসব ছেলেদের মুখের ঝলমলে ভাব দেখে বুঝতে পারলাম এগুলো সেই সরকারি মাল যেগুলো পাওয়ার জন্য মধ্যবিত্ত কিংবা ধনী শ্রেণীর সন্তানেরা গভীর রাতে নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে অন্য দেশে ডাটাবেজে গিয়ে তাদের মূল্যবান ধন চুরি করে আনে। চুরি করা নিষিদ্ধ হলেও চুরি করার রাস্তাটা নিষিদ্ধ না।
কি অদ্ভুত তাইনা!
যেই ছেলেগুলোর এখনো বয়সন্ধিকালে শুরু হয়নি তারা যৌনতা থেকে কি মজা নিবে?আর যৌনতা কিভাবে তাদের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেল? ছোটবেলা থেকে তারা বিনোদনের অংশ হিসেবে যে কয়টা গান শুনেছে কিংবা নাটক-সিনেমা দেখেছে তার চেয়ে
চেয়ে বেশি দেখেছে বস্তির প্রবেশমুখে লো কোয়ালিটি এর সস্তা যৌনতা ভরা সিনেমার পোস্টার। তখন বাধ্য হয়ে স্বীকার করলাম এগুলোই তাদের কাছে বিনোদন। ক্ষুধার্ত মনের খোরাক।রাজন আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে সামনের দিকে এগুনোর আহ্বান জানালো। তার সাথে সম্মতি জানিয়ে গন্তব্যের খোঁজে। এই দোকান ওই দোকান সাথে পথচারী। কিন্তু কোথাও হদিস পাচ্ছিলাম না সেই ছেলের।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পিছন থেকে এক ৬ বছর বয়সী মেয়ের ক্ষুধার্ত ডাক। ঝাপটে পা জড়িয়ে ধরে বলে ফেললো ,
- স্যার কয়ডা ট্যাকা দেন। রুটি খামু। বিশ্বাস করেন সকাল থিকা কিছু খাই নাই। ডাক শুনেই মন থেকে তার জন্য মায়া চলে আসতে বাধ্য।
- নাম কি তোর???
- হুমায়রা।(রাজন যেনো কিছু টা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, এত সুন্দর নাম কিভাবে এই বস্তিতে??)
- যাই হোক হুমায়রার ক্ষুদার কষ্টে কান না দিয়ে আমি তাকে নানা রকম প্রশ্ন করা শুরু করলাম। (আমাদের মত রিপোর্টার দের যা কাজ আর কি। আমিও ঐতিহ্য ভাংলাম না।)
তবে খেয়াল করছিলাম বাচ্চাটা ক্ষুদার কষ্টে ঠিক মত উত্তর দিতে পারছিল না।
- তোর বাপ মা কি করে?(রাজন প্রশ্ন করলো)
- স্যার আব্বায় ইট ভাঙ্গে। আর মা নাই। আব্বার ইনকাম দেইখা আরেক বিয়া করছে।
অবাক হচ্ছিলাম। এই মেয়ে এই ব্যাপার টা অনুধাবন করলো কিভাবে যে আর্থিক দুরবস্থা তার বাবা মায়ের বিচ্ছেদের কারণ। আবার কি সুন্দর ইনকাম ইংলিশ শব্দ টাও বললো!
যাই হোক অসুস্থ বান্ধবীর সুস্থতার আশায় মেয়েটাকে কিছু টাকা নিয়ে বললাম খেয়ে নিও। দান খয়রাত এর অছিলায় নাকি আল্লাহ্ অসুস্থ কে সুস্থ করে দেন শুনেছি। হারাম সম্পর্ক নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। বেশ অবাক লাগছে নিজের কাছে। যাই হোক পরের কথা বলি।
- স্যার আমাগো লাইগা আল্লায় ১২ মাস রোজা দিলে ভালো হইত। মসজিদ এ ট্যাকা ছাড়া খাওন পাওয়া যায় রোজার সময়। বচ্ছরে ১২ মাস রোজা আর কুরবানীর ঈদ ২ ডা।
৩০ রোজা রাখতেই জীবন শেষ আর এই মেয়ে বলে ১২ মাস রোজা!

ক্ষুদার যন্ত্রণা কি আমাদের ভাবুক বানায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর নাই। বস্তিতে এসে সেই ছেলের খোঁজ পাই আর না পাই বেচে থাকবার অনুপ্রেরণা পাচ্ছি। তমার সাথে বিচ্ছেদের পড় সুইসাইড করবার প্ল্যান করেছিলাম। তখন ই জীবনে আমার অসুস্থ্ বান্ধবীর প্রবেশ। তার ক্যান্সার লাস্ট স্টেপ এ।
যাই হোক এবার হাটা শুরু করলাম। মেয়েটির হতে চকচকে ১০০ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মনে হচ্ছিল নিজেকে। ওর হাসিটা অতুলনীয় ছিল। আমার জন্য ও মন থেকে দোয়া করছিল।
বেলা ১২ টা পার হয়ে যায় যায় ভাব। যেই মুখ্য উদ্দেশ্যে বেড়িয়েছি সেই কাজের কাজ হলো না। কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না।আসলে কাজে মন ছিল না। বস্তিতে ঢুকে নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক মনে হচ্ছিল। বিভিন্ন ঘটনা দেখছিলাম আর ফেইসবুক সৈনিকদের মত মনে মনে কমেন্ট করছিলাম। এইটা আমার প্রথম বস্তি ভ্রমণ ছিল। জীবন এর তিক্ত স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। বিদেশে পড়তে যাওয়া ছেলেটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।
যোহর এর আযান দিবে দিবে ভাব এমন সময় এক ডিম বিক্রেতার কাছে খোঁজ পেলাম। মজিদ মিয়ার ছেলে নাকি বিদেশ যাচ্ছে পড়তে। মজিদ মিয়ার ২ বউ। যেই ছেলে বাইরে যাচ্ছে পড়তে সে দ্বিতীয় ঘরের ছেলে। আগের ঘরে কোনো সন্তান নেই তার। ছেলের বিদেশ যাবার খবরে ২য় বউ এর পা যেনো রীতিমত আকাশে। আর হবেই না কেনো। এ যে বিশাল ব্যাপার।মজিদ মিয়ার সাথেই দেখা পাশের চায়ের স্টলে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মজিদ মিয়া বুঝতে পারলেন আবার কেউ ইন্টারিউ নিতে এসেছে।
- স্যার! আমাগো সজীব এর ছবি তুলবেন?পত্রিকায় দিবেন? চলেন আপনারে আমাগো বাসায় নিয়া যাই।দাড়ান স্যার। ওই শমসের স্যার রে আগে এক কাপ চা দে। মালাই মাইরা চা দে স্যার গো।
লোকটার চোখে ভীষন উল্লাস। তবে ইন্টারভিউ এর সাথে তিনি পরিচিত। এর আগেও কোনো রিপোর্টার নিশ্চয় এসেছেন। চা খাওয়া শেষ করে উঠলাম গন্তব্যে যাওয়ার জন্য।
- সজীবের আম্মা বাইরে আহ। সজীব রে ডাক দাও। ওই সজীব কই তুই?
-চিল্লাইতাসো কা? সজীব এ আকাশ এর লগে থানায় গেছে নয়ন রে ছাড়াইতে। বান্দির বাচ্চা এইবার নাকি খুন করতে গেছিলো। কিন্তু পারে নাই ধরা খাইছে।
সজীব, নয়ন আর আকাশ ছোটবেলার বন্ধু। নয়ন সীমিত আকারে ভাড়াটে সন্ত্রাসী আর আকাশ পানির বোতল বিক্রি করে।
বেশ কিছুক্ষণ পর সজীবের দেখা।
- সজীব,আমরা তোমার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে চাই।
- হা বলেন।
( তেমন আগ্রহ দেখছিলাম না। এর আগেও ইন্টারভিউ দিয়েছে তা নিশ্চিত হলাম।)
- সজীব তোমার পুরো নাম আর ডিটেইলস এ আমাদের বলো। তোমাকে দেখে ইন্টারভিউ দিতে দিতে পাকা লাগছে ।
- মুচকি হাসি দিয়ে সব বলা শুরু করল।
এক এন জি ও থেকে নয়ন ,সজীব আর আকাশ সহ প্রায় ১৭ জনকে নিয়ে জোর করে স্কুল এ ভর্তি। তারপর তাদের থেকেই নানান রকম সহায়তা করা হতো। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের মাঝে শুধু সজীব ই পড়ালেখা চালিয়ে যায়। যদিও শুরুতে সজীবের বাবা মায়ের ইচ্ছা ছিল না তেমন। তবুও কোনো ভাবে হয়ে গেছে পুরো ব্যাপার টা। সজীব ওই এন জি ও থেকে বিশ্বের বৃত্তিতে আগামী ২ সপ্তাহে মালয়েশিয়া যাচ্ছে পড়তে। সম্ভবত বিষয় টা "Human development" সম্পর্কিত।
তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলাম বস্তি নিয়ে। তবে বস্তির মানুষকে নিয়ে তারকিন্তু তেমন মহৎ কোনো উদ্দেশ্য দেখলাম না। রাজনৈতিক নেতাদের মত বাঁধা কিছু বুলি এই সেই। কথা বলে বুঝলাম খুব আত্মকেন্দ্রিক সে। আর বড় হয়ে এই বস্তি তার কাছ থেকে কি পাবে সেটাও রাজন আর আমার আন্দাজ করতে বাকি রইলো না।
আসলে সে যেই সমাজে বড় হয়েছে সেখান থেকে আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার ই কথা। এখানে মানুষ বাবা মা চেনার আগে টাকা চেনে। এখন থেকে আত্মকেন্দ্রিক মানুষ বের হবার ঘটনা সাভাবিক।
নয়ন আর আকাশ এর সাথেও দেখা। তবে তাদের মন অন্য রকম। বিশেষ করে আকাশ এর। সজীব কে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। সে পানি বিক্রির টাকা থেকে তাকে খাতা কেনার টাকা দিত। তাই তার কাছ থেকে আকাশ এর অনেক আশা। সে তাকে একটা পানির আড়ৎ দিয়ে দিবে। সেখান থেকে সে আরো বড় ব্যবসা করবে।
আর নয়ন এর ইচ্ছা সে সজীব এর সাথে কাচ্চী বিরিয়ানি খাবে। সজীব এর বাবা মায়ের সাথেও বেশ সময় কথা হলো। এখন তাদের সজীব কে নিয়ে খুব স্বপ্ন। অথচ সজীব কে তাদের পড়ানোর কোনো ইচ্ছা ছিল না। এখন সজিবের বাবা আর মায়ের রীতিমত ঝগড়া । সজীব এর সফলতার পেছনে কার অবদান বেশি তা নিয়ে।
ইন্টারভিউ শেষ করে ফেরার পথে সজীব সম্পর্কে রাজন এর মন্তব্য শুনছিলাম।
- এত কষ্ট করে আসলাম কিন্তু মানুষ কে অনুপ্রেরণা দেওয়ার মতো কোনো গল্প খুঁজে পেলাম না। সজীব এর কাছে এসব কোনো ব্যাপার ই না এমন মনোভাব। অদ্ভুত লাগল ভাই।

আমার মনে হয় সজীব জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে একটা পণ্য হিসাবে কাজ করেছে। যেমন আমরা তাকে পণ্য হিসাবে আমাদের পত্রিকার T.R.P বাড়ানোর জন্য কাজ করছি। এন জি ও এর প্রচার বাড়ছে। আর বস্তিতে সে তো বরাবর ই বাবা মায়ের কাছে এক পণ্যই ছিল।বস্তির মানুষের অনেক আশা যে তাকে নিয়ে এমন কিন্তু না।অনেকে এই খবর ও জানে না যে সজীব নামের কোনো ছেলে বাইরে পড়তে যাচ্ছে।
জীবন হয়তো এমন ই। দিনশেষে সার্থ ছাড়া মানুষকে নিয়ে ভাববার সময় কই আমাদের। ফেরার পথে সারাদিন এর স্মৃতিচারণ করছিলাম। একই বস্তিতে কত রকম ব্যাক্তিত্ব। গাড়িতে চড়ার সময় ই বসের ফোন।
- এক রিপোর্ট করতে এতক্ষণ?আমিও কি তোমাদের গল্পের আসরে যোগ দেব?
- নিরুপায় আমি সারাদিনের সব ঘটনা মনে করে বাকরুদ্ধ ভাবে স্যার এর ফোন টি কেটে ভাবতে ভাবতে চলা শুরু করলাম। আবার হয়তো কোনো সজীব এর সাথে দেখা হবে।

-There is none for none under the sun.( কেউ কারো না)
-তানভীর আহমেদ।

Khondkar, Jamshed, Mr.twist, Mr kiddo, Mahmud, Akash, রকি and লেখাটি পছন্দ করেছে

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum